প্রতিবন্ধী শিশুর প্রতি সমাজের দায়িত্ব (পাঠ ৪)

শিশুর বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক - গার্হস্থ্যবিজ্ঞান - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

889

সমাজ কাদের নিয়ে? সমাজ আমাদের নিয়ে, আমাদের চারপাশের সকলকে নিয়ে। প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজে বড়ই অবহেলিত। তাদের অবহেলার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো-

  • প্রতিবন্ধী শিশুরা কম বুঝতে পারে বলে অনেকেই এদেরকে বোকা, পাগল বলে, হাসি-ঠাট্টা করে।
  • সমবয়সিরা প্রকাশ্যে তাদের উত্ত্যক্ত করে। খেলায় নেয় না, তার সাথে মেশে না।
  • আত্মীয়স্বজন প্রায়ই বেড়ানোর প্রোগ্রামে এদেরকে তালিকা থেকে বাদ দেন।
  • এরা অসুস্থতার কথা ঠিকভাবে বোঝাতে পারে না। এজন্য এদের চিকিৎসায় প্রচুর সময়ের দরকার হয়। ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসায় অবহেলা দেখা যায়।
  • বিশেষ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শিক্ষক, কর্মচারী আন্তরিক না হলে এদের অযত্ন হয়। যেমন-এদের সাথে ধমকের সুরে কথা বলা, এদের প্রতি মনোযোগের অভাব ইত্যাদি।

প্রতিবন্ধী শিশুদের সহায়তার জন্য কীভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করা দরকার?
প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী আমাদের অবশ্যই তাকে বিশেষ শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেমন- দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি, শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীর জন্য ইশারায় ভাষা শিক্ষা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের নিজের কাজ নিজে করতে পারার প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। এছাড়া, তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের উপার্জন করার জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যই থাকে শিশুটি যেন আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। এই কার্যক্রম তখনই সফল হবে, যখন শিক্ষকেরা তাদের প্রতি যত্নবান হবেন। তাদের সৌহার্দপূর্ণ কণ্ঠস্বর, ধৈর্য, আন্তরিকতা একজন প্রতিবন্ধী শিশুকে প্রশিক্ষণে উৎসাহী করবে, স্কুলে আসতে আগ্রহী করে তুলবে।

তোমরা যদি প্রতিবন্ধী শিশুটির আত্মীয়, প্রতিবেশী, সহপাঠী কিংবা সমবয়সি হও, তবে তোমরাও তার উদ্দীপনা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারো। তোমরা যা যা করতে পারো-

  • যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিশুটিকে সঙ্গ দেওয়া, দেখাশোনার দায়িত্ব তুমি নিজে নিতে পারো।
  • প্রতিবন্ধীদের ধরন অনুযায়ী খেলাধুলার আয়োজন করতে পারো। যেমন- দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের গল্প শোনানো, শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সাথে দাবা খেলা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর সাথে গান, গল্প, ছবি আঁকা ইত্যাদি।
  • এলাকায় কোনো প্রতিবন্ধী দরিদ্র হলে তার জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নিতে পারো।
  • ছোট শিশুরা প্রতিবন্ধী শিশুকে ভয় পায়। তার এই ভয় দূর করার জন্য তুমি ভূমিকা রাখতে পারো। প্রতিবন্ধী শিশুটির অসুবিধাগুলো ঠিকভাবে বুঝিয়ে দিলে ঐ স্বাভাবিক শিশুটিও প্রতিবন্ধী শিশুটির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাহায্যকারী হয়ে উঠতে পারে।
  • প্রতিবন্ধী শিশুটির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে নানাভাবে তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারো ।

সমাজ ও পরিবারের সবার সহযোগিতায় একজন প্রতিবন্ধী কীভাবে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে, তার একটি ঘটনা তোমাদের জানাই, জন্মগতভাবে চোখে দেখে না ছোট্ট মেয়ে কাজল। তার মা বাবা যখন জানতে পারলেন তাঁদের সন্তান দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তখন তাঁরা দিশাহারা হয়ে পড়লেন। পাঁচ বছর আগে আস্তে আস্তে দৃষ্টি হারিয়ে যাওয়া দাদি বললেন আমিও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। আমি এখনো শব্দ ও স্পর্শ দিয়ে সব কিছু বুঝতে পারি। ওকেও এভাবে শেখাতে হবে। তাঁরা নিকটস্থ পরামর্শ কেন্দ্রের সাহায্যে শিশুটিকে শোনার, অনুভব করার, কোনো কিছুর গন্ধ নেওয়ার প্রচুর উদ্দীপনা দিতে শুরু করলেন। দাদি তাঁর সাথে প্রচুর কথা বলতেন, গান শোনাতেন। তাকে স্পর্শ করে চলাফেরা শেখানো হলো। খেলার মাঠে নেওয়া হলো। তিন-চার বছর থেকে সে নিজেই বাথরুমে যেতে পারত। ছয় বছর বয়সে সে বিশেষ স্কুলে যেতে শুরু করল। প্রতিবেশী ছেলেমেয়েরা তাকে সাথে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য আসত। পাড়ার লোকজন যখন তাদেরকে দেখত তারা বুঝতেই পারত না কে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী।

প্রতিবন্ধী শিশুটির পরিবারের প্রতি যতভাবে সম্ভব সহযোগিতার হাত বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের সব কাজের মাধ্যমে বোঝাতে হবে যে প্রতিবন্ধী শিশুটির পাশে আমরাও আছি। সমাজের সবার অফুরন্ত ভালোবাসা তাদের এগিয়ে দিতে সাহায্য করবে। তাদের জগৎটাকে সহজ ও সুন্দর করে তুলবে। প্রতিবন্ধী শিশুর বিশেষ যত্ন, মনোযোগ ও ভালোবাসায় সে আরও বেশি সক্ষম ও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারবে।

প্রতিবেশীরা বুঝতেই পারে না কে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী।

কাজ ১- প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে তার পরিবার যে সমস্যার সম্মুখীন হয় তা নিরসনে তার আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শিক্ষক কীভাবে সহযোগিতা করতে পারেন তা লেখো।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...