মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য (তৃতীয় অধ্যায়)

পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র - পৌরনীতি ও সুশাসন - এইচএসসি | NCTB BOOK

2.5k

(Values, Law, Liberty & Equality)

পৌরনীতি ও সুশাসন অধ্যয়নে মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। আধুনিক সমাজে নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুচারুরূপে পালন করার জন্য এ বিষয়গুলোর ধারণা থাকা উচিত। সমাজে বসবাস করতে গেলে অনেক ধরনের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। তাদের মধ্যে কিছু নিয়ম-কানুন মানুষ বিবেকবোধ থেকে মেনে চলে। আবার কতগুলো নিয়ম-কানুন মানুষ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মান্য করে। অর্থাৎ মানুষ নিজের যা খুশি তা করতে পারে না। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সমাজে ও রাষ্ট্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। সকল নাগরিকগণ যার-যার যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাদের মাঝে একটি সাম্যের ভাব বহাল থাকে। যদি কেউই নিয়মকানুন না মানে, যার যা খুশি তাই করে, তাহলে সকলেরই অসুবিধা হয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্র বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যায়। মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্যের মতো বিষয়গুলো অনুশীলন করে মানুষ তার মানবিক গুনাবলি বিকাশ ঘটানোর সর্বোত্তম সুযোগ পায়। এ ইউনেটে এ বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটির আলোকে প্রশ্নের উত্তর দাও :
অনুচ্ছেদটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও :
উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও :

সরকার করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাকে বাধ্যতামূলক করেছেন। মোটর ড্রাইভাব মফিজ মাস্ক ছাড়া যাত্রী পরিবহণ করায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে সোপর্দ করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত বাদুর আইন অমান্য করায় মফিজকে শাস্তি প্রদান করেন।

Please, contribute by adding content to মূল্যবোধ.
Content
Please, contribute by adding content to মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য.
Content
Please, contribute by adding content to মূল্যবোধের ভিত্তি বা উপাদান.
Content
Please, contribute by adding content to মূল্যবোধের শ্রেণিবিভাগ.
Content
Please, contribute by adding content to মূল্যবোধ ও সুশাসন.
Content
Please, contribute by adding content to গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ.
Content
Please, contribute by adding content to গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্ব.
Content
Please, contribute by adding content to সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ.
Content
Please, contribute by adding content to আইনের ধারণা ও সংজ্ঞা.
Content
Please, contribute by adding content to আইনের উৎস.
Content
Please, contribute by adding content to আইনের শ্রেণিবিভাগ.
Content
Please, contribute by adding content to আইন মানা করার কারণ.
Content
Please, contribute by adding content to নৈতিকতা.
Content
Please, contribute by adding content to আইন ও নৈতিকতা.
Content
Please, contribute by adding content to স্বাধীনতার সংজ্ঞা.
Content
Please, contribute by adding content to স্বাধীনতার বিভিন্ন রূপ.
Content
Please, contribute by adding content to স্বাধীনতার রক্ষাকবচ.
Content
Please, contribute by adding content to আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক.
Content
Please, contribute by adding content to সাম্যের সংজ্ঞা ও অর্থ.
Content
Please, contribute by adding content to সাম্যের বিভিন্ন রূপ বা শ্রেণিবিভাগ.
Content
Please, contribute by adding content to স্বাধীনতায় সাম্যের গুরুত্ব.
Content

(Concept and Nature of Values)

মূল্যবোধের ধারণা ও বৈশিষ্ট্য

মূল্যবোধ একটি মানবিক গুনাবলী। এটি একজন মানুষের নীতি-নৈতিকতা ও বিবেকের উপর নির্ভরশীল। মূল্যবোধ সামাজিক আচার-ব্যবহার, সংস্কৃতি চর্চা ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়। এটি অর্জনেরবিষয়, আরোপিত নয়। মূল্যবোধ এর নির্দিষ্ট কোন মাপকাঠি বা যৌক্তিকতা প্রমাণের সুযোগ নেই। কেননা একজনের কাছে যা আর্দশ, তা অন্য জনের কাছে বিরক্তির কারণও হতে পারে। তবে অনেকের মতে মানবিক গুনাবলী এবং সঠিক বিবেক-বুদ্ধির বহিঃপ্রকাশই মূল্যবোধ। বিভিন্ন পন্ডিত মূল্যবোধকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানী এইচ এম জনসন (H.M. Johnson) এর মতে "সামাজিক মূল্যবোধ হল একটি মানদন্ড”।
ক্লাইড ক্লুখোন (Clyde Kluokhon) বলেন "সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সেসব প্রকাশ্য ও অনুমেয় আচার-আচরণের ধারা যা ব্যক্তি ও সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বলে স্বীকৃত”।
সমাজবিজ্ঞানী এফ ই মেরিল (F. E. Meril) বলেন "সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে বিশ্বাসের এক প্রকৃতি বা ধরণ, যা গোষ্ঠীগত কল্যাণে সংরক্ষণ করাকে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
অতএব, সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সেসব ধারণার চূড়ান্ত ব্যাপ্তি যা মানুষ হিসেবে একজন ব্যক্তির জীবনে একান্ত কাম্য। সমাজের এসব মূল্যবোধ মানুষের জীবনের জন্য লক্ষ্য ও প্রাপ্তি স্থির করতে সাহায্য করে।

মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য

১। নৈতিক প্রাধান্য: মূল্যবোধ বিষয়টি নৈতিকতার উপর নির্ভরশীল। নীতি-নৈতিকতাহীন ব্যক্তি সাধারণত মূল্যবোধসম্পন্ন হয় না।
২। নির্দিষ্টতা: যেমন, মায়ের প্রতি কারো সম্মান। আবার তা সাধারণও হতে পারে। যেমন, যে প্রতিবেশীকে ভালবাসে আসলে সে নিজেকেই ভালবাসে।
৩। বিভিন্নতা: সংস্কৃতি ভেদে মূল্যবোধ ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক থেকে শুরু করে নানা দিক থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতির মূল্যবোধের সাথে বাঙালি সংস্কৃতির মূল্যবোধের পার্থক্য আছে।
৪। আপেক্ষিকতা: মূল্যবোধ একটি আপেক্ষিক বিষয়। একই মূল্যবোধ ভিন্ন-ভিন্ন দেশে বা সংস্কৃতিতে নানারকম হতে পারে। অর্থাৎ স্থান, কাল, পাত্রভেদে মূল্যবোধের মাত্রা কম বা বেশি দেখা যায়।
৪। সামাজিক মানদন্ড: বিদ্যমান মূল্যবোধ দিয়ে একটি সমাজের বা রাষ্ট্রের পরিবেশ, সংস্কৃতি, চিন্তা-ভাবনার মূল্যায়ন করা যায়। যেমন, কৃষি প্রধান সমাজের মূল্যবোধ একরকম, আবার শিল্পসমৃদ্ধ সমাজের মূল্যবোধ অন্যরকম।
৫। পরিবর্তনশীলতা: মূল্যবোধ যেহেতু চর্চার বিষয় এবং অভ্যাসের দ্বারা গড়ে উঠে, তাই ভিন্ন সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে একজন ব্যক্তির পুরনো মূল্যবোধে পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন, একজন বাঙালি দীর্ঘ দিন পশ্চিমা কোন সংস্কৃতিতে বসবাস করলে তার আচারণ-আচরণে চিন্তায় নানান পরিবর্তন ঘটতে পারে।
৬। সম্পর্কের সেতু: অপরিচিত ব্যক্তিরা অনেক সময় একই মূল্যবোধের হলে, তাদের মাঝেও একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। যেমন কোন বাংলাদেশি নাগরিক লন্ডনে আরেকজন অপরিচিত বাংলাদেশী নাগরিককের সাথে দেখা হলে সহজেই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে।

মূল্যবোধের উপাদান

মূল্যবোধ একটি অর্জিত বিষয়, যা কোন সমাজে দীর্ঘ সময় বসবাসের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তির মাঝে গড়ে ওঠে। এক জন ব্যক্তির মূল্যবোধ কেমন হবে তা সমাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা সমাজের বিভিন্ন উপাদানের উপর নির্ভর করে। এই অবস্থাগুলোই হল মূল্যবোধের ভিত্তি বা উপাদান। নিম্নে এরকম কয়েকটি উপাদান আলোচনা করা হল-
ক. নীতিবোধ: নৈতিকতা মূল্যবোধের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য যা নীতিবোধ থেকে সৃষ্টি হয়। কোন কাজ করতে গেলে নিজের বিবেক, নীতি ও যুক্তি প্রয়োগ করে তা করা উচিত। যৌক্তিকতা সাধারণত নীতিবোধের উপর নির্ভরশীল। কেননা নৈতিক কাজ যুক্তি বিরুদ্ধ হতে পারে না। তাই যে যত বেশি নীতিবান হবে তার মূল্যবোধ তত পরিশীলিত হবে।
খ . শৃঙ্খলা: শৃঙ্খলা মূল্যবোধের অপরিহার্য উপাদান। শৃঙ্খলা অনুসরণ করলে উচ্চ মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়।
গ. সহমর্মিতা: মূল্যবোধ ও সহমর্মিতা নিবিড়ভাবে জড়িত। সহমর্মিতা না থাকলে কেউ সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন হতে পারে না।
ঘ. সৌজন্যবোধ: ব্যক্তির আচার-আচরণের মধ্য দিয়েই তার মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সৌজন্যবোধ তার একটি অংশ। আচার-ব্যবহার সৌজন্য, শালীনতা মূল্যবোধ থেকে সৃষ্টি হয়।

চ. মানবিকতা: মানবিকতা মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ। মানবিকতা না থাকলে তাকে মানুষ বলা যায় না; মূল্যবোধসম্পন্ন বলার তো প্রশ্নই আসে না। অর্থাৎ মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তি অবশ্যই মানবিক গুনাবলির অধিকারী হবে।
ছ. শ্রমের মর্যাদা: শ্রমের মর্যাদা দেওয়া প্রত্যেকের কর্তব্য। এটি অনুশীলনের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। এর মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি অন্য একজন ব্যক্তিকে সম্মান করতে শিখে।

সার-সংক্ষেপ

মূল্যবোধ একটি মানবিক গুনাবলী। এটি একজন মানুষের নীতি-নৈতিকতা ও বিবেকের উপর নির্ভরশীল, যা সামাজিক আচার-ব্যবহার, সংস্কৃতি চর্চা ও পরিমন্ডলে বসবাসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়। মূল্যবোধ বিষয়টি আপেক্ষিক। এটি সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত, পরিবর্তিত ও নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। নীতিবোধ, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, সহমর্মিতা, সৌজন্যবোধ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাসহ এর অনেকগুলো উপাদান রয়েছে। সুন্দর ও আর্দশ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক অপরিহার্য।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Concepts and Importance of Democratic Values)

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারণা

বিভিন্ন ধরনের মূল্যবোধের মাঝে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অন্যতম। নৈতিকতা, সহমর্মিতা, আত্মসংযম, পরমত সহিষ্ণুতা এর মতো গুনাবলিগুলো মানুষকে গণতান্ত্রিক আচরণ করতে শেখায়। একটি রাষ্ট্র কেবল গণতন্ত্র ঘোষণা করলেই হবে না, তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য জনগণের মাঝে গণতান্ত্রিক চেতনা, সংকল্প ও উদ্দেশ্য তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থাকতে হবে। সমাজের কথা, প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধা, অন্যের অধিকার সম্পর্কে চিন্তা করা মূল্যবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ যা আবার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরই প্রতিফলন। মূলত উদারতাবাদ নামক মতবাদ থেকেই এর উৎপত্তি। অধ্যাপক জর্জ এইচ সেবাইন উদারতাবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন "ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা এবং সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার তত্ত্ব ও অনুশীলন হচ্ছে উদারতাবাদ। মানুষের মানবিক ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সহজাত যুক্তিবোধ ও গুণ, এবং পারস্পরিক সম্মতিসহ এমন আরো কয়েকটি গুণের চর্চাই হল উদারতাবাদ, যার সবকটিই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। গণতন্ত্র ব্যর্থ হবার পেছনে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবকেই দায়ী করা হয়।"

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্ব

সমাজে বসবাসের জন্য মূল্যবোধ অপরিহার্য। একে অপরের সাথে আন্ত:সম্পর্কের মূল ভিত্তিই হল এই মূল্যবোধ। মূল্যবোধহীন ব্যক্তি সমাজের জন্য বিপদস্বরূপ। অন্যদিকে গণতন্ত্রের মূল কাজ হল ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা। একজনের অধিকার ও স্বাধীনতা অন্যের উপর নির্ভরশীল, যা বজায় রাখার জন্য পারস্পরিক মূল্যবোধ প্রয়োজন। অপরের বক্তব্য ও অধিকারকে সম্মান দেখানোর অর্থই হল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। একটি সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যক্তির অধিকার, মর্যাদা, সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত হয়। ব্যক্তি অন্যের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ, সহমর্মী ও সংযত হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক সমাজের সৃষ্টি হয়। বর্তমান সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে হানাহানি, প্রতিহিংসা ও সংঘাত লেগেই থাকে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময়ের সামষ্টিক উদ্যোগের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হল-

মূল্যবোধ মানুষকে সহনশীলতার শিক্ষা দিয়ে থাকে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যা অপরিহার্য। অন্যের মতামত বিশেষ করে বিরুদ্ধ মত সহ্য করা ও বিবেচনা করা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত করে। এহেন মূল্যবোধ সম্পন্ন নাগরিক সৃষ্টি হলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে নাগরিকেরা নিজ-নিজ অধিকার ভোগ ও কর্তব্য সম্পাদনে তৎপর হয়।
সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। এ মূল্যবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি সমান দৃষ্টি দিয়ে থাকে। এর ফলে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যমতে পৌছানো জরুরি, যা কেবল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার মধ্য দিয়েই সম্ভব।
সরকারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যসম্পাদনকারী ব্যক্তিবর্গের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত ব্যক্তি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ থেকে বিরত থাকে।

সার-সংক্ষেপ

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিকের গুরুত্ব অপরিসীম। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নাগরিকদের মাঝে অবশ্যই গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটতে হবে। বাক-স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সহমর্মিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মতো গুনাবলিও নাগরিকদের অবশ্যই থাকতে হবে। তবেই গণতন্ত্র স্থায়ী হওয়া সম্ভব।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Democratic Values for Good Governance)

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ

সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। একটি সমাজে যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কর্তব্যপরায়ণতার মতো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো নিশ্চিত হয় তখনই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরমত সহিষ্ণুতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, অন্যের মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোও সুশাসনের জন্য আবশ্যক। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল:-

পরমত সহিষ্ণুতা: গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের একটি ভিত্তি হল পরমত সহিষ্ণুতা। নানা মত, নানা চিন্তায় বিভক্ত রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তিগুলো যদি পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং অপর পক্ষের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় সম্মত থাকে, তাহলে একটি রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
স্বচ্ছতা: রাষ্ট্রীয়, সরকারি কিংবা প্রশাসনিক কর্মকান্ডের স্বচ্ছতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ। এই মূল্যবোধের চর্চা সাধারণ জনগণের মধ্যে শাসনকারী কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে আস্থার জন্ম দেয়, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি।
আইনের শাসন: সমাজের প্রয়োজনেই আইনের সৃষ্টি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেই সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব যা কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মাধ্যমেই তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ না থাকলে আইনের কোন মূল্যায়ন থাকে না। সেক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ন্যায়পরায়ণতা: গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসসম্পন্ন ব্যক্তি সাধারণত ন্যায়পরায়ণ হয়। সমাজে এমন নাগরিকের সংখ্যা বেশি হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত হয়। তাই একটি সমাজে বা রাষ্ট্রে ন্যায়পরায়ণতার বোধ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
সচেতনাবোধ সৃষ্টি: সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সচেতন নাগরিক একান্ত কাম্য। মানবিক গুনাবলী ও মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিরাই সচেতন হয়ে থাকে। ফলে সরকার ও প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়াও কেবলমাত্র সচেতন ব্যক্তিরাই সুশাসন বিরোধী কর্মকান্ডের বিরোধীতা করতে পারে।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সবসময় নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে। ফলে এ ধরনের নাগরিকদের মাঝে সহজেই দেশ প্রেমের সৃষ্টি হয়।
দায়বদ্ধতা: নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের যেমন দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকেরও দায়বদ্ধতা আছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কেবলমাত্র অধিকার ভোগ করে না বরং রাষ্ট্রের প্রতি তার যে দায়িত্ব সেগুলোও ভালোভাবে পালন করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয় পক্ষের দায়বদ্ধতা কাম্য।

সার-সংক্ষেপ

সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সুশাসন হল আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রীয় পরিসরে একটি সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা। সুশাসন প্রতিষ্ঠা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এটি প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অপরিহার্য। কেননা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পরমত সহিষ্ণুতা, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সচেতনতা জাগিয়ে তোলে। এভাবেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায় ও স্থায়ী হয়।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Concept and Classification of Law)

আইন
সৃষ্টির আদি কাল থেকেই মানুষ কোন না কোন নিয়ম-কানুন বা প্রথা মেনে আসছে। এই নিয়মকানুন যখন সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বীকৃতি পায় তা আইন হিসেবে গন্য হয়। আইন মানব সমাজের দর্পণস্বরূপ। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে একসাথে বসবাস করার জন্য নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা অপরিহার্য। মানব কল্যাণের স্বার্থেই নিয়ম-কানুন প্রয়োজন। স্বীকৃত এই নিয়ম-কানুনই হল আইন। আইন হল ফার্সী শব্দ যার অর্থ সুনির্দিষ্ট নীতি বা নিয়ম। আইন এর ইংরেজি প্রতিশব্দ "Law"। Law শব্দের অর্থ স্থির বা অপরিবর্তনীয় এবং সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। বিশেষজ্ঞগণ বিভিন্নভাবে আইনের সংজ্ঞা দিয়েছেন। এরিস্টটল বলেন, "সমাজের যুক্তিসিদ্ধ ইচ্ছার অভিব্যক্তিই হচ্ছে আইন"।
The Dictionary of the History of Ideas (1973) এ আইনকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, "আইন হচ্ছে মানুষের আচরণকে পরিচালিত করার সবচেয়ে স্পষ্ট, প্রাতিষ্ঠানিক এবং জটিল মাধ্যম"।
অধ্যাপক হল্যান্ড এর মতে আইন হচ্ছে, "সেই সাধারণ নিয়ম যা মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যা প্রয়োগ করেন।"
জন অস্টিন বলেন, "আইন হল সার্বভৌম শাসকের আদেশ"।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আইন হল মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণে মানুষের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র যে সকল বিধিনিষেধ প্রণয়ন করে সাধারণভাবে সেগুলোকেই আইন বলা হয়।

আইনের বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি
আইন সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণের মতামত থেকে আইনের কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
(১) সার্বভৌম ক্ষমতা কর্তৃক অনুমোদিত
(২) সর্বজনীন
(৩) বিধিবদ্ধ নিয়মাবলি
(৪) বাহ্যিক আচরণের নিয়ন্ত্রক
(৫) ব্যক্তিস্বাধীনতার রক্ষক
(৬) সুস্পষ্ট
(৭) গতিশীল
(৮) দেশকাল ভেদে পরিবর্তনশীল

আইনের প্রকারভেদ
আইনের প্রয়োগ ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের উপর ভিত্তি করে আইনকে প্রধানত তিনভাগে ভাগ করা যায়ঃ (১) সরকারি আইন (২) বেসরকারি আইন (৩) আন্তর্জাতিক আইন
(১) সরকারি আইন
সরকার কর্তৃক প্রণীত ও বলবৎকৃত নিয়মকানুনই হল সরকারি আইন। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে নানা ধরনের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হয়। সরকারি আইন সাধারণত জাতীয় সংসদ বা পার্লামেন্টে প্রণীত হয়ে থাকে। পার্লামেন্টে আইন প্রণীত হবার কয়েকটি পর্যায় থাকে। সকল পর্যায়েই সাধারণত সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যগণের সম্মতির প্রয়োজন পড়ে। সরকারি আইন আবার কয়েক প্রকার। যেমন-

ফৌজদারি আইন: ব্যক্তির বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্র মূলত এ আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে থাকে। সমাজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, শান্তি বজায় রাখা এবং ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে দন্ড দেয়ার জন্য ফৌজদারি আইন প্রয়োগ করা হয়।
প্রশাসনিক আইন: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জনগণকে সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনের মানের উপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ।
সাংবিধানিক আইন: রাষ্ট্রের ভিত্তি হল সংবিধান। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। অন্য যেকোন আইন এ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তা বাতিল হয়ে যায়। এ আইন দ্বারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা, বন্টন ও প্রয়োগকারী নির্ধারণ করা হয়।
২. বেসরকারি আইন
এ আইন রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণীত নয় তবে সামাজিকভাবে স্বীকৃত হয়। এ আইন দ্বারা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক রক্ষা এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়। যেমন, কোন সংঘের আইন, চুক্তি ও দলিল সংক্রান্ত আইন।
৩. আন্তর্জাতিক আইন
আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ ও বজায় রাখার জন্য যে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা হয় তাকে আন্তর্জাতিক আইন বলে। আন্তর্জাতিক আইনকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- শান্তিকালীন আইন, যুদ্ধসংক্রান্ত আইন এবং নিরপেক্ষতার আইন। এক রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক, রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধান, আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মত বিষয়গুলি আন্তর্জাতিক আইনের অন্তর্ভুক্ত।

সার-সংক্ষেপ

আইন মানব সমাজের দর্পণস্বরূপ। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে একসাথে বসবাস করার জন্য নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা অপরিহার্য। আইন সার্বভৌম ক্ষমতা কর্তৃক অনুমোদিত, সর্বজনীন, বিধিবদ্ধ, বাহ্যিক আচরণের নিয়ন্ত্রক, ব্যক্তিস্বাধীনতার রক্ষক, সুস্পষ্ট, গতিশীল এবং দেশকাল ভেদে পরিবর্তনশীল। সরকারি আইন, প্রশাসনিক, সাংবিধানিক, দেওয়ানি ও ফৌজদারি, বেসরকারি আইন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনসহ বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে। রাষ্ট্র বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে থাকে।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Rule of Law)

নাগরিক জীবনে আইনের শাসন

আইনের শাসনের মূল কথা হল আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সকলের জন্য আইন একইভাবে প্রযোজ্য হবে। একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য আইনের শাসন অপরিহার্য। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইনের শাসন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আইনের শাসনের একটি অর্থ হচ্ছে নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ থেকে অন্যায়, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য দূর হয়। ফলে সমাজে স্থিতিশীলতা আসে। আইনের শাসন না থাকলে সবল-দুর্বল, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান প্রকট হতে থাকে। আইনের শাসনের অভাবে রাজনৈতিক কারণে বিচার ব্যবস্থাও প্রভাবিত হয়।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার উপায়সমূহ নিম্নরূপ:

আইন মান্য করা: রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। পৃথিবীর প্রত্যেক সভ্য জাতিই আইন মেনে চলে। আইন মেনে চলা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন উন্নত জাতিরই বহিঃপ্রকাশ।

যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরাধীর সার্বিক অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে যে আইনটি তার জন্য প্রযোজ্য তাই প্রয়োগ করা উচিত। আইন প্রয়োগে আবেগের কোন স্থান দেয়া উচিত নয়।

যুক্তিসংগত ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন: সেকেলে আইন সংস্কার করা এবং বাস্তবসম্মত ও সুদূরপ্রসারী আইন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উনবিংশ শতাব্দীর সকল আইন একবিংশ শতাব্দীতে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাই নিয়মিতভাবে আইনের সংস্কার জরুরি।

বিদ্যমান আইন সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করা: সচেতন নাগরিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত। আইন সম্পর্কে নাগরিকগণ যদি সচেতন হয় তাহলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসে এবং রাষ্ট্রে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। তাই রাষ্ট্রে বিদ্যমান আইন এবং নতুন প্রণিতব্য আইন সম্পর্কে নাগরিকদেরকে সচেতন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

যথাসময়ে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা: ইংরেজিতে বলা হয় Justice delayed, justice denied. অর্থাৎ, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার না হওয়া। যখন যে অপরাধ সংঘটিত তখনই তার বিচার করাই উত্তম। কখনো-কখনো দেখা যায় যে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুবাদে অপরাধকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থেকে রেহাই পেয়ে যায়। তাই আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য যথাসময়ে বিচারকার্য সম্পাদন করা একান্ত প্রয়োজন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক কর্তব্য

আইন রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলেও, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাই নাগরিকগণ যদি বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজের বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে কাজ করে তবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যেমন, রাস্তায় কোন চুরি-ছিনতাই হতে দেখলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদি তার কাছে কোন তথ্য জানতে চায় তবে তা জানিয়ে দেয়াটা নাগরিক কর্তব্য। প্রত্যেক নাগরিকের মাঝে এ বোধ আসতে হবে যে, আইনের শাসনের মাধ্যমেই তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।

আইন মান্য করার কারণ

আইনের শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হল আইন মান্য করা। আইনের যথাযথ প্রয়োগ যেমন জরুরি তেমনি আইন মান্য করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক আইনেই কিছু নির্দেশনা এবং তা অমান্য করলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকে। তারপরও দেখা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ হয়। উন্নত দেশগুলোতে অধিকাংশ জনগণই আইন মেনে চলে এবং আইনকে শ্রদ্ধা করে। আইন মান্য করার অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে একটি হল আইনের উপযোগিতা। জনগণ এটি বুঝতে পারে যে, আইন অধিকার রক্ষা করে, দুর্বলকে সবলের অত্যাচার থেকে রক্ষা করে এবং সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা করে। লর্ড ব্রাইস আইন মান্য করার কারণগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেনঃ (ক) যৌক্তিকতার উপলব্ধি (খ) অপরের প্রতি শ্রদ্ধা (গ) নির্লিপ্ততা (ঘ) সহানুভূতি (ঙ) শাস্তির ভয়

সার-সংক্ষেপ
রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আইনের শাসনের অর্থ হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতা অর্থাৎ সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক ও রাষ্ট্র উভয়েরই দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। নাগরিক আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে। রাষ্ট্র যথাযথ আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করবে, সময়মতো বিচার করবে এবং সময়ে-সময়ে আইন সংস্কার করবে।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Relations between Civics and Good Governance and Sociology)

স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার বিভিন্ন রূপ

'স্বাধীনতা' নামক প্রত্যয়টি পৌরনীতি ও সুশাসন এর আলোচনায় খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্রে একজন নাগরিকের অস্তিত্ব বিভিন্ন বিষয়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা থেকেই প্রকাশ পায়। স্বাধীনতা শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল 'Liberty'। স্বাধীনতাকে শাব্দিক অর্থে বলা যায় নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করা। কিন্তু একজনের স্বাধীনতার সাথে অন্যের স্বাধীনতা ভোগের বিষয় যেহেতু জড়িত তাই পৌরনীতিতে স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই করা নয়। স্বাধীনতা মানে যৌক্তিক ও আইনসিদ্ধভাবে কোন কিছু করাকেই বুঝায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকগণ নানা ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। যেমন- চলাফেরার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম সংক্রান্ত স্বাধীনতা। জাতীয় স্বাধীনতা আবার একটু ভিন্ন। এটি অর্জন করা কঠিন। সাধারণত স্বাধীনতার আন্দোলন বা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের মাধ্যমে একটি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে। নাগরিক বা জাতি সে যা-ই হোক না কেন, এদের স্বাভাবিক অস্তিত্বের জন্য স্বাধীনতা অপরিহার্য। তাই দেখা যায় পৃথিবীর

অধিকাংশ দেশের সংবিধানেই নাগরিকদের স্বাধীনতা ভোগের বিষয়ে নানান ধরনের ধারা সংযুক্ত থাকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এইচ জে লাস্কি (H.J.Laski) বলেছেন "স্বাধীনতা হল অধিকারের ফল"
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টি এইচ গ্রিন (T.H. Green) বলেন, "যা উপভোগ করার এবং সম্পন্ন করার যোগ্য তা উপভোগ ও সম্পাদন
করার ক্ষমতাকে স্বাধীনতা বলে"।
প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বাধীনতা ভোগ করতে চায়। স্বাধীনতা হচ্ছে ব্যক্তির অধিকার। জীবনের সুকুমার বৃত্তিগুলোর বিকাশের জন্য এটি অপরিহার্য। আদর্শ নাগরিক সৃষ্টিতে স্বাধীনতা ভোগের বিকল্প নেই। স্বাধীনতার বিপরীত হল পরাধীনতা বা স্বাধীনতাহীনতা। স্বাধীনতাহীনতায় কেউ বাঁচতে চায় না। পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য অনেক জাতি যুগের পর যুগ সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আবার আত্মপরিচয়ের এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য নাগরিকদের স্বাধীনতা প্রদান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা:
স্বাধীনতাহীনতায় মানুষ দাসে পরিণত হয়। সকল মৌলিক অধিকার যেমন প্রয়োজন স্বাধীনতাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকগণ স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন করতে পারলে রাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পরাধীনতায় ব্যক্তি নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পায় না, ফলে তার স্বাভাবিকতা বিঘ্নিত হয়। স্বাধীনতা চর্চার মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি বা একটি জাতি তার সম্ভাবনার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পায়।

স্বাধীনতার বিভিন্ন রূপ

একটি রাষ্ট্রে নাগরিকগণ বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করে। স্থান, কাল, পাত্রভেদে এটি আবার ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন-(১) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (২) সামাজিক স্বাধীনতা (৩) রাজনৈতিক স্বাধীনতা (৪) অর্থনৈতিক স্বাধীনতা (৫) জাতীয় স্বাধীনতা ও (৬) পৌর স্বাধীনতা
১. ব্যক্তিগত স্বাধীনতা
এই স্বাধীনতা একান্তই ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভোগে অন্যের উপর কোন প্রভাব পড়ে না। যেমন, ধর্ম সংক্রান্ত স্বাধীনতা কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা।

২. সামাজিক স্বাধীনতা
মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য সামাজিক স্বাধীনতা অপরিহার্য। যেমন, জীবন ধারণ, সম্পত্তি ভোগ কিংবা সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা। সামাজিক স্বাধীনতা মানুষকে সুন্দর জীবনের পথ দেখায়। তার মনের সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটায়।
৩. রাজনৈতিক স্বাধীনতা
ভোটার হবার স্বাধীনতা, ভোটদানের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক স্বাধীনতার অন্তর্গত। ন্যায়সঙ্গতভাবে একজন নাগরিক সব ধরনের স্বাধীনতা ভোগের অধিকার রাখে। নেতৃত্বের বিকাশের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকা উচিত। একনায়কতান্ত্রিক, সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় নাগরিকগণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়।
৪. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা
এ ধরনের স্বাধীনতার মধ্যে পেশা বাছাই ও জীবিকার স্বাধীনতা অন্যতম। মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিকল্প নেই। তাছাড়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে শ্রেণি-বৈষম্য বেড়ে গিয়ে যেকোন শ্রেণি শোষণ-বঞ্চনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার আইনগত ভিত্তি রয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে অন্যান্য স্বাধীনতাও খর্ব হয়।
৫. জাতীয় স্বাধীনতা
বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে জাতি রাষ্ট্র। অর্থাৎ তারা স্বাধীন জাতি হিসেবে রাষ্ট্র গঠন করেছে। একটি জাতির নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাই হল জাতীয় স্বাধীনতা। জাতি হিসেবে স্বাধীন থাকা যেমন গর্বের, তেমনি তা অর্জন করাও কষ্টসাধ্য। স্বাধীনতা অর্জনের পথে অনেক জাতিকে বিপুল আত্মদান করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে।
৬. পৌর স্বাধীনতা
জীবনের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, ধর্ম সংক্রান্ত অধিকারগুলো পৌর স্বাধীনতার অন্তর্গত। ব্যক্তিজীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ ও সমাজে সুখ-শান্তি নিশ্চিতকরণে এই সব স্বাধীনতা অপরিহার্য।
স্বাধীনতা নাগরিকের অধিকারস্বরূপ। ফলে এই স্বাধীনতা ভোগের জন্য কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা জরুরি। রাষ্ট্র যাতে নাগরিকের এই সব স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে সে ব্যাপারে নাগরিকদের সবসময় সচেতন থাকতে হবে।

সার-সংক্ষেপ
স্বাধীনতা মানে যৌক্তিক ও আইনসিদ্ধভাবে কোন কিছু করাকেই বুঝায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকগণ নানা ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। স্বাধীনতা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ব্যক্তি স্বাধীনতা, জাতীয় স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ধর্ম সংক্রান্ত স্বাধীনতা। অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কিংবা উপনিবেশিক রাষ্ট্রে নাগরিকেরা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Safeguards to Liberty)

স্বাধীনতার রক্ষাকবচ
প্রবাদ আছে "স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা বেশি কঠিন"। ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে শুরু করে জাতীয় স্বাধীনতা, সব ধরনের স্বাধীনতা অর্জনের জন্যই যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করতে হয়। জাতীয় স্বাধীনতা লাভের পর দেখা যায় অন্যান্য স্বাধীনতার সংগ্রাম বিদ্যমান। রাষ্ট্রের প্রাণ যেমন জাতীয় স্বাধীনতা, তেমনি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হল ব্যক্তি স্বাধীনতা। গণতন্ত্রই ব্যক্তিকে সর্বাধিক স্বাধীনতা দিয়ে থাকে।
স্বাধীনতা রক্ষা করার কয়েকটি উপায় নিচে আলোচনা করা হল-

১। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা: প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশ গ্রহণ থাকে। এখানে জনগণের ইচছার একটি প্রতিফলন দেখা যায়। ফলে সরকার বা শাসকশ্রেণী জনগণের অধিকার, বাক-স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ করাসহ অন্যান্য সকল অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকে। প্রাপ্ত স্বাধীনতাকে স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত না করা হচ্ছে নাগরিকের দায়িত্ব। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় অন্য যেকোন ব্যবস্থার চেয়ে স্বাধীনতা বেশি নিশ্চিত হয়।

২। সংবিধান মান্যতা: সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণের অধিকারের দলিল। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা হলে জনগণের স্বাধীনতা সহজেই নিশ্চিত হয়। যেমন, বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায়ে জনগণের অনেক অধিকার ও স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। সরকার যদি সংবিধান মান্য করে তাহলে স্বাধীনতা খর্ব হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না।

৩। আইনের শাসন: আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। একজন অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তিরও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের পূর্ণ অধিকার আছে। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগ সকল পক্ষের ঊর্ধ্বে থেকে বিচারকার্য পরিচালনা করবে।

৪। ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি: রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনটি বিভাগ আছে। এগুলো হচ্ছে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এই তিনটি বিভাগ যদি স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে নিজ-নিজ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় তাহলে আশা করা যায় যে রাষ্ট্রের নাগরিকেরা তাদের প্রাপ্য স্বাধীনতাগুলো ভোগে সক্ষম হবে। উদাহরণস্বরূপ শাসন বিভাগ যদি বিচার বিভাগের কাজের উপর হস্তক্ষেপ করে তবে একজন নাগরিক ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং তার স্বাধীনতা খর্ব হতে পারে। তাই রাষ্ট্রের তিন বিভাগ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে পৃথকভাবে সক্রিয় থাকা একান্ত প্রয়োজন।

৫। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগ একটি রাষ্ট্রের প্রাণস্বরূপ। নাগরিকের শেষ ভরসার আশ্রয়স্থল হল বিচার বিভাগ। আশা করা হয় যে অন্য কোন বিভাগ থেকে কেউ যদি ন্যায় বঞ্চিত হয়ও বিচার বিভাগ অবশ্যই ন্যায় বিচার করবে। কিন্তু বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে কাজ না করতে পারে তবে এই বিভাগটি দুর্বল হয়ে যায়।

৬। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: চরম ক্ষমতা চরমভাবে নষ্ট হয়। অর্থাৎ সকল ক্ষমতা এক স্থানে কেন্দ্রীভূত থাকলে নাগরিকের স্বাধীনতা বিনষ্ট হবার আশঙ্কা থাকে। তাই উন্নত দেশগুলোতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না করে স্থানীয়ভাবে বন্টন করে দেয়া হয়। এর ফলে নাগরিকগণ অধিকতর সেবা পেয়ে থাকে এবং সরকারী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করে।

৭। সুশাসন: সুশাসন স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম কবচ। সুশাসন হল নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রযন্ত্রের সুষ্ঠু পরিচালনা। রাষ্ট্রে সুশাসন থাকলে স্বাধীনতা রক্ষা করায় নাগরিককে খুব বেশি বিচলিত হতে হয় না।

৮। জনমত: জনমত স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। যৌক্তিক ও সুষ্ঠু জনমত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ করে না এবং নাগরিকের ক্ষতিও কামনা করে না। ফলে স্বাধীনতা রক্ষা হয়। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন থাকলেই তা সব সময় জনমত হয় না। জনমতের সাথে অবশ্যই জনকল্যাণ যুক্ত থাকতে হবে।

সার-সংক্ষেপ
স্বাধীনতা লাভ করা গেলেও অনেক সময় সে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। আইনসিদ্ধ স্বাধীনতা অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অনেকগুলো উপাদান কাজ করে। যেমন- গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, সংবিধান মান্যতা, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা স্বাধীনতা সংরক্ষণের প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Relations between Law and Liberty)

আইন ও স্বাধীনতা
আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং পরস্পর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য আইনের প্রয়োজন আছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে কোন কোন আইনকে স্বাধীনতার পরিপন্থীও মনে হয়। আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক সংক্রান্ত দুটি পরস্পর বিরোধী মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। প্রথম দলটি মনে করেন, আইন ও স্বাধীনতা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এরিস্টটল, মন্টেস্কু, উইলোবি, বার্কার, লক প্রমুখ মনীষী এই মতের সমর্থক। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, আইন ও স্বাধীনতা পরস্পর বিরোধী। হার্বার্ট, এ ভি ডাইসি প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এই দলের অন্তর্গত। আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক নিচে আলোচনা করা হল-

আইন স্বাধীনতার ভিত্তি
স্বাধীনতার কোন পরিমাপ নেই। অনেকে মনে করেন, নির্বিচার স্বাধীনতা নাগরিকের কল্যাণের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। কোন স্বাধীনতা কতটুকু উপভোগ করা যাবে তা আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। আইন ব্যতীত স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হবার আশঙ্কা থেকে এমনটি করা হয়। জন লকের মতে, "যেখানে আইন নেই সেখানে স্বাধীনতাও নেই।"

আইন স্বাধীনতার রক্ষাকবচ
একজনের স্বাধীনতা যেন অন্যের অধিকার খর্ব না করে সেজন্য বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে। স্বাধীনতা বঞ্চিতরা আইনের আশ্রয় নিতে পারে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে নাগরিকদের জন্য অনেক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়। জন লকের মতে, যেখানে আইন থাকে না সেখানে কোন স্বাধীনতাও থাকে না।

আইন স্বাধীনতার পরিপূরক
আইন যেমন কেবল নিয়ন্ত্রণ নয় তেমনি স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছে তা করা নয়। উভয়টির সাথেই যৌক্তিকতা বিষয়টি রয়েছে। আইন স্বাধীনতাকে পূর্ণ করে। স্বাধীনতা কোনভাবে বাধাগ্রস্ত হলে আইনের মাধ্যমে তা বলবৎ করা হয়। অর্থাৎ আইন ছাড়া স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না।

আইন স্বাধীনতার বিরোধী

আইন সবসময় স্বাধীনতানিশ্চিত করতে পারে না। কেবল জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা প্রণীত আইনই স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারে। স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচার কর্তৃক প্রণীত আইন অনেক সময়ই স্বাধীনতা বিরোধী। দৃষ্টান্ত হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যমূলক আইনের কথা বলা যায়, যা ঐ দেশের কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের অধিকার খর্ব করত। তাছাড়া মার্কসবাদীগণ মনে করেন, পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন তৈরি হয় মূলত সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণির শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখার জন্য। অর্থাৎ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন হল শোষণের হাতিয়ার।

আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্কে অনেক বিরুদ্ধ যুক্তি থাকতে পারে। তারপরেও এটাই বাস্তবতা যে, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিপুল সংখ্যক নাগরিকের স্বাধীনতা নূন্যতম পর্যায়ে হলেও রক্ষা করার জন্য আইনের বিকল্প নেই। তাই উপসংহারে আর্নেস্ট বার্কারের ভাষায় বলা যায় "স্বাধীনতা ও আইনের মধ্যে বিরোধ নেই"।

সার-সংক্ষেপ
আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আইন না থাকলে স্বাধীনতা বলবৎ করা সম্ভব নয়। আবার আইনের জন্য স্বাধীনতা খর্ব হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কোন কোন চিন্তাবিদ আইনকে ব্যক্তির স্বাধীনতার বিরোধী মনে করলেও, বেশিরভাগই আইনকে স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করেন। পরিশেষে বলা যায় যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Concepts of Morality, Relation between Law and Morality)

উদ্দেশ্য
এই পাঠ শেষে আপনি

  • নৈতিকতা কি তা বলতে পারবেন।
  • নৈতিকতার সংজ্ঞা জানতে পারবেন।
  • আইন ও নৈতিকতার মাঝে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য সম্পর্কে জানতে পারবেন।

নৈতিকতার ধারণা
নৈতিকতা ব্যক্তিগত একটি বিষয়। পৃথিবীতে ভালো-মন্দ যাচাই করার কোন শ্বাশত মানদন্ড না থাকার ফলে একজনের দৃষ্টিতে যে বিষয়টি ভালো অন্য জনের দৃষ্টিতে তা খারাপ হতে পারে। তবে ভালো-মন্দের একটি গড়পড়তা মানদন্ড সব সমাজে প্রায় একই রকম। সততা, সদাচারী, সৌজন্যমূলক আচরণকারী, প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারি ব্যক্তিকে সব সমাজই নৈতিক গুনসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করে। এ রকম ব্যক্তি কোন বিষয়টি সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ভালো বা মন্দ তা নির্ণয় করতে পারে। এই ভালো ও মন্দের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারাটাই হল ব্যক্তির নৈতিকতা। নৈতিকতাকে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ-
ডি এন সিডলি'র মতে "সঠিক ও বেঠিক এর মাঝে পার্থক্যই হল নৈতিকতা"।

আইন ও নৈতিকতার সম্পর্ক
আইন ও নৈতিকার বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলে দেখা যায় এ দুটি প্রত্যয়ের মাঝে দুই ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে। একটি হল মিল বা সুসম্পর্ক; অন্যটি অমিল বা পার্থক্য।
আইন ও নৈতিকতার সুসম্পর্ক
উদ্দেশ্যগত: আইন ও নৈতিকতা উভয়েরই উদ্দেশ্য হল সৎ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সমাজ ও দেশ গঠন। আইনের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে সৎ, যুক্তিসংগত, নিয়মের মাঝে রাখা। অন্যদিকে, নৈতিকতারও একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। নীতিবান ব্যক্তি তার কর্মে ও কথায় সবসময় সৎ, সদাচারী, সৌজন্যমূলক ও সৎচিন্তাশীল হয়ে থাকে। এসব গুণ সমাজজীবনে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য অপরিহার্য। সাধারণত সমাজে যেসব বিষয়গুলো আইন বিরোধী, সেগুলো সাধারণত নীতিবিরোধীও হয়। যেমন, প্রতারণা বিষয়টি নীতিবিরোধী আবার তা আইন বিরোধীও। বাংলাদেশে কেউ প্রতারণা করলে ফৌজদারী কার্যবিধির ৪২০ ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। এ ধরনের বিবেচনা থেকে অধ্যাপক আর জি গেটেল বলেন, "আইন ও নৈতিকতার মাঝে নিবিড় সম্পর্ক বিরাজমান।"
প্রভাবগত: সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানকারী ব্যক্তিকে নীতি-নিষ্ঠ আখ্যা দেওয়া হয়। নীতি-নিষ্ঠতা মানুষের কাছ থেকে স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সীমাহীন চাহিদা, হিংসাত্মক মনোভাবের কবলে পড়ে অনেক সময় মানুষ নীতিবোধ বিসর্জন দেয়। আইনের হস্তক্ষেপে মানুষ অনেক সময় নীতিবোধ বিসর্জিত হওয়াটা বুঝতে শিখে।
আইন ও নৈতিকতার পার্থক্য
আইন ও নৈতিকতার মধ্যে কয়েকটি পার্থক্য নীচে উল্লেখ করা হল:
ক) কার্যক্ষেত্রগত পার্থক্য: আইন ও নৈতিকতার কার্যক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আইন কেবল মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ঘটনা ঘটে যাবার পর ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যদিকে, নৈতিকতা মানুষের অন্তর্জীবন ও

বহি:জীবন উভয়কে প্রভাবিত করে। যেমন, মাদক গ্রহণ করা আইনত দন্ডনীয়, তারপরও অনেকে মাদক গ্রহণ করে। কিন্তু যে ব্যক্তির মনে এই চিন্তাটি থাকে যে, মাদক তার নিজের পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সে ব্যক্তি সাধারণত নেশা করে না। আইন মানুষের অন্যায় কাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিন্তু অন্যায় চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

