‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ অনুযায়ী ‘মূর্ছা’ বানানটি অশুদ্ধ। এই শব্দটির সঠিক ও প্রমিত বানান হলো ‘মুর্ছা’।
বানানটি অশুদ্ধ হওয়ার কারণ নিম্নরূপ:
বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মানুযায়ী, কিছু তৎসম ও তদ্ভব শব্দের বানানে দীর্ঘ ঈ-কার (ী) ও দীর্ঘ ঊ-কারের (ূ) পরিবর্তে হ্রস্ব ই-কার (ি) ও হ্রস্ব উ-কার (ু) ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে, বিশেষত যেখানে দীর্ঘস্বর ব্যবহারের নির্দিষ্ট কোনো ভাষাতাত্ত্বিক কারণ নেই অথবা দীর্ঘস্বর ব্যবহারের ফলে অর্থের কোনো পরিবর্তন হয় না।
‘মূর্ছা’ শব্দটি সংস্কৃত ‘মূর্ছা’ (mūrchā) থেকে এলেও বাংলা একাডেমি আধুনিক বানানের সরলীকরণ ও প্রমিতকরণের অংশ হিসেবে এখানে প্রথম বর্ণের দীর্ঘ ঊ-কারের (ূ) পরিবর্তে হ্রস্ব উ-কার (ু) ব্যবহারের নিয়ম করেছে।
সুতরাং, প্রমিত বানান অনুযায়ী ‘মূর্ছা’ নয়, ‘মুর্ছা’ হলো সঠিক ও গ্রহণযোগ্য রূপ।
বাহুল্য দোষ / বচনজনিত অশুদ্ধি: বাক্যে 'সেইসব' (বহুবচনাত্মক নির্দেশক) এবং 'গুলো' (বহুবচনাত্মক প্রত্যয়) একসাথে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলায় একই বাক্যে দুটি বহুবচনবোধক শব্দ বা প্রত্যয় পাশাপাশি ব্যবহার করলে বাহুল্য দোষ ঘটে। তাই যেকোনো একটি বহুবচন রূপ ব্যবহার করতে হবে— হয় 'সেইসব প্রতিষ্ঠান' অথবা 'প্রতিষ্ঠানগুলো'।
বানানগত ভুল: 'উচিৎ' বানানটি অশুদ্ধ। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী সঠিক বানান হলো 'উচিত' (শেষে 'ত' হবে, 'ৎ' নয়)।
অতএব, বাক্যটির শুদ্ধ রূপ: সেইসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া উচিত। (অথবা: প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।)
প্রদত্ত বাক্যটিতে প্রয়োগগত এবং বানানগত ভুল রয়েছে। বাক্যটি শুদ্ধ করার কারণসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
'রবাহুত' শব্দের অপপ্রয়োগ ও বানান ভুল: যাকে আহ্বান বা নিমন্ত্রণ করা হয়নি, তাকে বোঝাতে সঠিক শব্দটি হলো 'অনাহূত'। 'রবাহূত' শব্দটির অর্থ হলো বিনানিমন্ত্রণে ভোজনকারী বা অনাহূত অতিথি। তবে বাক্য গঠনে 'অনাহূত' শব্দটির ব্যবহারই প্রমিত ও সঠিক। এছাড়া 'অনাহূত' বানানে 'হ' বর্ণে দীর্ঘ-ঊ কার (ূ) ব্যবহৃত হয়।
'আহুতি' শব্দের অপপ্রয়োগ: 'আহুতি' শব্দের অর্থ হলো যজ্ঞে ঘৃতাহুতি বা উৎসর্গ করা। সাধারণ গমনার্থে বা কোথাও উপস্থিত হওয়া বোঝাতে 'আহুতি দিতে গিয়েছি' শব্দগুচ্ছের ব্যবহার অসঙ্গত ও প্রয়োগগতভাবে অশুদ্ধ। তাই বাক্যের স্বাভাবিক অর্থ প্রকাশের জন্য 'গিয়েছি' বা 'উপস্থিত হয়েছি' ব্যবহার করা নিয়মসম্মত।
নিহিতার্থ: অক্ষম ব্যক্তির বৃথা আস্ফালন বা অহেতুক তর্জন-গর্জন।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের তো কোনো ক্ষমতা নেই, অথচ সবাইকে ভয় দেখাচ্ছ; তোমার অবস্থা তো দেখছি ‘বিষ নেই কুলোপনা চক্কর’।
‘বিষ নেই কুলোপনা চক্কর’ প্রবাদটি বাংলা ভাষায় অত্যন্ত প্রচলিত একটি ভাবধর্মী প্রবাদ। এর বিস্তারিত প্রেক্ষাপট নিচে তুলে ধরা হলো:
উৎপত্তি ও মূল ভাব: বিষহীন সাপ যেমন বাস্তবে কারো কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না, অথচ কুলোর মতো বড় ফণা তুলে চক্কর দিয়ে মানুষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে; ঠিক তেমনি সমাজে যেসব মানুষের কোনো সামর্থ্য বা ক্ষমতা নেই, তারা বাহ্যিক আস্ফালন বা তর্জন-গর্জনের মাধ্যমে নিজেদের জাহির করতে চায়।
প্রয়োগের ক্ষেত্র: কারো কোনো প্রকৃত ক্ষমতা বা প্রভাব না থাকা সত্ত্বেও যদি সে অহেতুক হুমকি দেয় বা অহংকার প্রকাশ করে, তবে তার আচরণকে নির্দেশ করতে এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়।
নিহিতার্থ: বিপদের ওপর আরও বিপদ বা যন্ত্রণার ওপর অতিরিক্ত যন্ত্রণা।
বাক্যে প্রয়োগ: এমনিতেই চাকরিটা হারিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি, তার ওপর আবার পরিবারে হঠাৎ অসুস্থতা—এ যেন একেবারে গোদের উপর বিষফোঁড়া।
প্রবাদের পটভূমি: 'গোদ' (পা ফোলা রোগ বা এলিফ্যান্টায়াসিস) নিজেই একটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক ব্যাধি। এই ব্যাধিগ্রস্ত শারীরিক স্থানে যদি পুনরায় কোনো বিষফোঁড়া ওঠে, তবে রোগীর যন্ত্রণা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ব্যবহারিক ক্ষেত্র: বাস্তবে যখন কোনো চলমান সংকট বা দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্যে অতিরিক্ত আরেকটি নতুন বিপদ এসে উপস্থিত হয়, তখন এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়।
নিহিতার্থ: ছোট-বড় সব ধরনের কাজ করা (বা সব বিষয়ে পারদর্শী হওয়া)।
বাক্যে প্রয়োগ: অফিসে লোকবল কম থাকায় ম্যানেজার সাহেবকে চণ্ডীপাঠ থেকে জুতোসেলাই—সব কাজই একা হাতে সামলাতে হয়।
বিষয়বস্তুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
প্রবাদের মূল অর্থ: 'চণ্ডীপাঠ থেকে জুতোসেলাই' প্রবাদটি মূলত কোনো ব্যক্তির বহুমুখী কাজের ব্যস্ততা অথবা ছোট-বড় সব ধরনের কাজ করার বাধ্যবাধকতা বা সক্ষমতাকে নির্দেশ করে।
শব্দার্থ ও রূপক বিশ্লেষণ:
চণ্ডীপাঠ: চণ্ডী হলো ধর্মীয় ও পবিত্র গ্রন্থ। 'চণ্ডীপাঠ' বলতে এখানে অত্যন্ত মহৎ, সম্মানজনক বা উচ্চমানের কাজকে বোঝানো হয়েছে।
জুতোসেলাই: জুতো সেলাই করা সাধারণ অর্থে মুচির কাজ, যা সমাজে অপেক্ষাকৃত তুচ্ছ বা নিম্নমানের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্যবহারিক প্রয়োগ: অতি উচ্চাঙ্গের বা সম্মানজনক কাজ থেকে শুরু করে অতি নগণ্য বা সাধারণ কাজ—সব ধরনের কাজই যখন একজন মানুষকে করতে হয়, তখন এই প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রবাদ-প্রবচনের নিহিতার্থ ও সঠিক বাক্য গঠনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিহিতার্থ: অপাত্রে বা অযোগ্য ব্যক্তির নিকট মূল্যবান বস্তুর অর্পণ।
বাক্যে প্রয়োগ: একজন মূর্খ মানুষের হাতে এমন মূল্যবান ও প্রাচীন বই তুলে দেওয়া আর বানরের গলায় মুক্তোর হার দেওয়া একই কথা।
প্রবাদ-প্রবচন বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য:
ভাবার্থ: বানর যেমন মুক্তোর সৌন্দর্য বা অর্থনৈতিক মূল্য বোঝে না, তেমনি কোনো অপাত্রের হাতে মূল্যবান বস্তু বা সম্পদ অর্পিত হলে সে তার সঠিক মূল্যায়ন ও ব্যবহার করতে পারে না।
ব্যবহারিক দিক: সমাজে যখন কোনো অযোগ্য ব্যক্তির নিকট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, জ্ঞান বা মূল্যবান সম্পদ তুলে দেওয়া হয়, তখন এই প্রবাদটি অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আলোচ্য উক্তিটি জ্ঞান ও বুদ্ধির গুরুত্ব এবং মুক্তির সাথে তাদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তুলে ধরে। মানবজীবনের সার্বিক উন্নতির জন্য জ্ঞানার্জন ও বুদ্ধির সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য। যখন জ্ঞান সীমিত থাকে, তখন মানুষের চিন্তার পরিধি সংকীর্ণ হয় এবং বিশ্ব সম্পর্কে তার ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই সীমাবদ্ধতা ব্যক্তি ও সমাজকে প্রগতির পথে বাধা দেয়, ফলে মানুষের মধ্যে অজ্ঞতা ও অন্ধকার বাসা বাঁধে।
অন্যদিকে, বুদ্ধি যখন আড়ষ্ট বা স্থবির হয়ে পড়ে, তখন মানুষ নতুন ধারণা গ্রহণ করতে, সমস্যা বিশ্লেষণ করতে কিংবা সৃজনশীল চিন্তাভাবনা করতে অক্ষম হয়। আড়ষ্ট বুদ্ধি কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং গতানুগতিকতার জালে আবদ্ধ থাকে, যা মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। বুদ্ধির এই জড়তা মানুষকে নতুন জ্ঞান অর্জনে নিরুৎসাহিত করে এবং তাকে মানসিকভাবে পরাধীন করে রাখে, যার ফলস্বরূপ ব্যক্তি নিজেকে চারপাশের পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়।
প্রকৃত মুক্তি কেবল শারীরিক স্বাধীনতা নয়, এটি মূলত মানসিক ও আত্মিক মুক্তি। জ্ঞান ও বুদ্ধির উন্মোচন ছাড়া এই মুক্তি অর্জন অসম্ভব। জ্ঞান মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে এবং তাকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখায়। বুদ্ধি তাকে অর্জিত জ্ঞানকে বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই মানুষ আত্মসচেতন, আত্মনির্ভরশীল ও স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠে এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারে।
