রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের অন্যতম রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগে থেকেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি কোলকাতার সাহিত্য, সংগীত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখনকার সমাজের কুসংস্কার দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ঊনিশ শতকের উল্লেখযোগ্য সমাজ সংস্কারক। ঠাকুর পরিবার ছিল যেমনি বিশাল তেমনি নানা প্রতিভাবানের সমাবেশে উজ্জ্বল। রবীন্দ্রনাথের বড়ো ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন দার্শনিক ও কবি, সেজো ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন বৃটিশ-ভারতের প্রথম বাঙালি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। অন্যান্য ভাই বোনদের মধ্যে হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বর্ণকুমারী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একাধারে সংগীতজ্ঞ ও নাট্যকার। গানের ব্যাপারে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে রবীন্দ্রনাথ অনেক ঋণী।
বালক বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখা শুরু করেন। ছোটোবেলা থেকে বিভিন্ন বিষয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি গানও শিখেছেন। ছোটোবেলাতেই নিজের তৈরি গান শুনিয়ে বাবার কাছ থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তিনি প্রথমে পড়েছেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে, পরে নর্মাল স্কুলে। স্কুলের একঘেয়ে নিয়মের বন্দিদশা থেকে তিনি মুক্তি চাইতেন। অথচ অন্যদিকে আবার বারান্দার রেলিংগুলোকে ছাত্র বানিয়ে কড়া শাসন করতেন। এ ছিল বালক রবীন্দ্রনাথের আপন খেয়ালের খেলা। আবার বন্ধ ঘরের জানালা দিয়ে উদাস দুপুরের রূপ দেখতেন। জমিদার বাড়ি হলে কি হবে প্রাচুর্য বা জৌলুসের মধ্যে তিনি বড়ো হননি।
'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে কবি হিসেবে সাহিত্যে বিশ্বের সেরা নোবেল পুরস্কার পান এবং সেই সুবাদে বাংলা সাহিত্য বিশ্বের দরবারে পরিচিতি পায়।
রবীন্দ্রনাথ শুধু লেখেননি, সমাজসেবামূলক অনেক কাজ করেছেন। আমাদের দেশের কৃষকদের সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশের শাহজাদপুরে কৃষিব্যাংক এবং পশ্চিমবঙ্গে বোলপুরের শ্রীনিকেতনে পল্লি সংগঠন স্থাপন করেন। তাঁর মহত্তম কীর্তি শান্তিনিকেতন। প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে সেখানে একেবারে শিশুশ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ রয়েছে। নাচ-গান, ছবি আঁকা, কাপড় রাঙানো, তাঁত বোনা, সেলাই করা সব রকম কলা চর্চার ব্যবস্থা আছে লেখাপড়ার পাশাপাশি। এছাড়া, কুটির শিল্প, সমবায় এসবের জন্যও তিনি বহু কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে মনে করতেন গানই তাঁর সেরা সৃষ্টি। তিনি দুই হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন। এগুলো পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ এ রকম কয়েকটি পর্বে ভাগ করেছেন নিজেই। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' তাঁরই রচনা।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীত ভুবনে এক অসাধারণ কবি, গীতিকার ও সুরস্রষ্টা। কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ সালের ১১জ্যৈষ্ঠ বুধবার (১৮৯৯ সালের ২৪ মে) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতার নাম জাহেদা খাতুন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে কাজী নজরুল ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া। নয় বছর বয়সে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। ফলে আর্থিক সংগতির অভাবে তার বিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য সামান্য চাকরি থেকে শুরু করে যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈনিক হিসেবেও তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ১৯১০ সালে মসজিদে ইমামতি করেন ও স্থানীয় পীরের মাজারে খাদেম ছিলেন। ১৯১১-১২ সালে শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে প্রথম ভর্তি হন ও কিছুকালের মধ্যেই স্কুল ত্যাগ করে মাথরুন নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটশনে ভর্তি হন। এরপর ১৯১৪ সালে তিনি ময়মনসিংহের দরিরামপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন ও পরবর্তীতে ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সালে পুনরায় শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পরিশেষে ১৯১৭ সালে ৪৯নং বাঙালি পল্টনে সৈনিকরূপে যোগদান করেন।
কৈশোরে লেটোর গান রচনা, বিদ্যালয়ে শিক্ষকের বিদায় সম্বর্ধনা উপলক্ষে কবিতা রচনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে তার স্বাভাবিক কবিত্বশক্তির স্ফুরণ লক্ষ করা যায়। পরবর্তীকালে ১৯১৯ সালে তাঁর সৈনিক জীবনের মধ্যভাগ থেকে তিনি সাহিত্য-সাধনায় ব্রতী হন। এই সময়ে তাঁর "বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী" নামে রচনা মাসিক 'সওগাত' ও 'মুক্তি' নামে কবিতা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। সৈনিক জীবন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি পুরোপুরিভাবে কাব্য রচনায় ব্যাপৃত হন। বাংলা কাব্য সাহিত্যে 'বিদ্রোহী' নামে এক অমর কবিতা রচনা ও পরাধীনতা, সামাজিক অনাচার, অবিচার, কুসংস্কার এর বিরুদ্ধে তাঁর নিরলস, দুঃসাহসী ও আপোষহীন সংগ্রাম তাঁকে 'বিদ্রোহী' কবি নামে জাতির কাছে পরিচিত করেছিল।
দেশ তখন ইংরেজ শাসনাধীন ছিল। পরাধীনতার বিরুদ্ধে অনলবর্ষী রচনার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ তার বেশ কয়েকটি পুস্তক বাজেয়াপ্ত করেন। তাঁকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় ও একাধিকবার কারাগার বরণ করতে হয়।
সমাজের সাধারণ শ্রেণির মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সদা জাগ্রত ছিল, তাঁর জীবনের বিভিন্ন সময়ে পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর পরিচয় রেখেছেন। কী কবিতায়, কী গানে, তিনি তাঁর সময়ের প্রচলিত ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক দিগন্ত উন্মোচন করেন ও অত্যন্ত বলিষ্ঠ একটি ভাবধারার প্রবর্তন করেন।
কবিতার ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু ছাড়াও বিভিন্ন অপ্রচলিত ও নিত্য নতুন ছন্দের অনায়াস ব্যবহারে তিনি সবাইকে চমৎকৃত করেছেন। নজরুল তাঁর কবিতায় ও গানে আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষার বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন।
তাঁর রচিত গান সম্পূর্ণ নতুন এবং বিচিত্র ধরনের। সংগ্রামী তার গানে উদ্বুদ্ধ হত, ভক্ত তাঁর গানের ভক্তিরসে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতো। সমাজের সকল স্তরে সব মানুষের দুঃখ সুখের সঙ্গী তাঁর গান। তিনি আবৃত্তিকার ও অভিনেতা হিসেবেও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। ছায়াছবি ও নাটকের কাহিনিকার এবং সংগীত পরিচালকের ভূমিকাতেও তার কৃতিত্ব অসামান্য।
নজরুল ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এইচ এম ভি গ্রামোফোন কোম্পানির গীতিকার ও প্রশিক্ষক (Trainer) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অন্যান্য রেকর্ড কোম্পানি ছাড়াও ১৯৩২ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোলকাতা বেতারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি 'হারামণি' ও 'নবরাগমালিকা' শিরোনামে সংগীত বিষয়ক তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার করেছেন। ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খান, ওস্তাদ কাদের বখশ, ওস্তাদ মঞ্জু সাহেব, ওস্তাদ মস্তান গামা প্রমুখ প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞদের কাছ থেকে তিনি শাস্ত্রীয়সংগীতের তালিম গ্রহণ করেছিলেন।
নজরুল স্বয়ং বেশ কয়েকটি রাগের সৃষ্টি করেছেন যেমন: নির্ঝরিণী, সন্ধ্যামালতী, বেণুকা, শংকরী, বনকুন্তলা, যোগিনী, উদাসী ভৈরব, মীনাক্ষী, শিব-সরস্বতী, অরুণ-ভৈরব, রূপমঞ্জুরী, রুদ্র ভৈরব, অরুণ-রঞ্জনী, আশা- ভৈরবী, দেবযানী, শিবানী-ভৈরবী, দোলনচাঁপা ইত্যাদি।
এছাড়া তিনি কয়েকটি নতুন তাল সৃষ্টি করেন। যেমন- প্রিয়া, নব-নন্দন, মণিমালা, মঞ্জুভাষিণী, মন্দাকিনী, স্বাগতা, মধুমতি, রুচিরা, দীপকমালা, ছন্দবৃষ্টিপ্রপাত, মত্তময়ূর ইত্যাদি।
এছাড়া বাংলা গজলের প্রচলন তিনিই সার্থকভাবে করতে পেরেছিলেন। বাংলাসংগীতে মার্চ-সংগীত বা কুচকাওয়াজের গানের তিনিই প্রথম উপস্থাপক। প্রায় ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ ধরনের গানের স্রষ্টা কাজী নজরুল। যেমন- গণসংগীত, শ্রমিকের গান, কৃষকের গান, ধীবরের গান, ছাদ পেটার গান, লেটো গান, ছাত্রদলের গান, কুচকাওয়াজের গান, নদীর মাঝির গান ইত্যাদি। এসব ছাড়াও পল্লিসংগীত, বাংলা ভাষায় সাঁওতালিদের ঝুমুর গান, আরবি, ফারসি ও অন্যান্য বিদেশি শব্দ ও সুরের মিশ্রণে গজল গান, বিভিন্ন প্রচলিত অপ্রচলিত রাগাশ্রয়ী গান, নিজ সৃষ্ট অন্তত বিশটি রাগের উপর রচিত গান, প্রকৃতির গান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, কীর্তন, শ্যামা সংগীত, ভজন, হামদ, নাত, মর্সিয়া ইত্যাদি ভক্তিমূলক গান, মুসলিম জাগরণী গান, বৃন্দ গান, বাউল গান, শিশুতোষ গান, হোরী, নারীদের ওপর রচিত গান, কাব্যসংগীত (আধুনিক), দেশাত্মবোধক গান, রাগ প্রধান, ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের গান রচনা করে তিনি বাংলার সংগীত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর স্মৃতি শক্তি ও বাকশক্তি হারান। বাংলাদেশ সরকার এর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবিকে ১৯৭২ সালে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, নাগরিকত্ব প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক 'ডি-লিট' উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ ভাদ্র ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
বাংলাগানের পঞ্চভাস্করদের (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলাম) মধ্যে অন্যতম দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্ম গ্রহণ করেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবার যেমন বাংলা সাহিত্য-সংগীত চর্চার ক্ষেত্রে কোলকাতায় উল্লেখযোগ্য নাম তেমনি কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে রায় পরিবার। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কয়েক পুরুষ পূর্ব থেকেই সাহিত্য সংগীত চর্চায় ব্রতী ছিল কৃষ্ণনগরের রায় পরিবার। শোনা যায় কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণ চন্দ্র রায়ের সাহিত্য সভার সভাসদ ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পূর্বপুরুষ। তাঁর পিতা দেওয়ান কার্তিকেয় চন্দ্র রায় ছিলেন তৎকালীন সময়ের প্রসিদ্ধ খেয়াল গায়ক। বড়ো ভাইদের মধ্যে জ্ঞানেন্দ্রলাল রায় ছিলেন স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক এবং বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক। রাজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে সুপণ্ডিত। রাজেন্দ্রলাল রায় এবং জ্ঞানেন্দ্রলাল রায় মিলে নবপ্রভা নামের একটি পত্রিকা সম্পাদন করতেন।
ছেলেবেলায় পারিবারিক পরিবেশে সংগীতে প্রাথমিক শিক্ষা পান দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তিনি ১৮৭৮ সালে এন্ট্রান্স এবং ১৮৮০ সালে এফএ পাশ করে হুগলী কলেজে ভর্তি হন। ১৮৮২ সালে হুগলী কলেজ থেকে বিএ এবং ১৮৮৪ সালে কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করেন। একই বছর দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কৃষিবিদ্যা বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিলেত যান। বিলেত বাসকালে দ্বিজেন্দ্রলাল পাশ্চাত্যসংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরেই তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মুঙ্গেরে যোগদান করেন। প্রখ্যাত টপখেয়াল গায়ক সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার তখন মুঙ্গেরে বাস করছেন। টপ্পা বিশেষ অলংকারধর্ম এক ধরনের সংগীত শৈলী। টপ্পার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অলংকার সহযোগে গীত খেয়াল গানকে টপ-খেয়াল বলা হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সুরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে টপখেয়ালের তালিম গ্রহণ করেন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ওজস্বী, ব্যঞ্জণাধর্মী সুর, টপ্পার অলংকার, জমজমা (পাশাপাশি দুটি স্বরের আন্দোলনধর্মী অলংকার) এবং পাশ্চাত্য সুরধর্মী চলন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ই বাংলা গানে প্রথম শাস্ত্রীয়সংগীত এবং পাশ্চাত্য সংগীতের যথার্থ মেলবন্ধন (Fusion) ঘটিয়ে নতুন মাত্রা দান করেন। সেই সময় এই বিশেষ ধরনের সুরকে DL Roy এর সুর বলা হতো।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় দেশাত্ববোধক, প্রেমসংগীত, ভক্তিগীতি এবং নাট্যসংগীত ইত্যাদি বিচিত্র ধারার গান রচনা করেন। তাঁর সময়ে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। হাসির গানের জন্য তিনি তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, ইংরেজ শাসন, এবং ইংরেজ তোষামোদী বাঙালি সমাজ নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ ছিল এই গানের প্রধান বিষয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৯১৩ সালের ১৭ মে মৃত্যুবরণ করেন।
রজনীকান্ত সেন
বাংলাগানের ধারায় কান্তকবি বলে খ্যাত রজনীকান্ত সেন ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে সিরাজগঞ্জ জেলার ভাঙাবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার সহজ সুমধুর লোকসুর ও রামপ্রসাদী সুর রজনীকান্তের গানের সুরবৈশিষ্ট্য আর বাণীর ভাবের ক্ষেত্রে তা প্রধানত ভঙ্গিবাদী। স্রষ্টার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সুমধুর ভক্তিগীতি রচয়িতা হিসেবে তিনি বাংলাসংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেন। পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন সরকারি আইন কর্মকর্তা।
মুন্সেফ এবং সাব জজ হিসেবে তিনি ঢাকা, বরিশাল, পাবনা, মেদিনীপুর, কাটোয়া বিভিন্ন জেলায় চাকরি করেছেন। রজনীকান্ত সেনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জেলা শহরে।
রজনীকান্তের সংগীত সমগ্রকে প্রধান তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ভঙ্গিরসাত্বক, হাস্যরসাত্বক ও স্বদেশি সংগীত। আইন ব্যবসায়ী (উকিল) রজনীকান্ত সেন রাজশাহীতে থাকার সময় পরিচিতি হন সেখানে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাথে। দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির গানে অনুপ্রাণিত হয়ে রজনীকান্ত বেশকিছু হাসির গান রচনা করেন। তবে উল্লেখ্য সদা বিনয়ী এবং আত্মসমর্পিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী রজনীকান্তের হাসির গান দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানের মতো তীব্র ব্যাঙ্গাত্মক নয় বরং হাস্য ও রম্য প্রধান।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র বাংলার সাহিত্য, সংগীত-সাংস্কৃতিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে ওঠে। রজনীকান্ত সেন রচনা করেন তাঁর কালজয়ী গান। 'মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়, মাথায় তুলে নে-রে ভাই' এই গান তাঁকে রাতারাতি চূড়ান্ত খ্যাতি এনে দেয়। রজনীকান্ত সেন ১৯১০ সালে গলায় কর্কট (ক্যান্সার) রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
অতুলপ্রসাদ সেন
আধুনিক বাংলাগানের সমৃদ্ধিতে যে ক'জন বাঙালি গীতিকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম অতুলপ্রসাদ সেন। বাংলাগানে তিনি যোগ করেন ঠুমরি এবং পারস্যের গজল অঙ্গের সুর। অতুলপ্রসাদ সেন ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা রামপ্রসাদ সেন পেশায় ডাক্তার হলেও তিনি সংগীতানুরাগী ছিলেন। ছেলেবেলায় পিতার মৃত্যু হলে অতুলপ্রসাদ সেন মাতামহ বাহাদুর কালী নারায়ণ গুপ্তের আশ্রয়ে লালিত হন। মাতামহ কালী নারায়ণ গুপ্ত নিজে ছিলেন সংগীতানুরাগী সৌখিন গায়ক ও ভক্তিগীতি রচয়িতা। এমনি সংগীতময় পরিবেশে অতুলপ্রসাদ সেনের ছেলেবেলা কাটে। ১৮৯০ সালে এন্ট্রান্স পাশ করে অতুলপ্রসাদ কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন সমাপ্ত না করেই একই বছর অতুলপ্রসাদ সেন ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত যান। বিলেত থেকে ফিরে তিনি প্রথম কোলকাতা এবং পরে লক্ষ্ণৌতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। বন্ধুবৎসল অতুলপ্রসাদ সেন খুব অল্প দিনেই লক্ষ্ণৌতে লোকপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। লক্ষ্ণৌতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গলী ক্লাব, সম্পাদনা করেন 'উত্তরা' পত্রিকা।
অতুলপ্রসাদ বাংলাগানে আনেন লক্ষ্ণৌ এর ঠুমরি গানের চাল ও পারস্য গজলের ধরণ, মেলবন্ধন করেন শাস্ত্রীয়সংগীতের খেয়াল, ঠুমরি আর বাংলার লোকসংগীতের। বাণী ও কাব্যভাবের দিক থেকে তাঁর গানকে মানবপ্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি, স্বদেশ এই চার ভাগে ভাগ করা যায়। তাঁর প্রেমের গানে প্রধানত প্রকাশ পেয়েছে বিরহের দুঃখবোধ, না পাওয়ার বেদনা। প্রকৃতির গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি, নিসর্গের রূপবর্ণন। ভক্তিগীতিতে অতুলপ্রসাদ পিতা রামপ্রসাদ সেন ও মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের মতো সমর্পিত ঈশ্বর ভক্তির অনুগামী। অতুলপ্রসাদের স্বদেশি গান সমকালীন অন্যান্য কবিদের মতো বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উৎসারিত। তবে এই গান কালের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তির সংগ্রামে। অতুলপ্রসাদ সেন ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
Read more