হিন্দুধর্মের স্বরূপ ও বিশ্বাস (তৃতীয় অধ্যায়)

হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

529

হিন্দুধর্ম একটি প্রাচীন ধর্ম। এ ধর্মের প্রকৃত নাম সনাতন ধর্ম। দেব-দেবীর পূজা অর্চনা হিন্দুধর্মের একটি বিশেষ দিক। এ ধর্মের মূলে রয়েছেন ভগবান। তাঁর অনুগ্রহ লাভের জন্য মানুষের ধর্মাচরণ করতে হয়। মানুষ ভক্তিভরে ভগবানের নিকট প্রার্থনা করলে ভগবান তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। বাস্তব জীবনে মা-বাবা সন্তানের লালন পালন ও সুখ সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করে থাকেন। সন্তানের উচিত দেবতা জ্ঞানে মা-বাবার সেবা-শুশ্রুষা করা। একই সাথে সমাজের অন্যান্য গুরুজনকে শ্রদ্ধা করা। এ অধ্যায়ে সনাতন ও হিন্দুধর্মের সম্পর্ক, হিন্দুধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস এবং ধর্ম বিশ্বাসের অঙ্গ হিসেবে গুরুজনে ভক্তি, মাতৃভক্তি, কর্তব্যবোধ ইত্যাদি দৃষ্টান্তমূলক উপাখ্যানসহ আলোচিত হয়েছে।

এ অধ্যায় শেষে আমরা -

  • সনাতনধর্ম ও হিন্দুধর্ম এ ধারণা দুটি ব্যাখ্যা করতে পারব
  • হিন্দুধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করতে পারব
  • হিন্দুধর্মের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করব
  • ধর্মবিশ্বাস ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে পারব
  • গুরুজনে ভক্তি ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে পারব
  • কীভাবে গুরুজনকে ভক্তি করতে হয় তা বর্ণনা করতে পারব
  • মাতৃভক্তির একটি গল্প বর্ণনা করতে পারব
  • ধর্মের আলোকে কর্তব্যবোধের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব
  • মাতা-পিতার প্রতি সন্তানদের কর্তব্য এবং সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার দায়িত্ব ও কর্তব্য ব্যাখ্যা করতে পারব
  • গুরুজনে ভক্তি ও কর্তব্য পালনে সচেতন হব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

মাধবী রানী তার ছেলেদের মাতৃভক্তি পরীক্ষা করার জন্য বললেন, এই যে রতন ও সুজন তোমরা দুজন থেকে যে আগে পৃথিবীকে ঘুরে এসে আমাকে প্রণাম করতে পারবে আমি তাকে গলার হার উপহার দেবো। রতন খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল আর সুজন মাকে প্রদক্ষিণ করে গলার হার পেয়ে গেল।

Please, contribute by adding content to হিন্দুধর্মের স্বরূপ.
Content

সনাতন ধর্ম ও হিন্দুধর্ম মূলত একই ধর্ম। অন্য কথায়, সনাতন ধর্মের অপর নাম হিন্দুধর্ম। সনাতন শব্দের অর্থ চিরন্তন। যা অতীতে ছিল বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে, সেটি সনাতন। সনাতন শব্দটিতে চিরদিনের কথা নির্দেশ করা হয়। সময়ের পরিবর্তনেও যার কোন পরিবর্তন হয় না সেটিই সনাতন। 'হিন্দু' শব্দটি এসেছে সিন্ধু শব্দ থেকে। সিন্ধুনদ প্রাচীনকাল থেকে প্রবাহিত। এই নদের তীরে প্রাচীনকালে সনাতন ধর্মের লোক বাস করত। তাদের আচার-আচরণ, ধর্ম বিশ্বাসে একটি বিশিষ্ট রূপ ছিল।

বিদেশিদের কাছে এদের পরিচয় হয় সিন্ধু নদের নামে। বিদেশিরাই সিন্ধু শব্দকে হিন্দু বলে উচ্চারণ করত। আর সেখানকার সনাতন ধর্মের লোকদেরকে তারা বলত হিন্দু। হিন্দুদের সনাতন ধর্মই তাদের ভাষায় হয়ে ওঠে 'হিন্দুধর্ম'।

এই ধর্ম অতি প্রাচীন। সময়ের অগ্রগতিতেও এ ধর্মের মূল ধারণাগুলোর কোন পরিবর্তন নেই। তবে দেশ-কালের প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে এ ধর্মে নতুন চিন্তা-চেতনা সংযুক্ত হয়েছে। হিন্দুধর্ম নামে নতুন নামকরণ হয়েছে। এভাবেই সনাতন ধর্মের বিকাশ ঘটেছে এবং ঘটছে।
মোটকথা, সনাতন ধর্মের নতুন পরিচয় হচ্ছে হিন্দুধর্ম নামে। সনাতন ধর্মে যে চিন্তা-চেতনা সেটিই হিন্দুধর্মের চিন্তা-চেতনা। হিন্দুধর্মের মূল ধর্মবোধ হচ্ছে- ঈশ্বরে বিশ্বাস, কর্মফলে বিশ্বাস, জন্মান্তরে বিশ্বাস, ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা, দেব-দেবীর পূজা-পার্বণ, জগতের কল্যাণ সাধন ইত্যাদি।
নতুন শব্দ: চিরন্তন, কর্মফল, সনাতন, জন্মান্তর।

Content added By

হিন্দুধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস সনাতন ধর্মের পরিচিতির মধ্যেই বর্তমান। সনাতন ধর্ম কোন একজন মাত্র মুনি, ঋষি বা অবতারপুরুষের প্রতিষ্ঠিত ধর্ম নয়। আদিম মানুষের মনে যখন সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়বোধ জেগেছিল- এক কথায়, ধর্মবোধ জেগেছিল, সেখান থেকে এ ধর্মের বিকাশ শুরু। আর সমাজের চিন্তাশীল ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের ধ্যান-ধারণার ফসল নিয়ে এ ধর্ম ক্রমশ বিকাশ লাভ করে।

হিন্দু ধর্মের মূলে রয়েছেন স্বয়ং ভগবান। ভগবান বা স্রষ্টা জগৎসৃষ্টির সাথে সাথে ধর্মেরও সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জীবন সুন্দর ও সুখময় করার জন্যই ধর্ম এসেছে। হিন্দু ধর্মের মূল বিশ্বাস হচ্ছে স্রষ্টা বা ভগবান আছেন। তাঁর সৃষ্ট জগতে মানুষকে কাজ করতে হচ্ছে। আর প্রতিটি কাজের যে ফল সেটিও মানুষকে ভোগ করতে হয়। একেই বলে কর্মফল- যা জন্মান্তরেও ভোগ করতে হয়। এর ফলে আসে জন্মান্তরের কথা। অমঙ্গল ও দুষ্টজনের অত্যাচার থেকে জগতকে মুক্ত করার জন্য ভগবান অবতাররূপে আবির্ভূত হন। ঈশ্বরের উপাসনা, নামজপ, কীর্তন এবং দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা, ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি ধর্মকর্মের অনুশীলন করে মানুষ সুখ শান্তি এবং মুক্তি লাভ করতে পারে।
সনাতন ধর্ম চিন্তায় যেমন ছিল পুনর্জন্ম, অবতার ও মোক্ষলাভের কথা- এ সবই রয়েছে হিন্দুধর্মে। তবে ধর্ম আচরণের পদ্ধতি হিসেবে কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রাচীনকালে সনাতন বা হিন্দু ধর্মে ধর্মানুষ্ঠান ছিল যজ্ঞক্রিয়া। সেটি ক্রমে দেব-দেবীর আরাধনায় রূপ নিয়েছে। যজ্ঞকর্মে দেব-দেবীর শক্তি ও রূপের বর্ণনা নিয়ে যজ্ঞক্রিয়া হতো। পরবর্তীকালে ঐ দেব-দেবীরই রূপ কল্পনা করে বিগ্রহ বা প্রতিমার মাধ্যমে পূজা-অর্চনার ব্যবস্থা হয়। সনাতন ধর্মের যে অবতার ও মোক্ষলাভের বিষয় রয়েছে এ সবই হিন্দুধর্মের সম্পদ। তবে ক্রমবিকাশের স্তরে স্তরে হিন্দুধর্মে আচার-আচরণে কিছু কিছু নতুনত্বও এসেছে। বৈদিক যুগের যজ্ঞক্রিয়া পূজা অর্চনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে আধুনিক হিন্দুধর্মে শুধু ঈশ্বরের নাম ও গুণকীর্তনের প্রচলন হয়েছে।

সনাতন ধর্মচর্চার আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদের একটি বিশিষ্ট রূপ ছিল। এদেশের বাইরে থেকে ইরান, গ্রিস প্রভৃতি দেশের জনগোষ্ঠী এখানে আসে। তারা সিন্ধুনদের তীরবর্তী লোকদেরকে একটি ভিন্ন মানবগোষ্ঠী মনে করত। বিদেশিদের উচ্চারণে সিন্ধু শব্দটির 'স'এর স্থলে 'হ' হয়ে উচ্চারিত হয়। ফলে সিন্ধু শব্দটি হয়ে পড়ে হিন্দু শব্দ। আর সিন্ধুনদের তীরবর্তী লোকজনও ঐ বিদেশিদের ডাকে হিন্দু হয়ে যায়। আর এটি আস্তে আস্তে দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এর ফলে এদেশে সনাতন ধর্মের অনুসারী মাত্রই হিন্দু নামে পরিচিত হয়।
হিন্দুধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঈশ্বরকে বিশ্বাস, ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা এবং একই সঙ্গে জগতের কল্যাণ সাধন। এখানে রয়েছে ঈশ্বর আরাধনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ। আর এ সুযোগের মধ্য দিয়ে মানুষ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সহজ সরল রূপ পেয়ে যায়। এভাবে এ ধর্মের অনুসারীরা মুক্তচিন্তার অধিকার পেয়ে গর্ববোধ করেন।

একক কাজ: হিন্দুধর্মের উৎপত্তির বিকাশ ধারাবাহিকভাবে লেখ।

নতুন শব্দ: সনাতন, অবতার, সিন্ধুনদ, যজ্ঞক্রিয়া, মোক্ষলাভ।

Content added By
Please, contribute by adding content to হিন্দুধর্মের বিশ্বাস.
Content

হিন্দুধর্ম কতিপয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এ বিশ্বাসগুলোকে এক কথায় বলা হয় ধর্মবিশ্বাস। ধর্মকর্ম অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মানুষ কল্যাণ লাভ করে। ধর্ম শব্দটির বিশেষ অর্থ হচ্ছে ধরে রাখার ক্ষমতা। ধর্ম মানুষকে কল্যাণের পথে চলার নির্দেশ দেয়। ধর্ম আচরণের রীতি-নীতি মানুষকে সুন্দর জীবন পথে চলতে সাহায্য করে। জীবনের কল্যাণ চিন্তা, ভালোভাবে জীবন যাপনের নির্দেশ লাভ করা যায় ধর্ম থেকে। ধর্মের বিধি-বিধান মেনেই মানুষ ইহকালে ও পরকালে মঙ্গল লাভ করতে পারে।
ধর্ম হচ্ছে ধারণশক্তি। সকল কল্যাণকামী গুণ বা গুণাবলী ধারণ করলে মানুষের জীবন বিকশিত হয় ও সার্থক হয়। ধর্মের এই গুণাবলি এবং এ গুলোর প্রতি যে বিশ্বাস, তাকেই এক কথায় ধর্মবিশ্বাস বলা যায়।

Content added By

গুরুজনে ভক্তি
বয়োজ্যেষ্ঠরা আমাদের গুরুজন। মা-বাবা, পিতামহ, মাতামহ, কাকা-কাকি, মামা-মামি, বড়ভাই ও বোনসহ অনেকেই আমাদের পরিবারের গুরুজন। পরিবারে আত্মীয়তার বন্ধনের মাধ্যমেও অনেক গুরুজন রয়েছেন। আবার শিক্ষকগণও আমাদের গুরুজন। যিনি দীক্ষাদান করেন তিনিও আমাদের গুরুজন। তাহলে আমাদের জীবন গঠনে মাতা, পিতা, শিক্ষকসহ বিভিন্ন গুরুজনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসকল গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাভরে ভালোবাসা প্রদর্শনের নামই ভক্তি। ভক্তিতে থাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং পুণ্য। ভক্তির মাধ্যমেই আমরা লাভ করি পুণ্য এবং মুক্তি।

