উত্তরঃ

‘অপরিচিতা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’ নামক গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
উত্তরঃ

“সমস্ত মন যে সেই অপরিচিতার পানে ছুটিয়া গিয়াছিল” – এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের একটি বিখ্যাত পঙক্তি। এর মাধ্যমে পোস্টমাস্টারের মানসিক একাকীত্ব এবং রতনের প্রতি তার গড়ে ওঠা গভীর মায়া ও নির্ভরতা প্রকাশ পেয়েছে। শহরের আরাম-আয়েশ ছেড়ে আসা পোস্টমাস্টার উলাপুরের নির্জন পরিবেশে একাকীত্বে ভুগছিলেন, আর রতনই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী।

একাকী পোস্টমাস্টার রতনকে বিভিন্ন কথা শেখাতেন এবং রতন মনোযোগ দিয়ে তা শুনত। রতনের মধ্যে পোস্টমাস্টার এক সহানুভূতিশীল সঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই রতন তার কাছে আর অপরিচিতা ছিল না, বরং তার নিঃসঙ্গ জীবনে আসা এক আপনজন হয়ে উঠেছিল। এই উক্তিটি পোস্টমাস্টারের অন্তরের অব্যাক্ত স্নেহ ও মানসিক আশ্রয় খোঁজার প্রবণতাকেই নির্দেশ করে।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকের জেরিনের শ্বশুর-শাশুড়ি যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধিকে প্রত্যাখ্যান করে আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন। অন্যদিকে, 'অপরিচিতা' গল্পের মামা যৌতুকলোভী, আত্মকেন্দ্রিক এবং সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই দিক থেকে উভয়ের চরিত্র ভিন্ন জগতের মানুষের প্রতিচ্ছবি।

'অপরিচিতা' গল্পের মামা ছিলেন সংকীর্ণমনা ও তীব্র যৌতুকলোভী একজন ব্যক্তি। কল্যাণীদের বিয়ের কথাবার্তা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেলেও শুধুমাত্র গহনার ওজন নিয়ে সন্দেহ এবং দেনা-পাওনার হিসাব মেলাতে না পারার কারণে তিনি নির্দ্বিধায় বিয়ে ভেঙে দেন। তার এই আচরণ সেকালের সমাজে যৌতুকপ্রথার ভয়াবহতা এবং এর ফলে নারীর প্রতি সমাজের নির্দয় মনোভাব ফুটিয়ে তোলে।

অপরদিকে, উদ্দীপকের জেরিনের শ্বশুর-শাশুড়ি যৌতুকের প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনোভাব পোষণ করেন। বিয়ের দিন জেরিনের বাবা-মা আসবাবপত্র দিতে চাইলে তারা বিনয়ের সাথে তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। শুধু তাই নয়, শ্বশুরবাড়িতে এসে জেরিন স্বামী ইরফানের ভালোবাসা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির আদর-স্নেহে মুগ্ধ হয়। এটি প্রমাণ করে যে, তারা যৌতুকমুক্ত একটি পরিবার গড়ে তোলার পক্ষে এবং মানবিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দেন, যা 'অপরিচিতা' গল্পের মামার ভোগবাদী মানসিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত। এ কারণে তাদের 'ভিন্ন জগতের মানুষ' হিসেবে আখ্যায়িত করা যথার্থ।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

“দেনাপাওনা” গল্পের শম্ভুনাথ ও কল্যাণী যৌতুক প্রথাকে সমাজের অভিশাপ হিসেবে দেখেছেন এবং এর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাজ ছিল যেখানে মানবিকতা, ভালোবাসা ও সম্মানই বিবাহের ভিত্তি হবে, কোনো প্রকার অর্থলিপ্সা বা পণ প্রথা থাকবে না। উদ্দীপকে জেরিনের শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকবিহীন ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্কের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা শম্ভুনাথ ও কল্যাণীর সেই আদর্শ সমাজেরই ইঙ্গিত বহন করে।

উদ্দীপকের জেরিন রহমান প্রাথমিকভাবে পত্র-পত্রিকা ও সংবাদ মাধ্যমে যৌতুক ও নারী নির্যাতন বিষয়ে বিভিন্ন ঘটনা দেখে বিয়ে সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। এটি তৎকালীন সমাজের যৌতুক প্রথার ভয়াবহতা ও এর কুফলকেই নির্দেশ করে। তবে, যখন তার শ্বশুর-শাশুড়ি বিনয়ের সাথে আসবাবপত্র নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং স্বামী ইরফানের ভালোবাসা ও তাদের আদর-স্নেহ তাকে বিমোহিত করে, তখন তার ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এই ঘটনা যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং এটি একটি সুস্থ, মানবিক সমাজ গঠনের দিকে ইঙ্গিত করে।

শম্ভুনাথ তার গল্পের মাধ্যমে যৌতুকের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানান। তিনি পণ প্রথার জন্য নিজ কন্যার বিয়ে ভেঙে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি এবং কল্যাণীও তার পিতার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যেখানে কোনো কন্যার পিতাকে যৌতুকের জন্য মাথা নত করতে হবে না, বরং ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই হবে সম্পর্কের মূল ভিত্তি। উদ্দীপকের জেরিনের শ্বশুরবাড়িতে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, অর্থাৎ যৌতুক গ্রহণ না করা এবং ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে ওঠা, তা মূলত শম্ভুনাথ ও কল্যাণীর আকাঙ্ক্ষিত সমাজ ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি। এটি প্রমাণ করে যে, যৌতুকমুক্ত ও মানবিক সম্পর্ক সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব এবং এমন সমাজই কাম্য।

সুতরাং, উদ্দীপকের ঘটনাপ্রবাহ সুস্পষ্টভাবে শম্ভুনাথ ও কল্যাণীর সেই আদর্শ সমাজের চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে, যেখানে প্রেম, প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও কল্যাণকর সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং যেখানে যৌতুকের মতো ঘৃণ্য প্রথার কোনো স্থান নেই। যৌতুকমুক্ত ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজই তাদের প্রত্যাশিত ছিল, যার প্রতিফলন আমরা উদ্দীপকে দেখতে পাই।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

মৃত্যুঞ্জয় কয়েকদিন অচেতন অবস্থায় ছিল।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

“ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মতো” – উক্তিটি প্রিয়জন হারানোর গভীর বেদনা, অপ্রাপ্তি এবং জীবন থেকে প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলার এক করুণ উপমাকে ধারণ করে। বাসি ফুলকে জল দিয়ে সতেজ রাখার বৃথা চেষ্টা যেমন তার আসল রূপ ও প্রাণবন্ততা ফিরিয়ে আনতে পারে না, তেমনি প্রিয়জনের মৃত্যু বা অনুপস্থিতি দ্বারা সৃষ্ট শূন্যতা কোনো কিছুর দ্বারা পূরণ করা যায় না।

এই উক্তিটি মূলত শোকাহত মানুষের অন্তরের হাহাকার, প্রিয় স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার নিষ্ফল প্রয়াস এবং জীবনের অনিবার্য নিষ্ঠুরতাকে ফুটিয়ে তোলে। এটি ইঙ্গিত করে যে, যা একবার শেষ হয়ে গেছে বা জীবনহীন হয়ে পড়েছে, তাকে বাহ্যিকভাবে ধরে রাখার প্রচেষ্টা কেবলই মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশাকে বাড়িয়ে তোলে, কিন্তু প্রকৃত সজীবতা ফিরিয়ে আনতে অক্ষম।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

উদ্দীপক এবং 'বিলাসী' গল্পে বর্ণিত উভয় সমাজেই রক্ষণশীলতা, সামাজিক বৈষম্য, শ্রেণি বিভাজন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় পরিলক্ষিত হয়। উভয় ক্ষেত্রেই সমাজের তথাকথিত উঁচু শ্রেণির প্রভাব ও নীচ শ্রেণির প্রতি তাদের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে মানবতা ও ন্যায়বিচার প্রায়শই উপেক্ষিত হয়।

'বিলাসী' গল্পে লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তৎকালীন বাংলার জাতিভেদ প্রথা ও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন। গল্পে মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসীর ভালোবাসার সম্পর্ক সমাজের চোখে ছিল নিন্দনীয়, কারণ বিলাসী ছিল সাপুড়ের মেয়ে, অর্থাৎ তথাকথিত নিচু জাতের। তাদের সমাজচ্যুত করা হয় এবং বিলাসীকে তার ভালোবাসার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়, যা সমাজের সংকীর্ণতা ও অমানবিকতাকে প্রকট করে তোলে।

অন্যদিকে, উদ্দীপকে দামপাড়া ইউনিয়নের প্রভাবশালী চেয়ারম্যানের ছেলে রাইহানকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে হাতেম চৌকিদারের মেয়ে বিউটি। অথচ এই মহৎ কাজের প্রতিদান হিসেবে তার কপালে জোটে 'কলঙ্কের দাগ, বঞ্চনা আর শারীরিক নির্যাতন'। এটি প্রমাণ করে যে উদ্দীপকের সমাজেও শ্রেণিগত ভেদাভেদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার বিদ্যমান। এখানেও নিম্নশ্রেণির বিউটির আত্মত্যাগের মূল্য দেওয়া হয়নি, বরং সামাজিক কলঙ্কের শিকার করে তাকে নিপীড়ন করা হয়েছে, যা 'বিলাসী' গল্পে বর্ণিত সমাজের মতোই অমানবিক ও বৈষম্যমূলক।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকের বিউটি চরিত্রটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বিলাসী' গল্পের বিলাসী চরিত্রের অনুরূপ। আমি এই মতকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করি। দুটি চরিত্রই সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণা উপেক্ষা করে মানবিকতা ও ভালোবাসার টানে নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, যার ফলস্বরূপ তাদের ভাগ্যে জুটেছে লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা।

উদ্দীপকের বিউটি পাশের বাড়ির রাইহানকে সুস্থ করে তোলার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। রাইহানের কোনো নিকটাত্মীয় না থাকলেও বিউটি তাকে সেবা-শুশ্রূষা করে, সাহস ও ভালোবাসা দিয়ে নতুন জীবন দান করেছে। এই সেবা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা প্রত্যাশা থেকে আসেনি, বরং এটি ছিল চরম মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিউটির কপালে জোটে কলঙ্কের দাগ, বঞ্চনা আর শারীরিক নির্যাতন। সমাজ তার এই মহৎ কাজের সঠিক মূল্যায়ন না করে তাকে অসম্মানিত করেছে।

একইভাবে, 'বিলাসী' গল্পের বিলাসী তৎকালীন সমাজব্যবস্থার জাতপাত ও সংকীর্ণতার বেড়াজাল ছিন্ন করে মৃত্যুঞ্জয়কে ভালোবাসে। সাপের কামড়ে মৃত্যুঞ্জয়ের মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য বিলাসী অসীম সাহসিকতা ও সেবা পরায়ণতার পরিচয় দেয়। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, পরিবার ও প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধাচরণ সত্ত্বেও বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়কে সুস্থ করে তোলে এবং তার স্ত্রী হিসেবে আমৃত্যু পাশে থাকে। তার এই ভালোবাসাময় আত্মত্যাগের কারণে তাকেও সমাজের একঘরে হতে হয় এবং অপবাদ সহ্য করতে হয়। বিলাসী কোনো দ্বিধা ছাড়াই মৃত্যুঞ্জয়ের সেবা ও তার প্রতি প্রেম প্রকাশ করে যা সমাজের চোখে অগ্রহণযোগ্য ছিল।

সুতরাং, উদ্দীপকের বিউটি এবং 'বিলাসী' গল্পের বিলাসী চরিত্র দুটিই তাদের প্রেম, সেবা এবং মানবিকতার জন্য সমাজের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। উভয় চরিত্রই সমাজের প্রচলিত প্রথা, কুসংস্কার এবং সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে গিয়ে নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং এর বিনিময়ে অবহেলা, অপবাদ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের আত্মত্যাগ এবং দৃঢ়তা উভয়ের চরিত্রেই এক অভিন্ন মানবিক আবেদন তৈরি করেছে। তাই, উদ্দীপকের বিউটিকে বিলাসী চরিত্রের অনুরূপ বলা সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সমর্থনযোগ্য।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
(৩)

আমিনুর সাহেব দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। প্রবাসের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামের মানুষের অভাব-অনটন দেখে তিনি মর্মাহত হন। গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ প্রায়শই তার কাছে সাহায্য চাইতে আসেন। কিন্তু তিনি কাউকে সাহায্য করেন না। তিনি ভাবেন, দুই-চার হাজার টাকা সাহায্য করে কারো ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। বরং তারা আমার কাছে ছোটো হবেন। একদিন তিনি এলাকার যুবক-যুবতীদের নিয়ে সভায় বসেন। সিদ্ধান্ত হয় এলাকার সমস্ত পুকুর লিজ নিয়ে সমবায় ভিত্তিতে মাছ চাষ করবেন। গরু ও মুরগির ফার্ম গড়ে তুলবেন। অল্প দিনের মধ্যেই এলাকার দৃশ্যপট বদলে যায়। এলকার সমস্ত মানুষ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।

উত্তরঃ আবুল ফজল রচিত 'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধটি প্রথম 'সাঁকো' গ্রন্থে সংকলিত হয়।
Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

মানব-কল্যাণ স্বয়ম্বুস্থ, বিচ্ছিন্ন বা সম্পর্ক-রহিত হতে পারে না। এর অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তির বা সমাজের প্রকৃত কল্যাণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এককভাবে সাধিত হতে পারে না। বরং, তা পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সম্ভব হয়। একজন মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে কখনোই সম্পূর্ণরূপে সুখে বা শান্তিতে থাকতে পারে না, কারণ তার অস্তিত্ব ও প্রয়োজন সামাজিক কাঠামোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

প্রকৃত মানব-কল্যাণ বলতে এমন একটি অবস্থা বোঝায় যেখানে সমাজের প্রতিটি সদস্য একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল এবং সমষ্টিগতভাবে সকলের উন্নতির জন্য কাজ করে। বিচ্ছিন্নভাবে কেবল অর্থ বা বস্তুগত সাহায্য দিয়ে কারো স্থায়ী কল্যাণ সাধন করা সম্ভব নয়। তাই, মানব-কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টা অপরিহার্য, যেখানে একজন অপরের উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

মানস-পুত্র বলতে বোঝায় এমন এক ব্যক্তি বা চরিত্র, যিনি কোনো লেখক বা প্রাবন্ধিকের আদর্শ, চিন্তা ও দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটান। প্রাবন্ধিকগণ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বিভিন্ন যুক্তি ও দর্শনের অবতারণা করেন, আর সেই দর্শনকে কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন এমন ব্যক্তিকেই প্রাবন্ধিকের মানস-পুত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়।

উদ্দীপকের আমিনুর রহমান দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষ করে গ্রামে ফিরে এসে মানুষের অভাব-অনটন দেখে মর্মাহত হন। কিন্তু তিনি সাময়িক সাহায্য না করে একটি সুদূরপ্রসারী ও টেকসৈ সমাধানের পথ বেছে নেন। তিনি যুবক-যুবতীদের নিয়ে সমবায় ভিত্তিতে মাছ চাষ, গরু ও মুরগির ফার্ম গড়ে তোলেন, যার ফলে অল্প দিনের মধ্যেই এলাকার মানুষ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। এই কর্মপদ্ধতি একজন দূরদর্শী প্রাবন্ধিকের গভীর সামাজিক চিন্তা ও দর্শনেরই প্রতিচ্ছবি।

বস্তুত, আমিনুর রহমান তার কাজের মধ্যে প্রাবন্ধিকের সেই আদর্শেরই বাস্তবায়ন করেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত সাহায্য নয় বরং সমষ্টিগত উদ্যোগ ও স্বাবলম্বিতাই একটি সমাজের মূল চালিকাশক্তি। তিনি মানুষের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করে তাদের সক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করেছেন, যা একজন প্রাবন্ধিকের কাঙ্ক্ষিত মানবতাবাদী দর্শনেরই প্রতিচ্ছবি। তাই, উদ্দীপকের আমিনুর রহমানকে প্রাবন্ধিকের মানস-পুত্র বলা যথার্থ।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

‘মানব-কল্যাণ’ প্রবন্ধের মূলবক্তব্য হলো সাময়িক সাহায্য বা অনুদান প্রদানের মাধ্যমে মানব-কল্যাণ সম্ভব নয়। বরং মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং তাদের নিজস্ব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমেই প্রকৃত ও টেকসই মানব-কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। উদ্দীপকে আমিনুর সাহেবের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ এই প্রবন্ধের মূলবক্তব্যকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত করেছে।

উদ্দীপকের আমিনুর সাহেব বিদেশে দীর্ঘদিন কর্মজীবন শেষে নিজ গ্রামে ফিরে এসে দেখেন গ্রামের মানুষের অভাব-অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। গ্রামের লোকজন তার কাছে সাহায্য চাইতে এলেও তিনি নগদ টাকা দিয়ে কাউকে সাহায্য করেননি। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সাময়িক আর্থিক সাহায্য কারো ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারে না, বরং এতে সাহায্য গ্রহণকারী ব্যক্তির আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন হয়। তাই তিনি এলাকার যুবক-যুবতীদের নিয়ে এক সভায় বসেন এবং সমবায় ভিত্তিতে মাছ চাষ, গরু ও মুরগির ফার্ম গড়ে তোলার মতো টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার এই দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে অল্প দিনের মধ্যেই এলাকার দৃশ্যপট বদলে যায় এবং গ্রামের সমস্ত মানুষ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।

‘মানব-কল্যাণ’ প্রবন্ধে যেমন কেবল ভিক্ষা দেওয়া বা সাময়িক অনুদান দিয়ে মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলার ধারণাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, ঠিক তেমনি উদ্দীপকের আমিনুর সাহেবও এই পথ পরিহার করেছেন। প্রবন্ধের মূল কথা হলো, মানুষকে শ্রমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা, তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের মেধা ও শ্রমকে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগিয়ে আত্মমর্যাদাশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তোলা। আমিনুর সাহেবের সমবায়ভিত্তিক মাছ চাষ ও পশুপালনের উদ্যোগ সরাসরি এই নীতির প্রতিফলন। তিনি গ্রামের মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের পথই দেখাননি, বরং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি উৎপাদনশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যা তাদের আত্মনির্ভরশীল ও সম্মানের জীবন নিশ্চিত করেছে।

আমার মতে, উদ্দীপকে 'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধের মূলবক্তব্য অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আমিনুর সাহেবের কর্মপদ্ধতি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত মানব-কল্যাণ কেবল বস্তুগত সাহায্য প্রদানে নয়, বরং মানুষের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার মধ্যেই নিহিত। তার গৃহীত উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক মুক্তিই আনেনি, বরং গ্রামবাসীদের মধ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার মানসিকতা এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রবণতাও তৈরি করেছে, যা প্রবন্ধের মর্মবাণীকে যথার্থভাবে তুলে ধরেছে।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

'রেইনকোট' গল্পটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

“প্রিন্সিপালের বাড়ির গেটে বোমা ফেলা মানে মিলিটারি ক্যাম্প অ্যাটাক করা” – এ কথার তাৎপর্য হলো, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতীকী বা কৌশলগত হামলা চালানো। প্রিন্সিপাল বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীর বাড়ি, যদি তিনি হানাদারদের পক্ষাবলম্বনকারী হন, তাহলে সেটি কেবল একটি বাড়ি থাকে না, বরং শত্রু শিবিরের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মুক্তিযোদ্ধারা সরাসরি সামরিক ক্যাম্পে হামলা করার ঝুঁকি না নিয়ে অনেক সময় শত্রুপক্ষের মনোবল ভাঙতে বা তাদের প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল করতে তাদের সহযোগী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালাতেন। এক্ষেত্রে প্রিন্সিপালের বাড়ির গেটে বোমা ফেলে তাঁর মাধ্যমে শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং একই সাথে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছিল এক ধরনের গেরিলা কৌশল, যা সামরিক হামলারই সমতুল্য তাৎপর্য বহন করত।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকের সালেহীন 'রেইনকোট' গল্পের মুক্তিযোদ্ধা মামা (ম্যাজর) চরিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করে।

'রেইনকোট' গল্পের মুক্তিযোদ্ধা মামা দিনের বেলায় আত্মগোপন করে থাকলেও রাতের আঁধারে তিনি গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে তাকে খুঁজে না পেলেও তার কর্মকাণ্ড গল্পের প্রধান চরিত্র অর্থাৎ প্রিন্সিপালকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে।

উদ্দীপকের সালেহীন একদিকে পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের কারণে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যেতে না পারলেও অন্যদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধা মামার মতোই গোপনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে। দিনের বেলায় সে ৯টা-৫টা সরকারি অফিস করলেও রাতে তার গোপনে বাইরে যাওয়া এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানি বাহিনীর তল্লাশির ঘটনা প্রমাণ করে যে সে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছিল। এই দিক থেকে সালেহীন 'রেইনকোট' গল্পের মুক্তিযোদ্ধা মামার বিপ্লবী চেতনার প্রতিচ্ছবি।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
উত্তরঃ

শহীদুল জহিরের 'রেইনকোট' গল্পে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভীতি, দেশপ্রেম, নীরব প্রতিরোধ ও অবশেষে প্রকাশ্য প্রতিরোধের চিত্র ফুটে উঠেছে। উদ্দীপকেও একজন সাধারণ মানুষের যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা, গোপন তৎপরতা এবং হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়ার মধ্য দিয়ে 'রেইনকোট' গল্পের মূল বিষয়বস্তু অনেকাংশেই প্রতিফলিত হয়েছে।

'রেইনকোট' গল্পে নুরুল হুদা নামের এক ভীতু ও সাধারণ মানুষ কীভাবে আকস্মিক এক ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশপ্রেম ও সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠেন, তার বর্ণনা রয়েছে। তার ভাগ্নে মুক্তিযোদ্ধা আকবরের ফেলে যাওয়া রেইনকোট গায়ে দিয়ে তিনি যেন প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। রেইনকোট তাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দেয়, যা দিয়ে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও অটল থাকেন। গল্পের মূল সুর হলো - সাধারণ মানুষের মনে লুকিয়ে থাকা দেশপ্রেম ও চরম বিপদে তার উন্মোচন।

উদ্দীপকের সালেহীন চরিত্রটি 'রেইনকোট' গল্পের এই মূল সুরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সালেহীন মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাইলেও পারিবারিক কারণে যেতে পারেননি, কিন্তু তার 'রাজ্যের অস্বপ্তি' তার ভেতরের দেশপ্রেমের কথাই বলে। তার স্ত্রী লক্ষ করেন, সালেহীন প্রতিদিন সন্ধ্যায় কোথায় যেন যায়, যা তার গোপন তৎপরতার ইঙ্গিত দেয়। অবশেষে পাক হানাদার বাহিনীর তার বাসায় হানা দেওয়ার ঘটনাটি সালেহীনের গোপন প্রতিরোধের বিষয়টি স্পষ্ট করে তোলে। এটি নুরুল হুদার রেইনকোট গায়ে দিয়ে পাক বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সমার্থক। ভয়, নীরব প্রতিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়ার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় অংশগ্রহণের যে চিত্র 'রেইনকোট' গল্পে পাওয়া যায়, উদ্দীপকে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

অতএব, বলা যায়, উদ্দীপকে 'রেইনকোট' গল্পের সাধারণ মানুষের ভীতি জয় করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়া, নীরবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং শেষ পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার মতো মৌলিক বিষয়বস্তুগুলো অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। উদ্দীপকটি গল্পের মূল বার্তার সাথে চমৎকারভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Satt AI
Satt AI
6 days ago
212

পাকা দুই ক্রোশ পথ হাঁটিয়া স্কুলে বিদ্যা অর্জন করিতে যাই। আমি একা নই-দশ-বারোজন। যাহাদেরই বাটী পল্লিগ্রামে, তাহাদেরই ছেলেদের শতকরা আশিজনকে এমনি করিয়া বিদ্যালাভ করিতে হয়। ইহাতে লাভের অঙ্কে শেষ পর্যন্ত একেবারে শূন্য না পড়িলেও, যাহা পড়ে, তাহাতে হিসাব করিবার পক্ষে এই কয়টা কথা চিন্তা করিয়া দেখিলেই যথেষ্ট হইবে যে, যে ছেলেদের সকাল আটটার মধ্যে বাহির হইয়া যাতায়াতে চার ক্রোশ পথ ভাঙিতে হয়—চার ক্রোশ মানে আট মাইল নয়, ঢের বেশি—বর্ষার দিনে মাথার ওপর মেঘের জল পায়ের নিচে এক হাঁটু কাদা এবং গ্রীষ্মের দিনে জলের বদলে কড়া সূর্য এবং কাদার বদলে ধুলার সাগর সাঁতার দিয়া স্কুল-ঘর করিতে হয়, সেই দুর্ভাগা বালকদের মা-সরস্বতী খুশি হইয়া বর দিবেন কি, তাহাদের যন্ত্রণা দেখিয়া কোথায় যে তিনি লুকাইবেন, ভাবিয়া পান না ।
তারপরে এই কৃতবিদ্য শিশুর দল বড় হইয়া একদিন গ্রামেই বসুন, আর ক্ষুধার জ্বালায় অন্যত্রই যান—তাঁদের চার ক্রোশ হাঁটা বিদ্যার তেজ আত্মপ্রকাশ করিবেই করিবে। কেহ কেহ বলেন শুনিয়াছি, আচ্ছা, যাঁদের ক্ষুধার জ্বালা, তাঁদের কথা না হয় নাই ধরিলাম কিন্তু যাঁদের সে জ্বালা নাই, তেমন সব ভদ্রলোকই বা কী সুখে গ্রাম ছাড়িয়া পলায়ন করেন? তাঁরা বাস করিতে থাকিলে তো পল্লির এত দুর্দশা হয় না ।
ম্যালেরিয়া কথাটা না হয় নাই পাড়িলাম। সে থাক, কিন্তু ওই চার ক্রোশ হাঁটার জ্বালায় কত ভদ্রলোকেই যে ছেলে-পুলে লইয়া গ্রাম ছাড়িয়া শহরে পালান তাহার আর সংখ্যা নাই। তারপরে একদিন ছেলে-পুলের পড়াও শেষ হয় বটে, তখন কিন্তু শহরের সুখ-সুবিধা রুচি লইয়া আর তাদের গ্রামে ফিরিয়া আসা চলে না। কিন্তু থাক এ-সকল বাজে কথা। স্কুলে যাই-দুক্রোশের মধ্যে এমন আরও তো দুই তিনখানা গ্রাম পার হইতে হয়। কার বাগানে আম পাকিতে শুরু করিয়াছে, কোন বনে বঁইচি ফল অপর্যাপ্ত ফলিয়াছে, কার গাছে কাঁঠাল এই পাকিল বলিয়া, কার মর্তমান রম্ভার কাঁদি কাটিয়া লইবার অপেক্ষা মাত্র, কার কানাচে ঝোপের মধ্যে আনারসের গায়ে রং ধরিয়াছে, কার পুকুরপাড়ের খেজুরমেতি কাটিয়া খাইলে ধরা পড়িবার সম্ভাবনা অল্প, এই সব খবর লইতেই সময় যায়, কিন্তু আসলে যা বিদ্যা-কামস্কাটকার রাজধানীর নাম কী এবং সাইবেরিয়ার খনির মধ্যে রূপা মেলে, না সোনা মেলে- এ সকল দরকারি তথ্য অবগত হইবার ফুরসতই মেলে না ।
কাজেই এক্জামিনের সময় এডেন কী জিজ্ঞাসা করিলে বলি পারশিয়ার বন্দর, আর হুমায়ুনের বাপের নাম জানিতে চাহিলে লিখিয়া দিয়া আসি তোগলক খাঁ এবং আজ চল্লিশের কোঠা পার হইয়াও দেখি, ও-সকল বিষয়ের ধারণা প্রায় একরকমই আছে-তারপরে প্রমোশনের দিন মুখ ভার করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া কখনো বা দল বাঁধিয়া মতলব করি, মাস্টারকে ঠ্যাঙানো উচিত, কখনো বা ঠিক করি, অমন বিশ্রী স্কুল ছাড়িয়া দেওয়াই কর্তব্য।
আমাদের গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে মাঝে মাঝেই স্কুলের পথে দেখা হইত। তাহার নাম ছিল মৃত্যুঞ্জয়। আমাদের চেয়ে সে বয়সে অনেক বড়। থার্ড ক্লাসে পড়িত। কবে সে যে প্রথম থার্ড ক্লাসে উঠিয়াছিল, এ খবর আমরা কেহই জানিতাম না- সম্ভবত তাহা প্রত্নতাত্ত্বিকের গবেষণার বিষয়-আমরা কিন্তু তাহার ওই থার্ড ক্লাসটাই চিরদিন দেখিয়া আসিয়াছি ।
তাহার ফোর্থ ক্লাসে পড়ার ইতিহাসও কখনো শুনি নাই, সেকেন্ড ক্লাসে উঠিবার খবরও কখনো পাই নাই । মৃত্যুঞ্জয়ের বাপ-মা, , ভাই-বোন কেহই ছিল না, ছিল শুধু গ্রামের এক প্রান্তে একটা প্রকাণ্ড আম-কাঁঠালের বাগান, আর তার মধ্যে একটা প্রকাণ্ড পোড়োবাড়ি, আর ছিল এক জ্ঞাতি খুড়া। খুড়ার কাজ ছিল ভাইপোর নানাবিধ দুর্নাম রটনা করা-সে গাঁজা খায়, সে গুলি খায়, এমনি আরও কত কি! তাঁর আর একটা কাজ ছিল বলিয়া বেড়ানো, ওই বাগানের অর্ধেকটা তাঁর নিজের অংশ, নালিশ করিয়া দখল করার অপেক্ষা মাত্র। অবশ্য দখল একদিন তিনি পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে জেলা-আদালতে নালিশ করিয়া নয়—ওপরের আদালতের হুকুমে। কিন্তু সে কথা পরে হইবে।
মৃত্যুঞ্জয় নিজে রাঁধিয়া খাইত এবং আমের দিনে ওই আম-বাগানটা জমা দিয়াই তাহার সারা বৎসরের খাওয়া-পরা চলিত এবং ভালো করিয়াই চলিত। যেদিন দেখা হইয়াছে, সেইদিনই দেখিয়াছি ছেঁড়া-খোঁড়া মলিন বইগুলি বগলে করিয়া পথের এক ধার দিয়া নীরবে চলিয়াছে। তাহাকে কখনো কারও সহিত যাচিয়া আলাপ করিতে দেখি নাই—বরঞ্চ উপযাচক হইয়া কথা কহিতাম আমরাই। তাহার প্রধান কারণ ছিল এই যে, দোকানের খাবার কিনিয়া খাওয়াইতে গ্রামের মধ্যে তাহার জোড়া ছিল না। আর শুধু ছেলেরাই নয়। কত ছেলের বাপ কতবার যে গোপনে ছেলেকে দিয়া তাহার কাছে স্কুলের মাহিনা হারাইয়া গেছে, বই চুরি গেছে ইত্যাদি বলিয়া টাকা আদায় করিয়া লইত, তাহা বলিতে পারি না । কিন্তু ঋণ স্বীকার করা তো দূরের কথা, ছেলে তাহার সহিত একটা কথা কহিয়াছে, এ কথাও কোনো বাপ ভদ্র সমাজে কবুল করিতে চাহিত না-গ্রামের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়ের ছিল এমনি সুনাম।
অনেক দিন মৃত্যুঞ্জয়ের দেখা নাই। একদিন শোনা গেল সে মর-মর। আর একদিন শোনা গেল, মালোপাড়ার এক বুড়া মালো তাহার চিকিৎসা করিয়া এবং তাহার মেয়ে বিলাসী সেবা করিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে যমের মুখ হইতে এ যাত্রা ফিরাইয়া আনিয়াছে ।
অনেক দিন তাহার মিষ্টান্নের সদ্ব্যয় করিয়াছি— মনটা কেমন করিতে লাগিল, একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকাইয়া তাহাকে দেখিতে গেলাম। তাহার পোড়োবাড়িতে প্রাচীরের বালাই নাই। স্বচ্ছন্দে ভিতরে ঢুকিয়া দেখি, ঘরের দরজা খোলা, বেশ উজ্জ্বল একটি প্রদীপ জ্বলিতেছে, আর ঠিক সমুখেই তক্তপোষের ওপর পরিষ্কার ধবধবে বিছানায় মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে, তাহার কঙ্কালসার দেহের প্রতি চাহিলেই বুঝা যায়, বাস্তবিক যমরাজ চেষ্টার ত্রুটি কিছু করেন নাই, তবে যে শেষ পর্যন্ত সুবিধা করিয়া উঠিতে পারেন নাই, সে কেবল ওই মেয়েটির জোরে। সে শিয়রে বসিয়া পাখার বাতাস করিতেছিল, অকস্মাৎ মানুষ দেখিয়া চমকিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। এই সেই বুড়া সাপুড়ের মেয়ে বিলাসী। তাহার বয়স আঠারো কি আটাশ ঠাহর করিতে পারিলাম না। কিন্তু মুখের প্রতি চাহিবামাত্রই টের পাইলাম, বয়স যাই হোক, খাটিয়া খাটিয়া আর রাত জাগিয়া জাগিয়া ইহার শরীরে আর কিছু নাই। ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মতো। হাত দিয়া এতটুকু স্পর্শ করিলে, এতটুকু নাড়াচাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।
মৃত্যুঞ্জয় আমাকে চিনিতে পারিয়া বলিল, “কে, ন্যাড়া?”
বলিলাম, “হুঁ।”
মেয়েটা ঘাড় হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল । মৃত্যুঞ্জয় দুই-চারিটি কথায় যাহা কহিল, তাহার মর্ম এই যে, প্রায় দেড় মাস হইতে চলিল সে শয্যাগত। মধ্যে দশ-পনের দিন সে অজ্ঞান অচৈতন্য অবস্থায় পড়িয়াছিল, এই কয়েক দিন হইল সে লোক চিনিতে পারিতেছে এবং যদিচ এখনো সে বিছানা ছাড়িয়া উঠিতে পারে না, কিন্তু আর ভয় নাই ।
ভয় নাই থাকুক । কিন্তু ছেলেমানুষ হইলেও এটা বুঝিলাম, আজও যাহার শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিবার ক্ষমতা হয় নাই, সেই রোগীকে এই বনের মধ্যে একাকী যে মেয়েটি বাঁচাইয়া তুলিবার ভার লইয়াছেন, সে কত বড় গুরুভার। দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি তাহার কত সেবা, কত শুশ্রূষা, কত ধৈর্য, কত রাতজাগা । সে কত বড় সাহসের কাজ! কিন্তু যে বস্তুটি এই অসাধ্য-সাধন করিয়া তুলিয়াছিল তাহার পরিচয় যদিচ সেদিন পাই নাই, কিন্তু আর একদিন পাইয়াছিলাম ।
ফিরিবার সময় মেয়েটি আর একটি প্রদীপ লইয়া আমার আগে আগে ভাঙা প্রাচীরের শেষ পর্যন্ত আসিল । এতক্ষণ পর্যন্ত সে একটি কথাও কহে নাই, এইবার আস্তে আস্তে বলিল, রাস্তা পর্যন্ত তোমায় রেখে আসব কি? বড় বড় আমগাছে সমস্ত বাগানটা যেন একটা জমাট অন্ধকারের মতো বোধ হইতেছিল, পথ দেখা তো দূরের কথা, নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যায় না। বলিলাম, “পৌঁছে দিতে হবে না, শুধু আলোটা দাও।”
সে প্রদীপটা আমার হাতে দিতেই তাহার উৎকণ্ঠিত মুখের চেহারাটা আমার চোখে পড়িল। আস্তে আস্তে সে বলিল, “একলা যেতে ভয় করবে না তো? একটু এগিয়ে দিয়ে আসব?” মেয়ে মানুষ জিজ্ঞাসা করে, ভয় করবে না তো। সুতরাং মনে যাই থাক, প্রত্যুত্তরে শুধু একটা “না” বলিয়াই অগ্রসর হইয়া গেলাম ।
সে পুনরায় কহিল, “ঘন জঙ্গলের পথ, একটু দেখে পা ফেলে যেয়ো।” সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়া উঠিল, কিন্তু এতক্ষণে বুঝিলাম, উদ্বেগটা তাহার কিসের জন্য এবং কেন সে আলো দেখাইয়া এই বনের পথ পার করিয়া দিতে চাহিতেছিল। হয়ত সে নিষেধ শুনিত না, সঙ্গেই যাইত, কিন্তু পীড়িত মৃত্যুঞ্জয়কে একাকী ফেলিয়া যাইতেই বোধ করি তাহার শেষ পর্যন্ত মন সরিল না ।
কুড়ি-পঁচিশ বিঘার বাগান। সুতরাং পথটা কম নয় । এই দারুণ অন্ধকারের মধ্যে প্রত্যেক পদক্ষেপই বোধ করি ভয়ে ভয়ে করিতে হইত, কিন্তু পরক্ষণই মেয়েটির কথাতেই সমস্ত মন এমনি আচ্ছন্ন হইয়া রহিল যে, ভয় পাইবার আর সময় পাইলাম না। কেবল মনে হইতে লাগিল, একটা মৃতকল্প রোগী লইয়া থাকা কত কঠিন। মৃত্যুঞ্জয় তো যে-কোনো মুহূর্তেই মরিতে পারিত, তখন সমস্ত রাত্রি এই বনের মধ্যে মেয়েটি একাকী কী করিত । কেমন করিয়া তাহার সে রাতটা কাটিত।
এই প্রসঙ্গে অনেকদিন পরের একটা কথা আমার মনে পড়ে। এক আত্মীয়ের মৃত্যুকালে আমি উপস্থিত ছিলাম । অন্ধকার রাত্রি—বাটীতে ছেলে-পুলে, চাকর-বাকর নাই, ঘরের মধ্যে শুধু তার সদ্যবিধবা স্ত্রী আর আমি। তার স্ত্রী তো শোকের আবেগে দাপাদাপি করিয়া এমন কাণ্ড করিয়া তুলিলেন যে, ভয় হইল তাহারও প্রাণটা বুঝি বাহির হইয়া যায় বা! কাঁদিয়া কাঁদিয়া বারবার আমাকে প্রশ্ন করিতে লাগিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় যখন সহমরণে যাইতে চাহিতেছেন, তখন সরকারের কী? তাঁর যে আর তিলার্ধ বাঁচিতে সাধ নাই, এ কি তাহারা বুঝিবে না? তাহাদের ঘরে কি স্ত্রী নাই? তাহারা কি পাষাণ? আর এই রাত্রেই গ্রামের পাঁচজন যদি নদীর তীরের কোনো একটা জঙ্গলের মধ্যে তাঁর সহমরণের যোগাড় করিয়া দেয় তো পুলিশের লোক জানিবে কী করিয়া? এমনি কত কি । কিন্তু আমার তো আর বসিয়া বসিয়া তাঁর কান্না শুনিলেই চলে না। পাড়ায় খবর দেওয়া চাই—অনেক জিনিস যোগাড় করা চাই। কিন্তু আমার বাহিরে যাইবার প্রস্তাব শুনিয়াই তিনি প্রকৃতিস্থ হইয়া উঠিলেন। চোখ মুছিয়া বলিলেন, “ভাই, যা হবার সে তো হইয়াছে, আর বাইরে গিয়া কী হইবে? রাতটা কাটুক না।” বলিলাম, “অনেক কাজ, না গেলেই যে নয় । ”
তিনি বলিলেন, “হোক কাজ, তুমি বসো।”
বলিলাম, “বসলে চলবে না, একবার খবর দিতেই হইবে”, বলিয়া পা বাড়াইবামাত্রেই তিনি চিৎকার করিয়া উঠিলেন, “ওরে বাপরে! আমি একলা থাকতে পারব না।”
কাজেই আবার বসিয়া পড়িতে হইল । কারণ, তখন বুঝিলাম, যে স্বামী জ্যান্ত থাকতে তিনি নির্ভয়ে পঁচিশ বৎসর একাকী ঘর করিয়াছেন, তাঁর মৃত্যুটা যদি-বা সহে তাঁর মৃতদেহটা এই অন্ধকার রাত্রে পাঁচ মিনিটের জন্যও সহিবে না। বুক যদি কিছুতে ফাটে তো সে এই মৃত স্বামীর কাছে একলা থাকিলে ।
কিন্তু দুঃখটা তাহার তুচ্ছ করিয়া দেখানও আমার উদ্দেশ্য নহে। কিংবা তাহা খাঁটি নয় এ কথা বলাও আমার অভিপ্ৰায় নহে। কিংবা একজনের ব্যবহারেই তাহার চূড়ান্ত মীমাংসা হইয়া গেল তাহাও নহে। কিন্তু এমন আরও অনেক ঘটনা জানি, যাহার উল্লেখ না করিয়াও আমি এই কথা বলিতে চাই যে, শুধু কর্তব্যজ্ঞানের জোরে অথবা বহুকাল ধরিয়া একসঙ্গে ঘর করার অধিকারেই এই ভয়টাকে কোনো মেয়েমানুষই অতিক্রম করিতে পারে না। ইহা আর একটি শক্তি, যাহা বহু স্বামী-স্ত্রী একশ বৎসর একত্রে ঘর করার পরেও হয়ত তাহার কোনো সন্ধান পায় না।
কিন্তু সহসা সে শক্তির পরিচয় যখন কোনো নরনারীর কাছে পাওয়া যায়, তখন সমাজের আদালতে আসামি করিয়া তাহাদের দণ্ড দেওয়ার আবশ্যক যদি হয় তো হোক, কিন্তু মানুষের যে বস্তুটি সামাজিক নয়, সে নিজে যে ইহাদের দুঃখে গোপন অশ্রু বিসর্জন না করিয়া কোনো মতেই থাকিতে পারে না ।
প্রায় মাস দুই মৃত্যুঞ্জয়ের খবর লই নাই। যাঁহারা পল্লিগ্রাম দেখেন নাই, কিংবা ওই রেলগাড়ির জানালায় মুখ বাড়াইয়া দেখিয়াছেন, তাঁহারা হয়ত সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিবেন, এ কেমন কথা? এ কি কখনো সম্ভব হইতে পারে যে, অত বড় অসুখটা চোখে দেখিয়া আসিয়াও মাস-দুই আর তার খবরই নাই । তাহাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্যক যে, এ শুধু সম্ভব নয়, এ-ই হইয়া থাকে। একজনের বিপদে পাড়াসুদ্ধ ঝাঁক বাঁধিয়া উপুড় হইয়া পড়ে, এই যে, একটা জনশ্রুতি আছে, জানি না তাহা সত্যযুগের পল্লিগ্রামে ছিল কি না, কিন্তু একালে তো কোথাও দেখিয়াছি বলিয়া মনে করিতে পারি না । তবে তাহার মরার খবর যখন পাওয়া যায় নাই, তখন সে যে বাঁচিয়া আছে এ ঠিক।
এমনি সময়ে হঠাৎ একদিন কানে গেল, মৃত্যুঞ্জয়ের সেই বাগানের অংশীদার খুড়া তোলপাড় করিয়া বেড়াইতেছেন যে, গেল গেল, গ্রামটা এবার রসাতলে গেল। নালতের মিত্তির বলিয়া সমাজে আর তাঁর মুখ বাহির করিবার যো রহিল না-অকালকুষ্মাণ্ডটা একটা সাপুড়ের মেয়ে নিকা করিয়া ঘরে আনিয়াছে। আর শুধু নিকা নয়, তাও না হয় চুলায় যাক, তাহার হাতে ভাত পর্যন্ত খাইতেছে। গ্রামে যদি ইহার শাসন না থাকে তো বনে গিয়া বাস করিলেই তো হয়। কোড়োলা, হরিপুরের সমাজ একথা শুনিলে যে – ইত্যাদি ইত্যাদি । - তখন ছেলে বুড়ো সকলের মুখেই ওই এক কথা—অ্যাঁ এ হইল কী? কলি কি সত্যই উল্টাইতে বসিল ।
খুড়া বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, এ যে ঘটিবে তিনি অনেক আগেই জানিতেন। তিনি শুধু তামাশা দেখিতেছিলেন, কোথাকার জল কোথায় গিয়া পড়ে। নইলে পর নয়, প্রতিবেশী নয়, আপনার ভাইপো । তিনি কি বাড়ি লইয়া যাইতে পারিতেন না? তাঁহার কি ডাক্তার-বৈদ্য দেখাইবার ক্ষমতা ছিল না? তবে কেন যে করেন নাই, এখন দেখুন সবাই । কিন্তু আর তো চুপ করিয়া থাকা যায় না। এ যে মিত্তির বংশের নাম ডুবিয়া যায়। গ্রামের যে মুখ পোড়ে ।
তখন আমরা গ্রামের লোক মিলিয়া যে কাজটা করিলাম, তাহা মনে করিলে আমি আজও লজ্জায় মরিয়া যাই । খুড়া চলিলেন নালতের মিত্তির বংশের অভিভাবক হইয়া, আর আমরা দশ-বারোজন সঙ্গে চলিলাম গ্রামের বদন দগ্ধ না হয় এইজন্য ।
মৃত্যুঞ্জয়ের পোড়োবাড়িতে গিয়া যখন উপস্থিত হইলাম তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা হইয়াছে। মেয়েটি ভাঙা বারান্দায় একধারে রুটি গড়িতেছে। অকস্মাৎ লাঠিসোটা হাতে এতগুলি লোককে উঠানের ওপর দেখিয়া ভয়ে নীলবর্ণ হইয়া গেল। খুড়া ঘরের মধ্যে উঁকি মারিয়া দেখলেন, মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে। চট করিয়া শিকলটা টানিয়া দিয়া সেই ভয়ে মৃতপ্রায় মেয়েটিকে সম্ভাষণ শুরু করিলেন। বলা বাহুল্য, জগতের কোনো খুড়া কোনো কালে বোধ করি ভাইপোর-স্ত্রীকে ওরূপ সম্ভাষণ করে নাই। সে এমনি যে, মেয়েটি হীন সাপুড়ের মেয়ে হইয়াও তাহা সহিতে পারিল না, চোখ তুলিয়া বলিল, বাবা আমারে বাবুর সাথে নিকা দিয়েছে জানো? খুড়া বলিলেন তবে রে! ইত্যাদি ইত্যাদি এবং সঙ্গে সঙ্গেই দশ-বারোজন বীরদর্পে হুংকার দিয়া তাহার ঘাড়ে পড়িল। কেহ ধরিল চুলের মুঠি, কেহ ধরিল কান, কেহ ধরিল হাত-দুটো এবং যাহাদের সে সুযোগ ঘটিল না তাহারাও নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিল না ।
কারণ, সংগ্রামস্থলে আমরা কাপুরুষের ন্যায় চুপ করিয়া থাকিতে পারি, আমাদের বিরুদ্ধে এত বড় দুর্নাম রটনা
করিতে বোধ করি নারায়ণের কর্তৃপক্ষেরও চক্ষুলজ্জা হইবে। এইখানে একটা অবান্তর কথা বলিয়া রাখি। শুনিয়াছি নাকি বিলাত প্রভৃতি স্লেচ্ছদেশে পুরুষদের মধ্যে একটা কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুর্বল এবং নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই। এ আবার একটা কী কথা! সনাতন হিন্দু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি যাহারই গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে
পারা যায়। তা সে নরনারী যাই হোক না কেন ।
মেয়েটি প্রথমেই সেই যা একবার আর্তনাদ করিয়া উঠিয়াছিল, তারপর একেবারে চুপ করিয়া গেল । কিন্তু আমরা যখন তাহাকে গ্রামের বাহিরে রাখিয়া আসিবার জন্য হিঁচড়াইয়া লইয়া চলিলাম, তখন মিনতি করিয়া বলিতে লাগিল, “বাবুরা, আমাকে একটিবার ছেড়ে দাও আমি রুটিগুলো ঘরে দিয়ে আসি। বাইরে শিয়াল কুকুরে খেয়ে যাবে—রোগা মানুষ সমস্ত রাত খেতে পাবে না।”
মৃত্যুঞ্জয় রুদ্ধ ঘরের মধ্যে পাগলের মতো মাথা কুটিতে লাগিল, দ্বারে পদাঘাত করিতে লাগিল এবং শ্রাব্য-অশ্রাব্য বহুবিধ ভাষা প্রয়োগ করিতে লাগিল। কিন্তু আমরা তাহাতে তিলার্ধ বিচলিত হইলাম না। স্বদেশের মঙ্গলের জন্য সমস্ত অকাতরে সহ্য করিয়া টানিয়া লইয়া চলিলাম ।
চলিলাম বলিতেছি, কেননা, আমিও বরাবর সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু কোথায় আমার মধ্যে একটুখানি দুর্বলতা ছিল, আমি তার গায়ে হাত দিতে পারি নাই। বরঞ্চ কেমন যেন কান্না পাইতে লাগিল । সে যে অত্যন্ত অন্যায় করিয়াছে এবং তাহাকে গ্রামের বাহির করাই উচিত বটে, কিন্তু এটাই যে আমরা ভালো কাজ করিতেছি সেও কিছুতেই মনে করিতে পারিলাম না। কিন্তু আমার কথা থাক ।
আপনারা মনে করিবেন না, পল্লিগ্রামে উদারতার একান্ত অভাব। মোটেই না। বরঞ্চ বড়লোক হইলে আমরা
এমন সব ঔদার্য প্রকাশ করি যে, শুনিলে আপনারা অবাক হইয়া যাইবেন।
এই মৃত্যুঞ্জয়টাই যদি না তাহার হাতে ভাত খাইয়া অমার্জনীয় অপরাধ করিত তাহা হইলে তো আমাদের এত রাগ হইত না । আর কায়েতের ছেলের সঙ্গে সাপুড়ের মেয়ের নিকা-এ তো একটা হাসিয়া উড়াইবার কথা কিন্তু কাল করিল যে ওই ভাত খাইয়া । হোক না সে আড়াই মাসের রোগী, হোক না সে শয্যাশায়ী কিন্তু তাই বলিয়া ভাত! লুচি নয়, সন্দেশ নয়, পাঁঠার মাংস নয়। ভাত খাওয়া যে অন্ন-পাপ। সে তো আর সত্য সত্যই মাপ করা যায় না। তা নইলে পল্লিগায়ের লোক সংকীর্ণচিত্ত নয় । চার ক্রোশ হাঁটা বিদ্যা যেসব ছেলের পেটে তারাই তো একদিন বড় হইয়া সমাজের মাথা হয়। দেবী বীণাপাণির বরে সংকীর্ণতা তাহাদের মধ্যে আসিবে কী করিয়া!
