উত্তরঃ
'বহিপীর' নাটকের তাহেরার চরিত্রটি একই সাথে স্বাধীনচেতা, আধুনিক, অধিকার সচেতন, অনমনীয় ও মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত নারীর প্রতীক।
'বহিপীর' নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র তাহেরা। তাকে কেন্দ্র করেই নাটকের ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে। এমনকি নায়ক চরিত্র হাশেম আলি ও খলনায়ক চরিত্র বহিপীরের মধ্যকার চূড়ান্ত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু তাহেরা। তাই এই চরিত্রটি সবচেয়ে গুরুত্ববহ চরিত্র।
তাহেরা বিশ শতকের আধুনিক নারী স্বাধীনতা ও জাগরণের প্রতীক। সমাজের প্রচলিত প্রতিবন্ধকতাকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। অধিকারের প্রশ্নে পরিবার-পরিজনকে ত্যাগ করতেও দ্বিধান্বিত হয়নি। তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তার চরিত্রকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল করে তুলেছে।
বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিজের মতামতকে উপেক্ষা করায় সে সংসার ত্যাগ করেছে। অনিশ্চিত অজানার পথে পা বাড়াতে সে-দ্বিতীয়বার ভাবেনি। বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে মতামত না নিয়ে বিয়েকে সে বলিষ্ঠ কণ্ঠে অস্বীকার করেছে। শরিয়তি বিয়ের অজুহাত, বৃদ্ধের প্রতি সহানুভূতি, পুলিশের ভয় কোনোকিছুই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারেনি। প্রয়োজনে সে আত্মহত্যা করবে, তবু বহিপীরের সাথে যাবে না।
তবে আশ্রয়দাতা হাতেম আলির অসহায় মুখচ্ছবি তাকে বিচলিত করেছে। আশ্রয়দাতার উপকারে লাগার কৃতজ্ঞতাবোধ তার চরিত্রকে মানবিক করে তুলেছে। জমিদারি রক্ষার টাকা পাওয়ার বিনিময়ে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন শর্তকে মেনে নিয়ে সে বহিপীরের সাথে ফিরে যেতে রাজি হয়েছে।
বিশ শতকের নারীজাগরণের সব গুণ তাহেরার মাঝে ফুটিয়ে তুলেছেন নাট্যকার। সে অনমনীয়, কিন্তু অমানবিক নয়; সে স্বাধীনচেতা, কিন্তু অবিবেচক নয়। সে আধুনিক, ঐশ্বর্যময়ী, অবিচল নারীসত্তার ধারক। ব্যক্তিত্বের গুণে সে মহিমান্বিত হয়েছে। কৃতজ্ঞতাবোধকে সে খাটো করে দেখেনি। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে একচুল ছাড় না দেওয়া তাহেরা জমিদারি বাঁচাতে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন শর্তে নিজেকে বলি দিতে প্রস্তুত। দুঃসাহসের সাথে সে সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেছে; ঘরবাড়ি ছেড়ে নিজেকে চালিয়েছে নিজের মতো। জীবন কীভাবে চলবে, সামনে কোন কঠিন মুহূর্ত অপেক্ষা করছে সেই ভাবনায় কখনোই বিচলিত নয় সে। নিজের স্বাধীনতা, স্বকীয়তাকে তাহেরা রেখেছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। হাশেমের সাথে অচেনা-অজানা-অনিশ্চিতের পথে যেতেও সে ভাবিত নয়।