রাজার ঘরে ছেলে সন্তান আসার আনন্দে রাজা রাজভান্ডার খুলে দিয়েছিলেন।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পে রাজার বিশাল বড়ো রাজ্য। কিন্তু ভোগ করার মতো রাজার কোনো সন্তান নেই। সন্তান প্রত্যাশায় রাজা একে একে সাতটি বিয়ে করেন। অনেক দিন পর ছোটোরানি রাজাকে খুশির খবর দিলেন। তাদের রাজ্যে ছেলে সন্তান আসবে। একথা শুনে রাজা রাজভান্ডার খুলে দিলেন এবং ঘোষণা দিলেন মিঠাইমন্ডা, মণি-মানিক যার যত ইচ্ছা নিয়ে যেতে বলেন। রাজ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ উন্মুক্ত করে দিলেন। দীর্ঘ দিন নিঃসন্তান থাকার কারণে রাজার মনে অনেক কষ্ট ছিল। তাই ছেলে সন্তান আসার আনন্দে রাজা রাজভান্ডার খুলে দিয়েছিল।
সাত ভাই চম্পা' গল্পে রাজার বিশাল বড়ো রাজ্য। কিন্তু ভোগ করার মতো কোনো সন্তান নেই। সন্তান প্রত্যাশায় রাজা একে একে সাতটি বিয়ে করেন। ছোটোরানিকে রাজা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন কারণ ছোটোরানি ছিলেন শান্ত-স্বভাবের। বড়োরানিরা ছিলেন অত্যন্ত অহংকারী।
দীর্ঘ দিন পর ছোটোরানি রাজাকে খুশির সংবাদ দিলেন। তাদের রাজ্যে ছেলে সন্তান আসবে। খুশিতে রাজা রাজভান্ডার খুলে দেন সাধারণ মানুষের জন্য। এ সংবাদ শুনে বড়োরানিরা ষড়যন্ত্র করা শুরু করেন।
রাজা ছোটোরানিকে অনেক ভালোবাসতেন। রাজা তাদের সন্তানকে দেখার জন্য অধিক আগ্রহে অপেক্ষা করেন। তা দেখে বড়োরানিরা হিংসায় ফেটে পড়ে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ছোটোরানির ঘরে আসে সাতটি ছেলে এবং একটি মেয়ে সন্তান। বড়োরানিরা তা সহ্য করতে পারেনি। তাই তারা ছোটোরানির সাতটি ছেলে এবং একটি মেয়েকে হাঁড়িতে ভরে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। তারা ছোটোরানি সম্পর্কে রাজাকে মিথ্যা কথা বলে। রাজা রাগান্বিত হয়ে ছোটোরানিকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। বড়োরানিরা খুশিতে আত্মহারা কারণ তাদের ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে। বড়োরানিরা রাজ প্রাসাদে আনন্দের সাথে দিন কাটাতে লাগল কিন্তু রাজার মনে অনেক দুঃখ। রাজার বাগানে কোনো ফুল ফোটে না, রাজার পূজা হয় না।
এক সময় সাতটি ছেলে সাতটি চাঁপা ফুলগাছ এবং মেয়েটি একটি পারুল ফুলগাছে পরিণত হয়। মালি পূজার জন্য একদিন ফুল তুলতে গেলে পারুলের কথামতো ভাইয়েরা মালিকে ফুল না দিয়ে রাজা ও বড়ো রানিদের ডেকে পাঠায় একইসাথে তারা ছোটো রানিকেও ডেকে পাঠায়।
রাজা সবাইকে ডেকে আনার পর একে একে সবাই মানুষ রূপ ধারণ করে ছোটোরানির কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাজা সব বুঝতে পারেন। বড়োরানিদের কঠিন শাস্তির নির্দেশ দেন। বড়োরানিদের হিংসাত্মক মনোভাবের পরিণতিতে তারা কঠোর শাস্তি পায়। রাজার রাজ্যে অশান্তি নেমে আসলেও পরে তা দূর হয়।
