প্রদত্ত শব্দটি হলো "অত্যান্ত", যা একটি ভুল বানান। এর সঠিক প্রমিত বানান হলো "অত্যন্ত"।
বানান ভুলের কারণটি বাংলা ব্যাকরণের সন্ধি বিষয়ক নিয়মের সাথে সম্পর্কিত। এটি য-ফলা সিদ্ধ স্বরসন্ধির একটি উদাহরণ।
'অত্যন্ত' শব্দটি 'অতি' এবং 'অন্ত' এই দুটি পদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে।
স্বরসন্ধির একটি নিয়ম অনুযায়ী, ই-কার (ি) বা ঈ-কারের (ী) পর যদি ই-কার বা ঈ-কার ভিন্ন অন্য কোনো স্বরধ্বনি আসে, তাহলে ই-কার বা ঈ-কার স্থানে য-ফলা (্য) হয়।
এখানে 'অতি' শব্দের শেষ বর্ণ 'ই' (ি) এবং 'অন্ত' শব্দের প্রথম বর্ণ 'অ' (অ)। এই দুটি স্বরধ্বনি মিলে য-ফলা (্য) সৃষ্টি করেছে।
ফলস্বরূপ, 'ত' ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে য-ফলা যুক্ত হয়ে 'ত্য' গঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো 'আ-কার' (া) যুক্ত হওয়ার ব্যাকরণগত ভিত্তি নেই। তাই 'অত্যান্ত' বানানটি ভুল এবং 'অত্যন্ত' বানানটি সঠিক।
কারণ: 'মনোযোগ' শব্দটি 'মনঃ + যোগ' এই বিসর্গ সন্ধি দ্বারা গঠিত। এখানে 'মনঃ'-এর বিসর্গটি 'ও-কার'-এ পরিণত হয়ে 'মনোযোগ' হয়। 'মনযোগ' বানানে 'ন'-এর পর 'ও-কার' না থাকায় বানানটি ভুল। প্রমিত বাংলা বানানে 'মনোযোগ' শব্দটিই সঠিক এবং এর অর্থ একাগ্রতা বা একাগ্র চিত্তে কোনো কিছুতে নিমগ্ন থাকা।
পদাবলি। কারণ, বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী ‘-আবলি’ প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দে সর্বদা ই-কার ব্যবহৃত হয়।
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসারে, যেসব তৎসম ও অতৎসম শব্দের শেষে ‘-আবলি’ প্রত্যয় যুক্ত হয়, সেগুলোতে ‘ই-কার’ (ি) ব্যবহার করা হবে। ‘আবলি’ প্রত্যয়টি মূলত সমষ্টি বা শ্রেণিবিন্যাস বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। পুরোনো বানানে অনেক সময় ‘-আবলী’ (ী-কার) ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে প্রমিত বানানে কেবল ‘-আবলি’ (ই-কার) প্রচলিত। যেমন: কার্যাবলি, শর্তাবলি, রচনাবলি, প্রশ্নাবলি ইত্যাদি। ‘পদাবলী’ শব্দটি ‘পদ’ এবং ‘আবলি’ প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত, তাই প্রমিত বানান হবে ‘পদাবলি’ যেখানে ‘ব’ এর সাথে ই-কার (ি) যুক্ত হবে, ঈ-কার (ী) নয়। এই নিয়মটি বাংলা ভাষার লিখনশৈলীতে সামঞ্জস্য ও প্রমিতকরণ নিশ্চিত করে।
বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী, 'ক' বর্ণের পূর্বে অনুনাসিক ধ্বনি হিসেবে 'ং' (অনুস্বার) ব্যবহৃত হয় না, বরং 'ঙ' ব্যবহৃত হয়, যা 'ক' এর সাথে যুক্ত হয়ে 'ঙ্ক' যুক্তাক্ষর গঠন করে। 'অঙ্ক' শব্দের ক্ষেত্রে এটি একটি ক-বর্গীয় ধ্বনি-সংযুক্ত অনুনাসিক বর্ণমালা।
সাধারণত, বাংলা ব্যাকরণে ক-বর্গীয় ব্যঞ্জনবর্ণের (ক, খ, গ, ঘ) সাথে অনুনাসিক ধ্বনি যুক্ত হলে সেই বর্গের নাসিক্য বর্ণ 'ঙ' ব্যবহৃত হয়। যেমন: অঙ্ক, কঙ্কাল, আকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে, 'ং' (অনুস্বার) প্রায়শই স্বাধীনভাবে বা অন্য কোনো বর্গের ব্যঞ্জনবর্ণের পূর্বে ব্যবহৃত হয়, যদিও এর ব্যবহারেও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। 'অংক' শব্দটি ভুল কারণ এটি এই প্রমিত বানান রীতিকে অনুসরণ করে না।
বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে ই-কার বা উ-কার বসবে। এখানে 'রূপা' শব্দটি কোনো তৎসম শব্দ নয়; এটি একটি তদ্ভব শব্দ, যার অর্থ 'সিলভার'। তাই প্রমিত বানানে এর দীর্ঘ-ঊ-কার (ঊ) পরিবর্তিত হয়ে হ্রস্ব-উ-কার (উ) হবে। এই নিয়মটি বানানের সরলীকরণ এবং শব্দে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ স্বরচিহ্ন পরিহার করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
ভুলের কারণ: এটি বাংলা ব্যাকরণের ণ-ত্ব বিধানের একটি নিয়ম লঙ্ঘন করে। ণ-ত্ব বিধান অনুযায়ী, ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ) পর সবসময় 'ণ' (মূর্ধন্য-ণ) ব্যবহৃত হয়, 'ন' (দন্ত্য-ন) নয়। 'বণ্টন' একটি তৎসম শব্দ এবং এখানে 'ট' ধ্বনির পর 'ণ' যুক্ত হয়ে 'ণ্ট' তৈরি হয়, যা সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং বাংলা প্রমিত বানানের নিয়ম। যেমন: লুণ্ঠন, কাণ্ড, প্রচণ্ড ইত্যাদি।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রয়েছে হাজার বছরেরও বেশি দিনের গৌরবময় ইতিহাস; অথচ বাংলা বানানের ইতিহাস এখনো দুইশ বছরও হয়নি। উনিশ শতকের পূর্বে বাংলা বানানের নিয়ম বলতে তেমন কিছু ছিল না। উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূত্রপাত ঘটে এবং ঐ সাহিত্যের বাহন হিসেবে সাহিত্যিক গদ্যের উন্মেষ হয়, তখন বাংলা বানানের একটি নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই বানানের নিয়ম সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম মেনে রচনা করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিশ শতকের বিশের দশকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৩৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বাংলা বানানের নিয়ম প্রবর্তিত হলেও বাংলা বানানের সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৮৮ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মশালা করে ও বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে বাংলা বানানের নিয়মের একটি খসড়া প্রস্তুত করে। বিশ্বভারতী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অনুসৃত বাংলা বানানের নিয়মের আলোকে ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি 'প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম' প্রণয়ন করে।
বাংলা একাডেমির 'প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম' ভাবনা-কেন্দ্রে রেখে বাংলা বানানের প্রধান নিয়মগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
ই-কার যুক্ত শব্দ:
শব্দের শেষে জগৎ, বাচক, বিদ্যা, সভা, ত্ব, তা, নী, ণী, পরিষদ, তত্ত্ব ইত্যাদি থাকলে তার পূর্বে ঈ-কার না হয়ে সাধারণত ই-কার হয়। যেমন-
প্রদত্ত বাক্যটিতে 'কর্মসূচী' বানানটি ভুল। বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানবিধি অনুযায়ী, 'কর্মসূচি' হবে, যেখানে 'চ' এর সাথে হ্রস্ব ই-কার (ি) ব্যবহৃত হয়। এটি একটি সাধারণ ভুল যা অনেক বাংলা শব্দে দেখা যায়, যেখানে দীর্ঘ ঈ-কার (ী) এর পরিবর্তে হ্রস্ব ই-কার (ি) ব্যবহারের নিয়ম প্রচলিত। যেমন: গাড়ি, বাড়ি, সরকারি, বেসরকারি ইত্যাদি। বাংলা ব্যাকরণে শুদ্ধ বানান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং দাপ্তরিক লেখায় এর সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য।
প্রদত্ত বাক্যটিতে দুটি প্রধান অসঙ্গতি ছিল। প্রথমত, 'মুগ্ধ সৃষ্টি করা' একটি ভুল প্রয়োগ। 'মুগ্ধ' একটি বিশেষণ, যা সাধারণত 'করা' ক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে 'মুগ্ধ করা' (আকৃষ্ট করা বা বিমোহিত করা) অর্থে ব্যবহৃত হয়, অথবা 'মুগ্ধতা' (বিশেষ্য) পদটি 'সৃষ্টি করা' ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে 'মুগ্ধতা সৃষ্টি করা' (বিমোহিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি করা) অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। মূল বাক্যের ভাব অনুযায়ী 'সকলকে মুগ্ধ করবেই' হলো সবচেয়ে সঠিক ও সাবলীল প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, 'কোরবেই' শব্দটি অশুদ্ধ। এর সঠিক রূপ হলো 'করবেই' (প্রমিত বাংলা বানানে র-ফলা ছাড়া লেখা হয়)। এই পরিবর্তনগুলো বাক্যটিকে ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ ও অর্থপূর্ণ করেছে।
বাংলা বানানে শ, ষ, স এর ব্যবহার নির্ণয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। এই তিনটি বর্ণকে যথাক্রমে তালব্য শ, মূর্ধন্য ষ এবং দন্ত্য স বলা হয়। এদের উচ্চারণ স্থান এবং শব্দের ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী এদের ব্যবহার ভিন্ন হয়।
১. তালব্য ‘শ’ এর ব্যবহার:
এটি তালু থেকে উচ্চারিত হয়। বাংলা ভাষার তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি সকল প্রকার শব্দে এর ব্যবহার দেখা যায়।
সাধারণত চ-বর্গীয় ধ্বনির (চ, ছ, জ, ঝ) পূর্বে 'শ' বসে যুক্তবর্ণ গঠন করে। যেমন: নিশ্চয়, পশ্চিম, প্রশ্ন, শাসন, শৈশব।
অনেক বিদেশি শব্দে ইংরেজি ‘sh’ বা ‘s’ ধ্বনির জন্য ‘শ’ ব্যবহৃত হয়। যেমন: শার্ট, শেয়ার, স্টেশন (এখানে যদিও 'স' বেশি প্রচলিত)।
অনেক তদ্ভব ও দেশি শব্দে 'শ' ব্যবহৃত হয়। যেমন: শাপলা, শিয়াল।
২. মূর্ধন্য ‘ষ’ এর ব্যবহার:
এটি মূর্ধা থেকে উচ্চারিত হয় এবং এটি মূলত তৎসম (সংস্কৃত থেকে আগত) শব্দেই ব্যবহৃত হয়। খাঁটি বাংলা শব্দে মূর্ধন্য ‘ষ’ এর ব্যবহার নেই।
‘র’ এর পর মূর্ধন্য ‘ষ’ হয় না, তবে ‘র’ এর পর যদি অন্য স্বরবর্ণ না থাকে এবং ‘ট’ বর্গীয় কোনো বর্ণ থাকে, তাহলে ‘ষ’ হয়। যেমন: কষ্ট, শ্রেষ্ঠ, নষ্ট, কাষ্ঠ, ইষ্ট।
ই-কারান্ত ও উ-কারান্ত উপসর্গের পর ক, খ, গ, প, ফ ইত্যাদি বর্ণের পূর্বে ‘ষ’ হয়। যেমন: অভিষেক, বিষম, প্রতিষেধ, নিষেধ, সুষম, অনুষ্ঠান। (যেমন: সু + সম = সুষম, প্রতি + সেধ = প্রতিষেধ)
কিছু নির্দিষ্ট শব্দে স্বাভাবিভাবেই ‘ষ’ হয়। যেমন: মানুষ, ভাষা, আষাঢ়, পাষাণ, শোষণ, পোশাক, বিষয়, বিষাদ, বিশেষণ।
বিশেষণবাচক শব্দে যেমন: বিশেষণ, বিশেষ্য।
৩. দন্ত্য ‘স’ এর ব্যবহার:
এটি দাঁত থেকে উচ্চারিত হয়। এটি বাংলা ভাষার তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি সকল প্রকার শব্দে ব্যবহৃত হয়।
সাধারণত ত-বর্গীয় ধ্বনির (ত, থ, দ, ধ) পূর্বে ‘স’ বসে যুক্তবর্ণ গঠন করে। যেমন: বস্ত্র, স্থান, আস্থা, সুস্থ, বস্তুত।
সংস্কৃত ‘সাৎ’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ‘স’ হয়। যেমন: ধূঁলিসাৎ, অগ্নিসাৎ।
বিদেশি শব্দে ‘স’ এর ব্যবহার ব্যাপক। যেমন: স্কুল, স্টেশন, বাস, সার্ভিস, সিটি।
খাঁটি বাংলা ও তদ্ভব শব্দে সাধারণত দন্ত্য ‘স’ ব্যবহৃত হয়। যেমন: সকাল, সস্তা, সাপ, সবুজ।
এই নিয়মগুলো মনে রেখে বাংলা বানানে শ, ষ, স এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তবে কিছু ব্যতিক্রমও থাকতে পারে, যা নিয়মিত অধ্যয়ন ও অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করা যায়।