উত্তরঃ

"মন্দ নয় হে! খাঁটি সোনা বটে।"—উক্তিটি নিরুপমার বাবার।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

"আমাকে একটি কথা বলাও তিনি আবশ্যক বোধ করিলেন না" উক্তিটির মাধ্যমে বক্তা অপর একজন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত উপেক্ষা এবং অবজ্ঞার বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। এর দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যে, অন্য ব্যক্তিটি বক্তাকে এতটুকুও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেননি যে, কোনো বিষয়ে তার সাথে আলোচনা করা বা তাকে অবহিত করা প্রয়োজন।

এই উক্তিটি সাধারণত তখন ব্যবহৃত হয় যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা ঘটনা সম্পর্কে বক্তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়, যেখানে বক্তার জানার বা মতামত দেওয়ার অধিকার ছিল। এটি সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস, দূরত্ব, অথবা বক্তার প্রতি অপর ব্যক্তির চরম উদাসীনতা ও অসম্মানবোধকে তুলে ধরে।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকের তাহমিনার বিয়ে ভাঙার ক্ষেত্রে গায়ের রঙের প্রসঙ্গটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'অপরিচিতা' গল্পের সেই সামাজিক কুসংস্কার ও সংকীর্ণ মানসিকতাকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য ও বংশমর্যাদাকে বিবাহের মূল মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়।

'অপরিচিতা' গল্পে অনুপমের মামা যৌতুকের লোভে শম্ভুনাথ সেনের দেওয়া কনেকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিল এবং এক পর্যায়ে শম্ভুনাথ বাবু নিজেই অনুপমকে প্রত্যাখ্যান করে তার আত্মমর্যাদার পরিচয় দেন। এখানে বিবাহের ক্ষেত্রে বরের পরিবারের মানসিকতা ছিল নারীর গুণ বা যোগ্যতা নয়, বরং তার ধনসম্পদ এবং বংশমর্যাদা। তৎকালীন সমাজে মেয়েদের গায়ের রঙ, রূপ বা আর্থিক অবস্থান দিয়ে বিচার করার যে প্রবণতা ছিল, সেই বিষয়টি গল্পে পরোক্ষভাবে বিদ্যমান।

আলোচ্য উদ্দীপকে তাহমিনার গায়ের রঙ কালো হওয়ায় পরপর চারবার তার বিয়ে ভেঙে যায়। এই ঘটনা 'অপরিচিতা' গল্পের সেই দিকটিকে তুলে ধরে, যেখানে নারীকে তার বাহ্যিক রূপ, বিশেষ করে গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করা হয়, যা একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজের জন্য অন্তরায়। তাহমিনার এই অভিজ্ঞতা সমাজে নারীর প্রতি বিদ্যমান এই সংকীর্ণ ও অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়। তবে তাহমিনা বিয়ের পিঁড়িতে না বসে নারীশিক্ষায় জীবন উৎসর্গ করার যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা যেন আত্মমর্যাদাশীল কল্যাণীদের এক নতুন রূপে আত্মপ্রকাশের দৃষ্টান্ত। কল্যাণী যেমন অনুপমকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিল, তেমনি তাহমিনাও সমাজের এই ভ্রান্ত ধারণাকে উপেক্ষা করে বৃহত্তর মানবকল্যাণে নিজেকে যুক্ত করে এক দৃঢ় প্রত্যয়ের পরিচয় দেয়।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

প্রদত্ত মন্তব্যটি নারীর সামাজিক জীবনে বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতা কীভাবে তাদের ব্যক্তিসত্তার জাগরণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, তার একটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। সমাজ, লিঙ্গবৈষম্য বা অন্যান্য সীমাবদ্ধতা নারীর আত্মবিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করলেও, অনেক সময় এই বাধাই তাদের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলে এবং তাদের নতুন পথ খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।

উদ্দীপকের তাহমিনা চরিত্রটি এই মন্তব্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গায়ের রঙের কারণে সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল এবং পরপর চারবার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার মতো যে চরম সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন তাকে হতে হয়েছিল, তা তাকে দুর্বল করে তোলেনি। বরং এই তিক্ত অভিজ্ঞতা তাহমিনাকে প্রথাগত বিয়ের পিঁড়ি এড়িয়ে আত্মমর্যাদাশীল হতে এবং নারী শিক্ষার উন্নয়নে জীবন উৎসর্গ করার মতো মহৎ সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। এটি তার ব্যক্তিসত্তার এক অসাধারণ জাগরণ, যা সামাজিক প্রতিকূলতার প্রত্যক্ষ ফল।

একইভাবে, বাংলা সাহিত্যের চিরস্মরণীয় চরিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'অপরিচিতা' গল্পের কল্যাণীও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে স্বীয় সত্তার উন্মোচন ঘটিয়েছেন। যৌতুকের কারণে তার বিবাহ ভেঙে যাওয়ার অপমানে তিনি ভেঙে না পড়ে বরং আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। এই প্রতিকূলতা তাকে শিক্ষাব্রতী হতে এবং বৃহত্তর সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে প্রেরণা জুগিয়েছে। তাহমিনা ও কল্যাণী উভয় চরিত্রই প্রমাণ করে যে, সামাজিক কুপ্রথা, বৈষম্য বা ব্যক্তিগত অবহেলা নারীকে বিপর্যস্ত না করে বরং তাদের ভেতরের সুপ্ত প্রতিবাদী সত্তাকে জাগিয়ে তোলে এবং তাদের কর্মমুখী ও স্বাবলম্বী করে তোলে।

পরিশেষে বলা যায়, নারীর জীবন পথের নানাবিধ সামাজিক বাধা-বিপত্তি তাদের আত্মানুসন্ধান ও ব্যক্তিসত্তার জাগরণে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তাহমিনা ও কল্যাণী চরিত্রদ্বয় তাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিবন্ধকতাকে শক্তি ও অনুপ্রেরণায় রূপান্তরিত করে নিজেদেরকে মহিমান্বিত করেছেন। তাই, "নারীর নানাবিধ সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তাহমিনা ও কল্যাণী চরিত্রের ব্যক্তিসত্তার জাগরণের অনুঘটক" - মন্তব্যটি সর্বাংশে যথার্থ ও তাৎপর্যপূর্ণ।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু হয়েছিল গোখরা সাপের দংশনে।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

উক্তিটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'মাসি-পিসি' গল্পের আহ্লাদি চরিত্র সম্পর্কে করা হয়েছে। আহ্লাদির জীবনে নেমে আসা সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা, নির্যাতন ও অনাহারে তার শরীরের ওপর এমন প্রভাব ফেলেছিল যে তার প্রকৃত বয়স বোঝা যাচ্ছিল না।

আহ্লাদি অল্পবয়স্কা হলেও স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নির্মম অত্যাচার এবং দিনের পর দিন অনাহারে থাকার ফলে তার শারীরিক গঠন ও মানসিক অবস্থা এতটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল যে তাকে দেখে তার প্রকৃত বয়স আঠারো না আঠাশ, তা ঠাহর করা অসম্ভব ছিল। এটি তার প্রতিকূল জীবনযাত্রার ফলস্বরূপ অকাল বার্ধক্যের প্রতি ইঙ্গিত করে।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকের রিফাতের মর্মান্তিক পরিণতি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বিলাসী' গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়। উভয়ই তথাকথিত সমাজের প্রচলিত প্রথা ভেঙে ভালোবাসাকে মূল্য দিতে গিয়ে সমাজ ও পরিবারের রোষানলে পড়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করে।

'বিলাসী' গল্পে মৃত্যুঞ্জয় গ্রামের ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়েও সর্পগুরু বিলের পাশে কুটিরে থাকা বিলাসীর প্রতি আসক্ত হয় এবং তার সাথে থাকতে শুরু করে। গ্রামের সমাজপতিরা এই সম্পর্ককে মেনে নেয় না এবং মৃত্যুঞ্জয়কে একঘরে করে। পরে যখন মৃত্যুঞ্জয় সাপের কামড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন সমাজ তাকে পরিত্যাগ করে। বিলাসী তাকে সুস্থ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, একসময় মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু হয় এবং তার মৃত্যুতে সমাজের মানুষের কোনো সহানুভূতি ছিল না, বরং অনেকেই এটিকে তাদের "কর্মফল" বলে মনে করে।

উদ্দীপকের রিফাত অবস্থাপন্ন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হয়েও দিনমজুরের মেয়ে আসমাকে ভালোবেসে বিয়ে করায় তার বাবা তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন। সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে সে জীবন নির্বাহের চেষ্টা করলেও সড়ক দুর্ঘটনায় তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তার পরিবারের সদস্যরাও মৃত্যুতে কোনো দুঃখ প্রকাশ না করে এটিকে তার "কর্মের ফল" বলে আখ্যা দেয়। এই ঘটনা 'বিলাসী' গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের সামাজিক ও পারিবারিক অবহেলার শিকার হওয়া এবং তার মৃত্যুর পর সমাজের নির্লিপ্ত প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয় চরিত্রই ভালোবাসার কারণে সমাজচ্যুত হয়ে মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করে এবং তাদের মৃত্যুতে প্রচলিত সমাজের সহানুভূতিহীন মনোভাব ফুটে ওঠে।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

সাহিত্য সমাজের দর্পণস্বরূপ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বিলাসী' গল্পে তৎকালীন সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার, জাত-পাতের ভেদাভেদ এবং মানবতাবিরোধী বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। উদ্দীপকেও একই ধরনের সমাজ বাস্তবতার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। যদিও প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তবু উভয়ক্ষেত্রেই সমাজে বিদ্যমান শ্রেণীবিদ্বেষ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সামাজিক অনুদারতা স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে, যা মন্তব্যটির যথার্থতা প্রমাণ করে।

উদ্দীপকে বর্ণিত রিফাত ও আসমার অসম বিয়েতে সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধের চরম দিকটি প্রকাশিত হয়েছে। রিফাত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হয়েও দিনমজুরের মেয়ে আসমাকে ভালোবাসার টানে বিয়ে করায় তার বাবা তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন। এমনকি রিফাতের আকস্মিক মৃত্যুর পরও তার পরিবার কোনো দুঃখ প্রকাশ না করে এটিকে তার 'কর্মের ফল' বলে আখ্যায়িত করে। এই ঘটনা সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অভাব এবং শ্রেণীবিদ্বেষের গভীর শিকড়কে নির্দেশ করে। এটি বস্তুত মানুষের প্রতি মানুষের অমানবিক আচরণ ও সামাজিক অনুদারতার এক নির্মম দৃষ্টান্ত।

'বিলাসী' গল্পেও আমরা এমন অমানবিক সামাজিক চিত্র দেখতে পাই। মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসী তাদের ভালোবাসার কারণে সমাজের রোষানলে পড়েছিল। উচ্চবর্ণের মৃত্যুঞ্জয়কে সাপের ওঝা বিলাসীকে আশ্রয় দেওয়ার "অপরাধে" সমাজচ্যুত করা হয় এবং তাকে অমানুষিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হতে হয়। উদ্দীপকের রিফাতের ত্যাজ্য হওয়ার ঘটনা এবং মৃত্যুর পর পরিবারের নির্মম আচরণ যেন 'বিলাসী' গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের সামাজিক বঞ্চনারই প্রতিচ্ছবি। উভয়ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রেম-ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত পছন্দকে সমাজ কীভাবে শ্রেণীগত সংকীর্ণতা, জাতপাত ও ভণ্ডামি দিয়ে বিচার করে।

সুতরাং, 'প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও উদ্দীপক ও 'বিলাসী' গল্পে প্রচলিত সমাজ বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে' — মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ। উভয় কাহিনিই প্রমাণ করে যে, সমাজে প্রেম-ভালোবাসা, মানবিকতা বা ব্যক্তি স্বাধীনতার চেয়ে শ্রেণীভেদ, জাতপাত ও সামাজিক আভিজাত্যের ধারণা কতটা শক্তিশালী ও নিষ্ঠুর হতে পারে। এ ধরনের সাহিত্যকর্ম আমাদের সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, অমানবিকতা এবং সংকীর্ণতার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টিতে সহায়তা করে এবং বৃহত্তর মানবতাবোধের উন্মোচন ঘটায়।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

"তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?"-উক্তিটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসের নবকুমারকে উদ্দেশ্য করে মতিবিবির।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

"বিভক্তিকরণের মনোভাব নিয়ে কারো কল্যাণ করা যায় না" উক্তিটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, মানুষকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, অর্থনৈতিক অবস্থা বা অন্য কোনো ভিত্তিতে ভাগ করে দেখলে তাদের প্রতি প্রকৃত অর্থে কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব নয়। মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থভাবে ও একাত্ম হয়ে কাজ করার মাধ্যমেই কেবল সত্যিকারের কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়।

যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিভেদমূলক চিন্তাভাবনা পোষণ করে অপরের উপকার করতে যায়, তখন সেই কাজের মধ্যে সংকীর্ণতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত থাকে। এতে সেবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং প্রাপকও পরিপূর্ণভাবে উপকৃত হতে পারে না। মানবতাবোধ ও সামগ্রিক কল্যাণের চিন্তা থেকেই নিঃশর্ত সেবা সম্ভব, যা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধে মানবকল্যাণকে শুধুমাত্র দান বা সাহায্য হিসেবে না দেখে মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের মাধ্যমে তার সার্বিক উন্নতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মানুষকে কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমেই প্রকৃত মানবকল্যাণ সাধিত হয়, যা তাকে নিজের ও সমাজের জন্য অবদান রাখতে সক্ষম করে তোলে।

উদ্দীপকের শিক্ষানুরাগী আলী হায়দার অবসর গ্রহণের পর 'আলোক বর্তিকা' নামক সেবা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও, তিনি বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিজের জমানো টাকায় 'আলী হায়দার টেকনিক্যাল কলেজ' স্থাপন করেন। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অসংখ্য যুবক-যুবতী প্রশিক্ষিত হয়ে দেশ-বিদেশে চাকরি পেয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছে।

আলী হায়দারের এই উদ্যোগ 'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধে বর্ণিত মানবকল্যাণের ধারণার সাথে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ। প্রবন্ধের মূল কথা হলো, কেবল দান-খয়রাত করে মানুষের সাময়িক উপকার করা নয়, বরং তাদের এমনভাবে গড়ে তোলা যেন তারা নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে। আলী হায়দারও ঠিক এই কাজটিই করেছেন; তিনি বেকার যুবকদের কর্মক্ষম করে তুলে তাদের জন্য স্থায়ী উপার্জনের পথ তৈরি করেছেন, যা তাদেরকে সমাজের উৎপাদনশীল সদস্যে পরিণত করেছে এবং প্রবন্ধের 'মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা'র ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকে 'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধের সামগ্রিক বিষয়বস্তু অত্যন্ত সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মানব-কল্যাণ হলো মানুষের সামগ্রিক উন্নতি, আত্মনির্ভরশীলতা এবং সমাজের সার্বিক মঙ্গলের জন্য কাজ করা। এটি কেবল অর্থ সাহায্য বা দাতব্য কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষকে কর্মক্ষম করে তোলা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করা এর প্রধান লক্ষ্য।

উদ্দীপকের শিক্ষানুরাগী আলী হায়দার একজন আলোকিত মানুষ, যিনি অবসরের পর নিজের জমানো টাকায় 'আলী হায়দার টেকনিক্যাল কলেজ' স্থাপন করে বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মক্ষম করে তুলেছেন। তার এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুবক-যুবতীরা প্রশিক্ষিত হয়ে দেশ-বিদেশে চাকরি করে নিজেদের এবং এলাকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনেছে। এটি কেবল আর্থিক সাহায্য নয়, বরং মানুষকে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করার এক মহৎ উদ্যোগ, যা 'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধের মূল চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মানব-কল্যাণ প্রবন্ধে মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তি বা পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মমর্যাদাশীল ও কর্মঠ করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আলী হায়দারের পদক্ষেপ ঠিক এই দর্শনকেই সমর্থন করে। তিনি 'আলোক বর্তিকা' নামক সেবা সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও, 'আলী হায়দার টেকনিক্যাল কলেজ' স্থাপন করে তিনি বেকারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবন ধারণের সুব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যা দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই মানব-কল্যাণের উদাহরণ। এর ফলস্বরূপ, সমাজে অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে, যা মানব-কল্যাণের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে।

অতএব, উদ্দীপকে আলী হায়দারের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোগ এবং সমাজের অবহেলিত অংশের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়াস 'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধের সামগ্রিক বিষয়বস্তুকে সুস্পষ্টভাবে এবং গভীরভাবে প্রতিফলিত করে। তাঁর কাজ প্রমাণ করে যে, প্রকৃত মানব-কল্যাণ নির্ভর করে মানুষকে কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তোলার উপর, কেবল সাময়িক সাহায্য প্রদানের উপর নয়।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ কানাই ও অন্যান্য পাইক-পেয়াদাদের সাথে মাসি-পিসির বাজারের তোলা নিয়ে ঝগড়া হয়।
Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

"হাতে দুটো পয়সা এলে তোমারও স্বভাব বিগড়ে যায়, কৈলেশ।" - উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দেনাপাওনা' গল্পের নিরুপমার বাবার। যৌতুক প্রথার নির্মমতার শিকার হয়ে চরম হতাশায় নিমজ্জিত নিরুপমার বাবা যখন পাত্রপক্ষের অর্থলোভ মেটাতে পারছিলেন না, তখন ঘটক কৈলেশের পক্ষ পরিবর্তন দেখে তিনি এই ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

এই উক্তির মাধ্যমে নিরুপমার বাবা ইঙ্গিত করেন যে, অর্থ মানুষের সততা ও শুভবুদ্ধিকে সহজেই প্রভাবিত করে তার স্বভাবকে বিগড়ে দিতে পারে। টাকার হাতছানি এলে ভালো মানুষেরও নৈতিক স্খলন ঘটে এবং তারা অন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করে। এটি সমাজে অর্থের প্রতি মানুষের দুর্নিবার লোভ এবং সেই লোভের কারণে সৃষ্ট নৈতিক অবক্ষয়ের এক গভীর পর্যবেক্ষণ।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকের রাশেদার স্বামীর সাথে 'মাসি-পিসি' গল্পের আহ্লাদীর স্বামী জহরের চরিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে। উভয়ই তাদের স্ত্রীদের প্রতি নির্মম ও অত্যাচারী।

'মাসি-পিসি' গল্পের জহর ছিল আহ্লাদীর স্বামী রূপে এক লোভী ও নিষ্ঠুর ব্যক্তি। সে আহ্লাদীর পৈতৃক সম্পত্তির লোভে তাকে মাসি-পিসির আশ্রয় থেকে ফিরিয়ে নিতে চাইত এবং তার প্রতি অমানবিক নির্যাতন চালাত। জহর আহ্লাদীকে বশীভূত করে তার সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে উদ্যত ছিল, যা নারীর প্রতি পুরুষের চরম হিংস্রতা ও শোষণমূলক মানসিকতার পরিচয় বহন করে।

উদ্দীপকে রাশেদার স্বামী নেশাখোর এবং অর্থের জন্য গর্ভবতী স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। সে নির্দয়ভাবে রাশেদার গায়ে হাত তোলে এবং তার অত্যাচারে রাশেদা প্রায়ই অজ্ঞান হয়ে যায়। জহরের মতোই রাশেদার স্বামীও স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর, লোভী এবং অত্যাচারী। জহর যেমন আহ্লাদীকে সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে নির্যাতন করত, তেমনি রাশেদার স্বামীও অর্থের লোভে রাশেদাকে নির্যাতন করে। এই নির্মমতা, শোষণমূলক মানসিকতা এবং শারীরিক নির্যাতনের দিক থেকে উভয় চরিত্রের মধ্যে গভীর সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকে বর্ণিত রাশেদার করুণ দশা এবং 'মাসি-পিসি' গল্পে আহাদীর অসহায়ত্ব তৎকালীন সমাজের নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিপীড়নের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। উভয় ক্ষেত্রেই নারী পুরুষের অত্যাচার, নির্যাতন ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়েছে, যা একটি গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এ প্রেক্ষিতে উদ্দীপকের সামাজিক সংকট 'মাসি-পিসি' গল্পের সমাজ বাস্তবতার অনুরূপ - এ মন্তব্যটি যথার্থ।

উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, পিতৃহীন রাশেদার স্বামীর সংসারে মোটেই সুখ নেই। অর্থের জন্য শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে মানসিক নির্যাতন করে এবং নেশাখোর স্বামী গর্ভবতী অবস্থায়ও তার গায়ে হাত তোলে। স্বামীর নির্মম অত্যাচারে সে প্রায়ই অজ্ঞান হয়ে যায়। এটি নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং শারীরিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ রূপ, যা সমাজে নারীর দুর্বল অবস্থানকে নির্দেশ করে। তবে রাশেদা শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদী হয়ে আইনের আশ্রয় নিয়ে নির্যাতনকারীদের শাস্তি বিধান করে, যা নারীর প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রকাশ।

'মাসি-পিসি' গল্পের সমাজ বাস্তবতায়ও নারীর প্রতি পুরুষের চরম নিপীড়ন ও সহিংসতা দেখা যায়। গল্পে আহাদী তার স্বামী জাব্বার কর্তৃক চরম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, যার মূল কারণ ছিল যৌতুক এবং অর্থনৈতিক শোষণ। জাব্বার আহাদীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করতে চেয়েছিল, যা নারীর প্রতি সমাজের নির্দয় মনোভাব ও পণ্য হিসেবে গণ্য করার চিত্র তুলে ধরে। আহাদী নির্যাতিত হলেও মাসি-পিসির সম্মিলিত প্রতিবাদী সত্তা তাকে রক্ষা করে। রাশেদা এবং আহাদী উভয়ই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিকার, যেখানে নারীর নিজস্ব কোনো মূল্য নেই এবং তাদের জীবন পুরুষের ইচ্ছাধীন। নির্যাতন, অর্থনৈতিক চাপ, এবং সমাজে নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব – এ বিষয়গুলো উদ্দীপক ও 'মাসি-পিসি' গল্পের সমাজ বাস্তবতাকে একসূত্রে গেঁথেছে।

সুতরাং, উদ্দীপকের সামাজিক সংকট, যেখানে নারী পারিবারিক সহিংসতা ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়, তা 'মাসি-পিসি' গল্পের নারীর প্রতি নৃশংসতা ও সমাজের নির্লিপ্ততার অনুরূপ। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি চরম অবিচার ও নির্যাতন স্পষ্ট, যা প্রমাণ করে যে মন্তব্যটি যথার্থ। সমাজে নারীর এই নিপীড়িত জীবনই উভয় রচনার মূল সুর।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
249

পাকা দুই ক্রোশ পথ হাঁটিয়া স্কুলে বিদ্যা অর্জন করিতে যাই। আমি একা নই-দশ-বারোজন। যাহাদেরই বাটী পল্লিগ্রামে, তাহাদেরই ছেলেদের শতকরা আশিজনকে এমনি করিয়া বিদ্যালাভ করিতে হয়। ইহাতে লাভের অঙ্কে শেষ পর্যন্ত একেবারে শূন্য না পড়িলেও, যাহা পড়ে, তাহাতে হিসাব করিবার পক্ষে এই কয়টা কথা চিন্তা করিয়া দেখিলেই যথেষ্ট হইবে যে, যে ছেলেদের সকাল আটটার মধ্যে বাহির হইয়া যাতায়াতে চার ক্রোশ পথ ভাঙিতে হয়—চার ক্রোশ মানে আট মাইল নয়, ঢের বেশি—বর্ষার দিনে মাথার ওপর মেঘের জল পায়ের নিচে এক হাঁটু কাদা এবং গ্রীষ্মের দিনে জলের বদলে কড়া সূর্য এবং কাদার বদলে ধুলার সাগর সাঁতার দিয়া স্কুল-ঘর করিতে হয়, সেই দুর্ভাগা বালকদের মা-সরস্বতী খুশি হইয়া বর দিবেন কি, তাহাদের যন্ত্রণা দেখিয়া কোথায় যে তিনি লুকাইবেন, ভাবিয়া পান না ।
তারপরে এই কৃতবিদ্য শিশুর দল বড় হইয়া একদিন গ্রামেই বসুন, আর ক্ষুধার জ্বালায় অন্যত্রই যান—তাঁদের চার ক্রোশ হাঁটা বিদ্যার তেজ আত্মপ্রকাশ করিবেই করিবে। কেহ কেহ বলেন শুনিয়াছি, আচ্ছা, যাঁদের ক্ষুধার জ্বালা, তাঁদের কথা না হয় নাই ধরিলাম কিন্তু যাঁদের সে জ্বালা নাই, তেমন সব ভদ্রলোকই বা কী সুখে গ্রাম ছাড়িয়া পলায়ন করেন? তাঁরা বাস করিতে থাকিলে তো পল্লির এত দুর্দশা হয় না ।
ম্যালেরিয়া কথাটা না হয় নাই পাড়িলাম। সে থাক, কিন্তু ওই চার ক্রোশ হাঁটার জ্বালায় কত ভদ্রলোকেই যে ছেলে-পুলে লইয়া গ্রাম ছাড়িয়া শহরে পালান তাহার আর সংখ্যা নাই। তারপরে একদিন ছেলে-পুলের পড়াও শেষ হয় বটে, তখন কিন্তু শহরের সুখ-সুবিধা রুচি লইয়া আর তাদের গ্রামে ফিরিয়া আসা চলে না। কিন্তু থাক এ-সকল বাজে কথা। স্কুলে যাই-দুক্রোশের মধ্যে এমন আরও তো দুই তিনখানা গ্রাম পার হইতে হয়। কার বাগানে আম পাকিতে শুরু করিয়াছে, কোন বনে বঁইচি ফল অপর্যাপ্ত ফলিয়াছে, কার গাছে কাঁঠাল এই পাকিল বলিয়া, কার মর্তমান রম্ভার কাঁদি কাটিয়া লইবার অপেক্ষা মাত্র, কার কানাচে ঝোপের মধ্যে আনারসের গায়ে রং ধরিয়াছে, কার পুকুরপাড়ের খেজুরমেতি কাটিয়া খাইলে ধরা পড়িবার সম্ভাবনা অল্প, এই সব খবর লইতেই সময় যায়, কিন্তু আসলে যা বিদ্যা-কামস্কাটকার রাজধানীর নাম কী এবং সাইবেরিয়ার খনির মধ্যে রূপা মেলে, না সোনা মেলে- এ সকল দরকারি তথ্য অবগত হইবার ফুরসতই মেলে না ।
কাজেই এক্জামিনের সময় এডেন কী জিজ্ঞাসা করিলে বলি পারশিয়ার বন্দর, আর হুমায়ুনের বাপের নাম জানিতে চাহিলে লিখিয়া দিয়া আসি তোগলক খাঁ এবং আজ চল্লিশের কোঠা পার হইয়াও দেখি, ও-সকল বিষয়ের ধারণা প্রায় একরকমই আছে-তারপরে প্রমোশনের দিন মুখ ভার করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া কখনো বা দল বাঁধিয়া মতলব করি, মাস্টারকে ঠ্যাঙানো উচিত, কখনো বা ঠিক করি, অমন বিশ্রী স্কুল ছাড়িয়া দেওয়াই কর্তব্য।
আমাদের গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে মাঝে মাঝেই স্কুলের পথে দেখা হইত। তাহার নাম ছিল মৃত্যুঞ্জয়। আমাদের চেয়ে সে বয়সে অনেক বড়। থার্ড ক্লাসে পড়িত। কবে সে যে প্রথম থার্ড ক্লাসে উঠিয়াছিল, এ খবর আমরা কেহই জানিতাম না- সম্ভবত তাহা প্রত্নতাত্ত্বিকের গবেষণার বিষয়-আমরা কিন্তু তাহার ওই থার্ড ক্লাসটাই চিরদিন দেখিয়া আসিয়াছি ।
তাহার ফোর্থ ক্লাসে পড়ার ইতিহাসও কখনো শুনি নাই, সেকেন্ড ক্লাসে উঠিবার খবরও কখনো পাই নাই । মৃত্যুঞ্জয়ের বাপ-মা, , ভাই-বোন কেহই ছিল না, ছিল শুধু গ্রামের এক প্রান্তে একটা প্রকাণ্ড আম-কাঁঠালের বাগান, আর তার মধ্যে একটা প্রকাণ্ড পোড়োবাড়ি, আর ছিল এক জ্ঞাতি খুড়া। খুড়ার কাজ ছিল ভাইপোর নানাবিধ দুর্নাম রটনা করা-সে গাঁজা খায়, সে গুলি খায়, এমনি আরও কত কি! তাঁর আর একটা কাজ ছিল বলিয়া বেড়ানো, ওই বাগানের অর্ধেকটা তাঁর নিজের অংশ, নালিশ করিয়া দখল করার অপেক্ষা মাত্র। অবশ্য দখল একদিন তিনি পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে জেলা-আদালতে নালিশ করিয়া নয়—ওপরের আদালতের হুকুমে। কিন্তু সে কথা পরে হইবে।
মৃত্যুঞ্জয় নিজে রাঁধিয়া খাইত এবং আমের দিনে ওই আম-বাগানটা জমা দিয়াই তাহার সারা বৎসরের খাওয়া-পরা চলিত এবং ভালো করিয়াই চলিত। যেদিন দেখা হইয়াছে, সেইদিনই দেখিয়াছি ছেঁড়া-খোঁড়া মলিন বইগুলি বগলে করিয়া পথের এক ধার দিয়া নীরবে চলিয়াছে। তাহাকে কখনো কারও সহিত যাচিয়া আলাপ করিতে দেখি নাই—বরঞ্চ উপযাচক হইয়া কথা কহিতাম আমরাই। তাহার প্রধান কারণ ছিল এই যে, দোকানের খাবার কিনিয়া খাওয়াইতে গ্রামের মধ্যে তাহার জোড়া ছিল না। আর শুধু ছেলেরাই নয়। কত ছেলের বাপ কতবার যে গোপনে ছেলেকে দিয়া তাহার কাছে স্কুলের মাহিনা হারাইয়া গেছে, বই চুরি গেছে ইত্যাদি বলিয়া টাকা আদায় করিয়া লইত, তাহা বলিতে পারি না । কিন্তু ঋণ স্বীকার করা তো দূরের কথা, ছেলে তাহার সহিত একটা কথা কহিয়াছে, এ কথাও কোনো বাপ ভদ্র সমাজে কবুল করিতে চাহিত না-গ্রামের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়ের ছিল এমনি সুনাম।
অনেক দিন মৃত্যুঞ্জয়ের দেখা নাই। একদিন শোনা গেল সে মর-মর। আর একদিন শোনা গেল, মালোপাড়ার এক বুড়া মালো তাহার চিকিৎসা করিয়া এবং তাহার মেয়ে বিলাসী সেবা করিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে যমের মুখ হইতে এ যাত্রা ফিরাইয়া আনিয়াছে ।
অনেক দিন তাহার মিষ্টান্নের সদ্ব্যয় করিয়াছি— মনটা কেমন করিতে লাগিল, একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকাইয়া তাহাকে দেখিতে গেলাম। তাহার পোড়োবাড়িতে প্রাচীরের বালাই নাই। স্বচ্ছন্দে ভিতরে ঢুকিয়া দেখি, ঘরের দরজা খোলা, বেশ উজ্জ্বল একটি প্রদীপ জ্বলিতেছে, আর ঠিক সমুখেই তক্তপোষের ওপর পরিষ্কার ধবধবে বিছানায় মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে, তাহার কঙ্কালসার দেহের প্রতি চাহিলেই বুঝা যায়, বাস্তবিক যমরাজ চেষ্টার ত্রুটি কিছু করেন নাই, তবে যে শেষ পর্যন্ত সুবিধা করিয়া উঠিতে পারেন নাই, সে কেবল ওই মেয়েটির জোরে। সে শিয়রে বসিয়া পাখার বাতাস করিতেছিল, অকস্মাৎ মানুষ দেখিয়া চমকিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। এই সেই বুড়া সাপুড়ের মেয়ে বিলাসী। তাহার বয়স আঠারো কি আটাশ ঠাহর করিতে পারিলাম না। কিন্তু মুখের প্রতি চাহিবামাত্রই টের পাইলাম, বয়স যাই হোক, খাটিয়া খাটিয়া আর রাত জাগিয়া জাগিয়া ইহার শরীরে আর কিছু নাই। ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মতো। হাত দিয়া এতটুকু স্পর্শ করিলে, এতটুকু নাড়াচাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।
মৃত্যুঞ্জয় আমাকে চিনিতে পারিয়া বলিল, “কে, ন্যাড়া?”
বলিলাম, “হুঁ।”
মেয়েটা ঘাড় হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল । মৃত্যুঞ্জয় দুই-চারিটি কথায় যাহা কহিল, তাহার মর্ম এই যে, প্রায় দেড় মাস হইতে চলিল সে শয্যাগত। মধ্যে দশ-পনের দিন সে অজ্ঞান অচৈতন্য অবস্থায় পড়িয়াছিল, এই কয়েক দিন হইল সে লোক চিনিতে পারিতেছে এবং যদিচ এখনো সে বিছানা ছাড়িয়া উঠিতে পারে না, কিন্তু আর ভয় নাই ।
ভয় নাই থাকুক । কিন্তু ছেলেমানুষ হইলেও এটা বুঝিলাম, আজও যাহার শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিবার ক্ষমতা হয় নাই, সেই রোগীকে এই বনের মধ্যে একাকী যে মেয়েটি বাঁচাইয়া তুলিবার ভার লইয়াছেন, সে কত বড় গুরুভার। দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি তাহার কত সেবা, কত শুশ্রূষা, কত ধৈর্য, কত রাতজাগা । সে কত বড় সাহসের কাজ! কিন্তু যে বস্তুটি এই অসাধ্য-সাধন করিয়া তুলিয়াছিল তাহার পরিচয় যদিচ সেদিন পাই নাই, কিন্তু আর একদিন পাইয়াছিলাম ।
ফিরিবার সময় মেয়েটি আর একটি প্রদীপ লইয়া আমার আগে আগে ভাঙা প্রাচীরের শেষ পর্যন্ত আসিল । এতক্ষণ পর্যন্ত সে একটি কথাও কহে নাই, এইবার আস্তে আস্তে বলিল, রাস্তা পর্যন্ত তোমায় রেখে আসব কি? বড় বড় আমগাছে সমস্ত বাগানটা যেন একটা জমাট অন্ধকারের মতো বোধ হইতেছিল, পথ দেখা তো দূরের কথা, নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যায় না। বলিলাম, “পৌঁছে দিতে হবে না, শুধু আলোটা দাও।”
সে প্রদীপটা আমার হাতে দিতেই তাহার উৎকণ্ঠিত মুখের চেহারাটা আমার চোখে পড়িল। আস্তে আস্তে সে বলিল, “একলা যেতে ভয় করবে না তো? একটু এগিয়ে দিয়ে আসব?” মেয়ে মানুষ জিজ্ঞাসা করে, ভয় করবে না তো। সুতরাং মনে যাই থাক, প্রত্যুত্তরে শুধু একটা “না” বলিয়াই অগ্রসর হইয়া গেলাম ।
সে পুনরায় কহিল, “ঘন জঙ্গলের পথ, একটু দেখে পা ফেলে যেয়ো।” সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়া উঠিল, কিন্তু এতক্ষণে বুঝিলাম, উদ্বেগটা তাহার কিসের জন্য এবং কেন সে আলো দেখাইয়া এই বনের পথ পার করিয়া দিতে চাহিতেছিল। হয়ত সে নিষেধ শুনিত না, সঙ্গেই যাইত, কিন্তু পীড়িত মৃত্যুঞ্জয়কে একাকী ফেলিয়া যাইতেই বোধ করি তাহার শেষ পর্যন্ত মন সরিল না ।
কুড়ি-পঁচিশ বিঘার বাগান। সুতরাং পথটা কম নয় । এই দারুণ অন্ধকারের মধ্যে প্রত্যেক পদক্ষেপই বোধ করি ভয়ে ভয়ে করিতে হইত, কিন্তু পরক্ষণই মেয়েটির কথাতেই সমস্ত মন এমনি আচ্ছন্ন হইয়া রহিল যে, ভয় পাইবার আর সময় পাইলাম না। কেবল মনে হইতে লাগিল, একটা মৃতকল্প রোগী লইয়া থাকা কত কঠিন। মৃত্যুঞ্জয় তো যে-কোনো মুহূর্তেই মরিতে পারিত, তখন সমস্ত রাত্রি এই বনের মধ্যে মেয়েটি একাকী কী করিত । কেমন করিয়া তাহার সে রাতটা কাটিত।
এই প্রসঙ্গে অনেকদিন পরের একটা কথা আমার মনে পড়ে। এক আত্মীয়ের মৃত্যুকালে আমি উপস্থিত ছিলাম । অন্ধকার রাত্রি—বাটীতে ছেলে-পুলে, চাকর-বাকর নাই, ঘরের মধ্যে শুধু তার সদ্যবিধবা স্ত্রী আর আমি। তার স্ত্রী তো শোকের আবেগে দাপাদাপি করিয়া এমন কাণ্ড করিয়া তুলিলেন যে, ভয় হইল তাহারও প্রাণটা বুঝি বাহির হইয়া যায় বা! কাঁদিয়া কাঁদিয়া বারবার আমাকে প্রশ্ন করিতে লাগিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় যখন সহমরণে যাইতে চাহিতেছেন, তখন সরকারের কী? তাঁর যে আর তিলার্ধ বাঁচিতে সাধ নাই, এ কি তাহারা বুঝিবে না? তাহাদের ঘরে কি স্ত্রী নাই? তাহারা কি পাষাণ? আর এই রাত্রেই গ্রামের পাঁচজন যদি নদীর তীরের কোনো একটা জঙ্গলের মধ্যে তাঁর সহমরণের যোগাড় করিয়া দেয় তো পুলিশের লোক জানিবে কী করিয়া? এমনি কত কি । কিন্তু আমার তো আর বসিয়া বসিয়া তাঁর কান্না শুনিলেই চলে না। পাড়ায় খবর দেওয়া চাই—অনেক জিনিস যোগাড় করা চাই। কিন্তু আমার বাহিরে যাইবার প্রস্তাব শুনিয়াই তিনি প্রকৃতিস্থ হইয়া উঠিলেন। চোখ মুছিয়া বলিলেন, “ভাই, যা হবার সে তো হইয়াছে, আর বাইরে গিয়া কী হইবে? রাতটা কাটুক না।” বলিলাম, “অনেক কাজ, না গেলেই যে নয় । ”
তিনি বলিলেন, “হোক কাজ, তুমি বসো।”
বলিলাম, “বসলে চলবে না, একবার খবর দিতেই হইবে”, বলিয়া পা বাড়াইবামাত্রেই তিনি চিৎকার করিয়া উঠিলেন, “ওরে বাপরে! আমি একলা থাকতে পারব না।”
কাজেই আবার বসিয়া পড়িতে হইল । কারণ, তখন বুঝিলাম, যে স্বামী জ্যান্ত থাকতে তিনি নির্ভয়ে পঁচিশ বৎসর একাকী ঘর করিয়াছেন, তাঁর মৃত্যুটা যদি-বা সহে তাঁর মৃতদেহটা এই অন্ধকার রাত্রে পাঁচ মিনিটের জন্যও সহিবে না। বুক যদি কিছুতে ফাটে তো সে এই মৃত স্বামীর কাছে একলা থাকিলে ।
কিন্তু দুঃখটা তাহার তুচ্ছ করিয়া দেখানও আমার উদ্দেশ্য নহে। কিংবা তাহা খাঁটি নয় এ কথা বলাও আমার অভিপ্ৰায় নহে। কিংবা একজনের ব্যবহারেই তাহার চূড়ান্ত মীমাংসা হইয়া গেল তাহাও নহে। কিন্তু এমন আরও অনেক ঘটনা জানি, যাহার উল্লেখ না করিয়াও আমি এই কথা বলিতে চাই যে, শুধু কর্তব্যজ্ঞানের জোরে অথবা বহুকাল ধরিয়া একসঙ্গে ঘর করার অধিকারেই এই ভয়টাকে কোনো মেয়েমানুষই অতিক্রম করিতে পারে না। ইহা আর একটি শক্তি, যাহা বহু স্বামী-স্ত্রী একশ বৎসর একত্রে ঘর করার পরেও হয়ত তাহার কোনো সন্ধান পায় না।
কিন্তু সহসা সে শক্তির পরিচয় যখন কোনো নরনারীর কাছে পাওয়া যায়, তখন সমাজের আদালতে আসামি করিয়া তাহাদের দণ্ড দেওয়ার আবশ্যক যদি হয় তো হোক, কিন্তু মানুষের যে বস্তুটি সামাজিক নয়, সে নিজে যে ইহাদের দুঃখে গোপন অশ্রু বিসর্জন না করিয়া কোনো মতেই থাকিতে পারে না ।
প্রায় মাস দুই মৃত্যুঞ্জয়ের খবর লই নাই। যাঁহারা পল্লিগ্রাম দেখেন নাই, কিংবা ওই রেলগাড়ির জানালায় মুখ বাড়াইয়া দেখিয়াছেন, তাঁহারা হয়ত সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিবেন, এ কেমন কথা? এ কি কখনো সম্ভব হইতে পারে যে, অত বড় অসুখটা চোখে দেখিয়া আসিয়াও মাস-দুই আর তার খবরই নাই । তাহাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্যক যে, এ শুধু সম্ভব নয়, এ-ই হইয়া থাকে। একজনের বিপদে পাড়াসুদ্ধ ঝাঁক বাঁধিয়া উপুড় হইয়া পড়ে, এই যে, একটা জনশ্রুতি আছে, জানি না তাহা সত্যযুগের পল্লিগ্রামে ছিল কি না, কিন্তু একালে তো কোথাও দেখিয়াছি বলিয়া মনে করিতে পারি না । তবে তাহার মরার খবর যখন পাওয়া যায় নাই, তখন সে যে বাঁচিয়া আছে এ ঠিক।
এমনি সময়ে হঠাৎ একদিন কানে গেল, মৃত্যুঞ্জয়ের সেই বাগানের অংশীদার খুড়া তোলপাড় করিয়া বেড়াইতেছেন যে, গেল গেল, গ্রামটা এবার রসাতলে গেল। নালতের মিত্তির বলিয়া সমাজে আর তাঁর মুখ বাহির করিবার যো রহিল না-অকালকুষ্মাণ্ডটা একটা সাপুড়ের মেয়ে নিকা করিয়া ঘরে আনিয়াছে। আর শুধু নিকা নয়, তাও না হয় চুলায় যাক, তাহার হাতে ভাত পর্যন্ত খাইতেছে। গ্রামে যদি ইহার শাসন না থাকে তো বনে গিয়া বাস করিলেই তো হয়। কোড়োলা, হরিপুরের সমাজ একথা শুনিলে যে – ইত্যাদি ইত্যাদি । - তখন ছেলে বুড়ো সকলের মুখেই ওই এক কথা—অ্যাঁ এ হইল কী? কলি কি সত্যই উল্টাইতে বসিল ।
খুড়া বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, এ যে ঘটিবে তিনি অনেক আগেই জানিতেন। তিনি শুধু তামাশা দেখিতেছিলেন, কোথাকার জল কোথায় গিয়া পড়ে। নইলে পর নয়, প্রতিবেশী নয়, আপনার ভাইপো । তিনি কি বাড়ি লইয়া যাইতে পারিতেন না? তাঁহার কি ডাক্তার-বৈদ্য দেখাইবার ক্ষমতা ছিল না? তবে কেন যে করেন নাই, এখন দেখুন সবাই । কিন্তু আর তো চুপ করিয়া থাকা যায় না। এ যে মিত্তির বংশের নাম ডুবিয়া যায়। গ্রামের যে মুখ পোড়ে ।
তখন আমরা গ্রামের লোক মিলিয়া যে কাজটা করিলাম, তাহা মনে করিলে আমি আজও লজ্জায় মরিয়া যাই । খুড়া চলিলেন নালতের মিত্তির বংশের অভিভাবক হইয়া, আর আমরা দশ-বারোজন সঙ্গে চলিলাম গ্রামের বদন দগ্ধ না হয় এইজন্য ।
মৃত্যুঞ্জয়ের পোড়োবাড়িতে গিয়া যখন উপস্থিত হইলাম তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা হইয়াছে। মেয়েটি ভাঙা বারান্দায় একধারে রুটি গড়িতেছে। অকস্মাৎ লাঠিসোটা হাতে এতগুলি লোককে উঠানের ওপর দেখিয়া ভয়ে নীলবর্ণ হইয়া গেল। খুড়া ঘরের মধ্যে উঁকি মারিয়া দেখলেন, মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে। চট করিয়া শিকলটা টানিয়া দিয়া সেই ভয়ে মৃতপ্রায় মেয়েটিকে সম্ভাষণ শুরু করিলেন। বলা বাহুল্য, জগতের কোনো খুড়া কোনো কালে বোধ করি ভাইপোর-স্ত্রীকে ওরূপ সম্ভাষণ করে নাই। সে এমনি যে, মেয়েটি হীন সাপুড়ের মেয়ে হইয়াও তাহা সহিতে পারিল না, চোখ তুলিয়া বলিল, বাবা আমারে বাবুর সাথে নিকা দিয়েছে জানো? খুড়া বলিলেন তবে রে! ইত্যাদি ইত্যাদি এবং সঙ্গে সঙ্গেই দশ-বারোজন বীরদর্পে হুংকার দিয়া তাহার ঘাড়ে পড়িল। কেহ ধরিল চুলের মুঠি, কেহ ধরিল কান, কেহ ধরিল হাত-দুটো এবং যাহাদের সে সুযোগ ঘটিল না তাহারাও নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিল না ।
কারণ, সংগ্রামস্থলে আমরা কাপুরুষের ন্যায় চুপ করিয়া থাকিতে পারি, আমাদের বিরুদ্ধে এত বড় দুর্নাম রটনা
করিতে বোধ করি নারায়ণের কর্তৃপক্ষেরও চক্ষুলজ্জা হইবে। এইখানে একটা অবান্তর কথা বলিয়া রাখি। শুনিয়াছি নাকি বিলাত প্রভৃতি স্লেচ্ছদেশে পুরুষদের মধ্যে একটা কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুর্বল এবং নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই। এ আবার একটা কী কথা! সনাতন হিন্দু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি যাহারই গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে
পারা যায়। তা সে নরনারী যাই হোক না কেন ।
মেয়েটি প্রথমেই সেই যা একবার আর্তনাদ করিয়া উঠিয়াছিল, তারপর একেবারে চুপ করিয়া গেল । কিন্তু আমরা যখন তাহাকে গ্রামের বাহিরে রাখিয়া আসিবার জন্য হিঁচড়াইয়া লইয়া চলিলাম, তখন মিনতি করিয়া বলিতে লাগিল, “বাবুরা, আমাকে একটিবার ছেড়ে দাও আমি রুটিগুলো ঘরে দিয়ে আসি। বাইরে শিয়াল কুকুরে খেয়ে যাবে—রোগা মানুষ সমস্ত রাত খেতে পাবে না।”
মৃত্যুঞ্জয় রুদ্ধ ঘরের মধ্যে পাগলের মতো মাথা কুটিতে লাগিল, দ্বারে পদাঘাত করিতে লাগিল এবং শ্রাব্য-অশ্রাব্য বহুবিধ ভাষা প্রয়োগ করিতে লাগিল। কিন্তু আমরা তাহাতে তিলার্ধ বিচলিত হইলাম না। স্বদেশের মঙ্গলের জন্য সমস্ত অকাতরে সহ্য করিয়া টানিয়া লইয়া চলিলাম ।
চলিলাম বলিতেছি, কেননা, আমিও বরাবর সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু কোথায় আমার মধ্যে একটুখানি দুর্বলতা ছিল, আমি তার গায়ে হাত দিতে পারি নাই। বরঞ্চ কেমন যেন কান্না পাইতে লাগিল । সে যে অত্যন্ত অন্যায় করিয়াছে এবং তাহাকে গ্রামের বাহির করাই উচিত বটে, কিন্তু এটাই যে আমরা ভালো কাজ করিতেছি সেও কিছুতেই মনে করিতে পারিলাম না। কিন্তু আমার কথা থাক ।
আপনারা মনে করিবেন না, পল্লিগ্রামে উদারতার একান্ত অভাব। মোটেই না। বরঞ্চ বড়লোক হইলে আমরা
এমন সব ঔদার্য প্রকাশ করি যে, শুনিলে আপনারা অবাক হইয়া যাইবেন।
এই মৃত্যুঞ্জয়টাই যদি না তাহার হাতে ভাত খাইয়া অমার্জনীয় অপরাধ করিত তাহা হইলে তো আমাদের এত রাগ হইত না । আর কায়েতের ছেলের সঙ্গে সাপুড়ের মেয়ের নিকা-এ তো একটা হাসিয়া উড়াইবার কথা কিন্তু কাল করিল যে ওই ভাত খাইয়া । হোক না সে আড়াই মাসের রোগী, হোক না সে শয্যাশায়ী কিন্তু তাই বলিয়া ভাত! লুচি নয়, সন্দেশ নয়, পাঁঠার মাংস নয়। ভাত খাওয়া যে অন্ন-পাপ। সে তো আর সত্য সত্যই মাপ করা যায় না। তা নইলে পল্লিগায়ের লোক সংকীর্ণচিত্ত নয় । চার ক্রোশ হাঁটা বিদ্যা যেসব ছেলের পেটে তারাই তো একদিন বড় হইয়া সমাজের মাথা হয়। দেবী বীণাপাণির বরে সংকীর্ণতা তাহাদের মধ্যে আসিবে কী করিয়া!
এই তো ইহারই কিছুদিন পরে, প্রাতঃস্মরণীয় স্বর্গীয় মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের বিধবা পুত্রবধূ মনের বৈরাগ্যে বছর দুই কাশীবাস করিয়া যখন ফিরিয়া আসিলেন, তখন নিন্দুকেরা কানাকানি করিতে লাগিল যে, অর্ধেক সম্পত্তি ওই বিধবার এবং পাছে তাহা বেহাত হয় এই ভয়েই ছোটবাবু অনেক চেষ্টা, অনেক পরিশ্রমের পর বৌঠানকে যেখান হইতে ফিরাইয়া আনিয়াছেন, সেটা কাশীই বটে । যাই হোক, ছোটবাবু তাহার স্বাভাবিক ঔদার্যে গ্রামের বারোয়ারি পূজাবাবদ দুইশত টাকা দান করিয়া, পাঁচখানা গ্রামের ব্রাহ্মণের সদক্ষিণা-উত্তর ফলাহারের পর, প্রত্যেক সদব্রাহ্মণের হাতে যখন একটা করিয়া কাঁসার গেলাস দিয়া বিদায় করিলেন, তখন ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল । এমনকি, পথে আসিতে অনেকেই দশের এবং দেশের কল্যাণের নিমিত্ত কামনা করিতে লাগিলেন, এমন সব যারা বড়লোক তাদের বাড়িতে বাড়িতে, মাসে মাসে এমন সদানুষ্ঠানের আয়োজন হয় না কেন?মনসা দেবী আমার মা- ঢোঁড়ার বিষ তুই নে, তোর বিষ ঢোঁড়ারে দে—
ওলটপালট পাতাল-ফোঁড়-
-দুধরাজ, মণিরাজ ।
কার আজ্ঞা-বিষহরির আজ্ঞা ।
ইহার মানে যে কী তাহা আমি জানি না। কারণ, যিনি এই মন্ত্রেরও দ্রষ্টা ঋষি ছিলেন-নিশ্চয় কেহ না কেহ ছিলেন-তাঁর সাক্ষাৎ কখনও পাই নাই ।
অবশেষে একদিন এই মন্ত্রের সত্য মিথ্যার চরম মীমাংসা হইয়া গেল বটে, কিন্তু যতদিন না হইল ততদিন সাপ ধরার জন্য চতুর্দিকে প্রসিদ্ধ হইয়া গেলাম । সবাই বলাবলি করিতে লাগিল, হ্যাঁ, ন্যাড়া একজন গুণী লোক বটে । সন্ন্যাসী অবস্থায় কামাখ্যায় গিয়া সিদ্ধ হইয়া আসিয়াছে । এতটুকু বয়সের মধ্যে এত বড় ওস্তাদ হইয়া অহংকারে আমার মাটিতে পা পড়ে না, এমনি যো হইল ।
বিশ্বাস করিল না শুধু দুই জন। আমার গুরু যে, সে তো ভালো মন্দ কোনো কথাই বলিত না। কিন্তু বিলাসী মাঝে মাঝে মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিত, ঠাকুর, এসব ভয়ংকর জানোয়ার, একটু সাবধানে নাড়াচাড়া করো । বস্তুত বিষদাঁত ভাঙা, সাপের মুখ হইতে বিষ বাহির করা প্রভৃতি কাজগুলো এমনি অবহেলার সহিত করিতে শুরু করিয়াছিলাম যে, সেসব মনে পড়িলে আমার আজও গা কাঁপে।
আসলে কথা হইতেছে এই যে, সাপ ধরাও কঠিন নয় এবং ধরা সাপ দুই চারদিন হাঁড়িতে পুরিয়া রাখার পরে
তাহার বিষদাঁত ভাঙাই হোক আর নাই হোক, কিছুতেই কামড়াইতে চাহে না। চক্র তুলিয়া কামড়াইবার ভান
করে, ভয় দেখায়, কিন্তু কামড়ায় না।
মাঝে মাঝে আমাদের গুরুশিষ্যের সহিত বিলাসী তর্ক করিত। সাপুড়েদের সবচেয়ে লাভের ব্যবসা শিকড় বিক্রি করা, যা দেখাইবামাত্র সাপ পালাইতে পথ পায় না। কিন্তু তার পূর্বে সামান্য একটু কাজ করিতে হইত । যে সাপটা শিকড় দেখিয়া পালাইবে, তাহার মুখে একটা লোহার শিক পুড়াইয়া বার কয়েক ছ্যাঁকা দিতে হয়। তারপর তাহাকে শিকড়ই দেখান হোক বা একটা কাঠিই দেখান হোক, সে কোথায় পালাইবে তা ভাবিয়া পায় না। এই কাজটার বিরুদ্ধে বিলাসী ভয়ানক আপত্তি করিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে বলিত, “দেখ, এমন করে মানুষ ঠকায়ো না।” মৃত্যুঞ্জয় কহিত, “সবাই করে-এতে দোষ কী?”
বিলাসী বলিত, “করুক গে সবাই। আমাদের তো খাবার ভাবনা নেই, আমরা কেন মিছামিছি লোক ঠকাতে যাই ।” আর একটা জিনিস আমি বারবার লক্ষ করিয়াছি। সাপ ধরার বায়না আসিলেই বিলাসী নানাপ্রকারে বাধা দিবার চেষ্টা করিত—আজ শনিবার, আজ মঙ্গলবার, এমনি কত কি। মৃত্যুঞ্জয় উপস্থিত না থাকিলে সে তো একবারেই ভাগাইয়া দিত, কিন্তু উপস্থিত থাকিলে মৃত্যুঞ্জয় নগদ টাকার লোভ সামলাইতে পারিত না। আর আমার তো একরকম নেশার মত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল । নানাপ্রকারে তাহাকে উত্তেজিত করিতে চেষ্টার ত্রুটি করিতাম না। বস্তুত ইহার মধ্যে মজা ছাড়া ভয় যে কোথায় ছিল, এ আমাদের মনেই স্থান পাইত না। কিন্তু এই পাপের দণ্ড আমাকে একদিন ভালো করিয়াই দিতে হইল ।
সেদিন ক্রোশ-দেড়েক দূরে এক গোয়ালার বাড়িতে সাপ ধরিতে গিয়াছি। বিলাসী বরাবরই সঙ্গে যাইত, আজও সঙ্গে ছিল। মেটে ঘরের মেঝে খানিকটা খুঁড়িতেই একটা গর্তের চিহ্ন পাওয়া গেল। আমরা কেহই লক্ষ করি নাই, কিন্তু বিলাসী সাপুড়ের মেয়ে-সে হেঁট হইয়া কয়েক টুকরা কাগজ তুলিয়া লইয়া আমাকে বলিল, “ঠাকুর, একটু সাবধানে খুঁড়ো । সাপ একটা নয় একজোড়া তো আছে বটেই হয়ত বা বেশি থাকিতে পারে।”
মৃত্যুঞ্জয় বলিল, “এরা যে বলে একটাই এসে ঢুকেছে। একটাই দেখতে পাওয়া গেছে।” বিলাসী কাগজ দেখাইয়া কহিল, “দেখছ না বাসা করেছিল?” মৃত্যুঞ্জয় কহিল, “কাগজ তো ইঁদুরেও আনতে পারে।”
বিলাসী কহিল, “দু-ই হতে পারে। কিন্তু দুটো আছে আমি বলছি।”
বাস্তবিক বিলাসীর কথাই ফলিল এবং মর্মান্তিকভাবেই সেদিন ফলিল। মিনিট-দশেকের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড খরিশ গোখরো ধরিয়া ফেলিয়া মৃত্যুঞ্জয় আমার হাতে দিল। কিন্তু সেটাকে ঝাঁপির মধ্যে পুরিয়া ফিরিতে না ফিরিতেই মৃত্যুঞ্জয় “উঃ’ করিয়া নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার হাতের উলটা পিঠ দিয়ে ঝরঝর করিয়া রক্ত পড়িতেছিল।
প্রথমটা যেন সবাই হতবুদ্ধি হইয়া গেলাম । কারণ সাপ ধরিতে গেলে সে পালাইবার জন্য ব্যাকুল না হইয়া বরঞ্চ গর্ত হইতে একহাত মুখ বাহির করিয়া দংশন করে, এমন অভাবনীয় ব্যাপার জীবনে এই একটিবার দেখিয়াছি । পরক্ষণেই বিলাসী চিৎকার করিয়া ছুটিয়া গিয়া আঁচল দিয়া তাহার হাতটা বাঁধিয়া ফেলিল এবং যত রকমের শিকড়-বাকড় সে সঙ্গে আনিয়াছিল সমস্তই তাহাকে চিবাইতে দিল। মৃত্যুঞ্জয়ের নিজের মাদুলি তো ছিলই, তাহার উপরে আমার মাদুলিটাও খুলিয়া তাহার হাতে বাঁধিয়া দিলাম। আশা, বিষ ইহার ঊর্ধ্বে আর উঠিবে না, বরং সেই ‘বিষহরির আজ্ঞা' মন্ত্রটা সতেজে বারংবার আবৃত্তি করিতে লাগিলাম। চতুর্দিকে ভিড় জমিয়া গেল এবং এ অঞ্চলের মধ্যে যেখানে যত গুণী ব্যক্তি আছেন সকলকে খবর দিবার জন্য দিকে দিকে লোক ছুটিল । বিলাসীর বাপকে সংবাদ দিবার জন্য লোক গেল ।
আমার মন্ত্র পড়ার আর বিরাম নাই, কিন্তু ঠিক সুবিধা হইতেছে বলিয়া মনে হইল না । তথাপি আবৃত্তি সমভাবেই চলিতে লাগিল । কিন্তু মিনিট পনের কুড়ি পরেই যখন মৃত্যুঞ্জয় একবার বমি করিয়া দিল, তখন বিলাসী মাটির ওপর একবারে আছাড় খাইয়া পড়িল । আমিও বুঝিলাম, বিষহরির দোহাই বুঝি-বা আর খাটে না ।
নিকটবর্তী আরও দুই-চারিজন ওস্তাদ আসিয়া পড়িলেন এবং আমরা কখনও-বা একসঙ্গে কখনও আলাদা তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর দোহাই পাড়িতে লাগিলাম । কিন্তু বিষ দোহাই মানিল না, রোগীর অবস্থা ক্রমেই মন্দ হইতে লাগিল। যখন দেখা গেল ভালো কথায় হইবে না, তখন তিন-চারজন ওঝা মিলিয়া বিষকে এমনি অকথ্য অশ্রাব্য গালিগালাজ করিতে লাগিল যে, বিষের কান থাকিলে সে মৃত্যুঞ্জয় তো মৃত্যুঞ্জয়, সেদিন দেশ ছাড়িয়া পলাইত। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না । আরও আধ ঘণ্টা ধ্বস্তাধ্বস্তির পরে রোগী তাহার বাপ মায়ের দেওয়া মৃত্যুঞ্জয় নাম, তাহার শ্বশুরের দেওয়া মন্ত্রৌষধি সমস্ত মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়া ইহলোকের লীলা সাঙ্গ করিল। বিলাসী তাহার স্বামীর মাথাটা কোলে করিয়া বসিয়াছিল সে যেন একেবারে পাথর হইয়া গেল ।
যাক, তাহার দুঃখের কাহিনিটি আর বাড়াইব না। কেবল এইটুকু বলিয়া শেষ করিব যে, সে সাত দিনের বেশি বাঁচিয়া থাকাটা সহিতে পারিল না। আমাকে শুধু একদিন বলিয়াছিল, ঠাকুর আমার মাথার দিব্যি রইল, এসব তুমি আর কখনও করো না ।
আমার মাদুলি-কবচ তো মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে কবরে গিয়াছিল, ছিল শুধু বিষহরির আজ্ঞা। কিন্তু সে আজ্ঞা যে
ম্যাজিস্ট্রেটের আজ্ঞা নহে এবং সাপের বিষ যে বাঙালির বিষ নয়, তাহা আমিও বুঝিয়াছিলাম । একদিন গিয়া শুনিলাম, ঘরে তো আর বিষের অভাব ছিল না, বিলাসী আত্মহত্যা করিয়া মরিয়াছে এবং শাস্ত্রমতে সে নিশ্চয় নরকে গিয়াছে। কিন্তু যেখানেই যাক, আমার নিজের যখন যাইবার সময় আসিবে, তখন ওইরূপ কোনো একটা নরকে যাওয়ার প্রস্তাবে পিছাইয়া দাঁড়াইব না, এইমাত্র বলিতে পারি ।
খুড়া মশাই ষোল আনা বাগান দখল করিয়া অত্যন্ত বিজ্ঞের মতো চারিদিকে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, ওর যদি না অপঘাত-মৃত্যু হবে, তো হবে কার? পুরুষমানুষ অমন একটা ছেড়ে দশটা করুক না, তাতে তো তেমন আসে যায় না-না হয় একটু নিন্দাই হতো। কিন্তু হাতে ভাত খেয়ে মরতে গেলি কেন? নিজে মরলো, আমার পর্যন্ত মাথা হেঁট করে গেল । না পেলে এক ফোঁটা আগুন, না পেলে একটা পিণ্ডি, না হলো একটা ভুজ্যি উচ্ছৃণ্ড্য। গ্রামের লোক একবাক্যে বলিতে লাগিল, তাহাতে আর সন্দেহ কী! অন্নপাপ । বাপ রে! এর কি আর প্রায়শ্চিত্ত আছে।
বিলাসীর আত্মহত্যার ব্যাপারটা অনেকের কাছে পরিহাসের বিষয় হইল। আমি প্রায় ভাবি, এ অপরাধ হয়ত ইহারা উভয়েই করিয়াছিল, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় তো পল্লিগ্রামেরই ছেলে, পাড়াগাঁয়ের তেলে-জলেই তো মানুষ । তবু অত বড় দুঃসাহসের কাজে প্রবৃত্ত করিয়াছিল তাহাকে যে বস্তুটা সেটা কেহ একবার চোখ মেলিয়া দেখিতে পাইল না ?
আমার মনে হয়, যে দেশের নরনারীর মধ্যে পরস্পরের হৃদয় জয় করিয়া বিবাহ করিবার রীতি নাই, বরঞ্চ তাহা নিন্দার সামগ্রী, যে দেশে নরনারী আশা করিবার সৌভাগ্য, আকাঙ্ক্ষা করিবার ভয়ংকর আনন্দ হইতে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত, যাহাদের জয়ের গর্ব, পরাজয়ের ব্যথা কোনোটাই জীবনে একটিবারও বহন করিতে হয় না, যাহাদের ভুল করিবার দুঃখ, আর ভুল না করিবার আত্মপ্রসাদ, কিছুরই বালাই নাই, যাহাদের প্রাচীন এবং বহুদর্শী বিজ্ঞ সমাজ সর্ব প্রকারের হাঙ্গামা হইতে অত্যন্ত সাবধানে দেশের লোককে তফাৎ করিয়া, আজীবন কেবল ভালোটি হইয়া থাকিবারই ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছেন, তাই বিবাহ ব্যাপারটা যাহাদের শুধু নিছক Contract তা সে যতই কেননা বৈদিক মন্ত্ৰ দিয়া Document পাকা করা হোক, সে দেশের লোকের সাধ্যই নাই মৃত্যুঞ্জয়ের অন্নপাপের কারণ বোঝে। বিলাসীকে যাঁহারা পরিহাস করিয়াছিলেন, তাঁহারা সাধু গৃহস্থ এবং সাধ্বী গৃহিণী— অক্ষয় সতীলোক তাঁহারা সবাই পাইবেন, তাও আমি জানি কিন্তু সেই সাপুড়ের মেয়েটি যখন একটি পীড়িত শয্যাগত লোককে তিল তিল করিয়া জয় করিতেছিল, তাহার তখনকার সেই গৌরবের কণামাত্র হয়ত আজিও ইহাদের কেহ চোখে দেখেন নাই। মৃত্যুঞ্জয় হয়ত নিতান্তই একটা তুচ্ছ মানুষ ছিল, কিন্তু তাহার হৃদয় জয় করিয়া দখল করার আনন্দটাও তুচ্ছ নয়, সে সম্পদও অকিঞ্চিৎকর নহে ।
এই বস্তুটাই এ দেশের লোকের পক্ষে বুঝিয়া উঠা কঠিন। আমি ভূদেববাবুর পারিবারিক প্রবন্ধেরও দোষ দিব না এবং শাস্ত্রীয় তথা সামাজিক বিধি-ব্যবস্থারও নিন্দা করিব না । করিলেও মুখের ওপর কড়া জবাব দিয়া যাঁহারা বলিবেন, এই হিন্দু সমাজ তাহার নির্ভুল বিধিব্যবস্থার জোরেই অত শতাব্দীর অতগুলো বিপ্লবের মধ্যে বাঁচিয়া আছে, আমি তাঁহাদেরও অতিশয় ভক্তি করি, প্রত্যুত্তরে আমি কখনই বলিব না, টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়, এবং অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে। আমি শুধু এই বলিব যে, বড়লোকের নন্দগোপালটির মতো দিবারাত্রি চোখে চোখে এবং কোলে কোলে রাখিলে যে সে বেশটি থাকিবে, তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই, কিন্তু একেবারে তেলাপোকাটির মত বাঁচাইয়া রাখার চেয়ে এক আধবার কোল হইতে নামাইয়া আরও পাঁচজন মানুষের মতো দু-এক পা হাঁটিতে দিলেই প্রায়শ্চিত্ত করার মত পাপ হয় না ।

Related Question

View All
উত্তরঃ 48 বছর

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯ মে ১৯০৮ – ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৬) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী লেখক। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। তাঁর রচনায় মনস্তত্ত্বের গভীরতা ও বাস্তবতার কঠিন চিত্র ফুটে উঠেছে। মার্কসবাদী দর্শন ও ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণ তাঁর সাহিত্যকর্মে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে 'পদ্মানদীর মাঝি', 'পুতুলনাচের ইতিকথা', 'দিবারাত্রির কাব্য' ইত্যাদি।

Satt AI
Satt AI
5 days ago
441
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews