সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড়ো উপায় হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যরক্ষার সকল উপায় অবলম্বন করা। শরীর সুস্থ ও সবল থাকলে শরীরের রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও দৃঢ় থাকে। এতে বাইরে থেকে রোগজীবাণু শরীরে প্রবেশে বাধা পায়। কোনো রোগজীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে পারে না। ফলে রোগজীবাণু আক্রমণ করতে পারে না। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে 'Prevention is better than cure' অর্থাৎ আরোগ্যের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো।
সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন
১। টিকা গ্রহণ: যেসব রোগের জন্য প্রতিরোধমূলক টিকা রয়েছে শিশু ও বয়স্কদের যথাসময়ে সেই টিকা নিতে হবে। যদি কোনো রোগের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে একাধিক বার টিকা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে তাহলে সে ব্যবধান মেনে নিয়মিত টিকা নিতে হবে। ঘরে পোষা পশুপাখি থাকলে তাদেরও নির্দিষ্ট সময়ে টিকা দিতে হবে। আমাদের দেশে যেসব রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে সেগুলো হলো- বসন্ত, টাইফয়েড, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হিমোফাইলাস, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, হাম, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস 'বি', জলবসন্ত, জরায়ু মুখের ক্যান্সার ইত্যাদি।
২। ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা : নিজ শরীর, পোশাক, আসবাবপত্র, রান্নার তৈজসপত্র, বাসন- কোসন, বসবাসের স্থান, বাথরুম, বসতবাড়ির চারপাশ সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
৩। হাত ধোয়ার অভ্যাস করা

- পায়খানা-প্রস্রাবের পর সাবান বা ছাই দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া।
- খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের আগে হাত ধোয়া।
- খাদ্য গ্রহণের আগে ও পরে হাত ধোয়া।
- হাত দিয়ে কোনো কিছু পরিষ্কার করার পর হাত ধোয়া।
- অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া।
- পোষা পশুপাখির সাথে খেলা করা, তাদের ধরা অথবা গোসল করানোর পর ভালোভাবে হাত ধোয়া।
- প্রতিবার বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর হাত ধোয়া।
৪। খাদ্য প্রস্তুত, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবেশনে সতর্কতা
- খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের আগে ও পরে হাত ধোয়া।
- খাবার না খাওয়া পর্যন্ত গরম খাদ্যকে গরম এবং ঠান্ডা খাদ্যকে ঠান্ডা রাখা।
- রান্নাঘরে মাছ-মাংস ও শাক-সবজি কাটার স্থান, তৈজসপত্র ইত্যাদি ব্যবহারের পর গরম পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে রাখা।
- রান্না ও খাওয়ার আগে হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন পরিষ্কার রাখা।
- টাটকা ফল ও সবজি খাওয়ার আগে নিরাপদ পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া।
- শস্য, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম ঠিকমতো সিদ্ধ করে খাওয়া।
- খাওয়া শেষ হওয়ার পরপর উদ্বৃত্ত খাদ্য ভালোভাবে সংরক্ষণ করা।
- খাবার সবসময় ঢেকে রাখা।
৫। সকল বন্য ও গৃহপালিত পশুপাখির বিষয়ে সাবধানতা : যেকোনো প্রাণী কামড়ালে ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে এবং তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে মুরগির খামারে কাজ করার পর বা জীবন্ত মুরগি ধরার পর হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুতে হবে।
৬। কীট-পতঙ্গের কামড় এড়িয়ে চলা: যেখানে মশা বা অন্যান্য কীট-পতঙ্গ খুব বেশি, এমন এলাকায় গেলে বা অবস্থান করলে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। বন-জঙ্গলে গেলে বা ভ্রমণ করার সময় কীট- পতঙ্গের আক্রমণ থেকে সাবধান থাকতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিরোধক মলম ব্যবহার করতে হবে।
৭। জীবাণুমুক্ত নিরাপদ পানি পান ও ব্যবহার করা: পানি অনেক রোগের বাহক। স্বাস্থ্যের জন্য জীবাণুমুক্ত নিরাপদ পানি পান করা দরকার। সাধারণ ব্যবহারের পানি যেমন- গোসল করা ও কাপড় ধোয়ার পানিও পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। তবে এই পানি অবশ্যই জীবাণুমুক্ত হতে হবে। টিউবওয়েলের পানি, ফোটানো পানি বা ফিস্টার করা পানি সাধারণত নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত।

৮। আত্মসচেতনতা সৃষ্টি: রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধের একটি কার্যকর উপায় আত্মসচেতনতা সৃষ্টি।
আত্মসচেতনতার উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- নিজ শরীর সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা।
- নিজ শক্তি-সামর্থ্য এবং দুর্বলতা সম্পর্কে জানা ও সচেতন থাকা।
- শক্তি ও সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং দুর্বলতা দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া।
- নিজ অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন থাকা।
- নিজের অধিকার সম্পর্কে জানা ও সচেতন থাকা।
- নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা এবং এ বিষয়ে সচেতন থাকা।
- নিজের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা, ত্রুটি ইত্যাদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করে এগুলো দূর করতে পারলে কোনো রোগ সহজে আক্রমণ করতে পারে না।
কাজ-১: নিচের ছকে রোগের নাম দেওয়া আছে। রোগের মাধ্যম লিখে ছকটি পূরণ কর।
কাজ-২: হাত ধোয়ার কাজগুলো পোস্টারে লিখে উপস্থাপন কর। (শ্রেণির জন্য) কাজ-৩: ছোট ছোট দলে ভাগ করে প্রত্যেক দলে ৩টি করে আত্মসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়গুলো লিখ এবং উপস্থাপন কর। (দলগত কাজ) |
Read more