সুখ
কামিনী রায়
নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?-
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যাতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
কেবলি কি নর জনম লয়?-
বল ছিন্ন বীণে, বল উচ্চৈঃস্বরে-
না, না, না, মানবের তরে
আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর
না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে।
কার্যক্ষেত্র ঐ প্রশস্ত পড়িয়া
সমর-অঙ্গন সংসার এই,
যাও বীরবেশে কর গিয়া রণ;
যে জিনিবে সুখ লভিবে সে-ই।
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ;
'সুখ' 'সুখ' করি কেঁদ না আর,
যতই কাঁদিবে, যতই ভাবিবে
ততই বাড়িবে হৃদয় ভার।
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী 'পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শিমুল ও জিহাদ দুই বন্ধু। শিমুল বিদেশে গিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন 'করে বাড়ি-গাড়ি' করেছে। অন্যদিকে জিহাদ উপার্জন করে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি অশিক্ষিত বয়স্ক লোকদের জন্য একটি নৈশ পাঠশালা খুলেছে।
বিষাদময় - দুঃখময়।
ছিন্ন - ছেঁড়া।
বীণে - বাদ্যযন্ত্র বিশেষের মাধ্যমে।
উচ্চৈঃস্বরে - চড়া গলায়। বলিষ্ঠ কণ্ঠে।
সৃজিলা - সৃষ্টি করলেন।
বিধি - বিধাতা। প্রভু।
নরে - মানুষকে।
সমর - সযুদ্ধ। লড়াই। রণ।
কার্যক্ষেত্র - কাজের জায়গা।
প্রশস্ত - প্রসারিত।
অঙ্গন - আঙিনা। উঠান। প্রাঙ্গণ।
জিনিবে - জয় করবে
লভিবে - লাভ করবে।
পরের কারণে - অন্যের জন্য।
স্বার্থ - নিজের সুবিধা। ব্যক্তিগত লাভ।
আপনার - নিজের।
বলি - উৎসর্গ। ত্যাগ। বিসর্জন।
হৃদয়ভার - মনের কষ্ট।
বিব্রত - ব্যতিব্যস্ত। দিশেহারা। বিপন্ন।
অবনী - পৃথিবী। ধরা। জগৎ।
আমরা সবাই জীবনে সুখী হতে চাই। কিন্তু কীভাবে জীবনে সুখ আসতে পারে, 'সুখ' কবিতায় কবি সে সম্পর্কে তাঁর ধারণা তুলে ধরেছেন।
জগতে যারা কেবল সুখ খোঁজেন তারা জীবনে দুঃখ-যন্ত্রণা দেখে ভাবেন মানুষের জীবন নিরর্থক। এ ধারণা ভুল। জীবনের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য আরও বিস্তৃত, অনেক মহৎ। দুঃখ-যন্ত্রণা সয়ে, সকল সংকট মোকাবিলা করে জীবনসংগ্রামে সফলতার মাধ্যমেই সুখ অর্জিত হয়।
কিন্তু সমাজের অন্য সবার কথা ভুলে কেউ যদি কেবল নিজের স্বার্থ দেখে, সে হয়ে পড়ে আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। আর সমাজ-বিচ্ছিন্ন মানুষ প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারে না।
পক্ষান্তরে অন্যকে আপন ভেবে, অন্যের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে প্রীতি, ভালোবাসা, সেবা ও কল্যাণের মাধ্যমে যে অন্যের মঙ্গলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে সেই প্রকৃত সুখী।
বস্তুত মানুষ সামাজিক জীব। পারস্পরিক ত্যাগের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে মানবসমাজ। এ সমাজে প্রতিটি মানুষ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই অন্যকে বাদ দিয়ে এ সমাজে একলা বাঁচার কথা কেউ ভাবতে পারে না, সুখী হওয়া তো দূরের কথা।
প্রায় একশ বছর আগে এদেশে যে কজন মহিলা সাহিত্যচর্চা করে গেছেন তাঁদের একজন হলেন কবি কামিনী রায়। একসময় তিনি 'জনৈক বঙ্গমহিলা' ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর কবিতা সহজ, সরল, মানবিক ও উপদেশমূলক। তাঁর কবিতায় জীবনের মহৎ আদর্শের প্রতি গভীর অনুরাগের পরিচয় আছে। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি 'আলো ও ছায়া' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। 'সুখ' কবিতাটি ঐ কাব্যগ্রন্থেরই অন্তর্ভুক্ত।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে: 'নির্মাল্য', 'অশোক সংগীত', 'দীপ ও ধূপ' ও 'জীবনপথে'। কবিতা ছাড়াও কামিনী রায় গল্প, নাটক ও জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন। সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জগত্তারিণী পদকে' সম্মানিত হন।
কামিনী রায়ের জন্ম ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাকেরগঞ্জ (বর্তমান বরিশাল) জেলার বাসন্ডা গ্রামে এবং মৃত্যু কলকাতায় ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে।
১. কে, কী করে সুখী হয়-এ বিষয়ে তোমার সহপাঠীদের মতামত নিয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা কর। প্রবন্ধে প্রত্যেকের মতামত হুবহু উদ্ধৃত করার চেষ্টা করবে।
২. সুখ বিষয়ে ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখে একটি বিষয়ভিত্তিক দেয়াল পত্রিকা তৈরি কর (শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর কাজ)।
Read more