# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো পরিবারে বাস করি। একটি বাড়িতে সাধারণত মাবাবা, ভাইবোন আরও অন্যান্য সদস্য একসাথে থাকার যে প্রতিষ্ঠান সেটি হলো পরিবার। সন্তানেরা শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্কে পৌঁছায়। সন্তানদের বিয়ের মাধ্যমে আরও কয়েকটি পরিবার তৈরি হয়। এভাবে পরিবারের জীবনচক্র চলতে থাকে।
অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানবশিশু সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। সে থাকে সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল। শিশু খুব ধীরে ধীরে বড় হয়। তার আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য বছরের পর বছর সহায়তা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দরকার হয়। পরিবার এ দায়িত্ব পালন করে। পরিবার শিশুর আশ্রয়। জন্মের পর থেকে সমবয়সিদের সাথে মেলামেশার পূর্ব পর্যন্ত শিশুটিকে পরিবারই সঙ্গ দিয়ে থাকে।
জন্মের পর পরিবারের সাথে শিশুর একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। বড় হওয়ার সাথে সাথে এই সম্পর্ক পরিবর্তন হতে থাকে। সে নিজের কাজ নিজে করতে পারে, নিজের মতামত দিতে পারে, পরিবারের ছোটখাটো কাজে অংশ নিতে পারে। পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে শিশুরা পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে যায়। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য যে যতো বেশি একে অন্যের সহযোগিতা করে, অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে, দুঃখকষ্ট ভাগাভাগি করতে পারে, বন্ধুভাবাপন্ন হয়, পরিবারের কাজে অংশ নেয় সে তত পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হতে পারে।
পরিবার সমাজের ক্ষুদ্র একক। কয়েকটি পরিবার নিয়ে হয় একটি সমাজ। আদিম যুগে যখন পরিবার প্রথা ছিল না তখনো মানুষকে খাবার জোগাড় করতে হতো, হিংস্র প্রাণী থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হতো, এ রকম ভয়ানক বিপদ ও কষ্টের মধ্যে মানুষ নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য দল বেঁধে থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এভাবে আত্মরক্ষার জন্য মানুষ দলবেঁধে থাকতে শুরু করে এবং সমাজ জীবনের শুরু হয়।
শিশুর বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক
পরিবার শিশুটির খাদ্য, বস্ত্র, আরামের চাহিদা মেটায়, নিরাপদ পরিবেশ দেয়, নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। শিশুটির এই প্রয়োজন মেটাতে খাদ্যশস্যের জন্য কৃষক, কাপড়ের জন্য তাঁতি, চিকিৎসার জন্য ডাক্তার, শিক্ষার জন্য শিক্ষক এভাবে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ পরিবারটির সাহায্যে এগিয়ে আসে। সমাজের এই সহযোগিতা ছাড়া পরিবারের একার পক্ষে চলা সম্ভব হয় না। এভাবে পরিবার ও সমাজ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। শিশু যেমন পরিবারের একজন সদস্য, তেমনি সমাজেরও একজন সদস্য।
বর্তমানে আমাদের চাহিদা অনেক বেশি ও বহুমুখী। পরিবারকে সহায়তার জন্য অনেক ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষা ও আচরণের জন্য স্কুল ও কলেজ, স্বাস্থ্যসেবায় হাসপাতাল, সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য আইন-আদালত, পণ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। যদিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিবারকে অনেক কাজে নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে, তবু শিশুদের জন্য প্রাথমিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিবারকেই গ্রহণ করতে হয়। যেমন- শিশুর স্বাস্থ্য, আস্থা ও নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়া, গ্রহণযোগ্য সামাজিক আচরণ শেখানো ইত্যাদি।

প্রত্যেক সমাজে কিছু নিয়মনীতি থাকে। পরিবার সমাজের এসব নিয়মনীতি অনুযায়ী শিশুকে আচরণ করতে শেখায়। সবার সাথে ভালো ব্যবহার, নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলা, সহযোগিতা করা ইত্যাদি আচরণ সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য। অপরদিকে ঝগড়া, মারামারি করা, খারাপ ব্যবহার, পরিবেশ নোংরা করা, অন্যের সম্পদ নষ্ট করা ইত্যাদি আচরণ সমাজ আশা করে না। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। সঠিক ও গ্রহণযোগ্য আচরণ নিয়ে শিশু বেড়ে উঠলে সমাজ ও দেশের উন্নতি হয়। এভাবে প্রতিটি শিশু পরিবার ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
| কাজ ১-পরিবারের সদস্য হিসেবে তোমার কী ধরনের দায়িত্ব পালন করা উচিত তা লেখো। কাজ ২-তুমি কী গুণাগুণ নিয়ে বেড়ে উঠলে সমাজের উপকারে আসতে পার তা লেখো। |
মানুষের সুস্থ বিকাশের জন্য উন্নত পারিবারিক পরিবেশের গুরুত্ব অনেক।
যে বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে আমরা কোনো পরিবারকে উন্নত পরিবেশের অধিকারী বলতে পারি তা হলো-
- যে পরিবারে প্রত্যেক সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক থাকে। সেখানে যেকোনো অভিজ্ঞতা বা সমস্যা একে অপরের সাথে আলোচনা করা যায়, একে অন্যের বিপদে ভালো পরামর্শ দেয়, সহযোগিতা করে এবং ঝগড়াঝাঁটি হয় না।
- যে পরিবারে শিশুর বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান থাকে, খেলাধুলার সুযোগ থাকে, বড় সদস্যরা ছোট শিশুর সাথে খেলাধুলায় অংশ নেয়, শিশুদেরকে গান, গল্প, ছড়া শোনায়, কৌতূহল মেটানোর জন্য বাইরের পরিবেশে নিয়ে যায়, শিশুর বিভিন্ন প্রশ্নে বিরক্ত না হয়ে যেভাবে সম্ভব বুঝিয়ে দেয়া হয়।
- যে পরিবারে শিশুকে প্রশংসা করা হয়, শিশুর বিভিন্ন দক্ষতা বিকাশের জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়।
- যে পরিবারে অন্য শিশুদের সাথে মেলামেশায় সুযোগ করে দেওয়া হয় এবং যে পরিবারে বয়স্কদের সাথে শিশুর সাক্ষাতের সুযোগ থাকে।
- যে পরিবারে শিশুর সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য শিশু পরিচালনা নীতি অনুসরণ করা হয়।
জীবনের প্রথম ৫ বছর পরিবার থেকে শিশু যেরকম শিক্ষা, যত্ন পেয়ে থাকে তার মধ্যে সেরকম আচরণের ভিত্তি তৈরি হয়। মা, বাবা এবং পরিবারের সদস্যরা শিশুর প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক। তারা শিশুর সবরকম ভালো অভ্যাস তৈরিতে সহায়তা করেন। পারিবারিক পরিবেশ থেকে যদি শিশু ভালো কাজের জন্য উৎসাহ পায় তাহলে সেটা তাড়াতাড়ি শেখে। যে কাজ করলে সকলে অপছন্দ করে সেটা খারাপ কাজ বলে ধারণা লাভ করে। পরিবার থেকে তাদের ভালো এবং মন্দ কাজের অভ্যাস তৈরি হয়।
পরিবার যখন শিশুকে বাড়ির বাইরের পরিবেশে নিয়ে যায়, তাদের বিভিন্ন কৌতূহল মেটায়, সমবয়সিদের সাথে খেলার সুযোগ করে দেয়, শিশুরা তখন সহজেই সকলের সাথে মেলামেশা করার ক্ষমতা অর্জন করে। শিশুকে যখন গান, গল্প, ছড়া শোনানো হয় তখন শিশুর ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, স্মরণশক্তি, মনোযোগ ইত্যাদি মানসিক ক্ষমতার বিকাশ ঘটে। সমবয়সিদের সাথে মেলামেশার ফলে শিশু সহযোগিতা ও গ্রহণযোগ্য সামাজিক আচরণ করতে শেখে। বড়দের সাথে মেলামেশায় শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

শিশুকে সঠিকভাবে পরিচালনার অন্যতম কৌশল হলো শিশুর সাথে ইতিবাচক আচরণ করা। শিশুকে সব সময় এটা কোরো না, ওটা কোরো না, তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না এ ধরনের নেতিবাচক কথা শিশুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এসো আমরা এ কাজটা করি, তুমি এখন পারছো না, তাতে কী? চেষ্টা করলেই পারবে, তুমি এটা করলে আমরা সবাই তোমাকে অনেক ভালো বলবো, এ ধরনের প্রতিটি কথা শিশুর বিকাশের জন্য ইতিবাচক।
শিশুরা তাদের আবেগ তীব্রভাবে প্রকাশ করে। অল্পতেই সে চিৎকার করে কাঁদে, ভয় পায়, রেগে যায়। শিশুর রাগ, ভয়, কষ্টে অবহেলা না করে সহানুভূতির সাথে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করলে শিশু সুখী হয়। পরিবারের সঠিক পরিচালনায় একটি শিশু পরিবার ও সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ এবং উপযুক্ত সদস্য হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। মা-বাবা, ভাইবোনের সাথে শিশুর ঘনিষ্ঠতা ও স্নেহের সম্পর্ক থাকে বলে পারিবারিক পরিবেশ থেকে শিশু বিভিন্ন আচরণের কৌশল শেখে।
| কাজ ১- শিশু পরিচালনায় কিছু নেতিবাচক উক্তি ও ইতিবাচক উক্তির তালিকা করো। কাজ ২- উন্নত পারিবারিক পরিবেশের বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি পোস্টার তৈরি করো। |
শিশু খুব অসহায় ও পরনির্ভরশীল অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে, আনন্দে হাসতে পারে, অন্যকে সাহায্য করতে পারে। ওপরের আচরণগুলো প্রত্যেক শিশুর বিভিন্ন ধরনের বর্ধন ও বিকাশ। বিকাশ অর্থ গুণগত পরিবর্তন এবং বর্ধন হচ্ছে পরিমানগত পরিবর্তন যা শিশু ধীরে ধীরে অর্জন করে। এই পরিবর্তন প্রধানত শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিক হয়ে থাকে।
১। শারীরিক বিকাশ (Physical Development)- এর মধ্যে পড়ে দেহের আকৃতি, অনুপাত, চেহারা, শরীরবৃত্তীয় কাজ (যেমন- হৃৎস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, খাদ্যগ্রহণ ইত্যাদি), ইন্দ্রিয় ও সঞ্চালন দক্ষতা (দেখা, শোনা, স্পর্শ, ঘ্রাণ, স্বাদ), হাঁটা, দৌড়ানো, শারীরিক স্বাস্থ্য ইত্যাদি।
২। মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ হলো (Cognitive Development)- বুদ্ধিগত দক্ষতার পরিবর্তন। ,এর মধ্যে পড়ে মনোযোগ, স্মরণশক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাত্যহিক জীবনের জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, ভাষার দক্ষতা, যুক্তি দিয়ে বোঝার ক্ষমতা ইত্যাদি।
৩। আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশ (Emotional and Social Development)-ক্রোধ বা রাগ, ভয়, উদ্বেগ, হিংসা, আনন্দ-উল্লাস ইত্যাদিতে যে আলোড়িত অবস্থা হয় তা হচ্ছে আবেগীয় বিকাশ। বিভিন্ন অনুকূল সামাজিক বিকাশের মধ্যে পড়ে সহযোগিতা, সমবেদনা, অংশগ্রহণ, পরোপকার, নিঃস্বার্থ হওয়া। অসামাজিক আচরণ হলো আক্রমণাত্মক আচরণ, স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, ধ্বংসাত্মক আচরণ ইত্যাদি।

শিশুর সব ধরনের বিকাশে প্রথম ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্র হলো পরিবার। শিশুর বিকাশে অন্য যে বিষয়গুলো প্রভাবিত করে সেগুলোর কোনোটিই পরিবারের সমতুল্য নয়। পরিবারে মা-বাবা, ভাইবোনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এটা সারা জীবনের জন্য তৈরি হয়।
মা-বাবার ভূমিকা
শিশুর সাথে বন্ধন গড়ে তুলতে মা হচ্ছেন প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। শিশুকে দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে মা ও সন্তানের সম্পর্কের শুরু হয়। মায়ের হাসি, মায়ের কণ্ঠস্বর শিশুর মধ্যে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে। মায়ের সাথে যোগাযোগের জন্য সন্তানের জন্মগত চাহিদা থাকে। মা সন্তানের যত্ন আনন্দের সাথে সম্পন্ন করেন যা সন্তানের সুস্থ বিকাশে সহায়ক।
শিশুদের লালনপালনে ও যত্নে মায়ের পাশাপাশি বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব পরিবারে বাবা শিশুকে সঙ্গ দেন, ভাব বিনিময় করেন, সেখানে শিশুরা নিজেদেরকে বেশি নিরাপদ মনে করে। তাদের মধ্যে সামাজিক ও আচরণগত সমস্যা কম হয়। বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত স্নেহের অভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের ক্ষতি হয়। বয়সানুযায়ী ওজন বাড়ে না, কাজে আগ্রহ হারায়, তাদের চেহারা মলিন ও বিমর্ষ থাকে।
ভাই ও বোনের ভূমিকা
শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা বিশেষ করে বড় ভাইবোন শিশুর সামনে যে ধরনের আচরণ করে শিশুটিও সে ধরনের আচরণ শেখে। ভাইবোনের সাথে সম্পর্ক শিশুর বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ভাইবোনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলে একজন অপরজনকে সঙ্গ দেয়, ভাগাভাগি করতে শেখে, যেকোনো সমস্যার কথা খোলাখুলি আলোচনা করতে পারে। এভাবে সে জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সহজেই খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা অর্জন করে। অন্যদিকে ভাইবোন ঈর্ষা, একজন অন্যজন অপেক্ষা নিজেকে বড় মনে করা, একে অন্যকে ঘৃণা করা ইত্যাদি মনোভাব পরিবারে বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তি আনে। তাদের মধ্যে আক্রমণধর্মী আচরণ, ঝগড়া করার প্রবণতা বেড়ে যায়। একজনের প্রয়োজনে অন্যজন এগিয়ে আসে না। এরকম পরিস্থিতিতে উভয়ের মন খারাপ থাকে, তাদের সময়টা আনন্দে কাটে না।
| কাজ ১- পরিবারে ভাইবোনেরা একে অন্যকে কোন বিষয়ে কীভাবে সাহায্য করবে তার কয়েকটি উদাহরণ দাও। |
পরিবারের পর আর কোন চালিকাশক্তি শৈশব ও কৈশোরের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে? উত্তরটি খুবই স্পষ্ট। সেটি হলো সমবয়সি দল। বিদ্যালয় বয়স থেকে শিশুরা বড় একটা সময় সমবয়সিদের সাথে কাটায়। তারা শ্রেণিকক্ষে থাকে, পড়াশোনার বাইরে নানারকম কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, প্রচারমাধ্যম যেমন-রেডিও, টিভি, কম্পিউটার সম্পর্কে নানারকম আলাপ আলোচনা তারা বন্ধুদের সাথে করে। তারা অগণিত খেলা বন্ধুদের সাথে খেলে।
এ বয়সে শুধু পরিবারের সাথে সময় কাটানো তাদের সন্তুষ্টি আনতে পারে না। মা-বাবা এবং সমবয়সি দল একে অন্যের পরিপূরক হয়। মা-বাবার স্নেহ নির্দেশনা শিশুদের নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। কিন্তু সামাজিক বিভিন্ন দক্ষতার জন্য সমবয়সিদের সাথে মেলামেশার দরকার হয়। যেমন-একে অন্যকে সাহায্য করা, মতামত ও ধারণা আদানপ্রদান, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শেখা ইত্যাদি। তারা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একে অন্যকে সাহায্য করে থাকে।
খেলার মাঠে খেলার সঙ্গীদের সাথে শিশুরা দলীয় খেলায় অংশ নেয়। দলীয় খেলায় তারা দক্ষতা অর্জন করে যেমন ভাষার বিকাশে দক্ষতা আসে, পরিকল্পনা করতে শেখে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হয়, নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে এবং অনুশীলনের মাধ্যমে যে ভালো ফল করা যায় এ ধারণা পায়।
দলের প্রভাবে অনেক সময় খারাপ আচরণের অভ্যাস হয়ে থাকে। সমবয়সিরা প্রাধান্য বিস্তার করলে মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়। ছেলেমেয়েরা বাড়ির কাজ, তার দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে। এ থেকেই মা-বাবার সাথে কলহের সূত্রপাত হয়।

স্কুল - শিক্ষার্থীদের পরিবার ও সমাজের উপযুক্ত সদস্য হিসাবে গড়ে তুলতে স্কুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্কুল এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে জ্ঞান বিতরণ করা হয়। এই কাজে মুখ্য ভূমিকা রাখেন স্কুলের শিক্ষকেরা। তারা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ সৃষ্টি করেন, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিকতা বিকাশে সহায়তা করেন। এ সকল বিকাশে শিক্ষকেরা যেভাবে ভূমিকা রাখেন-
- পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেন।
- শিক্ষকেরা ভালো আচরণে উৎসাহিত করেন, খারাপ আচরণের ফলাফল বুঝিয়ে সতর্ক করেন।
- শিক্ষকের প্রশংসা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অংশগ্রহণ বাড়ায়, ভালো ফল করতে উৎসাহী করে এবং স্কুলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।
- পছন্দের শিক্ষকের অনুকরণে শিক্ষার্থীরা আচরণ শেখে ও জীবনের লক্ষ্য স্থির করে।
| বিদ্যালয়গামী শিশু | সহপাঠীদের সাথে সুসম্পর্ক, শিক্ষকের প্রশংসা, উৎসাহ | স্কুলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব | ক্লাসে ভালো অংশগ্রহণ ও ভালো ফল |
শিশুরা সব সময় উৎসাহ পেতে চায়। অনেক সময় শিক্ষকের দেওয়া শারীরিক শাস্তি বা শাস্তির ভয় দেখানো শিশুর বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হয়। এতে শিশুর মনে ভয় হয়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিক্ষককে কোনো প্রশ্ন করতে পারে না এবং মানসিক চাপ বাড়ে যা মস্তিষ্ক গঠনে বাধা সৃষ্টি করে।
প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন
প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সাহায্য ছাড়া পরিবারের একার পক্ষে চলা খুব কঠিন। নানা ধরনের সহযোগিতার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের সাহায্য শিশুর বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পারিবারিক বিপর্যয়, যেমন-পরিবারে মা কিংবা বাবার মৃত্যু, অসুস্থতা, যেকোনো মতবিরোধ বা পারিবারিক দুর্ঘটনায় তাঁরা বিভিন্নভাবে সাহায্যের হাত বাড়ান। এসব বিপর্যয়ে শিশু সন্তানদের স্নেহ, ভালোবাসা, উপদেশ ও পরামর্শের প্রয়োজন হয়। নির্ভর করা যায় এমন প্রতিবেশী ও আত্মীয়ের সাথে সন্তানেরা খোলামেলা আলোচনা করতে পারে। এতে তাদের বিশেষ করে কৈশোরের ছেলেমেয়েদের হতাশা কম হয়, তারা বিপদকে মোকাবেলা করতে শেখে, বিশৃঙ্খল আচরণ কম হয়, সর্বোপরি তাদের সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে সহজভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
| কাজ ১- সমবয়সী দলের মাধ্যমে শিশুরা কোন ধরনের আচরণ শেখে? কাজ ২- স্কুলে পাঠক্রমের বাইরের কার্যক্রম কোন ধরনের আচরণ বিকাশে সহায়তা করে, তা লেখো। |
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন :
১. আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য কিসের প্রয়োজন?
ক. অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা
খ. নিরাপদ পরিবেশে বসবাস
গ. বছরের পর বছর শিক্ষা
ঘ. অপরের ওপর নির্ভরশীলতা
২. সমবয়সিদের সাথে মেলামেশার ফলে শিশুর মধ্যে গড়ে উঠে-
i. আত্মবিশ্বাস
ii. সহযোগিতার মনোভাব
iii. পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং ৩ ও ৪ নং প্রশ্নের উত্তর দাও:
রুমা ও কণা দুই বোন। প্রত্যেকে যেন নিজের কাজ নিজে করে, এ ব্যাপারে তাদের মা তাদের উৎসাহিত করেন। রুমা ৭ম শ্রেণির এবং তার বোন কণা ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। রুমা প্রায়ই তার বোনের বই, কাপড় ও বিছানা গুছিয়ে দিয়ে থাকে।
৩. রুমার মাঝে কোন ধরনের মনোভাব লক্ষ করা যায়-
ক. সহযোগিতার
খ. শৃঙ্খলাবোধের
গ. নেতৃত্বদানের
ঘ. সমবেদনার
৪. রুমার আচরণ কণাকে পরবর্তী সময়ে করে তুলবে-
i. কর্মে অনাগ্রহী
ii. পরনির্ভরশীল
iii. অন্যের প্রতি সহমর্মী
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ.ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
সৃজনশীল প্রশ্ন :
১. কর্মব্যস্ত স্বামী ও দুই সন্তান সুমন ও সুমনাকে নিয়ে রেবেকার সংসার। রেবেকা সন্তানদের সাথে বন্ধুর মতো ভাব বিনিময় করেন। সমবয়সিদের সাথে তাদের সহযোগী মনোভাব তৈরিতে রেবেকা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সুমন ও সুমনার বাবা শত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর সন্তানদের সময় দেন ও তাদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে ও পার্কে বেড়াতে নিয়ে যান।
ক. পরিবার কী?
খ. দেশের সুনাগরিক তৈরিতে সমাজের নিয়মনীতি অনুসরণ প্রয়োজন কেন?
গ. সন্তানদের প্রতি রেবেকার আচরণ শিশুর কোন ধরনের আচরণ বিকাশে সহায়ক? বুঝিয়ে লেখো।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লিখিত পরিবেশ শিশুদের সুস্থ বিকাশের সহায়ক- বক্তব্যটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
২. ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া রনি তার সহপাঠীদের সাথে লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে। রনি তার বন্ধুদের নিয়ে তার এলাকাকে দূষণমুক্ত করতে সবুজ সংঘ নামে একটি সংঘ তৈরি করে। রনি ও তার বন্ধুরা এলাকাবাসীর সহায়তায় এলাকার ময়লা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার জন্য কয়েকটি বড় ড্রামের ব্যবস্থা করে। রনি ও তার বন্ধুদের দ্বারা পরিচালিত 'সবুজ সংঘ' এলাকার উন্নয়নের জন্য নানা ধরনের কাজ করে যা সবার কাছে প্রশংসিত হয়। রনির মা রনিকে এ ব্যাপারে সব সময় উৎসাহ দেন।
ক. শিশুকে সঠিকভাবে পরিচালনার অন্যতম কৌশল কী?
খ. ভাইবোনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজন কেন
গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত কাজের মাধ্যমে রনির চরিত্রের কোন গুণটি বিকশিত হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. মায়ের উৎসাহ ও ভালো সঙ্গের প্রভাব রনিকে আজ সুপরিচিত করেছে- উদ্দীপকের আলোকে মূল্যায়ন করো।