মানুষের জীবনে বিভিন্ন রকম লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকে, এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের কাজ করি। কাজগুলো করার জন্য আমরা বিভিন্ন রকম সম্পদ ব্যবহার করে থাকি। আমাদের চাহিদার তুলনায় সম্পদ সীমিত। আর তাই সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। পারিবারিক লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য আমাদের যে সম্পদ আছে, তার ব্যবহারে পরিকল্পনা, সংগঠন, নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যায়ন করাকে এক কথায় গৃহ ব্যবস্থাপনা বলে। তাই বলা যায় যে, গৃহ ব্যবস্থাপনা পারিবারিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য কতগুলো কর্মপদ্ধতির সমষ্টি। আর এ পদ্ধতি কতগুলো ধারাবাহিক স্তর বা ধাপের সমন্বয়ে গঠিত, যা গৃহ ব্যবস্থাপনার স্তর হিসেবে পরিচিত। লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে গৃহ ব্যবস্থাপনার স্তরগুলো চক্রাকারে আবর্তিত হয়।

পরিকল্পনা গৃহ ব্যবস্থাপনার প্রথম স্তর হলো পরিকল্পনা প্রণয়ন। যেকোনো কাজ করতে গেলে কাজটি কেন করা হবে, কীভাবে করা হবে ইত্যাদি সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা করার নাম পরিকল্পনা। পরিকল্পনাকে অনুসরণ করে পরবর্তী কাজগুলো করা হয়। সেজন্যই পরিকল্পনাকে যেকোনো কাজের মূল ভিত্তি বলা হয়। অন্যভাবেও বলা যায়, পরিকল্পনা হলো লক্ষ্য অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কার্যকলাপের পূর্বাভাস। লক্ষ্য অর্জন করার জন্য কী কাজ করা হবে, কেন করা প্রয়োজন, কে বা কারা এ কাজ করবে, কখন ও কীভাবে প্রতিটি কাজ করা হবে ইত্যাদি বিষয় পরিকল্পনার সময় মনে রাখতে হবে। পরিবারের সকল সদস্যর মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকলে পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ হয়। সকলের সুবিধা-অসুবিধার দিকে লক্ষ রেখে পরিকল্পনা করতে হয় এবং এটা যেন সহজ সরল হয়, যাতে সবাই বুঝতে পারে। প্রয়োজনে পরিকল্পনায় কিছু রদবদল করার সুযোগও থাকতে হবে। পরিকল্পনাটা যেন বাস্তবমুখী হয় এবং সবার মিলিত প্রচেষ্টায় তা যেন কার্যকর করা যায়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হয়।
সংগঠন – পরিকল্পনার বিভিন্ন কাজের সংযোগসাধন করার নাম সংগঠন। গৃহ ব্যবস্থাপনার দ্বিতীয় এ স্তরে কোন কাজ কীভাবে করলে ভালো হবে, কোথায় করা হবে, কে বা কারা করবে, কোন কাজে কাকে নিয়োজিত করা হবে, কী কী সম্পদ ব্যবহার করা হবে এসব বিষয় ঠিক করা হয়। এক কথায় কাজ, কর্মী ও সম্পদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাকে সংগঠন বলে। কাজের প্রতি উৎসাহ, দক্ষতা, মনোযোগ থাকলে কাজের ফলাফল ভালো হয়। কোনো কাজের কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা যায় সংগঠন দ্বারা। সংগঠনস্তরে পরিকল্পনালব্ধ কাজের যুক্তিসংগত বিন্যাস করা হয়। সুতরাং বলা যায় যেকোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য।
নিয়ন্ত্রণ- গৃহীত পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া ও সংগঠনের বিভিন্ন ধারা কার্যকর করে তোলাকে নিয়ন্ত্রণ বলে। গৃহ ব্যবস্থাপনার তৃতীয় এ স্তরটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা যত ভালোই হোক, তা যদি বাস্তবায়ন না করা যায় তাহলে কখনই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। নিয়ন্ত্রণ স্তরটি কয়েকটি পর্যায়ে এগিয়ে চলে। প্রথম পর্যায়ে কাজে সক্রিয় হওয়াকে বোঝায়। অর্থাৎ উদ্যোগ নিয়ে কাজটা শুরু করা। কী কাজ করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে তা জানা থাকলে কাজ শুরু করা সহজ হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজের অগ্রগতি লক্ষ করা হয়। অর্থাৎ কাজটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখা। তৃতীয় পর্যায়ে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে হয়। কোনো সমস্যা দেখা দিলে গৃহীত পরিকল্পনায় কিছুটা রদবদল করে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই হলো খাপ খাওয়ানো।
মূল্যায়ন - গৃহ ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ স্তরের নাম মূল্যায়ন। কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর এর ফলাফল যাচাই করাই মূল্যায়ন। কাজটি লক্ষ্য অর্জন করতে পারল কি না তা মূল্যায়নের মাধ্যমে জানা যায়। মূল্যায়ন ছাড়া কাজের সফলতা বা ব্যর্থতা নিরূপণ করা যায় না। লক্ষ্য অর্জন হলে সফলতা আসে। এ সফলতা লাভের উপায় ভবিষ্যৎ কাজের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। আর লক্ষ্য অর্জন যদি ব্যর্থ হয়, তাহলেও ব্যর্থতার কারণ জেনে তা সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম অনুযায়ী পরিবর্তন ও সংশোধন করে লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হয়। তাই গৃহ ব্যবস্থাপনা হলো কতকগুলো পরস্পর নির্ভরশীল ও গতিশীল পর্যায়ক্রমিক স্তরের সমষ্টি। আর এর প্রতিটি স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। সেজন্যই গৃহ ব্যবস্থাপনার কাঠামোটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে মূল বিষয়রূপে দেখানো হয়েছে।
| কাজ ১- গৃহ ব্যবস্থাপনার স্তর অনুযায়ী একটি ক্লাসপার্টির আয়োজন করতে হলে তোমার কী করতে হবে তা লেখো। |