যে গ্রন্থে অতি প্রাকৃতিক সত্তা (ভগবান, ঈশ্বর ইত্যাদি) ও কল্যাণকর জীবন যাপন সম্পর্কে আলোচনা, উপদেশ ও উপাখ্যান লেখা থাকে, তাকে ধর্মগ্রন্থ বলে। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, শ্রীচন্ডী, প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ। আমরা জানি, বেদ হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থ। এ অধ্যায়ে সংক্ষেপে বেদ ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- ধর্মগ্রন্থের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব
- ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বেদ ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সাধারণ পরিচয় ব্যাখ্যা করতে পারব
- জীবনাচরণে বেদের শিক্ষা বর্ণনা করতে পারব
- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের কয়েকটি বাণী ব্যাখ্যা করতে পারব
- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব
- বেদ ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সন্ধ্যেবেলায় পুরোহিত মহাশয় মন্দিরে আগুন জ্বালিয়ে বেদের মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবতাদের আহ্বান জানালেন। তার এ কাজে আরও পাঁচ-ছয় ভক্ত অংশ নিলেন।
আমরা জানি, যে গ্রন্থে অতি প্রাকৃতিক সত্তার কথা থাকে, তাকে ধর্মগ্রন্থ বলা হয়। ধর্মগ্রন্থে থাকে ঈশ্বরের বাণী ও মাহাত্ম্যের বর্ণনা। থাকে সৎ ও পরিশুদ্ধ জীবন-যাপনের বিধিবিধান। আমাদের মঙ্গল হয় এমন উপদেশ থাকে। এ সকল উপদেশ যে কেবল সরাসরি দেয়া হয় তা নয়। উপাখ্যানের মধ্য দিয়েও বিভিন্ন উপদেশ দেওয়া হয়। উপদেশের মাধ্যমে আমরা পাই নৈতিক শিক্ষা। এ নৈতিক শিক্ষা আমাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। আমাদের অনেক ধর্মগ্রন্থ আছে। যেমন: বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি।
বেদ হিন্দুদের আদি এবং প্রধান ধর্মগ্রন্থ। 'বেদ' শব্দের অর্থ জ্ঞান। জ্ঞান পবিত্র, বিচিত্র ও সুন্দর। এ জ্ঞান স্রষ্টা ও প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান। জ্ঞানের কি শেষ আছে? জ্ঞান কি চেষ্টা ছাড়া পাওয়া যায়? তার জন্য চেষ্টা করতে হয়, সাধনা করতে হয়। গভীর চিন্তায় ডুবে যাওয়া বা নিমগ্ন হওয়াকে বলে ধ্যান। ধ্যানে সত্যকে উপলব্ধি করা যায়। সত্য চিরন্তন, সনাতন। যা সনাতন তার অন্ত নেই। এ সত্য সৃষ্টি করা যায় না, এ সত্য গভীর ধ্যানের আলোকে দর্শন করা যায়- উপলব্ধি করা যায়।

প্রাচীনকালে যাঁরা সত্য বা জ্ঞান এবং স্রষ্টার মাহাত্ম্য দর্শন বা উপলব্ধি করতে পারতেন, তাঁদের বলা হতো ঋষি। বেদ এই ঋষিদের ধ্যানলব্ধ পবিত্র জ্ঞান। ধ্যানের মাধ্যমে ঋষিগণ সেই সত্য দর্শন করে তাকে ভাবের আবেগে প্রকাশ করেছেন। এ জন্যই বলা হয়, বেদ সৃষ্ট নয়, দৃষ্ট। অর্থাৎ বেদ কেউ সৃষ্টি করেননি, উপলব্ধি করেছেন মাত্র।
| একক কাজ: ধর্মগ্রন্থ ও সাধারণ গ্রন্থের মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত কর। |
বেদে বহু দেব-দেবীর বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন অগ্নি, সূর্য, ইন্দ্র, বিষ্ণু, বায়ু, বরুণ, রুদ্র, যম, ঊষা, বাক্, রাত্রি, সরস্বতী ইত্যাদি। তবে বেদে বলা হয়েছে, একই পরমাত্মা থেকে সকল দেব-দেবীর উদ্ভব। প্রত্যেকের গুণ ও শক্তি ভেদে তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন দেব-দেবী রূপে প্রকাশিত।
ঋষিগণ এই দেব-দেবীর মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন। তাঁদের স্তুতি বা প্রশংসা করেছেন এবং অসাধারণ শক্তি ও প্রভাবসম্পন্ন দেব-দেবীর কাছে ধন-সম্পদ, সুখ ও শান্তি প্রার্থনা করেছেন। ঋষিগণ বেদের দেবতাদের তিন ভাগে ভাগ করেছেন-

১. স্বর্গের দেবতা এঁদের ক্ষমতাই শুধু বোঝা যায়। এঁরা পৃথিবীতে নেমে আসেন না। যেমন- সূর্য, যম, বরুণ, প্রভৃতি।

২. অন্তরীক্ষের দেবতা: এঁদের উনাদের ক্ষমতা বোঝা যায়, দেখাও যায়। তাঁরা মর্ত্যে নেমে আসেন কিন্তু অবস্থান করেন না। যেমন- ইন্দ্র, বায়ু ইত্যাদি।
৩. মর্ত্যের দেবতা: যে সকল দেবতা মর্ত্যে বা পৃথিবীতে আসেন এবং অবস্থান করেন তাঁদের বলা হয় মর্ত্যের দেবতা। যেমন- অগ্নি দেবতা।

অগ্নিকে আমরা পৃথিবীতে দেখতে পাই। তাই তাঁর কাছে ভালো ভালো জিনিস উৎসর্গ করে তাঁরই মাধ্যমে অন্যান্য দেবতাদের নিকট প্রার্থনা জানানো হয়। এভাবে আগুন জ্বেলে বেদের মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবতাদের আহ্বান জানানো এবং এই প্রার্থনা করাকে যজ্ঞ বলা হয় ।
বেদের ছন্দোবদ্ধ বাক্যকে বলা হয় মন্ত্র। ঋষিরা বেদ থেকে মন্ত্র উচ্চারণ করে ধর্মানুষ্ঠান বা উপাসনা করেছেন। বৈদিক উপাসনা পদ্ধতি ছিল যজ্ঞ বা হোম করা। এছাড়া বেদের বাক্য সুর দিয়ে যজ্ঞের সময় গান করা হয়। বেদে রয়েছে এই রকম কিছু গান। এই গানকে বলা হতো সাম। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের বিচিত্র জ্ঞানের কথাও বেদে রয়েছে।
| দলীয় কাজ: স্বর্গ, মর্ত্য ও অন্তরিক্ষের দেব-দেবীর একটি তালিকা তৈরি কর। |
বেদের শ্রেণিবিভাগ
বিষয়বস্তু ও রচনা রীতির পার্থক্য সামনে রেখে বেদের শ্রেণিবিভাগ করেছেন মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। বেদকে তিনি বিভক্ত করেছেন বলে তাঁকে বলা হয়েছে বেদব্যাস। বেদকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ।

১. ঋগ্বেদ ঋক্ মানে মন্ত্র। ঋগ্বেদে রয়েছে স্তুতি ও প্রার্থনামূলক মন্ত্র। স্তুতি মানে প্রশংসা আর প্রার্থনা মানে কোনো কিছু চাওয়া। প্রার্থনা করে এক এক দেবতার কাছ থেকে এক এক বিষয় চাওয়া হয়। এখানে ১০৪৭২টি মন্ত্র রয়েছে। এগুলো পদ্যে বা ছন্দে রচিত যা এক ধরনের কবিতা। ঋগ্বেদ অগ্নি, ইন্দ্র, বিষ্ণু, ঊষা, রাত্রি প্রভৃতি দেব-দেবীর স্তুতি ও প্রার্থনামূলক মন্ত্রের সংগ্রহ।
২. সামবেদ সাম মানে গান। এই বেদে সংগৃহীত হয়েছে গান। যজ্ঞ করার সময় কোনো কোনো ঋক বা মন্ত্র আবৃত্তি না করে সুর করে গাওয়া হতো। যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্যে এই গান গাওয়া হয়। সামবেদে সর্বমোট ১৮১০টি মন্ত্র আছে।
৩. যজুর্বেদ যজুঃ মানে যজ্ঞ। যজুর্বেদে রয়েছে এমন কিছু মন্ত্র যেগুলো যজ্ঞ করার সময় উচ্চারিত হয়। এখানে যজ্ঞের নিয়ম পদ্ধতিও বর্ণিত হয়েছে। এটি কৃষ্ণ যজুর্বেদ ও শুক্ল যজুর্বেদ নামে দুভাগে বিভক্ত। দুটিতে মোট ৪০৯৯টি মন্ত্র রয়েছে।
৪. অথর্ববেদ চিকিৎসা বিজ্ঞান, বাস্তুকলা, ইত্যাদি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের জ্ঞান নিয়ে সংকলিত হয়েছে অথর্ববেদ। এখানে প্রায় ৬০০০টি মন্ত্র রয়েছে। এই যে বেদের চারটি ভাগ, এর একেকটি ভাগকে সংহিতা বলা হয়েছে। যেমন- ঋগ্বেদ সংহিতা, সামবেদ সংহিতা, যজুর্বেদ সংহিতা এবং অথর্ববেদ সংহিতা।
একক কাজ: ছকে প্রদত্ত বেদ-এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কমপক্ষে দুটি বাক্য লিখে ছক পূরণ কর। | ঋগ্বেদ | সামবেদ | যজুর্বেদ | অথর্ববেদ |
|
|
|
|
