সুদীর্ঘকাল ধরেই ইউরোপীয়রা 'Y' দেশের লোকদের ঔপনিবেশিক শাসনে নিষ্পেষিত করছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাদের অপমানিত ও বঞ্চিত করছে। এ অমানবিক নির্যাতনের ও শোষণের বিরুদ্ধে এক মহান অবিসংবাদিত সংগ্রামী নেতার নেতৃত্ব ওই দেশের জঘন্য নীতির মৃত্যু নিশ্চিত করে। জয় হয় কালো মানুষের।
স্নায়ুযুদ্ধের ইংরেজি প্রতিশব্দ Cold War. ১৯৪৬ সালের শুরুর দিকে Cold War শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়া ও আমেরিকা বন্ধু হয়ে অক্ষশক্তিকে প্রতিহত করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ার সমাজতন্ত্র ও আমেরিকার পুঁজিবাদ দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। রাশিয়া চেয়েছিল বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে। দুই পরাশক্তির এ প্রতিদ্বন্দ্বিতাই স্নায়ুযুদ্ধ। এ সময় একে অপরে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও উভয় দেশ সবসময় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে থাকত। রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে এ যে স্নায়ুবিক উত্তেজনা এটিই স্নায়ুযুদ্ধ বা Cold war নামে পরিচিত।
উদ্দীপকে বর্ণিত বিষয়ের সাথে আমার পাঠ্যবইয়ে আলোচিত দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসক কর্তৃক প্রচলিত বর্ণবাদ প্রথার মিল রয়েছে। ১৮২০ সালে ইংরেজরা প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকায় তাদের বসতি স্থাপন করে। ইংরেজরা এবং অন্য ইউরোপীয়রা দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের পৃথক করতে যে নীতি গ্রহণ করে তার ফলেই গড়ে ওঠে বর্ণবাদ। বর্ণবাদ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ Apartheid. ১৯৪৩ সালের ২৬ মার্চ Die Burger পত্রিকায় একটি প্রবন্ধে সর্বপ্রথম Apartheid শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ১৯৪৮ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল পার্টি বর্ণবাদ কথাটির ব্যাপক প্রচলন করে। ইউরোপীয়রা আফ্রিকায় বসতি স্থাপনের পর কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে শুরু করে এবং কালো শ্রমিকদের বেতন শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকদের তুলনায় কম দেওয়া হতো। ১৯৪৮ সালে ন্যাশনাল পার্টি দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বর্ণবাদ আফ্রিকার সরকারি নীতিতে পরিণত হয়। ১৯৪৯ সালে এ সরকার বর্ণবাদ সংক্রান্ত ৭টি আইন প্রণয়ন করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রত্যেক বর্ণের অধিবাসীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়পত্র প্রণয়ন করা হয়। কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। কোনো.. কৃষ্ণাঙ্গ শহর এলাকায় ৭২ ঘণ্টার বেশি অবস্থান করতে পারত না। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল এবং তাদের জন্য আলাদা যাত্রীবাহী বাসের ব্যবস্থা ছিল। যার ফলশ্রুতিতে বর্ণবাদ বিশ্ব ইতিহাসে একটি লজ্জাজনক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। আলোচনা শেষে বলা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ প্রথা কঠোরভাবে বিদ্যমান ছিল, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল।
উদ্দীপকে উল্লিখিত নেতার কার্যক্রমের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মিল রয়েছে।
নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সেকেই-এর মোভেজো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নেলসন ম্যান্ডেলা যখন একজন পূর্ণবয়স্ক যুবক তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের শাসন চলছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন বর্ণবাদ প্রথা ছিল প্রকট। সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গরা দক্ষিণ আফ্রিকা শাসন করত। তারা কৃষ্ণাঙ্গদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করত। নেলসন ম্যান্ডেলা এ বর্ণবাদ প্রথা দূরীকরণের জন্য এবং কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। এক্ষেত্রে তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে অনুসরণ করতেন। ম্যান্ডেলা ১৯৪৩ সালে এন্টন লেমবেডের সাথে দেখা করেন যিনি কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন পরিচালনার জন্য তিনি ১৯৬২ সালে বন্দি হন এবং দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবাস জীবনের পর ১৯৯০ সালের মুক্তি পান। এরপর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্কের সাথে আলোচনা করে বর্ণবাদ নামে এ ঘৃণ্য প্রথার বিলোপ সাধন করেন। তাই বলা যায়, বর্ণবাদ প্রথা বিলোপ সাধনে নেলসন ম্যান্ডেলার অবদান সর্বাগ্রে। তিনি বর্ণবাদ প্রথা বিলোপ করতে গিয়ে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাঁর জীবন ও যৌবন দুটোই উৎসর্গ করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন কারাবাস জীবনযাপন করেছেন। তবুও তিনি আন্দোলন থেকে সরে আসেননি। তিনি শুধু চেয়েছেন, আফ্রিকার মানুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও ঘৃণ্য বর্ণবাদ প্রথা দূর করা। যা তিনি করতে পেরেছেন পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে এক মহান নেতার আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। পরিশেষে বলা যায়, নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন
ফ্রেডারিক উইলিয়াম দ্য ক্লার্ক (১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) (Frederik Willem de Klerk 1936): ফ্রেডারিক উইলিয়াম ডি ক্লার্ক দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসনের সমর্থক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পার্টির নেতা। তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্ণবাদের সমর্থক সরকারের সর্বশেষ শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য দূরীকরণে সহায়তা করেন। সব বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকার ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তিনিই প্রথম গ্রহণ করেন। শ্বেতাঙ্গ শাসনের সমর্থক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পার্টির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাকে বর্ণবৈষম্যহীন দেশরূপে গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের African National Congress (ANC) এবং The Communist Party of South Africa-এর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন।
নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করে দেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। তার সময়কালকে বলা হয় ন্যাশনাল পার্টি ও আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যে আলোচনার যুগ। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তার উদ্যোগে গণভোটের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বর্ণবৈষম্যের অবসান হয়। বর্ণবৈষম্য দূরীকরণের জন্য তিনি ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতন্ত্রের নতুন যুগের সূচনা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রেক্ষাপটে তারা এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তিনি বিশ্বমানবতার কল্যাণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা, সমিতি ও সেমিনারে বক্তৃতা দেন। শ্বেতাঙ্গ হয়েও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে তার অবদান চিরস্মরণীয়।'
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র (১৯২৯-১৯৬৮) (Martin Luther King Jr. (1929-1968): ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে আগস্ট ওয়াশিংটনে লাখ লাখ মানুষের মিছিলে মার্টিন লুথার কিং-এর দেওয়া বক্তৃতা 'I have a dream...' কখনো ভোলার নয়। সেই বক্তৃতায় মার্টিন লুথার আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণায় সব মানুষের সমান অধিকারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, "স্বাধীনতার শতবর্ষ পরেও মর্মান্তিক সত্য হচ্ছে, নিগ্রোরা আজও মুক্ত নয়। নিজ বাসভূমেই নিগ্রো মানুষেরা নির্জীব দশায় পড়ে আছে....।" মার্টিন লুথার বলেন, "বন্ধুরা, বর্তমানের প্রতিকূলতা ও বাধা সত্ত্বেও আমি আজও স্বপ্ন দেখি। আমার এ স্বপ্নের শেকড় পাতা আমেরিকান স্বপ্নের গভীরে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এ জাতি জাগবে এবং বাঁচিয়ে রাখবে এ বিশ্বাস: আমার এ সত্যকে স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করেছি; সব মানুষ সমান।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে সাবেক দাস আর সাবেক দাস মালিকের সন্তানরা ভ্রাতৃত্বের এক টেবিলে বসতে সক্ষম হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন মরুময় মিসিসিপি রাজ্য, অবিচার আর নিপীড়নের উত্তাপে দম বন্ধ করা মিসিসিপি হয়ে উঠবে মুক্তি আর সুবিচারের মরূদ্যান। আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চার সন্তান একদিন এমন এক জাতির মধ্যে বাস করবে, যেখানে তাদের চামড়ার রং দিয়ে নয় তাদের চরিত্রের গুণ দিয়ে তারা মূল্যায়িত হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন আলাবামা রাজ্যে সেখানকার গভর্নরের ঠোঁট থেকে কেবলই বিধিনিষেধ আর গঞ্জনার বাণী ঝরে সেখানকার পরিস্থিতি এমনভাবে বদলে যাবে যে, কালো বালক আর বালিকারা সাদা বালক আর বালিকাদের সঙ্গে ভাই-বোনের মতো হাত ধরাধরি করবে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন সব উপত্যকা উত্তীর্ণ হবে, সব পাহাড়-পর্বত হবে আনত, এবড়োখেবড়ো জমিন মসৃণ হবে, আঁকাবাঁকা জায়গাগুলো সমান হবে এবং ঈশ্বরের জয় উদ্ভাসিত হবে এবং একসঙ্গে সব মানব তা চাক্ষুষ করবে। .... এ-ই আমার স্বপ্ন।"২
বিশ্বসভ্যতার এক নিন্দনীয় ও সমালোচনার বিষয় বর্ণবাদ, যা মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। আফ্রিকার কালো মানুষেরাই বেশি বর্ণবৈষম্যের শিকার। শ্বেতকায় মানুষগুলো অশ্বেতকায় মানুষের প্রতি যে বৈষম্যমূলক ঘৃণ্য আচরণ করে তা-ই বর্ণবাদ। মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের একটি হচ্ছে তার ত্বক। চামড়ার বর্ণগত তারতম্যের কারণে কেউ সাদা, কেউ কালো, আবার কেউ বর্ণসংকর। নৃতাত্ত্বিকভাবে নরগোষ্ঠীকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ককেশয়েড, অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলয়েড এবং নিগ্রোয়েড। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ককেশয়েড অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গরা অন্য বর্ণের বিশেষ করে নিগ্রোদের বা কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ করে তা-ই বর্ণবাদ। এটি মনোচৈতন্যের একটি বিষয়। আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জঘন্যতম নিষ্ঠুর প্রথাই বর্ণবাদ। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানবতাবিরোধী এ প্রথা থেকে মুক্তির আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, যাকে অনুসরণ করেন বিশ্বমানবতার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এবং আরেক জীবন্ত কিংবদন্তি ডেসমন্ড টুটু। এ মনীষীদের আন্দোলনে বর্ণবাদ আজ ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ। এ অধ্যায়ের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎদের জানা শিক্ষার্থীদের জন্য অতি জরুরি। এতে তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত হবে। শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ ও ইতিবাচক আচরণ সৃষ্টিতে এ অধ্যায়ের পাঠগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন-ড. সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী স্যারে এর লেখা বই
ফ্রান্সের অভিজাতগণ দাবি করেন, অভিজাতরা বহিরাগত বিজেতা জাতি ফ্রাঙ্ক-এর বংশধর। ফ্রাঙ্কিশগণ যেহেতু শ্রেষ্ঠ এবং তাদের দ্বারাই ফ্রান্স প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু জন্মগতভাবেই তারা তৃতীয় শ্রেণির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এ কারণে সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, নেতৃত্ব অভিজাতদের প্রাপ্য। তৃতীয় শ্রেণির লোকদের তারা বলে, এরা দাসদের সাথে সংকরায়নের ফলে উদ্ধৃত এজন্য তারা নিকৃষ্ট। আর এভাবে ফ্রান্সে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
উদ্দীপকের বিষয়টি আমার পাঠ্যবইয়ের বর্ণবাদ প্রথার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। উদ্দীপকে বর্ণিত জুয়েলের গায়ের রং ফর্সা, তমালের গায়ের রং কালো। এ কারণে জুয়েল তমালকে ঘৃণার চোখে দেখে। জুয়েল মনে করে, তমালদের পূর্বপুরুষ নীচু জাতের। এজন্যই তমালের গায়ের রং কালো। উদ্দীপকের এ ঘটনার সাথে পাঠ্যবইয়ের বর্ণবাদ প্রথার সাদৃশ্য রয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কারণে বর্ণবাদের ধারণার সৃষ্টি হয়। বর্ণবাদ মানব সমাজে বিদ্যমান একটি ঘৃণ্যপ্রথা। আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এ প্রথা মানবতাকে কলঙ্কিত করেছিল। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে আধিপত্যের প্রতিযোগিতা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের বীজ বপন করে দীর্ঘকাল টিকেছিল। বর্ণবাদের মর্মকথা হলো শ্বেতাঙ্গরা জন্মগতভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের বা অন্যান্য জাতি অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকার আছে এবং তাদের প্রতি বৈষম্য আচরণ করা দোষের কিছু নয়।' পরিশেষে বলা যায়, উপনিবেশবাদ ও চরম জাতীয়তাবাদের ধারণা থেকেই বর্ণবাদের সৃষ্টি হয়েছে।
হ্যাঁ, আমি মনে করি উক্ত ধারণার জন্য অর্থাৎ বর্ণবাদ প্রথার জন্য অনেক দেশে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছিল। আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশে বর্ণবাদের কারণে সংঘাত সৃষ্টি * হয়েছিল। আমেরিকা মহাদেশে কৃষিকাজ ও অন্যান্য শ্রম কাজের জন্য আফ্রিকা থেকে নিগ্রোদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হতো। আফ্রিকার কালো মানুষের প্রতি আমেরিকার শ্বেতাঙ্গরা বর্ণবাদ নীতি অনুসরণ করত। আমেরিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাস, ট্রেন, খাবারের দোকান প্রভৃতি ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে বর্ণবাদ নীতি অনুসরণ করত। দক্ষিণ আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনামলে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর কর্তৃত্ব করত। কৃষ্ণাঙ্গরা খনি এবং কঠিন কাজে নিয়োগ পেত; কিন্তু মজুরি পেত কম আর শ্বেতাঙ্গরা কম পরিশ্রমে বেশি বেতন পেত। এমনকি আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের অভিবাসী শ্বেতাঙ্গরাও শ্বেতাঙ্গ শাসকদের কাছে পক্ষপাতমূলক আচরণ পেত। স্থানীয় ভারতীয় বিচারকরা ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের বিচার করতে পারত না। বর্ণবাদ প্রথার কারণে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহুদেশে সংঘাত হয়েছে।পরিশেষে বলা যায়, বর্ণবাদ প্রথার কারণে আমেরিকা ও আফ্রিকাসহ বহু দেশে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
১৯১২ সালের ৮ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের প্রথম জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠন আফ্রিকান জাতীয় কংগ্রেস সংক্ষেপে ANC প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংগঠন আফ্রিকানদের সংহতি, যাবতীয় ধরনের বর্ণবৈষম্যবাদের বিরোধিতা করে এবং বর্ণবৈষম্যমুক্ত একীভূত ও গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ঘোষণা দেয়।