ছাত্রসমাজ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা এবং পরিবর্তনের ধারক ও বাহক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধিকার অর্জনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। রাজনীতি হলো একটি দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। যখন এই দুটি শক্তি সম্মিলিত হয়, তখন তা দেশের গতিপথ পরিবর্তনে এক অসামান্য ক্ষমতা ধারণ করে। তবে, ছাত্ররাজনীতির গতিপথ সর্বদা মসৃণ ছিল না; এর রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস যেমন, তেমনি রয়েছে কলঙ্কিত অধ্যায়ও।
ছাত্রসমাজের পরিচয়:
ছাত্রসমাজ বলতে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আওতাভুক্ত অথবা বৃহত্তর অর্থে শিক্ষাজীবনে অবস্থানরত তরুণ প্রজন্মকে বোঝায়। জ্ঞানার্জন, মেধার বিকাশ, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখা তাদের প্রধান কাজ। তারুণ্যের উচ্ছলতা, আদর্শবাদিতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব এবং আপসহীনতা ছাত্রসমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
রাজনীতির পরিচয়:
রাজনীতি হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণ, সংরক্ষণ ও প্রয়োগের বিজ্ঞান ও শিল্প। এটি জনগণের কল্যাণ সাধন, সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অবস্থান দৃঢ় করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। গণতন্ত্রে রাজনীতি জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল।
ছাত্র ও রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিটি পরতে ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অবিস্মরণীয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের আত্মত্যাগ ও নেতৃত্ব ছিল অনবদ্য। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এসব আন্দোলন প্রমাণ করে, ছাত্রসমাজ কেবল বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা প্রজন্ম নয়, বরং তারা প্রয়োজনে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে।
ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
গণতন্ত্রের প্রহরী: ছাত্ররাজনীতি গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নেতৃত্ব তৈরি: ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
সমাজসচেতনতা বৃদ্ধি: সামাজিক অসঙ্গতি, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ জনমত গঠনে সাহায্য করে।
অধিকার প্রতিষ্ঠা: শিক্ষাক্ষেত্রে ও বৃহত্তর সমাজের বিভিন্ন ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ছাত্ররাজনীতি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ: ছাত্ররাজনীতি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে।
ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক দিক:
গৌরবময় ইতিহাসের পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতির কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে, যা এর ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে।
সহিংসতা ও হানাহানি: ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দলীয় কোন্দলের কারণে শিক্ষাঙ্গনে প্রায়শই সহিংসতা দেখা যায়, যা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে।
সেশন জট: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘর্ষের কারণে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকা এবং পরীক্ষা বিঘ্নিত হওয়ায় সেশন জট সৃষ্টি হয়।
অরাজনৈতিক উদ্দেশ্য: কিছু ছাত্রনেতা ব্যক্তিগত বা দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যবহার করে, যা সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে অনীহা তৈরি করে।
অস্ত্রের ব্যবহার: শিক্ষাঙ্গনে অস্ত্রের ব্যবহার ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করেছে এবং ছাত্রদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করেছে।
মূল্যবোধের অবক্ষয়: আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে সুবিধাবাদী ও পেশিশক্তির রাজনীতির কারণে ছাত্রসমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে।
ছাত্ররাজনীতির বর্তমান অবস্থা:
বর্তমানে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি তার গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দলতন্ত্র, পেশিশক্তি ও অর্থায়নের প্রভাবে ছাত্ররাজনীতি এখন অনেকটাই মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করছে। শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার ও একাডেমিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার পরিবর্তে কতিপয় ছাত্রনেতার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছে।
ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক ভূমিকা ফিরিয়ে আনার উপায়:
ছাত্ররাজনীতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
নৈতিকতা ও আদর্শের পুনরুত্থান: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো নেতৃত্বের আদর্শ ও নীতিকে অনুসরণ করতে হবে।
শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে।
সহিংসতা দমন: ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
স্বচ্ছ নির্বাচন: ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা: মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাত্ররাজনীতিকে লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
উপসংহার:
ছাত্রসমাজ ও রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি রাজনীতি দেশ ও দশের কল্যাণের জন্য পরিচালিত হয়। ছাত্ররাজনীতিকে আবারও তার স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে হলে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি সুস্থ ও গঠনমূলক ছাত্ররাজনীতিই পারে দেশকে সুনাগরিক উপহার দিতে এবং জাতির ভবিষ্যৎ পথকে সুগম করতে। শিক্ষা ও প্রজ্ঞা নির্ভর ছাত্ররাজনীতিই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সার্থক করতে পারে।
আজ পৃথিবীতে এক অদ্ভুত নৈতিক অন্ধকার নেমে এসেছে। এই যুগে যারা অন্ধ, অর্থাৎ বিবেকহীন, প্রেমহীন, প্রীতিহীন ও করুণাহীন, তারাই সমাজে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার করছে। তাদের কুপরামর্শ ছাড়া যেন পৃথিবী অচল। অন্যদিকে, যাদের হৃদয়ে মানুষের প্রতি গভীর আস্থা আছে, যারা মহৎ সত্য, রীতি, শিল্প বা সাধনাকে এখনো স্বাভাবিক বলে মনে করে, তাদের হৃদয় আজ শকুন ও শেয়ালের খাদ্যে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, দুর্নীতি ও অনাচারের এই সময়ে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষেরা কোণঠাসা ও লাঞ্ছিত।
আশা করি ভালো আছিস। তোর চিঠি পেয়ে খুব খুশি হলাম। আজ আমি তোকে দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কিছু কথা লিখতে চাই।
আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনবল অপরিহার্য। শুধু সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকরির বাজার দখল করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কারিগরি শিক্ষা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা মানুষকে হাতে-কলমে কাজ শেখায়, যা তাকে দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়।
কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী সুনির্দিষ্ট পেশার জন্য নিজেকে তৈরি করতে পারে। যেমন – ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, কম্পিউটার টেকনোলজি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা শিল্প-কারখানা, কলকারখানা বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং বেকারত্বের হার কমে আসে। উন্নত দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন আছে এবং তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূলে এটি একটি বড় কারণ।
শুধু চাকরির জন্য নয়, কারিগরি শিক্ষা মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতেও সাহায্য করে। নিজের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একজন ব্যক্তি নিজেই উদ্যোক্তা হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই, দেশের টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
আশা করি আমার কথাগুলো তোর ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে। তোর পরিবারের সবাইকে আমার সালাম ও শুভেচ্ছা জানাবি।
আত্মনির্ভরশীলতা অর্থ নিজের উপর নির্ভর করা। এটি একটি মহৎ গুণ। আত্ম-সাহায্যই শ্রেষ্ঠ সাহায্য। যারা নিজেদের সাহায্য করে, ঈশ্বর তাদের সাহায্য করেন। তাই, প্রত্যেককে আত্মনির্ভরশীল হতে হলে তার নিজের যোগ্যতার উপর নির্ভর করতে হবে। একজন আত্মনির্ভরশীল মানুষের নিজের যোগ্যতার উপর আস্থা থাকে। সে কঠিন পরিস্থিতির মুখেও সাহস হারায় না।
বাংলা ব্যাকরণে কিছু শব্দ রয়েছে যা উচ্চারণগত দিক থেকে প্রায় একই রকম শোনায়, কিন্তু তাদের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। এই ধরনের শব্দগুলোকে 'প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ' বলা হয়। যেমন: 'আবরণ' এবং 'আভরণ' শব্দদুটি শুনতে একই রকম মনে হলেও এদের অর্থ ভিন্ন।
আবরণ: এই শব্দটি মূলত কোনো কিছু ঢাকা বা আচ্ছাদিত করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি দিয়ে বাইরের আচ্ছাদন বা পোশাক বোঝানো হয়। উদাহরণস্বরূপ: "শীতের কারণে লোকটি মোটা আবরণে নিজেকে ঢেকেছে।"
আভরণ: এই শব্দটি অলংকার বা ভূষণ অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে পরা হয়। উদাহরণস্বরূপ: "নববধূ সোনায় মোড়া আভরণে সেজেছে।"
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে, বিশেষ করে বিসিএস, ব্যাংক বা অন্যান্য সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বাংলা অংশে প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ থেকে প্রশ্ন প্রায়শই আসে। সঠিকভাবে এই শব্দগুলোর অর্থ পার্থক্য অনুধাবন করা ব্যাকরণিক জ্ঞান এবং শব্দভান্ডার বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। এটি লেখার নির্ভুলতা এবং অর্থের স্পষ্টতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই শব্দগুলোর সঠিক প্রয়োগ ভাষার সমৃদ্ধি ও প্রমিত ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুখপত্র: কোনো সংস্থা, দল বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রকাশিত সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র বা প্রচারপত্র, যা তাদের নীতি, আদর্শ বা বক্তব্য প্রকাশ করে।
মুখপাত্র: যিনি কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলেন বা বক্তব্য দেন; মুখপাত্র।
বাংলা ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যাদের উচ্চারণ প্রায় একই রকম হলেও অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদেরকে প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ বলা হয়। প্রশ্নোক্ত 'মুখপত্র' ও 'মুখপাত্র' দুটি শব্দই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ এবং এদের অর্থগত পার্থক্য জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শুদ্ধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে।
মুখপত্র: এটি সাধারণত একটি অজীব বস্তু বা মাধ্যমকে বোঝায়, যেমন – সংবাদপত্র, পত্রিকা, সাময়িকী, বা কোনো সংগঠনের বুলেটিন। এটি হলো সেই মাধ্যম যার মাধ্যমে কোনো দল, প্রতিষ্ঠান বা সরকার তাদের আনুষ্ঠানিক বার্তা, নীতি, আদর্শ বা বিবৃতি জনসমক্ষে প্রকাশ করে। যেমন: "এই সংবাদপত্রটি সরকারের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে।"
মুখপাত্র: এটি দ্বারা একজন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। ইনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি কোনো ব্যক্তি, দল, সংস্থা বা সরকারের পক্ষ থেকে জনসম্মুখে কথা বলেন, বক্তব্য দেন অথবা বিবৃতি প্রদান করেন। ইনি সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বা মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। যেমন: "দলের মুখপাত্র আজ সাংবাদিকদের কাছে নতুন নীতি ব্যাখ্যা করেছেন।"
সুতরাং, সহজভাবে বললে, 'মুখপত্র' হলো একটি প্রকাশনা বা মাধ্যম, আর 'মুখপাত্র' হলেন একজন ব্যক্তিগত প্রতিনিধি।
বাংলা ভাষায় প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শুদ্ধ প্রয়োগ ও অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে। এই ধরনের শব্দগুলি শুনতে প্রায় একই রকম মনে হলেও এদের বানান ও অর্থ ভিন্ন হয়।
কুজন: এই শব্দটি মূলত 'কু' (খারাপ/মন্দ) উপসর্গ এবং 'জন' (মানুষ) শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ হলো মন্দ লোক, খারাপ স্বভাবের মানুষ অথবা দুষ্ট ব্যক্তি। যেমন: "মন্দ লোকের কুজন সমাজের জন্য ক্ষতিকর।"
কূজন: এই শব্দটি পাখির ডাক বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। 'কূ' এখানে কোনো উপসর্গ নয়, বরং পুরো শব্দটিই পাখির সুমধুর ডাককে নির্দেশ করে। এটি সাধারণত পাখির মিষ্টি আওয়াজ বা কলরব অর্থে প্রয়োগ হয়। যেমন: "ভোরে পাখির কূজন মনকে স্নিগ্ধ করে তোলে।"
সুতরাং, এই দুটি শব্দের মধ্যে পার্থক্য কেবল একটি দীর্ঘস্বর (ূ) এবং হ্রস্বস্বর (ু) এর ব্যবহারেই নয়, এদের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সঠিক প্রয়োগের জন্য এই পার্থক্য জানা জরুরি।
কোণ: জ্যামিতিক পরিমাপ (যেমন: ৯০ ডিগ্রি কোণ), অথবা কোনো কিছুর প্রান্ত বা সংযোগস্থল (যেমন: ঘরের কোণ)।
কোন: এটি একটি সর্বনাম। এটি জিজ্ঞাসা (যেমন: 'কোন বইটি তোমার?') অথবা অনির্দিষ্টতা বোঝাতে (যেমন: 'কোন এক দিন যাব') ব্যবহৃত হয়।
বাংলা ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যাদের উচ্চারণ প্রায় একরকম হলেও অর্থ এবং ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। কোণ এবং কোন তেমনই দুটি শব্দ, যা প্রায় সমোচ্চারিত শব্দের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এবং এদের অর্থ পার্থক্য সঠিকভাবে জানা বাংলা ভাষার নির্ভুল প্রয়োগের জন্য জরুরি।
কোণ: এই শব্দটি একটি বিশেষ্য পদ। এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে—
জ্যামিতিক পরিমাপ: দুটি সরলরেখা বা তল একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হলে যে স্থান তৈরি হয়, তাকে কোণ বলে। যেমন: সমকোণ (right angle), সূক্ষ্মকোণ (acute angle), স্থূলকোণ (obtuse angle)।
প্রান্ত বা কিনারা: কোনো কিছুর শেষ প্রান্ত, কিনারা বা ভেতরের সংযোগস্থল বোঝাতেও এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন: ঘরের কোণ, টেবিলের কোণ, রাস্তার মোড় বা কোণ।
উদাহরণ: ত্রিভুজের তিনটি কোণ থাকে। শিশুরা ঘরের কোণে খেলছে।
কোন: এটি একটি সর্বনাম পদ। এর দুটি প্রধান ব্যবহার দেখা যায়—
প্রশ্নসূচক সর্বনাম: জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। এটি 'কোনটি', 'কোন জন', 'কোন বিষয়ে' ইত্যাদির সংক্ষিপ্ত রূপ। যেমন: তুমি কোন বইটি পড়ছ? কোন ছাত্রটি আজ আসেনি? কোন ফল তোমার পছন্দ?
অনির্দিষ্টতাবাচক সর্বনাম: যখন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তুকে চিহ্নিত করা না হয়, তখন অনির্দিষ্টতা বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন: কোন এক দিন দেখা হবে। কোন না কোন উপায়ে কাজটা হয়ে যাবে।
উদাহরণ: তোমার কোন জায়গায় যেতে ভালো লাগে?
এই দুটি শব্দের সঠিক ব্যবহার বাংলা ভাষার নির্ভুল প্রয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এবং লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই ধরনের শব্দের অর্থ পার্থক্য প্রায়শই জিজ্ঞাসা করা হয়।
বাংলা ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যাদের উচ্চারণ প্রায় একই রকম শোনায়, কিন্তু তাদের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদেরকে প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ (Homophones or Homonyms) বলা হয়। এই শব্দগুলোর সঠিক অর্থ জানা না থাকলে বাক্য প্রয়োগে ভুল হতে পারে বা অর্থের বিকৃতি ঘটতে পারে।
অবিমিশ্র: এই শব্দটির অর্থ হলো যা মিশ্রিত নয়, অর্থাৎ বিশুদ্ধ বা খাঁটি। যেমন, "অবিমিশ্র ভালোবাসা" বলতে কোনো ভেজাল বা স্বার্থহীন ভালোবাসা বোঝায়।
অবিমৃষ্য: এই শব্দটির অর্থ হলো যে বিচার-বিবেচনা করে কাজ করে না, অর্থাৎ অবিবেচক বা হঠকারী। যেমন, "অবিমৃষ্যকারী কাজ" বলতে কোনো চিন্তাভাবনা না করে করা কাজকে বোঝায়, যার পরিণতি খারাপ হতে পারে।
এই দুটি শব্দের সামান্য উচ্চারণগত পার্থক্য থাকলেও তাদের অর্থগত ভিন্নতা বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বাক্য গঠনে সূক্ষ্মতা এনেছে।
যেসকল পদ দ্বারা কোন কাজ করা, ঘটা বা হওয়া বোঝায় এবং যা দ্বারা বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ হয়, তাদের ক্রিয়াপদ বলে। ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য সম্পূর্ণ হয় না। বাংলা ব্যাকরণে ক্রিয়াপদের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ রয়েছে, যা নিচে উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো:
১. সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া:
সমাপিকা ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদ দ্বারা বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় এবং বাক্য শেষ হয়, তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: আমি বই পড়ি। (এখানে 'পড়ি' ক্রিয়াটি দ্বারা বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ হয়েছে।)
অসমাপিকা ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদ দ্বারা বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় না এবং বাক্য শেষ হয় না, তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে। অসমাপিকা ক্রিয়া সাধারণত 'ইয়া', 'ইলে', 'ইতে' প্রত্যয় দিয়ে গঠিত হয় এবং এর পর আরেকটি সমাপিকা ক্রিয়া বসে বাক্যকে সম্পূর্ণ করে।
উদাহরণ: আমি ভাত খেয়ে স্কুলে যাব। (এখানে 'খেয়ে' অসমাপিকা ক্রিয়া, যা বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ করেনি। 'যাব' সমাপিকা ক্রিয়া দ্বারা বাক্য সম্পূর্ণ হয়েছে।)
২. কর্ম অনুসারে ক্রিয়া:
সকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদের কর্ম (object) থাকে, তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে। 'কী' বা 'কাকে' দিয়ে প্রশ্ন করলে যদি উত্তর পাওয়া যায়, তবে তা সকর্মক ক্রিয়া।
উদাহরণ: মা ভাত রান্না করছেন। (কী রান্না করছেন? – ভাত। এখানে 'ভাত' কর্ম।)
অকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদের কর্ম থাকে না, তাকে অকর্মক ক্রিয়া বলে। 'কী' বা 'কাকে' দিয়ে প্রশ্ন করলে কোন উত্তর পাওয়া যায় না।
উদাহরণ: সে ঘুমায়। (কী ঘুমায়? কাকে ঘুমায়? – কোনো উত্তর নেই। এখানে 'ঘুমায়' অকর্মক ক্রিয়া।)
দ্বিকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদের দুটি কর্ম থাকে, তাকে দ্বিকর্মক ক্রিয়া বলে। একটি মুখ্য কর্ম (বস্তুবাচক) ও অন্যটি গৌণ কর্ম (প্রাণিবাচক) হয়।
উদাহরণ: শিক্ষক ছাত্রদের বাংলা পড়াচ্ছেন। (কাকে পড়াচ্ছেন? – ছাত্রদের (গৌণ কর্ম)। কী পড়াচ্ছেন? – বাংলা (মুখ্য কর্ম)।)
৩. গঠন অনুসারে ক্রিয়া:
মৌলিক ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদ ধাতু থেকে সরাসরি উৎপন্ন হয় এবং যাকে আর বিশ্লেষণ করা যায় না, তাকে মৌলিক ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: সে দেখে। (মূল ধাতু: দেখ্)
যৌগিক ক্রিয়া: একটি অসমাপিকা ক্রিয়া ও একটি সমাপিকা ক্রিয়া একত্রিত হয়ে যখন একটি বিশেষ বা সম্প্রসারিত অর্থ প্রকাশ করে, তখন তাকে যৌগিক ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: রোগা শরীরটা শুকিয়ে যাচ্ছে। (এখানে 'শুকিয়ে' অসমাপিকা ক্রিয়া এবং 'যাচ্ছে' সমাপিকা ক্রিয়া একত্রিত হয়ে একটি বিশেষ অবস্থা বোঝাচ্ছে।)
প্রযোজক ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদে কর্তা নিজে কাজটি না করে অন্যকে দিয়ে কাজটি করায়, তাকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে। এখানে একজন প্রযোজক কর্তা (যিনি কাজ করাচ্ছেন) এবং একজন প্রযোজ্য কর্তা (যিনি কাজটি করছেন) থাকে।
উদাহরণ: মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন। (এখানে মা প্রযোজক কর্তা এবং শিশু প্রযোজ্য কর্তা।)
নামধাতুর ক্রিয়া: বিশেষ্য, বিশেষণ বা অব্যয়ের সঙ্গে 'আ' প্রত্যয় যোগ করে যে ধাতু গঠিত হয় এবং তা থেকে যে ক্রিয়া উৎপন্ন হয়, তাকে নামধাতুর ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: সে আমার সাথে মিশিয়াছে। (এখানে 'মিশ' একটি বিশেষ্য, যা থেকে 'মিশিয়াছে' ক্রিয়া গঠিত হয়েছে।)
'পত্র' শব্দটির আভিধানিক বা ব্যবহারিক অর্থ স্মারক বা চিহ্ন। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে মানবমনের কোনো ভাব, সংবাদ, তথ্য, আবেদন ইত্যাদি অপরের কাছে লিখিতভাবে জানানো হলে, তাকে সাধারণভাবে পত্র বা চিঠি বলে। সুন্দর, শুদ্ধ চিঠির মাধ্যমে মানুষের শিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা, রুচি ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। সুলিখিত চিঠি অনেক সময় উন্নত সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ছিন্নপত্র'।
চিঠি লিখতে হলে কতকগুলো সাধারণ নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন-
ক. চিঠির প্রকাশভঙ্গি আকর্ষণীয় হতে হবে। এর জন্য সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় চিঠি লিখতে হবে।
খ. পত্রে কোনো কঠিন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। ভাষা প্রয়োগে শুদ্ধতা বজায় রাখতে হবে।
গ. হাতের লেখা যতটা সম্ভব পরিষ্কার রাখতে হবে।
ঘ. চিঠির বক্তব্য হবে সুস্পষ্ট। পত্রে অনাবশ্যক কিংবা অতিরঞ্জিত কোনোকিছু না লেখাই ভালো।
ঙ. চিঠি লেখার পদ্ধতি মেনে চলতে হবে। খামে নাম ঠিকানা স্পষ্টাক্ষরে লিখতে হবে।
পত্র বা চিঠির অংশ:
একটি চিঠি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। যথা:
১. শিরোনাম
২. পত্রগর্ভ।
১. শিরোনাম: এর প্রধান অংশ প্রাপকের ঠিকানা। এই অংশে চিঠির খামের ওপর বামদিকে প্রেরকের ঠিকানা ও ডান দিকে প্রাপকের ঠিকানা লিখতে হয়। বর্তমানে সরকারি পোস্ট অফিসে প্রাপ্ত খামের সামনের অংশে প্রাপকের ঠিকানা লেখার নির্দিষ্ট ছক এবং পেছনের অংশে প্রেরকের ঠিকানা আলাদা ছাপানো ছক রয়েছে। 'লেফাফা' শব্দের অর্থ- খাম বা চিঠিপত্রের উপরের আবরণবিশেষ; এতে ডাকটিকেট লাগানো হয়। পোস্টাল কোড পোস্ট অফিসের নাম নির্দেশ করে। প্রবাসী বন্ধুকে লেখা পত্রের ঠিকানা ইংরেজি ভাষায় লিখতে হবে। পূর্ণ ও স্পষ্ট ঠিকানার অভাবে চিঠিপত্র গুলোকে 'ডেড লেটার' বলা হয়।
২. পত্রগর্ভ: এটি হচ্ছে চিঠির ভেতরের অংশ। পত্রের মূল বিষয়কে পত্রের গর্ভাংশ বলা হয়।
বিষয়বস্তু, প্রসঙ্গ ও কাঠামো অনুসারে বিভিন্ন ধরনের পত্রকে নিম্নলিখিত শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা:
১. ব্যক্তিগত চিঠি
২. আবেদনপত্র বা দরখাস্ত
৩. সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য চিঠি
৪. মানপত্র ও স্মারকলিপি
৫. বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িকপত্র
৬. আমন্ত্রণ বা নিমন্ত্রণপত্র
১. ব্যক্তিগত চিঠি: ব্যক্তিগত চিঠির কাঠামোতে ছয়টি অংশ থাকে। যথা:
ক. মঙ্গলসূচক শব্দ: এককালে ব্যক্তিগত চিঠির প্রথমে কাগজের পৃষ্ঠার মাঝামাঝি জায়গায় পত্রলেখক মঙ্গলসূচক শব্দ লিখতেন। আজকাল ব্যক্তিগত চিঠিতে এগুলো আর লেখা হয় না।
খ. স্থান ও তারিখ: ব্যক্তিগত পত্রের ওপরের ডানদিকে তারিখ এবং যে স্থানে বসে পত্র লেখা হচ্ছে তার নাম লিখতে হয়।
গ. সম্বোধন: পত্র লেখার শুরুতে পত্রের বামদিকে প্রাপকের সঙ্গে সম্পর্ক অনুযায়ী সম্বোধন বা সম্ভাষণ লিখতে হয়। পত্রদাতার সঙ্গে প্রাপকের সম্পর্ক অনুসারে এবং পত্র-প্রাপকের মান, মর্যাদা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা অনুযায়ী সম্বোধনসূচক শব্দ নির্বাচন করতে হয়। যেমন-
ব্যক্তিগত পত্রের সম্ভাষণ রীতি-
শ্রদ্ধাভাজন (পুরুষ)
শ্রদ্ধাস্পদেষু, পরম শ্রদ্ধাভাজন, মাননীয়, মান্যবরেষু, মান্যবর, শ্রদ্ধাভাজনেষু ইত্যাদি।
শ্রদ্ধাভাজন (মহিলা)
মাননীয়া, মাননীয়াসু, শ্রদ্ধেয়া, শ্রদ্ধাস্পদাসু ইত্যাদি।
সমবয়স্ক প্রিয়জন/বন্ধু (পুরুষ)
বন্ধুবরেষু, অভিন্নহৃদয়েষু, প্রিয়বরেষু, প্রিয়, প্রিয়বর, বন্ধুবর, সুপ্রিয়, সুহৃদবরেষু, প্রীতিভাজনেষু ইত্যাদি।
সমবয়স্ক প্রিয়জন/বন্ধু (মহিলা)
সুচরিতাসু, প্রীতিভাজনীয়াসু, প্রীতিনিলয়াসু, সুহৃদয়াসু ইত্যাদি
বয়ঃকনিষ্ঠ (ছেলে)
কল্যাণীয়, কল্যাণীয়েষু, স্নেহাস্পদেষু, স্নেহভাজনেষু, স্নেহের, প্রীতিভাজনেষু, প্রীতিনিলয়েষু ইত্যাদি।
বয়ঃকনিষ্ঠ (মেয়ে)
কল্যাণীয়া, কল্যাণীয়াসু, স্নেহের, স্নেহভাজনীয়া, স্নেহভাজনীয়াসু ইত্যাদি।
ঘ. মূল পত্রাংশ (মূল বক্তব্য): পত্র লেখার সময় পত্রের বক্তব্য ও বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এই অংশে পত্রলেখকের মূল বক্তব্য, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, আবেগ, অনুভূতি, ঔৎসুক্য ইত্যাদি লিখতে হয়। পত্র-সমাপ্তিসূচক অভিব্যক্তির পর বিদায় সম্ভাষণ হিসেবে পত্র-প্রাপকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়। স্থান, কাল, পাত্রভেদে পত্র-প্রাপকের সঙ্গে সম্পর্ক অনুসারে বিশেষণ ব্যবহারে পাথর্য্য দেখা যায়। বিদায় সম্ভাষণ সাধারণত পত্রের ডানদিকে লিখতে হয়। যেমন-
ব্যক্তিগত পত্রের বিদায় সম্ভাষণ-
প্রাপক শ্রদ্ধাভাজন (পুরুষ)
স্নেহভাজন, স্নেহধন্য, স্নেহাকাড়ী, প্রীত্যর্থী, গুণমুগ্ধ, প্রণত, প্রীতিধণ্য, প্রীতিস্নিগ্ধ ইত্যাদি।
প্রাপক শ্রদ্ধাভাজন
(পত্রলেখক পুরুষ) স্নেহধন্যা, প্রণতা, বিনীতা, গুণমুগ্ধা প্রীতিধন্যা, প্রীতিস্নিগ্ধা ইত্যাদি।
প্রাপক বয়সে ছোট হলে
আশীর্বাদক, আশীর্বাদিকা, শুভাকাঙ্ক্ষী, শুভানুধ্যায়ী ইত্যাদি।
প্রাপক অনাত্মীয়
সম্মানীয় লোক
(পত্রলেখক পুরুষ) নিবেদক, ভবদীয়, বিনীত, বিনয়াবনত ইত্যাদি।
(পত্রলেখক মহিলা) নিবেদিকা, বিনীতা, বিনয়াবনত ইত্যাদি।
প্রাপক বন্ধুস্থানীয় বা
প্রিয়ভাজন
(পত্রলেখক পুরুষ) প্রীতিধন্য, প্রীতিমুগ্ধ, অভিন্নহৃদয়, আপনারই, তোমারই ইত্যাদি।
(পত্রলেখক মহিলা) প্রীতিধন্য, প্রীতিমুগ্ধ, অভিন্নহৃদয়া ইত্যাদি।
ঙ. নাম-স্বাক্ষর (পত্রলেখকের স্বাক্ষর): নাম-স্বাক্ষর চিঠির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই চিঠির শেষে অবশ্যই স্বাক্ষর করতে হয়।
চ. শিরোনাম: পত্র পাঠাবার খামের উপর লিখতে হয়। খামের উপর বাম দিকে পত্রলেখকের (প্রেরক) ঠিকানা এবং ডান দিকে পত্র প্রাপকের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা স্পষ্টভাবে লিখতে হয়। খামের উপরে ডান কোণে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মূল্যের ডাক টিকিট লাগাতে হয়। আজকাল বড় বড় পোস্ট অফিসে ডাক টিকিটের পরিবর্তে মেশিনের সাহায্যে খামের উপর ছাপ মারার ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
২. আবেদনপত্র বা দরখাস্ত: যে পত্র চাকরির জন্য লিখতে হয় তার নামই আবেদনপত্র। অর্থাৎ সুযোগ-সুবিধা প্রার্থনা করে কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত পত্রের নাম আবেদনপত্র।
৩. সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য চিঠি: সংবাদপত্র একটি আবেদন প্রকাশের জন্য সম্পাদকের বরাবর পাঠাতে হয়। বিজ্ঞপ্তি হলো- সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য নিখোঁজ সংবাদ।
৪. মানপত্র ও স্মারকলিপি: অভিনন্দন বা সংবর্ধনা পত্রকে মানপত্র বা স্মারকলিপি বলা হয়।
৫. বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িকপত্র: বাণিজ্যিক পত্রে বিষয়ের স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে।
৬. আমন্ত্রণ বা নিমন্ত্রণপত্র: আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে যে দাওয়াত পত্র, তাকে নিমন্ত্রণপত্র বলে।
৭. দলিল বা চুক্তিপত্র: বৈষয়িক ব্যাপারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আইনানুসারে লিখিত পত্রকে দলিলপত্র বা চুক্তিপত্র বলে।
একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।
একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।
একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।
সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।
একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।
একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।
অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।
সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।
লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।
সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।
আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।
সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।
আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে। আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।
শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।
বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।
আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে। খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।
বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।
অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র
য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ:
সাম্যবাদের পতন:
১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।
গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:
সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ:
অর্থনৈতিক সংকট:
সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের উত্থান:
অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা:
নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।
সামাজিক পরিবর্তন:
পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
গুরুত্বপূর্ণ দিক:
এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল।
পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-
১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:
সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয় একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।
অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।
অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।
২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। [ঊর্মি হোসেন]