উত্তরঃ
'বহিপীর' নাটকে নানাবিধ সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত রয়েছে। নিচে কয়েকটি সমস্যার উল্লেখ করা হলো-
প্রথমত, 'বহিপীর' নাটকের নামকরণেই পির সম্প্রদায়ের ধর্মব্যাবসার ইঙ্গিত রয়েছে। সুফিবাদের ব্যাখ্যার ওপর পির-মুরিদ প্রথা গড়ে উঠলেও বর্তমান সময়ে তা ব্যাবসার, হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বহিপীর উল্লেখ করেছেন বছরের বিভিন্ন সময় তাকে বিভিন্ন অঞ্চলে মুরিদদের কাছে কাটাতে হয়। মুরিদরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে পিরের সেবা করে। হালের গরু, ছাগল-মুরগির ব্যবস্থা করে খাওয়ায়। অর্থ না থাকলেও ঋণ করে পিরের সেবা করে। তাহেরার বাবা-মা সেই পিরকে খুশি করতে তাদের কিশোরী কন্যাকে বিয়ে দিয়েছিল। এমনকি বহিপীর চাইলে তার ধনী মুরিদরা পিরকে জমিদারি রক্ষার টাকা দেবেন বলেও বহিপীরের দৃঢ় বিশ্বাস'।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মভীতি 'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। বাস্তব জ্ঞানবহির্ভূত ধর্মভীতিই ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়ে উৎসাহিত করে। 'বহিপীর' নাটকের খোদেজা চরিত্রটি ধর্মীয় ভীতির প্রামাণ্য দলিল। তাহেরার সঙ্গে বহিপীরের বিয়ে অন্যায় বুঝেও তিনি বহিপীরকেই সমর্থন করেন শুধু বহিপীরের বদদোয়া লাগার ভয়ে।
তৃতীয়ত, অসম বয়সের বিবাহ এ নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। হিন্দু সমাজের কৌলীন্য প্রথার সূত্র ধরে বাংলার সর্বত্র অসম বয়সের বিয়ে চালু হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' প্রহসনে আশি বছর বয়স্ক কুলীন ব্রাহ্মণের সঙ্গে আট বছরের শিশুকন্যার বিয়ে এক সময়ে এ সমাজে প্রচলিত সত্য ছিল। 'বহিপীর' নাটকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সঙ্গে কিশোরী তাহেরার বিয়ের ব্যাপারটি সেই অসম বয়সের বিয়েকে সামনে এনেছে।
চতুর্থত, নারীসমাজের প্রতি সামাজিক অবমাননার দিকটি ফুটে উঠেছে 'বহিপীর' নাটকে। 'বহিপীর নাটকে তাহেরার ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসার দিকটি নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিকতার পরিচায়ক। কিন্তু জমিদারপত্নী খোদেজা বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখেননি। তিনি নানাভাবে তাহেরাকে হেয় করেছেন।
পঞ্চমত, ইংরেজদের রেখে যাওয়া জমিদারি প্রথার ভাঙন। 'বহিপীর' নাটকে জমিদার হাতেম আলি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। বাপ-দাদার আমলে জমিদারির নাম-ডাক থাকলেও এখন তা কেবল ঢাকের ঢোলের মতো। তাও সন্ধ্যা আইনে নিলামে চড়তে যাচ্ছে।
'বহিপীর' নাটকের উল্লেখযোগ্য সামাজিক সমস্যা ওপরে বর্ণিত হলো। নাট্যকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এসব বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেছেন।