মুখস্থনির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা এবং তাদের আগ্রহ, কৌতূহল ও ভালো লাগার জগতকে বিকশিত করার জন্য ধারাবাহিক মূল্যায়ন অতীব জরুরি বিষয়। জাতীয় শিক্ষানীতি- ২০১০ ও নতুন শিক্ষাক্রমে ধারাবাহিক মূল্যায়নের এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ্যপুস্তকগুলোতে কর্ম-অনুশীলন অংশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য কিছু নমুনা কর্মপত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কর্মপত্রের মধ্যে বেশ কিছু কাজের উল্লেখ আছে যার ভিতর দিয়ে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ রয়েছে; বিনোদনের ভিতর দিয়ে তাদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ থাকছে এবং বাচনকলা থেকে শুরু করে সৌন্দর্যবোধ, ন্যায়পরায়ণতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবিকতাবোধ, শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা, অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ ইত্যাদি বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়নের যে দক্ষতাগুলোর সঙ্গে শিক্ষকগণ ও শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে পরিচিত হয়েছেন, সেই চিন্তন দক্ষতা, সমস্যা-সমাধান দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা (মৌখিক ও লিখিত), ব্যক্তিক দক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা ও সহযোগিতামূলক দক্ষতা বিকাশের নিশ্চয়তার আলোকে মূল্যায়ন করাই এই পর্বের উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব দক্ষতার বিকাশ ঘটলে তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারবে।
কর্ম-অনুশীলন অংশে দেওয়া কর্মপত্রগুলো নমুনা মাত্র। শিক্ষকগণ তাঁদের বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে উল্লেখিত কাজগুলো করাতে পারেন কিংবা নতুন কোনো কাজও দিতে পারেন। তবে নতুন কোনো কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনায় রাখতে হবে।
শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯৫-'৯৬ সালে শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়। কিন্তু এ শিক্ষাক্রমের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন তথা পরীক্ষাপদ্ধতির সংস্কার করা হয় নি।
বিষয়টি বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষাপদ্ধতি সংস্কার করে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ উদ্যোগকে সফল ও অর্থবহ করার জন্য এসএসসি পরীক্ষাপদ্ধতি সংস্কারের আলোকে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড পাঠ্যপুস্তকের প্রতিটি অধ্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্ন সংযোজনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বিগত বছরগুলোর এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মোট নম্বরের শতকরা ৮০ ভাগ প্রশ্ন স্মৃতিনির্ভর, যা শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে উত্তর দেয়। অবশিষ্ট অধিকাংশ প্রশ্ন অনুধাবন স্তরের। প্রয়োগ ও উচ্চতর চিন্তন-দক্ষতা মূল্যায়নের প্রশ্ন খুবই কম। প্রচলিত এ পরীক্ষাপদ্ধতি মূলত শিক্ষার্থীর মুখস্থ করার ক্ষমতাকে মূল্যায়ন করে আসছে।
বস্তুত মুখস্থ, সাজেশন ও নোটনির্ভর এ পরীক্ষাপদ্ধতি শ্রেণিকক্ষের শিখন-শেখানো কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তক বুঝে লেখাপড়ার পরিবর্তে মুখস্থ করার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। আর এ মুখস্থ করাও একটি কঠিন কাজ এবং এতে শিক্ষার্থীর সৃজনশীল প্রতিভাবিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের মেধার যথাযথ বিকাশ সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতার বিকাশ ও মেধার যথার্থ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার জন্য পরীক্ষাপদ্ধতির সংস্কার অপরিহার্য। শিক্ষার্থীর পাঠলব্ধ জ্ঞান ও অনুধাবনকে নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ এবং উপাত্ত ও ঘটনা বিচার-বিশ্লেষণ করার সামর্থ্য যাচাই করার মতো ব্যবস্থা প্রশ্নপত্রে থাকা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সৃজনশীল প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্রে পরিবর্তন
প্রচলিত এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন তিন ধরনের প্রশ্নের সাহায্যে হয়ে থাকে। এগুলো হচ্ছে বহুনির্বাচনি প্রশ্ন, সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন ও রচনামূলক প্রশ্ন। পরীক্ষা-সংস্কারের মাধ্যমে প্রচলিত বহুনির্বাচনি প্রশ্নের পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক বহুনির্বাচনি প্রশ্ন এবং সংক্ষিপ্ত-উত্তর ও রচনামূলক প্রশ্নের পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক সৃজনশীল প্রশ্ন প্রবর্তন করা হয়েছে।
সৃজনশীল প্রশ্নের গঠন-প্রক্রিয়া
□ | সৃজনশীল প্রশ্ন একটি দৃশ্যকল্প/উদ্দীপক, সূচনা-বক্তব্য (Stem বা Scenario) দিয়ে শুরু হবে। |
□ | দৃশ্যকল্প/উদ্দীপকটি কোনো ঘটনা, গল্প, চিত্র, মানচিত্র, গ্রাফ, সারণি, পেপার কাটিং, ছবি, উদ্ধৃতি, অনুচ্ছেদ ইত্যাদি হতে পারে। |
□ | দৃশ্যকল্প হবে মৌলিক (Unique)। পাঠ্যপুস্তকে সরাসরি এ দৃশ্যকল্পটি থাকবে না। তবে বাংলা ও ধর্ম বিষয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃশ্যকল্প রচনায় পাঠ্যপুস্তক থেকে উদ্ধৃতাংশ ব্যবহার করা যাবে। |
□ | দৃশ্যকল্পটি শিক্ষাক্রমের/পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত বিষয়বস্তুর আলোকে হতে হবে। |
□ | দৃশ্যকল্পটি আকষর্ণীয় ও সহজে বোধগম্য হতে হবে। |
□ | দৃশ্যকল্পের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে প্রশ্নের অংশগুলো তৈরি হবে এবং প্রতিটি অংশ সহজ থেকে কাঠিন্যের ক্রমানুসারে হবে। |
□ | প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্ন চিন্তন-দক্ষতার চারটি স্তরের (ক-অংশ: জ্ঞান; খ-অংশ: অনুধাবন; গ-অংশ: প্রয়োগ; ঘ-অংশ: উচ্চতর দক্ষতা) সমন্বয়ে গঠিত হবে। |
□ | হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের তিন স্তরের (সহজ, মধ্যম ও কঠিন) সমন্বয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন গঠিত হবে। |
□ | দৃশ্যকল্প বা উদ্দীপকে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থাকবে না, তবে উত্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় অনুপ্রেরণা থাকবে। প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্নের মোট নম্বর হবে ১০। |
একটি সৃজনশীল প্রশ্নের বিভিন্ন অংশ ও নম্বর বণ্টন
প্রশ্নের অংশ | চিন্তন-দক্ষতার স্তর | নম্বর |
ক | জ্ঞান-দক্ষতা | ১ |
খ | অনুধাবন-দক্ষতা | ২ |
গ | প্রয়োগ-দক্ষতা | ৩ |
ঘ | উচ্চতর দক্ষতা | ৪ |