খ) অনুমোদনগত পার্থক্য: আইন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে অনুমোদিত হতে হবে। তা না হলে আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, নৈতিকতা বিষয়টি ব্যক্তিগত। এর জন্য কারও অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। আইন প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তিবর্গ প্রয়োজন হয়। কিন্তু নীতির প্রয়োগের জন্য এমন কিছুর প্রয়োজন নেই।
গ) অবস্থান ও কালভেদে পার্থক্য: একই বিষয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম আইন হতে পারে। যেমন, মদ্যপান বাংলাদেশে আইনত দন্ডনীয়। এখানে মদ্যপানকে নৈতিকতা পরিপন্থী হিসাবেও বিচেনা করা হয়। পক্ষান্তরে, পশ্চিমা বিশ্বে মদ্যপান সাধারণ সামাজিকতার অংশ এবং এই অভ্যাসের সাথে নৈতিকতা লঙ্ঘনের প্রশ্ন যে সমাজে অবান্তর।
ঘ) প্রকৃতিগত পার্থক্য: প্রকৃতিগত দিক থেকেও আইন ও নৈতিকতার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। নীতিশাস্ত্র সকল কাজকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, শালীন-অশালীন ইত্যাদি মানদন্ডে বিভক্ত করে থাকে। কিন্তু আইন পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রণীত ও প্রযোজ্য হয়।
ঙ) সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টতার মানদন্ড: আইন সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। বেশিরভাগ আইনই লিপিবদ্ধ থাকে। কোন বিষয়ের জন্য
কোন আইন প্রযোজ্য হবে তা নির্দিষ্ট থাকে। অন্যদিকে, নৈতিকতার নির্দিষ্ট কোন মানদন্ড নেই। একই বিষয় একজনের নিকট গ্রহণযোগ্য হলেও অন্য জনের নিকট তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। দুইটি ভিন্ন সমাজে নৈতিকতার ভিন্ন মানদন্ড থাকতে পারে।
চ) নৈতিকতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক: নৈতিকতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিন্তু আইন ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। সকল ব্যক্তির জন্য একই আইন সমভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ আইন সর্বজনীন।


সার-সংক্ষেপ
মানব সমাজে এমন অনেক বিষয় আছে যেগুলোর ভালো-মন্দ বিচার করার শ্বাশত কোন মানদন্ড নেই। কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ হিসেবে বিবেচিত হবে, তা ব্যক্তির মানসিক গঠনের উপর নির্ভর করে। এটি বিচার করতে পারাটাই নৈতিকতা। নৈতিকতা আপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল। স্থান-কালভেদে নৈতিকতার মানদন্ডে পার্থক্য দেখা যায়। অনেকে নৈতিকতার সাথে আইনের একটি সম্পর্ক স্থাপন করেন। আবার এ দুটির মাঝে বৈপরীত্যও আছে। কেননা আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা যেমন রয়েছে, তেমনি তা লিপিবদ্ধ হওয়াও বাধ্যতামূলক। কিন্তু নৈতিকতার ক্ষেত্রে এরূপ কোন বিষয় নেই।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By

(Concept and Classification of Equality)

উদ্দেশ্য

এই পাঠ শেষে আপনি

  • সাম্য কি জানতে পারবেন।
  • সাম্য কত প্রকার হতে পারে তা জানতে পারবেন।
  • সাম্যের বিভিন্ন প্রকারভেদ সম্পর্কে জানতে পারবেন।

সাম্যের ধারণা
সাম্য শব্দটি প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রীসের নগররাষ্ট্র প্রসঙ্গে প্লেটোর লেখনীতেও সাম্যবাদের কথা পাওয়া যায়। প্লেটোর সাম্যের ধারণা অবশ্য আধুনিক ধারণা থেকে ভিন্ন। আধুনিকযুগে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলোপ করে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন কার্ল মার্কস। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জন লক, রুশোর মতো চিন্তাবিদদের লেখালেখি এবং আমেরিকার স্বাধীনতা ও ফরাসি বিপ্লব এর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে সমাজে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। ফরাসি বিপ্লবের মূল কথাই ছিল সাম্য। সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব এই তিনটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করা ছিল ফরাসি বিপ্লবের মূল্য লক্ষ্য। বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে সাম্য বলতে মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের উপযোগী সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে পাওয়াকে বুঝায়।

উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করাকে বুঝায়। অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির মতে, সকলের সম্মুখে যথার্থ সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত রাখার অর্থ হল সাম্য। অর্থাৎ, সাম্য বলতে এমন একটি অবস্থা বা পরিবেশ বুঝায় যেখানে সকল নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করে যথার্থভাবে নিজেদের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়।

সাম্যের প্রকারভেদ
সাম্য বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যথাঃ
(ক) সামাজিক সাম্য (খ) রাজনৈতিক সাম্য (গ) অর্থনৈতিক সাম্য (ঘ) আইনগত সাম্য

ক. সামাজিক সাম্য
সামাজিক সাম্য হচ্ছে এমন একটি পরিস্থিতি যখন কোন একটি সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তি বিশেষ কতগুলো ক্ষেত্রে সমান সুযোগ ভোগ করে। বাক-স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ভোগ কিংবা নাগরিক অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ লাভ করতে পারাটা সামাজিক সাম্যের নির্দেশক।

খ. রাজনৈতিক সাম্য
প্রত্যেক নাগরিক রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এইসব সুযোগ-সুবিধা লাভ করাই রাজনৈতিক সাম্য। সংগঠন করার স্বাধীনতা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ এর সুবিধা, ভোটাধিকার ইত্যাদি রাজনৈতিক সাম্যের পর্যায়ে পড়ে। রাজনৈতিক সাম্য না থাকলে রাষ্ট্রে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে।

গ. অর্থনৈতিক সাম্য
অর্থনৈতিক সাম্য বলতে সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদে প্রত্যেকের সমান সুযোগ থাকা বোঝায়। পছন্দমত পেশা নির্বাচন, পেশা পরিবর্তন, যোগ্যতা অনুযায়ী পেশা গ্রহণের মত বিষয়গুলি অর্থনৈতিক সাম্যের নির্দেশক। অর্থনৈতিক সাম্যের মাত্রার উপরেই একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে।

ঘ. আইনগত সাম্য
ইতোপূর্বে আলোচিত সাম্যের কিছু কিছু আবার আইনের দ্বারা স্বীকৃত। যেমন, চাকুরিতে সমান সুযোগ লাভের অধিকার, সংগঠন ও সমাবেশ করার অধিকার। বাংলাদেশের মত দেশে আইনগত সাম্য সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। সংবিধান ছাড়াও দেশের বিদ্যমান অন্যান্য আইন দ্বারাও সাম্য স্বীকৃত হতে পারে। আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্য আইনের সাম্য থাকা উচিত।

সার-সংক্ষেপ
সাম্য বলতে এমন একটি অবস্থা বা পরিবেশ বুঝায় যখন রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করার মাধ্যমে নিজেদের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। সাম্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত হতে পারে। সাম্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

মূল্যবোধ, আইন, স্বাধীনতা ও সাম্য-প্রথম পত্র-উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখকে বই

Content added By
Please, contribute by adding content to পাঠ-৩.১১: সাম্য ও স্বাধীনতার সম্পর্ক.
Content
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...