উত্তরঃ
রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এমন একটি আইনি ও কৌশলগত ব্যবস্থা, যেখানে একটি দেশ অন্য দেশের আরোপিত শুল্ক বা করের হারের সাথে হুবহু সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করে; সহজ কথায় "তুমি আমার পণ্যে যতটুকু শুল্ক বসাবে, আমিও তোমার পণ্যে ঠিক ততটুকু শুল্কই আরোপ করব"-এই 'ইট-পাটকেল বা "যেমন কর্ম, তেমন ফল" (Tit-for-tat) নীতিই হলো রিসিপ্রোকাল বা পাল্টা শুল্ক। এটি মূলত এক পক্ষ কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য পক্ষ থেকে নেওয়া একটি বাণিজ্যিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা, যার মূল লক্ষ্য কেবল বাড়তি রাজস্ব আদায় করা নয়, বরং এই অর্থনৈতিক চাপকে একটি শক্তিশালী দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ দেশকে অনুচিত বাণিজ্যিক আচরণ (যেমন: মেধা স্বত্ব চুরি বা অবৈধ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি) সংস্কার করতে এবং মুক্ত বাণিজ্যের টেবিলে বসতে বাধ্য করা।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে রিসিপ্রোকাল ট্যারিফের ভূমিকা:
যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে এই রিসিপ্রোকাল বা পাল্টা শুল্ক নীতি একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মূল ভূমিকা নিচে দেওয়া হলো:
i) বাণিজ্য ভারসাম্য ও দরকষাকষি: যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই চীনের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এবং অনুচিত বাণিজ্য চর্চাকে তাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর মনে করেছে। এই ঘাটতি পূরণে এবং চীনকে তাদের বাণিজ্যের নিয়ম পরিবর্তন করতে বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা সমমানের শুল্ক চাপানোর কৌশল গ্রহণ করে। ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য কেবল রাজস্ব আদায় করা ছিল না, বরং এই পাল্টা শুল্কের বিশাল আর্থিক চাপকে একটি কার্যকর দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এই নীতির মাধ্যমে বেইজিংকে তাদের অভ্যন্তরীণ ভর্তুকি নীতি ও জোরপূর্বক প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া সংস্কারের টেবিলে আসতে বাধ্য করা হয়। এটি প্রমাণ করে যে ভূ-অর্থনৈতিক রাজনীতিতে রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে, যা একপাক্ষিক বাণিজ্যিক আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
ii) শুল্ক বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিভিন্ন পণ্যের ওপর উচ্চহারে (একপর্যায়ে ১৪৫% পর্যন্ত) শুল্ক আরোপ করলে, চীনও তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন পণ্যের ওপর সমকক্ষ বা তুলনামূলক শুল্ক (যেমন: ১২৫% বা তার বেশি) আরোপ করে। এই পাল্টা শুল্ক একে অপরের বাজারকে সঙ্কুচিত করে দেয়। উভয় দেশই তাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষার্থে এই শুল্কের হারকে ক্রমান্বয়ে এক অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে যায়। এই অন্ধ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশোধের চক্র সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের গণ্ডি পেরিয়ে একপর্যায়ে উচ্চ-প্রযুক্তি এবং বিরল খনিজ সম্পদের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ সুগম করে।
iii) সংঘাত থেকে আপস-আলোচনা: এই ধরনের আক্রমণাত্মক রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক শেষ পর্যন্ত উভয় দেশকেই বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলে। এর ফলে উভয় পক্ষই পরবর্তীতে শুল্ক হার কমানো বা সাময়িক বিরতির মতো সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য হয়। পাল্টা শুল্কের এই চরম রূপ উভয় পক্ষকে এমন এক অর্থনৈতিক খাদের কিনারায় নিয়ে যায়, যেখানে সংঘাত দীর্ঘায়িত করলে কারোরই জেতার সুযোগ থাকে না। অতিরিক্ত করের ধাক্কায় যখন মার্কিন শেয়ার বাজারে ধস নামে এবং চীনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি মারাত্মক হ্রাসের সম্মুখীন হয়, তখন উভয় দেশই পিছু হটতে বাধ্য হয়। এর ফলেই বিভিন্ন সময়ে 'ফেজ-১' চুক্তি বা হোয়াইট হাউস ফ্যাক্ট শিটের মতো দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদে শুল্ক স্থগিত বা হ্রাসের নতুন রূপরেখা তৈরি হয়।
iv) উভয়মুখী অর্থনৈতিক ক্ষতি: রিসিপ্রোকাল ট্যারিফের কারণে মার্কিন বাজারে চীনা পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তা ও উৎপাদনকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একইসাথে, চীনও যখন পাল্টা শুল্ক বসায়, তখন মার্কিন কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমেরিকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন চীনা কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ কেনে, তখন উচ্চ শুল্কের কারণে তাদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা দেশটিতে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি বা স্ট্যাগফ্লেশন তৈরি করে। এর বিপরীতে, বেইজিংয়ের পাল্টা শুল্কের কারণে আমেরিকার কৃষিখাত তাদের ইতিহাসের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বাজারটি হারিয়ে চরম সংকটে পড়ে, যা সামাল দিতে মার্কিন সরকারকে বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ ভর্তুকি দিতে হয়। অন্যদিকে, আমেরিকার বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় চীনের হাজার হাজার উৎপাদনমুখী কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকট দেখা দেয়।
v) বিশ্ব বাণিজ্যে প্রভাব: বিশ্বের এই দুই বৃহত্তম অর্থনীতির রিসিপ্রোকাল ট্যারিফের লড়াই বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দেয়। বহুজাতিক মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামালের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে নতুন বিনিয়োগ থমকে গেছে। উচ্চ শুল্কের এই দেয়াল এড়াতে কোম্পানিগুলো এখন চীন থেকে তাদের উৎপাদন কেন্দ্র ভিয়েতনাম, মেক্সিকো কিংবা বাংলাদেশে সরিয়ে নিচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে 'China+1' কৌশল হিসেবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে। সর্বোপরি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা-এর বহুপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা এই দ্বিপাক্ষিক রিসিপ্রোকাল ট্যারিফের আগ্রাসনে অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববাজার স্থায়ীভাবে দুটি ভিন্ন ব্লকে বিভক্ত হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে।