গান এবং নাচের জন্য ছন্দ, মাত্রা ও তাল প্রদর্শন করতে বাদ্যের ভূমিকা অপরিহার্য। প্রকৃতির যে উপাদানগুলো বিশেষভাবে ধ্বনি ও সুর উৎপাদন করতে পারে তাকে বাদ্য বলে। সুর উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক উপাদানের বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাদ্যকে প্রধানত চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তাহলো ততবাদ্য, আনদ্ধবাদ্য, শুষিরবাদ্য ও ঘনবাদ্য।
ততবাদ্য (Chordophones) তার জাতীয় বাদ্য। তার বা সুতা টান করে বেঁধে তাতে টোকা বা ঘষা অথবা আঘাত করে বাজানো হয়। একতারা, বেহালা, দোতারা, সারিন্দা, সেতার, গিটার এই শ্রেণির বাদ্য।
আনদ্ধ বা অবনদ্ধ বাদ্য (Membranophones) মূলত চামড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া কোনো গোলাকার কাঠ কিংবা ধাতব পাত্রে টানটান করে বেঁধে সেখানে লাঠি, হাত কিংবা আঙুলের টোকা বা আঘাত করে বাজানো হয়। ঢোল, তবলা, ডমরু, মৃদঙ্গ, মাদল, ডক্ষ, দামামা এই শ্রেণিভুক্ত।
শুষির বাদ্য (Aerophones) বলতে বাতাসবাহিত বাদ্য বোঝায়, যা মুখে ফুঁ দিয়ে বা বাতাসে চাপ সৃষ্টি করে শব্দ করা হয়। যেমন বাঁশি, হারমোনিয়াম, শঙ্খ, সানাই ইত্যাদি।
ঘনবাদ্য (Ediophones) বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন লোহা, কাঁসা, কাঠ, পাথর, লাউয়ের খোল, বেল বা নারিকেলের মালা, বাঁশ, নল, পাতা, মাটি, পিতল ইত্যাদি দিয়ে বানানো হয়। মন্দিরা, জাইলোফোন, জুড়ি, খঞ্জনি এই গোত্রের।
যে সকল বাদ্য এককভাবে বাজানো যায়, তাঁকে স্বয়ংসিদ্ধ বাদ্য বলে, যেমন পিয়ানো, সেতার, সরোদ প্রভৃতি। আবার যে বাদ্য কেবল গান বা অন্য বাদ্যের সঙ্গে আনুগত্য রেখে সঙ্গত করা হয় তাকে অনুগতসিদ্ধ বাদ্য বলে, যেমন তানপুরা, মৃদঙ্গ প্রভৃতি; কণ্ঠসংগীতের সঙ্গেও এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন পূজা, বিবাহ, মুহররমের শোভাযাত্রা, লাঠিখেলা, কুস্তির আখড়ায় ঢোল ঢাক বাজানোর রীতি আছে। পাহাড়পুর-ময়নামতীর পোড়ামাটির চিত্রে কাঁসর, করতাল, ঢাক, বীণা, মৃদঙ্গ, বাঁশি, মৃৎভান্ড প্রভৃতি বাদ্যের খোদাই করা নকশা দেখা যায়। কোনো জাতির জন্য তাদের নিজ বাদ্য পরিচয়ের গুরুত্ব অশেষ।
একতারা
একতারা তত গোত্রীয় লোকজ বাদ্যযন্ত্র। একতারা তৈরি করতে একটি লাউয়ের খোল, একটি বাঁশের দণ্ড, কাঠের বয়লা ও একটি তার প্রয়োজন। বাদ্যযন্ত্রটির নির্মাণ পদ্ধতি সহজ। গোলাকৃতির লাউয়ের খোলের উপরিভাগ বৃত্তাকারে কাটা হয়। একটি সরু তিন ফুট লম্বা বাঁশের দণ্ডের এক প্রান্তের গিটকে অটুট রেখে এবং বাঁশের মধ্যাংশ চিরে সেটিকে লম্বা চিমটা আকারে লাউয়ের খোলের উভয় দিকে তার বা সুতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। লাউয়ের খোলের তলা কেটে চামড়ার ছাউনি দেওয়া হয় এবং এই ছাউনির ভিতর দিয়ে লোহার তার ঢুকিয়ে তারের অন্য প্রান্ত বাঁশের মাথায় কানের সাথে যুক্ত করা হয়। ডান হাতের তর্জনী বা মধ্যমা আঙ্গুলে মিজরাব লাগিয়ে একতারা বাজাতে হয়। বাউল গানের সঙ্গে একতারা যন্ত্র বেশি ব্যবহৃত হয় ।
১। লাউয়ের খোল
২। বাঁশের দণ্ড
৩। কাঠের বয়লা
৪। পিতল বা লোহার তার
৫। চামড়ার ছাউনি

দোতারা
দোতারা তত জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। দোতারা কাঠের তৈরি। প্রায় আড়াই ফুট লম্বা ও আধা ফুট চওড়া এক খণ্ড কাঠ খুদে দোতারা তৈরি করা হয়।
১। কান বা বয়লা
২। তারগহন
৩। তার
৪। চামড়ার ছাউনি
৫। খোল
৬। সোয়ারি বা ব্রিজ
৭। লেংগুট বা টেলপিস

কাঠের খোদানো বুকে একটি ইস্পাতের পটরী আবদ্ধ থাকে। কাষ্ঠখণ্ডের বুকের নিচের গোলাকার অংশকে খোল বলে। খোলের ওপর একটি চামড়ার ছাউনি লাগানো হয়। খোলের শেষ প্রান্তে একটি লেংগুট আটকানো হয়। ছাউনির ওপর সোয়ারি থাকে। তারগহনের ওপরের দিকে চারটি কাঠের বয়লা লাগানো থাকে। এই চারটি বয়লা থেকে চারটি তার সোয়ারি হয়ে লেংগুটের সাথে আটকানো থাকে। বর্তমানে একটি পঞ্চম তারও দোতারায় ব্যবহৃত হয়। দোতারা জওয়া দিয়ে বাজানো হয়। বাঁ হাতে পটরির ওপর তার চেপে ডান হাতে জওয়া দিয়ে আঘাত করে দোতারা বাজানোর নিয়ম। ভাওয়াইয়া গানে দোতারা একটি অপরিহার্য বাদ্যযন্ত্র। সেই কারণে ভাওয়াইয়া গানকে দোতারার গানও বলা হয়।
Read more