ছোটোরানি খুব শান্ত এবং নিরহংকারি ছিল বলে রাজা ছোটোরানিকে বেশি ভালোবাসতেন।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পের রাজার ছিল সাত রানি। রাজার বড়ো রানিদের ছিল খুব দেমাক। আভিজাত্যের অহংকারে তারা ছিল অন্ধ। তাই রাজা তাদেরকে পছন্দ করতেন না। ছোটোরানিকে রাজা বেশি পছন্দ করার কারণে বড়োরানিরা ছোটোরানিকে হিংসে করা শুরু করে। অন্যদিকে ছোটোরানি ছিল খুব শান্ত এবং নিরহংকারি। বড়োরানিদের জন্য তার মনে কোনো হিংসে ছিল না। ছোটোরানি ছিলেন কোমল প্রকৃতির মানুষ। ছোটোরানির সরলতায় এবং কোমলতায় মুগ্ধ ছিলেন রাজা। তাই রাজা তাকেই বেশি ভালোবাসতেন এবং পছন্দ করতেন।
সাত ভাই চম্পা' দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের অত্যন্ত জনপ্রিয় রূপকথার গল্প। এ রূপকথার গল্পকে তিনি সহজ ও সাবলীল ভাষায় বাস্তবতার রূপ দান করেছেন। ছোটোরানি ভালো মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ষড়যন্ত্রের কারণে তার জীবনে নেমে আসে দুঃখ দুর্দশা, এ গল্পে লেখক তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন।
সাত ভাই চম্পা' গল্পে রাজার ছিল সাত রানি। রাজার বড়োরানিরা ছিল খুব অহংকারি। আভিজাত্যের অহংকারে তারা ছিল অন্ধ। রাজা বড়োরানিদের পছন্দ করতেন না। ছোটোরানিকে রাজা বেশি পছন্দ করার কারণে তারা ছোটোরানির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা শুরু করে।
এ বিশাল রাজ্যে রাজার কোনো সন্তান ছিল না। দীর্ঘ দিন পর ছোটোরানি রাজাকে খুশির সংবাদ দেয়। তাদের রাজ্যের উত্তরসূরী আসবে। রাজা খুশি হয়ে জনসাধারণের জন্য রাজভান্ডার উন্মুক্ত করে দেন। ছোটোরানিকে আরো বেশি যত্ন করা শুরু করেন। বড়োরানিদের কাছে ছোটো রানির এ সুখ সহ্য হয়নি। তাই তারা পরিকল্পনা করা শুরু করে কীভাবে ছোটোরানিকে রাজ্য থেকে বের করা যায়।
ছোটোরানি আট সন্তান জন্ম দেয়। রাজা সন্তান দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু বড়োরানিরা মূর্হতে রাজার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ছোটোরানি সন্তানের মুখ দেখতে চাইলে বড়োরানিরা তাকে মিথ্যে কথা বলে। বড়োরানিরা বলে তার কয়েকটি ইঁদুর আর কাঁকড়া হয়েছে। তাই ছোটোরানি হতাশ হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। রাজা সন্তানদের দেখতে আসেন। বড়োরানিরা রাজাকে কতগুলি ব্যাঙের ছানা ও ইঁদুর ছানা দেখায় এতে রাজা রাগান্বিত হয়ে আটরানিকে রাজ প্রাসাদ থেকে বের করে দেন।
বড়োরানিদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ছোটোরানি দাসীতে পরিণত হন। ছোটোরানি পথে পথে ঘুরতে থাকে। ছোটোরানি তার প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন এবং দুঃখ কষ্টে জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন।
তাই বলা যায়, ষড়যন্ত্র করে বড়োরানিরা ছোটোরানির জীবনকে দুঃখময় করে তোলে। রাজার সন্তানের মা হয়েও সে পথে পথে জীবনযাপন করেন। বড়োরানিদের হিংসাত্মক আচরণের শিকার হয়ে রাজার পছন্দের ছোটোরানি রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন।
মালি নিত্য পূজার জন্য ফুল আনতে বাগানে গেলে পারুলের বুদ্ধিতে বড়োরানিদের ষড়যন্ত্র প্রকাশ পায়।
সাত ভাই চম্পা' গল্পের মালি দেখতে পায় পাঁশগাদার উপর সাতটি চাঁপা এবং একটি পারুল ফুল ফুটে আছে। মালি নিত্যপূজার ফুল না পেয়ে রাজাকে এই ফুলগুলো দিয়ে পূজা করার কথা বলেন। কিন্তু মালি বাগান থেকে ফুল আনতে পারেনা। রাজ পরিবারের সবাই ফুলগুলো আনতে ব্যর্থ হয়। বাগান থেকে ফুলেরা বলে রাজার ঘুটে-কুড়ানি দাসী আসলে ফুল দিবে। এ দাসী ছিল রাজার ছোটোরানি এবং এই ফুলগুলো ছিল তার সন্তান। বড়োরানিদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সে সন্তানদের হারায় এবং রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়। দাসী আসলে ফুলগুলো মা, মা বলে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাজ পরিবারের সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এভাবে বড়োরানিদের ষড়যন্ত্র প্রকাশ পায়। তারা ভয়ে কাঁপতে থাকে। অবশেষে রাজা তাদেরকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন।
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার বিখ্যাত সব রূপকথার রচয়িতা। 'সাত ভাই চম্পা' তার অন্যতম সংকলন। এ গল্পে তিনি বর্ণনা করেছেন মিথ্যাবাদী এবং ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য মানব জীবনে কীভাবে দুঃখ নেমে আসে। আবার এই ষড়যন্ত্রকারীদের কঠিন শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে মানব জীবনে পুনরায় সুখ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পে রাজার মনে অনেক দুঃখ ছিল কারণ রাজা ছিলেন নিঃসন্তান। রাজার ছিল সাত রানি। বড়োরানিরা ছিল অহংকারী এবং নিঃসন্তান। তাই রাজা তাদেরকে অপছন্দ করতেন। রাজা ছোটোরানিকে অনেক ভালোবাসতেন। কারণ ছোটোরানি ছিল শান্ত। অনেক দিন পর ছোটোরানি আট সন্তান জন্ম দেয়। বড়োরানিরা হিংসা করে সন্তানের পরিবর্তে রাজাকে ইঁদুর এবং ব্যাঙ দেখায়। রাজা রাগান্বিত হয়ে ছোটোরানি রাজ প্রসাদ থেকে বের করে এবং তাকে অবিশ্বাস করেন।
রাজার রাজ্যে নেমে আসে দুঃখ। রাজার মনে কোনো আনন্দ নেই। তাই রাজা সব বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। বাগানের সাতটি চাঁপা এবং একটি পারুল ফুল মালিকে মুগ্ধ করে। অন্যফুল না থাকাই মালি এসে রাজাকে সেই ফুল দিয়ে পূজা করার কথা বলে। রাজা মালিকে ফুল আনতে বলে। ফুলগুলো ছিল ছোটোরানির আটটি সন্তান। রাজ পরিবারের সবাই ফুলগুলো আনতে যায় কিন্তু সবাই ব্যর্থ হয়। ছোটোরানি আসলে ফুলগুলো থেকে রাজার আটটি সন্তান বেরিয়ে আসে। রাজা সন্তানদের দেখে অবাক হন এবং অঝরে কাঁদতে থাকেন।
সন্তান থাকা সত্ত্বেও রাজা এতো দিন নিঃসন্তান হয়ে জীবন কাটান। রাজার নিকট বড়োরানিদের ষড়যন্ত্র প্রকাশ পায়। তাই রাজা বড়োরানিদের কঠিন শাস্তি দেয়। মিথ্যা বলার কারণে রাজা তাদেরকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। এভাবে রাজা রাজ্যে সুখ প্রতিষ্ঠা করেন।
বড়োরানিদের কাছ থেকে সন্তান হিসেবে ইঁদুর ও কাঁকড়া প্রসবের কথা শুনে ছোটোরানি মূর্ছা যান।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পে রাজার সাত রানি ছিল। তাদের মধ্যে ছোটোরানি সাতটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান প্রসব করেছিলেন। কিন্তু হিংসুটে বড়োরানিরা ষড়যন্ত্র করে সন্তানগুলোকে হাঁড়িতে ভরে পাঁশগাদায় পুঁতে রাখে। আর ছোটোরানিকে ইঁদুর ও কাঁকড়া প্রসবের মিথ্যা কাহিনি বলে। এসব শুনে ছোটোরানি তীব্র মানসিক আঘাত পান এবং শোক সামলাতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যান।
'সাত ভাই চম্পা' দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের একটি শিক্ষামূলক রূপকথা-জাতীয় গল্প। এই গল্পের মাধ্যমে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, হিংসা-বিদ্বেষের পরিণাম কখনো ভালো হয় না। মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করলেও সত্য একদিন প্রকাশ পায়। মিথ্যাকে পরিহার করে সর্বদা সত্যের পথে অবিচল থাকাই এই গল্পের মূলশিক্ষা।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পে রাজার ছিল সাত রানি। তাদের মধ্যে ছোটোরানিকে রাজা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। এ কারণে বড়োরানিরা সবসময় ছোটোরানিকে হিংসা করতেন। ছোটোরানির সন্তান হওয়ার পর তারা ছোটোরানিকে জানায় যে, ছোটোরানি কিছু ইঁদুর ও কাঁকড়া প্রসব করেছেন। অথচ ছোটোরানি প্রসব করেছিলেন সাতটি ফুটফুটে ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান। চক্রান্তের শিকার ছোটোরানিকে রাজা রাজপুরী থেকে বের করে দেন।
বড়োরানিরা মিথ্যার আশ্রয়ে সাময়িকভাবে সুখে থাকলেও একসময় তাদের মিথ্যা ধরা পড়ে যায় এবং কঠিন শাস্তি পায়। বড়োরানিরা যে ছেলেমেয়েগুলোকে হাঁড়িতে ভরে পাঁশগাদায় পুঁতে রেখেছিল, তারা একসময় ফুলগাছে পরিণত হয়। মালি একদিন পূজার জন্য সেই বাগানের ফুল আনতে গেলে ফুলে পরিণত হওয়া সেই সন্তানগুলো রাজা, ছোটোরানি ও পুরো রাজ্যের মানুষের সামনে বড়োরানিদের মিথ্যা কথা ফাঁস করে দেয়। রাজার কাছে বড়োরানিদের ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে এবং তিনি তাদেরকে রাজ্য থেকে বের করে দেন।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পে ছোটোরানি ও তার সন্তানদের ঘিরে বড়োরানিদের হিংসা, বিদ্বেষ ও মিথ্যাচার তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। তাদের মিথ্যা ধরা পড়ে গিয়েছে এবং তাদের শাস্তি পেতে হয়েছে। তাই গল্পটির মূলশিক্ষা এটাই যে, হিংসা, বিদ্বেষ ও মিথ্যাচার মানুষের জীবনে দুর্ভোগ ব্যতীত কিছুই নিয়ে আসে না। তাই আমাদের সবসময় এসব পরিত্যাগ করে সত্যের পথে চলা উচিত।
বড়োরানিরা ষড়যন্ত্র করে ছোটোরানির সন্তানদের হত্যা করার জন্য সন্তান প্রসবের পরে শিকলে নাড়া দিলো না।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পে রাজা ছোটোরানির সন্তান হওয়া মাত্র শিকলে নাড়া দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। বড়োরানিরা আঁতুড়ঘরে গিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই দুইবার শিকলে নাড়া দেয়। কিন্তু সত্যিই যখন ছোটো রানির সন্তান হয়, তখন তারা শিশুগুলোকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আর শিকলে নাড়া দেয় না। সন্তানগুলোকে পাঁশগাদায় পুঁতে রেখে আসার পর তারা শিকলে নাড়া দেয় এবং রাজাকে কতগুলো ব্যাঙের ছানা ও ইঁদুরের ছানা এনে দেখায়। মূলত, ছোটোরানির ছেলেমেয়েগুলোকে পাঁশগাদায় পুঁতে হত্যা করার জন্যই নিষ্ঠুর বড়োরানিরা আর শিকলে নাড়া দেয়নি।
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের 'সাত ভাই চম্পা' গল্পে এক রাজা ও তার সাত রানির কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ছোটোরানিকে রাজা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। এ কারণে বড়ো ছয় রানি ছোটোরানিকে প্রচন্ড হিংসা করত। তাদের হিংসা ও ষড়যন্ত্রের কারণে ছোটোরানি রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন এবং ঘুঁটে-কুড়ানি রূপে জীবন কাটাতে থাকেন।
'সাত ভাই চম্পা' গল্পে দেখা যায় বড়োরানিরা ছোটোরানিকে পছন্দ করে না। ছোটোরানি ছিলেন খুব শান্ত স্বভাবের। ফলে রাজা তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। এরপর ছোটোরানি সন্তানসম্ভবা হলে বড়োরানিরা তাকে আরও বেশি হিংসা করতে শুরু করে। সন্তানের আগমনের খুশিতে রাজা যখন সকলের জন্য রাজভান্ডার খুলে দেন, তখন তারা যেন হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরে যেতে থাকে।
প্রতিহিংসাপরায়ণ বড়োরানিরা ছোটোরানির সন্তান প্রসবের পর সন্তানগুলোকে হাঁড়িতে ভরে পাঁশগাদায় পুঁতে ফেলে রাখে। আর রাজাকে কতগুলো ব্যাঙের ছানা ও ইঁদুরের ছানা প্রসবের সংবাদ দেয়। এতে রাজা রেগে গিয়ে ছোটোরানিকে রাজপুরী থেকে বের করে দেন। দুঃখী ছোটোরানি ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী হয়ে পথে পথে ঘুরতে থাকেন। তার দুঃখে গাছ-পাথর ফাটে, নদী-নালা শুকিয়ে যায়।
উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, ছোটোরানির প্রতি বড়োরানিদের তীব্র হিংসা-বিদ্বেষের কারণে তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ কারণেই ছোটোরানিকে ঘুঁটে-কুড়ানি হয়ে জীবন কাটাতে হয়। তাই বলা যায়, বড়োরানিদের হিংসাই ছিল ছোটোরানির দুর্ভোগের মূল কারণ।

১.
এক রাজার সাত রানি। দেমাকে বড়ো রানিদের মাটিতে পা পড়ে না। ছোটো রানি খুব শান্ত। এই জন্য রাজা ছোটো রানিকে সকলের চাইতে বেশি ভালোবাসিতেন।
কিন্তু, অনেক দিন পর্যন্ত রাজার ছেলেমেয়ে হয় না। এত বড়ো রাজ্য, কে ভোগ করিবে? রাজা মনের দুঃখে থাকেন।
এইরূপে দিন যায়। কতদিন পরে- ছোটোরানির ছেলে হইবে। রাজার মনে, আনন্দ আর ধরে না; পাইক-পিয়াদা ডাকিয়া, রাজা, রাজ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন- 'রাজা রাজভান্ডার খুলিয়া দিয়াছেন, মিঠাইমণ্ডা মণি-মানিক যে যত পার, আসিয়া নিয়া যাও।'
বড়োরানিরা হিংসায় জ্বলিয়া মরিতে লাগিল।
রাজা আপনার কোমরে, ছোটোরানির কোমরে, এক সোনার শিকল বাঁধিয়া দিয়া বলিলেন, 'যখন ছেলে হইবে, এই শিকলে নাড়া দিয়ো, আমি আসিয়া ছেলে দেখিব!' বলিয়া রাজা রাজদরবারে গেলেন।
ছোটোরানির ছেলে হইবে, আঁতুড়ঘরে কে যাইবে? বড়োরানিরা বলিলেন, 'আহা ছোটোরানির ছেলে হইবে, তা অন্য লোক দিব কেন? আমরাই যাইব।'
বড়োরানিরা আঁতুড়ঘরে গিয়াই শিকলে নাড়া দিলেন। অমনি রাজসভা ভাঙিয়া, ঢাক-ঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি-মানিক হাতে ঠাকুর-পুরুত সাথে, রাজা আসিয়া দেখেন- কিছুই না!
রাজা ফিরিয়া গেলেন।
রাজা সভায় বসিতে না-বসিতেই আবার শিকলে নাড়া পড়িল।
রাজা আবার ছুটিয়া গেলেন। গিয়া দেখেন, এবারও কিছুই না। মনের কষ্টে রাজা রাগ করিয়া বলিলেন, 'ছেলে না-হইতে আবার শিকল নাড়া দিলে, আমি সব রানিকে কাটিয়া ফেলিব।' বলিয়া রাজা চলিয়া গেলেন।
একে একে ছোটোরানির সাতটি ছেলে একটি মেয়ে হইল। আহা ছেলেমেয়েগুলি যে-চাঁদের পুতুল-ফুলের কলি।
আঁকুপাঁকু করিয়া হাত নাড়ে, পা নাড়ে- আঁতুরঘর আলো হইয়া গেল।
ছোটোরানি আস্তে আস্তে বলিলেন, 'দিদি, কী ছেলে হইল একবার দেখাইলি না!'
বড়োরানিরা ছোটোরানির মুখের কাছে রঙ্গ-ভঙ্গি করিয়া হাত নাড়িয়া, নথ নাড়িয়া, বলিয়া উঠিল, 'ছেলে না, হাতি হইয়াছে- ওর আবার ছেলে হইবে! -কয়টা ইঁদুর আর কয়টা কাঁকড়া হইয়াছে।'
শুনিয়া ছোটোরানি অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিলেন।
নিষ্ঠুর বড়োরানিরা আর শিকলে নাড়া দিল না। চুপিচুপি হাঁড়ি-সরা আনিয়া, ছেলেমেয়েগুলিকে তাহাতে পুরিয়া, পাঁশগাদায় পুঁতিয়া ফেলিয়া আসিল। আসিয়া, তাহার পর শিকল ধরিয়া টান দিল।
রাজা আবার ঢাক-ঢোলের বাদ্য দিয়া, মণি-মানিক হাতে ঠাকুর-পুরুত সঙ্গে আসিলেন; বড়োরানিরা হাত মুছিয়া, মুখ মুছিয়া তাড়াতাড়ি করিয়া কতকগুলি ব্যাঙের ছানা, ইঁদুরের ছানা আনিয়া দেখাইল।
দেখিয়া, রাজা আগুন হইয়া, ছোটোরানিকে রাজপুরীর বাহির করিয়া দিলেন।
বড়োরানিদের মুখে আর হাসি ধরে না; পায়ের মলের বাজনা থামে না, সুখের কাঁটা দূর হইল; রাজপুরীতে আগুন দিয়া, ঝগড়া-কোন্দল সৃষ্টি করিয়া, ছয় রানিতে মনের সুখে ঘরকন্না করিতে লাগিলেন।
পোড়াকপালি ছোটোরানির দুঃখে গাছ-পাথর ফাটে, নদী-নালা শুকায়- ছোটোরানি ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী হইয়া, পথে পথে ঘুরিতে লাগিলেন।
২.
এমনি করিয়া দিন যায়। রাজার মনে সুখ নাই, রাজার রাজ্যে সুখ নাই- রাজপুরী খাঁ খাঁ করে, রাজার বাগানে ফুল ফোটে না, রাজার পূজা হয় না।
একদিন মালি আসিয়া বলিল, 'মহারাজ, নিত্যপূজার ফুল পাই না, আজ যে, পাঁশগাদার উপরে, সাত চাঁপা এক পারুল গাছে, টুলটুলে সাত চাঁপা আর এক পারুল ফুটিয়া রহিয়াছে।'
রাজা বলিলেন, 'তবে সেই ফুল আন, পূজা করিব।'
মালি ফুল আনিতে গেল।
মালিকে দেখিয়া পারুলগাছে পারুলফুল চাঁপাফুলদিগে ডাকিয়া বলিল, 'সাত ভাই চম্পা জাগ রে!'
অমনি সাত চাঁপা নড়িয়া উঠিয়া সাড়া দিল-
'কেন বোন পারুল ডাক রে?'
পারুল বলিল,
'রাজার মালি এসেছে, পূজার ফুল দিবে কি না দিবে?'
সাত চাঁপা তুরতুর করিয়া উপরে উঠিয়া গিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিতে লাগিল, 'না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর, আগে আসুক রাজা, তবে দিব ফুল!'
দেখিয়া শুনিয়া মালি অবাক হইয়া গেল। ফুলের সাজি ফেলিয়া, দৌড়িয়া গিয়া, রাজার কাছে খবর দিল।
আশ্চর্য হইয়া, রাজা, রাজসভার সকলে সেইখানে আসিলেন।
৩.
রাজা আসিয়া ফুল তুলিতে গেলেন, অমনি পারুলফুল চাঁপাফুলদিগে ডাকিয়া বলিল,
'সাত ভাই চম্পা জাগ রে!'
চাঁপারা উত্তর দিল, 'কেন বোন পারুল ডাক রে?'
পারুল বলিল, 'রাজা আপনি এসেছেন, ফুল দিবে কি না দিবে?'
চাঁপারা বলিল, 'না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর, আগে আসুক রাজার বড়োরানি তবে দিব ফুল!'
বলিয়া, চাঁপাফুলেরা আরও উঁচুতে উঠিল।
রাজা বড়োরানিকে ডাকাইলেন। বড়োরানি, মল বাজাইতে বাজাইতে আসিয়া ফুল তুলিতে গেল। চাঁপাফুলেরা
বলিল,
'না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,
আগে আসুক রাজার মেজোরানি তবে দিব ফুল!'
তাহার পর মেজো রানি আসিলেন, সেজো রানি আসিলেন, নোয়া রানি আসিলেন, কনে রানি আসিলেন কেহই ফুল পাইলেন না। ফুলেরা গিয়া আকাশে তারার মতো ফুটিয়া রহিল।
রাজা গালে হাত দিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িলেন।
শেষে দুয়োরানি আসিলেন; তখন ফুলেরা বলিল,
'না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর,
যদি আসে রাজার ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী,
তবে দিব ফুল।'
তখন খোঁজ-খোঁজ পড়িয়া গেল। রাজা চৌদোলা পাঠাইয়া দিলেন, পাইক বেহারারা চৌদোলা লইয়া মাঠে গিয়া ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী ছোটোরানিকে লইয়া আসিল।
ছোটোরানির হাতে পায়ে গোবর, পরনে ছেঁড়া কাপড়, তাই লইয়া তিনি ফুল তুলিতে গেলেন। অমনি সুড়সুড় করিয়া চাঁপারা আকাশ হইতে নামিয়া আসিল, পারুল ফুলটি গিয়া তাদের সঙ্গে মিশিল; ফুলের মধ্য হইতে সুন্দর সুন্দর চাঁদের মতো সাত রাজপুত্র এক রাজকন্যা 'মা' 'মা' বলিয়া ডাকিয়া, ঝুপঝুপ করিয়া ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী ছোটোরানির কোলে-কাঁখে ঝাঁপাইয়া পড়িল।
সকলে অবাক! রাজার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল গড়াইয়া গেল। বড়োরানিরা ভয়ে কাঁপিতে লাগিল।
রাজা তখনি বড়োরানিদিগকে কঠিন শাস্তি দিয়া সাত রাজপুত্র, পারুল-মেয়ে আর ছোটোরানিকে লইয়া রাজপুরীতে গেলেন।
রাজপুরীতে জয়ডঙ্কা বাজিয়া উঠিল।
Related Question
View Allসন্তান হওয়ার বদলে ছোট রানির কাঁকড়া ও ইঁদুর হয়েছে- এ কথা শুনে ছোট রানি অজ্ঞান হয়ে গেল।
রাজার কোনো সন্তান নেই বলে সবসময় তার মনে দুঃখ ছিল। অনেক দিন পর হঠাৎ ছোট রানির সন্তান হওয়ার কথা শুনে পুরো রাজ্যে আনন্দের ঢল নামে। কিন্তু রাজার বড় রানিরা এই সংবাদে মোটেই খুশি ছিল না। সন্তান হওয়ার দিন ছোট রানি কী সন্তান হয়েছে তা জানতে চাইলে বড় রানিরা জানায় তার পেট থেকে কাঁকড়া ও ইঁদুরের ছানা হয়েছে। এমন সংবাদ শুনে ছোট রানি অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল।
উদ্দীপকের পারুল 'সাত ভাই চম্পা' গল্পের ছোট রানি চরিত্রের প্রতিনিধি।
অন্যায় করলে মানুষকে শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু অনেক সময় এমনও হয়, কোনো অন্যায় না করেও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শাস্তি পেতে হয়। শুধু প্রমাণের অভাবে দিনের পর দিন শাস্তির এই বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হয়। আর যখন প্রমাণিত হয়, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।
উদ্দীপকে রাজার হুকুমে পারুলের বনবাস হয়। কেউ রাজার হুকুমের অবাধ্য হতে পারে না বলে পারুলকে বনবাসে যেতে হয়। জন-প্রাণীহীন গভীর অরণ্যে পারুল একাকী দিন কাটায়। 'সাত ভাই চম্পা' গল্পে বড় রানিদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয় ছোট রানি। আর রাজা তাকে ভুল বুঝে রাজপুরীর বাইরে বের করে দেন। রাজপুরীর বাইরে 'অত্যন্ত দুঃখে ছোট রানির দিন কাটে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের পারুল 'সাত ভাই চম্পা' গল্পের ছোট রানি চরিত্রের প্রতিনিধি।
"উদ্দীপকটি কেবল 'সাত ভাই চম্পা' গল্পের একটি দিকের ধারক, পুরোটির নয়।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
মানুষের জীবনে নানান সময় নানা রকমের ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো ঘটনার ওপর তাদের নিজেদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এরপরও সেই ঘটনার জন্য দিনের পর দিন ভুগতে হয় সেই ব্যক্তিকে। তখন তাকে নিয়তি বলে মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কিছুই করার থাকে না।
উদ্দীপকে দেখা যায়, রাজার হুকুমে পারুলের বনবাস হয়। বনে গিয়ে পারুলের একাকী দিন কাটে। কেবল পরীরা তার সঙ্গী হয়। 'সাত ভাই চম্পা' গল্পে বড় রানিরা হিংসা করে ছোট রানিকে রাজার সামনে অপরাধী করে। ছোট রানির সাত ছেলে এক মেয়ে হলেও বড় রানিরা রাজাকে মিথ্যা কথা বলে। তারা রাজাকে জানায়, ছোট রানির ব্যাঙের ছানা ও ইঁদুরের ছানা হয়েছে। একথা জানতে পেরে রাজা ছোট রানিকে রাজপুরীর বাইরে বের করে দেন। অনেক দিন পরে ছোট রানি নির্দোষ প্রমাণিত হয়।
উদ্দীপকে শুধু পারুলের বনবাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে পারুলের অপরাধ বা তার নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার কোনো ঘটনা ফুটে ওঠেনি। কিন্তু 'সাত ভাই চম্পা' গল্পে ছোট রানির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, তার শাস্তি হওয়া এবং শেষপর্যন্ত তার নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার দিকটিও প্রকাশ হয়েছে। এসব বিষয় উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
ছোট রানিকে রাজপুরীর বাইরে বের করে দেওয়া হলো।
ছোট রানির বাচ্চা হওয়ার কথা শুনে বড় রানিরা হিংসায় জ্বলে গেল।
রাজার মনে দুঃখ ছিল ভীষণ। কারণ তার কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না। অনেক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ছোট রানির বাচ্চা হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ল। রাজা এই খবর শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং রাজভাণ্ডার খুলে দিলেন সাধারণ মানুষের জন্য। ছোট রানির এমন সুসংবাদ শুনে এবং রাজার খুশি দেখে বড় রানিরা হিংসায় জ্বলে গেল।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!