বর্ণনামূলক প্রশ্ন

Updated: 8 months ago
উত্তরঃ

'সূর্যাস্ত আইন' জমিদার হাতেম আলির জমিদারি নিলামে দাঁড় করিয়েছে। ১৭৯৩ সালে প্রণীত এ আইনে বলা আছে, নির্ধারিত তারিখে সূর্য ডোবার পূর্বে জমিদারদের খাজনা পরিশোধ করতে হবে। তা করতে ব্যর্থ হলে খাজনা পরিশোধে অপরাগতার দায়ে জমিদারির স্বত্ব নিলামে উঠে যাবে। জমিদার হাতেম আলি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি। বংশপরম্পরায় জমিদারির দাপট কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত হাতেম আলির জমিদারি যেখানে এসে পৌছায়, তাকে নাট্যকার 'ঢাকের ঢোল' বলে উল্লেখ করেছেন। তবু গ্রামে সম্মান বজায় রেখে চলার জন্য এই জমিদারি সহায়ক ছিল। কিন্তু খাজনা বাকি পড়ায় এখন তা নিলামে ওঠার উপক্রম হয়েছে। জমিদারির আয় ছাড়া হাতেম আলির আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই। এই জমিদারির ওপরই নির্ভর করছে সম্মান বজায় রেখে চলা। তাই বলা যায়, 'সূর্যাস্ত আইন' হাতেম আলির জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে বহিপীর ও হাতেম আলির সম্পর্ক আশ্রয়হীনতা ও আশ্রয়দাতার।

'বহিপীর' নাটকের বহিপীর এই এলাকার মানুষ নন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। বছরের বিভিন্ন সময় তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত তার মুরিদদের সঙ্গে কাটান। এখানে তার এক পেয়ারের মুরিদ আছে। মুরিদ পিরের আশীর্বাদ পেতে নিজ কন্যাকে বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে বিয়ে দেয়। মুরিদের মেয়ে তাহেরা এই অসম বয়সের বিয়েকে মেনে নেয় না। তাই সে বিয়ের রাতে বাড়ি ছেড়ে পালায়। ফলে পিরসাহেব তার সহযোগী হকিকুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে নববধূকে খুঁজতে বের হন। নৌকায় করে যাওয়ার সময় প্রচন্ড ঝড় ওঠে।

তখন বহিপীরের নৌকার সঙ্গে জমিদারি বজরার ধাক্কা লাগে। আধ ডোবা অবস্থায় বহিপীরকে উদ্ধার করেন জমিদার হাতেম আলি।

হাতেম আলি একজন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। রেশমপুরে তাঁর যৎকিঞ্চিৎ জমিদারি রয়েছে যা সান্ধ্য আইনে নিলামে চলে যেতে বসেছে। তাই তিনি শহরে বন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে টাকা ধারের জন্য গিয়েছিলেন। বিষয়টি প্রথমে তিনি স্ত্রী-পুত্র এমনকি বহিপীরের কাছেও গোপন রাখেন। বন্ধুর কাছ টাকা থেকে ধার না পাওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন এবং বহিপীরের কাছে সবকিছু খুলে বলেন।

বহিপীর প্রথমত হাতেম আলির অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণ করেন। তিনি জানতে পারেন তার পলাতক স্ত্রী তাহেরা জমিদারের এই বজরায়ই অবস্থান করছে। তাই তিনি জমিদার হাতেম আলিকে তার স্ত্রীকে তার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার শর্তে টাকা ধার দিতে চান। শহরে পিরসাহেবের কিছু ধনী মুরিদ আছে। তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বহিপীর জমিদার হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।

হাতেম আলি পিরসাহেবের এই শর্তের মর্মার্থ খুঁজে পান না। বিপদে ! পড়লেও' হাতেম আলি ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। তাই তিনি এমন শর্তে টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পিরসাহেবও তার ভুল বুঝতে পারেন। । ফলে তিনি বিনা শর্তে হাতেম আলিকে টাকা দিতে রাজি হন।
বহিপীর ও হাতেম আলির সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলা যায় দুজনেই গভীর দুশ্চিন্তায় মগ্ন। বহিপীর তার পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার এবং বুঝিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় ব্যস্ত। অন্যদিকে হাতেম আলি বহু পুরোনো জমিদারি হারানোর দুশ্চিন্তায় ভীত। জমিদারির সঙ্গে হাতেম আলির মানসম্মান সহকারে বেঁচে থাকা নির্ভর করছে। তাই হাতেম আলি ও পিরসাহেবকে গভীর দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে মেলানো যেতে পারে।

উত্তরঃ

"খোদা কাকে কীভাবে পরীক্ষা করেন তা বুঝিবার ক্ষমতা আমাদের নাই।"- আলোচ্য উক্তিটি বহিপীরের। বহিপীর জমিদারি হারানোর ভয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হাতেম আলিকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এ কথা বলেছেন।

বিপদের সময় আত্মহারা হয়ে পড়া উচিত নয়। বরং ধৈর্য ধরে বিপদ থেকে উত্তরণের চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যখন সব উপায় শেষ হয়ে যায়, তখন ধৈর্য ধরে রাখা সম্ভব হয় না। হাতেম আলির জমিদারি সান্ধ্য আইনে নিলামে ওঠার উপক্রম হয়েছে। স্ত্রী-'সন্তানকে মিথ্যা বলে শহরে চিকিৎসার নাম করে বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে অর্থ সাহায্যের জন্য এসেছিলেন তিনি। অথচ ধনাঢ্য সেই বন্ধুও তাঁকে নিরাশ করেছেন। ফলে হাতেম আলি হতাশায় দুচোখে অন্ধকার দেখছেন। তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে শুরু করেছে। বহিপীর তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখার উপদেশ দিয়েছেন। বহিপীরের মতে, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। হাতেম আলির জমিদারি যাওয়ার আশঙ্কাও হয়তো সেই রকম একটি পরীক্ষা। তাই বিচলিত না হয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভরসা রাখা উচিত বলে মনে করেন বহিপীর।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে নানাবিধ সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত রয়েছে। নিচে কয়েকটি সমস্যার উল্লেখ করা হলো-

প্রথমত, 'বহিপীর' নাটকের নামকরণেই পির সম্প্রদায়ের ধর্মব্যাবসার ইঙ্গিত রয়েছে। সুফিবাদের ব্যাখ্যার ওপর পির-মুরিদ প্রথা গড়ে উঠলেও বর্তমান সময়ে তা ব্যাবসার, হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বহিপীর উল্লেখ করেছেন বছরের বিভিন্ন সময় তাকে বিভিন্ন অঞ্চলে মুরিদদের কাছে কাটাতে হয়। মুরিদরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে পিরের সেবা করে। হালের গরু, ছাগল-মুরগির ব্যবস্থা করে খাওয়ায়। অর্থ না থাকলেও ঋণ করে পিরের সেবা করে। তাহেরার বাবা-মা সেই পিরকে খুশি করতে তাদের কিশোরী কন্যাকে বিয়ে দিয়েছিল। এমনকি বহিপীর চাইলে তার ধনী মুরিদরা পিরকে জমিদারি রক্ষার টাকা দেবেন বলেও বহিপীরের দৃঢ় বিশ্বাস'।

দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মভীতি 'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। বাস্তব জ্ঞানবহির্ভূত ধর্মভীতিই ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়ে উৎসাহিত করে। 'বহিপীর' নাটকের খোদেজা চরিত্রটি ধর্মীয় ভীতির প্রামাণ্য দলিল। তাহেরার সঙ্গে বহিপীরের বিয়ে অন্যায় বুঝেও তিনি বহিপীরকেই সমর্থন করেন শুধু বহিপীরের বদদোয়া লাগার ভয়ে।

তৃতীয়ত, অসম বয়সের বিবাহ এ নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। হিন্দু সমাজের কৌলীন্য প্রথার সূত্র ধরে বাংলার সর্বত্র অসম বয়সের বিয়ে চালু হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' প্রহসনে আশি বছর বয়স্ক কুলীন ব্রাহ্মণের সঙ্গে আট বছরের শিশুকন্যার বিয়ে এক সময়ে এ সমাজে প্রচলিত সত্য ছিল। 'বহিপীর' নাটকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সঙ্গে কিশোরী তাহেরার বিয়ের ব্যাপারটি সেই অসম বয়সের বিয়েকে সামনে এনেছে।

চতুর্থত, নারীসমাজের প্রতি সামাজিক অবমাননার দিকটি ফুটে উঠেছে 'বহিপীর' নাটকে। 'বহিপীর নাটকে তাহেরার ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসার দিকটি নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিকতার পরিচায়ক। কিন্তু জমিদারপত্নী খোদেজা বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখেননি। তিনি নানাভাবে তাহেরাকে হেয় করেছেন।

পঞ্চমত, ইংরেজদের রেখে যাওয়া জমিদারি প্রথার ভাঙন। 'বহিপীর' নাটকে জমিদার হাতেম আলি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। বাপ-দাদার আমলে জমিদারির নাম-ডাক থাকলেও এখন তা কেবল ঢাকের ঢোলের মতো। তাও সন্ধ্যা আইনে নিলামে চড়তে যাচ্ছে।

'বহিপীর' নাটকের উল্লেখযোগ্য সামাজিক সমস্যা ওপরে বর্ণিত হলো। নাট্যকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এসব বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেছেন।

উত্তরঃ

আশ্রয়দাতা জমিদার হাতেম আলির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাঁর জমিদারি রক্ষার জন্য তাহেরা বহিপীরের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। তাহেরা সৎমায়ের সংসারে বড় হওয়া মেয়ে। তার সৎমায়ের ইন্ধনে বাবা বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেয়। তাহেরা এই অসম বয়সের বিয়ের ব্যাপারে সোচ্চার হয় এবং বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেয়। জমিদার হাতেম আলি ও তার স্ত্রী খোদেজা অসহায় তাহেরাকে আশ্রয় দেওয়ায় তাদের প্রতি তাহেরা কৃতজ্ঞ। জমিদারগিন্নি খোদেজা তাকে কন্যার সমতুল্য মনে করেছেন। ঘটনাচক্রে বহিপীর ঝড়ের কবলে পড়ে জমিদারের বজরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি জানতে পারেন তার পলাতক নববধূ এই বজরাতেই অবস্থান করছে। ধূর্ত বহিপীর তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্তে হাতেম আলিকে জমিদারি রক্ষায় টাকা ধার দিতে চান। আশ্রয়দাতা হাতেম আলির উপকারে আসার সুযোগ তাহেরা হাতছাড়া করে না। জমিদার হাতেম আলির প্রতি কৃতজ্ঞতাবশে তাহেরা বহিপীরের সঙ্গে ফিরে যেতে রাজি হয়।

উত্তরঃ

হ্যাঁ, হাশেমকে প্রতিবাদী চরিত্র বলা যায়।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র জমিদারপুত্র হাশেম আলি। প্রচলিত জমিদারি ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা লাম্পট্য শ্রেণির যুবক সে নয়। হাশেম আলি উচ্চশিক্ষিত বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। জমিদারপুত্র হয়েও পিতার জমিদারির প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। বরং ব্যাবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় সে। তাই বাবার কাছে ছাপাখানার ব্যাবসা দেওয়ার স্বপ্ন ব্যক্ত করেছে।

হাশেম আলি একটি ইতিবাচক চরিত্র। মানবীয় মূল্যবোধ ও ন্যায়বোধের গুরুত্ব তার কাছে সর্বাধিক। এক অর্থে হাশেম আলিকে নায়ক বলা যেতে পারে। জমিদারপুত্র হলেও বৈষয়িক বিবেচনা তার কাছে কম। পিতার জমিদারি চলে গেলে এবং ছাপাখানা বসাতে না পারলেও সে চিন্তিত নয়। সে ভাবে, যখন লেখাপড়া করেছে তখন একটা কিছু হবেই। সে অত্যন্ত যুক্তিবাদী, আধুনিক ও মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ।

অসম বিয়ে না মেনে ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসা তাহেরার সমস্যা হাশেম আলিই প্রথম উপলব্ধি করে। হাশেম তাহেরার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। মেয়েটি আত্মহনন করতে পানিতে ঝাঁপ দিতে চাইলে হাশেম তাকে রক্ষা করে। পুরো বজরার মানুষ তাহেরার বিপক্ষে চলে গেলেও একমাত্র হাশেমই ছিল তার পক্ষে এবং শেষ পর্যন্ত সে তার পক্ষ ত্যাগ করেনি। নাটকে' তাকে অস্থিরচিত্ত বলে বর্ণনা করা হলেও সে তার অবস্থানে ছিল স্থির। এক্ষেত্রে মাতার সাবধান বাণী, বহিপীরের ভীতি প্রদর্শন, পিতার করুণ অবস্থা- কোনোকিছুই তাকে পিছু হটাতে পারেনি। সে তাহেরাকে বাঁচাতে চেয়েছে, এমনকি বিয়ে করে হলেও। জমিদারপুত্র হিসেবে তাহেরা তার কাছে একটি অপরিচিত মেয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সব বৈষয়িক ভাবনা ত্যাগ করে মেয়েটিকে বাঁচাতে সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। সবকিছু ছিন্ন করে অচেনা অপরিচিত একটি মেয়েকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে অজানার উদ্দেশ্যে।

হাশেম আলির শিক্ষা কেবল বাহ্যিক নয়, তার মনুষ্যত্ব গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সে সব ধরনের সংকীর্ণতামুক্ত আধুনিক যুবক। প্রেসের ব্যাবসার সম্ভাবনা বিনষ্ট হলেও সে চিন্তিত নয়। সে মায়ের সাবধান বাণী, বহিপীরের ভীতি প্রদর্শন কিংবা বাবার করুণ অবস্থার চিন্তায় মনুষ্যত্বহীন কাজ করতে প্রস্তুত নয়। সমাজের প্রচলিত অসম বিয়ের বিরুদ্ধে সে প্রতিবাদী। আর এই অসম বিয়ের শিকার বালিকা তাহেরাকে নিয়ে পালিয়ে তার প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলা যায় যে, হাশেমকে অবশ্যই প্রতিবাদী যুবক বলা যায়।

উত্তরঃ

"কথ্য ভাষা হইল মাঠ-ঘাটের ভাষা, খোদার বাণী বহন করার উপযুক্ততা তাহার নাই।"- উক্তিটি 'বহিপীর' তার নাম প্রসঙ্গে করেছিল।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। তিনি এখানকার লোক নন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। বছরের বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের 'বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মুরিদদের বাড়িতে কাটান পিরসাহেব। তাকে সারা বছরই ওয়াজ-নসিহত করে ফিরতে হয়। তাছাড়া দেশের সর্বত্র তার মুরিদ থাকায় আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা তার পক্ষে অসম্ভব। কেননা একেক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা একেক রকম। তাই বহিপীরকে বাধ্য হয়ে বইয়ের ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হয়। তাছাড়া বহিপীর মনে করেন কথ্য ভাষা জনসাধারণের ভাষা। শরিয়ত তথা সৃষ্টিকর্তার দিকনির্দেশনামূলক উপদেশ বহন করার সক্ষমতা আঞ্চলিক কথ্য ভাষার নেই। ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত খোদার বাণীকে যথাযথভাবে ধারণ করার গুরু-গম্ভীর বৈশিষ্ট্য কেবল বইয়ের ভাষারই রয়েছে। তাই বহিপীর মনে করেন খোদার বাণী ধারণ করার ক্ষমতা কথ্য ভাষার নেই।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের 'সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র তাহেরা। সে মাতৃহীন। সে সৎমায়ের সংসারে পালিত এক মেয়ে। তার বাবা এবং সৎমা তার মতামতকে উপেক্ষা করে বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সে বাড়ি ছেড়ে পালায়। তাই তাহেরাকে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক বলা যায়।

নিজের অমতে বিয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ঘর ছেড়ে পালানো, তৎকালীন সমাজ বিচারে একটা মেয়ের পক্ষে কখনোই সহজ কাজ 'বলা যায় না। ফলে তাহেরা পালিয়ে গিয়ে নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। নানাবিধ আশঙ্কা নিয়ে পালিয়ে তাহেরা সমাজে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকটি উন্মোচন করেছে।

ব্যক্তিমানুষ হিসেবে সমাজে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমঅধিকার থাকা উচিত। বিয়ের মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মতামত জানানো প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার। কিন্তু আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় কর্তৃত্ববান পুরুষের মতামত নেওয়া হলেও নারীরা সব সময় থেকেছে অবহেলিত। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তে তাদের মতামত জানার প্রয়োজন মনে করে না সমাজের কর্তাব্যক্তিরা। তাহেরার মতো প্রতিবাদী নারীরা তাদের সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য না দিলে এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে তবেই সমাজের পরিবর্তন আসবে। তাই পারিবারিক সিদ্ধান্তকে মেনে না নিয়ে পালিয়ে আসায় তাহেরা চরিত্রের মধ্যে দুঃসাহসিকতা ফুটে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত, জন্মগতভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বাধীন। মতামতের ব্যাপারেও তাই। প্রত্যেক মানুষের রয়েছে অপরের মতকে অগ্রাহ্য করার স্বাধীনতা। তাহেরার মাঝে ব্যক্তিস্বাধীনতার সেই বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে। বাবা-মায়ের মতামত, বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে বিয়ের সিদ্ধান্ত তাহেরার পক্ষে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাই সে তার ব্যক্তিস্বাধীনতার বলে এ বিয়েকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পালিয়ে এসেছে। বিষয়টি তার ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নির্দেশ করেছে।
উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে যে, সমাজ তথা পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাহেরার অবস্থান। একাকী একটা মেয়ের পক্ষে বাড়ি থেকে পালিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে পা বাড়ানো ভীতুদের কাজ নয়। তাহেরা পালিয়ে গিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। আবার প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে পারিবারিক অবিবেচনামূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করার। তাহেরা পারিবারিক সিদ্ধান্তকে মেনে না নিয়ে সেই স্বাধীনতার পরিচয় দিয়েছে। তাই নাটকে তাহেরাকে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক বলা যায়।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের বহিপীর চরিত্রটি অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন তাকে অসম বয়সে বিয়ের জন্য নানাবিধ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তিনি সবকিছু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। বহিপীরের প্রথম স্ত্রীর মারা যান চৌদ্দ বছর পূর্বে। বৃদ্ধ বয়সের নিঃসঙ্গতা কাটাতে মুরিদের কন্যাকে বিয়ে করার অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেননি। বিয়ের রাতে স্ত্রী পালিয়ে গেলে তিনি তাকে খুঁজতেও বেরিয়েছেন। এসব বিষয়ে তিনি পুলিশি হস্তক্ষেপ পরিত্যাগ করেছে। তাহেরাকে ফিরিয়ে আনতে তিনি ধর্মের দোহাইও দিয়েছেন। এতে তাহেরার মন না গলায় পুলিশের ভয় দেখিয়েছেন। তারপর তিনি মানবিকতার বাহানায় তাহেরার সহানুভূতি পেতে চেয়েছেন। সবকিছুই করেছেন স্থিরচিত্তের সঙ্গে। শেষমেশ হাতেম আলিকে টাকা ধার দেওয়ার শর্ত হিসেবে তাহেরাকে অধিকার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তাহেরা হাশেমের সঙ্গে চলে গেলে বহিপীর বিনা শর্তে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার টাকা দিয়েছেন। তাই একদিক থেকে বিচার করলে 'বহিপীর' তাহেরার একটি নিশ্চিত স্থান দেখতে চেয়েছেন। 'বহিপীর' নাটকের এই দিক বিবেচনায় বহিপীর চরিত্রটি সম্পূর্ণ ইতিবাচক চরিত্র।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে বহিপীর ও খোদেজা চরিত্রের মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামির চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের বহিপীর চরিত্রটি গ্রামীণ মানুষের কুসংস্কারকে আশ্রয় করে গঠিত পির সম্প্রদায়ের ধর্মব্যাবসার স্বরূপ তুলে ধরেছেন। বহিপীরের বাড়ি সুনামগঞ্জে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে।

বহিপীর সারা বছর মুরিদদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওয়াজ-নসিহত করে সেবা নেন। বহিপীরের মুরিদরা তার কথায় সব করতে পারে। হালের গরু বিক্রি করে, আথালের ছাগল-মুরগি জবাই করে পিরের সেবা করতে প্রস্তুত। মুরিদদের সামর্থ্যে না থাকলেও কর্জ করে পিরের সেবায় মরিয়া তারা। এমনকি পিরের এক মুরিদ ও তার স্ত্রী মিলে তাদের বালিকাকন্যা তাহেরাকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ পিরের সঙ্গেও বিয়েও দেয়। যদিও তাহেরা তা মেনে নেয়নি। বহিপীরের শহরের ধনী মুরিদরা পির সাহেবকে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার টাকা দিতেও কসুর করবে না। ধর্মকে পুঁজি করে ব্যাবসার এই তথ্যটি বাংলাদেশের সমাজে জেঁকে বসা পির-মুরিদি নামক ধর্মব্যাবসার স্বরূপ উন্মোচন করেছে।

'বহিপীর' নাটকের একটি অপ্রধান চরিত্র খোদেজা। জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী। এই চরিত্রটি অত্যন্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু। তাহেরার সঙ্গে বহিপীরের অসম বিয়েটা যে অন্যায় সেটি বুঝতে পেরেও পিরের অভিশাপের ভয়ে তিনি এ ধরনের কাজকে অস্বীকার করেন না। ছেলে হাশেম তাহেরাকে উদ্ধার করতে চাইলে তিনি ছেলেকে পিরের অভিশাপের জন্য নিষেধ করেন। এমনকি ছেলে ও পির মুখোমুখি অবস্থানে গেলে তিনি পিরের পক্ষে অবস্থান নেন। অথচ তিনি তার ছেলেকেও শক্তভাবে দমন করতে পারেনি। পিরভক্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভীতু প্রকৃতির এমন খোদেজাদের কারণেই সমাজে এখনো পির সম্প্রদায়ের ধর্মব্যাবসা টিকে থাকতে পেরেছে। পির সাহেবের জীবনাচরণ ও তার মুরিদানদের সর্বস্ব দিয়ে পিরের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা 'বহিপীর' নাটকের ধর্মীয় গোঁড়ামির চিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছে। পাশাপাশি জমিদারপত্নী খোদেজার কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামি সমাজে প্রচলিত ধর্মব্যাবসা বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। বহিপীর ধর্মব্যবসায়ী হলে খোদেজা ধর্মব্যাবসার অনুকূল পরিবেশ।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের উল্লিখিত পিরপ্রথা বাংলাদেশের পির-মুরিদ সম্পর্কের স্বরূপ উন্মোচন করেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসলাম ধর্ম সূচিত হয়ে মধ্যযুগে ভারতবর্ষ ও বাংলা অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। অশিক্ষিত জনসাধারণকে সুফিবাদের ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তা থেকে পিরপ্রথার সূচনা হয়। ধীরে ধীরে তা একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ধর্মব্যাবসায় রূপ লাভ করে। 'বহিপীর' নাটকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। 'বহিপীর' নাটকের নামকরণের মধ্যেই পিরপ্রথার ইঙ্গিত রয়েছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। বছর দুবছর অন্তর তিনি তার বিভিন্ন অঞ্চলে মুরিদদের বাড়ি গমন করেন। মুরিদরা সর্বস্ব উজাড় করে পিরের সেবা করে। গৃহস্থের ছাগল-হাঁস-মুরগি জবাই করে, অর্থ কর্জ করে হলেও পিরের সেবায় তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। বহিপীরের ধনী মুরিদরা তাকে জমিদারি নিলামের হাত থেকে বাঁচানোর মতো অর্থ দিতেও কসুর করবে না বলে পিরসাহেব আত্মবিশ্বাসী। তাহেরার বাবা-মা তো বৃদ্ধ পিরের সেবায় কিশোরী কন্যাকেও দান করে দিয়েছে।

উত্তরঃ

বহিপীর নাটকের দুই ভিন্ন মানসিকতার দুজন নারী চরিত্র তাহেরা ও খোদেজা। তারা পরস্পর বিপরীত মেরুর চরিত্র।

তাহেরা চরিত্রটির প্রতি নাট্যকার বিশেষ যত্নবান ছিলেন। গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ পরিবারের মেয়ে তাহেরা। তার মা নেই। সৎমায়ের সংসারে সে মানুষ। বাবা ও সৎমা মিলে বৃদ্ধ বহিপীরের সঙ্গে তার বিয়ে দেয়। বহিপীর সুনামগঞ্জের অধিবাসী। তাহেরার বাবা, সৎমা বহিপীরের মুরিদ। পিরের আশীর্বাদ পেতে তারা তাদের মেয়েকে উৎসর্গ করে। তাহেরা বিশ শতকের প্রথমার্ধের নারীজাগরণের প্রতীকী চরিত্র। সে এই অসম বিয়ে মানে না। তাই বিয়ের রাতে ঘর ছেড়ে পালিয়ে ডেমরার ঘাটে পৌছায়। সেখানে বাজে ছেলেদের কুনজরে পড়তে দেখে জমিদারপত্নী খোদেজা তাকে বজরায় আশ্রয় দেন।

অন্যদিকে জমিদারপত্নী খোদেজা। স্বামীর চিকিৎসার জন্য স্বামী ও একমাত্র পুত্র হাশেম আলিকে নিয়ে শহরে যান। খোদেজা সরল পল্লি নারীর প্রতীক। সামাজিকতার বন্ধনকে তিনি ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন। কুসংস্কার ও ধর্মভীরুতা তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি মনে করেন তাহেরার বিয়ের আসর থেকে পালানো উচিত হয়নি। এমনিতে খোদেজা মানবিক গুণের অধিকারী। তবে পিরের বদদোয়াকে তিনি খুবই ভয় পান। তাহেরা প্রসঙ্গে বহিপীর ও তার নিজ পুত্র হাশেম আলি মুখোমুখি দাঁড়ালে খোদেজা বহিপীরের পক্ষ নেন। ব্যক্তিত্বের দিক থেকে খোদেজা খুবই দুর্বল। তিনি শক্ত হাতে তার পুত্রকেও দমাতে পারেননি।

এদিক থেকে তাহেরা দুঃসাহসিকতার পরিচয়বাহী। তাহেরা স্বাধীন ব্যক্তিসত্তায় উদ্ভাসিত অনমনীয় এক নারী। সে কখনোই বহিপীরকে স্বামী হিসেবে মেনে নেয়নি; বরং বারবার প্রতিবাদ করেছে। বহিপীরের দেখানো পুলিশের ভয়, বার্ধক্যজনিত সহানুভূতির দোহাই কোনোকিছুই তার ব্যক্তিত্বকে টলাতে পারেনি। সে প্রয়োজনে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে তবু বহিপীরের সঙ্গে যাবে না। কিন্তু তার আশ্রয়দাতা হাতেম আলিকে জমিদারি রক্ষায় টাকা দেওয়ার শর্তে সে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হয়েছে। এদিক বিচারে তাহেরা চরিত্রটি মানবিক।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, তাহেরা চরিত্রটি 'দুঃসাহসী নারীসত্তার প্রতীক। জীবনের প্রশ্নে সে স্বাধীনচেতা, নিজ সিদ্ধান্তে অনমনীয়। কৃতজ্ঞতাবোধ চরিত্রটিকে মানবীয় করে তুলেছে। অন্যদিকে খোদেজা চরিত্রটি সরল, ধর্মভীরু গ্রামীণ মায়ের প্রতীক। তাহেরাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার পরিচয় দিলেও বহিপীরের অধ্যাত্মশক্তির ভয়ে ভীত তিনি। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস চরিত্রটিকে নেতিবাচক করে তুলেছে।

উত্তরঃ

বিভিন্ন অঞ্চলের মুরিদদের বোঝার স্বার্থে বহিপীর বইয়ের ভাষা রপ্ত করেছেন।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। তিনি এখানকার মানুষ নন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। বছর দুবছরে বহিপীর একবার মুরিদদের বাড়ি যান সেবা নেওয়ার ও ধর্ম উপদেশ দেওয়ার জন্য। মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে বহিপীরের সেবা করে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় তার মুরিদ থাকায় সব অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা তার পক্ষে শেখাটা দুরূহ। তাছাড়া এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলে কটু শোনায়। আবার কথ্য ভাষার বেশ কিছু সংকীর্ণতা রয়েছে। বহিপীর যেহেতু ওয়াজ-নসিহত করে বেড়ান, সেহেতু তার ভাষায় গাম্ভীর্য থাকা বাঞ্ছনীয়। কথ্য ভাষার শব্দে সেই গাম্ভীর্য নেই যা শরিয়তের বাণীকে বহন করতে পারে। তাই বহিপীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার জটিলতা এড়াতে এবং কথা-বার্তায় যথার্থ গাম্ভীর্য বজায় রাখতে বইয়ের ভাষা রপ্ত করেছেন।

উত্তরঃ

হ্যাঁ, তাহেরাকে বিশ শতকের নারী অধিকার ও জাগরণের প্রতীক বলা যায়। আমার মতের সপক্ষে নিচে যুক্তি তুলে ধরা হলো-

'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ উনিশ শতকের শেষাংশ এবং বিশ শতকের সূচনালগ্নকে নির্দেশ করে। ১৭৯৩ সালে 'সূর্যাস্ত আইন' ব্রিটিশ ভারতে চালু হয় এবং এ আইনে জমিদার হারাতে থাকে। এ সময় পর্যন্ত হাতেম আলির ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি প্রমাণ করে নাটকটি বিশ শতকের সূচনায় প্রবহমান। বিশ শতক বাংলার আধুনিকতাবাদের কাল। সাহিত্য সমাজ সংস্কারের তুমুল গতিধারা নিয়ে বিশ শতক উদ্ভাসিত। বেগম রোকেয়া, বেগম ফজিলাতুন্নিসার মতো নারীরা বিশ শতকের প্রথমার্ধে নারীর অধিকারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাহেরা চরিত্রের মধ্যে লেখক বিশ শতকের সেই নারীজাগরণের বীজ বুনে দিয়েছেন।

তাহেরার বাবা-সৎমা তাদের বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেয়। বিয়েতে তাহেরার মতকে তারা উপেক্ষা করে। অসম বয়সের এই বিয়ে সে মেনে নেয় না। বিয়ের রাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় সে। সমকালীন সমাজ বিচারে একটি কিশোরীর পক্ষে এমন দুঃসাহসের কাজ অভাবনীয়। স্বাধীনচেতা তাহেরা তা করে দেখায়। আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে অনিশ্চিত পথে পা বাড়ানো একটি মেয়ের পক্ষে সহজ ছিল না। তাহেরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছে।

বহিপীর তার সহযোগী হকিকুল্লাহকে নিয়ে তাহেরার খোঁজে বের হলে ঘটনাক্রমে জমিদার হাতেম আলির বজরায় তাহেরার সন্ধান পায়। তাহেরা নিজের পরিচয়ও গোপন করেনি। কিন্তু বহিপীরের সব কূটচক্রের জাল ছিন্ন করেছে। বহিপীরের দেখানো পুলিশের ভয়ে তাহেরা ভীত হয়নি। এক্ষেত্রে বৃদ্ধ মানুষ হিসেবে পিরের সহানুভূতির প্রশ্নেও তাহেরা ছিল অবিচলিত। সে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন করতেও প্রস্তুত তবুও বহিপীরের সঙ্গে ফিরে যাবে না। এই অনমনীয় ব্যক্তিত্ব তাহেরাকে আধুনিক মানুষে পরিণত করেছে। শেষ পর্যন্ত সে জমিদারপুত্র হাশেম আলির হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে চলে যায়।

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বিশ শতকের সূচনার পরিমন্ডলে রচিত 'বহিপীর' নাটকের তাহেরা চরিত্রটি স্বাধীনচেতা, অধিকারসচেতন, আধুনিক নারীজাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাহেরা শেষ পর্যন্ত তার ব্যক্তিত্বে থেকেছে অটল, সিদ্ধান্তে থেকেছে অনমনীয়। নিজের মতামতকে উপেক্ষা করায় বাড়ি থেকে পালিয়ে দুঃসাহসিতার যে পরিচয় দিয়েছে তা সমকালীন পরিমন্ডলে বিরল।

উত্তরঃ

নাটক সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা। নাটক শব্দটির মধ্যেই নাটক কী তার ইঙ্গিত রয়েছে। নাটক শব্দটির উৎপত্তি 'নট্' মূল ধাতু থেকে উৎগত। নট্ মানে হচ্ছে নড়াচড়া করা, অঙ্গচালনা করা। নাটকের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Drama। Drama শব্দটি এসেছে গ্রিক Dracin শব্দ থেকে। যার অর্থ হলো to do বা কোনো কিছু করা। নাটকের মধ্যেও মূলত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নড়াচড়া, কথাবার্তা ইত্যাদির মাধ্যমে জীবনের বিশেষ কোনো দিক বা ঘটনা উপস্থাপন করা হয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে নাটককে কাব্যসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নাটক অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয় বলে একে দৃশ্যকাব্য বলা হতো। কিন্তু নাটক শুধু দেখার বিষয় নয়, শোনারও বিষয়। নাটক মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে দেখা ও শোনার মাধ্যমে দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়। তাই এটি একটি মিশ্র শিল্পমাধ্যম। বর্তমান সময়ে নাটক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে।

উত্তরঃ

"বহিপীর' নাটকের বহিপীর অত্যন্ত ধূর্ত ও বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি।"- মন্তব্যটি যথার্থ।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। সুনামগঞ্জ জেলায় তার বাড়ি। বহিপীর বছর দুবছরান্তে মুরিদদের বাড়িতে যান। মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে তার সেবা করে। একবার এক মুরিদ তার কন্যাকে বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইলে বহিপীর তাতে দ্বিমত করেন না। কারণ হিসেবে একাকিত্বের অজুহাত দেখান। বহিপীরের প্রথম স্ত্রী মারা যান চৌদ্দ বছর আগে। তাই বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীসেবা পেতে তার আগ্রহের কমতি নেই।

বহিপীরের বিয়ে করা কিশোরী স্ত্রী বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে বিপত্তি ঘটে। অল্পবয়সি কিশোরী তাহেরা বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে নিজের অমতে এমন বিয়েকে মেনে নেয়নি। সে পালিয়ে গেলে তার বাবা ও সৎমা পুলিশে খবর দিতে চাইলে বুদ্ধিমান বহিপীর সেসব নিষেধ করেন। কেননা তিনি বুঝতে পারেন তাহেরার অমতে এমন বিয়ে আইন দ্বারা স্বীকৃত নয়। ফলে পুলিশে জানালে হিতে বিপরীত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। অগত্যা নিজের সফরসঙ্গী হকিকুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে বহিপীর নিজেই পলাতক স্ত্রীকে খুঁজতে বের হন।

ভাগ্যক্রমে তাহেরা যে জমিদারি বজরায় আশ্রয় গ্রহণ করে, ঝড়ে নৌকাডুবি হয়ে একটুর জন্য বেঁচে গিয়ে বহিপীরও সেই বজরাতেই আশ্রয় নেন। তার পলাতক স্ত্রী হাতেম আলির এই বজরাতেই অবস্থান করছে দেখে বহিপীর কিছুটা নিশ্চিন্ত হন। তারপর নানা রকম কৌশলের মাধ্যমে তাহেরাকে নিজের সঙ্গে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে প্রচেষ্টা চালান। প্রথমত নরম কণ্ঠে ভদ্রভাবে তাকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। এতে তাহেরা সায় না দিলে বহিপীর তাকে পুলিশের ভয় দেখান। এতেও কাজ না হলে বহিপীর কিস্তিমাত করার চাল আঁটেন। হাতেম আলির জমিদারি রক্ষায় টাকা ধার দেওয়ার শর্তে তিনি তাহেরাকে ফিরে পেতে চান। আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে তাহেরা বহিপীরের শর্তে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু হাতেম আলি এমন শর্তে টাকা ধার নিতে চান না। তাই তাহেরা জমিদারপুত্র হাশেম আলির হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। পরাজিত হয়েও বহিপীর তার বুদ্ধিমত্তা থেকে সরে আসেননি। তিনি তাহেরা-হাশেমের চলে যাওয়ায় কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন না। কেননা কূটবুদ্ধিসম্পন্ন পিরের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এ বিষয়টি নিয়ে যত বাড়াবাড়ি হবে ততই তার মানসম্মান নিয়ে টানাটানি হবে, তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিত বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকের বহিপীর চরিত্রটি স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তাই তাকে ধূর্ত ও বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

উত্তরঃ

বছরের নির্ধারিত দিন সূর্য ডোবার আগে খাজনা পরিশোধ সংক্রান্ত আইনই 'সূর্যাস্ত আইন' নামে পরিচিত।

ব্রিটিশ ভারতের পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালে 'সূর্যাস্ত আইন' পাশ হয়। ওই আইন সান্ধ্য আইন নামেও পরিচিত। ইংরেজ সরকার খাজনা আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ফল সূর্যাস্ত আইন। ওই আইনের ফলে নির্দিষ্ট জমির মালিকরা তাদের নামে অর্পিত জমির ওপর বছরের নির্ধারিত দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে ওই জমি খাস বলে বিবেচিত হতো। পরবর্তী সময়ে নিলামের মাধ্যমে সামর্থ্যরা ওই জমির খাজনা পরিশোধের মাধ্যমে জমি ভোগদখলের কর্তৃত্ব লাভ করত। হাতেম আলি বহিপীর নাটকের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। খাজনা বাকি পড়ায় তার জমিদারি সূর্যাস্ত আইনে নিলাম উঠতে বসেছে। একমাত্র বন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে তিনি অর্থসাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হন। তাই বলা যায়, হাতেম আলি খাজনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সূর্যাস্ত আইনের বলি হতে চলেছেন।

উত্তরঃ

"অশিক্ষিত মানুষের কুসংস্কার ও ধর্মভীতি বহিপীরের ধর্মব্যাবসার পুঁজি।" আলোচ্য মন্তব্যটি যুক্তিযুক্ত।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। 'বহিপীর' নামকরণের মধ্যেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলাদেশের অশিক্ষিত জনসাধারণের মনে জেঁকে বসা পিরপ্রথার বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করেছেন। বাংলা অঞ্চলে পিরপ্রথার উদ্ভব ঘটে ইসলামের সুফিবাদী ব্যাখ্যার সূত্র ধরে। জনসাধারণকে ইসলামের একত্ববাদের স্বরূপ বোঝাতে তৎকালে পির-মুরিদ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে সাধারণ অশিক্ষিত মানুষকে পুঁজি করে পির সম্প্রদায় ধর্মব্যাবসা শুরু করে। 'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীরের মাঝে পিরপ্রথা নামে ধর্মব্যাবসার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়।
বহিপীর নাটকের বহিপীর অত্যন্ত ধূর্ত ও কূটকৌশলী ব্যক্তি। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। ওয়াজ-নসিহত করার সুবিধার্থে পিরসাহেব বইয়ের ভাষা রপ্ত করেছেন। তাই তাকে 'বহিপীর' বলা হয়। বহিপীর কোনো অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার মুরিদান রয়েছে। বছর দুবছরান্তর বহিপীর তার মুরিদদের বাড়িতে যান। মুরিদরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে বহিপীরের সেবা করে। কেউ হালের বলদ বিক্রি করে, কেউ হাঁস-মুরগি জবাই করে পিরকে খাওয়ায়।

বহিপীরের প্রথম স্ত্রী চৌদ্দ বছর আগে মারা গেছেন। অশিক্ষিত মূর্খ মুরিদ বহিপীরের সেবার উদ্দেশ্যে তার কিশোরী কন্যা তাহেরাকে বহিপীরের সঙ্গে বিয়ে দেয়। বহিপীরের মতো বৃদ্ধ কিশোরী মেয়ের সঙ্গে বিয়েতে সম্মত হওয়াই প্রমাণ করে সেই বহিপীর ভন্ড। বিয়ের রাতে তাহেরা পালিয়ে গেলে বহিপীর তাকে খুঁজতে বের হন। জমিদারপত্নী খোদেজা বহিপীরের অধ্যাত্ম শক্তিকে ভয় পান। তিনি মনে করেন বহিপীরের বদদোয়ায় তার পরিবারের অমঙ্গল হতে পারে। খোদেজার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতা তাহেরাকে বহিপীরের সঙ্গে যেতে মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে। বহিপীর চাইলে তার শহরের মুরিদের অর্থ দিয়ে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষা করাও সম্ভব।

বহিপীরের জীবন-যাপন ও অর্থনীতি তার পিরপ্রথার ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের ধর্মভীতি ও কুসংস্কার এই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মুরিদরা তাদের যথাসর্বস্ব পিরের সেবায় দান করে। তাহেরার সৎমা ও বাবা মিলে তাদের কিশোরী কন্যাকেও পিরের হাতে তুলে দিতে কসুর করে না। জমিদারপত্নী খোদেজা পিরের বদদোয়াকে খুব ভয় পান। শহরের ধনী মুরিদরা পিরের কথায় হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার টাকা দেবেন বলেও পিরসাহেব আত্মবিশ্বাসী। তাই বলা যায় যে, অশিক্ষিত মানুষের কুসংস্কার ও ধর্মভীতিই হলো বহিপীরের ধর্মব্যাবসার পুঁজি।

উত্তরঃ

বঝড়ের কারণে নাকানিচুবানি খেয়ে বহিপীর জমিদারের রজরায় আসেন।

বহিপীরের বাড়ি সুনামগঞ্জে। এখানকার এক পেয়ারের মুরিদ বহিপীরের সঙ্গে তার নিজ কন্যা তাহেরার বিয়ে দেয়। বংশ খানদানি বলে বহিপীর বিয়েতে অমত দেননি। মুরিদের সেই কিশোরী কন্যা অসম বয়সের বিয়ে না মেনে পালিয়ে যায়। বহিপীর তার সহকারী হকিকুল্লাহকে নিয়ে তাহেরাকে খুঁজতে বের হন। ডেমরা ঘাট থেকে বহিপীর ডিঙি নৌকা নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে প্রচন্ড ঝড় ওঠে। ঝড়ের প্রকোপ থেকে বাঁচতে বহিপীরের নৌকা একটি ছোট খালের মধ্যে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়। তখন জমিদার হাতেম আলির বজরার সঙ্গে বহিপীরের নৌকার ধাক্কা লাগে। ঝড়ের প্রকোপ ও বৃহৎ বজরার ধাক্কায় গতি সামলাতে না পেরে বহিপীরের নৌকা ডুবতে শুরু করে। আধ-ডোবা অবস্থায় বহিপীরকে হাতেম আলির বজরায় টেনে তোলা হয়। মরতে মরতে বেঁচে যান বহিপীর। এভাবে বহিপীর জমিদারের বজরায় আসেন।

উত্তরঃ

"তাহেরাকে কেন্দ্র করেই 'বহিপীর' নাটকের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।" মন্তব্যটি সঙ্গে আমি একমত।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তাহেরা। এক অর্থে তাকেই এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলা যায়। তাহেরা মা-মরা মেয়ে। সৎমায়ের সংসারে সে বড় হয়েছে। তার বাবা ও সৎমা মিলে বৃদ্ধ বহিপীরের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়েছে। এ অসম বয়সের বিয়ে মেনে না নিয়ে তাহেরা ঘর ছেড়ে তাহেরা পালিয়েছে। সমকালীন সমাজবাস্তবতা বিচারে এটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। বহিপীর তার পালানোর খবর পেয়ে সহকারী হকিকুল্লাহকে নিয়ে তাকে খুঁজতে বের হয়েছেন।

জমিদার হাতেম আলির পত্নী অসহায় তাহেরাকে দেখে তাদের বজরায় তাকে আশ্রয় দেন। ঘটনাক্রমে বহিপীরও ঝড়ের কবল থেকে কোনোমতে বেঁচে হাতেম আলির বজরায় অবস্থান নেন। ধীরে ধীরে তিনি জানতে পারেন তাহেরা এই বজরাতেই অবস্থান করছে। ফলে বহিপীরের দুরূহ কাজটি অনেকাংশে সহজ হয়ে ওঠে।

হাতেম আলির শিক্ষিত, আধুনিক ও যুক্তিবাদী ছেলে তাহেরার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। সে মনে করে তাহেরার অমতে পঞ্চাশোর্ধ্ব পিরের সঙ্গে তাহেরার এ বিয়ে যুক্তিসংগত নয়। সে তাহেরাকে এ বিপদ থেকে বাঁচাতে চায়। এমনকি বিয়ে করে হলেও সে তাকে উদ্ধার করার শপথ করে। এক্ষেত্রে মাতার সাধারণ বাণী, পিতার জমিদারি হারানোর আশঙ্কা, পিরের পুলিশের ভয় দেখানো কোনোকিছুই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি। ফলে তাহেরাকে কেন্দ্র করেই বহিপীর ও হাশেম আলির মধ্যে দ্বন্দ্ব ঘনীভূত হয়।

শুরু থেকেই তাহেরা তার সিদ্ধান্তে ছিল অনমনীয়। সে স্বাধীনচেতা, আধুনিক নারীজাগরণের প্রতীক। পুলিশের ভয়, বৃদ্ধের প্রতি সহানুভূতি কোনোকিছুই তাকে অবদমন করতে পারেনি। প্রয়োজনে সে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত তবু সে বহিপীরের সঙ্গে যাবে না।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের শুরুতে নাট্যকার নদীর তীরবর্তী বন্দর এলাকার হেমন্তকালের বর্ণনা দিয়েছেন, যে নদীর পাড়ে ভেড়ানো ছিল একটি জমিদারি বজরা।

নাটক লেখা হলেও এটি মূলত 'দৃশ্যকাব্য। মঞ্চায়নের মধ্যেই রয়েছে নাটক রচনার সার্থকতা। তাই মঞ্চের পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার জন্য নাট্যকার নাটকের শুরুতে মঞ্চ ও পার্শ্ববর্তী পরিবেশের বর্ণনা উল্লেখ করেন। 'বহিপীর' নাটকেও এই ধারার ব্যত্যয় ঘটেনি। নাট্যকার অত্যন্ত সংক্ষেপে পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন। 'বহিপীর' নাটকের শুরু হেমন্তকালের কোনো একটি দিনের সকাল নয়টায়। নাটকের মঞ্চ বজরায় হওয়ায় চারপাশে নদী, নদীতে নৌকা, জাহাজের সিটির শব্দ। পার্শ্ববর্তী তীরে ফেরিওয়ালার হাঁকাহাঁকি, ভাটিয়ালি গানের ক্ষীণ রেশ। মঞ্চটি দুই কামরাওয়ালা একটি জমিদারি রংদার বজরা। বজরার সামনে পাটাতনে বসে একটি চাকর মসলা পেষে; একটু দূরে পিরের সহকারী হকিকুল্লাহ হুঁকা টানে, ছাদে শুকায় বহিপীরের লেবাস। বড় কামরায় জমিদার হাতেম আলি ও বহিপীর। ছোট কামরায় অবস্থান করছে জমিদারপুত্র হাশেম আলি, জমিদারপত্নী খোদেজা ও তাহেরা। এভাবে লেখক শুরুর পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন।

উত্তরঃ

"তাহেরা একই সঙ্গে অনমনীয় ও মানবিক চরিত্র।"- মন্তব্যটি সত্য।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র তাহেরা। তাকে কেন্দ্র করেই নাটকের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। মা-মরা মেয়ে সে, সৎমায়ের সংসারেই সে বড় হয়েছে। বাবা ও সৎমা মিলে তাদের বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে তাহেরার অমতে তাকে বিয়ে দেয়। তাহেরা এই ভাসম বয়সের বিয়ে মেনে নেয়নি। বিয়ের রাতে সে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। সমকালীন সমাজব্যবস্থা বিচারে তাহেরার এই কাজ দুঃসাহসিকতার পরিচায়ক। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনিশ্চিয়তার পথে পা বাড়ানো একজন নারীর ক্ষেত্রে সহজ ব্যাপার নয়। তাহেরা সজ্ঞানে এই অনিশ্চয়তাকে বেছে নিয়েছে।

বাড়ি ছেড়ে তাহেরা আশ্রয় পেয়েছে জমিদার হাতেম আলির বজরায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়েনি। ঘটনাচক্রে বহিপীরও এসে উঠেছেন সেখানে। কিন্তু তাহেরা তার সিদ্ধান্তে অনমনীয়। প্রয়োজনে সে আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত, তবু বহিপীরের সঙ্গে সে ফিরে যাবে না। বহিপীরের শরিয়ত মোতাবেক বিয়ের দোহাই, পুলিশের ভয় কিংবা বৃদ্ধ বয়সের দিকে তাকানোর সহানুভূতির বাণী কোনোকিছুই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি।

তাহেরা চরিত্রের অনমনীয় মানসিকতার পাশাপাশি প্রকাশ পেয়েছে তার কৃতজ্ঞতাবোধ। অসহায় তাহেরাকে জমিদার পরিবার ডেমরা ঘাট থেকে সহানুভূতির বশে তুলে আনে। বজরায় তুলে তাহেরার সর দায়িত্ব নেয় এই পরিবার। তাই বহিপীর জমিদার হাতেম আলিকে করুণ অবস্থায় দেখে তাহেরাকে বহিপীরের সঙ্গে যাওয়ার শর্তে জমিদারকে টাকা ধার দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। জমিদার হাতেম আলি এ শর্তের যৌক্তিকতা দেখতে পান না। মানবিক তাহেরা তার আশ্রয়দাতাকে টাকা দেওয়ার শর্তে বহিপীরের সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হয়। কৃতজ্ঞতাবোধ তাহেরা চরিত্রটিকে মানবিকতা দান করেছে। উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, তাহেরা চরিত্রটি দুঃসাহসের দৃষ্টান্ত। বহিপীরের সঙ্গে অসম বয়সের বিয়ে না মেনে সে 'বাড়ি ত্যাগ করে। প্রয়োজনে আত্মহত্যা করবে তবু সে বহিপীরের সঙ্গে ফিরবে না। শরিয়তি বিয়ের প্রসঙ্গ, পুলিশের ভয় কিংবা সহানুভূতির প্রশ্ন কোনোকিছুই তার সিদ্ধান্ত থেকে তাকে সরাতে পারেনি। কিন্ত আশ্রয়দাতা হাতেম আলির বিপদে সে মানবিক হয়েছে। টাকা ধার দেওয়ার শর্তে বহিপীরের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে। তাই বলা যায় যে, তাহেরা চরিত্র একই সঙ্গে অনমনীয় ও মানবিক।

উত্তরঃ

"বিয়ে হলো তকদিরের কথা।" খোদেজার এই উক্তিতে তার ধর্মীয় সংস্কার প্রকাশ পেয়েছে। 'বহিপীর' নাটকের খোদেজা চরিত্রটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু।

সরল গ্রামীণ মায়ের বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে ফুটে উঠেছে। সমকালীন সমাজব্যবস্থার বিপরীতে চিন্তা তিনি মেনে নিতে পারেন না। বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে তাহেরার বিয়েকে তিনি তকদিরের কথা বলেছেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ বয়স্ক লোকের সঙ্গে কিশোরী মেয়ের বিয়ে ধর্মগ্রন্থ দ্বারাও স্বীকৃত নয়। তাই প্রকৃত ধর্ম শিক্ষাও তার চরিত্রে প্রকাশ পায়নি। তার মন্তব্যে যেটি ফুটে উঠেছে তাকে ধর্মীয় কুসংস্কার বলাই শ্রেয়। পিরের সঙ্গে বিয়েকে তিনি সৌভাগ্য মনে করেন। বহিপীরের বদদোয়াকে তিনি ভয় পান। এমনকি নিজ পুত্র ও বহিপীরের মুখোমুখি অবস্থানে তিনি পিরের অধ্যাত্ম শক্তির ভয়ে পিরের পক্ষ নেন। খোদেজা চরিত্র আগাগোড়া ধর্মভীতিতে আক্রান্ত। সেই ধর্মীয় সংস্কার থেকেই খোদেজা বিয়েকে তকদিরের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন।

উত্তরঃ

"ব্যক্তিগত স্বার্থের হিসাবে বহিপীর জীবন ও জগৎকে গণনা করে।"- মন্ত্যটির যথার্থ।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। ইসলামি শরিয়তের ভাবধারার আদের্শ প্রচারিত পিরপ্রথার সঙ্গে তার পিরত্বের যথেষ্ট বিচ্যুতি রয়েছে। শরিয়তের ব্যাখ্যার স্বার্থে পির সম্প্রদায়ের সূচনা। কিন্তু বহিপীর বিষয়টিকে অর্থনৈতিক করে ফেলেছেন। তাই এক অর্থে 'বহিপীর' নাটকে উল্লিখিত বহিপীরের পিরত্বকে ধর্মব্যাবসা বলা যেতে পারে। বহিপীর বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মুরিদদের বাড়ি বাড়ি বছর দুবছরান্তে গমন করেন। তার মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে পিরের সেবা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ছাগল-মুরগিসহ গৃহপালিত পশু-পাখি দিয়ে পিরের সেবাযত্ন করে তারা।

'বহিপীর' নাটকে উল্লিখিত বহিপীর কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। অর্থাৎ পির-মুরিদি থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়েই তার ভরণপোষণ করতে হয়। অশিক্ষিত মানুষের ধর্মভীতিকে পুঁজি করেই তার এ ব্যাবসা চালিত।

বহিপীর সবকিছুর উর্ধ্বে রেখেছে তার ব্যক্তিস্বার্থকে। তার পেয়ারের মুরিদ তার কাছে নিজ কন্যাকে তুলে দিতে চাইলে তিনি তাতে সম্মত হয়েছেন। বিয়ের রাতে তাহেরা পালিয়ে গেলে বহিপীর তাহেরার বাবাকে আইনি সহায়তা নিতে নিষেধ করেছেন। কেননা এই অসম বিয়ে আইন স্বীকৃত নয়। ফলে হিতে-বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। জমিদারের বজরায় বসেও তিনি তাহেরাকে পুলিশের ভয় দেখান, কিন্তু পুলিশে যাওয়ার চিন্তাও মাথায় আনেন না। তাহেরাকে ফিরে পেতে তিনি জমিদার হাতেম আলিকে জমিদারি রক্ষার অর্থ প্রদানের কথা বলেন। অর্থাৎ জমিদারের অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণ করেন এবং এক্ষেত্রে তাহেরার কৃতজ্ঞতাবোধকে কাজে লাগান। শেষ পর্যন্ত তাহেরা হাশেমের সঙ্গে পালিয়ে গেলে বহিপীর বিষয়টি নিয়ে আর সামনে অগ্রসর - হন না। কেননা তিনি বুঝতে পারেন এ বিষয় নিয়ে যত ঘাঁটাঘাঁটি করা হবে, ততই তার মান-সম্মানের ওপরে চাপ বাড়তে থাকবে। পির হিসেবে তার সামাজিক মর্যাদার হানি ঘটবে যার প্রভাব পড়বে তার ধর্মব্যাবসার ওপর।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বহিপীরের পির-মুরিদি থেকে শুরু করে তাহেরাকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রত্যেকটি পদক্ষেপে বহিপীর তার ব্যক্তিগত স্বার্থকে সবার উপরে রেখেছেন। তাই বলা যায় যে, বহিপীর ব্যক্তিগত স্বার্থের হিসাবে জীবন ও জগৎকে গণনা করেন।

উত্তরঃ

খোদেজার পরস্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্যের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে তাহেরা এ কথা বলেছে।

'বহিপীর' নাটকের খোদেজা একই সঙ্গে দরদি ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন চরিত্র। সমাজ সম্পর্ক বহির্ভূত কোনো কাজকে তিনি প্রশ্রয় দেন না। অসহায় তাহেরাকে ডেমরার ঘাট থেকে বজরায় তুলে নিয়ে মনুষ্যত্বের পরিচয় দেন। তাকে নিজের মেয়ের মতোই আদর করেন। তাহেরা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হলে হাশেম আলিকে দিয়ে তিনি তাহেরাকে বাঁচান। বহিপীরের সঙ্গে অসম বয়সের বিয়ে যথোপযুক্ত কাজ হয়নি মনে করলেও তিনি তাহেরার পরিবার ছেড়ে পালানোকে ভুল সিদ্ধান্ত বলেছেন। বহিপীরের সঙ্গে বিয়েকে ভাগ্যের লেখা বলে মেনে নেওয়ার পক্ষপাতী তিনি। বহিপীর যখন তাহেরাকে নিতে এসেছেন তখন তার যাওয়া উচিত বলেও তাহেরাকে তিনি বোঝান, এক দিকে তিনি তাহেরাকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচান, আবার অন্যদিকে তার সিদ্ধান্তের বাইরে বহিপীরের সঙ্গে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাহেরা আলোচ্য কথাটি বলেছে।

উত্তরঃ

" 'বহিপীর' নাটকে হাশেম আলিকে অস্থিরচিত্ত বলে বর্ণনা করা হলেও, সে তার অবস্থানে ছিল স্থির।" 'বহিপীর' নাটকের পট বিবেচনায় আলোচ্য মন্তব্যটি যুক্তিপূর্ণ।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র হাশেম আলি। সে কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীরের বিপরীত চরিত্র অর্থাৎ বহিপীর চরিত্রের ধর্মব্যাবসা, কূট চক্রান্ত, বৈষয়িক বুদ্ধির বিপরীতে হাশেম আলি যুক্তিবাদী, আধুনিক ও মানবিক চরিত্র। এক অর্থে বহিপীরকে খলনায়ক হিসেবে ধরে নিলে হাশেম আলি নায়ক চরিত্রের মহিমায় উত্তীর্ণ হবে। হাশেম আলি শিক্ষিত তরুণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। বিশ শতকের সূচনায় বাংলা অঞ্চলে যে আধুনিক চিন্তাচেতনার প্রসার ঘটেছিল, 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি সেই আধুনিকতাবাদের প্রতীক চরিত্র।

হাশেম আলি জমিদারপুত্র। তবে প্রচলিত জমিদারপুত্রদের কোনো নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে ফুটে ওঠেনি। সে উচ্চশিক্ষিত, নাটকে তাকে বিএ পাশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পৈতৃক জমিদারির প্রতি তার কোনো প্রকার আগ্রহ নেই। সে আধুনিক চিন্তাধারায় শিক্ষিত তরুণ। ছাপাখানার ব্যাবসা করে সে নিজের ও অন্য যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়।

'বহিপীর' নাটকে হাশেম আলিকে অস্থিরচিত্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে যুক্তিবাদী ও আগাগোড়া আধুনিক মানুষ। বজরায় অচেনা অপরিচিত, অসহায় মেয়ে, তাহেরা আশ্রয় নেয়। হাশেম আলি তার বিপদগ্রস্ত অবস্থার কথা শুনে সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সঙ্গে কিশোরী তাহেরার বিয়েকে সে অনৈতিক, বে-আইনি মনে করেছে। অসহায় তাহেরাকে এ অবস্থা থেকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেয় হাশেম আলি। বজরার সবাই এমনকি তাহেরাও টাকা ধার দেওয়ার শর্তে বহিপীরের সঙ্গে যেতে রাজি হলেও একমাত্র হাশেম আলি সব সময় এর বিপক্ষে থেকেছে। বহিপীরের সব কূটচক্রান্তকে হাশেম অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। বহিপীরের দেখানো পুলিশের ভয়, মায়ের নিষেধ, বাবার অসহায় মুখ কোনো কিছুই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাহেরাকে সঙ্গে নিয়েই সে অনিশ্চিত অজানার পথে পা বাড়িয়েছে।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, হাশেম আলি যুক্তিবাদী, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ। সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মভীতির বিরুদ্ধে সে সর্বদা সোচ্চার। এক্ষেত্রে সে নিজের সিদ্ধান্তে সব সময় অটুট থেকেছে। তাই বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকে হাশেম আলিকে অস্থিরচিত্ত বলে বর্ণনা করা হলেও সে তার অবস্থানে ছিল স্থির।

উত্তরঃ

মানবিক কারণে খোদেজা তাহেরাকে বজরায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ তাহেরা চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মা-ম্রা মেয়ে সে। সৎমায়ের সংসারে মানুষ। সৎমা ও বাবা পিরের অনুগ্রহ পেতে বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে কিশোরী কন্যা তাহেরার বিয়ে দেয়। অসম বয়সের এই বিয়ে মেনে নেয়নি তাহেরা। বিয়ের রাতে সে ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসে। ডেমরা ঘাটে অসহায় কিশোরী মেয়েকে বদলোকেরা কুনজরে দেখতে থাকে। নানাজন নানা মন্তব্য শুরু করে দেয়। এদিকে জমিদার হাতেম আলি সপরিবারে বজরায় করে ডেমরা ঘাটে অবস্থান করছেন। জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী অসহায় তাহেরাকে দেখতে পান। তাহেরাকে দেখে তার মায়া হয়। এ কারণে খোদেজা তাহেরাকে চাকর দ্বারা বজরায় ডেকে এনে আশ্রয় দেন। সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একটি মেয়েকে নিতান্তই মানবিকতার কারণে খোদেজা তাদের বজরায় আশ্রয় দেন। কেননা রাত গড়ালে অসহায় তাহেরার বিপদ হতে পারে তা খোদেজা বুঝতে পারেন।

উত্তরঃ

"হাশেম আলি কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীরের বিপরীত মেরুর চরিত্র।"- 'বহিপীর' নাটকের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আলোচ্য মন্তব্যটি সত্য।

'বহিপীর' নাটকের বহিপীর ও জমিদারপুত্র হাশেম আলি দুটি প্রধান চরিত্র। বহিপীর বৈষয়িক বুদ্ধিশাসিত, অত্যন্ত ধূর্ত চরিত্র। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। বছর দুবছরে তিনি মুরিদদের বাড়িতে বাড়িতে যান। মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে তার সেবা করতেও কার্পণ্য করে না। বহিপীর কোনো অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। মুরিদদের দেওয়া অর্থের ওপর নির্ভর করেই তার জীবিকা চলমান। এমনকি তার ধনী মুরিদরা তাকে জমিদারি রক্ষার অর্থ দেবে বলেও তিনি আত্মবিশ্বাসী। অর্থাৎ বহিপীরের অর্থনৈতিক উৎস মূলত অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের ধর্মভীতিকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন। তিনি মুরিদের কন্যা কিশোরী তাহেরার সঙ্গে অসম বিয়েতে নিঃসংকোচে মত দিয়েছেন। তাহেরাকে খুঁজে পেতে পুলিশের আশ্রয় নেননি। কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আইন দ্বারা এ বিয়ে স্বীকৃত নয়। তাহেরাকে উদ্ধার করার জন্য তিনি নানা কূটচক্রান্তের আশ্রয় নিয়েছেন। পুলিশের ভয়, ধর্মীয় বিয়ের দোহাই এবং শেষ পর্যন্ত অসহায় জমিদারকে টাকা ধার দেওয়ার শর্তে তাহেরাকে পেতে চান। সার্বিক বিচারে বহিপীরকে এই নাটকে হীন চরিত্রের ব্যক্তি বলা সমীচীন।

'বহিপীর' নাটকের আরেক প্রধান চরিত্র হাশেম আলি। সে শিক্ষিত, তরুণ, যুক্তিবাদী ও মানবিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জমিদারপুত্র হয়েও কোনো বৈষয়িক চিন্তা তার ব্যক্তিত্বকে ম্লান করতে পারেনি।
নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাহেরাকে উদ্ধার করার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সে ছিল অনড়। পিরের পুলিশের ভয় দেখানো, মায়ের নিষেধ, অসহায় বাবার মুখ- কোনোকিছুই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরাতে পারে না। বজরার সবাই এমনকি তাহেরাও জমিদারি রক্ষার টাকা দেওয়ার শর্তে বহিপীরের সঙ্গে যেতে একমত হলে, একমাত্র হাশেমই এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে। বহিপীরের সব চক্রান্তকে সূক্ষ্মতার সঙ্গে মোকাবিলা করে হাশেম। সব শেষে তাহেরাকে বাঁচাতে সে তাকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সার্বিক বিবেচনায় বহিপীরের বিপরীত বৈশিষ্ট্যের কারণে হাশেমকে 'বহিপীর' নাটকের নায়ক বলা যায়।

উপর্যুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে, হাশেম চরিত্রটি বহিপীরের বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ধারক। বহিপীর হাশেম মুখোমুখি দ্বন্দ্বে হাশেম জয়ী। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি সত্য।

উত্তরঃ

পালিয়ে এসেও বহিপীরের হাত থেকে রক্ষা না পাওয়ায় তাহেরা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চায়। 'বহিপীর' নাটকে কিশোরী তাহেরার সঙ্গে পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের বিয়ে দেয় তাহেরার বাবা ও সৎমা। তাহেরা মা-মরা 'মেয়ে।

সৎমায়ের সংসারেই সে মানুষ। তার বাবা-মা বৃদ্ধ বহিপীরের মুরিদ। সৎমায়ের পরামর্শে পিরের খেদমতে কিশোরী মেয়েকে বহিপীরের সঙ্গে বিয়ে দেয় তার বাবা। এ অসম বয়সের বিয়েতে তাহেরার মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করেনি তারা। তাই বিয়ের রাতে তাহেরা ঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে জমিদার হাতেম আলির বজরায় আশ্রয় পায়। ধূর্ত বহিপীর পুলিশে খবর না দিয়ে নিজে তাকে খুঁজতে বের হন। ঘটনাচক্রে বহিপীর হাতেম আলির সেই বজরায় এসে উপস্থিত হন। তাহেরা বহিপীরের কথা শুনে বুঝতে পারে এই সেই পির, যার সঙ্গে তার বাবা ও সৎমা জোর করে তাকে বিয়ে দিয়েছে। তাহেরা হাশেম আলি ও জমিদারগিন্নি খোদেজাকে তার পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করে। খোদেজা পিরের কাছে মিথ্যা বলে তার বদদোয়া নিজেদের ঘাড়ে নিতে চান না। তাই পালিয়ে এসেও বহিপীরের হাত থেকে রক্ষা পাবে না ভেবে তাহেরা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চায়।

উত্তরঃ

"হাতেম আলি আত্মনিমগ্ন, স্থিতধী ও উচ্চ মানবিক চেতনাসম্পন্ন উজ্জ্বল চরিত্র।" 'বহিপীর' নাটকের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় উক্তিটি যথার্থ।

হাতেম আলি 'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র। তিনি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি। এককালে তাদের জমিদারির নামডাক ছিল। কিন্তু এখন তার হাতে এসে যা পৌঁছেছে তাকে নাট্যকার 'ঢাকের ঢোল' বলে অভিহিত করেছেন। তবু সমাজে সম্মান বজায় রেখে কোনো রকমে চলার জন্য তা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সান্ধ্য আইনে এখন তার জমিদারি নিলামে ওঠার উপক্রম। একদিন পরে খাজনা পরিশোধ করতে না পারলে তার জমিদারি নিলামে উঠবে। স্ত্রী খোদেজা ও পুত্র হাশেম আলি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় জমিদারি নিলামের কথা তিনি তাদের কাছে গোপন রাখেন। অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার জন্য শহরে আসার কথা বললে তারাও তার সঙ্গে শহরে আসার বায়না ধরে। তাই তিনি জমিদারি বজরায় করে শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

হাতেম আলি শহরে আসার মূল কারণ জমিদারি রক্ষার টাকার বন্দোবস্ত করা। শহরে তার বন্ধু আনোয়ারউদ্দিন থাকে। সম্পদশালী বন্ধুর কাছে টাকা ধার পাওয়ার আশায় জমিদার শহরে আসেন। কিন্তু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে টাকা না পেয়ে তিনি আত্মনিমগ্ন হয়ে পড়েন। আত্মিক শান্তির জন্য জমিদার বহিপীরের কাছে সবকিছু খুলে বলেন। বহিপীর তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাহেরাকে ফিরে পাওয়ার শর্তে তাকে টাকা ধার দিতে চান। প্রথমে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত এই শর্তকে তার কাছে অমানবিক মনে হয়। তাই তিনি বহিপীরের টাকা নিতে চান না।

'বহিপীর' নাটকে হাতেম আলি শুরু থেকেই এত বড় বিপর্যয়কে স্থিত বুদ্ধি দিয়ে চেপে রেখেছেন একান্ত নিজের কাছে। কারও সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলে নিজের ভেতরে থেকেছেন আত্মনিমগ্ন। আনোয়ারউদ্দিনের শেষ ভরসা হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারালেও বহিপীরের অমানবিক শর্তকে অগ্রাহ্য করেছেন। তাই উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, হাতেম আলি আত্মনিমগ্ন, স্থিতধী ও উচ্চ মানবিক চেতনাসম্পন্ন উজ্জ্বল চরিত্র। জমিদারি হারানোর ভয় তাকে মানসিক পীড়া দিলেও বহিপীরের অমানবিক শর্তের কাছে নিজের মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দেননি। তাই আলোচ্য উক্তিটি যথার্থ বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়।

উত্তরঃ

জমিদার হাতেম আলি সপরিবারে বজরায় করে শহরে এসেছিলেন। অন্যদিকে বহিপীর বিয়ের প্রথম রাতে পালিয়ে যাওয়া সদ্য বিবাহিত স্ত্রী তাহেরাকে খোঁজার জন্য নৌকা নিয়ে বের হন। ডেমরা ঘাটের কাছে হঠাৎ ঝড় শুরু হলে বজরা ও নৌকা একই সঙ্গে খালের ভেতর ঢুকতে চেষ্টা করে। খালের সরু পথে ঢুকতে গিয়ে বজরা ও নৌকার মধ্যে সংঘর্ষ হয়। অন্ধকারের মধ্যে এবং হাওয়ার ধাক্কায় নৌকার মাঝিরা ঠিকমতো সামাল দিতে পারেনি। ধাক্কা খেয়ে পির সাহেবের নৌকা মিনিটের মধ্যেই আধা-ডোবা হয়ে যায়। পির সাহেব ও তার সঙ্গী হকিকুল্লাহ্ নাকানি-চুবানি খেয়ে অবশেষে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেন। তবে বজরা ও নৌকার সংঘর্ষে নৌকা প্রায় ডুবে গেলেও বজরার কিছুই হয়নি। সুতরাং দেখা যায়, ঝড়ের সময় একই সঙ্গে খালের ভেতর ঢুকতে গিয়ে নৌকার সঙ্গে বজরার ধাক্কা লাগে।

উত্তরঃ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচিত 'বহিপীর' নাটকের কাহিনি গড়ে উঠেছে এক পিরকে কেন্দ্র করে, যার নাম বহিপীর। মাত্র দুটি অঙ্কে সমাপ্ত এই নাটকের মঞ্চ হিসেবে রয়েছে মূলত বজরার দুটি কামরা। তবে নাট্যকার নাটক আরম্ভের পূর্বে মঞ্চের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে পাঠকের কাছে নাটকটি হয়ে উঠেছে অধিকতর আকর্ষণীয়।

'বহিপীর' নাটকের মঞ্চের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় নাট্যকার সময় ও কালের উল্লেখ করেছেন নির্দিষ্টভাবেই। তিনি শুরুই করেছেন এভাবে- 'হেমন্তের বেলা নয়টা'। তারপরে নাট্যকার চারপাশের পরিবেশ বর্ণনা করেছেন বাস্তবধর্মীভাবে। নাট্যকারের উপস্থাপন গুণে সবকিছুই হয়ে উঠেছে জীবন্ত। পানির শব্দ, দূরে জাহাজের সিটি ধ্বনি, তীরে ফেরিওয়ালার হাঁকাহাঁকি, ভাটিয়ালি গানের অতি ক্ষীণ রেশ প্রভৃতি সমবেত কোলাহলের মধ্যে নাটকের মঞ্চের পর্দা উঠিয়েছেন নাট্যকার। যেখানে রয়েছে মূলত দু-কামরাওয়ালা একটি রংদার বজরা, কোণে সামান্য উঁচু পাড়, বজরা থেকে সেই পাড়ে যাতায়াতের জন্য একটা সিঁড়ি। বর্ণনার মধ্য দিয়েই দৃশ্যটিকে পাঠকের কাছে জীবন্ত করে তুলেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্।

নাট্যকার বজরার দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন এভাবে- দর্শকের দিকে বজরাটি খোলা। পেছনের জানালাগুলোর অধিকাংশ তোলা, যার ভেতর দিয়ে অপর পাশের আভাসও কিছুটা দেখা যায়। বজরার সামনে পাটাতনে বসে একটি চাকর মসলা পেষে; একটু দূরে একজন মাঝি আপন মনে দড়ি পাকায়। তারই কাছাকাছি বসে হকিকুল্লাহ হুঁকা টানে। ছাদে শুকাতে দেওয়া আছে একটি রঙিন আলখাল্লা ও পায়জামা।

পরিশেষে তাই বলা যায়, নাট্যকার মাত্র দুটি অঙ্কে নাট্যকাহিনির বিন্যাস করতে গিয়ে বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অঙ্কের শুরুতেই একটি দীর্ঘ বর্ণনার মাধ্যমে একটা জীবন্ত বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করা। নাট্যকারের এই পরিচর্যারীতি নাটকটিকে কালজয়ী করে রেখেছে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে দেখা যায়, তাহেরার বাপ ও সৎমা হচ্ছে বহিপীরের মুরিদ। বছরে-দুইবছরে পিরসাহেব একবার এলেই তাহেরার বাবা ও সৎমা পিরের খাতির-খেদমত করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। তারা পিরসাহেবের খেদমত করার জন্য তাহেরার সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দেয়। কিন্তু তাহেরা তা মানে না। বিয়ের রাতেই সে নাবালক চাচাতো ভাইকে সঙ্গে করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে সপরিবারে শহরে আসা জমিদার হাতেম আলির বজরা এসে থামে ডেমরার ঘাটে। তার স্ত্রী খোদেজা বেগম লক্ষ করেন তীরে অনেক ভিড়। একটা ছেলে কাঁদছে। পাশে অল্পবয়সি একটি মেয়ে চুপচাপ বসে আছে। এই মেয়েটির নামই তাহেরা। বদ লোকের হাত থেকে রক্ষা করতে খোদেজা বেগম তাই তাহেরাকে বজরায় তুলে নেন। এভাবেই তাহেরা জমিদারের বজরায় আশ্রয় লাভ করে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের কাহিনি গড়ে উঠেছে এক পিরসাহেবকে কেন্দ্র করে, যিনি মূলত বহিপীর নামেই পরিচিত। এই বহিপীরের কাজ হচ্ছে সারা বছর বিভিন্ন জেলায় তার অনুসারীদের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো। বিভিন্ন এলাকার মধ্যে ভাষাগত পার্থক্য বিদ্যমান। এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলের মানুষ বোঝে না। তাই বইয়ের ভাষা তথা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন এই পির। 'বহিপীর' নাটকটি সময়কাল উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের সূচনালগ্ন। নাট্যকাহিনিতে দেখা যায় সূর্যাস্ত আইনের কারণে জমিদার হাতেম আলি জমিদারি হারাতে বসেছেন। সূর্যাস্ত আইন প্রাণীত হয় ১৭৯৩ সালে। সেই সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে জেঁকে বসে পিরপ্রথা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে পিরকে ধনী-গরিব সকলে অসম্ভব ভয় ও মান্য করত। গ্রামের সাধারণ মানুষ মূলত ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণেই পিরকে পেলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, পিরের সেবা করার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। ধনসম্পদ থেকে শুরু করে নিজের কন্যাকে পর্যন্ত পিরের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করে না। বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রচলিত এই পিরপ্রথার বিশ্বস্ত দলিল হয়ে উঠেছে 'বহিপীর' নাটক। এ নাটকেও দেখা যায়, তাহেরার বাবা ও সৎমা মূলত পিরভক্তির কারণেই বৃদ্ধ বহিপীরের সঙ্গে তাহেরার বিয়ে দেয়। এ বিয়েতে তাহেরার মত না থাকলেও তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। মুরিদের অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নেন পিররাও। তাই দেখা যায়, ধর্মব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী এই বহিপীর জমিদারের অসহায়ত্বের সুযোগও গ্রহণ করেন। 'বহিপীর' নাটকে যদিও পিরসাহেব শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারেননি, তবুও তৎকালীন সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে শিকড় গেড়ে বসা ধর্মীয় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিশ্বস্ত দলিল হয়ে উঠেছে 'বহিপীর' নাটকটি।

পরিশেষে তাই বলা যায়, তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রভাব 'বহিপীর' নাটকে বাস্তবধর্মী ও জীবন্ত হয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।

উত্তরঃ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'বহিপীর' নাটকের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং গ্রামীণ বাঙালি মুসলিম সমাজে পিরপ্রথার মাধ্যমে শোষণের চিত্রায়ণ। নাটকটিতে নাট্যকার গ্রামীণ প্রান্তিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রভাবকে তুলে ধরেছেন। নাটকের সময়কাল ছিল উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের সূচনালগ্ন। নাট্যকার মূলত সেই সময়ের একটি বাস্তব চিত্রকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন 'বহিপীর' নাটকে। নাটকের কাহিনির সমকালে রয়েছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষত মুসলমান সমাজের মধ্যে জেঁকে বসে পিরপ্রথা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস। সেই কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস প্রত্যাখ্যাত হয়ে আধুনিক মানবিকতার জয় ঘোষিত হয়েছে 'বহিপীর' নাটকে। নাট্যকার পুরোনো দুনিয়া থেকে নতুন দুনিয়ার মধ্যে উত্তরণকেই নাটকের প্রধান প্রতিপাদ্য করে তুলেছেন।

উত্তরঃ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর রচিত 'বহিপীর' নাটকটি রচনা করেছেন 'বহিপীর' নামে পরিচিত এক পিরকে কেন্দ্র করে। এ নাটকের কাহিনি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নাটকের স্থান ও অনেক চরিত্র অনগ্রসর সমাজ থেকে উঠে এসেছে। নাট্যকার সেই সমাজের কথা বলেছেন যেখানে জমিদারিপ্রথা ও পিরপ্রথা প্রচলিত রয়েছে, যা অনগ্রসর একটি সমাজকেই উপস্থাপিত করে। কিন্তু নাটকের বিষয়বস্তুতে দেখা যায়, জমিদারপুত্র হাশেম, তাহেরা, এমনকি জমিদার হাতেম আলি পর্যন্ত আধুনিক মননের পরিচয় দিয়েছে; আধুনিক জীবনে উত্তরণের প্রক্রিয়া ব্যক্ত করেছে' এবং আধুনিকতার জন্য চিরায়ত পুরোনো প্রথাকে ভেঙে নতুন দিনের জন্য সংগ্রাম করেছে।

'বহিপীর' নাটকের পটভূমি রচিত হয়েছে যে সময়ে তখন সামন্তবাদের সূর্য প্রায় অস্তমিত। শিক্ষার, আলোয় আলোকিত হয়ে অনগ্রসর সমাজের প্রান্তিক মানুষেরাও ধর্মীয় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। সেই ভেঙে পড়া অনগ্রসর সমাজকেই নাটকের পটভূমি করে তুলেছেন নাট্যকার। কিন্তু আধুনিক সমাজে উত্তরণের জন্য হাশেম ও তাহেরার মতো প্রতিবাদী চরিত্র সৃষ্টিতে দ্বিধা করেন না। অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় কুসংস্কারের পরোয়া না করে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়ায় বিদ্রোহ করেছে তাহেরা। জমিদারের বজরায় ওঠার পর জমিদারপুত্র হাশেম তাকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছে। একদিকে বহিপীরের জঘন্য কূটকৌশল অন্যদিকে হাশেম ও তাহেরার চরম প্রতিবাদ বজরার মধ্যে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। তাহেরা ও হাশেম সব বাধার জাল ছিন্ন করে নতুন ধারায় নবজীবনের সূচনা করে। আধুনিক তাহেরা ও হাশেমের মন ও মননের সাথে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে লিপ্ত বহিপীর শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য হন; সম্ভাবনাময় নতুন দিনের পরিবর্তনকে শুভ কামনা জানান তিনি।

উত্তরঃ

উনিশ শতকের শেষ দিকে বা বিশ শতকের সূচনালগ্নের সময়কালের পটভূমিতে রচিত হয়েছে বহিপীর' নাটক। সেই সময়ের গ্রামীণ প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গ্রামের দু-একজন ছাড়া সকলেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। যার ফলে গ্রামীণ সমাজে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস ছেঁকে বসে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত। অঞ্চলে জেঁকে বসা পিরপ্রথা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে নিয়ে। রচিত হয়েছে 'বহিপীর' নাটক। তবে অনগ্রসর গ্রামীণ সমাজের পটভূমিতে রচিত হলেও লেখক এ নাটকে আধুনিক জীবনে। উত্তরণের বার্তা দিয়েছেন। নাটকে দেখা যায়, বাঙালি মুসলমান। সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থা ভেঙে বেরিয়ে আসে নাটকের অন্যতম প্রধান দুটি চরিত্র হাশেম ও তাহেরা। পুরোনোকে ভেঙে নতুনের পথে বদলানোর এই সংতেককেই পাঠকের সামনে বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন লেখক যেখানে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের স্থানে জয় ঘোষিত হয়েছে মানবিকতার। এই বার্তার মাধ্যমেই 'বহিপীর' হয়ে উঠেছে মানবিক জাগরণের দৃশ্যকাব্য।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকটি গড়ে উঠেছে গ্রামীণ সমাজবাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। এখানে সেই সমাজের কথা তুলে ধরা হয়েছে যে সমাজের মানুষ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং ধর্মীয় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। তাদের এই অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মানুষ ব্যাবসা করতে থাকে। গ্রামীণ বাঙালি মুসলমান সমাজের এই বাস্তব চিত্রকে দেখতে পাওয়া যায় 'বহিপীর' নাটকে।

'বহিপীর' নাটকে প্রতিফলিত সমাজব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, নাটকটির সময়কাল উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের সূচনালগ্ন। যেখানে জমিদার হাতেম আলি ১৭৯৩ সালে প্রণীত হওয়া সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি হারাতে বসেছেন। আর তৎকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রচলিত পিরপ্রথার একটি বিশ্বস্ত দলিল হয়ে উঠেছে 'বহিপীর' নাটকটি।

'বহিপীর' নাটকের কাহিনি গড়ে উঠেছে এক পিরকে কেন্দ্র করে, যে পির 'বহিপীর' নামেই পরিচিত ও জনপ্রিয়। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পিরসাহেবকে ধনী-গরিব সবাই অসম্ভব মান্য ও ভয় করত। ধন-সম্পদ থেকে শুরু করে নিজের কন্যাকে পর্যন্ত দান করে দেয় পিরের কাছে। তাহেরার বাবা এবং সৎমা ছিল এই পিরের মুরিদ। পিরের খেদমত করার জন্য বৃদ্ধ পিরের সাথে তাহেরাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। 'বহিপীর' নাটকের পটভূমি যে সময়ের সেই সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে একটু একটু করে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। সেই পরিবর্তনের ধারাকেও নাট্যকার তুলে ধরেছেন নাটকে। পুরোনো সমাজব্যবস্থার প্রতিনিধি হিসেবে একদিকে যেমন, বহিপীর, খোদেজা বেগমের মতো চরিত্র সৃষ্টি করেছেন অন্যদিকে আধুনিক মানুষের মন ও মননের প্রতীক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন তাহেরা ও হাশেমের মতো চরিত্র। বহিপীর, হাতেম আলিরা পুরোনোকে আঁকড়ে থাকলেও নতুন জীবনের বাস্তব পরিস্থিতিকে মেনে নিয়েছেন। এভাবে দুই ধরনের চরিত্রের সমাবেশের মধ্য দিয়ে লেখক সমাজের একটা জীবন্ত ছবি উপস্থাপন করতে চেয়েছেন 'বহিপীর' নাটকে। এভাবেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তৎকালীন মানুষ, সময়, সমাজ ও পরিবেশকে উপস্থাপনের মাধ্যমে 'বহিপীর' নাটকে তৎকালীন সমাজবাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।

উত্তরঃ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচিত 'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছে 'বহিপীর'। এই বহিপীরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে নাটকের কাহিনি। এই পিরের কাজ হচ্ছে সারা বছর বিভিন্ন জেলায় তার মুরিদদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো। এক এক এলাকায় এক এক ধরনের ভাষা। এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলের মানুষ বোঝে না। ভাষার এই জটিলতা কাটাতে বহিপীর বিভিন্ন এলাকার ভাষা শিক্ষা না করে বইয়ের ভাষায় তথা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন। বহি বা বইয়ের ভাষায় কথা বলার কারণেই তার নাম হয়েছে বহিপীর। নাটকের এই কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম অনুসারেই নাট্যকার নাটকের নামকরণ করেছেন 'বহিপীর'। তবে নামটির একটি প্রতীকী তাৎপর্য আছে। নাটকে বহিপীর হচ্ছেন মানুষের কুসংস্কার ও ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যাবসা করা স্বার্থান্বেষী শ্রেণির প্রতিনিধি।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকটি রচিত হয়েছে এক পিরকে কেন্দ্র করে। বহিপীর নামে খ্যাত এই পির এক ঝড়ের রাতে আশ্রয় নেন জমিদার হাতেম আলির বজরায়। হাতেম আলির সঙ্গে কথোপকথনের সময় নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে পিরসাহেব বলেন, জীবনে তিনি যা চেয়েছিলেন তা পাননি, কেবল মুরিদান করেই জীবন কাটিয়েছেন। সারা বছর মুরিদদের বাড়িতে ঘুরে ঘুরেই তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন।

বজরায় জমিদারের সঙ্গে বহিপীরের অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়। বহিপীর জানান অতি নিকটেই কোথাও তাকে যেতে হবে। ঝড়ের কবলে পড়ে একটু দেরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এতে কিছুই যায় আসে না। জানে বেঁচে আছেন এটাই যথেষ্ট। তার কাছে মনে হয়েছে এই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া, তারপর জমিদারের বজরায় আশ্রয় পাওয়ার মধ্যে নিশ্চয় কোনো গুরুত্ব আছে যা তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে - নাকানি-চুবানি খাওয়ার পর বহিপীরের নিজেকে বড় শ্রান্ত মনে হয়েছে। কারণ হিসেবে বহিপীর নিজেই উল্লেখ করেছেন- 'কত আর ছুটাছুটি করতে পারি। বয়স তো হইয়াছে।' নিজের জীবনের ক্লান্তি অনুভব করে বহিপীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জীবনকে পর্যালোচনা করেছেন। তার কাছে মনে হয়েছে যা তিনি চেয়েছেন তা তিনি পাননি। কেবল বেশকিছু মুরিদ হয়েছে তার। মুরিদ হওয়ার জন্য লোকেরা তার কাছে দলে-দলে এসেছে, সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে। সেই মুরিদরাই তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। যার ফলে ইবাদত করার সময় বা ফুরসত তিনি পাননি। তাই বর্তমানে তার ভাবনা সবকিছু ছেড়ে তিনি খোদার ইবাদতে মনোযোগ দেবেন। জীবনভর মুরিদানে ব্যস্ত থাকার কারণে খোদার ইবাদত করার পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার ফলে হতাশা ব্যক্ত করছেন বহিপীর।

পরিশেষে বলা যায়, নিজের বিগত জীবনের সবকিছু পর্যালোচনা করার ফলে বহিপীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন- "যাহা চাহিয়াছিলাম তাহা পাই নাই, কেবল মুরিদান করিয়াই জীবন কাটাইয়াছি।"

উত্তরঃ

বহিপীর নাটকের অন্যতম একটি চরিত্র হাতেম আলি। তিনি একজন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। রেশমপুরে তার যৎকিঞ্চিৎ জমিদারি আছে। তবে একসময় এই জমিদারির নামডাক ও আয়ের পর্যাপ্ততা থাকলেও বর্তমানে তা নেই। তার জমিদারি ঢাকের ঢোলের মতো আওয়াজ হলেও ভেতর অন্তঃসারশূন্য, দেখতে বড় কিন্তু ভেতরে ফাঁকা। হাতেম আলির স্ত্রী খোদেজা বেগম এবং একমাত্র ছেলে হাশেম আলি। জমিদার হাতেম আলির খাজনা বাকি পড়ার কারণে সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি নিলামে উঠবে। জমিদারি রক্ষার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে শহরে গেলেও অর্থ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। নাটকে জমিদার হাতেম আলি চিয়ায়ত পুরোনো সমাজব্যবস্থার প্রতিনিধি হলেও নতুন দিনের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় তার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। তিনি বহিপীরের শর্তে টাকা নিতে রাজি হননি। এতে নাটকে হাতেম আলির উচ্চ নৈতিকতাবোধের পরিচয় ফুটে উঠেছে। বহিপীর' নাটকে হাতেম আলি স্থিতধী, আত্মনিমগ্ন, উচ্চ মানবিক চেতনাসম্পন্ন একটি উজ্জ্বল চরিত্র।

উত্তরঃ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচিত 'বহিপীর' নাটকটি রচিত হয়েছে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে। উনিশ শতকের শেষ দিকের সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে লক্ষ করা যায়, কুসংস্কার ও ধর্মীয় বইয়ের পাতা থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজে পিরপ্রথার সৃষ্টি হয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এই যুগসন্ধিক্ষণের পটভূমিতে রচনা করেছেন 'বহিপীর' নাটক। 'বহিপীর' নাটকের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে সমাজে জেঁকে বসা পিরপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নতুন জীবনের পথে পদার্পণ করা। এই বিষয়বস্তুকে তুলে ধরতে লেখক যে সময়কে প্রেক্ষাপট হিসেবে বেছে নিয়েছেন তা নাটকের মূল বিষয়বস্তুকে এতটাই প্রভাবিত করেছে যে নাটকটি হয়ে উঠেছে মানবিক জাগরণের দৃশ্যকাব্য।

'বহিপীর' নাটকে প্রতিফলিত সমাজচিত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নাটকের সময়কাল, উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের সূচনালগ্ন। ১৭৯৩ সালে প্রণীত হওয়া সূর্যাস্ত আইনের প্রভাব নাটকের অন্যতম চরিত্র হাতেম আলির ক্ষেত্রে দেখা যায়। মূলত সেই সময়ে ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদের সূর্য অস্তমিতপ্রায়। পুঁজিবাদীদের কবলে পড়ে সামন্তবাদীরা হারিয়ে যেতে বসেছে। সমাজে কুসংস্কারের বিষাক্ত ছায়া। তখন পর্যন্ত শিক্ষার আলো পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে না উঠলেও একজন দুজন করে মানুষ সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করে নিজের অধিকার সম্পর্কে। হাতেম আলি যেমন তার চিরায়ত জমিদারি টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন তেমনই বহিপীরও পিরপ্রথাকে টিকিয়ে রেখে তার প্রভাব বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু তাদের পুরোনো শোষণের প্রথাকে ভেঙে দিতে বিদ্রোহ করেছে তাহেরা ও হাশেমের মতো তরুণ ব্যক্তিবর্গ। মূলত বিশ শতকের সূচনালগ্নে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে সেই চিত্রই পরিলক্ষিত হয়।

পরিশেষে বলা যায়, 'বহিপীর' নাটকের সময়কাল ও পরিবেশ নাটকের মূল বিষয়বস্তুকে বাস্তব জীবনের প্রেক্ষাপটে বাস্তবধর্মী ও জীবন্ত করে তুলেছে, যা নাটকটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। সুতরাং দেখা যায়, মূল বিষয়বস্তুতে বাস্তব সময়কাল ও পরিবেশের প্রভাব নাটকটিকে প্রভাবিত করে তুলেছে।

উত্তরঃ

রেশমপুরের জমিদার হাতেম আলি। একসময় এই জমিদারির প্রচুর নামডাক থাকলেও বর্তমানে তা অন্তঃসারশূন্য। শহরে যাওয়ার কারণ হিসেবে হাতেম আলি পরিবারের কাছে শারীরিক অসুস্থতার কারণে শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা বলেন। তার স্ত্রী খোদেজা ও পুত্র হাশেম তাকে একা ছাড়েননি। তারা তার সঙ্গে এসেছেন। তবে হাতেম আলির শহরে আসার মূল কারণ ছিল জমিদারি রক্ষা করা। সূর্যাস্ত আইনের করাল গ্রাসে তিনি জমিদারি হারাতে বসেছেন। তাই কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে খাজনার টাকা জোগাড় করার জন্য তিনি শহরে এসেছেন। আশা ছিল বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে জমিদারি নিলামে চড়াটা বন্ধ করতে পারবেন। কিন্তু হাতেম আলিকে সেখানে নিরাশ হতে হয়। মূলত বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে জমিদারি রক্ষা করার জন্য হাতেম আলি শহরে গিয়েছিলেন।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকটি গড়ে উঠেছে বহিপীরের সর্বগ্রাসী স্বার্থ ও নতুন দিনের প্রতীক এক বালিকার বিদ্রোহের কাহিনিকে কেন্দ্র করে। নাটকের পটভূমি হিসেবে লেখক বেছে নিয়েছেন অনগ্রসর গ্রামীণ সমাজকে। কিন্তু কাহিনিতে তুলে ধরেছেন আধুনিক মন ও মননের প্রতিক্রিয়া। আপাতদৃষ্টিতে নাটকের কাহিনি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে বহিপীর ও তাহেরার দ্বন্দ্ব এবং এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনা নিয়েই নাটকটি গড়ে উঠেছে। তবে গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই দ্বন্দ্ব হচ্ছে সামন্তযুগীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে আধুনিক শিক্ষার। সাধারণ পাঠকের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত একটি সাধারণ কাহিনি হচ্ছে 'বহিপীর'। তবে লেখক তাঁর বিশ্লেষণী গুণ ও নিপুণ দক্ষতার মাধ্যমে এই সাধারণ কাহিনিকেই করে তুলেছেন অসাধারণ। সামন্তযুগের সন্ধিক্ষণে এসে আধুনিক শিক্ষার বিরুদ্ধে সামন্তযুগীয় সংস্কারের যে সংঘাত হয় সেটিই তুলে ধরেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। নাটকে দেখা যায়, হাতেম আলি ও বহিপীরের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের প্রতিপত্তিকে টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে তাহেরা ও হাশেমের মতো তরুণ মানুষ সামন্তযুগের সংস্কারকে ভেঙে নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যেতে চাইছে। বহিপীর ও তাহেরার কাহিনিকে কেন্দ্র করে জমিদারের বজরার মধ্যে দুপক্ষের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। বহিপীর জঘন্য কূটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকেন, এমনকি জমিদারের অসহায়ত্বের সুযোগও তিনি গ্রহণ করতে তৎপর হন। কিন্তু বিবদমান এ সংঘাতে সামন্তযুগীয় সংস্কারের প্রতিনিধি বহিপীর শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেন না। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন তাহেরা ও হাশেম আলি সব বাধার জাল ছিন্ন করে পালিয়ে যায়। বহিপীর তথা সামন্তযুগীয় সংস্কারের প্রতিনিধিরা আধুনিক শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতিকে মেনে নিতে বাধ্য হন।

তাই বলা যায়, গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত 'বহিপীর' নাটকের কাহিনি সাধারণ দৃষ্টিতে সরল মনে হলেও এর মূলে রয়েছে সামন্তযুগীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে আধুনিক শিক্ষার সংঘাত। সেখানে শেষ পর্যন্ত আধুনিক শিক্ষার জয় ঘোষিত হয়েছে এবং সামন্তযুগীয় সংস্কার সেই বাস্তব পরিস্থিতিকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

উত্তরঃ

পিরসাহেব বইয়ের ভাষায় কথা বলার কারণে তাকে বহিপীর বলা হয়। 'বহিপীর' নাটকটি রচিত হয়েছে এক পিরকে কেন্দ্র করে। এই পিরের কাজ হচ্ছে সারা বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে তার ভক্ত-অনুসারী তথা মুরিদদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরতে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন, এক অঞ্চলের মানুষের ভাষা অন্য অঞ্চলের মানুষ বোঝে না। এ সমস্যার সমাধানে তিনি বিভিন্ন এলাকার ভাষা শিক্ষা গ্রহণ না করে বইয়ের ভাষা রপ্ত করেছেন। এছাড়াও তিনি নিজেকে খোদার বার্তাবাহক বলে মনে করেন। তাই তার কাছে মনে হয় আঞ্চলিক কথ্য ভাষা কটু। তাতে পবিত্রতা ও গাম্ভীর্য নেই। খোদার বাণী বহন করার উপযুক্ততা কথ্য ভাষার নেই। তার কাছে মনে হয় খোদার বাণী বর্ণনার জন্য পুস্তকের ভাষার মতো পবিত্র ও গম্ভীর আর কোনো ভাষা নেই। তাই তিনি সব সময় বইয়ের ভাষাতেই কথা বলেন। এ কারণেই তাকে বহিপীর বলা হয়।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের পটভূমি গ্রামীণ অনগ্রসর সমাজ হলেও এর মূলে রয়েছে আধুনিক জীবনে উত্তরণের পদক্ষেপ। নাটকের শেষে লেখক এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, জোর করে পুরোনোকে চির প্রতিষ্ঠিত রাখার চেষ্টা না করে কালের পরিবর্তনে নতুনত্বকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। 'বহিপীর' নাটকের শেষের এই বার্তা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কার্যকর বলে আমি মনে করি। যুগে যুগে নতুন চিন্তা, ধারণা ও মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়। ক্রমান্বয়ে মানুষ এগিয়ে যায় উন্নতির দিকে। সেই সাথে এগিয়ে যায় সমাজ। নতুনকে গ্রহণ করার তাগিদে আবশ্যিকভাবে হারিয়ে যেতে থাকে পুরোনো। ফলে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর 'বহিপীর' নাটকে সেই পরিবর্তনের সময়কালকে পটভূমি করে তুলেছেন। নাটকটিতে প্রতিফলিত সমাজচিত্র থেকে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে নাটকের সময়কাল উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের সূচনালগ্ন। নাটকে ইতিহাসের যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হচ্ছে ১৭৯৩ সালে প্রণীত হওয়া সূর্যাস্ত আইনে নাটকের অন্যতম চরিত্র হাতেম আলি জমিদারি হারাতে বসেছেন। অন্যদিকে একই সময়ে গ্রামীণ প্রত্যন্ত এলাকার মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। যার প্রভাবে বিশেষ করে তরুণ সমাজ সাধারণ মানুষকে শোষণ করা সনাতনী সমাজ থেকে বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হয়ে উঠছে। তবে পুরোনো সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের প্রভাব বজায় রাখতে চেষ্ট করছেন। লেখক এখানে নাটকের মাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন যে নতুনের এই পরিবর্তনকে মেনে নেওয়াই কর্তব্য। তাহেরা ও হাশেমের নতুন জীবনের দিকে পদার্পণে বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিয়ে বহিপীরের মুখে ব্যক্ত হয়েছে- তারা তো আর আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে না, বরং তাদের নতুন জীবনের পথে যাচ্ছে F তাদের ঠেকিয়ে রাখা যায় না। কারণ আজ না হয় কাল তারা নতুনের পথে যাবেই। পুরোনো সমাজকে ভেঙে বা পরিবর্তন করে নতুন সমাজের সৃষ্টিতে এই মেনে নেওয়া ও সমর্থন করা সর্বাধিক কার্যকর বলে আমি মনে করি; যা 'বহিপীর' নাটকের সমাপ্তিতে বার্তা হিসেবে দিয়েছেন লেখক।

উত্তরঃ

স্নেহ আর ভালোবাসার অভাবে রুহু মরে যায়। 'বহিপীর' নাটকে মাতৃহারা তাহেরা সম্পর্কে বহিপীর এ মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন। মানুষ সামাজিক জীব। যুগ যুগ ধরে মানুষ পরিবারবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। পরিবারের বড়দের কাছ থেকে ছোটরা স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা পেয়ে বড় হয়। কিন্তু যারা বড়দের এই স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত তারা নিতান্ত হতভাগ্য। 'বহিপীর' নাটকে তেমনই হতভাগ্য চরিত্র তাহেরা। ছোটবেলায় মাতৃহারা তাহেরা বাবা-মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একটি চারা গাছকে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা না করলে গাছটি যেমন ধীরে ধীরে বড় না হয়ে মরে যায় তেমনই মানুষও যদি প্রয়োজনীয় স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা না পায় তবে তার রুহু মরে যায়। জমিদার হাতেম আলির সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাহেরা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বহিপীর এ বিষয়টি তুলে ধরছেন।

উত্তরঃ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচিত 'বহিপীর' নাটকের কাহিনি গড়ে উঠেছে বহিপীরের সর্বগ্রাসী স্বার্থ এবং নতুন দিনের প্রতীক বালিকা তাহেরার বিদ্রোহের কাহিনিকে কেন্দ্র করে। এ বিদ্রোহের সূচনা হয় বহিপীরের সঙ্গে তাহেরার জোর করে বিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও তার সাথে জড়িয়ে পড়া কিছু ঘটনা, পরিবেশ ও চরিত্রকে আশ্রয় করে এগিয়েছে নাট্যকাহিনি।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছে বহিপীর; যার কাজ হচ্ছে সারা বছর বিভিন্ন এলাকায় তার অনুসারী মুরিদদের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো। তার অনেক মুরিদের মধ্যে পেয়ারা মুরিদ ছিল তাহেরার বাবা এবং সৎমা। কোনো এক জুম্মা রাতে অত্যন্ত শখ করে তাহেরার বাবা ও সৎমা তাহেরাকে জোর করে এই বহিপীরের সাথে বিয়ে দেয়। তাহেরার বাবা পরহেজগার মানুষ, বিষয়-আশয় তেমন না থাকলেও বংশ খানদানি। তাছাড়া নিজের বয়স হয়েছে, দেখাশোনা ও খেদমত করার জন্য একজন নিজের মানুষ প্রয়োজন- এ চিন্তা থেকে বহিপীর বিয়েতে মত দেন। বহিপীরের প্রথম স্ত্রী চৌদ্দ বছর আগে মারা গেছেন। তাদের কোনো সন্তানও নেই। বর্তমানে তার দেখাশোনার জন্য একমাত্র চাকর হকিকুল্লাহ্ রয়েছে। কিন্তু সে আর কত করতে পারে। এসব চিন্তাভাবনা থেকে বিয়ে করাকেই অধিক সমীচীন মনে করেন বহিপীর। পিরসাহেব বিয়েতে রাজি হওয়ার পর তার মুরিদ তথা তাহেরার বাবাই বিয়ের সব কাজের দায়িত্ব নেয়। তাহেরার বাবা ও সৎমা পিরের পেয়ারা মুরিদ হলেও তাহেরা পিরকে পছন্দ করত না। তার ওপর পিরের বৃদ্ধ বয়স। তাই বিয়ের রাতেই নাবালক চাচাতো ডাইকে সঙ্গে করে তাহেরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।

তাই বলা যায়, তাহেরার বাবা ও সৎমা নিজেদের ইচ্ছাতেই জোর করে তাহেরাকে তাদের পির তথা বহিপীরের সঙ্গে বিয়ে দেয়, যা তাহেরা মেনে নিতে পারেনি। তাই সে প্রতিবাদস্বরূপ বাড়ি থেকে

উত্তরঃ

গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত 'বহিপীর' নাটকের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে নদীতে ভাসমান জমিদার হাতেম আলির বজরার মধ্যে। বজরার দুটি কামরায় সম্পূর্ণ নাট্যকাহিনি বিন্যস্ত হয়েছে। বজরার বড় কামরার মধ্যে দেখা যায় জমিদার হাতেম আলি ও বহিপীরের মধ্যে কথোপকথন এবং অপর কামরায় অবস্থান করে খোদেজা বেগম, তাহেরা এবং হাশেম আলি। দুই কামরার মধ্যে বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদানের বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে হাশেম আলি। নাটকের মূল কাহিনি যেখানে বহিপীরের বিরুদ্ধে তাহেরার দ্বন্দ্ব সেখানে এই দুই পক্ষের মধ্যে বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছে জমিদারপুত্র হাশেম। হাশেম আলির ভাষ্যমতে, সারা দুপুর আর সারা বিকেল ধরে এ কামরা, সে কামরা করছি। আর ভালো লাগে না। যেন যুদ্ধক্ষেত্রে শর্ত-পাল্টা শর্ত নিয়ে দুই জোরদার শত্রু শিবিরের মধ্যে যাতায়াত করছি। দুই পক্ষের মধ্যে বারবার তথ্য আদান-প্রদান করার জন্য হাশেম আলির নিজেকে বার্তাবাহক বলে মনে হয়েছে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের কাহিনিতে দেখা যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু তাহেরার বাবা ও সৎমা বৃদ্ধ পিরকে খুশি করতে কিশোরী তাহেরাকে তার সঙ্গে বিয়ে দেয়। তাহেরা এ বিয়ে মেনে না নিয়ে নাবালক চাচাতো ভাইকে সঙ্গে করে পালিয়ে যায়। ঘটনাক্রমে আশ্রয় পায় জমিদার হাতেম আলির বজরায়। কাকতালীয়ভাবে তাহেরাকে খুঁজতে বের হয়ে বহিপীরও সেই বজরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। সব জেনে জমিদারগিন্নি তাহেরাকে পিরের হাতে তুলে দিতে চান। তাহেরা আত্মহত্যা করতে চাইলে তাকে তারা মরতে দিতে চান না। যার ফলে জমিদারগিন্নি খোদেজা বেগমকে কটাক্ষ করে তাহেরা বলেছে- আপনারা কোরবানির গোল্ড খেতে পারেন কিন্তু গরু জবাই দেখতে পারেন না।

বাড়ি থেকে পালিয়ে ডেমরা ঘাটে এলে তাহেরার চাচাতো ভাই ভয়ে কাঁদতে থাকে আর তাহেরা চুপচাপ বসে থাকে। এ সময় লোকজনের ভিড় জমে যায়। একটি মুসলমান মেয়ে বিপদে পড়েছে দেখে জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী খোদেজা বেগম তাকে বজরায় তুলে নেন। তাহেরাকে খুঁজতে বের হয়ে বহিপীরও ঝড়ের কবলে পড়ে। জমিদারের বজরার সঙ্গে ধাক্কা লেগে তার নৌকা প্রায় ডুবে যায়। সঙ্গীসহ নাকানি-চুবানি খেয়ে পিরসাহেব অবশেষে বজরায় উঠে আসেন। কাকতালীয়ভাবে বহিপীর ও তাহেরা একই বজরায় দুটি কামরায় আশ্রয় লাভ করে। পিরসাহেবের কথা জানতে পেরে তাহেরা খোদেজা বেগমকে বারবার অনুরোধ করে পিরের কাছে তার পরিচয় প্রকাশ না করার জন্য। কিন্তু ধর্মভীরু খোদেজা তার কোনো কথা না শুনে পিরের কাছে তাহেরার পরিচয় ফাঁস করে দেন। এ সময় তাহেরা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চাইলে খোদেজা ও হাশেম আলি তাকে রক্ষা করেন। খোদেজা বেগম তাহেরাকে পিরের হাতে তুলে দিতে পারেন ঠিকই কিন্তু চোখের সামনে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মরতে দেন না। তাই জমিদারগিন্নির ওপর ক্ষোভ থেকে তাহেরা প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছে।

উত্তরঃ

এতদিনের জমিদারির শেষ রাত বলতে হাতেম আলির জমিদারি নিলামে ওঠার অন্তিম মুহূতকে বোঝানো হয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম চরিত্র হাতেম আলি। রেশমপুরে তার সামান্য জমিদারি আছে। বংশগতভাবে প্রাপ্ত এই জমিদারির সঙ্গে। জড়িয়ে আছে তার বংশের ঐতিহ্য, মানসম্মান ও মর্যাদা। সূর্যাস্ত আইনের করাল গ্রাসে তিনি জমিদারি হারাতে বসেছেন। বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতে না পারলে তার জমিদারি নিলামে উঠবে। হাতেম আলিকে খাজনা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয় এক 'রাত। বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে অনেক আশা নিয়ে সাহায্যের জন্য যান হাতেম আলি কিন্তু আনোয়ারউদ্দিন জানিয়ে দেন যে তিনি সাহায্য করতে পারবেন না। তাই সমস্ত আশা হারিয়ে নিলাম হওয়ার আগের রাতকে জমিদারির শেষ রাত বলে অভিহিত করা হয়েছে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম একটি চরিত্র হচ্ছে হাতেম আলি। রেশমপুরে তার সামান্য জমিদারি আছে। ১৭৯৩ সালের সূর্যাস্ত -আইনের করাল গ্রাসে পড়ে তার সেই জমিদারি নিলামে উঠতে চলেছে। অসহায় জমিদার হাতেম আলি অনেক চেষ্টা করেও জমিদারি রক্ষার জন্য খাজনার টাকা জোগাড় করতে পারেননি। শহরে বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। ঘটনাক্রমে বহিপীরের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তাহেরা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে জমিদারের বজরায় আশ্রয় লাভ করে। অন্যদিকে ঝড়ের কবলে পড়ে জমিদারের বজরার সঙ্গে ধাক্কা লেগে বহিপীরের নৌকা প্রায় ডুবে যায়। তাহেরাকে খুঁজতে এসে নাকানি-চুবানি খেয়ে কাকতালীয়ভাবে পিরসাহেবও একই বজরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। বজরায় আশ্রয় নেওয়া তাহেরাকে বুঝিয়ে বহিপীরের কাছে ফেরত দেওয়ার শর্তে বহিপীর হাতেম আলিকে খাজনার টাকা ধার দিতে চান। দ্বিধান্বিত জমিদার তার জমিদারি রক্ষার জন্য তাহেরার কাছে শর্তের কথা উপস্থাপন করেন। নাটকে তাহেরা বিদ্রোহী হলেও মানবিক গুণের অধিকারী। যে তাহেরা বহিপীরের কাছে না যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়েছে, যে তাহেরা বহিপীরের কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত সেই তাহেরাই হাতেম আলির জমিদারি রক্ষা করার জন্য বহিপীরের সঙ্গে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু তাহেরা রাজি হলেও হাতেম আলি এরকম শর্তে রাজি হননি। হাতেম আলি জমিদারি হারানোর উদ্‌দ্বিগ্নতা ত্যাগ করে বিবেকের দংশনে বহিপীরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে বহিপীর বিনাশর্তে টাকা দিতে চাইলেও হাতেম আলি তা নিতে চাননি। তখন বহিপীর নিজের মানবিকতার পরিচয় দিতে চান। সকলের কাছে হার মেনে, বাস্তব পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে নিজেকে পরাজিত শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে জমিদার হাতেম আলির কাছে শেষ অনুরোধ জানান বহিপীর।

উত্তরঃ

উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদার হয়েছেন হাতেম আলি। একসময় জমিদারির প্রাচুর্যতা থাকলেও বর্তমানে তা নেই। এ জমিদারি থেকে হাতেম আলি কোনো রকমে মানমর্যাদা রক্ষা করে ভরণপোষণ চালান। অন্তঃসারশূন্য এ জমিদারিকে তাই ফাঁকা ঢোলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

হাতেম আলিকে জমিদার বলা হলেও তার জমিদারিতে কোনো আয় উন্নতি নেই, তার অর্থ-সম্পদও অঢেল নয়। তিনি যে জমিদারি চালান তা একসময় ধনদৌলতে ভরপুর ছিল। কিন্তু এখন তা নেই, তার হাতে বর্তমানে যে জমিদারি তা কেবল ঢাকের ঢোল, বাজালে আওয়াজ হয় কিন্তু ভেতর অন্তঃসারশূন্য, দেখতে বড় কিন্তু ভেতরে ফাঁকা। বস্তুত একজন জমিদার হিসেবে তিনি কিছুই পাননি। একারণেই হাতেম আলি নিজের জমিদারিকে ফাঁকা ঢোলের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে অপ্রধান চরিত্রের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী খোদেজা বেগম। নাটকে খোদেজা বাঙালি মুসলমান নারী চরিত্রের সার্থক উদাহরণ। তিনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিন্তু অত্যন্ত ধর্মভীরু একটি চরিত্র। তৎকালীন সময়কালকে নাটকে বাস্তবধর্মী করে তুলে ধরতে খোদেজার মতো চরিত্র সৃষ্টি করেছেন লেখক।

'বহিপীর' নাটকের সার্বিক কাহিনিতে দেখা যায়, জমিদারগিন্নি খোদেজা বেগম অত্যন্ত সাদামাটা একটি চরিত্র। ডেমরা ঘাটে একটি মুসলমান মেয়ে বিপদে পড়েছে শুনে সেই 'মেয়ে তথা তাহেরাকে অচেনা হওয়া সত্ত্বেও নিজের বজরায় আশ্রয় দিয়েছেন তিনি। তাহেরার জীবনে করুণ কাহিনি শুনে তিনি নিজেও ব্যথিত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তার উদার মানবিক মানসিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে। আবার তিনি যখন জানতে পারেন তাহেরা একজন পিরের পালিয়ে আসা স্ত্রী তখন তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন, যা তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনমানসিকতাকে তুলে ধরে। তাহেরার মতো তরুণীর সঙ্গে বৃদ্ধ পিরের বিয়ে অন্যায় জেনেও পরক্ষণেই পিরের অভিশাপের ভয়ে তিনি ভীত হয়েছেন। অন্যায় মনে করেও পিরের বদদোয়া থেকে নিস্তার পেতে তাহেরাকে ফেরত পাঠাতে চেয়েছেন পিরের কাছে। পিরের স্ত্রী হওয়াকে তিনি সৌভাগ্যের বিষয় মনে করেছেন। আবার বহিপীরের সঙ্গে পুত্র হাশেম মুখোমুখি দাঁড়ালে তিনি পিরের পক্ষ নিয়ে ঝামেলামুক্ত থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু ছেলেকেও তিনি শক্ত হাতে দমন করতে পারেননি। যার মধ্য দিয়ে বাঙালি চিরায়ত মায়ের প্রতিমূর্তিটি ফুটে উঠেছে খোদেজা চরিত্রের মধ্য দিয়ে।

উপর্যুক্ত আলোচনা পর্যালোচনা করে তাই বলা যায়, 'বহিপীর' নাটকে খোদেজা বেগম কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিন্তু অত্যন্ত ধর্মভীরু একটি চরিত্র।

উত্তরঃ

তাহেরা ও হাশেম নতুন জীবনের পথে যাচ্ছে।
'বহিপীর' নাটকের কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে স্বার্থান্বেষী বহিপীর ও নতুন দিনের প্রতীক কিশোরী তাহেরার দ্বন্দ্ব। তাহেরা বহিপীরের সঙ্গে বিয়ে অস্বীকার করে বাড়ি থেকে পালিয়ে জমিদার হাতিম আলির বজরায় আশ্রয় নেয়। তাহেরাকে খুঁজতে এসে ঘটনাক্রমে পিরসাহেবও সেই বজরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাহেরাকে স্ত্রী দাবি করে জোর করে তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু তাহেরা তার সঙ্গে যেতে চায় না। জমিদারপুত্র হাশেম চায় তাহেরাকে বহিপীরের হাত থেকে বাঁচাতে। বহিপীরের কূটকৌশলে পড়ে তাহেরা তার সঙ্গে যেতে চাইলেও জমিদার হাতেম আলি বহিপীরের সেই শর্ত মেনে নেননি। হাশেম তাহেরাকে নিয়ে নতুন জীবনের পথে বেরিয়ে পড়ে। পিরসাহেবও তাদের এ যাত্রাকে মেনে নেন।

উত্তরঃ

বাঙালি গ্রামীণ মুসলমান সমাজের প্রেক্ষাপটে রচিত 'বহিপীর' নাটকের কাহিনি আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় অত্যন্ত সরল। কিন্তু লেখক এর মধ্য দিয়ে সামন্তযুগের সন্ধিক্ষণকে তুলে ধরেছেন। নাটকের মূলে রয়েছে সামন্তযুগীয় সংস্কারের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার দ্বন্দ্ব। সামন্তযুগের প্রতিনিধি হিসেবে লেখক উপস্থাপন করেছেন বহিপীর চরিত্রকে। সরল পথে নিজের কার্যসিদ্ধি করতে না পেলে বহিপীর কূটকৌশলের আশ্রয় নেন।

'বহিপীর' নাটকে নাট্যকাহিনির স্থান জমিদার হাতেম আলির। বজরা। বজরার মধ্যে ক্ষয়িষ্ণু সামন্তযুগের দুই প্রতিনিধি হাতেম আলি ও বহিপীর নিজের স্ব-স্ব সমস্যার জন্য চিন্তায় জর্জরিত। একজনের জমিদারি হারানোর শঙ্কা, আরেকজনের অবাধ্য স্ত্রীকে বুঝিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা। এই দুই সমস্যার সমাধান বের করেন বহিপীর। তবে সেই সমাধানের মূলে ছিল বহিপীরের নিজের স্বার্থ উদ্ধারের কূটকৌশল। তিনি জমিদার হাতেম আলিকে বোঝান যে, জোরজুলুম করে পাগলা হাতি তথা অত্যন্ত হিংস্র জন্তুকেও বশ করা যায়, কিন্তু মানুষকে কখনো জোর করে বশ করা যায় না। মানুষকে বশ করতে হয় কৌশল দিয়ে। বহিপীরের কথার নিহিতার্থ অর্থ এই যে, তাহেরাকে জমিদার পরিবার বজরায় আশ্রয় দিয়েছেন। সুতরাং তাহেরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এখন জমিদার হাতেম আলি যদি তাকে বুঝিয়ে বহিপীরের সঙ্গে ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন তবে বহিপীরও জমিদারের খাজনার টাকা ধার দিয়ে জমিদারি রক্ষা করবেন। এই কূটকৌশলের কথা হাতেম আলির কাছে ব্যক্ত করতে গিয়ে বহিপীর আলোচ্য মন্তব্য করেন।

সুতরাং বলা যায়, তাহেরাকে বশ করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য বহিপীর যে কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করতে চান সেটি-ই জমিদার হাতেম আলির কাছে ব্যস্ত করতে গিয়ে বহিপীর উপর্যুক্ত মন্তব্যের অবতারণা করেন।

উত্তরঃ

"বদলোকেরা তোমাকে গিলে খাচ্ছে"- খোদেজা বেগম কথাটি বলেছেন তাহেরার দিকে নদীর ঘাটের খারাপ লোকদের কুনজরে তাকানো প্রসঙ্গে।

বৃদ্ধ পিরের মতে জোর করে বিয়ে দেওয়ায় তাহেরা তার নাবালক চাচাতো ভাইকে সঙ্গে করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ডেমরাঘাটে এসে তার চাচাতো ভাই চিৎকার দিয়ে কান্না করে। তাহেরাকে ঘাটে অসহায় অবস্থায় দেখে বদলোকেরা ভিড় করতে শুরু করে এবং এমনভাবে তাহেরাকে দেখতে থাকে যেন চোখ দিয়ে লোকগুলো তাহেরাকে গিলে খাবে। জমিদারগিন্নি খোদেজা বেগম তাহেরাকে সেই অবস্থায় আশ্রয় দিয়েছেন। কথা বলতে গিয়ে খোদেজা বেগম আলোচ্য মন্তব্যটি করেছেন।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের' যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত তার মূলে রয়েছে তাহেরা চরিত্রের বিদ্রোহী মনোভাব। তাহেরা সেই সমাজে থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, যে সমাজে নারীরা পুরুষের বিপক্ষে প্রতিবাদ তো দূরের কথা, উঁচু গলায় কথা পর্যন্ত বলতে পারত না। সেই সময় তাহেরা চরিত্রের মধ্যে এ ধরনের মনোভাব চরিত্রটিকে অসাধারণ করে তুলেছে। আর সেই অসাধারণ নারীর পরিচয় পেয়েছেন বহিপীর।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে তাহেরা। কারণ তাহেরাকে কেন্দ্র করেই নাটকের সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে। মাতৃহারা তাহেরার কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাবা ও সৎমা বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে জোর করে তাকে বিয়ে দেয়। কিন্তু সে এ অন্যায় বিয়ে মেনে না নিয়ে প্রতিবাদ করেছে। প্রতিবাদস্বরূপ সে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। ঘটনাচক্রে সে জমিদারের বজরায় আশ্রয় পায়। রজরার একমাত্র হাশেম আলি ছাড়া সবাই তার বিরুদ্ধে গেলেও সে বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে তার না যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। এই হিসেবে তাহেরা একটি অত্যন্ত অনমনীয় চরিত্র। 'বহিপীর' নাটকের সময়কালের প্রেক্ষাপটে নারী চরিত্রের মধ্যে এই অনমনীয় গুণ ছিল দুষ্কর। সমাজের চিরায়ত প্রথার বাইরে গিয়ে, সনাতনী প্রথা ভেঙে তাহেরা চরিত্রটি হয়ে ওঠে অসাধারণ। তাহেরা চরিত্রের এই গুণে বহিপীর নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে না পারলেও তাহেরা চরিত্রটি তাকে করে তুলেছে বিমোহিত।
নিজের বিয়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন মত প্রকাশ করে তাহেরা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, সামাজিক বাধার কারণে অনেক , নারীর পক্ষেই তা সম্ভব নয়। তাহেরার এই অধিকার সচেতনতা অনেক নারীকেই নিজ অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে। সবশেষে তাহেরা নতুন জীবনের সন্ধানে হাশেম আলির হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। সামগ্রিক আলোচনায় তাহেরাকে বিশ শতকের প্রারম্ভে নারী অধিকার ও জাগরণের প্রতীক চরিত্র বলা যায়। যা কেবল বহিপীরকেই নয় বরং সচেতন সব পাঠককেই তার অসামান্যতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের কাহিনি তাহেরাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তাহেরা। সে মা-মরা মেয়ে, সৎমায়ের সংসারেই মানুষ। সৎমা ও বাবা বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে তার বিয়ে দেয়। এই অসম বিয়ে তাহেরা মেনে নেয়নি। বিয়ের রাতে পালিয়ে জমিদার হাতেম আলির বজরায় আশ্রয় নেয়। ঘটনাচক্রে বহিপীর সেই বজরায় উপস্থিত হন। সেখানে তাহেরার খোঁজ পেয়ে তাকে ফিরিয়ে নিতে চান। কিন্তু তাহেরা তার সাথে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রয়োজনে সে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা যাবে, তবু বহিপীরের সাথে যাবে না। জমিদার হাতেম আলির পুত্র হাশেম আলি তার পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে বহিপীর ও হাশেম মুখোমুখি দ্বন্দ্বে উপনীত হয়। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু তাহেরা। বহিপীরের শরিয়তি বিয়ের দোহাই, পুলিশের ভয় কোনোকিছুই তাহেরাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি। অবশেষে হাশেম আলির সঙ্গে অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় সে। এরই মধ্য দিয়ে নাটকটি চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছায়। তাই বলা যায়, 'বহিপীর' নাটকের কাহিনি তাহেরাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।

উত্তরঃ

"হকিকুল্লাহ বহিপীরের ধামাধরা একটি ব্যক্তিত্বহীন চরিত্র।"- মন্তব্যটি যথার্থ।

'বহিপীর' নাটকের নাম-চরিত্র বহিপীর। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। বছর-দুবছরান্তে তিনি মুরিদদের বাড়ি গমন করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। মুরিদরা সর্বস্ব উজাড় করে পিরের সেবা করতে মরিয়া। বহিপীরের স্ত্রী মারা গেছে চৌদ্দ বছর আগে। তাই বহিপীরের একমাত্র ভরসা হকিকুল্লাহ। হকিকুল্লাহ একটি অপ্রধান চরিত্র। সে বহিপীরের খাদেম অর্থাৎ দেখভাল করা লোক। প্রাচীনকালে সম্রাটদের যেমন তোষামোদকারী থাকত, 'বহিপীর' নাটকের হকিকুল্লাহ সে-জাতীয় চরিত্র।

নাটকের পুরো ঘটনাকাল পরিসরে হকিকুল্লাহর উপস্থিতি ছিল। কিন্তু সেটা উপস্থিতি না-থাকার মতো, সে বসে বসে হুঁকা টানে। নাটকের প্রথম ও শেষাঙ্কের বর্ণনাংশে হকিকুল্লাহকে হুঁকা খাওয়া অবস্থায় নাট্যকার বর্ণনা করেছেন। তাকে এর ব্যত্যয় ঘটাতে খুব একটা চোখে পড়ে না।

হকিকুল্লাহ পিরের খেদমতদার। পিরসাহেবের লেবাস শুকাতে দিতে তাকে দেখা যায়। পিরসাহেবের পিঠ ব্যথা করলে হকিকুল্লাহ তার পিঠ টিপে দেয়। পিরসাহেব থামতে বললে সে থামে, না থামতে বললে থামে না। মাঝখানে হট্টোগোলের সময় বহিপীরের সাথে হকিকুল্লাহ ভেতরের কামরায় উঁকি দেয়। খোদেজা তাকে দেখে ভয় পায়। তখন সে বহিপীরের সহযোগী হিসেবে নিজের পরিচয় দেয়।

মানবীয় বোধবুদ্ধি নেই হকিকুল্লাহর। এমনকি মানুষ হিসেবে নিজের বুদ্ধিমত্তার প্রকাশও বহিপীরকে অবাক করে। বহিপীর তাহেরাকে ভয় দেখানোর জন্য হকিকুল্লাহকে পুলিশ ডাকতে বললে হকিকুল্লাহ বুদ্ধি খাটিয়ে পুলিশকে ডাকে না। তার এই বুদ্ধিমত্তা পিরকে বিস্মিত করে এ কারণে যে হকিকুল্লাহ-ও ভাবতে শুরু করেছে! তবে পিরসাহেব তার প্রশংসাও করেন।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, হকিকুল্লাহ পিরের খেদমতদার। পিরসাহেবের উপস্থিতিতে তার ভূমিকা নগণ্য। বহিপীরের আদেশ পালনই তার কাজ। বহিপীরের ইচ্ছাই তার ইচ্ছা। তাই বলা যায় যে, হকিকুল্লাহ বহিপীরের ধামাধরা একটি ব্যক্তিত্বহীন চরিত্র। পুরো নাটকে তার উপস্থিতি দৃশ্যমান হলেও তার কাজ কেবল বহিপীরের ডাকে সাড়া দেওয়া। বাকিটা সময় সে হুঁকা খেয়েই কাটিয়েছে। কোনো বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য নেই। বহিপীরের উপস্থিতিতে তার নিজস্ব বলে কিছু প্রকটিত হয়নি।

উত্তরঃ

বহিপীরের হাত থেকে বাঁচাতে হাশেম তাহেরাকে বিয়ে করতে চায়।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র হাশেম আলি। সে বহিপীরের বিপরীত ধারার চরিত্র। হাশেম আলি যুক্তিবাদী, আধুনিক ও মানবিক চেতনাসম্পন্ন চরিত্র। সে উচ্চশিক্ষিত তরুণ। জমিদারের ছেলে হয়েও বৈষয়িক চিন্তা-ভাবনা তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। ছাপাখানার ব্যাবসা করে সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। অসহায় তরুণী তাহেরার সাথে বৃদ্ধ বহিপীরের অসম বিয়ের ব্যাপারে হাশেম আলি সোচ্চার। তার মতে, এ বিয়ের কোনো ভিত্তি নেই। কেননা এ বিয়েতে তাহেরার মতামতকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। এমন বিয়ে আইন দ্বারাও স্বীকৃত নয়। তাহেরার খোঁজে বহিপীর বজরায় এসে উপস্থিত হলে তাহেরা ভয় পায়। বহিপীরের সাথে যাওয়ার চেয়ে সে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। জমিদারপুত্র হাশেম আলি তাকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচায়। বহিপীরের হাত থেকে বাঁচাতে সে তাহেরাকে বিয়ে করতেও প্রস্তুত। মূলত বহিপীরের সব চক্রান্ত থেকে বাঁচাতে হাশেম আলি তাহেরাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত।

উত্তরঃ

"বহিপীরের মতো ধর্মব্যবসায়ীদের অনুকূল পরিবেশ খোদেজার মতো ধর্মভীরু সাধারণ জনগোষ্ঠী।"- মন্তব্যটির সাথে আমি একমত পোষণ করছি।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় ও নাম-চরিত্র বহিপীর। সুনামগঞ্জে তার বাড়ি। দেশের সব অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। বছর-দু'বছরান্তে বহিপীর মুরিদদের বাড়ি যান। মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে বহিপীরের সেবা করে। তিনি অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের কুসংস্কার ও ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে তার ধর্মব্যাবসা পরিচালনা করেন। তিনি অত্যন্ত ধূর্ত ও বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন। বহিপীরকে খুশি করার জন্য তার পেয়ারের মুরিদ একমাত্র কন্যা কিশোরী তাহেরাকে পিরের সাথে বিয়ে দিতেও কসুর করে না। এমনকি বহিপীর বললে তার শহরের ধনী মুরিদরা হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার টাকা দেবে বলে বহিপীর আত্মবিশ্বাসী।-সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মভীরুরা বহিপীরের মতো ভন্ডদের উত্থানের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এমনই একজন জমিদার হাতেম আলির পত্নী খোদেজা বেগম।

'বহিপীর' নাটকের খোদেজা চরিত্রটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু বৈশিষ্ট্যের জন্য প্রসিন্ধ। প্রগতিশীল চিন্তা তিনি করতে পারেন না। বয়স্ক লোকের সাথে তাহেরার বিয়ে অন্যায় মানলেও পিরের সাথে বিয়েকে খোদেজা সৌভাগ্যের বিষয় মনে করেন। তার কথায় যুবক বা তরুণ পির না পাওয়া যাওয়ায় বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়েই ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি পিরের বদদোয়াকে ভয় পান। তাহেরায় প্রতি মানবিকবোধ জন্মালেও পিরের বিরুদ্ধে কাজ করাকে তিনি অমঙ্গলজনক ভাবেন। হাশেম ও বহিপীর তাহেরাকে ঘিরে দ্বন্দ্বে মুখোমুখি হলে তিনি পিরের পক্ষ অবলম্বন করেন। সার্বিক বিচারে খোদেজার কুসংস্কার, ধর্মভীরুতাই বহিপীরের মতো ধর্মব্যাবসায়ীদের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলে সহায়তা করে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, কোনো প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না থেকেও বহিপীর জমিদারের জমিদারি রক্ষার সক্ষমতা রাখেন শুধু ধর্মীয় ভীতিকে কাজে লাগিয়ে। আর এই ধর্মব্যাবসার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে ধর্মভীরু কুসংকারাচ্ছন্ন সাধারণ মানুষ। 'বহিপীর' নাটকের খোদেজা এই শ্রেণির প্রতিনিধি। তাদের মতো মানুষের জন্যই সমাজে পিরপ্রথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাই বলা যায় যে, বহিপীরের মতো ধর্মব্যবসায়ীদের অনুকূল পরিবেশ খোদেজার মতো ধর্মভীরু সাধারণ জনগোষ্ঠী।

উত্তরঃ

বহিপীরের বদদোয়া লাগার ভয়ে খোদেজা বহিপীরের পক্ষ নিয়েছিলেন।

'বহিপীর' নাটকের খোদেজা চরিত্রটি একটি অপ্রধান চরিত্র। তিনি জমিদারপত্নী। অত্যন্ত ধর্মভীরু ও কুসংস্কারাছন্ন এই চরিত্রটি সকল প্রগতিশীলতার বিরোধী। তাহেরার বাড়ি ছেড়ে পালানোকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। অসম বয়সের বিয়ে অনুচিত মনে করলেও বহিপীরের সাথে বিয়ে হওয়াকে তিনি সৌভাগ্যের বিষয় মনে করেন। যেহেতু যুবক পির পাওয়া যায় না, সেহেতু বৃদ্ধ পিরকে বিয়ে করেই সন্তুষ্ট থাকা শ্রেয়। তিনি বহিপীরের বদদোয়াকে ভয় পান। ছেলে হাশেম আলিকে তিনি বহিপীরের বিরুদ্ধে যেতে নিষেধ করেন। তাহেরা বহিপীরের কাছে তার পরিচয় গোপন রাখতে বললেও খোদেজা তা শোনেন না, তিনি মনে করেন পিরসাহেব আধ্যাত্মিক শক্তির বলে সবকিছু জেনে যাবেন। হাশেম তাহেরাকে পিরসাহেবের কবল থেকে বাঁচাতে গেলে বহিপীরের সাথে মুখোমুখি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। বহিপীর-হাশেমের এই দ্বন্দ্বে পিরের বদদোয়ার ভয়ে খোদেজা বহিপীরের পক্ষ নেন। বহিপীরের অভিশাপ থেকে বাঁচতে খোদেজা এই কাজটি করেন।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের শুরুর সমাজচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের নাম-চরিত্র বহিপীর বাংলা অঞ্চলে পিরপ্রথার জেঁকে বসা বিষয়টিকে নির্দেশ করেছে। বহিপীর সারা বছর তার মুরিদদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান। শহরে বহিপীরের ধনী মুরিদ আছে- এ বিষয়টি বাংলা অঞ্চলে শহর গড়ে ওঠার ইঙ্গিত করেছে, যা বিশ শতকের শুরুর দিকের নগর কলকাতা-ঢাকাকে নির্দেশ করে।

দ্বিতীয়ত, তাহেরার মতো নারী স্বাধীনতার প্রতীক চরিত্রের সাথে এ অঞ্চলের নারীজাগরণের বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিষয়টি বিশ শতকের শুরুতে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, নবাব ফয়জুন্নিসা, ফজিলাতুন্নেছার নারীবাদী আন্দোলন ও সংগ্রামের ইঙ্গিত দেয়।

তৃতীয়ত, হাশেম আলি শিক্ষিত আধুনিক তরুণদের প্রতীক। বিশ শতকের শুরুতে কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আধুনিকতাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে। এদের আদর্শ ছিল সমাজ থেকে কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও অস্ত্র ধর্মবিশ্বাস ভুলে যুক্তিবাদ, মানবতা প্রতিষ্ঠা করা। হাশেম আলি চরিত্রের মধ্যে আধুনিকতাবাদীদের সেই মনস্তত্ত্ব প্রত্যক্ষ করা যায়। জমিদারপুত্র হয়েও বৈষয়িক বুদ্ধিশাসিত নয়, বরং সে যুক্তিবাদী, মানবিক চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।

চতুর্থত, ব্রিটিশ ভারতে ১৭৯৩ সালে সূর্যাস্ত আইন প্রণীত হয়। এই আইনে বলা আছে, জমিদাররা নিজ নিজ জমিদারি সীমার নির্ধারিত খাজনা নির্দিষ্ট দিন সূর্যাস্তের পূর্বে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে নতুবা জমিদাররা জমিদারি স্বত্ব হারাবে এবং তা নির্দিষ্ট মূল্যে নিলামে চড়বে। 'বহিপীর' নাটকে জমিদার হাতেম আলি সেই সূর্যাস্ত আইনের বলি হতে চলেছেন। তবে তার জমিদারির নাম-ডাক নেই। ফলে এ নাটকটি সেই সময় লিখিত যখন সূর্যাস্ত আইন শেষ দিকে। অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষ দিকে জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদ হতে শুরু করে।

পঞ্চমত, নগর সভ্যতার সূচনার বিষয়টি এসেছে। জমিদার হাতেম আলি জমিদার হওয়া সত্ত্বেও শহরের বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে টাকা ধার চাইতে গিয়ে ফিরে এসেছেন। অর্থাৎ গ্রামীণ সভ্যতার বিপরীতে নগর সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিশ শতকের ইংরেজ কোম্পানির যান্ত্রিক শিল্প-কলকারখানার ইঙ্গিত দিয়েছে।

সুতরাং উপযুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের সূচনার সমাজচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। পিরপ্রথা, নারীজাগরণ, আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের উন্মেষ, ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি ব্যবস্থা, নগর সভ্যতার বিকাশ ইত্যাদি বিষয় সেই সময়কেই নির্দেশ করছে।

উত্তরঃ

বহিপীরের হাত থেকে তাহেরাকে বাঁচানো নিয়ে হাশেম আলি ও তার মায়ের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।

হাশেম আলি জমিদারপুত্র হয়েও বৈষয়িক চিন্তা তার চরিত্র কলুষিত করেনি। সে উচ্চশিক্ষিত, যুক্তিবাদী, মানবিক চেতনাসম্পন্ন তরুণ। সে শিক্ষিত, পাশাপাশি মানবিক ও মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন। পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সঙ্গে মা-মরা কিশোরী তাহেরার বিয়েকে সে বৈধ মনে করে না। কেননা এ বিয়েতে তাহেরার মতকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। তাই হাশেম আলি তাহেরার পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে তার মা খোদেজা কুসংস্কারাছন্ন। ধর্মভীতি তার চিন্তা-চেতনাকে আকৃষ্ট করে 'রেখেছে। তিনি মনে করেন পিরের সাথে বিয়ে সৌভাগ্যের বিষয়। পিরের বদদোয়াকে তিনি ভয় পান। এমনকি পিরের আধ্যাত্মিক শক্তিতেও তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি মনে করেন তারা তাহেরার কথা পিরসাহেবের কাছ থেকে লুকালেও আধ্যাত্মিক বলে পির তা জেনে যাবেন। তাই তিনি তাহেরাকে পিরসাহেবের হাতে তুলে দিতে চান। অন্যদিকে তার ছেলে হাশেম আলি চায় যেকোনো মূল্যে তাহেরাকে বাঁচাতে। এমনকি এ ক্ষেত্রে তাহেরাকে বিয়ে করে হলেও পিরসাহেবের হাত থেকে সে বাঁচাবে। মূলত তাহেরাকে বহিপীরের হাত থেকে বাঁচানো নিয়ে হাশেম ও তার মায়ের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।

উত্তরঃ

"হাশেম আলি অত্যন্ত শান্তভাবে বহিপীরের কূটচালকে মোকাবিলা করে জয়লাভ করেছে।"- মন্তব্যটি যথার্থ।

'বহিপীর' নাটকের মূল আকর্ষণ তাহেরাকে কেন্দ্র করে জমিদারপুত্র হাশেম আলি ও বহিপীরের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত হাশেম আলিই 'জয়ী হয়েছে। নাটকের শেষে বহিপীর নিজেকে পরাজিত শত্রু বলে উল্লেখ করেছেন। এক বিবেচনায় 'বহিপীর' নাটকের বহিপীরকে খলনায়ক ও জমিদারপুত্র হাশেম আলিকে এই নাটকের নায়ক হিসেবে দাঁড় করানো যায়।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর অত্যন্ত ধূর্ত ও কূটকৌশলী চরিত্র। বৈষয়িক স্বার্থ বিবেচনায় তিনি জীবন ও জগৎকে দেখেন। সাধারণ ধর্মভীরু জনগোষ্ঠীর ভীতিকে কাজে লাগিয়ে ধর্মব্যাবসায় লিপ্ত তিনি। তার পেয়ারের মুরিদ একমাত্র কন্যা কিশোরী তাহেরাকে তার মতো পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধের হাতে তুলে দিতে চাইলে তিনি তা মেনে নেন। কিন্তু নারীজাগরণের প্রতীক তাহেরা এ অসম বয়সের বিয়ে মেনে নেয়নি। বিয়ের রাতে সে বাড়ি ছেড়ে পালালে বহিপীর তাকে খুঁজতে বের হন। তাহেরাকে পেতে তিনি নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন।

বহিপীর-হাশেম দ্বন্দ্বে জয়ী জমিদারপুত্র হাশেম। সে উচ্চশিক্ষিত, আধুনিকমনা, যুক্তিবাদী ও মানবিক চেতনাসম্পন্ন যুবক। তাহেরার সাথে বহিপীরের এ অসম বিয়ের কোনো অর্থ তার কাছে নেই। সে তাহেরাকে আত্মহত্যার হাত থেকে রক্ষা করে। বহিপীরের হাত থেকে তাহেরাকে বাঁচানোর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রতিজ্ঞায় সে অটল ছিল। কখনো কখনো অস্থির ও অশান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত বহিপীরের সব কূটচালকে সে শান্তভাবে মোকাবিলা করেছে। বহিপীরের শরিয়তি বিয়ের দোহাই, পুলিশের ভয়, এমনকি অসহায় বৃদ্ধ জমিদার বাবার সুখ কোনোকিছুই তাকে তার সংকল্প থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সে তাহেরাকে নিয়ে অনিশ্চিত অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছে। বহিপীরের সমস্ত কূটচালকে ভেস্তে দিয়ে জয়ী হয়েছে সে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি তার যুক্তিবাদী আধুনিক ও মানবিক চেতনা দ্বারা শান্তভাবে বহিপীরের সমস্ত কূটচালকে মোকাবিলা করেছে। এক্ষেত্রে কোনো সামাজিক ও পারিবারিক সংকট তাকে বিচলিত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত জয় তারই হয়েছে। তাহেরাকে সে বহিপীরের কবল থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলা যায় যে, আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।

উত্তরঃ

আশ্রয়দাতা হাতেম আলির জমিদারি বাঁচাতে বহিপীরের সাথে তাহেরার যাওয়া প্রসঙ্গো উক্তিটি করা হয়েছে।

তাহেরা সৎমায়ের সংসারে মানুষ। সৎমা এবং তার বাবা মিলে তাকে বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে বিয়ে দেয়। নিজের মত উপেক্ষা করে এমন অসম বয়সের বিয়ে মেনে নেয়নি তাহেরা। বিয়ের রাতে সে ঘর ছেড়ে পালায়। অসহায় তাহেরা জমিদারের বজরায় আশ্রয় পায়। শৈশব থেকে তাহেরা মায়ের স্নেহবঞ্চিত। তাই হাতেম আলির পরিবারকে সে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। বহিপীরের কোনো অনুরোধই তাহেরাকে দমাতে পারেনি। এমনকি এক্ষেত্রে পুলিশের ভয়ও কোনো, কাজে আসেনি। সে পানিতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত তবু বহিপীরের সাথে যাবে না। তাই বহিপীর কূট চক্রান্তের আশ্রয় নেন। তাহেরা বহিপীরের সাথে গেলে তিনি হাতেম আলিকে জমিদারি রক্ষার টাকা দিতে চান। চতুর বহিপীর ধারণা করে হাতেম আলির বিপদে তাহেরা এগিয়ে আসবে। হাতেম আলির বজরায় স্থান পেয়ে সে যে স্নেহমমতা পেয়েছে তার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সে হাতেম আলিকে রক্ষা করতে চাইবে। এ প্রসঙ্গেই বহিপীর হাতেম আলিকে বলেন যে, কৃতজ্ঞতার তেজ নেশার মতো ।

উত্তরঃ

"বহিপীর অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ধৈর্যশীল লোক।"- 'বহিপীর' নাটকের কাহিনি বিবেচনায় উক্তিটি যথার্থ। নিচে এ বিষয়ে 'বহিপীর' নাটক অবলম্বনে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলো-

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় ও নাম-চরিত্র বহিপীর। সুনামগঞ্জে তার বাড়ি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওয়াজ-নসিহত করেই তার দিন কাটে। তার প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছে চৌদ্দ বছর পূর্বে। তার এক খানদানি বংশের পেয়ারের মুরিদ তার কিশোরী কন্যা তাহেরাকে তার সঙ্গে বিয়ে দেয়। বহিপীর এতে অমত করেন না। কিন্তু বিয়ের রাতে সেই কিশোরী মেয়ে পালিয়ে যায়।

বহিপীর অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোক। তাই তাহেরা পালিয়ে যাওয়ার পর তাহেরার বাবা পুলিশে খবর দিতে চাইলেও বহিপীর তাতে সম্মতি দেন না। কেননা বৃদ্ধের সাথে কিশোরীর বিয়ে আইন দ্বারা স্বীকৃত নয় এবং এ বিয়েতে তাহেরার মতামত সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। ফলে পুলিশে জানালে হিতে-বিপরীত ঘটার আশঙ্কাই বেশি। তাই বহিপীর নিজে তাহেরাকে খুঁজতে রের হন।

বজরায় তাহেরার সংবাদ জানতেও বহিপীর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। হাতেম আলিকে তিনি গোপনে তাহেরার পরিচয় জেনে নিতে বলেছেন। তাহেরার তথ্য পেয়েও তিনি অধৈর্য হননি। শুধু খোদার শোকর আদায় করে চুপ থাকেন। তাহেরাকে তিনি ধর্মীয় শরিয়তের বিয়ের দোহাই দেন, পুলিশের ভয় দেখান কিন্তু কিছুতেই কিছু না হলে তিনি নতুন বুদ্ধি আঁটেন। জমিদার হাতেম আলিকে টাকা ধার দেওয়ার শর্তে তিনি তাহেরাকে ফিরে পেতে চান। বহিপীর বুঝতে পারেন আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশে তাহেরা বহিপীরের এই কূটচালকে অস্বীকার করতে পারবে না। হলোও তাই। তাহেরা বহিপীরের এই শর্তে সম্মত হতে বাধ্য হলো।

পুরো নাটকে বহিপীর অপরিসীম ধৈর্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাহেরাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সব চাল তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিচালনা করেছেন। তাহেরাকে তিনি কোনো প্রকার জোরজবরদস্তি করেননি। পুলিশ ডাকার ভয় দেখানো ছাড়া কোনো প্রকার ভীতির আশ্রয়ও গ্রহণ করেননি। বহিপীরের এই ভাবভঙ্গিমাকে হাশেম সপত্নীক আত্মীয়রাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সাথে তুলনা করেছে। বেড়াল যেমন শিকারকে থাবার নিচে পেয়ে না দেখার ভান করে, বহিপীরের স্বভাব ঠিক তেমনই। শেষ পর্যন্ত তাহেরা হাশেমের হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালেও বহিপীর কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেননি।

সুতরাং উপর্যুক্ত দৃষ্টান্ত থেকে এই, সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, 'বহিপীর' নাটকের বহিপীর চরিত্রটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুদ্ধি ও ধৈর্যের ওপর অটুট ছিল। কোনো প্রকার অস্থিরতা, প্রতিহিংসামূলক কাজে তিনি জড়িত হননি। তাই বলা যায় যে, বহিপীর অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ধৈর্যশীল লোক।

উত্তরঃ

বহিপীর বইয়ের ভাষায় কথা বলতেন বলে তার নাম হয়ে যায়-বহিপীর।

'বহিপীর' নাটকের মূল চরিত্র বহিপীর। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। সারা বছর সেসব মুরিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্মোপদেশ দেন। মুরিদরাও তার সেবায় সর্বস্ব উজাড় করে দেয়। একেক অঞ্চলে একেক ভাষা প্রচলিত হওয়ায় কোনো একটি নির্দিস্ট ভাষা ব্যবহার করা তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। কেননা এক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা অপর অঞ্চলে বোধগম্য নয়। বহিপীরের একার পক্ষে সব অঞ্চলের ভাষা রপ্ত করাটাও অসম্ভব। তাই বহিপীর বইয়ের ভাষায় কথা বলেন। তাছাড়া কথ্যভাষাকে বহিপীর মাঠ-ঘাটের ভাষা মনে করেন। তিনি মনে করেন স্রষ্টার বাণী বহন করার সক্ষমতা নেই সেই ভাষার। ফলে বহিপীর বইয়ের ভাষায় কথাবার্তা বলেন ও ধর্মোপদেশ দান করেন। বইয়ের ভাষায় কথা বলায় মানুষজন তাকে বইয়ের ভাষায় কথা বলা পির এবং এর সংক্ষেপে বহিপীর বলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এটিই তার নামে পরিণত হয়।

উত্তরঃ

"খোদেজা ধর্মান্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীসমাজের প্রতিনিধি।"-'বহিপীর' নাটকের খোদেজা চরিত্রের আলোকে আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।

'বহিপীর' নাটকের খোদেজা জমিদার হাতেম আলির পত্নী। নাটকের শুরুতে খোদেজা মানবদরদি নারী। অসহায়, তাহেরাকে দেখে মায়ার বশবর্তী হয়ে তাকে তিনি বজরায় তুলে নেন। কিন্তু খোদেজা সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারী। তাই তিনি তাহেরার ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসাকে সায় দেন না। তাহেরাকে তিনি এ বিষয় নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। নারী হিসেবে এমন দুঃসাহসের কাজ অনুচিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। খোদেজা যুক্তহীন নারী। কুসংস্কারাচ্ছন্নতা তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সাথে কিশোরী তাহেরার অসম বিয়েকে তিনি সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করেন। তার মতে, পিরের সংস্পর্শে থাকা সৌভাগ্যের।

খোদেজা নারী স্বাধীনতার বিরোধী। চার দেওয়ালের মাঝে নারীর সৌন্দর্যকেই তিনি দেখতে পছন্দ করেন। তাহেরার অধিকার সচেতন মানসিকতা তাকে বিরক্ত করে। তিনি বহিপীরের আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী। তাহেরা তাকে পিরের কাছ থেকে পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করলে তা তিনি শোনেন না। তার বিশ্বাস, তাহেরার কথা না বললেও বহিপীর আধ্যাত্মিক শক্তির বলে জেনে যাবেন। তখন পিরের কাছে সত্য লুকানোর দায়ে তার ও তার পরিবারের ক্ষতি হবে। পুত্র হাশেম তাহেরাকে বাঁচাতে চাইলে খোদেজা ছেলেকে শাসন করেন।

বহিপীরের অভিশাপ বা বদদোয়াকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন খোদেজা ভয় করেন। রীতিমতো এই বদদোয়া তাকে আতঙ্কগ্রস্ত রাখেন। তিনি মনে করেন হাশেম তাহেরাকে বাঁচালে বহিপীরের বদদোয়া লাগবে হাশেমের জীবনে। বহিপীর ও হাশেম তাহেরার প্রশ্নে মুখোমুখি অবস্থান করলে সন্তানের পক্ষ ছেড়ে তিনি পিরের পক্ষ নেন পিরের বদদোয়ার ভয়ে।

সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকের খোদেজা চরিত্রটি সর্বপ্রকার আধুনিক চিন্তা-চেতনার স্পর্শবিবর্জিত। শৃঙ্খলমুক্ত ভাবনা তিনি ভাবতে পারেন না; অন্যরা ভাবলে তার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন তিনি। ধর্মীয় গোঁড়ামি, ভীতি, কুসংস্কার তার চরিত্রের কতকগুলো প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই বলা যায় যে, খোদেজা ধর্মান্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীসমাজের প্রতিনিধি।

উত্তরঃ

"আমি যেন কোরবানির বকরি"- উক্তিটি 'বহিপীর' নাটকের তাহেরা চরিত্রের।

'বহিপীর নাটকের আধুনিক নারীজাগরণের প্রতীক চরিত্র তাহেরা। সে মা-মরা মেয়ে। তার বাবা ও সৎমা তাকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সাথে বিয়ে দেয়। কিশোরী মেয়ের অমতে বৃদ্ধ লোকের সাথে বিয়ে দেওয়া কোনো দিক বিবেচনাতেই যুক্তিসংগত নয়। জীবজন্তুকে কোরবানি করার সময় যেমন তাদের অনুমতি জানার প্রয়োজন মনে করে না এসবের মালিক, তেমনই যেন তাহেরাকেও বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তার কোনোরূপ মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি তার বাবা-মা। নিজের অধিকার হারিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তাহেরা। বিয়ের দিন পালিয়ে যায় সে। জমিদারপত্নীর দয়ায় আশ্রয় নেয় হাতেম আলির জমিদারি বজরায়। ঘটনাচক্রে বহিপীরও সেই বজরায় উপস্থিত হন এবং তাহেরার কথা জানতে পারেন। তিনি তাহেরাকে জোরপূর্বক তার সাথে নিয়ে যেতে চান। তখন তাহেরা জানায় যে; তার সৎ-মা আর বাবা পিরকে খুশি করার জন্য এই বিয়ে দিয়েছে। তাকে কোরবানির বকরির মতো মনে করে তারা এ কাজ করেছে। কিন্তু সে মানুষ। এবার পুলিশ ডাকলে, বাবাকে ডাকলে কিংবা জুলুম করলেও সে তার সাথে যাবে না।

উত্তরঃ

"বহিপীরের ধর্মান্ধ মনোভাব শেষ পর্যন্ত মানবিকতায় বিকশিত হয়েছে।"- 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ ও বহিপীর চরিত্রের পরিণতি বিচারে মন্তব্যটি যথার্থ।

'বহিপীর' নাটকের নাম-চরিত্র বহিপীর। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। সারা বছর বহিপীর মুরিদদের বাড়ি বাড়ি যান, ওয়াজ-নসিহত করেন। মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে পিরের সেবা করে। বহিপীর বিপত্নীক। তার প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন চৌদ্দ বছর আগে। পির-মুরিদি করতে গিয়ে নিজের সেবার কথা চৌদ্দ বছর ভুলে থাকেন। চৌদ্দ বছর পরে এক পেয়ারের মুরিদের অনুরোধে তার স্ত্রীসেবা পাওয়ার বাসনা জাগে। মুরিদ তার কিশোরী কন্যাকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সেবায় অর্পণ করে। কিন্তু বিয়ের রাতে তার কন্যা পালিয়ে যায়। পুলিশে গেলে ঝামেলা বাড়ার ভয়ে বহিপীর নিজেই স্ত্রীর খোঁজে বের হন।

তাহেরাকে পাওয়ার জন্য বহিপীর নানাবিধ কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। গোপনে বজরায় আশ্রয় নেওয়া মেয়েটি তাহেরা কি-না তা জানার ছক কষেন। তাহেরার পরিচয় স্পষ্ট হলে বহিপীর শিকার হাতে পাওয়া শিকারি বেড়ালের মতো ভান করেন। তাহেরার পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাখ্যানকে তিনি গায়ে মাখেন না। তিনি তাকে ধর্মীয় শরিয়ত মেনে বিয়ের দোহাই দেন। তাহেরা এ বিয়েকে অস্বীকার করে। কেননা এতে তার মত ছিল না। বহিপীর জানান তার মত না থাকলেও তার বাবার মত ছিল। এরপর তিনি হকিকুল্লাহকে পুলিশ ডাকতে বলে তাহেরাকে 'ভয় দেখান। শেষ পর্যন্ত হাতেম আলির জমিদারি নিলামে ওঠার উপক্রম হলে তিনি এই সুযোগটি গ্রহণ করেন। তিনি হাতেম আলিকে তার সাথে তাহেরাকে যাওয়ার শর্তে টাকা ধার দিতে চান। তাহেরা এই শর্তকে মেনে নেন। কিন্তু জমিদার হাতেম আলি এমন অমানবিক শর্তে টাকা ধার নিতে রাজি হন না। জমিদারপুত্র তাহেরাকে বহিপীরের হাত থেকে বাঁচাতে তাকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে চলে যায়। বহিপীরের এই ব্যর্থতাই যেন তাকে মানবিক করে তোলে। শেষ পর্যন্ত তিনি বিনা শর্তে টাকা ধার দিয়ে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষায় অংশ নেন।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, একের পর এক অমানবিক ছক কষা বহিপীর শেষ পর্যন্ত তাহেরা ও হাশেম আলির বন্ধনকে মেনে নেন। মানবিক বোধে উদ্‌বুদ্ধ হয়ে অসহায় জমিদারকে জমিদারি হারানোর হাত থেকে রক্ষা করেন। তাই বলা যায় যে, বহিপীরের ধর্মান্ধ মনোভাব শেষ পর্যন্ত মানবিকতায় বিকশিত হয়েছে।

উত্তরঃ

হাতেম আলির পরিবারের কাছে জীবনে অপ্রাপ্য স্নেহ-ভালোবাসা পাওয়ায় পালিয়ে আসার পরও তাহেরার চিন্তা-ভাবনা নেই।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তাহেরা। সে দুঃসাহসী, স্বাধীনচেতা নারী। তার মা নেই। সৎমায়ের ঘরেই সে মানুষ। বলতে গেলে শিশুকাল থেকেই সে স্নেহ-মমতাবঞ্চিত। পরিবার তার কাছে কখনো স্বাভাবিক মানুষের পরিবার হয়ে ওঠেনি। সৎমা আর বাবা বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে তার বিয়ে দেয়। সারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এমন সিদ্ধান্তে তার পরিবার তার মতামতটুকু নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। নিজের অমতে এমন বিয়েকে সে মানে না। তাই সে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী তাকে তার অসহায় অবস্থায় বজরায় তুলে নেন। জমিদার পরিবারের মধ্যে সে তার অপ্রাপ্য পারিবারিক স্বপ্ন-প্রত্যাশাকে বাস্তবে পায়। তাহেরার নিজের পরিবার যেখানে নরকযন্ত্রণার মতো তাকে যন্ত্রণা দিত, সেখানে হাতেম আলির পরিবার তাকে মায়া-মমতার বন্ধন শিখিয়েছে। তাই পালিয়ে আসার পরও তাহেরার চিন্তা-ভাবনা নেই। অন্তত পূর্বতন পরিবার থেকে জমিদারের এই পরিবারে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেয়েছে সে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের তাহেরার চরিত্রটি একই সাথে স্বাধীনচেতা, আধুনিক, অধিকার সচেতন, অনমনীয় ও মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত নারীর প্রতীক।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তাহেরা। তাকে কেন্দ্র করেই নাটকের ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে। এমনকি নায়ক চরিত্র হাশেম আলি ও খলনায়ক চরিত্র বহিপীরের মধ্যকার চূড়ান্ত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু তাহেরা। তাই এই চরিত্রটি সবচেয়ে গুরুত্ববহ চরিত্র।

তাহেরা বিশ শতকের আধুনিক নারী স্বাধীনতা ও জাগরণের প্রতীক। সমাজের প্রচলিত প্রতিবন্ধকতাকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। অধিকারের প্রশ্নে পরিবার-পরিজনকে ত্যাগ করতেও দ্বিধান্বিত হয়নি। তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তার চরিত্রকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল করে তুলেছে।

বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিজের মতামতকে উপেক্ষা করায় সে সংসার ত্যাগ করেছে। অনিশ্চিত অজানার পথে পা বাড়াতে সে-দ্বিতীয়বার ভাবেনি। বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে মতামত না নিয়ে বিয়েকে সে বলিষ্ঠ কণ্ঠে অস্বীকার করেছে। শরিয়তি বিয়ের অজুহাত, বৃদ্ধের প্রতি সহানুভূতি, পুলিশের ভয় কোনোকিছুই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি। প্রয়োজনে সে আত্মহত্যা করবে, তবু বহিপীরের সাথে যাবে না।

তবে আশ্রয়দাতা হাতেম আলির অসহায় মুখচ্ছবি তাকে বিচলিত করেছে। আশ্রয়দাতার উপকারে লাগার কৃতজ্ঞতাবোধ তার চরিত্রকে মানবিক করে তুলেছে। জমিদারি রক্ষার টাকা পাওয়ার বিনিময়ে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন শর্তকে মেনে নিয়ে সে বহিপীরের সাথে ফিরে যেতে রাজি হয়েছে।

বিশ শতকের নারীজাগরণের সব গুণ তাহেরার মাঝে ফুটিয়ে তুলেছেন নাট্যকার। সে অনমনীয়, কিন্তু অমানবিক নয়; সে স্বাধীনচেতা, কিন্তু অবিবেচক নয়। সে আধুনিক, ঐশ্বর্যময়ী, অবিচল নারীসত্তার ধারক। ব্যক্তিত্বের গুণে সে মহিমান্বিত হয়েছে। কৃতজ্ঞতাবোধকে সে খাটো করে দেখেনি। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে একচুল ছাড় না দেওয়া তাহেরা জমিদারি বাঁচাতে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন শর্তে নিজেকে বলি দিতে প্রস্তুত। দুঃসাহসের সাথে সে সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেছে; ঘরবাড়ি ছেড়ে নিজেকে চালিয়েছে নিজের মতো। জীবন কীভাবে চলবে, সামনে কোন কঠিন মুহূর্ত অপেক্ষা করছে সেই ভাবনায় কখনোই বিচলিত নয় সে। নিজের স্বাধীনতা, স্বকীয়তাকে তাহেরা রেখেছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। হাশেমের সাথে অচেনা-অজানা-অনিশ্চিতের পথে যেতেও সে ভাবিত নয়।

উত্তরঃ

"এই পিরসাহেব আপনার পিরসাহেব নন তো?"- উক্তিটি 'বহিপীর' নাটকের জমিদারপুত্র হাশেম আলির।

'বহিপীর' নাটকটি বহিপীর নামক এক ধূর্ত পিরকে কেন্দ্র করে রচিত। বহিপীর সারা বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মুরিদদের বাড়ি যান। মুরিদরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে পিরের সেবা করে। একবার তার পেয়ারের এক মুরিদ তার কিশোরী কন্যা তাহেরাকে তার সাথে বিয়ে দেয়। তাহেরা পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ পিরের সাথে নিজের মতামত উপেক্ষা করা এ বিয়ে মেনে নেয় না। তাই সে বাড়ি ছেড়ে পালায়। ডেমরার ঘাটে তাকে অসহায় অবস্থায় দেখে জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী দয়াবশত তাকে বজরায় আশ্রয় দেন। ওদিকে তাহেরাকে না পেয়ে তার বাবা ও সৎমা পুলিশে জানানোর কথা বললে চতুর বহিপীর তা নিষেধ করেন। কেননা কনের অমতে বিয়ে আইনসিদ্ধ নয়। তাই তিনি নিজেই তাহেরাকে খুঁজতে বের হন। দুর্ভাগ্যবশত কালবৈশাখি ঝড়ের কবলে পড়ে বহিপীরের ডিঙি নৌকা ও জমিদারের বজরায় ধাক্কা লাগে। অবশেষে পিরসাহেব একই বজরায় আশ্রয় নেন। বজরায় ঝড়ের কবলে একজন পির আসায় জমিদারপুত্র হাশেম তাহেরাকে জিজ্ঞেস করে এই পিরই তাহেরাকে বিয়ে করা বহিপীর কি না।

উত্তরঃ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বদলি হওয়ায় তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখার সুযোগ পান। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের পিরপ্রথার স্বরূপ শৈশবেই তার নজরে আসে। বহিপীর সেই ঘরানার একজন পির। বহিপীর নাটকের কেন্দ্রীয় ও নাম-চরিত্র তিনি। কিন্তু বহিপীরের মাঝে পিরসুলভ ভণ্ডামি স্থান পায়নি। তাহেরাকে ফিরে পেতে তিনি কূটচক্রান্তের আশ্রয় নিলেও কোনো আধ্যাত্মিক শক্তি বা জাদুবিদ্যার আশ্রয় নেননি। তাছাড়া শেষে হাশেম-তাহেরার অজানার উদ্দেশ্যে চলে যাওয়াকে বহিপীর মেনে নিয়েছেন এবং বিনা শর্তে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন, যা চরিত্রটিকে মানবিক করে তুলেছে। ফলে বহিপীর চরিত্র পির সম্প্রদায়ের হলেও ওয়ালীউল্লাহ তাকে আধুনিক মানুষের স্বরূপে নির্মাণ করেছেন।

জমিদারপুত্র হাশেম আলি আগাগোড়া আধুনিক মানুষ। সে উচ্চশিক্ষিত, যুক্তিবাদী, মানবিক চেতনাসম্পন্ন। বহিপীরের সাথে তাহেরার বিয়েকে সে যৌক্তিক মনে করে না। অসহায় তাহেরাকে বাঁচানোর প্রতিজ্ঞায় সে অনড় থেকেছে শেষ অবধি। তাই এই চরিত্রটিও আধুনিক মানুষে পরিণত হয়েছে ওয়ালীউল্লাহর হাতে।

তাহেরা যুক্তিবাদী, স্বাধীনচেতা, অধিকার সচেতন, আধুনিক নারীজাগরণের প্রতীক চরিত্র। তাহেরা তার সিদ্ধান্তে অনমনীয় কিন্তু কৃতজ্ঞতাবোধ চরিত্রটিকে মানবিক করে তুলেছে। নিজের অমতের বিয়ের বিরুদ্ধে সে প্রতিবাদী। বহিপীরের সাথে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে সে অটল ছিল। অথচ আশ্রয়দাতার উপকারে আসার প্রশ্নে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন শর্তকে সে মেনে নিয়ে মানবিকতার পরিচয় - দিয়েছে। অনমনীয় তাহেরাকে নাট্যকার ওয়ালীউল্লাহ মানবিক করার মধ্য দিয়ে আধুনিক নারীতে পরিণত করে তুলেছেন।

আত্মনিমগ্ন, স্থিতধী, মানবিক গুণে উত্তীর্ণ আরেক চরিত্র জমিদার হাতেম আলি। পৈতৃক জমিদারি হারানোর সংশয়ে তিনি দিশেহারা হয়ে বহিপীরের অমানবিক শর্তের কথা তাহেরাকে বলেন। শেষ পর্যন্ত তাহেরা রাজি হলেও বহিপীরের অমানবিক শর্তকে প্রত্যাখ্যান করেন জমিদার হাতেম আলি। ওয়ালীউল্লাহ হাতেম আলির কাছে সম্মান ও সম্পদের চেয়ে মানবিকতাকে বড় করে তুলে আধুনিকতার স্পর্শ পাইয়ে দিয়েছেন।

তাই বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর আধুনিক মানসিকতার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে।

উত্তরঃ

"মাঝখান থেকে আমরা কিছু সওয়াব পাই"- উক্তিটি দ্বারা কুসংস্কারাচ্ছন্ন খোদেজার ধর্মান্ধ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ তাহেরাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিশোরী এই নারীর সাথে পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের বিয়ে দেয় তার বাবা ও সৎমা। এই বিয়েতে তাহেরার মত সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। তাই অধিকার সচেতন, স্বাধীনচেতা তাহেরা বিয়ের রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। তার অসহায়ত্ব দেখে জমিদারপত্নী খোদেজা তাকে বজরায় তুলে নেন। খোদেজা কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আধুনিকতার স্পর্শবিবর্জিত। সামাজিক শৃঙ্খলার বাইরে তিনি কোনোকিছু চিন্তা করতে পারেন না। পিরের সাথে তাহেরার বিয়েকে তিনি সৌভাগ্য মনে করেন। তাহেরা তাকে তার পরিচয় বহিপীরের কাছে গোপন করতে বললে পিরের আধ্যাত্মিক শক্তির ভয়ে তিনি পিরের কাছে সব বলে দেন। তাহেরাকে তিনি বহিপীরের সাথে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে চান। বহিপীরের সাথে তাহেরার এ বজরায় মিলন হলে খোদার সুদৃষ্টি পড়বে বলে তার বিশ্বাস। বহিপীরের হাতে তাহেরাকে তুলে দেওয়াকে খোদেজা সওয়াবের কাজ মনে করেন। বহিপীর খুশি হলে তারা অনেক সওয়াব পাবেন বলেও বিশ্বাস কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মান্ধ এ নারীর।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের সবচেয়ে সহানুভূতিশীল ও মানবিক চরিত্র হাশেম। 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ ও হাশেম আলি চরিত্রের অবিচল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য মন্তব্যটি যথাযথ।

'বহিপীর' নাটকের বহিপীর, তাহেরা ও হাতেম আলি চরিত্র শেষ পর্যন্ত মানবিক চেতনায় উত্তীর্ণ হলেও হাশেম আলি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানবিক চেতনায় অটুট। অন্যান্য চরিত্রের সাপেক্ষে তাই এই চরিত্রটিকে সহানুভূতিশীলতা ও মানবিকতার সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বলা যেতে পারে।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় তথা নাম-চরিত্র বহিপীর শুরু থেকেই অত্যন্ত ধূর্ত ও কূটকৌশলী। তাহেরাকে উদ্ধার করার জন্য তিনি পুলিশের আশ্রয় ত্যাগ করেছেন। কেননা তাদের এই অসম বিয়ের আইনি বৈধতা নেই। ফলে 'হিতে-বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। তাহেরাকে তিনি শরিয়তি বিয়ের দোহাই দেন, পুলিশের ভয় দেখান এবং সবশেষে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষায় অর্থ সহায়তার বিনিময়ে তাহেরাকে পেতে চান। কিন্তু সব কৌশল ব্যর্থ হলে তিনি মানবিকতায় উত্তীর্ণ হয়।

তাহেরা চরিত্রটি প্রথম থেকেই স্বাধীনচেতা ও অনমনীয়। সে অসম বিয়ে না মেনে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াতেও দ্বিধান্বিত হয়নি। বহিপীরের শরিয়তি বিয়ের দোহাই, পুলিশের ভয় তাকে নমনীয় করতে পারেনি। কিন্তু আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রশ্নে তাহেরা মানবিক হয়ে উঠেছে।

হাতেম আলি চরিত্রটি প্রথম দিক থেকেই আত্মনিমগ্ন। জমিদারি রক্ষার শেষ ভরসা বন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে অর্থ সহায়তা না পেয়ে তিনি দিশেহারা। তাই বহিপীরের অমানবিক প্রশ্নে প্রথমে সায় দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এই শর্ত থেকে বেরিয়ে আসেন। এমন অমানবিক শর্তে টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে হাতেম আলি চরিত্রটি মানবিক চেতনায় উত্তীর্ণ হয়।

'বহিপীর' নাটকের একমাত্র চরিত্র হাশেম আলি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। সে শিক্ষিত, আধুনিক, যুক্তিবাদী তরুণ। শিক্ষা কেবল তার বাহ্যিক দিক হয়ে ওঠেনি, এটি তার মনুষ্যত্বেও ভূমিকা রেখেছে। তাহেরা ও বহিপীরের বিয়ে সামাজিক ধর্মীয় মতে স্বীকৃতি পেলেও হাশেম আলির কাছে এ বিয়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেননা এ বিয়েতে তাহেরার মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। হাশেম তাহেরাকে অসহায় অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য প্রথম থেকেই সোচ্চার হয়েছে। সে তাকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচায়। মাকে স্পষ্ট বলে দেয়, সে তাহেরাকে বিয়ে করে হলেও বাঁচাবে। বজরার সবাই তাহেরার বিপক্ষে চলে গেলেও
একমাত্র হাশেম শেষ পর্যন্ত তাহেরার পক্ষে অবিচল থেকেছে। শেষে তাহেরাকে নিয়ে পা বাড়িয়েছে অনিশ্চিত অজানার উদ্দেশ্যে।

সুতরাং দেখা যায় যে, হাশেম আলি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানবিক চেতনায় ও সহানুভূতিতে অটুট ছিল। তাই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, হাশেম 'বহিপীর' নাটকের সবচেয়ে সহানুভূতিশীল ও মানবিক চরিত্র।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। ধর্মান্ধ সাধারণ মানুষের কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধিই তার একমাত্র উদ্দেশ্য। শহরে অবস্থিত ধনী মুরিদরা তাকে জমিদারি রক্ষার মতো মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করতেও দ্বিধা করে না। তিনি তাঁর পেয়ারের মুরিদের কিশোরী কন্যাকে বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রী মারা যায় চৌদ্দ বছর আগে। তাই বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্ব কাটানোর বাহানায় তিনি কিশোরী তাহেরাকে বিয়েতে মত দেন। কিন্তু বিয়ের রাতে তাহেরা পালিয়ে যায়। তাহেরার বাবা-মা পুলিশে খবর রাতে চাইলেও বহিপীর তাতে মত দেন না। কেননা তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তিনি নিজেই তার সহকারী হকিকুল্লাহকে নিয়ে তাহেরাকে খুঁজতে বের হন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীপথ ছাড়া সেই সময়ে ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল না। তাই বহিপীর নৌকা ভাড়া করে তাহেরার খোঁজে রওয়ানা দেন। পথে কালবৈশাখি ঝড় উঠলে বহিপীরের নৌকা ছোট খালে ঢোকে ঝড়ের কবল থেকে বাঁচতে। তখন জমিদার হাতিম আলির বজরার সাথে নৌকার ধাক্কা লাগলে নৌকা আধডোবা হয়ে পড়ে। জমিদার বহিপীরকে তার বজরায় তুলে আশ্রয় দেন।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে বহিপীরের জবানে বাংলার সাধারণ জনগোষ্ঠীর ভেতর জেঁকে বসা পিরপ্রথার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। এই নাটকে নাট্যকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলার সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে ধর্মান্ধতার কারণে সৃষ্ট পিরপ্রথার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।

'বহিপীর' নাটকের নাম-চরিত্র বহিপীর ধর্মকে আশ্রয় করে সৃষ্ট পিরপ্রথার অন্যন দৃষ্টান্ত। ধর্মকে আশ্রয় করেই তার জীবিকা চলমান। এমনকি জমিদার হাতেম আলির চেয়ে অর্থনৈতিক-সামাজিক মর্যাদায় তার স্থান উচ্চে। বহিপীরের বাড়ি সুনামগঞ্জে। সাধারণ মানুষের চেয়ে নিজের মর্যাদা উন্নত রাখার জন্য তিনি জনসাধারণের ভাষা ব্যবহার করেন না। বইয়ের ভাষায় ওয়াজ-নসিহত ও কথাবার্তা বলেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদান রয়েছে। বছর-দুবছরে তিনি একবার মুরিদের বাড়িতে গমন করেন। অশিক্ষিত ধর্মভীরু মুরিদরা সর্বস্ব উজাড় করে তার সেবা করে। বহিপীর কোনো অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত নন। অথচ তার লেবাস, চলাচলে কোনো দারিদ্র্যের ছাপ নেই। বহিপীরের চাওয়ামাত্র মুরিদানরা অসম্ভব বস্তুকেও পিরের সামনে হাজির করতে কসুর করবে না। বহিপীর উল্লেখ করেছেন, তিনি চাইলেই অনেক ধনসম্পদের মালিক বনে যেতে পারেন। খোদা তাকে এমন মুরিদান দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তা চান না। কেননা তার অর্থসম্পদের প্রতি লোভ নেই। বহিপীর নিঃসন্তান। তার প্রথম স্ত্রী চৌদ্দ বছর আগে মারা গেছেন। ফলে বৃদ্ধ বয়সে তাহেরাকে বিয়ে করার প্রস্তাবে তিনি অমত করেন না। তাহেরা বিয়ের রাতে পালিয়ে গেলে তাকে পাওয়ার জন্য তিনি নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। ধর্মভীরু খোদেজা পির সম্প্রদায়ের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিকারী চরিত্র। এক অর্থে তৎকালীন সরল ধর্মভীরু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি খোদেজা। তিনি বহিপীরের বদদোয়াকে ভয় করেন। তিনি মনে করে বহিপীর আধ্যাত্মিক বলে সব অজানাকে জেনে ফেলতে পারেন। তাই বহিপীর ও নিজ পুত্রের মুখোমুখি অবস্থানে খোদেজা বহিপীরের বদদোয়ার ভয়ে বহিপীরের পথে অষস্থান করেন।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, 'বহিপীর' নাটকে নাট্যকার অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তৎকালীন সমাজে জেঁকে বসা পিরপ্রথা ও জনসাধারণের মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন।

উত্তরঃ

বছরের নির্ধারিত দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে বাৎসরিক খাজনা পরিশোধসংক্রান্ত আইনকে সূর্যাস্ত আইন বলে।

১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু' করেন। এর ফলে জমিদারগণ তাদের অধীনস্ত ভূমির স্থায়ী মালিক বনে যান। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অনেকগুলো ধারার মধ্যে একটি ধারা হলো সূর্যাস্ত আইন তথা সান্ধ্য আইন। এই ধারার বলা হয়েছে, জমিদারগণ বছরের একটি নির্দিষ্ট দিন সূর্যাস্তের পূর্বে বাৎসরিক খাজনা পরিশোধ করতে বাধিত থাকবেন। নির্দিষ্ট দিন সূর্যাস্তের পূর্বে খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে জমিদার তার জমিদারি হারাবেন। তখন তার নির্ধারিত জমিদারি নিলামে তুলে নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ খাজনা হিসেবে পরিগণিত হবে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমি জমিদারগণের স্থায়ী সম্পদে পরিণত হয়। আবার খাজনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ জমিদাররা হয় সর্বস্বান্ত।

উত্তরঃ

"একটি স্বপ্ন ভেঙে গেলে আরেকটি স্বপ্ন গড়ার মানসিকতাই হাশেম আলিকে আধুনিক মানুষে পরিণত করেছে।" 'বহিপীর' নাটাকের ঘটনাপ্রবাহ ও হাশেম আলির দৃঢ় স্বভাব বিচারে আলোচ্য মন্তব্যটি যুক্তিযুক্ত।

'বহিপীর' নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র জমিদার হাতেম আলির ছেলে হাশেম আলি। হাশেম উচ্চশিক্ষিত। সে বিএ পাশ করেছে। জমিদারপুত্র হয়েও বাবার জমিদারির প্রতি তার কিঞ্চিৎ আকর্ষণ নেই তার। শুরু থেকেই সে স্বাধীনচেতা, মানবিক চিন্তা-চেতনাসম্পন্ন, আধুনিক মানুষ। বৈষয়িক চিন্তা তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। নাটকে তাকে অস্থিরচিত্ত বলা হয়েছে। কিন্তু সে নিজের সিদ্ধান্তে শুরু থেকে শেষ অবধি স্থির থেকেছে। ব‍্যাবসা করে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় সে। তাই সে ছাপাখানার ব্যাবসা করতে চায়। নিজের ও এলাকার তরুণ যুবকদের আর্থিক সচ্ছলতার দিক বিবেচনায় তার এই উদ্যোগ প্রশংসিত। বহিপীরের সাথে তাহেরার অসম বয়সের বিয়েকে সে মানে না। তাই অসহায় তাহেরাকে সে বহিপীরের কবল থেকে রক্ষা করতে চায়। শেষ পর্যন্ত সে তাহেরাকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে।

হাশেম আলির চরিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অভিযোজন দক্ষতা। বাবার জমিদারি হারানোর দুশ্চিন্তায় সে কাতর হয়েছে। জমিদারি অর্থসম্পদের বিবেচনা করে নয়, তার বাবার বয়স বিবেচনায় সম্মানহানির কথা, সে বিবেচনা করে। হাশেম অকপটে স্বীকার করেছে প্রেসের ব্যাবসা না দিতে পারলেও তাতে তার কোনো আক্ষেপ নেই। সে শিক্ষিত যুবক। কোনো না কোনো কাজ সে. বুঝে নিতে পারবে। তার কাছে কাজের ক্ষেত্রে ছোট-বড় প্রভেদ নেই। সব পেশাকেই সে সম্মানের চোখে দেখে। এই বোধ হাশেম আলিকে আধুনিক জীবনভাবনার নতুন, কারিগরে পরিণত করেছে। সে স্বপ্ন ভেঙে গড়তে জানা আধুনিক জীবনদর্শনের প্রতিভূ চরিত্র। তাই বলা যায় যে, একটি স্বপ্ন ভেঙে গেলে আরেকটি স্বপ্ন গড়ার মানসিকতাই হাশেম চরিত্রটিকে আধুনিক মানুষে পরিণত করেছে।

উত্তরঃ

বহিপীরের অমানবিক শর্ত প্রত্যাখ্যান করে হাতেম আলি মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আত্মিক মুক্তি পেয়েছেন, যেটাকে তিনি নতুন জীবনের স্বাদ পাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন।

'বহিপীর' নাটকে হাতেম আলি-রেশমপুরের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। কিন্তু সান্ধ্য আইনে সেই জমিদারিও নিলামে ওঠার উপক্রম। এ কারণে তিনি তার জমিদারি রক্ষার জন্য শহরে থাকা তার বাল্যবন্ধুর কাছে অর্থ সাহায্যের উদ্দেশ্যে যান। হাতেম আলি জমিদারি নিলামে ওঠার ব্যাপারটি স্ত্রী-সন্তানের কাছ থেকে গোপন রাখেন। কিন্তু বন্ধু আনোয়ারউদ্দিন তাকে নিরাশ করলে ঘটনাটি তিনি প্রকাশ না করে পারেন না। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তখন বহিপীর ধূর্ততার আশ্রয় নিয়ে তাকে এক অমানবিক শর্তে জমিদারি রক্ষার টাকা ধার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। শর্তটি হলো, টাকা ধার দেওয়ার জন্য তাহেরা বিবিকে তার সাথে ফিরে যেতে হবে। প্রথমে মানবিক বিপর্যস্ততার জন্য বহিপীরের এই শর্তে মৌনসম্মতি জানালেও পরক্ষণেই তার ভুল ভাঙে। জমিদার তৎক্ষণাৎ এই শর্তে টাকা ধার নিতে অস্বীকৃতি জানান। মানবতার জয় হয়। তাই মানবিতায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে হাতেম আলি নতুন এক জীবনের স্বাদ পান।

উত্তরঃ

"অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়।"-উক্তিটির যেন তাহেরা চরিত্রের প্রতিবাদী দিকটির প্রকাশক হয়ে উঠেছে।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র তাহেরা। মাতৃহারা মেয়ে তাহেরাকে তার বাবা তার সৎমায়ের কুপরামর্শে তাদের পির সাহেব বহিপীরের সাথে বিয়ে দেয়। বিয়েতে তাহেরার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন তারা মনে করেনি। বহিপীর পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স্ক। তার প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন চৌদ্দ বছর পূর্বে। তাছাড়া তাদের কোনো সন্তান ছিল না। এমন পাত্রের সাথে কিশোরী কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে কূটচক্রান্তের সর্বনিম্ন ও জঘন্যতম পর্যায়। তাই বিয়ের রাতে কিশোরী তাহেরা ঘর ছেড়ে পালিয়ে অনিশ্চিতের পথ বেছে নেয়।

'বহিপীর' নাটকের তাহেরা চরিত্রটি দুঃসাহসিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি শোষণ ও বঞ্চনার যে ইতিহাস পাওয়া যায়, তার প্রথম প্রতিবাদ সূচিত হয়েছে তাহেরা চরিত্রটি দ্বারা। পাশাপাশি বিশ শতকের শুরুতের সামাজিক পরিমণ্ডলে বেগম রোকেয়া, ফয়জুন্নেসা, ফজিলাতুন্নেসা ও পরবর্তীকালে সুফিয়া কামাল, মাহমুদা খাতুনদের দ্বারা নারীজাগরণের যে সূত্রপাত ঘটে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তাহেরা চরিত্রটি। তার বিরুদ্ধে ঘটতে যাওয়া সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছে। সে বহিপীরকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ওই বিয়েতে তার মত ছিল না, সে মত দেয়নি। তাই ওই বিয়ে সে মানে না। বহিপীরের 'বিবি' বলাতেও সে বারবার প্রতিবাদ করেছে। তাহেরা বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল। প্রয়োজনে সে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন দিতেও প্রস্তুত, তবু সে বহিপীরের সাথে যাবে না। কেননা বহিপীরের সাথে যাওয়ার মানে তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়া। এক্ষেত্রে পুলিশের ভয়, শরিয়তি বিয়ের দোহাই কিংবা মানবতার প্রশ্ন কোনো কিছুই তাকে তার অবিচল অবস্থা থেকে সরাতে পারেনি। সে স্বাধীন ব্যক্তিত্বে বলীয়ান। সে বুঝে গেছে অধিকার কেউ কউকে অতি সহজে দিয়ে দেয় না, সেটা নিজ প্রচেষ্টায় আদায় করে নিতে হয়।

সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনায় তাহেরার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বলা যায় যে, বিশ শতকের পরিমণ্ডলে তাহেরা একটি প্রতিবাদী চরিত্র।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের প্রধান চরিত্রের একটি তাহেরা। সে মা-মরা কিশোরী। শিশুকাল থেকে সৎমায়ের সংসারেই বড় হয়েছে সে। বাবা-তাকে স্নেহ-মমতার খাতিরে নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য ভরণপোষণ দিয়েছে। বড় হওয়ার পর বিয়ে দিয়েছে নিজেদের পিরের সাথে। বহিপীরের বয়স পঞ্চাশেরও অধিক। তিনি নিঃসন্তান। তার প্রথম বউ মারা গেছেন চৌদ্দ বছর আগে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদান রয়েছে। সেখানে বছর-দুবছরান্তে একবার পায়ের ধুলো দেন পিরসাহেব। মুরিদরা সর্বস্ব উজাড় করে দেয় পিরের সেবায়। এবার তার পেয়ারের খানদানি বংশের মুরিদ তাহেরার বাবা তার কিশোরী কন্যাকে পিরের সেবায় উৎসর্গ করেছে। কিন্তু স্বাধীনচেতা, অধিকার সচেতন তাহেরা বহিপীরের সাথে এমন বিয়ে মেনে নেয়নি। সে বহিপীরকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ওই বিয়ে সে মানে না। কেননা ওই বিয়েতে সে মত দেয়নি। তাই বিয়ের রাতে দুঃসাহসী তাহেরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।

উত্তরঃ

"ধর্মের নামে স্বীয় হীনস্বার্থ চরিতার্থ করাই বহিপীরের প্রকৃত ধর্ম।" 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ ও বহিপীরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।

'বহিপীর' নাটকের বহিপীর অসাধু ধর্মব্যবসায়ী। আধ্যাত্মিক কথা বললেও 'বৈষয়িক বুদ্ধি তার টনটনে। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তার মুরিদান রয়েছে। বছর-দুবছরে তিনি মুরিদের বাড়িতে যান। মুরিদরা যথাসর্বস্ব দিয়ে পিরের সেবা করতে ভোলে না। বহিপীর কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত নন। অথচ তার পোশাক-আশাকে উচ্চ সামাজিক মর্যাদা প্রস্ফুটিত হয়। বহিপীর প্রকাশ করেছেন যে, তিনি চাইলে মুরিদদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমিদারের জমিদারিও রক্ষা করতে পারেন। সুতরাং ক্ষমতার দিক থেকে তৎকালীন পির সম্প্রদায় সমাজের উচ্চ স্তরের অধিকারী হয়ে উঠেছিল।

'বহিপীর' অত্যন্ত ধূর্ত ও বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন। অশিক্ষিত সাধারণ মানুষের কুসংস্কার ও ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে তার ধর্মব্যাবসা পরিচালনা করেন। তার প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন চৌদ্দ বছর আগে। এখানে তিনি তার এক খানদানি বংশের পেয়ারের মুরিদের কন্যা তাহেরাকে তার অমত সত্ত্বেও বিয়ে করেন। বিয়ের রাতে কিশোরী তাহেরা পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের হাত থেকে বাঁচতে বাড়ি ছেড়ে পালায়। বহিপীর এতে চালাকির আশ্রয় নেন। তিনি আইনের আশ্রয় নেন না, কেননা আইন দ্বারা ওই বিয়ে স্বীকৃত নয়। তাহেরাকে তিনি প্রথমে পুলিশের ভয় দেখান। তাহেরা এতে নরম না হলে শরিয়তি বিয়ের দোহাই, মানবতার বাহানা দেখান। এতেও কাজ না হওয়ায় তিনি জমিদার হাতিম আলির অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণ করেন। মোট কথা নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বহিপীর সকল প্রকার হীন কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বহিপীরের জীবিকা থেকে শুরু করে বৈবাহিক অবস্থা- সব ক্ষেত্রেই তিনি ধর্মের আশ্রয় নিয়ে অধর্ম করতে প্রস্তুত। তাই বলা যায় যে, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।

উত্তরঃ

কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও ধর্মভীতির কারণে খোদেজা পিরের বদদোয়াকে ভয় করেন।

'বহিপীর' নাটকের কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মভীরু চরিত্র খোদেজা আবহমানকালীন গ্রামীণ সংস্কারমনা গ্রামীণ নারী সমাজের প্রতিনিধি। সকল প্রকার মুক্তচিন্তা তার কাছে বাড়াবাড়ি। সমাজ শৃঙ্খলার মধ্যে থাকতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাহেরার বাড়ি থেকে পালিয়ে আসাকে তিনি দুঃসাহসী কর্মকান্ড বলে মনে করেন। এমন কাজ অনুচিত। ধর্মীয় অপসংস্কার তার মর্মমূলে বিদ্ধ। তিনি মনে করেন, বিয়ের মতো সামাজিক চুক্তি তকদিরের ব্যাপার। তাছাড়া পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়েকেও তিনি সৌভাগ্য মনে করেন। তিনি বহিপীরের আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী। তাহেরা তাকে তার বজরায় আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি বহিপীরকে না-জানানোর অনুরোধ করলেও খোদেজা সেই অনুরোধ গায়ে মাখেননি। তিনি মনে করেন, তারা তাহেরার কথা বহিপীরকে না জানালেও বহিপীর আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবলে সবকিছু জেনে যাবেন। তখন বহিপীর তাদেরকে বদদোয়া দেবেন। তাই তিনি পিরসাহেবকে তাহেরার কথা বলে দেন। বহিপীরের বদদোয়ায় তাদের ক্ষতির আশঙ্কা করেন খোদেজা। মূলত কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও ধর্মভীতির কারণেই তিনি বহিপীরের বদদোয়াকে ভয় করেন।

উত্তরঃ

"হাতেম আলি উচ্চ নৈতিকতাবোধসম্পন্ন মানুষ"- 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ ও কার্যকরণ সম্পর্ক বিচারে আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ। 'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র জমিদার হাতেম আলি।