গুরুজনে ভক্তির উপায়
মাতা ও পিতা আমাদের পরম গুরু। মা-বাবার স্থান আমাদের জীবনে সবার উপরে। এই পৃথিবীর আলো যিনি দেখিয়েছেন তিনি আমাদের মা। মায়ের সাথে রয়েছে আমাদের নাড়ির বন্ধন। মা আমাদের সুখের সাথি আবার দুঃখেরও ভাগীদার। আমাদের সৎ ও সুন্দর জীবন গঠনে মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। শিশুকাল হতে মা পরমযত্নে আমাদের বড় করে তোলেন। বড় হলেও মায়ের নিকট আমরা সর্বদাই শিশু। আমরা অনেকেই মাতৃপূজা করি। কোনো মঙ্গলযাত্রায় আমরা সর্বাগ্রে মাকে প্রণাম করি। আমাদের ধর্মে মায়ের স্থান সবার উপরে। মা সন্তানের ভক্তিতে সন্তুষ্ট থাকলে দেবতারাও তুষ্ট হন। তাই আমরা মায়ের কাজে সাহায্য করব। মায়ের আদেশ, নির্দেশ কর্তব্যজ্ঞানে মেনে চলব। কোনো কারণে মায়ের অন্তর কষ্ট পেলে মায়ের প্রতি ভক্তি বাধাপ্রাপ্ত হয়। পিতাও মায়ের মতো আমাদের আদর্শ জীবন গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকেন। পিতা সম্পর্কে আমাদের ধর্মে শ্লোক রয়েছে। যেমন-

পিতা স্বর্গঃ পিতা ধর্মঃ পিতাহি পরমন্তপঃ।
পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতাঃ

অর্থাৎ পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম পিতাই পরম তপস্যা। পিতা প্রীত হলে সকল দেবতাই তুষ্ট হন।
শিক্ষকগণ আমাদের শিক্ষাগুরু। শিক্ষক আমাদের জীবন চলার পথ প্রদর্শক। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের আলো শিক্ষকগণই জ্বালিয়ে রাখেন। তাদের আদেশ, নিষেধ মান্য করা আমাদের কর্তব্য। আবার দীক্ষাগুরু ও আমাদের গুরুজন। আমাদের জীবন চলার পথে ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা তারা দিয়ে থাকেন। এভাবে আমাদের জীবন চলার পথে সকল গুরুজনের প্রভাব রয়েছে। তাই আমরা সকল গুরুজনকেই মনে প্রাণে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করি।

একক কাজ: তোমার গুরুজন কারা এবং তাদেরকে তুমি কীভাবে ভক্তি কর?

এ প্রসঙ্গে মাতৃভক্ত গণেশ ও কার্তিকের গল্পটি স্মরণ করা যায়।

Content added By

মা দুর্গার ছেলে গণেশ ও কার্তিক। গণেশের দেহটি মোটাসোটা; ইঁদুর তাঁর বাহন। অপরদিকে কার্তিকের সুঠাম বলিষ্ঠ
দেহ; তাঁর বাহন ময়ূর। মা দুর্গা ঘোষণা করলেন, যে আগে পৃথিবী ঘুরে এসে মাকে প্রণাম করতে পারবে তাকেই তিনি গলার হার দেবেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হলো। গণেশ দেখলেন তাঁর বাহন ইঁদুরকে নিয়ে কার্তিকের বাহন ময়ূরকে হারানো সম্ভব নয়। তখন গণেশের মনে হলো, মাতা জগত্ৰুপিণী; তিনিই পৃথিবী। তাঁর চারিদিকে ঘুরে আসলেই পৃথিবী ঘোরা হয়ে যাবে। এই চিন্তা করে গণেশ ভক্তিভরে মায়ের চারিধার ঘুরে এসে মাকে প্রণাম করলেন। অপরদিকে কার্তিক দ্রুত গতিতে পৃথিবী ঘুরে এসে দেখেন গণেশের গলায় মা হারটি পরিয়ে দিয়ে গণেশকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। এ ঘটনার কারণ জানতে চাইলে মা দুর্গা কার্তিককে বললেন, গণেশ অত্যন্ত জ্ঞানী। সে জানে মাতাই পৃথিবী। তাই তাঁর চারপাশে ঘুরলে পৃথিবী ঘোরা হয়। গণেশের এ মাতৃভক্তি জগতে অমর হয়ে রয়েছে। সকল ছেলে-মেয়েরই উচিত মাতা-পিতাকে দেবতা জ্ঞানে ভক্তি করা, সেবা করা।
নতুন শব্দ : ধর্মবিশ্বাস, কর্তব্য, বাহন, প্রতিযোগিতা, জগত্ৰুপিণী, মাতৃভক্তি।

Content added By

যা কিছু করা হয় তাই কর্ম। আর যে সকল কর্ম অনুশীলন করা আবশ্যক তাই কর্তব্য। অর্থাৎ যা করা উচিত তাই আমাদের কর্তব্য। কর্তব্যের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ এবং মমত্ব জাগ্রত হওয়াকে বলে কর্তব্যবোধ। মাতা-পিতার আদেশ পালন, শিক্ষকের উপদেশ পালন, বৃদ্ধ মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের পরিচর্যা ও ভরণপোষণ, মাতা-পিতা কর্তৃক সন্তান লালন-পালন প্রভৃতি কর্তব্যবোধের উদাহরণ। আমাদের পরিবার ও সমাজে প্রত্যেকেরই নিজ নিজ কর্তব্য রয়েছে।
মাতা-পিতার কর্তব্য সন্তানকে সুষ্ঠুভাবে লালন পালন করা। সন্তানকে স্নেহ-যত্নে বড় করে তোলা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষিত করে তোলা। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। আবার সন্তানের কর্তব্য মাতা-পিতার আদেশ ও উপদেশ মেনে চলা। তাদের বিভিন্ন কাজে সহায়তা করা। মাতা-পিতার সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকা।
কর্তব্য পালন ধর্মের অঙ্গ। ছাত্রের কর্তব্য অধ্যয়ন করা। সংস্কৃতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ছাত্রানং অধ্যয়নং তপঃ। অর্থাৎ ছাত্রের একমাত্র কর্তব্য অধ্যয়ন করা। নিষ্ঠার সাথে কর্তব্য পালন করলে জীবনে অনেক বড় হওয়া যায়। যেমন-একজন শিক্ষার্থী যথাযথ কর্তব্য পালনের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। কর্তব্য পালনে যারা অবহেলা করে এবং অসচেতন থাকে তারা জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারে না।

একক কাজ: ছাত্র হিসেবে তোমার কর্তব্যসমূহ চিহ্নিত কর।
Content added By

সন্তান পরিবারের মধ্যেই লালিত-পালিত হয়। পরিবারে পিতা-মাতাই এই সন্তানকে বড় করে তোলে। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার যেমন ভূমিকা রয়েছে তেমনি পিতা-মাতার প্রতি সন্তানেরও ভূমিকা রয়েছে। বাল্য ও কৈশোরে আমরা পিতা-মাতার আদেশ ও উপদেশ মেনে চলি। পরিবারে আমরা মায়ের নানা কাজে সহায়তা করে থাকি। সন্ধ্যায় আমরা দেবতাদের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যা আরতি দেই, পূজা করি। কখনো কখনো আমরা রান্নার কাজে মাকে সহায়তা করি। আবার বাবার কাজেও আমরা তাকে সহায়তা করে থাকি। পারিবারিক কাজে পারস্পরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের পারিবারিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে। আমাদের পিতা-মাতা এতে আনন্দিত এবং সন্তুষ্ট হন। পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট ও আনন্দে রাখা আমাদের কর্তব্য ।

আমরা পড়াশুনায় ভালো করলেও পিতা-মাতা খুশি হন। পিতামাতাকে খুশি রাখা আমাদের কর্তব্য।
কর্তব্যবোধ মানুষের মহৎ গুণ। ধার্মিক সর্বদাই কর্তব্যপরায়ন। বৃদ্ধ পিতা-মাতার পরিচর্যা ও ভরণপোষণও আমাদের কর্তব্য। পিতা কিংবা মাতার অবর্তমানে তাদের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করাও আমাদের কর্তব্য। যেমন-পিতার অবর্তমানে মা, ছোট ভাই-বোন, প্রতিবন্ধী ভাই-বোন লালন-পালন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আর্থিক সহায়তাদান, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ গঠনে সহায়তা করা প্রভৃতি আমাদের কর্তব্য। আমাদের সকলের উচিত পিতা-মাতার ইচ্ছা, আবেগ ও অনুভূতির প্রতি অত্যন্ত সজাগ থাকা। পিতা-মাতা এতে খুশি হন। সুতরাং পিতা-মাতাকে খুশি ও আনন্দে রাখাও আমাদের কর্তব্য।
আমাদের সমাজ জীবনে দেখা যায় পিতার অবর্তমানে সম্পত্তি নিয়ে ভাই-ভাই ঝগড়া বিবাদ করে। পিতার অবর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারে বড়ভাই কিংবা অন্য কেউ সকলের ভরণ-পোষণসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন। পরিবারের শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে তারা পিতার মতোই ভূমিকা পালন করেন। এটিও সন্তানের কর্তব্য।

একক কাজ: পারিবারে পিতা-মাতার প্রতি আমরা কোন কর্তব্যগুলি পালন করে থাকি তা লেখ।
Content added By

সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য অশেষ। সন্তান গর্ভে ধারণ করা হতে ভূমিষ্ট পর্যন্ত মায়ের কষ্টের শেষ নেই। মায়ের এই কষ্টের মূল্য কোনো কিছুর সাথে তুলনীয় নয়। মা আমাদের লালন-পালন করেন। ঘুম পাড়ানির গান গেয়ে আমাদের ঘুমের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। বাবা সন্তানের আনন্দের ও সুখের সব আয়োজনই করেন। সন্তান বিদ্যালয়ে যাওয়ার পূর্বে মা ও বাবা উভয়েই সন্তানকে প্রস্তুত করে তোলেন। মা সন্তানকে মুখে মুখে কত স্বরধ্বনি- অ, আ, উ প্রভৃতি উচ্চারণ শেখান, ছড়া বলেন, গল্প বলেন আরো কতো কী। মা-বাবা সন্তানকে হাতেখড়িদানের আয়োজন করেন। সন্তান বিদ্যালয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মা বাবা তাদেরকে প্রস্তুত করে তোলেন। সন্তানের প্রতি মা-বাবার এ ধরনের আচরণ তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে এমনিতেই আসে।

সন্তান একদিন বিদ্যালয়, কলেজ পড়া শেষ করে উচ্চ শিক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। সন্তানের প্রতি মা-বাবার প্রত্যাশাও বাড়তে থাকে। সন্তানের ভবিষ্যত গড়ার সব আয়োজনে তাঁদের স্বপ্ন ও চেষ্টার শেষ থাকে না। সন্তানকে মা-বাবা তাঁদের স্বপ্নের কথা বলেন। সন্তান নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন। সন্তানের ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্নকেও মা-বাবা একধাপ এগিয়ে দেন। এখানেও মা-বাবা সন্তানের ভবিষ্যত গড়ার পথ প্রদর্শক। ধর্মে মা-বাবাকে সন্তান গড়ার কারিগর বলা হয়েছে।
সন্তানের চরিত্র ও নৈতিকতা গঠনে মা-বাবা নানা ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মা ও বাবা সব সময়ই চান তাঁদের সন্তান হবে আদর্শবান, সৎ, নির্ভিক, সদালাপি ও চরিত্রবান। পারিবারিক জীবনে সকল মা-বাবাই তাঁদের সন্তানকে এভাবে দেখতে চান এবং এ লক্ষ্যেই দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া নিজ কন্যা সন্তানকে সৎপাত্রে দান এবং পুত্রের জন্য সৎ পাত্রী নির্বাচন করে বিবাহের দায়িত্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রে মা-বাবাই পালন করে থাকেন। সুতরাং সন্তানের সুন্দর জীবনের জন্য মা-বাবার দায়িত্ব ও কর্তব্য ব্যাপক ও বিস্তৃত। মা-বাবাকে আমাদের ধর্মে দেব-দেবীর মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে।

একক কাজ: ভবিষ্যত জীবন গড়ার ক্ষেত্রে তোমার মা-বাবা কী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছেন তা চিহ্নিত কর।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...