বস্তুত, জ্ঞান ও বুদ্ধির সজীব ও গতিশীল প্রবাহই ব্যক্তি ও সমাজকে সকল প্রকার স্থবিরতা, কুসংস্কার এবং সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ এনে দেয়। যে সমাজে জ্ঞানচর্চা উপেক্ষিত এবং বুদ্ধির বিকাশ রুদ্ধ, সে সমাজে মানুষের অগ্রগতি হয় না এবং মুক্তি সেখানে কেবলই একটি অলীক স্বপ্ন হয়ে থেকে যায়। তাই মুক্তি অর্জনের জন্য নিরন্তর জ্ঞানচর্চা এবং বুদ্ধির প্রখরতা অপরিহার্য।
ভূমিকা: ২১ শতকে বিশ্বসভ্যতার আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী অনুঘটক হলো ইন্টারনেট প্রযুক্তি। ইন্টারনেট কেবল যোগাযোগ কিংবা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সৃষ্টি করেছে এক নতুন বিশ্বসংস্কৃতি—'ইন্টারনেট সংস্কৃতি' বা 'সাইবার সংস্কৃতি'। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইন্টারনেট তার প্রভাব বিস্তার করেছে। ভৌগোলিক সীমানা টপকে সমগ্র মানবজাতিকে একসূত্রে গেঁথে ইন্টারনেট বিশ্বকে রূপান্তর করেছে এক 'গ্লোবাল ভিলেজ' বা বিশ্বগ্রাম-এ।
ইন্টারনেট সংস্কৃতির ধারণা: ইন্টারনেট সংস্কৃতি বলতে ইন্টারনেটের ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল ফোরাম ও প্রযুক্তিগত যোগাযোগের ফলে গড়ে ওঠা আচরণিক ধারা, চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও জীবনযাপনকে বোঝায়। ই-মেইল, ব্লগিং, সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব), অনলাইন গেমিং, মেম (Meme) সংস্কৃতি, স্ট্রিম সার্ভিস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ইত্যাদির মাধ্যমে এই নতুন বৈশ্বিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে। এখানে তথ্যের প্রবাহ অবাধ ও তাৎক্ষণিক, যা প্রথাগত মাধ্যমগুলোর (সংবাদপত্র, রেডিও, টিভি) ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা হ্রাস করেছে।
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা ও ইন্টারনেট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বিশ্বব্যবস্থা মূলত ছিল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক মেরুকরণ ঘটলেও, একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে 'তথ্য ও প্রযুক্তি শক্তি'। যে রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী প্রযুক্তি ও তথ্যের ওপর যত বেশি আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তারা তত বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। ইন্টারনেট সংস্কৃতি বিশ্বব্যবস্থাকে কেন্দ্রমুখী কাঠামোর পরিবর্তে এক বিকেন্দ্রীভূত ও নেটওয়ার্কভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করেছে।
বিশ্বায়নের ত্বরান্বিতকরণ ও সামাজিক প্রভাব: বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার গতি দ্রুততর করতে ইন্টারনেট সংস্কৃতি প্রধান ভূমিকা পালন করছে। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের সামাজিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়:
সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সংস্কৃতি, ভাষা, শিল্প ও সাহিত্য এখন এক ক্লিকের দূরত্বে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এক মিশ্র বৈশ্বিক সংস্কৃতি (Hybrid Culture)।
অনলাইন নাগরিক সমাজ: নেটপাড়ার অধিবাসীরা (Netizens) আজ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার বা বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন আজ ইন্টারনেট সংস্কৃতির হাত ধরে বৈশ্বিক আন্দোলনের রূপ নেয়।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: শক্তিশালী পশ্চিমা মিডিয়া ও জীবনধারা তুলনামূলক দুর্বল বা বিকাশমান দেশগুলোর নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ফেলছে।
ভূ-রাজনীতি ও সাইবার কূটনীতি: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট সংস্কৃতি এনেছে এক নতুন মাত্রা। এখন আর যুদ্ধ কেবল স্থল, জল বা আকাশে সীমাবদ্ধ নেই; সাইবার স্পেস হয়ে উঠেছে 'পঞ্চম যুদ্ধক্ষেত্র' (Fifth Domain of Warfare)। সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো (Fake News), এবং সামাজিক মাধ্যমে জনমত পরিবর্তনের অপচেষ্টা বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, ডিজিটাল কূটনীতি (Digital Diplomacy) বা 'টুইটার কূটনীতি'-র মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রধানেরা সরাসরি বৈশ্বিক জনমতের সাথে যুক্ত হচ্ছেন।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ই-কমার্স: ইন্টারনেট সংস্কৃতি বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থাকে রূপান্তর করেছে 'ডিজিটাল অর্থনীতি' বা 'জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে'। বিশ্বজুড়ে অনলাইন কেনাকাটা, ফ্রিল্যান্সিং, গিগ ইকোনমি (Gig Economy), ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: Google, Apple, Amazon, Meta, Microsoft) বিশ্ব অর্থনীতির বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
ইন্টারনেট সংস্কৃতির প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ: প্রযুক্তিগত এই বিপ্লবের সাথে সাথে বিশ্বব্যবস্থায় নতুন কিছু জটিল সংকট দেখা দিয়েছে:
ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide): উন্নত ও উন্নতশীল দেশগুলোর মধ্যে, এমনকি শহরের সাথে গ্রামীণ জনগণের প্রযুক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য থেকে যাচ্ছে।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নজরদারি (Data Privacy): কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য বা ডেটা এখন করপোরেট ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির মুখে। ডেটাই এখন আধুনিক যুগের ‘নতুন তেল’ (Data is the new oil)।
অপতথ্য ও গুজব (Misinformation): সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও বিচ্ছিন্নতা: ভার্চুয়াল সংযোগ বাড়লেও মানুষের মধ্যে প্রকৃত সামাজিক যোগাযোগ কমছে। সাইবার বুলিং, আসক্তি ও বিষণ্ণতা নতুন সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গঠনের সফল বাস্তবায়নের পর বাংলাদেশ এখন 'স্মার্ট বাংলাদেশ'-এর অভিমুখে ধাবিত হচ্ছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংস্কৃতির সাথে সংযুক্ত করেছে। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, এবং সফটওয়্যার রপ্তানিতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে স্থান করে নিচ্ছে। তবে সাইবার নিরাপত্তা সুসংহত করা, ডিজিটাল স্বাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট সংস্কৃতির ইতিবাচক প্রয়োগ সুনিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার: ইন্টারনেট সংস্কৃতি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক অনিবার্য বাস্তবতা। এটি যেমন বৈশ্বিক যোগাযোগ, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সহযোগিতার অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনই নিরাপত্তা, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। ইন্টারনেট সংস্কৃতি যেন কেবল পশ্চিমা বা করপোরেট আধিপত্যের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেজন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সাইবার আইন। বিশ্ব সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যাতে ইন্টারনেট সংস্কৃতি মানবজাতির কল্যাণ, অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। এর ভাষা ও বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য এবং এর কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। এতে বিধৃত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা। এ সময়ের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা ও ধর্মনির্ভরতা। ধর্মের বিষয়টি সমাজজীবনের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে, তাই সাহিত্যে ধর্মের কথা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রাচীন যুগের সময়কাল-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
৬৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে
৯৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুকুমার সেনের মতে
৯০০-১৩৫০ খ্রি.
চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য/কবিতা সংকলন চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন। ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে 'চর্যাচর্য বিনিশ্চয়' নামক পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের সাথে 'ডাকার্ণব' ও 'দোহাকোষ' নামে আরও দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৬ সালে সবগুলো বই একসাথে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে প্রকাশ করেন।
বাংলার পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মালম্বী। তাদের আমলে চর্যাগীতিগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পদগুলো রচিত। পাল বংশের পরে আসে সেন বংশ। সেন বংশ হিন্দুধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যসংস্কার রাজধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধচার্যেরা এদেশ হতে বিতাড়িত হয় এবং নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বাংলাদেশের বাহিরে নেপালে পাওয়া গেছে।
ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
চর্যাপদের শব্দগুলো অপরিচিত, শব্দ ব্যবহারের রীতি বর্তমানের রীতি থেকে ভিন্ন --এর কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যা ভাষা'ও বলে। চর্যাপদের কবিতাগুলো গাওয়া হত। তাই এগুলো একইসাথে গান ও কবিতা।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার 'বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ' (Origin and Development of Bengali language) নামক গ্রন্থে ধ্বনি তত্ত্ব ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পদসংকলনটি আদি বাংলা ভাষায় রচিত। কেউ কেউ একে মৈথিলি, উড়িয়া বা আসামি ভাষা বলে দাবি করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, সেকালের বাংলা, উড়িয়া বা আসামি ভাষার পার্থক্য ছিল সামান্যই। উল্লেখ্য যে, চর্যাপদ উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নিজ নিজ ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত।
এতে মোট ৫১ টি পদ'রয়েছে। কয়েক পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সর্বমোট সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া গেছে। ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে উদ্ধার করা হয়েছে অর্থাৎ এর শেষাংশ পাওয়া যায়নি। ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদগুলো পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের মোট পদকর্তা ২৪। অনেকের মতে, আদি চর্যাকার লুইপা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম সরহ বা ভুসুকু। কাহ্নপা সর্বাধিক ১৩ টি পদ রচনা করেন।
রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ চর্যাপদ এর অংশবিশেষ
চর্যাপদের কবি / পদকর্তা-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
২৩ জন
ড. সুকুমার সেনের মতে
২৪ জন
পদকর্তা: লুই, শবর, ককুরী, বিরুআ, গুণ্ডারী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, আজদেব, ঢেণ্টণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। পদকর্তাদের নামের শেষে সম্মানসূচক 'পা' যোগ করা হয়। যেমন: লুই থেকে লুইপা, শবর থেকে শবরপা।
কাহ্ন : ১৩ টি পদ রচনা করেন।
ভুসুকু : ৮ টি পদ রচনা করেন।
সরহ : ৪ টি পদ রচনা করেন।
লুই, শান্তি ও শবরী: ২ টি করে পদ রচনা করেন।
বাকিরা : ১ টি করে পদ রচনা করেন।
লাড়ীডোম্বী : কোন পদ পাওয়া যায়নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫০টি এবং প্রাপ্ত পদ সাড়ে ছেচল্লিশটি।
ড. সুকুমার সেনের 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫১টি।
লুইপা। তিনি ২টি পদ রচনা করেন। যথা: ১, ২৯। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, তিনি শবরপার শিষ্য ছিলেন। লুইপাকে আদি চর্যাকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
চর্যাপদের প্রথম পদটিঃ
কাআ (শরীর) তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই (বলে) গুরু পুচ্ছিঅ জাণ ॥
সঅল সহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরিঅই ॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস ॥
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা ॥
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা বা আলো-আঁধারির ভাষা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এর ভাষার নাম 'বঙ্গকামরূপী'। এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।
একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।
একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।
সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।
একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।
একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।
অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।
সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।
লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।
সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।
আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।
সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।
আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে। আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।
শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।
বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।
আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে। খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।
বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।
অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র
য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ:
সাম্যবাদের পতন:
১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।
গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:
সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ:
অর্থনৈতিক সংকট:
সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের উত্থান:
অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা:
নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।
সামাজিক পরিবর্তন:
পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
গুরুত্বপূর্ণ দিক:
এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল।
পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-
১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:
সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয় একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।
অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।
অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।
২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। [ঊর্মি হোসেন]