রেশমপুরে তার সামান্য জমিদারি রয়েছে। এককালে এই জমিদারির খ্যাতি ছিল। কিন্তু সেই সুদিন হাতেম আলির বাবার আমলেই শেষ হয়ে গেছে। এখন তার কাছে যেটুকু আছে তাকে নাট্যকার 'ঢাকের ঢোল' বলে উল্লেখ করেছেন। তবু দেশে সম্মান নিয়ে বসবাস করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু সান্ধ্য আইনে জমিদার হাতেম আলির জমিদারি হারানোর উপক্রম। আত্মনিমগ্ন জমিদার জমিদারি নিলামে ওঠার বিষয়টি স্ত্রী ও সন্তান হাশেম আলির কাছে গোপন রেখেছেন। চিকিৎসার বাহানা করে তিনি শহরে বন্ধুর কাছে টাকা ধার নিতে এলে স্ত্রী-সন্তানও তার সাথে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে।

বিপত্তি ঘটে বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছ থেকে জমিদার টাকা ধার না পাওয়ায়। এতদিনের জমিদারি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় হাতেম আলি উদ্ভ্রান্তের মতো আচরণ করেন। তার স্ত্রী-সন্তান এই সংবাদ শুনলে বজরায় হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে যায়।

কূটকৌশলী বহিপীর অসহায় বিপন্ন জমিদারকে একটি অমানবিক শর্ত দেন। বহিপীর তাকে জানান জমিদারি রক্ষার টাকার ব্যবস্থা করে দেবেন, যদি তাহেরা বহিপীরের সাথে যায়। অসহায় উদ্ভ্রান্ত জমিদারের কাছে এমন আজব শর্ত ঠাট্টার মতো ঠেকে। তিনি তাহেরাকে এই শর্তের কথা জানালে কৃতজ্ঞতার বশে তাহেরা রাজি হয়। কিন্তু দিশেহারা হয়ে পড়লেও উচ্চ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হাতেম আলির বুঝতে অসুবিধা হয় না বহিপীরের এমন শর্ত অমানবিক। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ বহিপীরকে জানান তাহেরা তার সাথে যেতে রাজি হলেও বহিপীরের এই শর্তে টাকা তিনি নেবেন না। এভাবেই 'বহিপীর' নাটকের শুরু থেকেই হাতেম আলি উচ্চ নৈতিকতাবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তাই বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকের হাতেম আলি উচ্চ নৈতিকতাবোধসম্পন্ন মানুষ।

উত্তরঃ

"তাহারা তাহাদের নতুন জীবনের পথে যাইতেছে।"-বহিপীরের এরূপ উক্তির কারণ বহিপীরের কূটচালকে ছিন্ন করে হাশেমের হাত ধরে তাহেরার অজানার উদ্দেশ্যে গমন।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। তাহেরার সৎমায়ের কুপরামর্শে তার বাবা বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে তাহেরাকে বিয়ে দেয়। কিন্তু আধুনিক যুক্তিবাদী তাহেরা ওই অসম বয়সের বিয়েকে মেনে নেয়নি। তাই সে বিয়ের রাতে বাড়ি ত্যাগ করে। বহিপীরও তাহেরার খোঁজে তার সহকারী হকিকুল্লাহকে নিয়ে বের হন। নাটকীয়ভাবে ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের নৌকার সাথে তাহেরাকে আশ্রয়দানকারী বজরার সংঘর্ষ হয়। এবং মরতে মরতে বেঁচে বহিপীর সেই বজরাতেই আশ্রয় পান। তাহেরা বহিপীরকে দেখে আত্মহত্যা করতে গেলে জমিদারপুত্র হাশেম তাকে বাঁচায়। বহিপীরের হাত থেকে তাহেরাকে বাঁচানোর কঠিন শপথ করে সে। বহিপীরের শরিয়তি বিয়ের দোহাই, জমিদারি রক্ষার টাকা দেওয়ার শর্ত সবকিছু মোকাবেলা করে জমিদারপুত্র হাশেম তাহেরাকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সব কূটচালে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে বহিপীর তাদের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়। তাই সে আলোচ্য উক্তিটি করেছে।

উত্তরঃ

মানবতাবশত জমিদারিপত্নী খোদেজা তাহেরাকে তাদের জমিদারি বজরায় তুলে নিলে সেই রাতেই ঝড়ের কবলে আধডোবা নৌকা থেকে মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে নাটকীয়ভাবে আশ্রয় পান বহিপীর। এভাবে তারা উভয়ে আবার এক ছাদের নিচে উপস্থিত হয়।

'বহিপীর' নাটকের আরেক প্রধান চরিত্র তাহেরা। সে মা-মরা মেয়ে। শিশুকাল থেকেই সৎমায়ের সংসারে মানুষ। অনাদর-অবহেলায় তার জীবন কেটেছে। নিঃসন্তান, বিপত্নীক, পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সাথে তার সম্পূর্ণ অমতে বিয়ে দেয় তার বাবা ও সৎমা। অধিকার সচেতন তাহেরা এই বিয়েকে মেনে নেয়নি। সে বিয়ের রাতেই বাড়ি ত্যাগ করে ডেমরার ঘাটে পৌঁছায়। তাকে নিয়ে লোকজন বাজে মন্তব্য করছিল, বদলোকেরা চোখ দিয়ে তাকে গিলে খাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে অসহায় একটা মেয়েকে থাকতে দেখে জমিদার পত্নী খোদেজার মায়া হয়। তিনি তাকে বজরায় আশ্রয় দেন। এদিকে বিয়ের রাতে কনে পলায়ন করায় তাহেরার বাবা পুলিশে খবর দিতে চাইলে বহিপীর তাতে সায় দেন না। ধূর্ত বহিপীর বুঝতে পেরেছিলেন তাহেরার মতের বিরুদ্ধে এমন বিয়ে আইন দ্বারা স্বীকৃত নয়। ফলে আইনের সহায়তা নিতে গেলে সেই আইনে তাদের ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি তার সহকারী হকিকুল্লাহকে নিয়ে তাহেরার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এবং সড়কপথ অনুন্নত হওয়ায় বহিপীর ডিঙি নৌকা ভাড়া করে বের হন। রাতে কালবৈশাখি ঝড় উঠলে ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেতে সব নৌযান ছোট খালের ভেতর আশ্রয় নিতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে বহিপীরের নৌকার সাথে হাতেম আলির জমিদারি বজরার সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বহিপীরের ডিঙি নৌকার আকারে ছোট হওয়ায় ডুবতে শুরু করে। হাতেম আলি আধডোবা নৌকা থেকে পিরসাহেবকে বজরায় তুলে নেন।

এভাবে সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিমণ্ডলে নাটকীয়ভাবে বহিপীর ও তাহেরা একই বজরায় আশ্রয় নেয়।

উত্তরঃ

বহিপীরের সাথে তাহেরার অসম বয়সের বিয়েতে তাহেরার মত ছিল না। আইনমাফিক এ বিয়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাই তাহেরা বহিপীরকে বিবি সাহেব ডাকতে নিষেধ করেছে।

'বহিপীর' নাটকের তাহেরার মা নেই। সৎমায়ের ঘরে সে মানুষ হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সে স্নেহ-ভালোবাসা বঞ্চিত। তার বাবা ও সৎমা বহিপীরের মুরিদ। বহিপীর বছর-দুবছরান্তে একবার তাদের বাড়ি এলে তারা তাদের সর্বস্ব উজাড় করে তার সেবায় লিপ্ত হয়। তাহেরার সৎমায়ের কুপরামর্শে তার বাবা এবার বহিপীরের সাথে তার বিয়ে দেয়। বিয়েতে তাহেরার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন তারা মনে করেনি। নিজের সম্পূর্ণ অমতে পঞ্চাশোর্ধ্ব সন্তানহীন বৃদ্ধ পিরের সাথে এ বিয়ে তাহেরা মানে না। তাই সে বিয়ের রাতে বাড়ি ছেড়ে পালায়। কিন্তু নাটকীয়ভাবে তার আশ্রয় নেওয়া জমিদারি বজরায় মরতে মরতে এসে আশ্রয় নেন বহিপীর। একই বজরায় তাহেরাকে পেয়ে তিনি খোদার শোকর আদায় করেন। বহিপীরের দাবি শাস্ত্রমতে তাহেরার সাথে 'তার বিয়ে হয়েছে। তাই তিনি তাহেরাকে 'বিবি সাহেব' বলে সম্বোধন করেন। এতে তাহেরা প্রতিবাদ করে। কেননা এই বিয়েতে তাহেরার মত ছিল না। তাই সে বহিপীরকে দৃঢ়তার সাথে বিবি সাহেব ডাকতে নিষেধ করে।

উত্তরঃ

"হাশেম আলি শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক চরিত্রের প্রতিনিধি।" 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ ও হাশেম আলির কর্মকাণ্ডের আলোকে উক্তিটি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র হাশেম আলি। সে শিক্ষিত, যুক্তিবাদী বাঙালি তরুণ সমাজের প্রতিনিধি। হাশেম আলি সব ধরনের কুসংস্কারমুক্ত সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার যুবক। সে নতুন দিনের বার্তাবাহক। সে জমিদারপুত্র। কিন্তু বৈষয়িক চিন্তা তার মনকে কখনো আচ্ছন্ন করতে পারেনি। বাবার জমিদারির প্রতি তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। এ জন্য জমিদার হাতেম আলি তাকে অস্থিরমতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে স্থির ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। সে চায় ব্যাবসা করে প্রতিষ্ঠিত হতে। তাই ছাপাখানার ব্যাবসা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বাবার কাছে। হাশেম কোনো নির্দিষ্ট কর্মকে বড়ো করে দেখে না, তার কাছে সব কাজই সমান মর্যাদাপূর্ণ। বাবার জমিদারি হারিয়ে ছাপাখানার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও সে দমে যায়নি। সে নতুন করে স্বপ্ন দেখার জন্য আগ্রহী। এই অপরাজেয় মানসিকতা তাকে আধুনিক স্বপ্নবাজ মানুষে পরিণত করেছে। হাশেম আলির শিক্ষা তার মনুষ্যত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অন্যদিকে হাশেম আলি সচেতন ব্যক্তিত্ব। সামাজিক কুসংস্কার-বৈষম্যের প্রতি সে সোচ্চার। তাহেরার অমতে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স্ক বহিপীরের সাথে কিশোরী তাহেরার অসম বিয়েকে সে যৌক্তিক মনে করে না। তার কাছে এ বিয়ের কোনো অর্থ নেই। তাই সে প্রথম থেকেই তাহেরাকে বহিপীরের হাত থেকে বাঁচানোর অঙ্গীকার করে। তাহেরা আত্মহত্যা করতে গেলে সে তাকে পানিতে ঝাঁপ দেওয়ায় বাধা দেয়। প্রতিশ্রুতি দেয় বিয়ে করে হলেও তাহেরাকে বাঁচানোর। বহিপীরের শরিয়তি বিয়ের দোহাই, পুলিশের ভয়, বাবার করুণ অসহায় মুখ কোনোকিছুই তাকে তার সচেতন মানসিকতা থেকে বিচলিত করতে পারেনি। সে তার অঙ্গীকার পূরণে শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে।

তাই উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক চরিত্রের প্রতিনিধি।

উত্তরঃ

বহিপীরের অমানবিক শর্তে অসহায় জমিদার হাতেম আলির টাকা ধার নেওয়ার বিষয়টি আলোচ্য উক্তির মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের আত্মনিমগ্ন, স্থিতধী ও মানবিক চরিত্র জমিদার হাতেম আলি। রেশমপুরে তার সামান্য জমিদারি ছিল। কিন্তু খাজনা বাকি পড়ার সান্ধ্য আইনে তা নিলামে ওঠার উপক্রম। তাই জমিদারি রক্ষার টাকার, সন্ধানে তিনি শহুরে বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে যান। বিষয়টি তার স্ত্রী-পুত্র এমনকি বজরায় আশ্রয় নেওয়া বহিপীরের কাছেও গোপন রাখেন। অতঃপর বাল্যবন্ধু তাকে নিরাশ করলে তিনি তার বিষয়টিকে গোপন রাখতে পারেন না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার বহিপীরের কাছে সবকিছু খুলে বলেন। বহিপীর তার অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে এক অমানবিক শর্তে তাকে টাকা ধার দেওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করেন। শর্তটি হলো, তাহেরা নামক আশ্রয়প্রার্থী বহিপীরের সাথে ফিরে যাওয়ার শর্তে তিনি জমিদার হাতেম আলিকে জমিদারি রক্ষার টাকা দেবেন। শুরুতে মানসিকভাবে উদ্ভ্রান্ত হাতেম আলির কাছে শর্তটি ঠাট্টা মনে হলেও ধীরে ধীরে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বহিপীর তাকে অমানবিক এক শর্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। বিষয়টি তাহেরাকে বললে আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তাহেরা এই শর্তকে মেনে নেয়। কিন্তু মানবিক হাতেম আলির কাছে নিজেকে কসাইর মতো মনে হতে থাকে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটাকে ক্ষয়িষ্ণু জমিদার হাতেম আলির বিপর্যস্ত অবস্থা সামন্ততন্ত্রের পতন ও জমিদারপুত্র হাশেম আলির ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পুঁজিবাদ তথা নতুন দিনের আগমন বার্তা দিয়েছে।

'বহিপীর' নাটকে নাট্যকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বিভিন্ন দ্বন্দ্বের মীমাংসায় পৌঁছেছেন। তন্মধ্যে একটি হলো সামন্ততন্ত্রের পতন ও নতুন দিনের সূচনা। 'বহিপীর' নাটকে ধ্বনিত হয়েছে নতুন দিনের বার্তা। সেই নতুন দিন হলো গ্রামের বিপরীতে নগর সভ্যতার বিকাশ। 'বহিপীর' নাটকে শহরকে সমৃদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। শহরে পড়ে জমিদারপুত্র হাশেম আলি জমিদারির প্রতি আকর্ষণ হারিয়েছে। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিপরীতে সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছে। তাই সে ছাপাখানার ব্যাবসাকে পেশা হিসেবে দেখছে। তাছাড়া গ্রামের জমিদাররাও অসহায় হয়ে পড়েছে। আর তাদের অর্থ-সহায়তার জন্য শহরমুখী হতে হচ্ছে। জমিদার হাতেম আলি তার জমিদারি রক্ষার টাকা আনতে যাচ্ছেন শহরে বাল্যবন্ধুর কাছে। বহিপীর জমিদারকে অর্থসাহায্য করার জন্য হাত পাতবে শহরের ধনী মুরিদদের কাছে।

নতুন দিনের স্বপ্ন দেখা যায় তাহেরার মাঝেও। খোদেজার মতো সে সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকেনি। নিজের বিরুদ্ধে হওয়া সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে সে দৃঢ়কণ্ঠে সোচ্চার হয়েছে। নিজের নির্ভর হয়ে উঠেছে নিজেই। এই আত্মনির্ভরশীলতা শহুরে কর্মজীবী উপার্জনক্ষম নারীদের বার্তা দেয়।

সুতরাং, উপর্যুক্ত দৃষ্টান্তের আলোকে বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকে সামন্ততন্ত্রের পতন ও নতুন দিনের আগমনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। হাতেম আলির জমিদারির ক্রান্তিলগ্নে শহরমুখী হওয়া থেকে শুরু করে জমিদারপুত্র হাশেম আলির পুঁজিবাদী ভাবনা কিংবা খোদেজার সামাজিক শৃঙ্খলে থাকার বিপরীতে তাহেরার শিকল ভাঙা প্রতিবাদ- প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরাতন সামাজিক কাঠামোর পতন ও নতুনত্বের বার্তা ধ্বনিত হয়েছে। তাই আলোচ্য উক্তিটি যথার্থ।

উত্তরঃ

তাহেরা বহিপীরের সব কথাতেই অসম্মতি জ্ঞাপন করলে বহিপীরের চোখ হিংস্র পশুর মতো জ্বলে ওঠে।

'বহিপীর' নাটকের প্রধান উপজীব্য পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে কিশোরী তাহেরার অসম বিয়ে। বহিপীর সুনামগঞ্জবাসী। সারা দেশে তার মুরিদান রয়েছে। বছর-দূরছারান্তে মুরিদের বাড়ি গেলে মুরিদরা সর্বস্ব উজাড় করে পিরের সেবায়। কিশোরী তাহেরার বাবা ও সৎমা বহিপীরের মুরিদ। সৎমায়ের চক্রান্তে বাপ বহিপীরের সাথে তাহেরার বিয়ে দেয়। পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ পূর্বতন দাম্পত্য জীবনে সন্তানহীন বহিপীরের সাথে জীবনের অনিশ্চিত এমন বিবাহকে মেনে নেয়নি তাহেরা। বিয়ের রাতে সে পালিয়ে জমিদার হাতেম আলির বজরায় আশ্রয় নেয়। নাটকীয়ভাবে ঝড়ের কবলে পড়ে মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে বহিপীরও আশ্রয় নেন জমিদারি বজরায়। ধীরে ধীরে বহিপীর জানতে পারেন তাহেরাও এই বজরায় আশ্রয় নিয়েছে। ভাই তিনি তাকে ফিরিয়ে নিতে নানা কূটচালের আশ্রয় নিতে শুরু করেন। কিন্তু তাহেরা বহিপীরের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কেননা বিয়েতে তাহেরা মত দেয়নি। ফলে আইনত এই বিয়ের কোনো বৈধতা নেই। বহিপীরের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তার চোখ হিংস্র জন্তুর মতো জ্বলে ওঠে ক্ষোভে।

উত্তরঃ

"শোষণমূলক সূর্যাস্ত আইন হাতেম আলির বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী।" 'বহিপীর' নাটক অবলম্বনে উক্তিটির সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হলো।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের একটি ধারা সূর্যাস্ত আইন। এই আইনে বলা হয়েছে জমিদারগণ বছরের নির্ধারিত দিন সূর্য ডোবার পূর্বে অধীন জমির রাজস্ব আদায় করতে বাধিত থাকবেন। যদি কোনো জমিদার তার নির্ধারিত খাজনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন তবে তার জমিদারি নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে উক্ত জমির রাজস্ব বুঝে নেওয়া হবে।

'বহিপীর' নাটকের হাতেম আলি এই শোষণমূলক সূর্যাস্ত আইনের ভুক্তভোগী। তিনি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। রেশমপুরে তার যৎকিঞ্চিৎ জমিদারি রয়েছে। এককালে তাদের জমিদারির নামডাক ছিল। কিন্তু সেই সুসময় তার পিতার আমলেই নিঃশেষ হয়ে যায়। তার হাতে যেটুকু আসে তাকে নাট্যকার ঢাকের ঢোল অর্থাৎ অন্তঃসারশূন্য বলে ঠাট্টা করেছেন। তবু সমাজে সম্মান বজায় রেখে চলার জন্য তা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু খাজনা বাকি পড়ায় সান্ধ্য আইনে জমিদারি নিলামে ওঠার উপক্রম হয়েছে। হাতেম আলির একমাত্র সহায় তার এই জমিদারি। এর সাথে তার সামাজিক মর্যাদা জড়িত। তাই জমিদারি হারালে তিনি সম্মান নিয়ে সমাজে বসবাস করতে পারবেন না।

জমিদারি নিলামে ওঠার সংবাদ পরিবারের কাছে গোপন রেখে চিকিৎসার নাম করে জমিদার তার শহুরে বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে টাকা ধার চাইতে যান। কিন্তু তার বন্ধু তাকে নিরাশ করে। ফলে জমিদার হাতেম আলি মানবিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বিভ্রম হয়ে বহিপীরের অমানবিক শর্তও প্রথমে মাথা পেতে নেন।

সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, হাতেম আলির বিপর্যস্ত অবস্থার জন্য দায়ী ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত শোষণমূলক সূর্যাস্ত আইন। এই আইনের বলেই তার জমিদারি নিলামে উঠতে যাচ্ছে, যার সাথে তার সম্মানসহকারে বেঁচে থাকার প্রশ্ন জড়িত। তাই বলা যায় যে, জমিদার হাতেম আলির বর্তমান অবস্থার জন্য ইংরেজদের শোষণমূলক সূর্যাস্ত আইন দায়ী।

উত্তরঃ

হাশেমের বিয়ের প্রস্তাবে তাহেরা মত না দেওয়ায় খোদেজা বেগম তাহেরাকে অকৃতজ্ঞ বললেন।

'বহিপীর' নাটকের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মভীরু চরিত্র খোদেজা। তিনি বহিপীরের বদদোয়াকে ভয় পায়। মা মরা মেয়ে তাহেরাকে তার বাবা ও সৎমা বহিপীরের বদদোয়াকে ভয় পান। বাবা ও সৎমা পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সাথে বিয়ে দিলে তাহেরা বাড়ি থেকে পালায়। ডেমরার ঘাটে অসহায় তাহেরাকে মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বজরায় তুলে নেন খোদেজা। কিন্তু তাহেরার সমাজবিরুদ্ধ কাজকে তিনি প্রশয় দেন না। তার একমাত্র ছেলে হাশেম অসহায় তাহেরাকে বহিপীরের হাত থেকে রক্ষার জন্য তৎপর হয়। সে তাহেরাকে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু বিষয়টি খোদেজা ভালোভাবে নেননি। তিনি চান তাহেরা বহিপীরের সাথে ফিরে থাক। অন্যদিকে হাশেম বহিপীরের সাথে তাহেরার বিয়ের কোনো যৌক্তিকতা দেখে না। তাই সে অসহায় তাহেরাকে বিয়ে করে হলেও বাঁচাতে চায়। এতে খোদেজার অমত দেখে তাহেরাও হাশেমের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে। তাহেরার প্রতি হাশেমের এত আত্মত্যাগ সত্ত্বেও তাহেরার তার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করায় খোদেজা তাহেরাকে অকৃতজ্ঞ বলেছেন।

উত্তরঃ

"একবার ঝুট কথা বললে তার উপায় নেই, তখন একটার পর একটা বলতে হয়।" উক্তিটির মধ্য দিয়ে অসহায় জমিদার হাতেম আলির জমিদারি নিলামে ওঠার ব্যাপারটিকে নিজের পরিবার ও বহিপীরের কাছ থেকে লুকানোর প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র হাতেম আলি। তিনি আত্মমগ্ন, স্থিতধী ও মানবিক চেতনাসম্পন্ন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি, রেশমপুরে তার যৎকিঞ্চিৎ জমিদারি রয়েছে। কিন্তু খাজনা বাকি পড়ায় সান্ধ্য আইনে তার জমিদারি নিলামে ওঠার 'উপক্রম। বিষয়টি তিনি তার স্ত্রী ও পুত্র হাশেম আলির কাছ থেকে গোপন করেন। পারিবারের কাছে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে শহরে যাওয়ার কথা বললেও মূলত তিনি জমিদারি রক্ষার টাকার জন্য শহরে তার বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছে যান।

কিন্তু বিপত্তি বাধে শহরের বাল্যবন্ধুর কাছে হাতেম আলি অর্থ সাহায্য না পাওয়ায়। এতে জমিদার দিশেহারা হয়ে পড়েন। হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি বহিপীরের কাছে সব প্রকাশ করেন। তার স্ত্রী ও ছেলে জমিদারি নিলামে তোলার খবর শুনলে বজরায় হুলস্থুল, কাণ্ড পড়ে যায়। বহিপীরও তখন তার আসল উদ্দেশ্য হাতেম আলির কাছে ব্যক্ত করে।

হাতেম আলির ঝুট কথা ছিল তার অসহায়ত্ব। রেশমপুরের তার জমিদারি সান্ধ্য আইনে নিলামে ওঠার উপক্রম। বিষয়টি তার সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার প্রশ্ন। কিন্তু বিষয়টি স্ত্রী ও পুত্র জানতে পারলে তারাও হতাশ হয়ে পড়বে। তাই উচ্চ মানবিকতাবোধের অধিকারী হাতেম আলি তার স্ত্রী ও পুত্রের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন করেন। আবার অচেনা-অজানা বহিপীরের কাছেও তিনি এসব কথা জানানোর বিষয়টি সম্মানজনক মনে করেননি। তাই তার কাছেও বিষয়টি গোপন রাখেন। কিন্তু বিষয়টিকে ঢাকতে তার একের পর এক মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে।

তাই বলা যায় যে, "একবার ঝুট বললে আর উপায় থাকে না, তখন একটার পর একটা বলতেই হয়।" উক্তিটি জমিদার হাতেম আলির এ অসহায়ত্বকে নির্দেশ করেছে।

উত্তরঃ

"পিরের ছায়ায় বসবাসের সৌভাগ্য ক'জনের হয়?" আলোচ্য উক্তিটির মাধ্যমে খোদেজার কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম অপ্রধান চরিত্র জমিদারপত্নী খোদেজা। তিনি কুসংস্কারমনা, ধর্মভীরু গ্রামীণ নারীসমাজের প্রতীক। খোদেজা যুক্তিবাদহীন, সমাজশৃঙ্খলে আবদ্ধ। সমাজশৃঙ্খলের বাইরে প্রতিবাদী চিন্তাভাবনা তার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। অসহায় তাহেরা বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে ডেমরার ঘাটে অবস্থান করলে তার প্রতি খোদেজার মায়া হয়। তিনি তাকে বজরায় তুলে নেন। কিন্তু বিয়ের রাতে পালিয়ে আসার কথা শুনে তিনি তাকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েন না। ধর্মীয় কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এ চরিত্রটি বিয়েকে মনে করেন ভাগ্যের লিখন। বিয়েতে নারীর মত থাকার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন না। পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সাথে বিয়েকে তিনি সৌভাগ্যের কারণ মনে করেন। তিনি পিরের বদদোয়াকে ভয় পান। তাই তাহেরার নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি বহিপীরকে তার কথা বলে দেন। কেননা তিনি মনে করেন, বহিপীরের কাছে প্রকাশ না করলেও বহিপীর আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে সবকিছু জেনে যাবেন। তখন তা তার সংসারে অভিশাপ হয়ে নেমে আসবে। পিরের ছায়ায় থাকাকেও তিনি সৌভাগ্য মনে করেন। তার মতে, সবাই এ সৌভাগ্যের অধিকারী হয় না।

উত্তরঃ

পির সাহেব জমিদার হাতেম আলির অস্বস্তিকর অবস্থার সুযোগে অমানবিক শর্তের মাধ্যমে নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত ছিলেন।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় ও নাম-চরিত্র বহিপীর। নিজ স্বার্থের বিচারে তিনি জীবন ও জগৎকে পরিমাপ করেন। তার পেয়ারের মুরিদ নিজ কিশোরী কন্যাকে তার সাথে বিয়ে দিতে চাইলে বহিপীর তাতে রাজি হন। কিন্তু বিয়ের রাতে এমন অসম বিয়ে না মেনে তাহেরা পালিয়ে গেলে তার কূটবদ্ধির প্রকাশ ঘটে। তিনি পুলিশে খবর দিতে রাজি নন। কেননা আইন দ্বারা কনের অমতে বিয়ের কোনো ভিত্তি নেই। তাই তিনি নিজেই তাহেরাকে খুঁজতে বের হন। নাটকীয়ভাবে বহিপীর ও তাহেরা একই বজরায় অবস্থান নেয়। বহিপীর নানা ছলে তাহেরাকে পেতে চান। শরিয়তি বিয়ের দোহাই, বৃদ্ধ লোকের প্রতি সহানুভূতিশীলতা-সংক্রান্ত মানবিকতার দোহাই, পুলিশের ভয় ইত্যাদি একের পর এক কূটচাল আঁটতে থাকেন। কিন্তু এতেও কাজ না হলে তিনি অমানবিক শর্তে উপনীত হন।

জমিদার হাতেম আলির বজরায় ঝড়ের কবলে আশ্রয় নিয়েছিলেন বহিপীর। হাতেম আলি ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। রেশমপুরে থাকা তার যৎসামান্য জমিদারি সান্ধ্য আইনে নিলামে ওঠার উপক্রম। বড় আশা নিয়ে তিনি শহুরে বন্ধু, আনোয়ারউদ্দিনের কাছে টাকা ধরে চাইতে এসেছিলেন। কিন্তু তিনিও তাকে নিরাশ করেন। ফলে 'জমিদারি হারানোর নিশ্চিত অধঃপতনে জমিদার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বিপর্যয় থেকে মানসিক স্বস্তি পেতে তিনি বহিপীরের কাছে সবকিছু খুলে বলেন। অথচ খল বহিপীর আশ্রয়দাতার প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতাবোধ না রেখে তার ওপর অমানবিক শর্ত চাপিয়ে দেন। তাহেরার কাছে সকল কূটচালে ব্যর্থ হয়ে তিনি অসহায় জমিদারের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিকে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলে কাজে লাগাতে চান। শর্তটি হলো তাহেরাকে তার সাথে ফিরে যাওয়ার শর্তে তিনি জমিদারের জমিদারি রক্ষার টাকা ধার দিতে প্রস্তুত। বিষয়টি হাতেম আলির কাছে প্রথমে ঠাট্টার মনে হলেও পরে তিনি এর অমানবিক দিকটি বুঝতে পারেন। তবে আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে তাহেরা বহিপীরের এই শর্তে রাজি হয়। ফলে বহিপীরের হীন স্বার্থ চরিতার্থ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তাই উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, পিরসাহেব হাতেম আলির অন্বস্তিকর অবস্থার সুযোগে অমানবিক শর্ত চাপিয়ে দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত ছিলেন।

উত্তরঃ

"নিশ্চয়ই ইহাতে কোনো গূঢ়তত্ত্ব আছে।" উক্তিটি মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে জমিদারের বজরায় আশ্রয় পাওয়াটা খোদার বিশেষ কোনো ইঙ্গিত বলেই মনে করার দিকটিতে ইঙ্গিত করেছেন বহিপীর।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। বইয়ের ভাষায় কথা বলায় তার এরূপ নামকরণ হয়েছে। বহিপীর অত্যন্ত ধূর্ত ও বৈষয়িক বৃদ্ধিচালিত খল চরিত্র। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। সারা দেশে তার মুরিদান রয়েছে। বছর-দুবছরান্তে তিনি মুরিদের বাড়ি যান। 'মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে তার সেবা করে। এবার তার এক পেয়ারের মুরিদ তার কিশোরী কন্যাকে বহিপীরের সাথে বিয়ে দেয়। বহিপীরের বয়স পঞ্চাশের অধিক। তার প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান থেকে চৌদ্দ বছর আগে মারা যান। এমন অসম বিয়েকে মেনে নেয় না বিয়ের কনে তাহেরা। সে বিয়ের রাতে বাড়ি ছেড়ে পালায়। তাহেরার বাবা পুলিশে খবর দিতে চাইলে ধূর্ত বহিপীর তা নাকচ করে দেন। তিনি ওই রাতেই তার সফরসঙ্গী হকিকুল্লাহকে নিয়ে তাহেরার খোঁজে বের হন। পথে কালবৈশাখি ঝড়ের কবল থেকে বাঁচতে ছোট খালে আশ্রয় নেওয়ার সময় জমিদারের বৃহৎ বজরার সাথে বহিপীরের ডিঙি নৌকার ধাক্কা লাগে। আধডোবা অবস্থায় মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে বহিপীর জমিদারের বজরায় আশ্রয় পান। জমিদারি বজরায় এমন নাটকীয়ভাবে আশ্রয় পাওয়াকে বহিপীর খোদার বিশেষ ইঙ্গিত বলে ধারণা করেছেন এই উক্তির মাধ্যমে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকটি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত একটি আধুনিক নাটক। নাটকের প্রতিটি চরিত্র শেষপর্যন্ত আধুনিক মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। নিচে 'বহিপীর' নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণ করা হলো।

'বহিপীর' নাটকের নাম-চরিত্র ও কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। বহিপীর নামটিই তার স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে। তিনি বইয়ের ভাষায় কথা বলায় তার এরূপ নামকরণ হয়েছে। বহিপীর বৈষয়িক বুদ্ধিচালিত আধুনিক মানুষ। স্বভাবসুলভ পিরদের অনুগামী নন তিনি। নিজেই স্বীকার করেছেন তার কোনো আধ্যাত্মিক শক্তি নেই। কিশোরী তাহেরাকে বিয়ে করে তিনি কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। তাহেরাকে উদ্ধার করার জন্য নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে সবকিছুতেই ব্যর্থ হন তিনি। তাই শেষ পর্যন্ত নিজের পরাজয়কে মেনে নিয়ে বিনা শর্তে হাতেম আলিকে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে মানবিকতায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

'বহিপীর' নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তাহেরা। নাটকের ঘটনাপ্রবাহ তাকে ঘিরেই আবর্তিত। তাকে কেন্দ্র করেই বহিপীর ও জমিদারপুত্র হাশেম আলি মুখোমুখি অবস্থান নেয়। তাহেরা যুক্তিবাদী, অধিকার সচেতন, আধুনিক নারীজাগরণের প্রতীক চরিত্র। বাবা ও সৎমা বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে তার সম্পূর্ণ অমতে বিয়ে দিলে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেয়। বহিপীরের কূটকৌশলে না ভুলে নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থেকেছে সে। শেষপর্যন্ত হাশেম আলির হাত ধরে নতুন জীবনের পথে পাড়ি জমিয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হাশেম। সে যুক্তিবাদী, উচ্চশিক্ষিত, মানবিক চেতনাসম্পন্ন, আধুনিক নাগরিক চরিত্র। অসহায় তাহেরাকে বাঁচানোর সিদ্ধান্তে শুরু থেকেই অনড় সে। বহিপীরের পুলিশের ভয়, ধর্মীয় বিয়ের দোহাই, বাবার অসহায় মুখ কোনোকিছুই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাহেরাকে নিয়ে সে অনিশ্চিত অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের আরেক প্রধান চরিত্র জমিদার হাতেম আলি। তিনি স্থিতধী, আত্মনিমগ্ন ও মানবিক চেতনাসম্পন্ন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার। জমিদারি হারানোর আশঙ্কায় মানসিক বিপর্যস্ততার কারণে বহিপীর তাহেরার বিনিময়ে টাকা ধার দেওয়ার প্রস্তাব করলে তার বুঝতে অসুবিধা হয় না, এটি অমানবিক শর্ত। শেষ পর্যন্ত এমন অমানবিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জমিদার হাতেম আলি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
'বহিপীর' নাটকের একটি অপ্রধান চরিত্র খোদেজা। 'তিনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মভীরু, গ্রামীণ শৃঙ্খলাবদ্ধ নারী সমাজের প্রতিনিধি। অসহায় তাহেরাকে মানবিকতার বশে বজরায় আশ্রয় দিলে বহিপীরের আধ্যাত্মিক শক্তির ভয় চরিত্রটিকে ক্রমে স্নান করে তুলেছে।

'বহিপীর' নাটকের পিরের ধামাধরা ব্যক্তিত্বহীন চরিত্র হকীকুল্লাহ। নাটকজুড়ে তাকে হুঁকা টানা আর পিরের খেদমত করা ছাড়া বিশেষ কোনো ভূমিকায় দেখা যায়নি।

উত্তরঃ

"দুনিয়া সত্যিই কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্র"- হাতেম আলির জমিদারি হারানো এবং তাহেরার পালিয়ে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বহিপীর অলোচ্য কথাটি বলেছেন।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব বিয়ের রাতে তাহেরার পালিয়ে গিয়ে জমিদারের বজরায় আশ্রয় গ্রহণ। তাহেরার বাবা-সৎমা তার মতামতকে অগ্রাহ্য করে বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে বিয়ে দিলে বিয়ের রাতে তাহেরা পালায়। তাকে খুঁজতে বহিপীর ঝড়ের কবলে পড়ে মরতে মরতে নাটকীয়ভাবে জমিদারের বজরায় আশ্রয় পান।

বহিপীর মনে করেন তার এই যাত্রার খোদার গূঢ়তত্ত্বের ইঙ্গিত রয়েছে। তাছাড়া জমিদার হাতেম আলি জমিদারি নিলামে ওঠার বিষয়টি পরিবার ও বহিপীরের কাছ থেকে গোপন করেন। তিনি শহরে বসবাসরত বাল্যবন্ধুর আর্থিক সাহায্যের আশা নিয়ে নিয়ে গেলেও বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিন তাকে নিরাশ করেন। ফলে মানসিক বিপর্যস্ততায় বিচলিত হয়ে পড়েন হাতেম, আলি। বহিপীরের কাছে মানসিক স্বস্তির জন্য সবকিছু স্বীকার করেন।
বহিপীর তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজের উদ্দেশ্যও খুলে বলেন। তার বিশ্বাস- দুনিয়া মস্তবড় পরীক্ষাক্ষেত্র। খোদা তাদের বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করছেন।

উত্তরঃ

"তাহেরা আধুনিক ব্যক্তিত্বশীল প্রতিবাদী নারী চরিত্রের প্রতিনিধি।"- 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ ও তাহেরা চরিত্রের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যের আলোকে আলোচ্য উক্তিটি যুক্তিযুক্ত।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার 'বহিপীর' নাটকের চরিত্রসমূহকে আধুনিক মানববৈশিষ্ট্যের আদলে গড়ে তুলেছেন। তার অন্যতম কৃতিত্ব তাহেরা চরিত্রচিত্রণে। এই চরিত্রের মধ্যে লেখক বিশ শতকের নারীজাগরণকে ধারণ করেছেন।

মা-মরা মেয়ে তাহেরা। শৈশব থেকে সে সৎমায়ের সংসারে বড় হয়েছে। তাই সে স্বাভাবিক স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত। বাবা তার দায়িত্ব পালন করলেও সেই দায়িত্বের মধ্যে মমত্ববোধ ছিল না। শেষ পর্যন্ত সৎমায়ের কুপরামর্শে বাবা তাকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ পিরের সাথে নিজের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বিয়ে দেয়। এই বিয়ে না মেনে তাহেরা বাড়ি ত্যাগ করে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেয়। নাটকীয়ভাবে ঝড়ের কবলে মরমর অবস্থায় বহিপীরও সেই বজরায় আশ্রয় নেন। বহিপীর তাহেরাকে নানা কূটচক্রান্তের আশ্রয়ে আয়ত্তে নিতে চাইলেও তাহেরা বিচক্ষণতার সাথে সবকিছু অস্বীকার করে। শেষপর্যন্ত জমিদারপুত্র হাশেম আলির হাত ধরে অনিশ্চিত অজানায় পাড়ি জমায় সে।

তাহেরা শুরু থেকেই তার প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। নিজের অমতে বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে বিয়ে সে মানে না। কেননা বহিপীরের প্রথম স্ত্রীও নিঃসন্তান ও বিপত্নীক। ফলে তাহেরা এ বিয়েতে রাজি হওয়া মানে তার পুরো স্বপ্নময় ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। তাই সে বাড়ি ত্যাগ করেছে। বহিপীর তাকে বিবিসাহেব ডাকলে সে তৎক্ষণাৎ এর প্রতিবাদ করেছে। সে দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করে, বিয়েতে তার মত ছিল না। তাই আইনত তারা স্বামী-স্ত্রী নয়।

তাহেরা চিন্তা-চেতনার দিক থেকেও অনেকাংশে আধুনিক ও ব্যক্তিত্ববান। সমাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সে সোচ্চার। নারী হলেও নারীসুলভ গৃহমুখী বৈশিষ্ট্য তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। শুরু থেকেই সে নিজের সিদ্ধান্তে অনমনীয়। প্রয়োজনে সে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত, তবু বহিপীরের সাথে গিয়ে ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেবে না। আবার জমিদারপুত্র হাশেম আলি তাকে ঝোঁকের বশে বিয়ে করতে চাইলে তাতেও সে প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হয়নি।

সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, তাহেরা আধুনিক ব্যক্তিত্বশীল, প্রতিবাদী নারী চরিত্রের প্রতিনিধি।

উত্তরঃ

"আমাকে কোনো অবসর দেয় নাই, এবাদত করিবার ফুরসত দেয় নাই।"- উক্তিটি দ্বারা বহিপীর তার মুরিদদের ভালোবাসার দরুন এবাদতের অবসর না পাওয়ার দিকটি প্রকাশ করেছেন।

'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। তিনি সুনামগঞ্জ নিবাসী, সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদান রয়েছে। বছর-দুবছরান্তে তিনি মুরিদের বাড়ি ঘুরে বেড়ান। মুরিদরা সর্বস্ব দিয়ে পিরের সেবায় লিপ্ত হয়। কেউ গোয়ালের গরু বেচে, ছাগল, মুরগি জবাই করে পিরের সেবা করে, কেউ কিশোরী মেয়েকে পিরের সাথে বিয়ে দিয়ে পিরের শ্বশুর হওয়ার মর্যাদার ভাগ নেয়। তাছাড়া বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দলে দলে লোক পিরের মুরিদ হওয়ার জন্য আসে। তারা কেউ কান্নাকাটি করে, কেউ ধনসম্পদ উজাড় করে দেয় পিরের পদতলে। তাই পিরসাহেব কোনো অবসর পান না। মুরিদদের নিয়েই তিনি সর্বদা ব্যস্ত থাকেন, মুরিদদের চাওয়া-পাওয়া আশা-আকাঙ্ক্ষা শোনেন, উপদেশ দেন। পিরসাহেব নিজেকে নিয়ে ভাবার অবসর পান না। অন্যের এবাদতের দীক্ষা দিতে গিয়ে নিজের এবাদত করার সুযোগ পান না। বহিপীরকে নিয়ে তার মুরিদদের মাতোয়ারা হয়ে থাকার দিকটি বহিপীর আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের নামকরণের প্রতীকী তাৎপর্য আলোচনা করা হলো।

'বহিপীর' সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর একটি বিখ্যাত নাটক। এই নাটকের মধ্য দিয়ে শিক্ষার আলোবঞ্চিত বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসে গড়ে ওঠা পিরপ্রথার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। সেই সময়ে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেঁকে বসা পিরপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার ফুটে উঠেছে এই নাটকে। পিরসাহেবকে ধনী-গরিব সবাই ভয় করে। বিশেষত নাটকে উল্লিখিত জমিদারপত্নী খোদেজা বহিপীরের আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী এবং তিনি বহিপীরের বদদোয়াকে ভয় করেন। দেখা যায় যে, গ্রামের সাধারণ মুরিদরা পিরকে পেলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ধনসম্পদ এমনকি নিজের কন্যাসন্তানকেও পিরের সেবায় দান করে দেয়। যেমনটি করেছে বহিপীরের পেয়ারের খানদানি বংশের মুরিদ তাহেরার বাবা ও সৎমা। তবে এই নাটকটি শেষ পর্যন্ত হাশেম আলির অদম্য মানসিকতার জয়ের মাধ্যমে পাঠক ও দর্শকদের আলোর পথ দেখায় এবং এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়।

মূলত মুসলমান সমাজে পিরপ্রথার সৃষ্টি হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সুফি সাধকদের ইসলাম প্রচারের পথ ধরে। তারা ইসলাম ধর্মের ব্যাখ্যা জনসাধারণকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পির-মুরিদি ব্যবস্থার চালু করে। ধীরে ধীরে স্বার্থান্বেষী একটা মহল সাধারণ মানুষের সুযোগ নিয়ে তৎকালীন সুফিবাদী ব্যাখ্যার সূত্রে গড়ে ওঠা পিরপ্রথাকে নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করতে শুরু করে। একসময় এটি পরিণত হয় ধর্মকে আশ্রয় করে অর্থ উপার্জনের উপায়ে। 'বহিপীর' নাটকে বহিপীরের সাথে তার মুরিদদের আচরণ ও কর্মকান্ডের বিচারে তথ্যটি বাস্তব বলে পরিগণিত হবে।

'বহিপীর' নামটির প্রতীকী তাৎপর্য হলো বই থেকে মাসায়েল বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণে ব্যবহার করেন যিনি তিনি পির। মূলত ইসলাম ধর্মের সুফিবাদী ব্যাখ্যার সূত্র থেকে বহিপীর নামকরণ সার্থক বলে মনে হলেও এর সাথে জড়িয়ে পড়েছে সামাজিক কুসংস্কার ও সাধারণ মানুষের ধর্মভীতি। এই নাটকে বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে জ্ঞানের তথা যুক্তির পথে ধাবিত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। এটিই 'বহিপীর' নামকরণের প্রতীকী তাৎপর্য।

উত্তরঃ

"মনে হয় তাহাতে পবিত্রতা নাই, গাম্ভীর্য নাই।"- উক্তিটির মাধ্যমে বহিপীর কথ্যভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেছেন।

'বহিপীর' নাটকের নাম-চরিত্র বহিপীর। তার এমন উদ্ভট নামের মধ্যে গূঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে। বহিপীর সুনামগঞ্জের অধিবাসী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার মুরিদ রয়েছে। একেক অঞ্চলে একেক কথ্যভাষা প্রচলিত। বহিপীরের পক্ষে প্রত্যেক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করা অসম্ভব। তাছাড়া এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলে কটু শোনায়। তাই বাধ্য হয়ে বহিপীর বইয়ের ভাষা অর্থাৎ সাধুভাষা রপ্ত করেছেন। তিনি সব সময় বইয়ের ভাষা ব্যবহার করেন। তাই লোকজন তাকে বইয়ের ভাষায় কথা বলা পির সংক্ষেপে বহিপীর বলে। বইয়ের ভাষা ব্যবহার করার আরও একটি কারণ রয়েছে। বহিপীরের কাজ ধর্মের বাণী জনসাধারণের কাছে পৌছে দেওয়া। কথ্যভাষায় গুরুগাম্ভীর্য নেই বলে খোদার বাণী বহন করার ক্ষমতা এর নেই বলেও তার দাবি। তাই তিনি মনে করেন, কথ্যভাষার কোনো পবিত্রতা নেই, গাম্ভীর্য নেই।

উত্তরঃ

পিরের সাথে তাহেরার বিয়েতে তাহেরার মতামতকে উপেক্ষা করায় এই বিয়েকে 'কেবল নামেই বিয়ে' বলা হয়েছে।

'বহিপীর' নাটকের মূল দ্বন্দ্ব পঞ্চাশোর্ধ্ব বহিপীরের সাথে তাহেরার অসম বিয়ে। বহিপীরের পেয়ারের মুরিদ তাহেরার বাবা ও সৎমা। তাহেরা শিশুকাল থেকে সৎমায়ের সংসারে বড় হয়েছে। তার সৎমায়ের পরামর্শে তার বাবা বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে তার বিয়ে দেয়। বিয়েতে তাহেরার মতামত নেওয়া হয়নি। বলা যায়, তার সম্পূর্ণ অমতে তারা এই বিয়ে দিয়েছে। তাই তাহেরা এই বিয়েকে মানে না। বিয়ের রাতে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেয়।

নাটকীয়ভাবে ঝড়ের কবলে ডুবতে ডুবতে বেঁচে গিয়ে বহিপীরও আশ্রয় নেন জমিদারের সেই বজরায়। ধীরে ধীরে তিনি জানতে পারেন তাহেরা এই বজরায় আশ্রয় নিয়েছে। তিনি বিভিন্ন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে তাহেরাকে বাগে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাহেরা কোনোভাবেই তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়ে না। বহিপীরের 'বিবি সাহেব' ডাকায় তাহেরা দৃঢ়কণ্ঠে প্রতিবাদ করে। সে জানিয়ে দেয়, এ বিয়েতে তার মত ছিল না; তাই তার কাছে এ বিয়ে কোনো অর্থ দাঁড় করে না। ফলে আইনত বহিপীরের তার প্রতি কোনো দাবি থাকার কথা নয়।

হাতেম আলির শিক্ষিত যুক্তিবাদী ছেলে হাশেম আলিও তাহেরার সাথে বহিপীরের বিয়েকে বৈধ মনে করে না। কেননা এ বিয়েতে তাহেরার সম্মতি নেওয়া হয়নি। যদিও বহিপীর শাস্ত্রীয় বিয়ের দোহাই দেন। হাশেম আলি তাহেরা বহিপীরের ধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সে এই বিয়ের কাগজ পেলে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলতে চায়। শুরু থেকে সে শান্তভাবে প্রতিহত করেছে। এমনকি তাহেরার মত থাকলে সে তাকে বিয়ে করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, ধর্মীয় শাস্ত্রমতে তাহেরার সাথে বহিপীরের বিয়ে হলেও আধুনিক আইনের দ্বারা এ বিয়ে স্বীকৃত নয়। এ বিয়েতে তাহেরার মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। এ বিয়ে ছিল তার সৎমায়ের কূট চক্রান্তের ফল। তাই বলা যায় যে, পিরের সাথে তাহেরার বিয়েতে তাহেরার মত না থাকায় এই বিয়েকে "কেবল নামেই বিয়ে" বলা হয়েছে।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে জমিদার হাতেম আলিকে উদ্দেশ্য করে বহিপীর এ উক্তিটি করেছেন। 'বহিপীর' নাটকে জমিদার হাতেম আলির জমিদারি নিলামে ওঠার উপক্রম হয় খাজনা বাকি পড়ার কারণে। সূর্যাস্ত আইনের কারণে সর্বস্বান্ত হতে বসা জমিদার তাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। শহরে তার বাল্যবন্ধুর কাছে টাকা ধার চেয়ে ব্যর্থ হলে তিনি একেবারে ভেঙে পড়েন। বহিপীর তার এ অবস্থার কথা জানতে পেরে তাকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন খোদা ইচ্ছা করলে চরম বিপদগ্রস্ত মানুষকেও বিপদমুক্ত করতে পারেন। বিপদের একমাত্র সহায় হিসেবে মহান আল্লাহর সাহায্যের কথা বহিপীর আলোচ্য উক্তির মাধ্যমে রূপকার্থে প্রকাশ করেছেন।

উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকের তাহেরা চরিত্রটি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অনবদ্য সৃষ্টি। সাধারণ গ্রামীণ কিশোরী তাহেরা তার প্রবল ব্যক্তিত্ববোধ ও অনড় মানসিকতার কারণে সব প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করেছে। তাহেরার বাবা ও সৎমা ছিলেন বহিপীরের মুরিদ ও অন্ধভক্ত। বহিপীরের বয়স অনেসাথে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। ডেমরার ঘাটে তাকে দেখে জমিদারপত্নী খোদেজা তাদের বজরায় স্থান দিয়েছেন। পরিবার ও সমাজের চাপিয়ে দেওয়া অসম বিয়েকে অগ্রাহ্য করে তাহেরা নতুন করে জীবনকে গড়ে তোলার যে সাহসিকতা দেখিয়েছে তা তার ব্যক্তিতত্ববোধের পরিচয় বহন করে। জমিদারের বজরায় ঘটনাচক্রে বহিপীর আশ্রয় নেন এবং তাহেরার উপস্থিতি জানতে পারেন। তিনি তাহেরাকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে নিতে চাইলে তাহেরা যেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং জোরাজুরি করলে আত্মহত্যা করতে চায়। সে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে হলেও স্বাধীনতা ও বাঁচার অধিকার আদায় করতে চায়। বহিপীর পুলিশ ডেকে তাহেরাকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে গিয়েও পিছপা হয়েছেন তাহেরার দৃঢ় মানসিকতার কথা মাথায় রেখে। বহিপীর জমিদারের বিপদের সুযোগ নিয়ে তাহেরাকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে তাহেরা রাজি হয়েছিল। কিন্তু তার এই পরিবর্তন ছিল মানবিক দিক বিবেচনা করে। নিজের বিপদকে সে অন্য কারও ঘাড়ে চাপাতে চায়নি। তাই জমিদার হাতেম আলিকে সাহায্য করতে চেয়েছে নিজের অমতে পিরের সাথে যেতে চেয়ে। এ থেকে তাহেরার চরিত্রের মানবিকবোধের বিষয়টি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাশেম তাহেরাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চাইলেও সে প্রথমে মত দেয়নি। কারণ ঝোঁকের বশে তার মতো বিপদগ্রস্ত নারীকে সাহায্য করলেও পরে তার অনশোচনা হতে পারে। - হাশেমের দৃঢ় মানসিকতা তাকে ভরসা দিয়েছে। জীবনকে পিরের স্ত্রী হয়ে তার সেবায় কাটিয়ে না দিয়ে নতুন করে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে পরিবার ও সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাহেরা চরিত্রটি নতুন দিনের জীবনবাদী আধুনিক নারীর বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে। তাই বলা যায়, তাহেরা ব্যক্তিত্ববাদী, অধিকার সচেতন ও আধুনিক নারীসত্তার মূর্ত প্রতীক।ক বেশি হলেও তার সাথে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয় তাহেরাকে। বাবা ও সৎমায়ের এই হঠকারী সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়নি স্বাধীনচেতা

উত্তরঃ

জমিদার হাতেম আলির জমিদারি রয়েছে রেশমপুরে। কিন্তু খাজনা বাকি পড়ার কারণে সূর্যাস্ত আইনে তার জমিদারি নিলামে ওঠার উপক্রম হয়। তিনি বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নিতে শহরে যান। এ বিষয়টি তিনি পুত্র হাশেম আলি ও স্ত্রী খোদেজার কাছে গোপন রাখেন। চিকিৎসার অজুহাতে শহরে এসে অর্থ সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কারণ জমিদারি হারালে তিনি স্বর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসবেন এবং তার পুত্র হাশেম আলিকে ছাপাখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে পারবেন না। জমিদার হাতেম আলি তার আসন্ন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।

উত্তরঃ

হাশেম আলি রেশমপুরের জমিদার হাতেম আলির পুত্র। 'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হাশেম আলি। সে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং উদার মানবিকতাবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। 'বহিপীর' নাটকের নাম-চরিত্র বহিপীরের বিপরীত চরিত্র হাশেম আলি। নাটকের আখ্যানভাগে সে অত্যন্ত দৃঢ়তা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বহিপীরের সকল কূটচালকে মোকাবিলা করেছে এবং পরিশেষে বিজয়ী হয়েছে। বহিপীর তার জাগতিক স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে হাশেম ইতিবাচকভাবে জীবন ও জগৎকে দেখেছে। মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বোধে বিশ্বাসী হাশেম আলি বিপন্ন তাহেরার পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়িয়েছে নতুন দিনের অগ্রপথিক হিসেবে। সে সমাজের প্রথাগত ধ্যানধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। এদিক থেকে তাকে এ উপন্যাসের নায়ক চরিত্র রূপে অভিহিত করা যায়। ডেমরার ঘাটে একটি বিপন্ন মেয়েকে বজরায় আশ্রয় দেন হাশেমের মা খোদেজা। মেয়েটি বহিপীরের স্ত্রী তা জানার পর বহিপীর তাকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে সে প্রতিবাদ জানায়। প্রতিবাদী তাহেরার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করেছে হাশেম আলি। তাহেরার সমস্যার প্রকৃতি অনুধাবন করে সে তার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে পড়ে। তাহেরা আত্মহনন করতে গেলে সে তাকে রক্ষা করেছে। তার মা, বহিপীর ও অন্যরা তাহেরার বিরুদ্ধে গেলেও সে শেষ পর্যন্ত তার পক্ষে থেকেছে। মেয়েটির প্রতি মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সে তার অবস্থানে অটল ছিল। এক্ষেত্রে তার মায়ের সাবধানবাণী, বহিপীরের ভীতি প্রদর্শন, পিতার 'করুণ মুখ কোনোকিছুই তাকে সংকল্প থেকে টলাতে পারেনি। বিপন্ন তাহেরার প্রতি হাশেমের এ মনোভাব তাকে উদার ও মানবিক চরিত্ররূপে ফুটিয়ে তুলেছে।

হাশেম আলি চরিত্রটি আধুনিক সত্তার প্রতীক। তার ব্যক্তিজীবনে নানাবিধ বাধা, সংকট ও সমস্যা রয়েছে। পিতার জমিদারি হারানোর শঙ্কা, প্রেস স্থাপন করতে না পারা, আর্থিক বিপর্যয় ইত্যাদি বিষয় তাকে মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। আবার তাহেরাকে রক্ষা করতে তাকে নিয়ে নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি সামাজিক প্রথা ও বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। নিজের জীবনে অনিশ্চয়তা থাকলেও তাহেরাকে নিয়ে সে নতুন জীবনের পথে পাড়ি দিয়েছে। চিন্তাভাবনা ও মানসিকতার দিক থেকে হাশেম আলি তৎকালীন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি থেকে প্রাগ্রসর ছিল। তাই বলা যায়, 'বহিপীর' নাটকে হাশেম আলি নতুন দিনের অগ্রপথিক।

1.6k

Related Question

View All
উত্তরঃ

আলোচ্য উক্তিটি প্রখ্যাত সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি বা পিসির মুখনিসৃত। স্বামীর অবহেলা, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন এবং প্রতিকূল পরিবেশের মুখেও আহ্লাদির অসাধারণ দৃঢ়তা, ধৈর্য ও প্রতিবাদী সত্তা দেখে তার মাসি বা পিসি বিস্মিত হয়ে এই উক্তিটি করেছিলেন।

যুগ যুগ ধরে নারীত্বের যে দুর্বল, লাঞ্ছিত ও অসহায় প্রতিচ্ছবি সমাজে প্রচলিত ছিল, আহ্লাদি যেন তা ভেঙে দিয়েছিল। চরম বিপদেও আহ্লাদি যখন হাল না ছেড়ে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট ছিল এবং তার মাসি-পিসির সাথে এক হয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার এই অদম্য মানসিকতা মাসি-পিসিকে বিস্মিত করেছিল। নারীও যে এত দৃঢ়চেতা হতে পারে, তা তারা কল্পনাই করতে পারেননি, এই উক্তির মাধ্যমে সে বিস্ময়ই প্রকাশিত হয়েছে।

Satt AI
Satt AI
1 month ago
2.5k
উত্তরঃ

'বহিপীর' নাটকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় ভণ্ডামি, অন্ধ বিশ্বাস এবং পীরতন্ত্রের নামে সমাজে প্রচলিত শঠতাকে তীক্ষ্ণভাবে সমালোচনা করেছেন। এই নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পুরনো ও প্রথাগত পীরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আধুনিক, যুক্তিবাদী ও মানবিক চিন্তাধারার সংঘাত।

উদ্দীপকে আব্দুল্লাহর বাবা একজন নামকরা পীর ছিলেন এবং তাঁর অসংখ্য মুরিদান ছিল। তারা আব্দুল্লাহকেও পীর হিসেবে সেবা করতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আব্দুল্লাহ এই ধরনের পীরতন্ত্র ও অন্ধ আনুগত্য পছন্দ করতেন না। একজন মুরিদান যখন তাঁর পায়ে সালাম করতে যায়, তখন তিনি তাকে বাধা দিয়ে দ্রুত সরে যান। এখানে আব্দুল্লাহর আধুনিক ও যুক্তিবাদী মনোভঙ্গি ফুটে উঠেছে, যা 'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় সংঘাতের একটি দিক, যেখানে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিপরীতে আধুনিক চিন্তাভাবনাকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মূলত, উদ্দীপকে আব্দুল্লাহর পীরতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান এবং মুরিদানের অন্ধ বিশ্বাস যে পীরের মাধ্যমে বেহেশতের চাবি পাওয়া যায়— এই ধারণাটি 'বহিপীর' নাটকের সেই দিকটিকে প্রতিফলিত করে যেখানে লেখক পীরেরা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অজ্ঞতা ও সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে কীভাবে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, তা উন্মোচন করেছেন। আব্দুল্লাহর চরিত্রটি যেন নাটকের ভেতরের সেই প্রতিবাদী সুরের প্রতিধ্বনি, যা শিক্ষা ও যুক্তির আলোকে অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং মানবিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেয়।

Satt AI
Satt AI
4 weeks ago
1.5k
উত্তরঃ

উদ্দীপকের আব্দুল্লাহ্ এবং ‘বহিপীর’ নাটকের বহিপীরের মধ্যে চেতনাগত প্রকট বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। আব্দুল্লাহ্ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন প্রগতিশীল মানুষ, যিনি ধর্মকে ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান না। অন্যদিকে, বহিপীর ধর্মকে পুঁজি করে নিজের ক্ষমতা ও আর্থিক সমৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য মানুষের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগান।

উদ্দীপকের আব্দুল্লাহ্ তাঁর পিতার নামজাদা পীর পরিচয় এবং অসংখ্য মুরিদান থাকা সত্ত্বেও পীরতন্ত্রের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে তিনি বুঝতে পারেন যে, পীর মুরিদের সম্পর্ক মূলত একটি কুসংস্কারের বেড়াজাল, যা মানুষের অজ্ঞতাকে ব্যবহার করে টিকিয়ে রাখা হয়। যখন একজন মুরিদান তাঁর পায়ে সালাম করতে আসে, তখন তিনি তাকে দ্রুত বাধা দিয়ে সরে যান, যা তাঁর কুসংস্কারমুক্ত এবং আত্মমর্যাদাশীল চেতনার পরিচয় বহন করে। তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পীরগিরি থেকে নিজেকে দূরে রেখে প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী জীবনযাপনে বিশ্বাসী।

অপরদিকে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত ‘বহিপীর’ নাটকের বহিপীর ধর্মকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেন। তিনি একজন ভণ্ড পীর, যিনি নিজের পানিপড়া ও তাবিজের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান। হাতেম আলীর সংসারে প্রবেশ করে রমাকে জোরপূর্বক বিয়ে করার প্রচেষ্টা এবং এর মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা লাভের চেষ্টা বহিপীরের অর্থলিপ্সা, ক্ষমতার মোহ ও ধর্মকে ব্যবসার পণ্য বানানোর প্রবণতাকে ফুটিয়ে তোলে। তিনি সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার ও মানুষের ধর্মীয় সরলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান এবং এর জন্য নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করতেও পিছপা হন না।

সার্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়, আব্দুল্লাহ্ আধুনিক মনস্কতার প্রতীক, যিনি মানুষের কুসংস্কার দূর করতে চান এবং নিজেই এই ধরনের প্রথা থেকে দূরে থাকতে চান। বিপরীতে, বহিপীর ভণ্ডামি ও স্বার্থপরতার প্রতীক, যিনি ধর্মকে ব্যবহার করে সমাজে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন এবং মানুষের সরল বিশ্বাসকে শোষণ করেন। এই দুই চরিত্রের চেতনাগত বৈসাদৃশ্য প্রগতিশীলতা বনাম রক্ষণশীলতা, আত্মমর্যাদা বনাম ভণ্ডামি এবং মানবতাবাদ বনাম অর্থলিপ্সার দ্বন্দ্বকে নির্দেশ করে।

Satt AI
Satt AI
4 weeks ago
545
উত্তরঃ

বহিপীর নাটকের কেন্দ্রীয় ও নাম চরিত্র। তার বাড়ি উত্তরের সুনামগঞ্জ। সাধারণের ভাষা তার কাছে অপবিত্র মনে হওয়ায় তিনি বহি বা বইয়ের ভাষায় কথা বলেন। এ কারণেই তার নাম বহিপীর

Abdullah Ahmed
Abdullah Ahmed
3 years ago
6.7k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews