ভূমিকা: খাদ্য জীবের জন্য অপরিহার্য। শরীরের ক্ষয়পূরণ, স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং কর্মশক্তির জন্য আমরা খাদ্য গ্রহণ করি। খাদ্যের প্রধান উৎস হলো কৃষি। প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানসমূহের মধ্যে কেবলমাত্র পানি ও লবণই বাহির থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব। অপরাপর সকল খাদ্যের জন্য নির্ভর করতে হয় কৃষির ওপর। কৃষি বলতে আমরা কৃষির ৪টি উপখাত বুঝে থাকি। এ খাতগুলো হলো-
(ক) ফসল উপখাত
(খ) প্রাণী সম্পদ উপখাত
(গ) বনজ সম্পদ উপখাত
(ঘ) মৎস্য সম্পদ উপখাত ।
উপরোক্ত ৪টি উপখাত থেকে আমরা খাদ্যের সব উপাদানগুলো পেয়ে থাকি। ধান, গম, ভুট্টা, যব, জোয়ার, বাজরা, চীনা, কাউন ইত্যাদি প্রধানত শর্করা বা শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য। অল্প পরিমাণ, আমিষ, খনিজ লবন এবং ভিটামিনও এসব খাদ্যে পাওয়া যায়। মাছ, মাংস, ডিম ও দুধে আছে আমিষ ও তেল জাতীয় খাদ্য। টাটকা শাক-সবজিতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, সহজলভ্য আমিষ এবং খনিজ লবণ। বিভিন্ন প্রকার ফলমূল সরবরাহ করে ভিটামিন, খনিজ লবণ ও বিবিধ খাদ্য উপাদান। সরিষা, তিল, রাই, সয়াবিন, সূর্যমূখী, চীনাবাদাম, রেড়ি প্রভৃতি গাছের বীজ থেকে স্নেহজাতীয় উপাদান পাওয়া যায়। ডালডা, বনস্পতি, মার্জারিন প্রভৃতি কৃত্রিম ঘি ও মাখনের উৎসও উদ্ভিজ্জ তেল। আখ, বীট, তাল, খেজুর থেকে শর্করা পাওয়া যায়। চা গাছের পাতা এবং কোকো ও কফির বীজ থেকে তৈরি করা হয় উত্তম পানীয়। কচি নারিকেলের পানি একটি সুস্বাদু ও উৎকৃষ্ট পানীয়। খাদ্যদ্রব্যকে মুখরোচক ও সুস্বাদু করার জন্য ব্যবহার হয় পেঁয়াজ রসুন, হলুদ, মরিচ, আদা, ধনিয়া, এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা ইত্যাদি উদ্ভিদের বীজ বা গাছের অংশ। মাছ, মাংস, দুধ ইত্যাদি সরবরাহ করে শরীরের জন্য অপরিহার্য প্রোটিন বা আমিষ। বনজ সম্পদ থেকে আমরা পাই ফলমূল, জ্বালানি ও আসবাবপত্র ইত্যাদি।
কৃষি ফসলের শ্রেণিবিভাগ
সাধারণত সমগ্র কৃষি ফসলকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১. উৎপাদন ক্ষেত্র ও পদ্ধতি ভেদে ফসলের শ্রেণিবিভাগ
২. মৌসুমভেদে কৃষি ফসলের শ্রেণিবিভাগ
৩. ব্যবহারভেদে কৃষি ফসলের শ্রেণিবিভাগ
উৎপাদন ক্ষেত্রভেদে : উৎপাদন ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য ও পরিচর্যার উপর নির্ভর করে কৃষি ফসলকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(ক) মাঠফসল বা কৃষিতাত্ত্বিক ফসল ।
(খ) বাগান ফসল বা উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল ।
(ক) মাঠ ফসল : যে সমস্ত ফসল বা শল্যকে একসাথে বড় এবং বিস্তীর্ণ মাঠে চাষাবাদ করা হয় এবং প্রতিটি গাছকে এককভাবে যত্ন নেওয়া হয় না, তাকে মাঠ ফসল বলে। যেমন- ধান, গম, ডাল, ভুট্টা, আখ, আলু ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে ফসলের যত্ন নেওয়া হয়। জমিতে প্রতিটি গাছের জন্য আলাদাভাবে ও নিখুঁতভাবে যত্ন নেওয়া হয় না ।
(খ) বাগান বা উদ্যান ফসল : সাধারণত যে সমস্ত ফসলের প্রতিটি গাছকে রোপণ বা বপনের সময় থেকে কর্তন বা ফসল সংগ্রহ করা পর্যন্ত পৃথকভাবে যত্ন নেওয়া হয় তাকে উদ্যান ফসল বলে। যেমন- আম, কাঁঠাল, নারিকেল, কলা, পেঁপে, টমেটো, বেগুন ইত্যাদি। উদ্যান ফসলের প্রতিটি চারা গাছের বিশেষভাবে যত্ন নেওয়া হয় এবং খুব সতর্কতার সাথে জমি প্রস্তুত করা হয়।
উৎপাদন পদ্ধতিভেদে : উৎপাদন পদ্ধতিভেদে কৃষি ফসলকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- (ক) বৃষ্টি নির্ভর ফসল ও (খ) আর্দ্র বা সেচ প্রাপ্ত ফসল।
(ক) বৃষ্টিনির্ভর বা শুষ্ক ফসল : যে সকল ফসলে সেচের জন্য প্রাকৃতিকভাবে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভর করে চাষ করা হয় সে ফসলকে বৃষ্টিনির্ভর বা শুল্ক ফসল বলে। যেমন- আউশ ও আমন ধান, গম, ডালশস্য, সরিষা, তিল, পাট, ভুট্টা, চিনা, কাউন ইত্যাদি। বার্ষিক বৃষ্টিপাত যেখানে ৫০০ মিলিমিটার সেসব এলাকার এ ফসল ভালো মনে।
(খ) আর্দ্র বা সেচ প্রাপ্ত ফসল : যে সকল ফসল বা শস্য সেচ ছাড়া চাষাবাদ করা যায় না সেগুলোকে সেচ প্রাপ্ত ফসল বলে। এ সকল ফসল আবাদে কৃত্রিম সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। যেমন- উচ্চ ফলনশীল ধান, বোরো ধান, আলু, শীতকালীন সবজি যেমন- টমেটো, ঢেঁড়স, মরিচ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, পালংশাক ইত্যাদি। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৭৬০ মিলিমিটারের বেশি এবং যেখানে পানি আটকিয়ে সেচ দেওয়া যায়, সেখানে এ ফসল ভালো হয়। এ ধরনের কৃষিকাজ ব্যয়বহুল। এ জন্য গভীর নলকূপ ও অগভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সেচকাজ করা হয়। তাছাড়া খাল, বিল, নদী নালার পানি সেচের মাধ্যমেও ফসল উৎপাদন করা হয়।
কৃষি ফসলসমূহকে চাষাবাদের কাল বা মৌসুমভিত্তিক (Season) দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- রবি ফসল ও খরিপ ফল
রবি ফসল : যে সকল ফসল বছরের অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে চাষ করা হয় সেগুলোকে রবি ফসল (Rabi Crops) বলে। যেমন- গম, যব, আলু, ডাল ফসল, তেল ফসল, শীতকালীন সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল ইত্যাদি।
খরিপ ফসল : যে সকল ফসল বছরের এপ্রিল মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে চাষাবাদ করা হয় তাদেরকে খরিপ ফসল (Kharif Crops) বলে। যেমন- ধান, ভুট্টা, পাট, জোয়ার ও বাজরা, তিল, তিসি গ্রীষ্মকালীন সবজি ইত্যাদি। খরিপ মৌসুমকে আবার দু ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুম।
খরিফ-১ মৌসুম : যে মৌসুমের সময় সীমা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বিস্তৃত থেকে তাকে খরিপ-১ মৌসুম বা গ্রীষ্মকালীন মৌসুম বলে। এ মৌসুমে উৎপন্ন ফসলগুলোকে খরিফ-১ শস্য বলে। যেমন- আউশ ধান, পাট, কাউন, ভুট্টা, তিল, মিষ্টি কুমড়া, কচু ও ঝিঙ্গা ইত্যাদি ।
খরিফ-২ মৌসুম : যে মৌসুমের সময়সীমা জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে তাকে খরিফ-২ মৌসুম বা বর্ষা মৌসুম বলে। যেমন- আমন ধান, ভুট্টা, মাষকলাই, বর্ষাকালীন সবজি ইত্যাদি ।
এছাড়া কিছু ফসল ও শাক-সবজি আছে যেগুলো উভয় মৌসুমেই বা সারা বছর চাষাবাদ করা হয়ে থাকে। এদেরকে বারোমাসী ফসল বলে। যেমন- কলা, পেঁপে ইত্যাদি। আধুনিক চাষাবাদ কলাকৌশলের মাধ্যমে বর্তমানে সারাবছর সবধরনের ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে সাধারণত ফসলের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিবেচনা করে ফসলগুলোকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়। এভাবে শ্রেণিবিভাগ করা ফসলগুলোর মধ্যে নিম্নের শ্রেণিগুলোই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—
১) দানা জাতীয় শস্য (Cereals ) : ল্যাটিন শব্দ সিরিস অর্থ শস্যের দেবী (Ciris) হতে Cereals নামকরণ করা হয়েছে। আমাদের প্রধান দানা ফসলগুলো এই শ্রেণিতে পড়ে। এগুলো Gramineae বা ঘাস জাতীয় ফসলের অন্তর্ভূক্ত। এই শস্যগুলোর মধ্যে আমাদের শরীরে শক্তিবর্ধক ও তাপরক্ষক শ্বেতসার জাতীয় পদার্থ প্রচুর পরিমানে থাকে। তাছাড়া প্রোটিন, চর্বি, খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন জাতীয় খাদ্য উপাদানও অল্প পরিমাণে থাকে। ধান, গম, যব, ভুট্টা, চিনা, কাউন ইত্যাদি দানা জাতীয় খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত।
২) ডাল জাতীয় শস্য (Pulses) : ছোলা, মসুর, মুগ, মটরশুঁটি, মাষকলাই, শিম, অড়হর প্রভৃতি উপাদান ডালজাতীয় শস্যের অন্তর্ভূক্ত। ডাল জাতীয় শস্যে প্রচুর পরিমাণে আমিষ জাতীয় খাদ্য উপাদান থাকায় চাল বা রুটির সাথে ডাল মিশিয়ে খেলে তা শুধু মুখরোচকই হয় না, বরং সুষম খাদ্যও হয়। অধিকাংশ ডাল জাতীয় শস্যের শিকড়ে গুটি বা Nodule থাকে। এই গুটিগুলোতে এক প্রকার ব্যাক্টেরিয়া বাস করে যারা বাতাস হতে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে গাছকে সরবরাহ করে। এই জাতীয় ফসল চাষে মাটি উর্বর হয় এবং পরবর্তী ফসলের উপকার করে। ডাল জাতীয় ফসলকে লিগুম (legume) ফসল ও বলা হয়।
৩) তেলবীজ (Oils) : কিছু কিছু শস্যের দানায় তেল সঞ্চিত থাকে। নাতিশীতোঞ্চ অঞ্চলে তেলবীজ ভালো জন্মে। আমাদের দেশে দৈনন্দিন রান্নার কাজে এবং গ্লিসারিন, সাবান, বার্নিস প্রভৃতি শিল্পের চাহিদা মেটাতে তৈলের প্রয়োজন। স্নেহ জাতীয় খাদ্য হিসেবে তেল আমাদের দেহের জন্য অপরিহার্য। সরিষা, নারিকেল, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী, তিল ইত্যাদি প্রধান তেল ফসল ।
৪) চিনি ফসল (Sugar Crops) : এ জাতীয় ফসলের মধ্যে আঁখ (Sugar Cane) ও বাঁটই প্রধান। চিনি ও গুড় প্রস্তুতের জন্য আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে আঁখের চাষ হয়ে থাকে। বীট আমাদের দেশে সবজি হিসেবেই ব্যবহার হয় কিন্তু শীতপ্রধান দেশে চিনি উৎপাদনের জন্য বীটের চাষ হয়। তাছাড়া তাল ও খেজুর গাছ হতে রস সংগ্রহ করে কিছু পরিমাণ গুড় বা অপরিশোধিত লাল চিনি তৈরি করা হয় ।
৫) আঁশ বা তন্তুজাতীয় ফসল (Fibre crops) : সুতা, বস্ত্র, দড়ি, চট, বস্তা, মাদুর ইত্যাদি জিনিস তৈরির জন্য এ জাতীয় ফসলের চাষ করা হয়। তুলা, পাট, মেস্তা, শণ, তিসি প্রভৃতি আঁশ জাতীয় ফসলের অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর মধ্যে তুলা ও পাট বহুল ব্যবহৃত।
৬) নেশা বা মাদকদ্রব্য ফসল (Narcotics) : এ ফসলগুলো সাময়িক উত্তেজনা, আরাম, উৎসাহ সৃষ্টিকারী নেশা ও মাদকতা জাতীয় ফসল যেমন- তামাক, আফিম, ভাঙ, গাঁজা প্রভৃতি। তামাকের ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে বর্তমানে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
৭) সবজি জাতীয় ফসল (Vegetables) : আলু, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, মূলা, শালগম, গাজর, মিষ্টি আলু প্রভৃতি সবজি জাতীয় ফসলের অন্তর্ভুক্ত। শাক-সবজি কেবল অর্থকরী ফসলই নয়, মানুষের খাদ্যে এগুলো প্রচুর পুষ্টি জোগায়। শাক-সবজিতে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ রয়েছে যা মানুষের শরীর স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ণ রাখে।
৮) পানীয় ফসল (Beverages) : পানীয় দ্রব্য বলতে সাধারণত পান করা হয় এরূপ খাদ্যকে বুঝায় । এ ফসলগুলো হচ্ছে চা ও কফি।
৯) পশু খাদ্য (Fodder Crops) : পশুর খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য যে সমস্ত ফসল আবাদ করা হয় তাকে পশুখাদ্য ফসল বলে। যেমন- নেপিয়ার ঘাস, ইপিল ইপিল, ভুট্টা, গো-মটর (Cow Pea) জোয়ার, কলাই, সরগম ইত্যাদি পশু খাদ্যের উদাহরণ।
১০) সবুজ সার জাতীয় ফসল (Green Manure Crops ) : ধৈঞ্চা, বরবটি, শিম, কলাই, ফেলন, অডহর, শন পাট ইত্যাদি সবুজ সার জাতীয় ফসল। এ সকল গাছের পাতা ও ডাটা কেটে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়াকে সবুজ সার বলে। সাধারণত শিকড়ে গুটি উৎপন্নকারী ডাল জাতীয় ফসলই সবুজ সারের জন্য উত্তম। বীজ বপনের ২ মাস পর অর্থাৎ গাছে ফুল আসার পূর্বেই কেটে চাষ ও মই দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে জমিতে জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেনের আধিক্য বাড়ে ।
১১) মসলা জাতীয় ফসল (Spices crops ) : খাদ্য সুস্বাদু, সুগন্ধী ও খাদ্য সংরক্ষণের কাজের জন্য যে সকল ফসল ব্যবহার করা হয় তাদেরকে মসলা ফসল বলে। যেমন- পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া, লবঙ্গ, দারুচিনি, জিরা, তেজপাতা ইত্যাদি। খাদ্যে মসলার ব্যবহারে ফসলের বাজে গন্ধ দূর হয়ে খাদ্য সুস্বাদু ও সুগন্ধী হয়।
১২) ফল ও বাগিচার ফসল (Plantation crops) : স্থায়ী ফল বাগান ও বাগিচার চাষ করার জন্য বহু বর্ষজীবী ফসলের চাষ হয়। যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল, লেবু, লিচু, নারিকেল ইত্যাদি এ জাতীয় ফল।
নিষিক্ত পরিপক্ব ডিম্বকোষকে বীজ বলে। তবে কৃষি বিজ্ঞানের দিক হতে বিচার করলে বীজের সংগা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। গাছের যে কোন অংগ যেমন- ডাল, মূল, পাতা, কুঁড়ি, শিকড় ইত্যাদি যার দ্বারাই এর বংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব তাকেই কৃষিবীজ বলে। যেমন- আঁখের টুকরা, কাটা আলু, পাথরকুচির পাতা, কাঁকরোলের শিকড় ইত্যাদি ।
ভালো বীজ : ভালো বীজের নিম্নের বৈশিষ্ট্য থাকা বাঞ্ছনীয়-
(ক) ভালোবীজ উন্নত জাতের হবে।
(খ) ভালো বীজে অন্য কোনো বীজের মিশ্রণ থাকবে না।
(গ) ভালো বীজ পোকা খাওয়া এবং রোগাক্রান্ত হবে না ।
(ঘ) ভালো বীজ নতুন, ঝকঝকে ও দুর্গন্ধমুক্ত হবে।
(ঙ) ভালো বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা উচ্চ মানের হবে।
(চ) ভালো বীজ সুপরিপক্ক, পুষ্ট, নিটোল ও সবই এক আকারে হবে।
ভালো গুণসম্পন্ন বীজকে পুষ্ট বীজ বলে। বীজ ফসল চাষ করে কেটে মাড়াই করলেই পুষ্ট বা ভালো বীজ পাওয়া যায় না। কারণ সদ্য মাড়াই করা বীজের মধ্যে খড়কুটা, ভাঙ্গা দানা, ছোট দানা, অন্য ফসলের বীজ, অন্য জাতের বীজ, আগাছার বীজ, পোকা, পোকা খাওয়া বীজ ও বিভিন্ন অপদ্রব্য থাকতে পারে। বীজের লট থেকে এ সকল অপদ্রব্য ও অপুষ্ট দানা কে বের করা ও পুষ্ট বীজ সংরক্ষনের জন্য নিম্নের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়। যেমন-
ক) বীজ শুকানো
খ) বীজ পরিষ্কারকরণ
গ) বীজ সংরক্ষণ
ঘ) বীজ শোধন
ঙ) বীজ মোড়কীকরণ
উপরোক্ত সকল কাজকে একত্রে বীজ প্রক্রিয়াজাত করণ (Seed Processing) বলে।
বীজ পরিষ্কারকরণ : বীজ মাড়াই করার পর বীজ লটে পুষ্ট বীজ ছাড়াও অপুষ্ট বীজ, অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত দ্রব্য এবং অপদ্রব্য থাকে। এগুলো নিম্নরূপ-
ক) অপুষ্ট বীজ যেমন-
১) ভাঙা বীজ, থেঁতলানো বীজ, ফাটা, চ্যাপ্টা বীজ ইত্যাদি
২) অস্বাভাবিক বীজ।
খ) অপদ্রব্য
১) খড়কুটা, ছাল, খোসা, ডাল পাতা ইত্যাদি।
২) ধুলা, বালি, পাথর, নুড়ি, মরা পোকা, ইঁদুরের বিষ্ঠা ইত্যাদি।
উপরোক্ত অপুষ্ট, ভাঙা বীজ ও অপদ্রব্য নিম্নের তিনটি ধাপে পরিষ্কার করা যায়-
ক) প্রাথমিক পরিষ্কার: প্রি ক্লিনার নামক যন্ত্র দ্বারা বীজের প্রাথমিক খড়কুটা, ধূলাবালি পরিষ্কার করা হয়।
খ) চূড়ান্ত পরিষ্কার: ফসলের মূল বীজ অপেক্ষা ছোট এবং বড় আকারের বীজ বের করে ফেলা চূড়ান্ত পরিষ্কার করার প্রধান কাজ। এ কাজের যন্ত্রের নাম এয়ারস্ক্রিন ক্লিনার ।
গ) বিশেষ পরিষ্কার: বিভিন্ন অপদ্রব্য পরিষ্কার করে এয়ার স্ক্রিন ক্লিনার। কিন্তু ছোট বড় বীজ, বিভিন্ন রঙের বীজ পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার হয়—
১) ইন্ডেটেন্ড সিলিন্ডার— দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে বীজ পৃথক করে ।
২) স্পাইরাল সেপারেটর - চ্যাপ্টা ও খোলা বীজ আলাদা করে।
৩) ইলেট্রিক কালার সর্টার- এ যন্ত্র রং দেখে বীজ আলাদা করে ।
৪) গ্রাভিটি সেপারেটর - বিভিন্ন ওজনের বীজ আলাদা করা যায়
খাদ্য : মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী যা খেয়ে জীবন ধারণ করে তাকেই খাদ্য বলে। যা খেলে শরীর সুস্থ ও কার্যক্ষম থাকে তাকেই খাদ্য বলে। শরীরের সুস্থতা বলতে আমরা সাধারণত শরীর ঠিকমতো বৃদ্ধি, কাজ করার সময় শক্তি পাওয়া এবং শরীরের কোনো অসুখ না থাকা এগুলোকে বুঝায় ।
মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্যই প্রধান। খাদ্য ছাড়া আমাদের বাঁচা সম্ভব নয়। খাদ্য খেলে তৃপ্তি পাওয়া যায়। খাদ্য গ্রহণের পর পরিপাকতন্ত্রে খাদ্য হজম হয়। খাদ্যনালীতে পুষ্টি উপাদানসমূহ শোষিত হয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায় ।
পুষ্টি : যে প্রক্রিয়া দ্বারা জীব দেহে খাদ্যদ্রব্য পরিপাক ও পরিশোধিত হয়ে সমস্ত দেহের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ে ও দেহের বৃদ্ধি রক্ষণাবেক্ষণ ও শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে তাকেই পরিপুষ্টি বা পুষ্টি বলে। অর্থাৎ পুষ্টি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে খাদ্য শরীর বৃদ্ধি ক্ষয় পূরণ ও শক্তি উৎপাদন করে।
এগ্রোবেসড খাদ্য : ইংরেজি Agriculture অর্থ কৃষি এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে Agro বা এখো । এগ্রোবেসড খাদ্য বলতে কৃষিভিত্তিক খাদ্যকে বুঝায়। কৃষি বা কৃষি খাত বলতে ফসল, পশু, পাখি, মৎস্য ও বন উপখাতকে একত্রে বুঝানো হয়ে থাকে। তাই ফসল, পশু, পাখি, মৎস্য ও বন থেকে উৎপাদিত খাওয়ার উপযোগী দ্রব্য সহযোগে প্রস্তুতকৃত সকল প্রকার খাদ্যকে এগ্লোবেসড খাদ্য বলে।
খাদ্যকে দুইভাবে শ্রেণিবিভাগ করা যায়।
যথা: (ক) উদ্ভিদ ও প্রাণিজ উৎসের ওপর ভিত্তি করে।
(খ) শরীরে কাজের উপর ভিত্তি করে।
(ক) উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীর উৎসের ওপর ভিত্তি করে খাদ্যকে নিম্নের ছক অনুযায়ী ভাগ করা যায়-
উদ্ভিদ থেকে | প্রাণী থেকে |
১. শস্য এবং শস্যজাত খাদ্য ২. চিনি এবং চিনিজাত খাদ্য ৩. সবজি এবং সবজিজাত খাদ্য ৪. ফল এবং ফলজাত খাদ্য ৫. ডাল এবং লিগুয়েমস ৬. তেলবীজ ৭. চা, কফি এবং কোকো ৮. মসলা জাতীয় | ১. মাংস ও মাংসজাতীয় খাদ্য ২. ডিম ও ডিমজাত খাদ্য ৩. মাছ ও মাছজাত খাদ্য ৪. দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য
|
শরীরের কাজের ওপর ভিত্তি করে খাদ্যকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১. শক্তিবর্ধক খাদ্য : শর্করার বা শ্বেতসার (Carbohydrate) যথা: চাল, গম, আলু চিনি, মধু, গুড়, ভুট্টা, কচু ইত্যাদি। স্নেহ বা চর্বি জাতীয় (Fat) যথা : তেল, চর্বি, ঘি ইত্যাদি।
২. দেহ বর্ধক খাদ্য : প্রোটিন বা আমিষ ও কিছু খনিজ লবণ (যথা- মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ডাল, শিমের বিচি ইত্যাদি)
৩. রোগ প্রতিরোধক খাদ্য: ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ, খনিজ লবণ ও পনি (যথা : ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি)। তবে কোনো কোনো খাদ্য একাধিক কাজ করে থাকে এবং অনেক সময় অবস্থা বিশেষে এক শ্রেণির খাদ্যের কাজও করে থাকে। তাছাড়া যে কোনো একটি খাদ্যের কাজ অন্যান্য খাদ্যের কাজের পরিপূরক হতে পারে ।
১। শক্তিবর্ধক খাদ্য : যে সকল খাদ্য শরীরের তাপ বজায় রাখে, শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকর্ম যেমন- পরিপাক ক্রিয়া, শ্বসন ক্রিয়া, রেচন ক্রিয়া ইত্যাদি এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য শক্তি বা ক্যালরি জোগান দেয়, সেগুলোকে শক্তি বর্ধক খাদ্য বলে। স্বেতসার বা শর্করা ও স্নেহ বা চর্বি জাতীয় খাদ্য হতে আমাদের শরীর তাপ ও শক্তি পেয়ে থাকে। শক্তি ব্যতীত কোনো কাজ সম্পাদন করা সম্ভব নয়। তাপ ও শক্তির অভাবে শরীর দুর্বল হয় ও কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং শরীর রোগাক্রান্ত হয়ে যায়।
শক্তি বর্ধক
(ক) শস্য জাতীয় খাদ্য : চাল, চিড়া, মুড়ি, খৈ, আটা, কেক, বিস্কুট, সুজি, সেমাই, সাগু, বার্লি, চিনা, কাউন, জব, ভুট্টা, বাজরা, জোয়ার ইত্যাদি।
(খ) মূল জাতীয় খাদ্য : আলু, মিষ্টি আলু, কচু, কাসাভা ইত্যাদি ।
(গ) মিষ্টি জাতীয় খাদ্য : গুড়, চিনি, মধু, মিছরি ইত্যাদি।
(ঘ) ফল জাতীয় খাদ্য : কলা, খেজুর, আম, কাঁঠাল, পেপে, পেয়ারা, লিচু ইত্যাদি ।
স্নেহ বা তেল-
(ক) উদ্ভিজ্জ-সরিষা, সয়াবিন, নারিকেল, পাম, চিনাবাদাম, সূর্যমুখী, তিল, র্যাপসিড, তুলার বীচি, ভূট্টা।
(খ) প্রাণিজ - ঘি, মাখন, ছানা, পনির, ডিমের কুসুম, চর্বি ।
২। দেহবর্ধক খাদ্য : যে সকল খাদ্যদ্রব্য প্রধানত শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠন, বৃদ্ধি এবং ক্ষয়পূরণের কাজ করে থাকে, সেগুলোকে দেহবর্ধক খাদ্য বলে। এ সকল খাদ্য শরীরের কাঠামো অর্থাৎ হাড়, রক্ত ও ত্বক তৈরি করে থাকে। এছাড়া শরীরে তাপ ও শক্তি উৎপাদনের কাজও করে থাকে। জন্মের পর থেকে একটি শিশুর শরীর বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাথে সাথে তার শরীরে বৃদ্ধি হার কমে যায়। দেহের অন্যান্য জৈবিকক্রিয়া বিপাকক্রিয়া চলতে থাকে। দেহের ভিতর হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ, পাকস্থলী, অস্ত্র, মস্তিষ্ক সব সময় কাজ করতে থাকে। একইভাবে দৈনিক হাঁটা চলা, কাজকর্ম, খেলাধুলা ইত্যাদি কায়িক শ্রমের জন্য আমাদের দেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। উক্ত ক্ষয় পূরণের জন্য দেহবর্ধক খাদ্য গ্রহণ করতে হয়।
দেহবর্ধক খাদ্যের উদাহরণ-
ক) উদ্ভিজ্জ উৎস- সকল প্রকার ডাল, বাদাম, মটরশুঁটি, সয়াবিন, শিমের বীচি ইত্যাদি ।
খ) প্রাণিজ উৎস- দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, কলিজা ইত্যাদি ।
৩। রোগ প্রতিরোধক খাদ্য: যে সকল খাদ্যদ্রব্য শরীরকে বিভিন্ন রোগবালাই থেকে রক্ষা করে এবং রোগাক্রান্ত হলে সহজে শরীর সুস্থ করে তোলে, সেসব খাদ্যকে রোগ প্রতিরোধক খাদ্য বলে। সাধারণত ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ ও খনিজ পদার্থসমূহ রোগ প্রতিরোধক খাদ্য হিসেবে কাজ করে। এসকল খাদ্যের অভাবে শরীরে নানা রকম অসুখ যেমন- রাতকানা, বেরিবেরি, স্কার্ভি, রিকেট, এনিমিয়া, গলগণ্ড ইত্যাদি হয়ে থাকে। রোগ প্রতিরোধক খাদ্যের উদাহরণ-
ক) উদ্ভিজ্জ উৎস- সব ধরনের শাকসবজি, ফল, ডাল তৈলবীজ, চিনাবাদাম।
খ) প্রাণিজ উৎস- ডিম, দুধ, মাংস, পনির, ঘি, মাখন, দই, কলিজা, মাছের তেল ইত্যাদি।
আমরা শরীর সুস্থ রাখার জন্য যে সকল খাদ্য গ্রহণ করে থাকি তাতে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য উপাদান থাকে । অধিকাংশ খাদ্যেই এক বা একাধিক খাদ্য উপাদান থাকে। খাদ্যে যে উপাদান বেশি পরিমাণে থাকে তাকে সে উপাদানযুক্ত খাদ্য বলা হয়। খাদ্যের উপাদানগুলোকে সাধারণত ছয়ভাগে ভাগ করা যায় যথা—
১. শ্বেতসার বা শর্করা (Carbohydrate)
২. আমিষ (Protein)
৩. স্নেহ বা চর্বি (Fat)
৪. খনিজ লবণ (Minerals)
৫. খাদ্যপ্রাণ (Vitamin )
৬. পানি (Water)
১. শ্বেতসার বা শর্করা : শ্বেতসার মূলত কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন (C, H, O) সমন্বয়ে গঠিত এক প্রকার জৈব যৌগ যা সকল প্রকার উদ্ভিদে পাওয়া যায়। শর্করার স্বাদ মিষ্টি বা মিষ্টিহীন এবং রং সাদা। উদ্ভিদে সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শর্করা উৎপন্ন হয়, যা দাহ্য হয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড, পানি ও শক্তি (ক্যালরি) উৎপন্ন হয়। শর্করা প্রধানত তিন প্রকার, যথা- মনোস্যাকারাইড, ডাই স্যাকারাইড ও পলি স্যাকারাইড। প্রায় সব ধরনের শর্করাই পানিতে দ্রবণীয় ।
সেলুলোজ (আঁশ) শর্করার একটি অপাচ্য ধরন যা ধান, গম, যব ও শাক-সবজির উপরের খোসা বা বাকলে পাওয়া যায়। এই সেলুলোজ মানুষের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
শর্করার কাজ-
(ক) শর্করার প্রধান কাজ হচ্ছে শরীরের তাপ ও শক্তি সরবরাহ করা। (১ গ্রাম শর্করা হতে ৪ ক্যালরি তাপশক্তি পাওয়া যায়)।
(খ) শর্করা স্বল্প আমিষ যুক্ত খাদ্যকে (Low Protein diet) তাপ উৎপাদানের কাজ থেকে অব্যাহতি দেয় ।
(গ) কিছু শর্করা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং অস্ত্রের স্বাভাবিক সংকোচন ত্বরান্বিত করে। যেমন- সেলুলোজ ও পেকটিন।
(ঘ) কিছু শর্করা রক্তের কোলেস্টরলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
(ঙ) অতিরিক্ত শর্করা শরীরে গ্রাইকোজেন হিসেবে জমা থাকে।
(চ) দেহকে কিটোসিস নামক রোগ হতে রক্ষা করে।
শর্করার উৎস : চাল, আটা, আলু, কচু, কলা, গুড়, চিনি, মধু, কাসাভা, ভুট্টা, আম, খেজুর, নারিকেল, কাজুবাদাম, বেল, সরিষা, আতা, পেঁপে, চালতা ইত্যাদি ।
২. আমিষ : আমিষ হচ্ছে নাইট্রোজেন জাতীয় একপ্রকার জটিল জৈব উপাদান। কোষের প্রোটোপ্লাজমের প্রধান উপাদান হচ্ছে প্রোটিন। তাই প্রোটিনকে জীবকোষের প্রাণ বলা হয়। প্রোটিন খাওয়ার পর তা ভেঙে এমাইনো এসিডে পরিণত হয়। প্রোটিনে প্রায় ২০ ধরনের অ্যামাইনো এসিড থাকে। সবচেয়ে উন্নতমানের আমিষ হচ্ছে প্রাণিজ আমিষ।
আমিষের কাজ
(ক) প্রধান এবং প্রথম কাজ হলো- দেহ গঠন, বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণ।
(খ) খাদ্যের পরিপাক ও বিপাক ক্রিয়াকে যে সকল এনজাইম প্রভাবিত করে তা প্রোটিন থেকে উৎপন্ন হয়। যেমন : পেপসিন, ট্রিপসিন ইত্যাদি ।
(গ) আমিষ জাতীয় খাবার খাওয়ার ফলে শরীরে এন্টিবডি ও এন্টিজেন পদার্থ তৈরি হয় যা আমিষ হতে উৎপন্ন হয়। এরা দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
(ঘ) রক্তের হিমোগ্লোবিন নামক আমিষ বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছ দেয়।
(ঙ) আমিষও তাপশক্তি উৎপাদন করে (১ গ্রাম আমিষ থেকে প্রায় ৪ ক্যালরি শক্তি উৎপন্ন হয়)। পর্যাপ্ত শর্করা ও স্নেহের অভাব হলে আমিষ ভেঙে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয়।
(চ) আমিষের অভাবে শরীরের কোষ থেকে পানি বের হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমে শ্বেত রোগ (Edema) হয়।
আমিষের উৎপত্তি : মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, চিনা বাদাম, মাশরুম, শিমের বিচি ইত্যাদি।
৩. স্নেহ বা চর্বি : তেল ও চর্বি জাতীয় খাদ্যকে স্নেহ পদার্থ বলে ইংরেজিতে একে Fat বা Lipid বলা হয়। এ খাদ্য সবচেয়ে বেশি তাপ ও শক্তি সরবরাহ করে। স্নেহ জাতীয় খাদ্য ফ্যাটি এসিড ও গ্লিসারল দ্বারা গঠিত। কোনো কোনো উদ্ভিদ বীজে ও বাদামে স্নেহ জাতীয় খাদ্য পাওয়া যায় যেমন- জলপাইয়ের তেল, নারিকেলের তেল, সরিষার তেল, সয়াবিন ও বাদাম তেল ইত্যাদি। শরীরের জন্য প্রানিজ তেল অপেক্ষা উদ্ভিদ তেল বেশি প্রয়োজন। প্রাণিজ তেল যেমন- ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস ইত্যাদি খেলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ হবার সম্ভাবনা থাকে ।
স্নেহ জাতীয় পদার্থের কাজ :
(ক) স্নেহ জাতীয় খাদ্য থেকে সবচেয়ে বেশি তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয় (১ গ্রাম স্নেহ থেকে ৯ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়)।
(খ) স্নেহ জাতীয় খাদ্য তাপ কুপরিবাহী বলে দেহকে গরম রাখে।
(গ) এ খাদ্যে ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে পাওয়া যায়।
(ঘ) উদ্ভিদ তেলের অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড ত্বক ও কোষের সুস্থতা রক্ষা করে ।
(ঙ) খাদ্যে স্নেহ জাতীয় পদার্থের ব্যবহারের ফলে সুস্বাদু ও মুখরোচক হয়।
স্নেহ জাতীয় খাদ্যের উৎস :
সয়াবিন, সরিষা, তিল সূর্যমুখী বীজ, চিনাবাদাম, নারিকেল, পাম, তুলা বীজ, ডালডা, মার্জারিন, ঘি, মাখন, চর্বি, মাছের তেল, ডিম ইত্যাদি।
৪. খনিজ লবণ : দেহের অন্যতম উপাদান হচ্ছে খনিজ লবণ। যদিও দেহে প্রায় ৯৬% জৈব পদার্থ ও বাকি ৪% অজৈব পদার্থ বা খনিজ লবণ, তবুও এই অল্প পরিমাণ খনিজ লবণ দেহের কাঠামো গঠন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। খনিজ লবণের মধ্যে যেগুলো বেশি পরিমাণে প্রয়োজন সেগুলোকে Macro minerals এবং যেগুলো কম পরিমাণে ব্যবহার হয় সেগুলোকে Trace element বলে। তবে শরীরে প্রায় ২০টি লবণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রয়োজনীয় খনিজ লবণগুলো হচ্ছে- (১) ক্যালসিয়াম (২) পটাশিয়াম (৩) সোডিয়াম (৪) লৌহ (৫) ম্যাগনেসিয়াম (৬) ম্যাঙ্গানিজ (৭) দস্তা (৮) তামা (৯) লিথিয়াম (১০) ফসফরাস (১১) গন্ধক (১২) ক্লোরিন (১৩) বেরিয়াম (১৪) আয়োডিন (১৫) সিলিকন (১৬) ফ্লোরিন ইত্যাদি। এর মধ্যে ১০টি দ্বারা শরীরের ক্ষারীয় এবং ৬টি দ্বারা শরীরের অম্লভাব বজায় থাকে।
ক্ষার জাতীয় লবণ : ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, লৌহ, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, দস্তা, তামা, লিথিয়াম ও বেরিয়াম।
অম্ল জাতীয় লবণ : ফসফরাস, গন্ধক, ক্লোরিন, আয়োডিন, সিলিকন ও ফ্লোরিন।
খনিজ লবণের কাজ
১) ক্যালসিয়াম
ক) ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস হাড় ও দাঁত গঠন করে এবং মজবুত করে।
খ) প্রতিটি জীবকোষ গঠনে এর প্রয়োজন।
গ) এটি রক্ত জমাট বাঁধার প্রয়োজনীয় উপাদান ।
লৌহ :
(ক) রক্তের লাল অংশ ও হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে।
(খ) হিমোগ্লোবিন ফুসফুস থেকে বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে।
(গ) কিছু এনজাইম বা জারক রস গঠনে লৌহের প্রয়োজন।
লৌহ জাতীয় খাদ্যের উৎস : কচুশাক, লালশাক, আলু, পুদিনা পাতা, শশা, শালগম, করলা, মূলা, ডাল, পেঁয়াজ, তরমুজ, মটরশুঁটি, খেজুর, যকৃৎ, মাংস, ডিম, গুড়, তেঁতুল, চিংড়ি, শুঁটকি মাছ ইত্যাদি।
আয়োডিন :
(ক) আরোভিন শরীরের থাইরক্সিন নামক হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে।
(খ) থাইরক্সিন দৈহিক ও মানসিক বিকাশ সরাসরি প্রভাবিত করে।
(গ) গর্ভবতী মায়ের জন্য আয়োডিন খুবই প্রয়োজন, অন্যথায় প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিতে পারে।
আয়োডিন জাতীয় খাদ্যের উৎস : বিভিন্ন শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ (তাজা ও শুঁটকি), শামুক, ছাগলের দুধ, শেওলা, মাছের তেল ইত্যাদি।
ভিটামিন : শর্করা, আমিষ স্নেহ পদার্থ ছাড়াও কিছু কিছু জৈব উপাদান সুস্থতা ও বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হয়। এগুলোকে খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন বলে। বেরিবেরি ও স্কার্ভি রোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন আবিষ্কার হয়েছে। বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা যেমন- অসবার্ন, মেন্ডেল, ম্যাককলাম ও ডেভিস প্রমাণ করেন যে, লেবুতে স্কার্ভি প্রতিরোধক ভিটামিন- সি, মাখন ও চর্বিতে ভিটামিন-এ, দুধ, গম ও চালের কুঁড়ায় ভিটামিন বি পাওয়া যায়। খাদ্যে ভিটামিন খুবই অল্প পরিমাণে প্রয়োজন হয়। দ্রবণীয়তার ভিত্তিতে ভিটামিন দুই প্রকার। যেমন (১) চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন : ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে (২) পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন : ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও ভিটামিন সি ।
ভিটামিন এ :
(ক) চোখ সুস্থ রাখে ও স্বল্প আলোতে দেখার ক্ষমতাকে রক্ষা করে ।
(খ) অস্থিকোষ ও দাঁতের গঠনকে প্রভাবিত করে।
(গ) সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে।
উৎস : সয়াবিন, চাল, ভুট্টা, লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, গাজর, পাকা আম, পাকা পেঁপে, পাকা কাঁঠাল, মিষ্টি আলু ইত্যাদি ।
ভিটামিন ডি এর কাজ :
(ক) শরীরের অস্ত্র ও কিডনি হতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সাহায্য করে।
(খ) শরীরের হাড় ও দাঁত সুগঠিত ও মজবুত করে ।
(গ) শিশুদের রিকেট ও বয়স্কদের অস্টিওম্যালেসিয়া (Osteomalacia) রোগ প্রতিরোধ করে।
উৎস : ডিমের কুসুম, দুধ, মাখন, যকৃৎ ও তৈলাক্ত মাছ। সাধারণত উদ্ভিজ্জ উৎসে ভিটামিন ডি নেই।
ভিটামিন ই এর কাজ :
(ক) কোষের ঝিল্লি গঠন করে।
(খ) ক্যারোটিন বিপাকে সহায়তা করে ।
(গ) গর্ভপাত প্রবণতা কমিয়ে দেয় ।
উৎস: উদ্ভিজ্জ তেল (বাদাম, ভুট্টা, সূর্যমুখী, সয়াবিন, পাম, নারিকেল) ভিটামিন ই এর উৎকৃষ্ট উৎস। দুধ, মাখন ডিমে এই ভিটামিন পাওয়া যায়।
ভিটামিন কে এর কাজ :
(ক) রক্ত জমাটকরণ কাজে সহায়তা করে।
উৎস : লেটুস, বাধাকঁপি, ফুলকপি, গাজর, মটরশুঁটি, ডাল, দুধ, ডিম, মাছ মাংস ইত্যাদি ।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স: ভিটামিন বি একটি একক ভিটামিন নয়। প্রায় ৮ প্রকার বি ভিটামিনকে একত্রে বি- কমপ্লেক্স বলা হয়। এগুলোর প্রত্যেকটির আলাদা গুণ ও কাজ আছে। এগুলো হলো- (১) ভিটামিন বি১ (২) ভিটামিন বি২ (৩) নায়াসিন (বি৫) (8) পিরিডক্সিন (বি৬) (৫) পেন্টোথেনিক এসিড (৬) বায়োটিন (৭) ফলিক এসিড ও (৮) ভিটামিন বি১২ ।
ভিটামিন বি১ (থায়ামিন) এর কাজ :
(১) বেরিবেরি রোগ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
(২) শর্করা জাতীয় খাদ্য বিপাকে সহায়তা করে ।
(৩) পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা রক্ষা করে।
উৎস: ঢেঁকিছাঁটা চাল, বাদাম, গম, মটরশুঁটি, মাছ, ডিম, যকৃৎ ইত্যাদি।
ভিটামিন বি২ (রিবোফ্লেভিন) এর কাজ :
(১) কোষকলার শ্বসন ও বিপাক কাজে সহায়তা করে ।
(২) ত্বকের সৌন্দর্য ও সজীবতা রক্ষা করে।
(৩) চোখ ও স্নায়ুর সুস্থতা রক্ষা করে।
উৎস: ঢেঁকিছাঁটা সিদ্ধচাল, ডাল, ভুট্টা, বাদাম, অঙ্কুরিত শস্য দানা, মটরশুঁটি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ইত্যাদি ।
নায়াসিন বা নিকোটেনিক এসিড :
(১) নায়াসিন শর্করা, আমিষ ও স্নেহ থেকে শক্তি উৎপাদন শ্বসন কাজে সহায়তা করে ।
(২) সুস্থ ত্বক, অস্ত্র ও স্নায়ুর জন্য নায়াসিন প্রয়োজন ।
উৎস: ডাল, বাদাম, ভুট্টা, তেলবীজ, ছোলা, মাছ, মাংস ও যকৃৎ ইত্যাদি।
পিরিডক্সিনের কাজ :
(১) আমিষ বিপাকে এনজাইমের সহায়তা করে ।
(২) বাড়ন্ত শিশুর বর্ধনে সহায়তা করে।
উৎস: ঈস্ট, চালের কুঁড়া, গম, ছোলা, বাদাম, সবুজ শাক, মাছ, মাংস, ও যকৃৎ ইত্যাদি।
ফলিক এসিড :
(১) কোষ বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
(২) রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে ।
উৎস: বাদাম, ছোলা, ডাল, চাল, আটা, সবুজ শাকসবজি, কলিজা, বৃক্ক, মাছ ও মাংস ইত্যাদি।
ভিটামিন বি১২:
(১) রক্তের লোহিত কণিকা গঠন করে।
(২) স্বাস্থ্যের উন্নতি ও ক্ষুধা বৃদ্ধিতে প্রভাবিত করে ।
উৎস: একমাত্র উৎস প্রাণিজ খাদ্য যেমন- যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি।
ভিটামিন সি :
(১) এটি কোলাজেন নামক আমিষ তৈরি করে হাড়, তরুণাস্থি ও ত্বকের রক্ষণাবেক্ষণ করে।
(২) রক্তের বিশুদ্ধতা ও রক্ত গঠনে সহায়তা করে।
(৩) ক্ষতস্থান তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করে।
(৪) এটি জারন প্রতিরোধক বা এন্টি অক্সিডেন্ট (Anti oxidant) হিসেবে কাজ করে ।
উৎস: সব রকম টাটকা ফল ও সবজি, আমলকী, পেয়ারা, কুল, কামরাঙ্গা, আমড়া, আনারস, জাম্বুরা, লেবু কাঁচামরিচ ইত্যাদি। টিনজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ভিটামিন সি থাকে না ।
৬. পানি : আম, কাঁঠাল, ডাব, তরমুজ, পেঁপে, আনারস, জাম্বুরা, আঁখ বিভিন্ন প্রকার ফল ও সবজিতে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে। মানব দেহের প্রায় ৬৩% পানি। শরীরে পানির ঘাটতি হলে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।
পানির কাজ :
(১) পানি পরিপাক ও পরিশোষণে সাহায্য করে।
(২) বিপাক ক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন দূষিত পদার্থ নিষ্কাশণ করে।
(৩) দেহ থেকে ঘাম নিরসন ও বাষ্পীভবনের দ্বারা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করে।
উৎস : খাবার পানি. চা, দুধ, কফি, সবজি ও ফল থেকে প্রাপ্ত পানি।
সুষম খাদ্য : আমাদের পেট খালি থাকলে ক্ষুধা অনুভব করি এবং তখন খাওয়ার প্রয়োজন হয়। ক্ষুধা লাগলে পেট ভরে খেয়ে ক্ষুধা দূর করাই উদ্দেশ্য নয়, খাওয়ার উদ্দেশ্য হলো শরীর রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো পরিমিত পরিমাণে শরীরে সরবরাহ নিশ্চিত করা। পুষ্টি উপদানগুলো হলো আমিষ, শর্করা, স্নেহ, খনিজ লবণ, ভিটামিন ও পানি।
দেহে যে ছয়টি পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন তা তিন শ্রেণীর বিভিন্ন প্রকার খাদ্য থেকে পাওয়া যায়। একজন লোকের দেহের স্বাভাবিক পুষ্টির জন্য বিভিন্ন উপাদান বহুল যেসব খাদ্যসামগ্রী পরিমাণমতো প্রয়োজন হয় তাকে সুষম খাদ্য বলে। সুষম খাদ্য দেহে শক্তি জোগানো ছাড়াও দেহের বৃদ্ধি সাধন, ক্ষয়পূরণ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দান করে। সুতরাং মাছ-ডাল, ভাত-রুটি, শাকসবজি, ফল এসব বিভিন্ন শ্রেণীর খাদ্য নিয়েই খাবার সুষম হয়। যেসব শর্ত পালনের ফলে খাবার সুষম হয় তা নিম্নরূপ-
(১) প্রতি বেলায় খাবারে তিন শ্রেণীর খাদ্য অন্তর্ভুক্ত করে খাদ্যের ছয়টি উপাদানের অন্তর্ভুক্ত নিশ্চিতকরণ।
(২) প্রত্যেক শ্রেণীর খাদ্য নির্ধারিত পরিমাণে (পেশা অনুযায়ী) পরিবেশন করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহে নিশ্চিতকরণ।
(৩) খাদ্য প্রস্তুতে সতর্কতা অবলম্বন করে খাদ্য উপাদানের অপচয় রোধ।
(৪) দৈনিক মোট ক্যালরির ৬০-৭০% শর্করা জাতীয় খাদ্য, ৩০-৪০% স্নেহ জাতীয় খাদ্য এবং ১০% আমিষ বা প্রোটিন জাতীয় খাদ্য থেকে গ্রহণ।
(৫) দৈনিক মাথাপিছু কমপক্ষে ৩০ গ্রাম তেল রান্নায় ব্যবহার এবং ২০ গ্রাম গুড়/চিনি পরিবেশন।
(৬) খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনে যথাযথভাবে পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন ।
(৭) এছাড়া প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।
সুষম খাদ্যকে উপাদেয় করার জন্য খাদ্য প্রস্তুতে মশলা ব্যবহার করা যেতে পারে। মশলা শুধু খাবার উপাদেয় করে না বরং কিছু খাদ্য উপাদান যোগ করে। সুষম খাদ্যে কিছু পরিমাণে আঁশ থাকা প্রয়োজন । কারণ আঁশ খাদ্যনালীতে হজমকৃত খাদ্য চলাচল ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে। সবধরনের শাকসবজি ও ফলমূলে যথেষ্ট পরিমাণে আঁশ থাকে। তাই খাদ্য সুষম করার জন্য প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ ফল ও সবজি থাকা প্রয়োজন।
আর্থিক অবস্থা ও খাদ্য প্রাপ্তি সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করে সুষম খাদ্য তৈরি করা যাবে। সুষম খাদ্য হিসেবে যে কোনো একশ্রেণির খাদ্য গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে দামি বা সস্তা খাবার গ্রহণ করা হলে খাদ্যের সুষমতা নষ্ট হবে না। এছাড়া এ তালিকায় ভিটামিন-সি যুক্ত করতে হবে। কারণ ভিটামিন-সি শরীরে জমা হয় না, প্রতিদিন তা খেতে হয়। ফল ও সবজিতে ভিটামিন-সি আছে। কিন্তু সবজি রান্নার ফলে ভিটামিন-সি তাপে নষ্ট হয়। নিম্নের চার্টে তিন ধরনের খাদ্যের দামি ও সস্তা খাবারের তালিকা দেওয়া হলো ।
সারণি : কাজের ভাগ হিসেবে তিন শ্রেণির দামি ও সস্তা খাবার :
খাদ্যের শ্রেণি | দামি খাবার | সস্তা খাবার |
শক্তিবর্ধক খাদ্য | চিকন চালের ভাত, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, চিনি, ঘি, মাখন, মধু | মোটা চালের ভাত, আটার রুটি, মিষ্টি আলু, চিনা, কাউন, ভুট্টা, কচু, কাচকলা, মূলা, গুড়, তেল |
দেহ বর্ধক খাদ্য | বড় মাছ, মাংস, ডিম, দুধ | ছোট গুঁড়ামাছ, ডাল, শিমের বিচি, বাদাম, সয়াবিন । |
রোগ প্রতিরোধক খাদ্য | দুধ, কলিজা, কলা, কমলা, আপেল আঙ্গুর, ডালিম, বেদানা, পাকা আম, | পাকা পেঁপে ইত্যাদি। | সবুজ ও রঙিন শাকসবজি, সাজনা, মিষ্টি কুমড়া, আমলকী, লেবু, জাম, কাঁঠাল, নারিকেল, আম ইত্যাদি । |
উপরের সারণি থেকে ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যের সমন্বয় করে সুষম খাদ্য তৈরি করতে হয়। তবে, মনে রাখতে হবে খাদ্য তালিকায় যত বেশি বিভিন্ন খাদ্যবস্তুর সমন্বয় করা যাবে, তত বেশি সুষম হবে। একজন লোক কোন শ্রেণির খাদ্য কি পরিমাণে খেলে তা সুষম হবে তা নির্ভর করে তার বয়স, পেশা, লিঙ্গ এবং শারীরিক অবস্থার ওপর। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি সস্তা সুষম খাদ্যের তালিকা নিম্নে দেওয়া হলো-
১. চাল বা গম + ডাল + শাক (পুঁইশাক /পালংশাক / ডাঁটা) বা সবজি (টমেটো, শিম, বরবটি, ফুলকপি, লাউ, করলা ইত্যাদি)।
২. চাল বা গম + ডাল + সামান্য মাছ + শাকসবজি।
৩. মায়ের দুধ (শিশুর জন্য সুষম খাদ্য)
৪. চাল বা গম + মাংস + শাকসবজি
৫. চাল বা গম + গরুর দুধ।
ছোট বাচ্চাদের শরীর দ্রুত বৃদ্ধি পায়, সে জন্য বয়স্কদের তুলনায় তাদের আমিষ জাতীয় খাদ্য বেশি প্রয়োজন হয়। যারা বেশি শারীরিক পরিশ্রম করে (কাঠ কাটা, মাটিকাটা, রিক্সা বা ঠেলাগাড়ি টানা ইত্যাদি) তাদের দরকার বেশি বেশি শক্তিদায়ক খাদ্য, যেমন- শর্করা। গর্ভবতী ও প্রসূতিকালে নারীদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেশি পরিমাণে এবং বৈচিত্র্যময় খাবার প্রয়োজন হয়।
(ক) ০-৬ মাস বয়সের জন্য মায়ের দুধই উৎকৃষ্ট খাদ্য। পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধই শিশুর সব পুষ্টি চাহিদা মেটাতে পারে।
(খ) ৬-১২ মাসের শিশুর দৈনিক খাদ্য তালিকা : মাতৃদুগ্ধের সাথে শিশুকে নিচের খাদ্যগুলো খাওয়াতে হবে।
উপরোক্ত খাদ্য তালিকা শরীরের গঠন, বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সম্পূর্ণ ও সুষম খাদ্য। উক্ত তালিকার খাদ্য থেকে আমিষ, শর্করা, চর্বি, খনিজ লবণ ও ভিটামিন সঠিক পরিমাণে পাওয়া যাবে। সাধারণভাবে কোনো খাদ্য তালিকায় যত বেশি ধরনের খাদ্য বস্তু থাকবে উক্ত খাদ্য ততবেশি রুচিপূর্ণ ও সুষম হবে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জনগণের এক বিরাট অংশ বিভিন্ন প্রকারের অপুষ্টিতে ভুগছে। বাংলাদেশে অপুষ্টির প্রথম এবং প্রধান শিকার হচ্ছে মা ও শিশু। যুক্তরাষ্ট্রের USAID বাংলাদেশ নারী ও শিশু স্বাস্থ্য ২০১১ইং শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে- এদেশে মায়েদের এক-তৃতীয়াংশ অপুষ্টির শিকার, উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন কম জাতিসংঘের FAO পুষ্টি জরিপ-১১তে বলা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নারীর পুষ্টিহীনতার দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষে। এতে আরও বলা হয়েছে বাংলাদেশে ৫০% এর বেশি নারীই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বিগত অক্টোবর ২০০৯ তারিখে অনুষ্ঠিত ১৯তম আন্তর্জাতিক পুষ্টি সম্মেলনে (ব্যাংকক) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহকারী মহাসচিব বলেছেন বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ শিশু মৃত্যুর কারণ অপুষ্টি। পৃথিবীর যে ৩৬টি দেশে অপুষ্টি বেশি তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সাউথ এশিয়ান ইনফ্যান্ট ফিডিং রিসার্চ নেটওয়ার্কের এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের প্রায় অর্ধেকই অপুষ্টিতে আক্রান্ত। ৫ বছরের কমবয়সী শিশুর ৫০% এর মৃত্যুর কারণ অপুষ্টি। বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিশু পুষ্টি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম কিউ, কে তালুকদারের মতে শুধু অপুষ্টির কারণে দৈনিক ২০০ শিশু মারা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক ২০০৬ এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে নবজাতকের মৃত্যুর হার ২৮%। এক বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ৩%। কম ওজনে জন্মানো শিশুর হার ১৯%। রক্তস্বল্পতায় ভোগে ৫০% এবং গর্ভবর্তী মা রক্তশূন্যতায় ভোগে ৪৬%। বাংলাদেশের ৪০% লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এরা দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দেশের ৫০% নারী ও শিশু আয়রনের অভাবে ভুগছে। অপুষ্ট মা অপুষ্ট শিশু অদক্ষ কর্মী অপুষ্টির এ চক্রে বছরে দেশের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের অপুষ্টির ব্যপকতা অতি উচ্চ হারের চেয়েও বেশি। এদেশে খর্বাকৃতি অর্থাৎ স্টান্টিং (Stunting) প্রায় ৩৬%। উচ্চতার তুলনায় ওজনআধিক্য বা ওয়েস্টিং (Wasting) ১৪% ও বয়সের তুলনায় ওজন স্বল্পতা বা আন্ডারওয়েট (Under weight) প্রায় ৩২% যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রধান পুষ্টি সমস্যা ও সম্ভাব্য কারণ নিম্নের ছকে দেওয়া হলো-
ক্রমিক নং | সমস্যা | কারণ |
১ | অসম খাদ্য বণ্টন | খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির অসমতা, ফলে অসম খাদ্য বণ্টন, খাদ্য মূল্য বৃদ্ধি, | অপর্যাপ্ত গুদামজাতকরণ, খাদ্য অপচয়ও খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি করে । |
২ | ক্যালরি গ্রহণ হ্রাস | মাথাপিছু প্রতিদিন ২৩০১ কিলোক্যালরি থেকে ১৯৬১ কিলোক্যালরিতে নেমে গেছে। |
৩ | শিশুর অপুষ্টি | ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা বিভিন্ন মাত্রার অপুষ্টিতে আক্রান্ত। শিশু মৃত্যুর হার বেশি, শিশু স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মায় অর্থাৎ জন্মকালীন ওজন ২.৫ কেজির ও কম। অল্প বয়সে বিবাহ, ঘন ঘন সন্তান প্রসব, মায়ের অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যহানি শিশুর অপুষ্টির প্রধান কারণ। |
৪ | মায়ের অপুষ্টি | প্রতি ১০০০ সন্তান জন্মদানে ৫৬ জন মা গর্ভকালীন জটিলতায় মারা যায়। দৈহিক ক্লেশ, অপর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য, কুসংস্কার, মায়ের অপুষ্টির প্রধান কারণ। |
৫ | রক্তস্বল্পতা | মহিলা, গর্ভবতী মহিলা এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা রক্ত স্বল্পতায় ভূগছে। কৃমি রোগ, আমাশয়, আমিষ ও লৌহের ঘাটতি, ঘন ঘন সন্তান জন্মদান, রক্ত স্বল্পতার প্রধান কারণ । |
৬ | ভিটামিন-‘এ’ এর অভাব | প্রতি বছর ৩০,০০০ শিশু ভিটামিন- ‘এ' এর অভাবে অন্ধ হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিশু অন্ধ হয়ে পড়ার পর মারা যায়। এর প্রধান | কারণ হচ্ছে ছোট ছেলেমেয়েদের ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ শাক-সবজি খাওয়ানো হচ্ছে না, রান্নায় তেল ব্যবহার খুবই অল্প, শাল দুধ ফেলে দেওয়া ইত্যাদি । |
৭ | আয়োডিনের অভাব | ৬৯% জনগণের মধ্যে আয়োডিনের অভাব। ৪৭% জনগণের মধ্যে গলগন্ড দেখা গেছে। ৫ লক্ষ লোক আয়োডিনের অভাবে মানসিক প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ। মাটি, পানি ও খাদ্যে আয়োডিনের ঘাটতি। |
৮ | অন্যান্য অণু পুষ্টি উপাদানের অভাব | ফলিক এসিড, রিভোফ্লাভিন এবং দস্তা ইত্যাদি অনুখাদ্যের অভাব কিশোরী মেয়ে ও পুরুষের মধ্যে দেখা যায়। আমিষ খাদ্যের স্বল্পতা, পেটের অসুখ প্রভৃতিতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয় । |
বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.২৬%। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাড়তি জনসংখ্যার চাপে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বসতি স্থাপনের ফলে চাষাবাদের জমি কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না। ফলে খাদ্য ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। খাদ্য দ্রব্যের ক্রয়মূল্য অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সকলের পক্ষে পুষ্টি সম্পন্ন খাদ্য কিনে খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব এবং অজ্ঞতার কারণে অনেকে হাতের কাছে যা পায় তাই খেয়ে ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু শরীর সুস্থ রাখার জন্য খাদ্য নির্বাচনের যে একটা প্রয়োজন আছে তা বিবেচনা করা একান্ত দরকার । শরীরের চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য খাওয়া উচিত অন্যথায় পুষ্টিহীনতায় ভুগে রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে ।
একজন লোকের দৈনিক ৭০-৭৫ গ্রাম প্রোটিন খাওয়ার দরকার। কিন্তু প্রোটিনের ঘাটতি থাকায় দিনের পর দিন প্রোটিন ও ক্যালরির অভাবে পুষ্টিহীনতা মানুষ ভুগছে। খাদ্যে প্রোটিন ও ক্যালরির একত্রে অভাবজনিত রোগকে প্রোটিন-ক্যালরির অভাবজনিত রোগ বলে। এ ধরনের পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে শিশু, অন্তসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারী এবং স্বল্প আয়ের লোকজন। অনেকে দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভুগছে ভুগতে মারা যাচ্ছে । যারা বেঁচে থাকে তারা অসুস্থ, মেধাহীন ও কর্মে নিরুৎসাহী হয়ে থাকে। একপর্যায়ে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিহীন হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকে। এছাড়া পুষ্টিহীনতা থেকে মানুষের ভিটামিনজনিত নানা রোগ হয়ে থাকে ।
পুষ্টিহীনতার কারণ— পুষ্টিহীনতাকে মোকাবেলা করার জন্য প্রথমে এর কারণ জানা প্রয়োজন। আমাদের দেশে পুষ্টির ঘাটতি বৃদ্ধির মূল কারণগুলো নিম্নরূপ-
১. দারিদ্র্য
২. ঘন জনবসতি
৩. অজ্ঞতা
৪. খাদ্যের পুষ্টিমান উন্নয়ন
৫. রন্ধন জ্ঞান
৬. সুষম খাদ্য তৈরি
৭. খাদ্য সংরক্ষণ
৮. কুসংস্কার
৯. খাদ্যে ভেজাল
১০. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও
১১. স্বাস্থ্য পরিচর্যা
নিম্নে এ কারণগুলো বর্ণনা দেওয়া হলো :
১। দরিদ্রতা : পুষ্টিকর খাদ্য যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, মাখন, পনির, ঘি, ডাল ও তেল ইত্যাদির দাম বর্তমান বাজারে আকাশচুম্বী। জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে বিধায় তারা পুষ্টিকর খাদ্য ক্রয় করতে পারে না ফলে পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়।
২। ঘন জনবসতি : অত্যন্ত ঘনবসতি পূর্ণ বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার বসতি প্রায় ১০৬৩ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। জনসংখ্যার এই ঊর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাবার জোগান দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাছাড়া প্রতিবছর ৮৭ হাজার হেক্টর কৃষি জমি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এভাবে আবাদি জমি হ্রাস এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি চলতে থাকলে খাদ্য ঘাটতি হবে, ফলে মারাত্মক পুষ্টিহীনতা দেখা দেবে।
৩। পুষ্টি বিষয়ক অজ্ঞতা : আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকেরই খাদ্য নির্বাচন এবং রান্নার উপযুক্ত পদ্ধতি জানা নেই। এ কারণে দেখা যায় একই ধরনের খাদ্য অতিমাত্রায় গ্রহণ করার ফলে খাদ্যের অন্যান্য উপাদানের ঘাটতি সৃষ্টি হয়। শাকসবজি ও ফলের খাদ্যপ্রাণ সংরক্ষণ, পুষ্টিকর খাদ্য চিহ্নিতকরণ ও ব্যক্তি বিশেষের ক্যালরির চাহিদা, শিশু খাদ্য ও সূর্যালোকের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জ্ঞান বা ধারণা না থাকার কারণে সাধারণ মানুষ পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে।
৪ । খাদ্যের পুষ্টিমান উন্নয়ন : খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুষ্টিমানের উৎকর্ষ বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যের মান উন্নত করা সম্ভব যা পুষ্টি সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- গুঁড়া দুধের সাথে ভিটামিন ‘এ' ও 'ডি' সংযুক্তকরণ, গমের সাথে লাইসিন যোগ, লবণের সাথে আয়োডিন যোগ, মাড়সহ ভাত রান্না, আটার সাথে ভুট্টার আটা যোগ, তেল সহযোগে ক্যারোটিনসমৃদ্ধ শাক-সবজি রান্না ইত্যাদি। খাদ্যের প্রকারভেদ অনুযায়ী খাদ্যের সাথে বিভিন্ন দ্রব্য যোগ করে খাদ্যের পুষ্টিমানের বৃদ্ধিসাধনে দক্ষ থেকে হবে।
৫ । রন্ধন জ্ঞান : খাদ্য উপাদান অবিকৃত রেখে সঠিক পুষ্টি আহরণ ও রান্নার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভের গুরুত্ব কম নয়। খাবার তৈরিতে বেশি মশলা, বেশি ঝাল, বেশি কষানো বা অল্প জ্বালে খাদ্যের পুষ্টি নষ্ট হতে পারে। এ ধরনের খাবার হজমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাপে ভিটামিন-সি নষ্ট হয়ে যায়। শাকসবজি সর্বদা ধুয়ে কাটতে হবে। রান্নায় কম পানি ব্যবহার করতে হয়। খাদ্য সর্বদা তাজা অবস্থায় রান্না করতে হয় ইত্যাদি জ্ঞানের অভাবে পুষ্টিহীনতা থেকে পারে ।
৬। সুষম খাদ্য : বয়স অনুপাতে বিভিন্ন ধরনের খাবার একত্রে মিশিয়ে সব ধরনের পুষ্টি প্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সুষম খাদ্যের কয়েকটি তালিকা পূর্বে দেওয়া হয়েছে।
৭। খাদ্য সংরক্ষণ : উৎপাদন মৌসুমে আলু, শাকসবজি, আম, কাঁঠাল, আনারস, লেবু, কলা ও অন্যান্য ফসল প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন হলে সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে তা নষ্ট হয়ে যায়। পরিসংখ্যান মতে বাংলাদেশে গত বছর (২০১৭) সবজি উৎপাদন হয় ৪ লক্ষ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন, আলু উৎপাদন হয় ১ কোটি ২ লক্ষ মেট্রিক টন। খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে উৎপাদিত ফল, মূল শাক-সবজি ইত্যাদি সংরক্ষণ করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে অনেক এগিয়ে গেছে।
৮। কুসংস্কার : সামাজিক কুসংস্কার আমাদের দেশে পুষ্টিহীনতার জন্য অনেকাংশে দায়ী; যেমন- গর্ভবতী ও প্রসূতি মাকে অনেক ধরনের খাবার খেতে দেওয়া হয় না যার বিজ্ঞানসমম্মত কোনো ভিত্তি নেই। মেয়ে অপেক্ষা ছেলেদেরকে পুষ্টিকর খাবার বেশি পরিমাণে দেওয়া হয়। অনেক এলাকায় প্রসূতি মাকে সুতিকা রোগ হওয়ার ভয়ে পুঁটিমাছ, ইলিশ মাছ ও গরুর মাংস খেতে দেওয়া হয় না। গ্রামের অনেক মা ও শিশুকে শুধু স্যালাইন ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানো হয় না। এ ছাড়াও বহু ধরনের কুসংস্কার পুষ্টিহীনতার জন্য দায়ী।
৯ । খাদ্যে ভেজাল : ভেজাল খাবার পুষ্টিহীনতা সৃষ্টির একটি অন্যতম উপায়। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফার জন্য তাদের নীতিবোধ বিসর্জন দিয়ে খাদ্যে ভেজাল দেয়। সয়াবিন তেলের সাথে পাম তেল, মিশ্রণ, সয়াবিন তেলের পরিবর্তে পোড়া মবিলে খাদ্য ভেজে বিক্রি করে। বিভিন্ন বাতিল রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে জুস বা পানীয় তৈরি করা হয়। ইউরিয়া দিয়ে মুড়ি ভাজা, মাছ, মাংস ও দুধে ফরমালিন মেশানো, কার্বাইড দিয়ে ফল পাকানো ইত্যাদি। বিভিন্নভাবে ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল ও দূষিত রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে পুষ্টিমানের চরম ক্ষতি করছে। এতে পুষ্টিহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং জনসাধারণ বিভিন্ন রোগবালাই দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে।
১০। প্রাকৃতিক দুর্যোগ : বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, জলোচ্ছাস ইত্যাদির কারণে অনেক সময় অঞ্চল বিশেষে উৎপাদিত সম্পূর্ণ ফসলই নষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসলের ক্ষতি হয়ে অনেক সময়ে দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। ফলে মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে।
১১। স্বাস্থ্য পরিচর্যা : স্বাস্থ্য পরিচর্যা হচ্ছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যা একটি নির্দিষ্ট এলাকার সদস্যদের নিকট সহজলভ্য করে তোলা। অবশ্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদান ও সুষম খাদ্যবণ্টন ও গ্রহণের পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বাস্তবায়ন করা উচিত। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্যানিটারি পায়খানা ব্যবহার, সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা, বাসস্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, শিশুর ছয়টি টিকা দান, ও মায়ের দুধ খাওয়ানো ইত্যাদি ব্যবস্থা করা গেলে পুষ্টিহীনতা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
অপুষ্টি সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান
অপুষ্টি সমস্যা যেমন একদিনে সৃষ্টি হয় না তেমনি এর সমাধানও একদিনে করা সম্ভব নয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজ থেকে অপুষ্টি দূর করা সম্ভব। পুষ্টিহীনতা দূর করার জন্য মোটামুটিভাবে যেসব ব্যবস্থা সাময়িকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব তা নিম্নরূপ-
১. শস্যের বহুমুখীকরণ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার সম্বন্ধে কৃষকদের উৎসাহ এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা, যাতে বিভিন্ন শ্রেণির খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে খাদ্যের সরবরাহ এবং প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পায় ।
২. বসতবাড়িতে হাস-মুরগি ও গবাদী পশু পালন এবং অধিক শাকসবজি ও ফল উৎপাদনের জন্য সবজি বাগান করা এবং ফলের গাছ লাগানো।
৩. বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা অবলম্বন করে জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে খাদ্য ও পুষ্টি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ।
৪. উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী প্রদর্শনী ও বীজ উৎপাদন খামার এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্ৰ স্থাপন করা। যাতে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যায়।
৫. শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার বিভিন্ন পাঠ্যসূচিতে পুষ্টি জ্ঞান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাকে অন্তর্ভুক্ত করা ।
৬. দরিদ্রতা এবং ভূমিহীনতা রোধ করার জন্য একটি জাতীয় ভূমি বণ্টন ব্যবস্থাপনা অবলম্বন করা ।
৭. ভূমিহীনদের জন্য কাজের সুযোগ ও আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যাতে তাদের পারিবারিক আয় ও ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ।
৮. প্রচলিত খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে অপ্রচলিত নতুন খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার কর্মসূচি, গ্রহণ করা। যেমন- মাশরুম, কাসাভা ইত্যাদি।
৯. এগ্রোবেসড শিল্পকে উৎসাহিত করার জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা।
১০.দেশব্যাপী শিশুদের সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি, ভিটামিন বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা ।
১১. পল্লী এলাকায় নিরাপদ পায়খানা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা এবং দরিদ্র লোকের জন্য স্বাস্থ্যকর বাসস্থানের কর্মসূচি গ্রহণ করা।
১২. সরকারি অনুদানের মাধ্যমে সকল স্কুলে ছাত্রদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টিফিনের ব্যবস্থা করা।
১৩. দেশে জরুরি খাদ্য মোকাবেলার জন্য 'খাদ্য ব্যাংক' গঠনের পরিকল্পনা করা।
১৪. জাতীয় পর্যায়ে একটি সঠিক ও উপযুক্ত পুষ্টিনীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা।
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
১। কৃষির ৪টি উপখাত গুলো কী কী?
২। কোন খাদ্যগুলো কৃত্রিম ঘি এর উৎস?
৩। আখ, বীট, তাল ও খেজুর থেকে কোন খাদ্য উপাদান পাওয়া যায়?
৪ । সমগ্র কৃষি ফসলকে কয় ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী?
৫। মাঠফসল কাকে বলে?
৬। উদ্যান ফসল কাকে বলে?
৭। উৎপাদন পদ্ধতি ভেদে কৃষি ফসলকে কয়ভাবে ভাগ করা যায় ও কী কী?
৮। রবি ফসল কাকে বলে?
৯। খরিফ-১ ও খরিফ-২ ফসলের মধ্যে পার্থক্য কী?
১০। সিরিস (Ciris) শব্দের অর্থ কী?
১১। কোন জাতীয় ফসলের শিকড়ে Nodule থাকে?
১২। Nodule বা গুটির মধ্যে কী থাকে এবং কী করে?
১৩। আমাদের দেশের তেল ফসলগুলো কী কী?
১৪। আঁশ জাতীয় ফসল কী কী?
১৫। পানীয় ফসল বলতে কী বুঝায়?
১৬। সবুজ সার কাকে বলে?
১৭। ফল ও বাগিচার ফসল কোনগুলো?
১৮। কৃষি বীজ কাকে বলে?
১৯। পুষ্ট বীজ সংরক্ষণের জন্য কয়টি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এগুলো কী কী?
২০। কোনগুলোকে অপুষ্ট বীজ বলে?
২১। বীজে অবস্থিত অপদ্রব্যগুলো কী কী?
২২। বীজের প্রাথমিক অপদ্রব্য পরিষ্কার করার যন্ত্রের নাম কী?
২৩। বীজের চূড়ান্তভাবে পরিষ্কার করার যন্ত্রের নাম কী?
২৪। বীজের রং দেখে বিভিন্ন বীজ আলাদা করার যন্ত্রের নাম কী
২৫। খাদ্য ও পুষ্টি বলতে কী বুঝায়?
২৬। এপ্রোবেসড খাদ্য কাকে বলে?
২৭। শরীরের কাজের উপর ভিত্তি করে খাদ্যকে কত ভাগে ভাগ করা যায়?
২৮। দেহবর্ধক খাদ্য কাকে বলে?
২৯। খাদ্যের উপাদান কয়টি ও কী কী?
৩০। শর্করা কত প্রকার ও কী কী?
৩১। সেলুলোজ ও পেকটিনের কাজ কী?
৩২। অতিরিক্ত শর্করা শরীরে কী হিসেবে জমা থাকে?
৩৩। দেহকে কিটোসিস নামক রোগ থেকে রক্ষা করে খাদ্যের কোন উপাদান?
৩৪। কেন প্রোটিনকে জীবকোষের প্রাণ বলা হয়?
৩৫। আমিষের প্রথম এবং প্রধান কাজ কী?
৩৬। খাদ্য পরিপাকের জন্য প্রোটিন থেকে উৎপন্ন এনজাইমগুলো কী কী?
৩৭। রক্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয় কোন আমিষ?
৩৮। কিসের অভাবে শরীরে শ্বেত রোগ (Edema) হয়?
৩৯। সবচেয়ে বেশি তাপ ও শক্তি সরবরাহ করে কোন খাদ্য?
৪০। খাদ্য সুস্বাদু ও মুখরোচক হয় কীভাবে?
৪১। দেহে শতকরা কত ভাগ জৈব ও অজৈব পদার্থ আছে?
৪২। শরীরে যে সকল খনিজ বেশি ও কম লাগে তাদের কী বলে?
৪৩। শরীরে লৌহের কাজ কী?
৪৪। গর্ভবর্তী মায়ের জন্য আয়োডিন কেন প্রয়োজন?
৪৫। অম্ল জাতীয় লবণ কোনগুলো?
৪৬। ভিটামিন কত প্রকার ও কী কী ?
৪৭। ভিটামিন-এর এর প্রধান কাজ কী?
৪৮। রিকেট ও অস্টিওম্যালেসিয়া রোগ প্রতিরোধ করে কোন ভিটামিন?
৪৯ । ভিটামিন 'কে'-এর কাজ কী?
৫০। কয় প্রকার ভিটামিনকে একত্রে ভিটা. বি কমপ্লেক্স বলা হয়?
৫১। ভিটামিন বি১ এর কাজ কী?
৫২। ভিটামিন বি১ ও বি২ এর অপর নাম কী কী ?
৫৩। ভিটামিন বি১২ এর কাজ কী?
৫৪ । কোলেজন নামক আমিষ তৈরি করে কোন ভিটামিন?
৫৫। মানব দেহে কত ভাগ পানি থাকে?
৫৬। সুষম খাদ্য বলতে কী বুঝায় ?
৫৭। দৈনিক মোট ক্যালরির কতভাগ শর্করা, স্নেহ ও আমিষ থেকে গ্রহণ করা উচিত?
৫৮। শিশুর ৫ মাস বয়স পর্যন্ত পুষ্টি চাহিদা কোন খাদ্য মিটিয়ে থাকে?
৫৯। পূর্ণ বয়স্ক লোকের দৈনিক কত ক্যালরি প্রয়োজন?
৬০। গর্ভবতী মহিলার দৈনিক কত ক্যালরি প্রয়োজন?
৬১। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ কি?
৬২। শতকরা কতভাগ মহিলা ও শিশু লৌহ ও রক্তস্বল্পতায় ভুগছে?
৬৩। অপুষ্টির ক্ষেত্রে স্টান্টিং, ওয়েস্টিং ও আন্ডার ওয়েট বলতে কী বুঝায়?
৬৪। ভিটামিন-'এ' র এর অভাবে বছরে কত শিশু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে?
৬৫। অনুপুষ্টি বলতে কী বুঝায় ?
৬৬। বাংলাদেশে জন সংখ্যা বৃদ্ধির হার কত?
৬৭। দৈনিক একজন মানুষের কত গ্রাম আমিষ খাওয়া প্রয়োজন?
৬৮। দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে কতজন লোক বসবাস করে?
৬৯। প্রতি বছর কত হেক্টর জমি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে?
৭০। গুঁড়া দুধের সাথে কী যোগ করে পুষ্টিমান উন্নয়ন করা যায়?
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
১। মাঠ ফসল ও উদ্যান ফসলের পার্থক্য লিখ ।
২। সেচ প্রাপ্ত ফসল বলতে কী বুঝায়? উদাহরণ দাও ।
৩। ব্যবহার ভেদে কৃষি ফসলের শ্রেণিবিন্যাসের নাম লিখ ।
৪ । পুষ্ট, অপুষ্ট ও অপদ্রব্যসমূহের পরিষ্কার কয়টি ধাপে করা হয় ও তা কী কী?
৫। খাদ্য, পুষ্টি ও এগ্রোবেসড খাদ্য কাকে বলে ?
৬। শক্তি বর্ধক খাদ্য কী? উদাহরণ দাও ।
৭। শ্বেতসার বা শর্করার কাজ কী?
৮। আমিষের কাজ কী?
৯ । দেহের প্রয়োজনীয় খনিজ লবনগুলো কী কী? নাম লেখ ৷
১০। ক্যালসিয়াম, লৌহ ও আয়োডিনের ২টি করে কাজের নাম লেখ ।
১১। ভিটামিন- এ, ডি, ই ও কে এর ২টি করে কাজের নাম লেখ।
১২। ভিটামিন- বি১ ও বি২ এর কাজ ও উৎস লেখ ।
১৩। ভিটামিন- সি এর কাজ ও উৎস লেখ ।
১৪ । সুষম খাদ্য তৈরির শর্তগুলো লেখ।
১৫। পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দৈনিক খাদ্য তালিকা লেখ ।
১৬। শিশু ও মায়ের অপুষ্টির বিদ্যমান কারণগুলো কী কী?
১৭। পুষ্টিহীনতার কারণগুলো কী কী?
১৮। ‘পুষ্টিহীনতা সৃষ্টির একটি অন্যতম উপায় খাদ্যে ভেজাল' ব্যাখ্যা কর ।
রচনামূলক প্রশ্ন :
১। সংক্ষেপে কৃষি ফসলের শ্রেণিবিভাগ উদাহরণসহ বর্ণনা কর।
২। বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কী? বীজ পরিষ্কারকরণের বিভিন্ন ধাপ বর্ণনা কর
৩। খাদ্যকে যে তিন ভাগে ভাগ করা যায় উদাহরণসহ তা বর্ণনা কর ।
৪ । আমিষ, শর্করা ও স্নেহ জাতীয় খাদ্য উপাদানের কাজ ও উৎস লেখ ।
৫ । ভিটামিন- এ, ডি, ই ও কে এর কাজ ও উৎস বর্ণনা কর।
৬। ভিটামিন- বি কমপ্লেক্সের বিভিন্ন ভিটামিনের কাজ ও উৎস লেখ ।
৭। সুষম খাদ্য কী? এ খাদ্য তৈরির শর্ত ও উদাহরণ দাও ।
৮। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ও মহিলার আলাদা আলাদা খাদ্য তালিকা লেখ ।
৯। দেশের প্রধান পুষ্টি সমস্যা ও সম্ভাব্য কারণের একটি ছক তৈরি কর ।
১০। পুষ্টি সমস্যার কারণগুলো কী কী? বর্ণনা কর ।
১১। অপুষ্টি সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানগুলো বর্ণনা কর ।
ভূমিকা: দেশে যে কয়টি দানাশস্য উৎপাদন হয় তার মধ্যে ধান হচ্ছে প্রধান খাদ্যশস্য। পৃথিবীর মধ্যে এটি দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য। সারা বিশ্বে ধান উৎপাদনকারী প্রধান দেশগুলো হচ্ছে- চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, ভূটান, কেনিয়া, ফিলিপাইন, মায়ানমার, নেপাল, জাপান, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে ৩ কোটি ৩৮ লক্ষ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয় (BBS ২০১৭)।
ধান একটি তন্দুল বা দানা জাতীয় ফসলের পরিপক্ক ডিম্বাশয়। এটি বীজ নয় বরং একে ক্যরিঅপসিস জাতীয় ফল বলে। এটি গ্রামীনি বা পোয়েসি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এ জাতীয় গাছের ফলে একটি বীজ থাকে বলে একে বীজ হিসেবেই ধরা হয়।
চাল : ধানের খোসা ছাড়ানোর পর যে অংশ পাওয়া যায় তাকে চাউল বা চাল বলে। ধানের তিন ভাগের এক ভাগ খোলা ও বাকি দুই ভাগ চাল। চালে ৭৯% শর্করা, ৬.৪% আমিষ ও ০.৪% স্নেহ জাতীয় পদার্থ থাকে ।
ধানের বৈশিষ্ট্য : ধানের বৈজ্ঞানিক নাম অরাইজা স্যাটাইভা (Oryza Sativa)। এর কাণ্ড নরম, এর পাতা ফলক ও খোল দুইটি অংশে বিভক্ত। গত্র ফলকের গোড়ায় অরিকল থাকে, শিকড় গুচ্ছমূল এটা একবীজপত্রী ও সমান (Albuminious)। এর তিনটি উপজাত রয়েছে। যেমন-
(ক) ইন্ডিকা : এ ধান গ্রীষ্মপ্রধান দেশে যেমন- বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তান, নেপাল ও ভূটান জন্মে। ভাত ঝরঝরে হয়।
(খ) জাপানিকা: এ খানের গাছ খাটো ভাত আঠালো হয়। তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া ও জাপানে এ ধান জন্মে।
(গ) জাভানিকা: এ খানের হুঁশি কম তাই ফলন কম, ইন্দোনেশিয়াতে জন্মে। মৌসুম ভেদে আমাদের দেশে তিন ধরনের ধান জন্মে হয়ে থাক। যেমন-
(ক) আউশ ধান : এ ধান আবাদের সময় ১৫ই মার্চ থেকে ১৫ই মে (চৈত্র-বৈশাখ) এবং ধান কাটার সময় ১৫ই জুন থেকে ১৫ই আগস্ট (আষাঢ়- শ্রাবণ) এ ধান আবাদে কম সময় লাগে।
(খ) আমন ধান : এ ধানের চারা রোপণের সময় ১৫ই জুন থেকে ১৫ই আগস্ট (আষাঢ়-ভাদ্র) এবং ধান কাটার সময় ১৫ই অক্টোবর-১৫ই জানুয়ারি (কার্তিক-পৌষ)। ধান আবাদে বেশি সময় লাগে ।
(গ) বোরো ধান : এ ধানের বপনের সময় ১৫ই ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি (পৌষ-মাঘ) এবং ধান কাটার সময় ১৫ই মার্চ থেকে ১৫ই মে (চৈত্র-বৈশাখ)। এটি আবাদে মাধ্যম সময় লাগে ।
১৯৭০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক (ব্রি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল (উফশী) ধানের জাত, মৌসুম, গড় উচ্চতা, গড় জীবনকাল, জাতের বৈশিষ্ট্য, গড় ফলন ও অবমুক্তের বছর নিম্নের ছকে দেয়া হলো ।
১ জীবনকাল বপনের সময়ের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি হয়।
* বৃষ্টিবহুল এলাকার উপযোগী ।
** আলোক-সংবেদনশীল।
*** ব্রি ধান ৪২ এবং ব্রি ধান ৪৩ বৃষ্টিবহুল এবং খরা প্রবণ উভয় অঞ্চলের উপযোগী ।
সূত্র:- কৃষি ডায়েরি- ২০১৬ ইং
ধানের বিভিন্ন অংশ নিম্নে বর্ণনা করা হলো-
১) তুষ (Husk) : এটি ধানের বহিরাবরণ। ধানের দুইটি বন্ধ্যা গুম, লেমা ও প্যালিয়া একত্রে মিলে তুষ তৈরি হয়। ধানের বহিরাবরণ বা খোসা ছেটে তুষ বের করে নিলে লাল আবরণসহ চালের দানা পাওয়া যায়। তুষ মানুষের ভক্ষণযোগ্য নয় ।
২) কুঁড়া (Bran) : চালের বহিরাবরণকে কুঁড়া বলে। ধানের তুষ বের করে নেওয়ার পর চাল বা দানার উপরের লাল ও খুবই পাতলা আবরণ ছাঁটাই করলে তা কুঁড়া হয়ে বেরিয়ে আসে। এই আবরণ সেলুলোজ দিয়ে তৈরি। এই আবরণসহ চাল খেলে সেলুলোজের জন্য শরীরে খাদ্য থেকে পুষ্টি শোষণে বাধা ঘটে। সেজন্য কুঁড়া ছেটে বাদ দেওয়া হয়।
(৩) অ্যালুরেন স্তর : তুষ ও কুঁড়া বের করে নেওয়ার পরও চালের উপর হালকা বাদামি রঙের গুঁড়ার মতো যে স্তরটি থাকে তাকে অ্যালুরেন স্তর বলে। এই স্তরের জন্য চাল আকাড়া থাকে। আকাড়া চাল সহজে শোষিত হয় না। অ্যালুরেন স্তরে প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ থাকে। ঢেঁকিতে চাল ভাঙ্গালে চালের উপর এই স্তর থেকে যায়। কিন্তু মেশিনে ধান ছাঁটাই করলে অ্যালুরেন স্তর আলাদা হয়ে চাল সাদা ও মসৃণ হয় । অ্যালুরেন স্তর আলাদা হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে চালের ভিটামিন ও প্রোটিন কমে যায়।
(৪) শস্য (Endosperm) : ধানের মূল দানাই হচ্ছে শস্য বা এন্ডোসপার্ম। এটি ধানের ৭৫ ভাগ অংশ । চালের দানার প্রায় সম্পূর্ণ অংশ হচ্ছে ৭৭-৭৯% শ্বেতসার। এন্ডোসপার্মের প্রান্তদেশে আয়োডিন, প্রোটিন এবং সামান্য লৌহ থাকে ।
(৫) ভ্রূণ (Embryo) : চালের দানার নিম্ন প্রান্তে অর্থাৎ বোঁটার দিকের প্রান্তে অবস্থিত ভ্রূণ খাদ্য উপাদানে সমৃদ্ধ। ভ্রূণে ভিটামিন-ই, রিবোফ্লোভিন, থায়ামিন, নায়াসিন, লৌহ এবং স্নেহ পদার্থ থাকে ।
চালের পুষ্টিমান : চালের পুষ্টি উপাদানের মধ্যে বেশিরভাগই শ্বেতসার যা চালের ভিতরের দিকে বা সস্যল অংশে থাকে। কিন্তু চর্বি, আঁশ এবং খনিজ লবণ থাকে দানার বাহিরের দিকে। চালে আমিষের ভাগ গম বা ভুট্টা থেকে কম থাকে। কলে ছাঁটা ও ঢেঁকি ছাঁটা চালের পুষ্টিমান নিম্নে দেওয়া হলো—
সারণি : চালের পুষ্টিমান (শতকরা হারে)
চালে আমিষের পরিমাণ শতকরা গড়ে ৭.৫ ভাগ এবং চালের আমিষের জৈবিক মান কম-বেশি ৬৮ ভাগ । অর্থাৎ চালে যে আমিষ থাকে দেহ তার ৬৮ ভাগ কাজে লাগাতে পারে। চালে ১৭টি অ্যামাইনো এসিড থাকে। এর মধ্যে অত্যাবশ্যক অ্যামাইনো এসিড-গুলো হলো- আইসোলিউসিন, লিউসিন, লাইসিন, ফিনাইল- এলানিন, মেথিওনিন, থায়ামিন, ট্রিপ্টোফেন, ও ভ্যালিন। শর্করা ও আমিষ ছাড়াও চাল ‘বি’ পরিবারের কয়েকটি ভিটামিন যথা- ‘বি১' (থায়ামিন), বি২ (রিবোফ্লোভিন), নায়াসিন ও ফলিক এসিড এবং লৌহের ভালো উৎস। ধানের বিভিন্ন অংশে উক্ত চারটি ভিটামিন ও লৌহের পরিমাণ দেখানো হলো-
ধানের পুষ্টি অপচয় : যে প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে ধান কলে ছেটে চাল তৈরি ও চাল থেকে ভাত, রান্না করা হয় তাতে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজের প্রায় সবটুকুই নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য আমাদের দেশের লোকজন পুষ্টিহীনতায় ভোগে। ঢেঁকিতে ছাঁটা চাল পুষ্টির দিক দিয়ে উন্নত কিন্তু শ্রমসাধ্য বিধায় কৃষকেরা ধান ঢেঁকিতে না ভেঙে কলে ভাঙাতে ইচ্ছুক। কলে ও ঢেঁকিতে ভাঙানো সিদ্ধ ও আতপ চালে প্রাপ্য তিনটি ভিটামিন ও লৌহের পরিমাণ নিচের সারণীতে দেখানো হলো ।
সারণি : আতপ ও সিদ্ধ ধান থেকে কলে ও ঢেঁকিতে ভাঙানো চালে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান (মিলিগ্রাম ১০০ গ্রামে)
ভাত বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক লোকের প্রধান খাদ্য চাল। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, জাপান, বার্মা, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে প্রচুর ধান উৎপাদন হয়। বাংলাদেশের মানুষ ৫ : ১ অনুপাতে ভাতের সাথে শাকসবজি খায়। আমাদের দেশের মানুষ তার দেহের প্রয়োজনীয় তাপশক্তির শতকরা ৭৫-৮৩ ভাগ পায় শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য থেকে। শ্বেতসার জাতীয় খাদ্যের মধ্যে ৮০ ভাগই হল ধান বা চাল। ধান বা চাল থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য ও শৌখিন জিনিসপত্র তৈরি করা যায়। যেমন-
(ক) মানুষের খাদ্যদ্রব্য
১) ভাত
২) চিড়া
৩) খৈ, খৈ এর মোয়া ও মুড়কি
৪) মোয়া ও মুড়কি
৫) নাডু
৬) জাউ ভাত
৭) পোলাও ও বিরিয়ানি
৮) খিচুড়ি
৯) মুড়ি, মিষ্টিমুড়ি ও ঝালমুড়ি।
১০) ফ্রায়েড রাইস
১১) পায়েস ও ক্ষীর
১২) স্যুপ ও মাড় বা ফেন
১৩) চালের আটা বা গুঁড়ি (রুটি তৈরি ও বিভিন্ন পিঠা ও তৈরির জন্য)
১৪) চালের গুঁড়ি থেকে বড়া, নিমকি ও পাপড়
১৫) ভাতের মাদক
১৬) বেগুনি তৈরিতে চালের আটা
১৭) চিপস তৈরি
১৮) চাল ভেজে ছাতু
১৯) বেকারিতে বিভিন্ন খাদ্যে চালের গুঁড়ি ব্যবহার
২০) ওরসালাইন তৈরিতে
২১) ভাতের পাপড় ইত্যাদি
(খ) পশুপাখির খাদ্য :
১) ধানের কুঁড়া
২) ভাঙা চাল
৩) ধানের খড়
ধান ফসল আবাদের পর কর্তন, সংগ্রহ ও গুদামজাত করা হয়। এ ধান ও চাল অনেকদিন ধরে অর্থাৎ পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত খাওয়া হয়। কোনো কোনো সময় বিশেষ জাতীয় প্রয়োজনে ধান সংরক্ষণ করা হয়। যেমন- প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, খরা ইত্যাদি সময় যাতে খাদ্যাভাব দেখা না যায়।
ধান কর্তনের পরের দিন থেকে এর গুণাগুণ ও পরিমাণ কমতে থাকে। গুদামজাত করার পর থেকে গুদামে দানার ক্ষতি ২-৬ ভাগ পর্যন্ত থেকে পারে। ধান সংরক্ষণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো গুদামজাত অবস্থায় ফসলের গুণাগুণ ও পরিমাণ সঠিকভাবে বজায় রাখা। এছাড়াও অমৌসুমে ধান পাওয়া যায় এবং এর অপচয় কম হয়। গুদামে ধান তিন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত থেকে পারে। যেমন-
ক) যান্ত্রিক কারণ
খ) জৈবিক কারণ
গ) জৈব-রাসায়নিক কারণ
যান্ত্রিক কারণ : ধান কর্তনের ফলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নাড়াচাড়ার ফলে ধানবীজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধান বীজে আর্দ্রতার পরিবর্তন হলে বীজ সংকুচিত হয়ে যায়। এজন্য গুদামঘরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সুষ্ঠুভাবে ধান সংরক্ষণের জন্য বীজে ১২-১৪ ভাগ আর্দ্রতায় আনা হয় ।
জৈবিক কারণ : বিভিন্ন অনুজীব বিশেষ করে ছত্রাক এবং গুদামজাত ক্ষতিকর পোকামাকড় বীজের গুণাগুণ নষ্ট করে। এজন্য গুদামের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অধিকাংশ অনুজীবের ও পোকার বৃদ্ধির জন্য ৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা জরুরি। গুদামের সবচেয়ে ক্ষতিকরক পোকা হচ্ছে বিটল ও মথ। এছাড়া ইঁদুর ও পাখি অনেক সময় গুদামে ঢুকে সংরক্ষিত ধানের ক্ষতি করে।
জৈব রাসায়নিক কারণ : ধানবীজ একটি জীবন্ত শস্যদানা। গুদামের মধ্যেও এর ভ্রূণের শ্বসন ক্রিয়া চলতে থাকে। ফলে জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে তাপ ও জলীয় বাষ্প উৎপন্ন হয়। তাই ধানবীজ নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য এই জলীয় বাষ্প ও তাপ বের করা খুবই প্রয়োজন।
গুদামঘরের প্রকারভেদ : বিভিন্নভাবে ধানবীজ গুদামে সংরক্ষণ করা যায়। এগুলো নিম্নরূপ-
ক) খামারবাড়িতে সংরক্ষণ : খাবার চাহিদা মেটানোর জন্য ধানবীজ বা শস্যদানা খামারের ভিতরেই গুদামে সংরক্ষণ করা হয়। এজন্য যে পাত্র ব্যবহার করা হয় তা হল-চটের বস্তা, কাঠের বাক্স, বাঁশের ঝুড়ি বা ডোল ও ড্রাম।
খ) ফসলের গোলা : দীর্ঘসময় ধরে ধান গুদামজাত করার জন্য ছোট আকারের কাঠামো তৈরি করা হয়। যেমন- কাঠ, বাঁশ, ধাতব শিট বা সিমেন্টের ঢালাই ইত্যাদি দ্বারা নির্মিত গোলা ।
গ) পাকা গুদাম : এ ক্ষেত্রে সাধারণত চালের মিলে এবং সরকারি সংস্থায় পাকা গুদাম ব্যবহার করে গুদামজাত করা হয়। ধানবীজকে বস্তায় ভরে গুদামে সারি করে স্তরে স্তরে সাজানো হয়। গুদামে ধানবীজের বস্তা ভিন্ন সারিতে সাজানো যেতে পারে। ফসলের দানা শস্যের বস্তা সাজানোর পদ্ধতি চিত্রে দেখানো হলো। এ ধরনের গুদামের মেঝে দেয়াল ও ছাদ পাকা করা হয় এবং আর্দ্রতা প্রতিরোধক করা হয়।
ঘ) ঢালাও গুদাম : শস্যদানা গুদামঘরের মেঝেতে স্তূপাকারে রাখা হয়, তবে আলো বাতাস চলাচলের যথাযথ ব্যবস্থা রাখতে হয়। এখানে কোনো বস্তা বা ব্যাগ ব্যবহার করা হয় না।
ঙ) সাইলো : খাদ্য মন্ত্রণালয় দীর্ঘ সময় ধরে ধান বা চাল সংরক্ষণের জন্য যে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত গুদাম তৈরি করে তাকে সাইলো বলে ।
খাদ্যশস্য গুদামে ভালোভাবে সংরক্ষণ করা একটি বড় সমস্যা। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (FAO) এর মতে পৃথিবীতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন শস্য গুদামে নাড়াচূড়ার দরুন নষ্ট হয়। কোনো কোনো দেশে শতকরা ১৫-৩০ ভাগ শস্য গুদামে নষ্ট হয়। উল্লেখ্য যে ৫০ ধরনের পোকা আমাদের দেশে গোলাজাত শস্যের ক্ষতিসাধন করে থাকে। পরিবেশগত দিক থেকে পোকামাকড়ের অবস্থা ও বংশ বিস্তারের জন্য বাংলাদেশ মোটামুটিভাবে উত্তম স্থান। এখানে অনুকূল আবহাওয়ার দরুন পোকামাকড় দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে গুদামজাত শস্য অতি অল্প সময়ের মধ্যে পোকাক্রান্ত হয়। নিম্নে গুদামজাত ধান ফসলের প্রধান প্রধান পোকার পরিচিতি ও ক্ষতির প্রকৃতি বর্ণনা করা হলো-
১. ধানের শুঁড় পোকা : গুদামজাত শস্যেরে কীটপতঙ্গের মধ্যে এটি অন্যতম। ইংরেজিতে এদের রাইস উইভিল বলে। এদের প্রধান খাদ্য ধান। এছাড়াও এরা গম, ভুট্টা প্রভৃতি আক্রমণ করে। এদের মাথার সামনে একটি শক্ত ও লম্বা শুঁড় থাকে। এরা শস্যের মধ্যে গর্ত করে শস্যের শাঁস খেয়ে থাকে। বাংলাদেশে এই পোকা বর্ষাকালে, বিশেষ করে আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত বেশি ক্ষতি করে।
২. কেড়ি পোকা : ইংরেজিতে একে লেসার গ্রেইন বোরার বলে। এ পোকা ধান ও গম ফসলের বেশি ক্ষতি করে এদের চোয়াল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এর সাহায্যে এরা শস্যদানার ভেতরের অংশ কুরে কুরে খায়। খাওয়ার ফলে শস্যদানার ভেতরের অংশ ফাঁপা হয়ে যায় এবং শুধু বাইরের খোসাটি অবশিষ্ট থাকে। একবার শস্যদানার মধ্যে ঢুকলে জীবনের অবশিষ্ট সময় এখানেই কাটিয়ে দেয় ।
৩. লাল শূসরী পোকা : ইংরেজিতে একে গ্রেইন বিটল বলে। এদের শরীরে লাল ও বাদামি রঙের হয়ে থাকে। পূর্ণবয়স্ক পোকা ও কীড়া উভয়ে গুদামজাত শস্যদানা বা প্রস্তুতকৃত খাদ্যদ্রব্য আক্রমণ করে। সাধারণত এরা অক্ষত ও পূর্ণ দানা আক্রমণ করে না। অন্য পোকা খাওয়া দানায় এরা ক্ষতি করে । পোকায় আক্রান্ত ময়দা, সুজি ও আটা একসাথে দলা বেঁধে যায় এবং খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।
৪. খাগড়া বিটল: দামজাত শস্যের জন্য এটি একটি মারাত্মক পোকা। এ পোকা না খেরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। এ পোকা ধান, গম, ভুট্টা, আটা ও ময়দায় আক্রমণ করে। পোকার কীড়া দানার ক্ষতি করে। এরা গুদামজাত শস্যের উপরের স্তরে আক্রমণ শুরু করে এবং কখনও খুব বেশি ভিতরে ঢোকে না।
৫. ধানের সুরুই পোকা : ইংরেজিতে একে রাইস মথ বলে। এ পোকা ধান, পম ভুট্টা ও অন্যান্য শস্যদানা আক্রমণ করে। এ পোকার কীড়া খানের খোসা ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে ভেতরের শাঁস খেয়ে থাকে। আক্রান্ত খানের মধ্যে এরা গোলাকার ছিদ্র করে খার। সাধারণত এরা ধানের উপরের স্তরে বেশি ক্ষতি করে।
৬. চালের সুরুই পোকা : একে রাইস মিল মথ বলে। এরা ধানের সুরুই পোকা থেকে একটু বড়। এ পোকা চালের সবচেরে বেশি ক্ষতি করে। কীড়াগুলো এক প্রকার রেশমি জান তৈরি করে তার নিচে থেকে চালের ক্ষতি করে। আক্রান্ত শস্যদানা দুর্গন্ধ যুক্ত এবং খাওয়া বা বিক্রির অনুপযুক্ত হয়ে যায় এবং বড় বড় জটা সৃষ্টি করে।
৭. সুরুই পোকা : একে ইন্ডিয়ান মিল মথ বলে। এ পোকা বিভিন্ন প্রকার শস্যদানা, খাদ্য বন্ধ, সয়াবিন, শুকনো ফল, বাদাম ইত্যাদি আক্রমণ করে। শস্য দানার উপর এরা রেশমি সুতা দিয়ে একটি জাল তৈরি করে যার সাথে পোকার বিষ্ঠা মিশানো থাকে।
গুদাম শস্যের পোকামাকড় দমনের জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাকে আমরা দুইভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন- ক) প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, খ) প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা :
১. শস্য কাটার পরবর্তী সময়ে শস্যদানাকে বেশি সময় ধরে মাঠে ফেলে রাখা যাবে না।
২. রোদে শুকানোর সময় আশে পাশের গুদাম থেকে পোকা এসে যাতে আক্রমণ করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে ভালোভাবে শস্যদানা শুকাতে হবে।
৩. শস্যদানাকে ভালোভাবে বাছাই করে গোলাজাত করতে হবে।
৪. গুদাম ঘরে যথেষ্ট আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৫. গোলাজাত করার পাত্রগুলোকে উত্তমরূপে শুকিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
৬. সংররক্ষণ পাত্র এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে এদের মুখ খুব ছোট এবং পেট অপেক্ষাকৃত মোটা হয় ।
৭. শস্য ভর্তি করার পর মুখে কিছু বালি, তুষ বা কুঁড়া বা নিম পাতার গুঁড়া দিতে হবে। তারপর মুখ কাঁদা দিয়ে বন্ধ করতে হবে যাতে কোনো ছিদ্র না থাকে ।
৮. শস্য গোলজাত করার সময় বাঁশের নির্মিত গোলা বা ডোলের ভেতর ও বাহিরের অংশ গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে ভালোভাবে প্রলেপ দিতে হয়।
৯. প্রতি কেজি শস্য দানার সাথে ২.৯ গ্রাম হারে নিম. নিশিন্দা বা বিষকাটালী পাতার গুঁড়ো মিশিয়ে সংরক্ষণ করলে পোকার আক্রমণ কম হয় ।
প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা :
১. বাহির থেকে গুদাম ঘরের ভেতরে ঠাণ্ডা বাতাস প্রয়োগ করে পোকামাকড় দমন করা যায় ।
২. গামা রশ্মি প্রয়োগ করে বিকিরণের মাধ্যমে পোকামাকড় দমন করা যায় ।
৩. প্রতি ১০০০ ঘনফুট জায়গায় ফলিথিয়ন (৫০ ইসি) অথবা ডিডিভিপি (১০০) ইত্যাদির ৮৫ গ্রাম কীটনাশক ৪.৫ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায় ।
৪. গুদামজাত প্রতিটন বীজে ২-৪ টি ফসটকসিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা হলে কীটপ্রতঙ্গ মারা যায়।
ধান থেকে উৎপাদিত চাল আমাদের দেশে দুইভাবে ব্যবহার হয়। যথা-
(ক) আতপ চাল : সংগৃহীত ধানকে শুকিয়ে সরাসরি মিলিং করে যে চাল পাওয়া যায় তাকে আতপ চাল বা সান ড্রাইড রাইস (Sundried Rice) বলে।
(খ) সিদ্ধচাল : সংগৃহীত ধানকে সিদ্ধ করা হয়। তারপর শুকিয়ে মিলিং করে যে চাল পাওয়া যায় তাকে সিদ্ধ বা পারবয়েলড রাইস (Parboild rice) বলে।
ধান সিদ্ধ করা একটি প্রাচীন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ধান সিদ্ধ করা প্রথমে শুরু হয়েছিল ভারতে এবং এই উপমহাদশে এখনও ব্যাপকভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিদ্ধ চাল ব্যবহার করা হয়। যেমন- বাংলাদেশ, নেপাল, বার্মা, শ্রীলংকা, মালেশিয়া এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশে। ধারণা করা হয় এই উপমহাদেশে প্রায় অর্ধেক সিদ্ধ চাল খাওয়া হয় যা পৃথিবীর মোট চালের এক-পঞ্চমাংশ। তবে সুগন্ধি চাল সিদ্ধ করা হয় না কারণ তাতে চালের সুগন্ধ অনকেটা চলে যায়।
ধান সিদ্ধকরণের সুবিধা ও অসুবিধা :
সুবিধা :
(১) সিদ্ধ করার ফলে ধানের খোসা ফেটে যায়। ফলে চাল থেকে তুষ বা খোসা সহজে পৃথক করা যায় ।
(২) সিদ্ধ করা ধান ভাঙালে খুদের পরিমাণ কম হয় ।
(৩) সিদ্ধ চালের পুষ্টি উপাদান বেশি হয়।
(৪) সিদ্ধ চালের পোকমাকড় প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি।
(৫) সিদ্ধ চালের কুঁড়ায় তেলের (Rice bran oil) পরিমাণ বেশি হয়।
(৬) সিদ্ধ চালের মাড়ে আতপ চালের মাড় অপেক্ষা কম খাদ্যমান অপচয় হয়।
অসুবিধা :
(১) সিদ্ধ করার ফলে চালের প্রাকৃতিক জারণ প্রতিরোধক বা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তা গুদামজাত অবস্থায় তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়।
(২) সিদ্ধ চাল রান্না করতে বেশি সময় লাগে এবং বেশি জ্বালানি খরচের প্রয়োজন হয়।
(৩) সিদ্ধ ধান বেশি দিন সংরক্ষণ করলে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়।
ধান সিদ্ধকরণ পদ্ধতি :
কৃষকের বাড়িতে হাঁড়ি, পাতিল, ডেগচি, কড়াই বা তাফালে ধান সিদ্ধ করা হয়। ভিজিয়ে রাখা ধান পাত্র থেকে তুলে রাখা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দিতে হয়। পাত্র চুলার উপর রেখে জ্বাল দিতে থাকলে যখন বেশির ভাগ ধান ফেটে যায় তখন উঠিয়ে এনে উঠানে বা চাতালে মেলে রোদে শুকানো হয়। ধান সিদ্ধ করার পদ্ধতি দুই-প্রকার। যথা (১) প্রচলিত পদ্ধতি ও (২) আধুনিক পদ্ধতি।
প্রচলিত পদ্ধতি : আমাদের দেশের প্রয়োজনীয় সিদ্ধ ধানের প্রায় সমস্তটাই প্রচলিত বা দেশীয় পদ্ধতিতে সিদ্ধ করা হয়। এ পদ্ধতি আবার দুই প্রকারের। যথা-
ক) একসিদ্ধ পদ্ধতি : বিভিন্ন পাত্রে ধান ১-৩ দিন পর্যন্ত ভিজানো হয়। তারপর জ্বাল দিয়ে সিদ্ধ করে শুকানো হয়।
খ) দুইসিদ্ধ পদ্ধতি : ধান পানিতে ডুবানোর পূর্বে আংশিক পানিপূর্ণ পাত্রে রেখে তাপ প্রয়োগ করা হয়। তাপের ফলে উৎপন্ন জলীয় বাষ্প ধানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। এ অবস্থায় গরম ধানকে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়। প্রায় ১ দিন পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখার পর ভিজা ধানকে উপরে বর্ণিত একসিদ্ধ পদ্ধতিতে সিদ্ধ করা হয়। দুই সিদ্ধের চাল বেশ শক্ত হয়। উভয় পদ্ধতিতেই ধান সিদ্ধ করার সময় যখন ধানের খোসা ফেটে দুই ভাগ হয়ে যায় তখন ধান সিদ্ধ সম্পন্ন হয়।
আধুনিক পদ্ধতি : আধুনিক পদ্ধতি তিন ধরনের। যথা-
ক) ধান ভিজিয়ে সিদ্ধ করার ধীর পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে পাকা চাতালের বা প্লাটফর্মের (plat from) উপর চোঙ্গাকৃতি এক বা একাধিক ইট বা সিমেন্টের (tank) বা কেটেল এ ধান ভিজানোর হয়। ২৪-৭২ ঘণ্টা ভিজানো ধান এখানে স্থানান্তর করা হয়। এই (tank) বা কেটেল একটি নল দ্বারা বয়লারের সাথে সংযুক্ত থাকে। নলটি ট্যাঙ্কের মাঝামাঝি স্থান দিয়ে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঢুকানো থাকে। বয়লার থেকে পানির বাষ্প সমস্ত ট্যাঙ্কের ধানে ছড়িয়ে পড়ে। বাষ্প নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নলে ভাল্ভ (Valve) লাগানো থাকে। বয়লারের পানি চুলার আগুনে বাষ্পে পরিণত হয়। বাষ্পের তাপে যখন সমস্ত ধান সিদ্ধ হয়ে খোসা ফেটে যায় তখন ট্যাঙ্ক বা কেটেলের নিচের ভালব খুলে সিদ্ধ ধান বের করে আনা হয়। অতঃপর তা শুকানো হয়।
(খ) ভারতীয় পদ্ধতি : এ পদ্ধতি ভারতের কেন্দ্রীয় খাদ্য কারিপরি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (CFTRI) কর্তৃক উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে স্টিলের তৈরি সিদ্ধকরণ ট্যাঙ্ক বা কেটেল ব্যবহার করা হয়। বয়লার থেকে বাম্প ট্যাঙ্কে প্রবেশ করার উপযোগী করে নলগুলো বিন্যস্ত থাকে। ট্যাকের উপরের অংশে পানি প্রবেশের নল থাকে। ট্যাঙ্কের নিচে দুইটি তাতে থাকে, একটি দিয়ে ট্যাঙ্কের পানি নিষ্কাশন করা হয় এবং অন্যটি দিয়ে সিদ্ধ ধান বের করা হয়। ট্যাঙ্কে পানি প্রবেশ করানোর পর বয়লার থেকে বাষ্প প্রবেশ করানো হয়। বাষ্পের তাপে পানির তাপমাত্রা যখন 85°C হয়ে যায় তখন ধানকে উক্ত গরম পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। স্বয়ংক্রিয় কনভেয়ারের সাহায্যে ধানকে সিদ্ধকরণ ট্যাঙ্কে ফেলা হয়। কিছুক্ষণ পর ধান ও পানি মিত্রণের তাপমাত্রা 70°C এ এসে যায় । এই তাপমাত্রা যেন স্থির থাকে সেজন্য ট্যাঙ্কের ভিতর পানি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রবাহিত করা হয়। এ অবস্থায় ৩-৪ ঘন্টা থাকার পর নিচের ভাত দিয়ে গরম পানি সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর ধানের মধ্যে গরম বা প্রবাহিত করে ধানকে সিদ্ধ করা হয়। বাম্পের পানি বের হওয়ার জন্য নিচে ভাত খোলা রাখা হয়। অধিকাংশ ধানের খোসা ফেটে গেলে ধান সিদ্ধ সম্পন্ন হয়।
(গ) প্রেসার পদ্ধতি : এটি ভারতে উদ্ভাবিত আধুনিক পদ্ধতি। এতে খানকে 90°C গরম পানিতে ৪০ মিনিট ডুবিয়ে রাখা হয়। এরপর উক্ত ভেজা ধানে ১৮ মিনিট পরম বাষ্প প্রবাহিত করা হয়। এ পদ্ধতিতে উচ্চ চাপে ধানের মধ্যে বাষ্প প্রবাহিত করা হয়। এতে সিদ্ধ ধানের রং কিছুটা হলুদ হয় এবং ভালা চাল ও খুদের পরিমাণ কম হয়।
সিদ্ধ ধান শুকানো :
সাধারণ বা আতপ ধান শুকানোর মতো সিদ্ধ করা ধান শুকানো যায় না। সিদ্ধ ধান খুব ধীরে শুকালে ক্ষতিকর অনুজীবের আক্রমণে ধান নষ্ট থেকে পারে। পক্ষান্তরে দ্রুত শুকালে চালে ফাটল তৈরি হয় এবং মিলিং-এর সময় ভাঙ্গা চালের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয় ধান সকল দিকে সমভাবে কানো উচিত। সুতরাং সিদ্ধ খান দুই পর্যায়ে শুকাতে হয়। প্রথম পর্যায়ে জলীয় অংশ ১৬% পৌছানোর আগেই শুকানো বন্ধ করে ছারার জমা করে কয়েক ঘন্টা রাখতে হবে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে শুকিয়ে জলীয় অংশ ১৪% বা তার কম করতে হবে । এভাবে শুকানোর মাঝে বিরতি দেওয়াকে টেম্পারিং বলে। রোদে ওকানোর ক্ষেত্রে এক রোদে না শুকিয়ে ২- ৩ দিনের রোদে শুকানো উচিত। প্রথমবার শুকানোর পর রাতের বেলা স্তূপীকৃত করে রাখলে টেম্পারিং-এর কাজ সহজেই হয়ে যায়। শুধু তাই নয় উঠানে ধান ছড়িয়ে দিয়ে ১ ইঞ্চি বা ২.৫ সে.মি. এর বেশি পুরু না করে ঘন ঘন উল্টারে দেওরা উচিত। বিভিন্ন ধরনের ড্রায়ারের মধ্যে অবিরাম প্রবাহলীল ও টেম্পারিং ব্যবস্থাযুক্ত প্রায়ার দ্বারা ধান শুকানো উচিত।
ধান থেকে তুষ ও কুঁড়া সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়াকেই মিলিং বা ধান ভাঙানো বলে। ধান মিলিং দুই ভাবে করা যায়। যথা- (ক) প্রচলিত মিলিং (খ) আধুনিক মিলিং
প্রচলিত সিলিং : প্রচলিত মিলিং বা ধান ভাঙানোতে যে সকল যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয় তা হল (১) গাইল ও সিয়া (২) ঢেঁকি।
আধুনিক মিলিং-এর যন্ত্রপাতিগুলো নিম্নরূপ-
(১) তুষ ছাড়ানো মেশিন (Husker)
(২) মিলিং মেশিন : এটি ভূম ছাড়ানো, কুঁড়া ছাড়ানো ও চাল চকচকেকরণ একত্রে সম্পন্ন করে।
(৩) রাইস মিলিং প্লান্ট : এ প্লান্টে ধান ঝাড়াইকরণ, সিদ্ধকরণ, শুকানো, তুষ ছাড়ানো, কুঁড়া ছাড়ানো, চাল থেকে খুদ ও কুঁড়া পৃথকীকরণ, আকার অনুযায়ী বাছাইকরণ ইত্যাদি সুবিধা সম্বলিত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ধান একসাথে প্রক্রিয়াজাত করা যায়।
তুষ ছাড়ানো মেশিন : এটি দুই ধরনের যথা (ক) মন পদ্ধতি যেমন- ধানকল বা হলার (খ) রোলার পদ্ধতি যেমন- রাবার রোলার হাঙ্কার
রাইস হুলার বা ধান কল : আমাদের দেশে বর্তমানে বহুল প্রচলিত ছোট ছোট ধানকলগুলোতে ঘর্ষণ বা ফ্রিকশান পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ধান ভাঙানো হয়। এতে ভূষ খসানোর সাথে সাথে কুঁড়া ছাড়ানো ও সামান্য পোলিশিং-এর কাজ একই সাথে সম্পন্ন হয়। এসব রাইস হলারগুলো আমাদের দেশে ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় এদেরকে ধান কল বলে। এগুলোর দাম কম, স্থাপনে জায়গা কম লাগে, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খুব সহজ এবং দেশেই তৈরি করা যায়। এগুলোর অসুবিধা হলো ভাঙা চাল ও খুদের পরিমাণ বেশি হয়। তাছাড়া চালের সাথে তুষ, কুঁড়া, খুদ ও ভাঙ্গা চাল একত্রে মিশে যায়।
হাঙ্কার : এই যন্ত্রে একই ব্যাসের দুইটি রাবার রোলার পাশাপাশি সেট করা হয়। রোলার দুইটির একটি বেশি গতিতে অন্যটি ধীর গতিতে ঘুরে। হলার থেকে ধান নিয়ন্ত্রিতভাবে রোলার দুইটির মাঝে পড়ে। মেশিন চালু করলে রোলার দুইটি তিগতি এবং বিপরীত গতিতে ঘুরতে থাকে। ফলে ধানের খোসা বিভক্ত হয়ে চাল বেরিয়ে আসে। এভাবে ধান মিলিং করার সুবিধা হলো এতে খুদের পরিমাণ কম হয় এবং চালের ভ্রূণ বা এপিডার্মিস অক্ষত থাকে। এপিডার্মিসের আবরণ গুদামজাত অবস্থার চালকে নষ্ট হতে দেয় না। এ প্রকার হাক্ষারের দাম বেশি, গঠন জটিল এবং বর্তমানে আমাদের দেশের তৈরি হয় না।
কুঁড়া ছাড়ানো যন্ত্র : ধানের খোসা ছাড়ানোর পর যে চাল পাওয়া যায় তার উপর লালচে বর্ণের কুঁড়ার আবরণ থাকে। এটি পরিপাক ক্রিয়ায় অসুবিধা সৃষ্টি করে। এজন্য চালকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য করার জন্য কুঁড়া ছাড়ানো যন্ত্রের সাহায্যে তা তুলে ফেলতে হয়। এ যন্ত্রটিতে দুইটি প্রধান অংশ থাকে তা হলো ছিদ্রযুক্ত ধাতব সিলিন্ডার অ্যাবাসিত রোলার। এর মাঝে থাকে ফাঁকা স্থান। এই ফাকা স্থানেই ঘৰ্ষণ পদ্ধতিতে মোটর দ্বারা রোলার ঘুরানোর ফলে চালের কুঁড়া আপসারিত হয়ে নিয়ে গঠিত হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনষ্টিটিউট (ব্রি) পাওয়ার উইনোয়ার (শক্তি চালিত কুঁড়া ছাড়ানো যন্ত্র) উদ্ভাবন করেছে যা ০.৫ অন্বশক্তিসম্পন্ন। স্থানীয়ভাবে এটি তৈরি করা যায়। এটি দুই জন শ্রমিক চালিয়ে প্রতি কর্মদিনে ৮০০-১০০০ কেজি চাল পরিষ্কার করতে পারে।
মিলিং মেশিন : ধান থেকে খাদ্য উপযোগী চাল পেতে হলে ধানের খোসা ছাড়ানো, কুঁড়া ছাড়ানো, ঝাড়াই করা, সাদা করা, তুষ ও কুঁড়া আলাদা করা, ভাগ্নে চাল ও ফুল আলাদা করা ইত্যাদি প্ররিালো সম্পন্ন করতে হয়। এ সকল প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করার জন্য হাস্কার, হোয়াইটেনিং মেশিন ও পলিশিং মেশিন ইত্যাদি একত্রে সমন্বিত করে কম জায়গায় ও কম শ্রমিকের যারা সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাকে মিশিং প্রক্রিয়া এবং ব্যবহৃত যন্ত্রাবলিকে একত্রে মিলিং মেশিন বলে। উন্নত দেশের বেশির ভাগ খামারে মিলিং মেশিন দ্বারা। ধান প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করা হয়। মিলিং মেশিনের বিভিন্ন অংশের নাম নিম্নে দেওয়া হলো-
(১) ধান পরিষ্কারক
(২) ধানের খোসা ছাড়ানো যন্ত্র
(৩) ধান আলাদাকারক
(৪) এলিভেটর
(৫) কুঁড়া ছাড়ানো যন্ত্র
(৬) কুঁড়া টানার ফ্যান
(৭) সাইক্লোন
(৮) চালনী
(৯) গ্রেডার ইত্যাদি।
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১. পৃথিবীতে দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য শস্যের না কী?
২. বাংলাদেশে বছরে হেক্টর প্রতি কত ধান এবং চাল উৎপাদন হচ্ছে?
৩. ধান এর সংজ্ঞা লিখ ।
৪. ধান কী জাতীয় ফল?
৫. চালের সংজ্ঞা দাও ।
৬. ধানের কয়টি উপজাত ও কী কী?
৭. বাংলাদেশে উৎপাদিত ধানের উপজাতের নাম কী?
৮. আউশ ধান কখন বোনে ও কখন পাকে?
৯. কোনটি শীতকালীন ধান? এটি কখন বোনে ও কখন পাকে?
১০. ২০১৬ পর্যন্ত ব্ৰি কতগুলো ধানের জাত অবমুক্ত করেছে?
১১. ব্রি ধান-৪২ এবং ৪৩ এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
১২. ব্রি ধান-৫০ এর বৈশিষ্ট্য কী?
১৩. ব্রি ধান-৫৩ ও ৫৪ এর বৈশিষ্ট্য কী?
১৪. জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান কোনটি?
১৫. ধানের বহিরাবরণ ও চালের বহিররাবরণকে কী বলে?
১৬. চালের অ্যালুরেন স্তর কোনটি?
১৭. চালের মোট কত ভাগ শস্য বা Endosperm ?
১৮. 'চালের জৈবিক মান ৬৮' বাক্যটির অর্থ কী?
১৯. চালে ভিটামিন বি পরিবারের কয়টি ভিটামিন থাকে? এগুলো কীকী?
২০. বাংলাদেশের মানুষের ভাত-সবজি খাওয়ার অনুপাত কী?
২১. ধান সংরক্ষনের জন্য ধানে কতভাগ আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন?
২২. ধানের গুদামে সবচেয়ে ক্ষতিকারক পোকা দুইটি কী কী?
২৩. সাইলো বলতে কী বুঝায়?
২৪. 'রাইস উইভিল' কী? কীভাবে ক্ষতি করে?
২৫. কেড়ি পোকাকে ইংরেজিতে কী বলে?
২৬. লাল শূসরী পোকা কীভাবে আক্রমণ করে?
২৭. খাপড়া বিটল কী?
২৮. রাইস মথ, রাইস মিল মথ, ইন্ডিয়ান মিল মথ এদের বাংলানাম কী?
২৯. গুদামে সংরক্ষণ কালে ধানের সাথে কী কী গাছের পাতার গুঁড়া মিশালে ভালো হয়?
৩০. গুদামজাত শস্যদানা রক্ষার জন্য কোন ঔষধ ব্যববহার করা উচিত?
৩১. সুগন্ধিচাল কেন সিদ্ধ করা হয় না?
৩২. সিদ্ধ করা চাল কেন তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়?
৩৩. ধান সিদ্ধ করার আধুনিক পদ্ধতি কয়টি ও কী কী?
৩৪. প্রেসার পদ্ধতিতে ধান সিদ্ধ করার জন্য কত তাপমাত্রায় কতক্ষণ ধান পানিতে রাখতে হয়?
৩৫. টেম্পারিং বলতে কী বুঝায়?
৩৬. মিলিং বলতে কী বুঝায়?
৩৭. ধান মিলিং মেশিনে কী কী অংশ থাকে?
৩৮. পাওয়ার উইনোয়ার বলতে কী বুঝায়?
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১. ধান ও চালের সংজ্ঞা দাও।
২. ধানের তিনটি উপজাতের বর্ণনা দাও।
৩. মৌসুম ভিত্তিক তিন প্রকার ধানের বর্ণনা দাও।
৪. ধান বীজের অংশ কয়টি ও কী কী চিত্র সহ বর্ণনা কর?
৫. চালের অ্যালুরেন স্তরের সুবিধা ও অসুবিধা কী?
৬. কলে ছাঁটা ও ঢেঁকি ছাঁটা চালের পুষ্টিমান বর্ণনা কর।
৭. ধান ও চালের ব্যাবহারের বিধি কী কী?
৮. গুদামে ধান কী কী কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার বর্ণনা দাও।
৯. ধানের প্রধান গোলাজাত পোকা মাকড়ের নাম লেখ।
১০. রাইস উইভিল ও গ্রেইন বিটলের বর্ণনা দাও।
১১. ধানে গুদামজাত পোকামাকড়ের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা লেখ।
১২. আতপ ও সিদ্ধ চাল বলতে কী বুঝায়?
১৩. ধান সিদ্ধকরণের সুবিধা কী কী?
১৪. সিদ্ধ ধান শুকানোর প্রক্রিয়া বর্ণনা কর।
১৫. আধুনিক মিলিং প্রক্রিয়ার ফ্লো চার্টটি লেখ।
১৬. আধুনিক মিলিং যন্ত্রপাতিগুলো কী কী?
১৭. মিলিং মেশিনের বিভিন্ন অংশগুলোর নাম লেখ।
রচনামূলক প্রশ্ন
১. ধান ও চালের বৈশিষ্ট্য, উল্লেখ করে এর উপজাত ও শ্রেণি বিভাগগুলো লিখ।
২. ধানের প্রধান প্রধান ১০টি জাতের বৈশিষ্ট্য লেখ।
৩. ধানবীজের বিভিন্ন অংশের বর্ণনা ও পুষ্টি লেখ।
৪. ধানের পুষ্টি ও পুষ্টির অপচয় বর্ণনা কর।
৫. ধান ও চালের ব্যবহার বিধি উল্লেখ কর।
৬. ধান সংরক্ষণকালীন ধানের ক্ষতির কারনগুলো বর্ণনা কর।
৭. বিভিন্ন প্রকার ধানবীজ গুদামঘরের বর্ণনা দাও।
৮. ধানের গোলজাত পোকামাকড়ের দমন ব্যবস্থার বর্ণনা দাও।
৯. শস্য গুদামজাত পোকামাকড় দমন ব্যবস্থার বর্ণনা দাও।
১০. ধান সিদ্ধকরণের আধুনিক পদ্ধতির বর্ণনা দাও।
১১. ধান সিদ্ধকরণের সুবিধা ও অসুবিধা ও ধান শুকানো বর্ণনা কর।
১২. রাইস হলার ও রাইস হাস্কারের বর্ণনা দাও।
১৩. মিলিং মেশিন কী? কুঁড়া ছাড়ানো যন্ত্র কীভাবে কাজ করে?
আরও দেখুন...