নতুন শব্দ: নিমগ্ন, উপলব্ধি, সনাতন, ধ্যানলব্ধ, দৃষ্ট, মাহাত্ম্য, অন্তরীক্ষ, মর্ত্য, স্তুতি, ঋক্, সাম, যজুঃ, সংহিতা, বাস্তুকলা।
বেদ পাঠ করলে স্রষ্টা, বিশ্বপ্রকৃতি ও জীবন সম্পর্কে জ্ঞানলাভ হয়। প্রত্যেকটি বেদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঋগ্বেদ সংহিতা পাঠ করলে আমরা বিভিন্ন দেব-দেবীর সম্পর্কে জানতে পারি এবং এর মাধ্যমে দেব-দেবীর স্তুতি বা প্রশংসা করতে শিখি। অগ্নি, ইন্দ্র, ঊষা, রাত্রি, বায়ু প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করা যায়। তাঁদের কর্মচাঞ্চল্যকে আদর্শ করে, আমরা আমাদের জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করব। যজ্ঞের মন্ত্রের সংগ্রহ হচ্ছে যজুর্বেদ। এ থেকে জানতে পারি সেকালে উপাসনা পদ্ধতি কেমন ছিল। যজুর্বেদ অনুসরণে বিভিন্ন সময়ে যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষপঞ্জি বা ঋতু সম্পর্কে ধারণা জন্মে। বিভিন্নভাবে এবং বিভিন্ন সময়ব্যাপী যজ্ঞানুষ্ঠান করা হতো। যজ্ঞের বেদি নির্মাণের কৌশল থেকেই জ্যামিতি বা ভূমি পরিমাপ বিদ্যার উদ্ভব ঘটেছে। সামবেদ থেকে সেকালের গান ও রীতি সম্পর্কে জানতে পারি।
অথর্ববেদ হচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল। এখানে নানা প্রকার রোগব্যাধি এবং সেগুলোর প্রতিকারের উপায় স্বরূপ নানা প্রকার লতা, গুল্ম বৃক্ষাদির বর্ণনা করা হয়েছে। আয়ুর্বেদ নামে চিকিৎসা শাস্ত্রের আদি উৎস এই অথর্ববেদসংহিতা। বলা যায়, অথর্ববেদ থেকে জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। সুতরাং সমগ্র বেদ পাঠে পরমাত্মা, বৈদিক দেব-দেবী, যজ্ঞ, সঙ্গীত, চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ের জ্ঞান লাভ করে জীবনকে সুন্দর, সুস্থ ও পরিপাটি করে তোলা যায়। আর এজন্যই এ গ্রন্থ আমাদের প্রত্যেকের পাঠ করা অবশ্য কর্তব্য।
দলীয় কাজ: ছক পূরণ
বেদ-এর শ্রেণি বিভাগ | শিক্ষা |
ঋগ্বেদ |
|
সামবেদ |
|
যজুর্বেদ |
|
অথর্ববেদ |
|
নতুন শব্দ: কর্মচাঞ্চল্য, বর্ষপঞ্জি, স্বরূপ, গুল্ম।
মহাভারত আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। এ গ্রন্থটি আঠারোটি পর্ব নিয়ে সৃষ্টি। ভীষ্মপর্ব মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এই পর্বে মোট আঠারোটি অধ্যায় রয়েছে। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের এই অধ্যায়সমূহ ২৫ থেকে ৪২ পর্যন্ত বিন্যস্ত, যাতে হস্তিনাপুর রাজ্যে সংঘটিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে। আমরা অনেকেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কাহিনি ছোটদের মহাভারত পড়ে কিংবা টিভি চ্যানেলে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক থেকে জেনেছি। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুন যখন যুদ্ধ করতে অসম্মতি প্রকাশ করলেন তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে সকল উপদেশ দিয়েছিলেন, তারই গ্রন্থরূপ হলো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। এই গ্রন্থে সর্বমোট সাতশত শ্লোক রয়েছে। এ জন্য এ গ্রন্থের অপর নাম সপ্তশতী। এবার আমরা হস্তিনাপুরের কুরুক্ষেত্রে সংঘটিত যুদ্ধের কাহিনি থেকে আমাদের এই পবিত্র ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণালাভ করব।

ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু দুই ভাই। ধৃতরাষ্ট্র বড়, পাণ্ডু ছোট। ধৃতরাষ্ট্রের একশ ছেলে আর এক মেয়ে। যেমন- দুর্যোধন, দুঃশাসন ইত্যাদি ও মেয়ে দুঃশলা। পান্ডুর পাঁচ ছেলে- যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেব। কুরুবংশের নাম অনুসারে ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানদের বলা হয় কৌরব। আর পান্ডুর নাম অনুসারে তার সন্তানদের বলা হয় পাণ্ডব। রাজ্য নিয়ে এই কুরু-পাণ্ডবের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন অবতাররূপে দ্বারকার রাজা ছিলেন। তিনি নিরস্ত্র অবস্থায় অর্জুনের রথের সারথি হয়েছিলেন। রথ যখন দুইপক্ষের সৈন্যদের মাঝখানে রাখা হলো তখন অর্জুন স্বপক্ষ ও বিপক্ষ দলের নিকট আত্মীয়-স্বজনদের দেখে মুষড়ে পড়লেন। অতি নিকট আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। তিনি ঠিক করলেন যুদ্ধ করবেন না। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তি প্রভৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন উপদেশ দেন।
সেই উপদেশ বাণীই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বর্ণিত হয়েছে। তাঁর উপদেশ শুনে অর্জুন যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ হন। উপলক্ষ অর্জুন হলেও গীতায় ভগবান যে উপদেশ দিয়েছেন, তা সকল কালের সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
| একক কাজ: পান্ডব ও কৌরবদের বংশধর চিহ্নিত কর। |
নতুন শব্দ : সপ্তশতী, সারথি, উদ্বুদ্ধ, কুরু।
গীতায় ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এবং ফলের আশা না করে নিজের কাজ করতে বলা হয়েছে। কাজটাই বড়, ফল যা-ই হোক। কর্মফলের কথা চিন্তা করতে থাকলে কাজের প্রতি একাগ্রতা আসে না। এভাবে ফলের আশা না করে কাজ করাকে বলে নিষ্কাম কর্ম। এ প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূমা তে সঙ্গোহত্ত্বকর্মণি।। গীতা-২/৪৭
অর্থাৎ কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনও তোমার অধিকার নেই। কর্মফলের প্রতি তুমি আসক্ত হয়ে যেন নিজ কর্তব্যের প্রতি অবহেলা না করো।
অর্জুন যে আত্মীয়দের সাথে যুদ্ধ করতে চাইছেন না, এতে কোন লাভ হচ্ছে না। এর কারণ আমাদের জন্ম এবং মৃত্যু ঈশ্বরের হাতে। সুতরাং কারো মৃত্যু অর্জুনের যুদ্ধ করা বা না করার ওপর নির্ভর করে না। অর্জুন নিজেই কি জানেন কখন তাঁর মৃত্যু ঘটবে! তাছাড়া ঈশ্বরই আত্মারূপে আমাদের মধ্যে থাকেন। তাই মৃত্যুর মাধ্যমে দেহের ধ্বংস হলেও, আত্মার ধ্বংস হয় না। আত্মাকে অগ্নি, বায়ু, জল- কেউ ধ্বংস করতে পারে না।
এক্ষেত্রে বলা হয়েছে-
ন জায়তে প্রিয়তে বা কদাচিৎ
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।। গীতা- ২/২০
অর্থাৎ আত্মার কখনও জন্ম বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাণ।
শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না। আত্মা সনাতন, অবিনশ্বর। শুধু স্থানান্তর হয়। আত্মাকে এভাবে জানতে পারলে আর দুঃখ থাকে না। তখন সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় সমান হয়ে যায়। গীতায় যোগের কথা বলা হয়েছে। যোগ হচ্ছে কর্মের কৌশল বা উপায়। নিষ্কাম কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ বা ভক্তিযোগ দ্বারা ঈশ্বরকে লাভ করা যায়। যিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্য বা অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য আরাধনা করেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাকে ভক্ত বলেছেন। ভক্ত চার রকম যথা- আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু আর জ্ঞানী। যিনি বিপদে পড়ে ঈশ্বরকে ডাকেন তিনি আর্তভক্ত। যিনি কোন ইচ্ছা বা প্রার্থনা পূরণের জন্য ঈশ্বরকে ডাকেন, তাঁকে অর্থার্থী ভক্ত বলা হয়। যিনি জ্ঞানের দ্বারা ঈশ্বরকে জানতে চান তিনি হচ্ছেন জিজ্ঞাসু ভক্ত। আর যিনি কোন কিছু পেতে না চেয়ে ঈশ্বরকে ভক্তি করেন এবং এজন্য তাকে ডাকেন, তাকে জ্ঞানীভক্ত বলা হয়। গীতা সব উপনিষদের সারকথা। ঈশ্বর বা ব্রহ্ম সম্পর্কে ধারণা এক জায়গায় সমন্বিতরূপে প্রকাশ করা হয়েছে। গীতামাহাত্ম্যে তাই বলা হয়েছে উপনিষদ যেন গাভী স্বরূপ, আর দুগ্ধ হচ্ছে গীতা। গোবৎস যেমন একটু একটু আঘাত করে দুধ বের করে, অর্জুন তেমনি গোবৎসের মতো প্রশ্ন করে একটু একটু আঘাত করেছেন। আর গীতারূপ দুধ দোহন করেছেন অর্থাৎ গীতারূপ জ্ঞানের কথা স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে শ্রবণ করেছেন।
| একক কাজ: গীতার উপদেশসমূহ চিহ্নিত কর এবং সমাজের মঙ্গলের জন্য তুমি যে ধরনের কাজ করতে চাও তার একটি তালিকা তৈরি কর। |
উল্লিখিত ভক্ত সম্পর্কে দুটি বাক্য লিখে ঘরগুলো যথার্থভাবে পূরণ কর | আর্তভক্ত | অর্থার্থীভক্ত | জিজ্ঞাসুভক্ত | জ্ঞানীভক্ত |
|
|
|
|
নতুন শব্দ: আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু, সান্নিধ্য।
গীতা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার প্রেরণা দেয়। কারণ স্বয়ং ভগবানই যুগে যুগে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন এবং ধর্ম রক্ষার জন্য পৃথিবীতে অবতার রূপে নেমে আসেন।
তিনি বলেছেন-
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজম্যহম্ ॥
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।। গীতা-৪/৭-৮
অর্থাৎ যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান, তখনই সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্টলোকদের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপন করার জন্য আমি এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই।
আত্মার ধ্বংস নেই। -গীতার এই শিক্ষা আমাদের মৃত্যুকে ভয় না করে ভালো কাজে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়।
গীতায় বলা হয়েছে- ১. শ্রদ্ধাবান ও সংযমীই জ্ঞানলাভে সমর্থ হয় ২. অনাসক্ত কর্মযোগী মোক্ষ লাভ করেন ৩. জ্ঞানীভক্তই তাঁকে হৃদয়ে অনুভব করেন এবং ৪. এই বিশাল বিশ্বে যা কিছু আছে সবই ঈশ্বরের মধ্যে বিদ্যমান।
গীতার এই কথা থেকে আমরা শ্রদ্ধা ও সংযম সাধনার দিকে মনোনিবেশ করি। জাগতিক বিষয়ের প্রতি নির্মোহ হওয়ার প্রেরণা পাই। ধর্ম অনুশীলনের কাজে বিচারে প্রবৃত্ত হই অর্থাৎ অর্থহীন গতানুগতিক পথ পরিহার করে তত্ত্বের মর্মার্থ বোঝবার চেষ্টা করি। সবকিছু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্গত ভেদবুদ্ধি দূর করে দিয়ে অন্যকে ভালোবাসতে চেষ্টা করি। যে যেভাবে বা যে পথে ঈশ্বরকে ডাকতে চায় ডাকুক। ঈশ্বর সে ভাবেই তার ডাকে সাড়া দেন। এখানেই বেজে ওঠে ধর্মসমন্বয়ের সুর।
গীতায় জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে বাস্তব জীবনে কীভাবে চলতে হবে সেই পথও দেখানো হয়েছে। এসব দিক থেকে হিন্দুদের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গীতার গুরুত্ব অপরিসীম।
| একক কাজ: ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শিক্ষার প্রভাব লেখ। |
নতুন শব্দ : সংযমী, মোক্ষ, নির্মোহ, ভেদবুদ্ধি, প্রবৃত্ত ।
Read more