মানুষ জাতি
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে
সে জাতির নাম মানুষ জাতি;
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত
একই রবি শশী মোদের সাথি।
শীতাতপ ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা
সবাই আমরা সমান বুঝি,
কচি কাঁচাগুলি ভাঁটো করে তুলি
বাঁচিবার তরে সমান যুঝি।
দোসর খুঁজি ও বাসর বাঁধি গো,
জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙা,
কালো আর ধলো বাহিরে কেবল
ভিতরে সবারই সমান রাঙা।
বাহিরের ছোপ আঁচড়ে সে লোপ
ভিতরের রং পলকে ফোটে,
বামুন, শূদ্র, বৃহৎ, ক্ষুদ্র
কৃত্রিম ভেদ ধূলায় লোটে।
বংশে বংশে নাহিকো তফাত
বনেদি কে আর গর-বনেদি,
দুনিয়ার সাথে গাঁথা বুনিয়াদ
দুনিয়া সবারি জনম-বেদি।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সুমি, দিপ্তী ও ম্যারিথা তিন বন্ধু। প্রত্যেকে প্রত্যেকেরই ধর্মীয় দিনে একে অপরে বাড়িতে বেড়াতে যায়।
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত - একই মায়ের দুধ পান করে যেমন সন্তান-সন্ততি বেড়ে ওঠে, তেমনি পৃথিবীর সব জাতি-ধর্ম-গোত্রের মানুষ একই পৃথিবীর খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে জীবন-যাপন করে।
রবি শশী - সূর্য ও চাঁদ।
শীতাতপ (শীত + আতপ) - ঠান্ডা ও গরম।
ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা - ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট।
কচি কাঁচাগুলি ভাঁটো করে তুলি - ছোটদের পরিপুষ্ট করে তুলি।
যুঝি - যুদ্ধ করি। লড়াই করি। সংগ্রাম করি।
তরে - জন্য (সাধারণত পদ্যে এ শব্দ ব্যবহৃত হয়)।
ডাঁটো - পুষ্ট। শক্ত। সমর্থ।
বাঁচিবার তরে সমান যুঝি - মানবিক জীবন-যাপনের জন্য সব মানুষই লড়াই করে।
বাসর বাঁধি গো - সম্প্রীতি গড়ে তুলি।
দোসর - সাথি। বন্ধু। সঙ্গী।
ধলো - সাদা। ফরসা। শুভ্র।
জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙা - জীবনসংগ্রামে কখনো বিপদে পড়ি আবার সংকট পেরিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখি।
ডাঙা - স্থল। উঁচুভূমি। চর।
জনম-বেদি - সূতিকাগৃহ। জন্মস্থান।
ছোপ - রঙের পোঁচ। ছাপ/দাগ।
বাহিরের ছোপ আঁচড়ে সে লোপ - মানুষের বাইরের চেহারার রং যাই হোক না কেন, আঁচড় লাগলে বা কেটে গেলে যে লাল রক্ত বের হয় তা বাইরের রঙের পার্থক্যকে ঘুচিয়ে দেয়।
শূদ্র - হিন্দু চতুর্বর্ণের (চার বর্ণের) একটি হলো শূদ্র।
বনেদি - প্রাচীন। সম্ভ্রান্ত।
গর-বনেদি - অভিজাত নয় এমন। তুলনীয়: গরহাজির।
বুনিয়াদ - ভিত্তি
দুনিয়া সবারি জনম-বেদি - এ পৃথিবী সব মানুষেরই জন্মক্ষেত্র।
ব্রহ্ম - হিন্দু ধর্মমতে পরমেশ্বর বা বিধাতা।
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা ও সমমর্যাদার মনোভাব সৃষ্টি।
মানুষ জাতি কবিতাটি কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'অভ্র আবীর' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। মূল কবিতার নাম 'জাতির পাঁতি'।
দেশে দেশে, ধর্মে ও বর্ণের পার্থক্য সৃষ্টি করে মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে, কবি মানুষকে তার চেয়ে উপরে আসন দিয়েছেন।
আমাদের এই পৃথিবী জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষেরই বাসভূমি। এই ধরণীর স্নেহ-ছায়ায় এবং একই সূর্য ও চাঁদের আলোতে লালিত ও প্রতিপালিত হচ্ছে সব মানুষ। শীতলতা ও উষ্ণতা, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অনুভূতি সব মানুষেরই সমান। বাইরের চেহারায় মানুষের মধ্যে সাদা-কালোর ব্যবধান থাকলেও সব মানুষের ভেতরের রং এক ও অভিন্ন। সবার শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে একই লাল রক্ত।
মানুষ আজ জাতিভেদ, গোত্রভেদ, বর্ণভেদ ও বংশকৌলীন্য ইত্যাদি কৃত্রিম পরিচয়ে নিজেদের পরিচয়কে সংকীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ করেছে। কিন্তু গোটা দুনিয়ার সঙ্গে মানুষের যে জন্মসম্পর্ক, সেই বিচারে মানুষের আসল পরিচয় হচ্ছে সে মানুষ এবং তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবার কথা নয়। সারা পৃথিবীতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে সমগ্র মানবসমাজ, কবি এই কবিতায় মানুষের সে পরিচয়কেই তুলে ধরেছেন। পৃথিবীর সব মানুষকে নিয়েই গড়ে উঠেছে মানুষ জাতি।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার কাছাকাছি নিমতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু ঘটে। বৈচিত্র্যপূর্ণ ছন্দের কবিতা লিখে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত 'ছন্দের জাদুকর' হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করে। কিন্তু পরে ব্যবসায় ছেড়ে সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি আরবি, ফারসি, ইংরেজিসহ অনেক ভাষা জানতেন। বিদেশি ভাষা থেকে উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ অনুবাদ করলেও কবি হিসেবেই তিনি অধিক পরিচিত। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: 'বেণু ও বীণা', 'কুহু ও কেকা', 'বিদায় আরতি' ইত্যাদি।
১. মানুষে মানুষে কী ধরনের ভেদাভেদ তোমার চোখে পড়েছে? তোমার দেখা মানুষজনের আলোকে উক্ত ভেদাভেদের বর্ণনা দাও এবং এই ভেদাভেদ কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে ব্যাপারে তোমার মতামত উপস্থাপন কর।