এই তো ইহারই কিছুদিন পরে, প্রাতঃস্মরণীয় স্বর্গীয় মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের বিধবা পুত্রবধূ মনের বৈরাগ্যে বছর দুই কাশীবাস করিয়া যখন ফিরিয়া আসিলেন, তখন নিন্দুকেরা কানাকানি করিতে লাগিল যে, অর্ধেক সম্পত্তি ওই বিধবার এবং পাছে তাহা বেহাত হয় এই ভয়েই ছোটবাবু অনেক চেষ্টা, অনেক পরিশ্রমের পর বৌঠানকে যেখান হইতে ফিরাইয়া আনিয়াছেন, সেটা কাশীই বটে । যাই হোক, ছোটবাবু তাহার স্বাভাবিক ঔদার্যে গ্রামের বারোয়ারি পূজাবাবদ দুইশত টাকা দান করিয়া, পাঁচখানা গ্রামের ব্রাহ্মণের সদক্ষিণা-উত্তর ফলাহারের পর, প্রত্যেক সদব্রাহ্মণের হাতে যখন একটা করিয়া কাঁসার গেলাস দিয়া বিদায় করিলেন, তখন ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল । এমনকি, পথে আসিতে অনেকেই দশের এবং দেশের কল্যাণের নিমিত্ত কামনা করিতে লাগিলেন, এমন সব যারা বড়লোক তাদের বাড়িতে বাড়িতে, মাসে মাসে এমন সদানুষ্ঠানের আয়োজন হয় না কেন?মনসা দেবী আমার মা- ঢোঁড়ার বিষ তুই নে, তোর বিষ ঢোঁড়ারে দে—
ওলটপালট পাতাল-ফোঁড়-
-দুধরাজ, মণিরাজ ।
কার আজ্ঞা-বিষহরির আজ্ঞা ।
ইহার মানে যে কী তাহা আমি জানি না। কারণ, যিনি এই মন্ত্রেরও দ্রষ্টা ঋষি ছিলেন-নিশ্চয় কেহ না কেহ ছিলেন-তাঁর সাক্ষাৎ কখনও পাই নাই ।
অবশেষে একদিন এই মন্ত্রের সত্য মিথ্যার চরম মীমাংসা হইয়া গেল বটে, কিন্তু যতদিন না হইল ততদিন সাপ ধরার জন্য চতুর্দিকে প্রসিদ্ধ হইয়া গেলাম । সবাই বলাবলি করিতে লাগিল, হ্যাঁ, ন্যাড়া একজন গুণী লোক বটে । সন্ন্যাসী অবস্থায় কামাখ্যায় গিয়া সিদ্ধ হইয়া আসিয়াছে । এতটুকু বয়সের মধ্যে এত বড় ওস্তাদ হইয়া অহংকারে আমার মাটিতে পা পড়ে না, এমনি যো হইল ।
বিশ্বাস করিল না শুধু দুই জন। আমার গুরু যে, সে তো ভালো মন্দ কোনো কথাই বলিত না। কিন্তু বিলাসী মাঝে মাঝে মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিত, ঠাকুর, এসব ভয়ংকর জানোয়ার, একটু সাবধানে নাড়াচাড়া করো । বস্তুত বিষদাঁত ভাঙা, সাপের মুখ হইতে বিষ বাহির করা প্রভৃতি কাজগুলো এমনি অবহেলার সহিত করিতে শুরু করিয়াছিলাম যে, সেসব মনে পড়িলে আমার আজও গা কাঁপে।
আসলে কথা হইতেছে এই যে, সাপ ধরাও কঠিন নয় এবং ধরা সাপ দুই চারদিন হাঁড়িতে পুরিয়া রাখার পরে
তাহার বিষদাঁত ভাঙাই হোক আর নাই হোক, কিছুতেই কামড়াইতে চাহে না। চক্র তুলিয়া কামড়াইবার ভান
করে, ভয় দেখায়, কিন্তু কামড়ায় না।
মাঝে মাঝে আমাদের গুরুশিষ্যের সহিত বিলাসী তর্ক করিত। সাপুড়েদের সবচেয়ে লাভের ব্যবসা শিকড় বিক্রি করা, যা দেখাইবামাত্র সাপ পালাইতে পথ পায় না। কিন্তু তার পূর্বে সামান্য একটু কাজ করিতে হইত । যে সাপটা শিকড় দেখিয়া পালাইবে, তাহার মুখে একটা লোহার শিক পুড়াইয়া বার কয়েক ছ্যাঁকা দিতে হয়। তারপর তাহাকে শিকড়ই দেখান হোক বা একটা কাঠিই দেখান হোক, সে কোথায় পালাইবে তা ভাবিয়া পায় না। এই কাজটার বিরুদ্ধে বিলাসী ভয়ানক আপত্তি করিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে বলিত, “দেখ, এমন করে মানুষ ঠকায়ো না।” মৃত্যুঞ্জয় কহিত, “সবাই করে-এতে দোষ কী?”
বিলাসী বলিত, “করুক গে সবাই। আমাদের তো খাবার ভাবনা নেই, আমরা কেন মিছামিছি লোক ঠকাতে যাই ।” আর একটা জিনিস আমি বারবার লক্ষ করিয়াছি। সাপ ধরার বায়না আসিলেই বিলাসী নানাপ্রকারে বাধা দিবার চেষ্টা করিত—আজ শনিবার, আজ মঙ্গলবার, এমনি কত কি। মৃত্যুঞ্জয় উপস্থিত না থাকিলে সে তো একবারেই ভাগাইয়া দিত, কিন্তু উপস্থিত থাকিলে মৃত্যুঞ্জয় নগদ টাকার লোভ সামলাইতে পারিত না। আর আমার তো একরকম নেশার মত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল । নানাপ্রকারে তাহাকে উত্তেজিত করিতে চেষ্টার ত্রুটি করিতাম না। বস্তুত ইহার মধ্যে মজা ছাড়া ভয় যে কোথায় ছিল, এ আমাদের মনেই স্থান পাইত না। কিন্তু এই পাপের দণ্ড আমাকে একদিন ভালো করিয়াই দিতে হইল ।
সেদিন ক্রোশ-দেড়েক দূরে এক গোয়ালার বাড়িতে সাপ ধরিতে গিয়াছি। বিলাসী বরাবরই সঙ্গে যাইত, আজও সঙ্গে ছিল। মেটে ঘরের মেঝে খানিকটা খুঁড়িতেই একটা গর্তের চিহ্ন পাওয়া গেল। আমরা কেহই লক্ষ করি নাই, কিন্তু বিলাসী সাপুড়ের মেয়ে-সে হেঁট হইয়া কয়েক টুকরা কাগজ তুলিয়া লইয়া আমাকে বলিল, “ঠাকুর, একটু সাবধানে খুঁড়ো । সাপ একটা নয় একজোড়া তো আছে বটেই হয়ত বা বেশি থাকিতে পারে।”
মৃত্যুঞ্জয় বলিল, “এরা যে বলে একটাই এসে ঢুকেছে। একটাই দেখতে পাওয়া গেছে।” বিলাসী কাগজ দেখাইয়া কহিল, “দেখছ না বাসা করেছিল?” মৃত্যুঞ্জয় কহিল, “কাগজ তো ইঁদুরেও আনতে পারে।”
বিলাসী কহিল, “দু-ই হতে পারে। কিন্তু দুটো আছে আমি বলছি।”
বাস্তবিক বিলাসীর কথাই ফলিল এবং মর্মান্তিকভাবেই সেদিন ফলিল। মিনিট-দশেকের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড খরিশ গোখরো ধরিয়া ফেলিয়া মৃত্যুঞ্জয় আমার হাতে দিল। কিন্তু সেটাকে ঝাঁপির মধ্যে পুরিয়া ফিরিতে না ফিরিতেই মৃত্যুঞ্জয় “উঃ’ করিয়া নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার হাতের উলটা পিঠ দিয়ে ঝরঝর করিয়া রক্ত পড়িতেছিল।
প্রথমটা যেন সবাই হতবুদ্ধি হইয়া গেলাম । কারণ সাপ ধরিতে গেলে সে পালাইবার জন্য ব্যাকুল না হইয়া বরঞ্চ গর্ত হইতে একহাত মুখ বাহির করিয়া দংশন করে, এমন অভাবনীয় ব্যাপার জীবনে এই একটিবার দেখিয়াছি । পরক্ষণেই বিলাসী চিৎকার করিয়া ছুটিয়া গিয়া আঁচল দিয়া তাহার হাতটা বাঁধিয়া ফেলিল এবং যত রকমের শিকড়-বাকড় সে সঙ্গে আনিয়াছিল সমস্তই তাহাকে চিবাইতে দিল। মৃত্যুঞ্জয়ের নিজের মাদুলি তো ছিলই, তাহার উপরে আমার মাদুলিটাও খুলিয়া তাহার হাতে বাঁধিয়া দিলাম। আশা, বিষ ইহার ঊর্ধ্বে আর উঠিবে না, বরং সেই ‘বিষহরির আজ্ঞা' মন্ত্রটা সতেজে বারংবার আবৃত্তি করিতে লাগিলাম। চতুর্দিকে ভিড় জমিয়া গেল এবং এ অঞ্চলের মধ্যে যেখানে যত গুণী ব্যক্তি আছেন সকলকে খবর দিবার জন্য দিকে দিকে লোক ছুটিল । বিলাসীর বাপকে সংবাদ দিবার জন্য লোক গেল ।
