খাদ্য নষ্ট হওয়ার কারণ (পাঠ ৩)

খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য - গার্হস্থ্যবিজ্ঞান - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

1.7k

কোনো খাদ্যই স্বাভাবিকভাবে অনেকদিন ধরে ঘরে রাখা যায় না। যেমন-ফল, সবজি নরম হয়ে যায়, খোসা কুঁচকে যায়, কালো দাগ পড়ে, চিতি পড়ে, দুর্গন্ধ বের হয় ইত্যাদি। মাছ, মাংস পচে নষ্ট হলে উপরিভাগ পিচ্ছিল হয়। পচা মাছের চোখ ঘোলা হয়ে বসে যায়, পেটের নাড়িভুঁড়ি গলে যায় ফলে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে পেট ভেতরে বসে যায়, আঁশ ঢিলা ও কানকা ফ্যাকাসে হয়। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ডিমও নষ্ট হয়। শুকনো খাদ্য, চাল, ডালে ছত্রাক জন্মায় এবং পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয়। একইভাবে রান্না করা খাদ্যে গাঁজন হয়, বুদ্‌বুদ ওঠে, টক গন্ধের সৃষ্টি হয়। তাই ঘরে রাখতে হলে খাবারকে পচনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর সেজন্যই খাবার কেন নষ্ট হয় সে সম্বন্ধে পুরোপুরি জ্ঞান থাকা দরকার।

খাদ্য নষ্ট হওয়ার কারণগুলো নিম্নরূপ:

১) অণুজীব

আমাদের চারদিকে বাতাসে, মাটিতে ও পানিতে ব্যাকটেরিয়া, ঈষ্ট, মোল্ড বা ছত্রাক ইত্যাদি অসংখ্য জীবাণু ছড়িয়ে আছে। এগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। অণুজীবের বেঁচে থাকা ও বংশ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন খাদ্য, পানি, তাপ ও অক্সিজেন। সুযোগ পেলেই এগুলো খাদ্যে প্রবেশ করে এবং অনুকূল পরিবেশে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অণুজীব দ্বারা আক্রান্ত হয়ে খাদ্য দূষিত হয় এবং পচে গিয়ে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে।

উল্লেখযোগ্য অণুজীবগুলো হচ্ছে-

ক) ব্যাকটেরিয়া- ব্যাকটেরিয়া এককোষী জীব। মাছ-মাংস, শাকসবজি, ফল ইত্যাদি খাদ্যে ব্যাকটেরিয়া জন্মায় এবং খাদ্য পচিয়ে ফেলে। আর্দ্রতায় ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার জন্য উচ্চতাপ প্রয়োজন। শুষ্ক পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি লোপ পায়।

খ) ইষ্ট- ইষ্ট হচ্ছে এককোষ বিশিষ্ট অণুজীব যা পানি ও বাতাসের উপস্থিতিতে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে খাদ্যকে নষ্ট করে। ইষ্টের প্রভাবে শর্করা গেঁজো অ্যালকোহল ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়। ইষ্ট বাতাসের অভাবে বাঁচতে পারে না। উত্তাপ দিয়ে ইষ্ট মেরে ফেলা যায়।

গ) ছত্রাক- ছত্রাক একজাতীয় উদ্ভিদ। উত্তাপ, আর্দ্রতা এবং বাতাসের উপস্থিতিতে কমলা, আম টমেটো, পনির, পাউরুটি, টক জাতীয় খাবারের উপর ছত্রাক জন্মায়। খাবারের উপর ছত্রাক ধূসর সবুজ বর্ণের আস্তরণ তৈরি করে। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে শস্য ও চীনাবাদামে এক ধরনের বিষাক্ত ছত্রাক জন্মায় যা খেলে দেহে বিষক্রিয়া দেখা দেয়। পানি ও আর্দ্রতায় ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শুষ্ক, ঠান্ডা ও আলোযুক্ত স্থানে ও উচ্চ তাপে ছত্রাক জন্মায় না। রোদের তাপে ছত্রাক ধ্বংস হয়।

২) এনজাইম- এনজাইম উদ্ভিদ ও প্রাণিকোষের উপাদান। উদ্ভিদ ও প্রাণিকোষে এনজাইম অনুঘটকের কাজ করে। এনজাইম ফল ও সবজি পাকাতে সাহায্য করে। এনজাইমের প্রভাবে ফল অতিরিক্ত পেকে নরম ও বোঁটাচ্যুত হয়। এভাবে থেতলানো ফল জীবাণুর আক্রমণে কালচে বর্ণ ধারণ করে। বিকৃত গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং নষ্ট হয়ে যায়। তাপ যত কম থাকে এনজাইমের কাজ তত কম হয়। ৮০° সে.-এর অধিক তাপে খাদ্য বস্তুকে উত্তপ্ত করলে এনজাইম নষ্ট হয়ে যায়।

৩) রাসায়নিক বিক্রিয়া- ফল ও সবজির রাসায়নিক উপাদান 'এসিড' ও 'ট্যানিন' বাতাস ও পানির সংস্পর্শে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। এর ফলে খাদ্যের বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদের পরিবর্তন হয় এবং খাদ্য নষ্ট হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়া রোধ করতে হলে ০° সে. তাপমাত্রায় ফলমূল সংরক্ষণ করা ভালো। খাদ্য শুকিয়ে পানি সম্পূর্ণরূপে বের করলে রাসায়নিক বিক্রিয়া রোধ হয়। বোতলে বায়ুশূন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে ফলমূল সংরক্ষণ করলে রাসায়নিক বিক্রিয়া কম ঘটে।

৪) সংরক্ষণের অনুপযুক্ত স্থান সংরক্ষণকৃত শুকনো খাদ্যদ্রব্য সঠিকভাবে যথাস্থানে রাখা না হলে ধুলা-ময়লা, ইঁদুর, পোকামাকড়ের আক্রমণে খাদ্যবস্তু আক্রান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে জীবাণু ও ছত্রাক জন্মায় এবং খাদ্য নষ্ট হয়ে যায়।

কাজ ১- খাদ্য নষ্ট হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলো।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...