আমার মন্ত্র পড়ার আর বিরাম নাই, কিন্তু ঠিক সুবিধা হইতেছে বলিয়া মনে হইল না । তথাপি আবৃত্তি সমভাবেই চলিতে লাগিল । কিন্তু মিনিট পনের কুড়ি পরেই যখন মৃত্যুঞ্জয় একবার বমি করিয়া দিল, তখন বিলাসী মাটির ওপর একবারে আছাড় খাইয়া পড়িল । আমিও বুঝিলাম, বিষহরির দোহাই বুঝি-বা আর খাটে না ।
নিকটবর্তী আরও দুই-চারিজন ওস্তাদ আসিয়া পড়িলেন এবং আমরা কখনও-বা একসঙ্গে কখনও আলাদা তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর দোহাই পাড়িতে লাগিলাম । কিন্তু বিষ দোহাই মানিল না, রোগীর অবস্থা ক্রমেই মন্দ হইতে লাগিল। যখন দেখা গেল ভালো কথায় হইবে না, তখন তিন-চারজন ওঝা মিলিয়া বিষকে এমনি অকথ্য অশ্রাব্য গালিগালাজ করিতে লাগিল যে, বিষের কান থাকিলে সে মৃত্যুঞ্জয় তো মৃত্যুঞ্জয়, সেদিন দেশ ছাড়িয়া পলাইত। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না । আরও আধ ঘণ্টা ধ্বস্তাধ্বস্তির পরে রোগী তাহার বাপ মায়ের দেওয়া মৃত্যুঞ্জয় নাম, তাহার শ্বশুরের দেওয়া মন্ত্রৌষধি সমস্ত মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়া ইহলোকের লীলা সাঙ্গ করিল। বিলাসী তাহার স্বামীর মাথাটা কোলে করিয়া বসিয়াছিল সে যেন একেবারে পাথর হইয়া গেল ।
যাক, তাহার দুঃখের কাহিনিটি আর বাড়াইব না। কেবল এইটুকু বলিয়া শেষ করিব যে, সে সাত দিনের বেশি বাঁচিয়া থাকাটা সহিতে পারিল না। আমাকে শুধু একদিন বলিয়াছিল, ঠাকুর আমার মাথার দিব্যি রইল, এসব তুমি আর কখনও করো না ।
আমার মাদুলি-কবচ তো মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে কবরে গিয়াছিল, ছিল শুধু বিষহরির আজ্ঞা। কিন্তু সে আজ্ঞা যে
ম্যাজিস্ট্রেটের আজ্ঞা নহে এবং সাপের বিষ যে বাঙালির বিষ নয়, তাহা আমিও বুঝিয়াছিলাম । একদিন গিয়া শুনিলাম, ঘরে তো আর বিষের অভাব ছিল না, বিলাসী আত্মহত্যা করিয়া মরিয়াছে এবং শাস্ত্রমতে সে নিশ্চয় নরকে গিয়াছে। কিন্তু যেখানেই যাক, আমার নিজের যখন যাইবার সময় আসিবে, তখন ওইরূপ কোনো একটা নরকে যাওয়ার প্রস্তাবে পিছাইয়া দাঁড়াইব না, এইমাত্র বলিতে পারি ।
খুড়া মশাই ষোল আনা বাগান দখল করিয়া অত্যন্ত বিজ্ঞের মতো চারিদিকে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, ওর যদি না অপঘাত-মৃত্যু হবে, তো হবে কার? পুরুষমানুষ অমন একটা ছেড়ে দশটা করুক না, তাতে তো তেমন আসে যায় না-না হয় একটু নিন্দাই হতো। কিন্তু হাতে ভাত খেয়ে মরতে গেলি কেন? নিজে মরলো, আমার পর্যন্ত মাথা হেঁট করে গেল । না পেলে এক ফোঁটা আগুন, না পেলে একটা পিণ্ডি, না হলো একটা ভুজ্যি উচ্ছৃণ্ড্য। গ্রামের লোক একবাক্যে বলিতে লাগিল, তাহাতে আর সন্দেহ কী! অন্নপাপ । বাপ রে! এর কি আর প্রায়শ্চিত্ত আছে।
বিলাসীর আত্মহত্যার ব্যাপারটা অনেকের কাছে পরিহাসের বিষয় হইল। আমি প্রায় ভাবি, এ অপরাধ হয়ত ইহারা উভয়েই করিয়াছিল, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় তো পল্লিগ্রামেরই ছেলে, পাড়াগাঁয়ের তেলে-জলেই তো মানুষ । তবু অত বড় দুঃসাহসের কাজে প্রবৃত্ত করিয়াছিল তাহাকে যে বস্তুটা সেটা কেহ একবার চোখ মেলিয়া দেখিতে পাইল না ?
আমার মনে হয়, যে দেশের নরনারীর মধ্যে পরস্পরের হৃদয় জয় করিয়া বিবাহ করিবার রীতি নাই, বরঞ্চ তাহা নিন্দার সামগ্রী, যে দেশে নরনারী আশা করিবার সৌভাগ্য, আকাঙ্ক্ষা করিবার ভয়ংকর আনন্দ হইতে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত, যাহাদের জয়ের গর্ব, পরাজয়ের ব্যথা কোনোটাই জীবনে একটিবারও বহন করিতে হয় না, যাহাদের ভুল করিবার দুঃখ, আর ভুল না করিবার আত্মপ্রসাদ, কিছুরই বালাই নাই, যাহাদের প্রাচীন এবং বহুদর্শী বিজ্ঞ সমাজ সর্ব প্রকারের হাঙ্গামা হইতে অত্যন্ত সাবধানে দেশের লোককে তফাৎ করিয়া, আজীবন কেবল ভালোটি হইয়া থাকিবারই ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছেন, তাই বিবাহ ব্যাপারটা যাহাদের শুধু নিছক Contract তা সে যতই কেননা বৈদিক মন্ত্ৰ দিয়া Document পাকা করা হোক, সে দেশের লোকের সাধ্যই নাই মৃত্যুঞ্জয়ের অন্নপাপের কারণ বোঝে। বিলাসীকে যাঁহারা পরিহাস করিয়াছিলেন, তাঁহারা সাধু গৃহস্থ এবং সাধ্বী গৃহিণী— অক্ষয় সতীলোক তাঁহারা সবাই পাইবেন, তাও আমি জানি কিন্তু সেই সাপুড়ের মেয়েটি যখন একটি পীড়িত শয্যাগত লোককে তিল তিল করিয়া জয় করিতেছিল, তাহার তখনকার সেই গৌরবের কণামাত্র হয়ত আজিও ইহাদের কেহ চোখে দেখেন নাই। মৃত্যুঞ্জয় হয়ত নিতান্তই একটা তুচ্ছ মানুষ ছিল, কিন্তু তাহার হৃদয় জয় করিয়া দখল করার আনন্দটাও তুচ্ছ নয়, সে সম্পদও অকিঞ্চিৎকর নহে ।
এই বস্তুটাই এ দেশের লোকের পক্ষে বুঝিয়া উঠা কঠিন। আমি ভূদেববাবুর পারিবারিক প্রবন্ধেরও দোষ দিব না এবং শাস্ত্রীয় তথা সামাজিক বিধি-ব্যবস্থারও নিন্দা করিব না । করিলেও মুখের ওপর কড়া জবাব দিয়া যাঁহারা বলিবেন, এই হিন্দু সমাজ তাহার নির্ভুল বিধিব্যবস্থার জোরেই অত শতাব্দীর অতগুলো বিপ্লবের মধ্যে বাঁচিয়া আছে, আমি তাঁহাদেরও অতিশয় ভক্তি করি, প্রত্যুত্তরে আমি কখনই বলিব না, টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়, এবং অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে। আমি শুধু এই বলিব যে, বড়লোকের নন্দগোপালটির মতো দিবারাত্রি চোখে চোখে এবং কোলে কোলে রাখিলে যে সে বেশটি থাকিবে, তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই, কিন্তু একেবারে তেলাপোকাটির মত বাঁচাইয়া রাখার চেয়ে এক আধবার কোল হইতে নামাইয়া আরও পাঁচজন মানুষের মতো দু-এক পা হাঁটিতে দিলেই প্রায়শ্চিত্ত করার মত পাপ হয় না ।

Related Question

View All
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews