শিশুর বিকাশে খেলাধুলা (পঞ্চম অধ্যায়)

শিশুর বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক - গার্হস্থ্যবিজ্ঞান - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

2.4k

শিশুর খেলা

শিশুরা খেলে, কারণ খেলা তাদের আনন্দ দেয়। খেলা শুধু আনন্দই দেয় না, খেলার মাধ্যমে শিশুর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক দক্ষতার বিকাশ ঘটে। লাধুলা বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা শেখায় এবং ভাগাভাগি করে নেওয়ার মনোভাব তৈরিতে সাহায্য করে। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে শিশু-সঙ্গী সাথিদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। শিশুরা নিজেকে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারে, অন্যকে বুঝতে শেখে, অন্যের অনুভূতিকে মূল্য দিতে শেখে। খেলাধুলা তাদের মধ্যে ন্যায় ও অন্যায় বোধ জাগ্রত করে। খেলার মধ্য দিয়ে শিশুরা কল্পনা ও নতুন কিছু সৃষ্টির চর্চা করে।
শৈশবের প্রথম বছরগুলোতে যখন শিশুর মস্তিষ্ক পড়াশোনার জন্য প্রস্তুত থাকে না, তখন খেলার মধ্য দিয়ে শিশুরা অনেক কিছু শিখতে পারে। যেমন- শব্দ, অক্ষর, সংখ্যা মুখস্থ করার চেয়ে খেলার মাধ্যমে শিশুকে শেখানো সহজ হয়। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, খেলা শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা দেখেছেন যে, খেলাধুলা শিশুর শারীরিক ও সামাজিক দক্ষতা অর্জনের সহজ মাধ্যম যা তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করে। খেলা শিশুদের অভিজ্ঞতা বাড়ায়, আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা শিশুর বিনোদনের মাধ্যম। খেলাধুলা শিশুকে অপরাধ প্রবণতা থেকে রক্ষা করে। যেসব শিশুর কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতা আছে খেলাধুলা তাদের জন্য উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

অবসর সময়ে গল্পের বই পড়ে অনামিকা। এছাড়া সে স্কুলে বন্ধুদের সাথে বউচি, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলে।

ইচ্ছামতো কাজ করা
খেলা করা
মনের ঝোঁক বা আগ্রহ
ভ্রমণ করা

বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে খেলাকে বিভিন্নভাবে শ্রেণিকরণ করা হয়। যেমন-
অঙ্গ সঞ্চালনমূলক খেলা- শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে শিশুরা যে খেলাগুলো খেলে থাকে তাই
অঙ্গ সঞ্চালনমূলক খেলা। যেমন- দৌড়াদৌড়ি, বল খেলা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, গাছে চড়া ইত্যাদি। জন্মের পর প্রথম দুই বছর শিশু হাত-পা নাড়াচাড়া করে, আঙুল মুখে দিয়ে আনন্দ পায়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে অঙ্গ সঞ্চালনে পরিবর্তন ঘটে। একটু বড় হলে হামাগুড়ি দেওয়া, দোলা, দৌড়ঝাঁপ, বেয়ে ওঠা ইত্যাদি অঙ্গ সঞ্চালনমূলক খেলা শিশু করে থাকে। সাধারণত ৫ বছরের পর থেকে শিশুরা এ ধরনের খেলায় দক্ষতার পরিচয় দেয়। ৭ ও ৮ বছর বয়সে শিশুরা দলবদ্ধ হয়ে অঙ্গ সঞ্চালনমূলক খেলা করে থাকে। যেমন- ফুটবল, বৌছি, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা ইত্যাদি।

আবিষ্কারমূলক খেলা- অনেক সময় শিশু খেলনাকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে খেলনার গঠন রহস্য আবিষ্কার ,করতে চেষ্টা করে। এতে খেলনাটি ভেঙে যায় ঠিকই কিন্তু খেলনার ভেতরে যন্ত্রপাতি দেখে শিশু আনন্দ পায়। এ থেকে শিশু বস্তুর আকার আকৃতি, কীভাবে এগুলো তৈরি হয়েছে, কীভাবেই বা কাজ করে ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।

গঠনমূলক খেলা- শিশু যখন তার নিজের ধারণা এবং অনুভূতি দিয়ে কোনো কিছু তৈরি করে, তখন সেটা গঠনমূলক খেলা হয়। সাধারণত ৩ বছর বয়সের পর থেকে শিশুর মধ্যে গঠনমূলক খেলার প্রতি ঝোঁক দেখা যায়। যেমন- কাগজ দিয়ে প্লেন ও নৌকা তৈরি, বালি, কাদামাটি, আটার মন্ড ও ব্লক দিয়ে বাড়ি, সেতু ও নানা আকৃতির জিনিস তৈরি করে শিশু আনন্দ পায়। এতে শিশুর চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে। শিশুরা ছবি আঁকা ও রং করার মাধ্যমে সহজেই নিজের ধারণা ও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।

কাল্পনিক বা নাটকীয় খেলা- সাধারণত ২ ও ৩ বছর বয়সের শিশুরা বাস্তব জীবনের অনুকরণে অভিনয় করে খেলে। যেমন- শিশু মা সেজে খেলে, ডাক্তার ও রোগীর ভূমিকায় অভিনয় করে, গাড়িচালক, ফেরিওয়ালা, পাইলট ইত্যাদি চরিত্র অনুকরণ করে খেলে। এই খেলা শিশুর কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি করে, সমাজে কার কী ভূমিকা বা দায়িত্ব সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।

দর্শন ও শ্রবণ-ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে আনন্দ লাভ
অনেক সময় শিশুরা নিজে অংশগ্রহণ না করে অন্যের খেলা দেখেও আনন্দ পায়। টিভি দেখা, গল্প শোনা ইত্যাদিও এক ধরনের খেলা, যা থেকে শিশুরা আনন্দ লাভ করে। এতে ভাষার বিকাশ হয়, চিন্তা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

স্থানভেদে খেলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
১) বহিরাঙ্গন খেলা (Outdoor Games) ও
২) অভ্যন্তরীণ খেলা (Indoor Games)
১) বহিরাঙ্গন খেলা- যে খেলা গৃহের বাইরে খোলা মাঠ বা জায়গায় খেলা হয় তাকে বহিরাঙ্গন খেলা বলে। যেমন- ফুটবল, কাবাডি, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, কানামাছি ইত্যাদি। এ ধরনের খেলায় অঙ্গ সঞ্চালন হয় যা শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন।

২) অভ্যন্তরীণ খেলা গৃহ পরিবেশ অথবা আবদ্ধ স্থানে অনুষ্ঠানযোগ্য খেলাকে অভ্যন্তরীণ খেলা বলে। যেমন- দাবা, বাগাডুলি, ব্লক দিয়ে খেলা, ছবি আঁকা ইত্যাদি। এ ধরনের খেলায় বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে।

Content added By

শিশুকালে এমন অনেক খেলা আছে যে খেলাগুলো করতে দেখলে বোঝা যায়, শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছে। খেলা শিশুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বলিষ্ঠ ও শক্ত করে।

  • অঙ্গ সঞ্চালনমূলক খেলাধুলার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দ্রুত ও গভীর হয়। এতে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, যা শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে।
  • খেলার মাধ্যমে যে ব্যায়াম হয়, যার ফলে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসযন্ত্রের বিশেষ উপকার হয়। খেলাধুলা না করলে বা অলসভাবে সময় কাটালে দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা ও বৃদ্ধি স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না।
  • খেলাধুলার ফলে যে আনন্দ, বিনোদন হয় তাতে দেহমন উপকৃত হয়। খেলাধুলা তাদেরকে এমনভাবে অনুপ্রাণিত করে যে, তাদের মধ্যে নতুন উদ্যম ও সচেতনতা ফিরে আসে।
  • শিশুরা বড় হলে তাকে যে বিষয়গুলো মোকাবেলা করতে হবে, তার জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলা তাকে পূর্বপ্রস্তুতি দেয়। বড় হয়ে শিশুকে অনেক পরিশ্রমী হতে হয়, খেলার মাধ্যমে পরিশ্রমী হওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়। অল্পতেই শিশু ক্লান্ত হয় না।
  • শারীরিক পরিশ্রম না হলে খাবার থেকে প্রাপ্ত খাদ্যশক্তি দেহে জমা থাকে। খেলাধুলার ফলে এসব বাড়তি শক্তি দহনের মাধ্যমে দেহ থেকে বের হয়। ফলে শিশু সুস্থ ও সবল থাকে। তা না হলে এসব অতিরিক্ত শক্তি দেহে মেদ হিসেবে জমা হয় এবং শিশুর ওজন বেড়ে যায়।
  • বেশিরভাগ বহিরাঙ্গন খেলা শিশুর শারীরিক বিকাশ এবং সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। শিশুর সুস্থতা ও স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পিতামাতারও মানসিক সন্তুষ্টি আসে।

সুতরাং শারীরিক বিকাশে খেলাধুলা যেভাবে সহায়তা করে তা হলো-

  • অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়া-চাড়ার ফলে ব্যায়াম হয় এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুগঠিত হয়
  • রক্ত চলাচল ভালো হয়
  • দূষিত পদার্থ ঘামের মাধ্যমে দেহ থেকে বের হয়ে যায়
  • মাংস পেশি সতেজ ও সবল থাকে
  • পেশি চালনার নৈপুণ্য অর্জিত হয়
  • হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়, ফলে ক্ষুধা বাড়ে
  • ঘুম ভালো হয়

বর্তমানে শহরকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা গৃহের ভেতরের খেলা খেলতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে কম্পিউটার গেইম অন্যতম। কম্পিউটারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলায় কোনো অঙ্গ সঞ্চালন হয় না, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুগঠিত হয় না, দেহের ওজন বেড়ে যেতে পারে। ঘাড়ে, পিঠে ও কোমরে ব্যথা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া কম্পিউটার স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের নানা রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কাজ ১- তোমার জানা বহিরাঙ্গন খেলা ও অভ্যন্তরীণ খেলার তালিকা তৈরি করো।
কাজ ২ - শারীরিক বিকাশে অঙ্গ সঞ্চালনমূলক খেলার গুরুত্ব বর্ণনা করো। দীর্ঘ সময় কম্পিউটার গেইম খেলা কেন ক্ষতিকর তা লেখো।
Content added By

খেলাধুলা যেমন আমাদের আনন্দ দেয় তেমনি আমাদের সামাজিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ খেলাধুলা আমাদের সামাজিক গুণাবলি অর্জনে সাহায্য করে। দলগত খেলার মাধ্যমেই সাধারণত শিশু সামাজিক গুণগুলো অর্জন করে। যেমন- খেলার মাধ্যমে শিশু যখন অন্যের সাথে মেলামেশা করে, কথা বলে, দল গঠন করে, দলে নেতৃত্ব দেয় তখন থেকেই শিশুর মধ্যে সামাজিকতার বিকাশ ঘটে।

বয়সের সাথে সাথে শিশু খেলাধুলার মাধ্যমে সামাজিক হতে শেখে। যেমন-

একাকী খেলা- শিশু জন্মের প্রথম বছরে একা একা নিজের হাত-পা নিয়ে খেলে। কোনো জিনিস নেড়েচেড়ে দেখে, চুষে ও বাজিয়ে শব্দ করে সে আনন্দ পায়। এটা একাকী খেলা। এখানে বস্তুর ব্যবহার থাকতে পারে আবার নাও পারে। এ বয়সে তার সামাজিক বিকাশ হয় না বলেই সে একা একা খেলে।

পাশাপাশি খেলা- একে অন্যের সাথে না খেলে পাশাপাশি বসে একই সরঞ্জাম দিয়ে খেলে। তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ থাকে না। এটাই সামাজিকতার প্রথম ধাপ। দেড় থেকে তিন বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা এই ধরনের খেলা খেলে।

সহযোগিতামূলক খেলা - পরস্পরের মধ্যে খেলার সামগ্রী বিনিময় বা আদানপ্রদান করে খেলে। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়স থেকে শিশুরা এ ধরনের খেলা খেলতে শুরু করে।

সমবায় খেলা- এই খেলা শিশুরা দলগঠন করে খেলে। যেমন-ক্রিকেট, ফুটবল, হাডুডু ইত্যাদি। শৈশবে নিজেরাই খেলার নিয়মকানুন তৈরি করে খেলে। ফলে তাদের মধ্যে দলীয় নিয়মকানুন মেনে চলা, সচেতনতা, সহযোগিতা করার প্রবণতা ইত্যাদি সামাজিক গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়। পাঁচ বা ছয় বছর বয়স থেকেই শিশুদের মধ্যে সমবায় খেলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

খেলার মাধ্যমে শিশু যে সামাজিক গুণাগুণ অর্জন করে সেগুলো হচ্ছে-

  • নিজ নিজ কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি
  • সহযোগিতামূলক মনোভাব সৃষ্টি হয়
  • নেতৃত্ব দানের গুণাবলির বিকাশ হয়
  • দলের সাথে সহজে খাপ খাওয়ানো শিখে
  • খেলার সরঞ্জাম ও তথ্য আদানপ্রদান করা শিখে
  • গঠনমূলক কাজের বিকাশ ঘটে
  • রীতিনীতি, আইনকানুন মেনে চলার প্রবণতা তৈরি।

অতি শৈশবে শিশু মা-বাবা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে খেলে। ফলে শিশুর সাথে পরিবারের সবার একটি মধুর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দলগত খেলা শিশুর সামাজিক গুণাবলি অর্জনের সাথে সাথে নৈতিক গুণাবলি বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নৈতিকতার প্রাথমিক শিক্ষা যদিও শিশু পরিবার থেকে অর্জন করে তবে চর্চা হয় খেলার মাঠে। আত্মবিশ্বাস, ন্যায় ও অন্যায়, ভালো ও মন্দ বোঝার ক্ষমতা, সৎ ও সত্যবাদিতা ইত্যাদি নৈতিক মূল্যবোধ শিশু খেলার মাধ্যমে সহজেই অর্জন করতে পারে।

কাজ ১- তোমার জানা দুটি খেলার বর্ণনা দাও। খেলাগুলো কীভাবে সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে লেখো।
Content added By

আমরা অনেক ধরনের খেলা খেলি। তার মধ্যে কতগুলো খেলা আমাদের বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়। যে যত বুদ্ধিমান সে তত সৃজনশীল। বুদ্ধি হচ্ছে একটি মানসিক ক্ষমতা, যার মাধ্যমে আমরা সহজেই পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারি। যেকোনো ধরনের খেলাই হোক না কেন, বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ বা কৌশলী না হলে খেলায় নৈপুণ্য দেখানো যায় না।

বুদ্ধি বিকাশের ধারা অনুযায়ী শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন খেলা খেলে। যেমন- আবিষ্কারমূলক খেলা, গঠনমূলক খেলা, সৃজনধর্মী খেলা ও নাটকীয় খেলা। এইসব খেলা শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশে সহায়তা করে। কারণ এসব খেলার মাধ্যমে শিশু চিন্তা ও কল্পনা শক্তি প্রয়োগ করে বুদ্ধির প্রকাশ ঘটাতে পারে। তবে শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশে সৃজনশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৃজনশীলতা শিশুকে গতিশীল করে। খেলার মাধ্যমে সহজেই সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটানো যায়। সৃজনশীলতা অর্থ হচ্ছে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রকাশ বা নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা। কাগজ, কাঠের টুকরা, কাদা, বালু, ব্লক, ফুল, ডাল, পাতা, ফেলে দেওয়া বিভিন্ন ধরনের জিনিস যেমন- কাগজের বাক্স, ডিসপোজেবল কাপ, কৌটা ইত্যাদি দিয়ে শিশু যখন নতুন কিছু তৈরি করে তখনই সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে। শিশু সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনের অব্যক্ত ইচ্ছার প্রকাশ সহজেই ঘটাতে পারে।

বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশে প্রয়োজন

১। চিন্তার সহজ ব্যবহার- এটা সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশুরা ছবি এঁকে, রং করে, গল্প ও কবিতা লিখে নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করতে পারে। তবে এর জন্য দরকার চিন্তার প্রসারতা, শব্দভান্ডার বৃদ্ধি, শব্দের সমর্থক শব্দ জানা এবং সেটা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা। বাধাহীনভাবে ও সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা করা এবং তা প্রকাশ করতে পারার মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো যায়।

২। স্বকীয়তা বা নিজস্বতা- সৃজনশীল আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সব সময় স্মৃতিকে ব্যবহার না করে নতুন কিছু সৃষ্টির চিন্তা করা। এর মধ্যে থাকতে হবে শিশুর নিজস্বতা ও নতুনত্ব।

খেলার মাধ্যমে শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতা বিকাশে যা করণীয়-

  • শিশুদের খেলার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। গঠনমূলক, আবিষ্কারমূলক ও সৃজনশীল খেলায় শিশুকে উৎসাহিত করা।
  • খেলা যাতে শিশুর কৌতূহল বাড়াতে পারে, সেদিকে লক্ষ রেখে খেলার উপকরণের ব্যবস্থা করা। যেমন-গাছের ডাল, ফুল, পাতা, কাগজ, রং, তুলি, কাদা মাটি ইত্যাদি।
  • শিশুদের খেলার সরঞ্জাম নিরাপদ ও আকর্ষণীয় হওয়া।
  • খেলার স্থান পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস পূর্ণ, খোলামেলা ও নিরাপদ হওয়া।
  • খেলায় আগ্রহী করার জন্য বয়স উপযোগী সঠিক খেলনা শিশুকে দেওয়া।
  • শিশুকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলতে দেওয়া ও সব সময় খেলায় হস্তক্ষেপ না করা।

শিশুর জীবনে সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য দামি খেলনা বা ব্যয়বহুল উপকরণের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন খেলার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং। এবং বিভিন্ন ধরনের খেলায় শিশুকে উৎসাহিত করা।

কাজ ১- কোন কোন খেলা তোমার সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায় তার তালিকা করো।
Content added By

শখ শব্দের অর্থ হচ্ছে মনের ঝোঁক বা আগ্রহ। আর বিনোদন হচ্ছে তাই যা মনকে প্রফুল্ল রাখে। শিশুদের মধ্যে বিচিত্র ধরনের শখ লক্ষ করা যায়। যেমন- কেউ ডাকটিকিট সংগ্রহ করে, কেউ খেলনা সংগ্রহ করে, কেউ মুদ্রা সংগ্রহ করে, কেউ ছবি, ভিউকার্ড, পোস্টার সংগ্রহ করে। গল্প বা কবিতার বই পড়ে, কেউ বা ফেলে দেওয়া কৌটা, ছোট বাক্স সংগ্রহ করে; আবার কেউ ভ্রমণ করে, ছবি এঁকে, বাগান করে শখ পূরণ করে। শখ ও বিনোদন অনেকটা নির্ভর করে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও পরিবেশের ওপর। শখ ও বিনোদনের অনেক শিক্ষাগত দিক রয়েছে।

ডাকটিকিট- ডাকটিকিট সংগ্রহ করে দেশ ও বিদেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। আবার প্রতিযোগিতায় ডাকটিকিট প্রদর্শন করে পুরস্কার লাভ করা সম্ভব।

বই- ছড়া, রম্যরচনা, মুক্তিযুদ্ধের বই, কার্টুন, রহস্যমূলক বই, খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের জীবনী, গল্প ও কবিতার বই পড়ে জ্ঞানভান্ডার, কল্পনা ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করা যায়।

ভ্রমণ- ভ্রমণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক নিসর্গের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশের রুপালি নদী, সবুজ বনানী, নীল আকাশ ও গ্রামবাংলার নান্দনিক রূপ লাভ করা যায়। বাংলার দর্শনীয় স্থানগুলো হচ্ছে- ঢাকার লালবাগ কেল্লা, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শিশু পার্ক, যাদুঘর, ফয়'জ লেক, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, রাঙ্গামাটি, সিলেটের মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, জাফলং-এর পাহাড়ি নদীর স্বচ্ছ জলধারা, খাসিয়া পল্লী, কুয়াকাটার সাগরসৈকত, কুমিল্লার ময়নামতি পাহাড়, নওগাঁর পাহাড়পুর ইত্যাদি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করে জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করা যায়।

মুদ্রা সংগ্রহ- পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা প্রচলিত আছে এবং এর নামও বিভিন্ন। আবার মুদ্রার উপর বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, স্থান ও প্রতীকের ছাপ থাকে। যেমন- বাংলাদেশের মুদ্রার ওপর শাপলা, ইলিশ মাছ, হরিণ, কাঁঠাল ইত্যাদির ছবি আছে। এইসব ছবি থেকে একটি দেশের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়।

ভিউকার্ড, পোস্টকার্ড- ভিউকার্ড, পোস্টকার্ডে বিভিন্ন দেশের উল্লেখযোগ্য স্থান, নামকরা ব্যক্তি, কৃষি ও শিল্পপণ্য, শিল্পকর্ম, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি এবং সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকে। এ থেকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। নিজের হাতে ছবি এঁকে কার্ড তৈরি করে যেমন আনন্দ লাভ করা যায় তেমনি সৃজনীশীলতা বৃদ্ধি পায়।

গান ও কবিতা আবৃত্তি- গান গেয়ে ও কবিতা আবৃত্তি করে অবসর সময়কে কাজে লাগানো যায়। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে নিজে যেমন আনন্দ পাওয়া যায় অন্যকেও আনন্দ দেওয়া যায়।

বাগান করা ও পশুপাখি পালন- বাড়ির আঙিনায়, টবে, বাড়ির ছাদে ফুল, ফল ও সবজি বাগান করে নিজের শখ পূরণ করা যায়, বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা যায় এবং পরিবারের ফল ও সবজির চাহিদা মেটানো যায়। কবুতর, কোয়েল পাখি, মুরগি, হাঁস, ছাগল ইত্যাদি পালন করে শখ ও বিনোদন লাভ করা যায়। শিশুর সার্বিক বিকাশে, সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে শখ ও বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কাজ ১- পড়াশোনার পাশাপাশি তুমি কীভাবে তোমার শখ পূরণ কর তা বর্ণনা করো।
Content added By

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন:

১. কোনটি গঠনমূলক খেলা?

ক. সাঁতার কাটা
খ. সাইকেল চালানো
গ. পুতুল তৈরি
ঘ. কানামাছি

২. কোন খেলাটির মাধ্যমে নেতৃত্বদানের গুণটি গড়ে উঠে?

ক. রং করা
খ. দাবা
গ. ফুটবল
ঘ. ছবি আঁকা

নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং ৩ ও ৪ নং প্রশ্নের উত্তর দাও :
ফাহিম খুব ভালো ছাত্র। অবসর সময়ে গল্পের বই পড়ে ও ছবি এঁকে খুব মজা পায়। মায়ের সাথে দাবা খেলে প্রায়ই সে জিতে যায়।

৩. খেলার মাধ্যমে ফাহিমের মাঝে কোনটির বিকাশ ঘটে?

ক. নৈপুণ্যতা
খ. সামাজিকতা
গ. অনুকরণীয় মনোভাব
ঘ. পেশির সবলতা

৪. নিচের কোন ক্ষেত্রে ফাহিমের অগ্রগতি হচ্ছে?
i. মানসিক বিকাশ
ii. বুদ্ধিমত্তা
iii. উদ্ভাবনী শক্তি
নিচের কোনটি সঠিক?

ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii

সৃজনশীল প্রশ্ন :

১. ফারাজ তার বিদ্যালয়ের ফুটবল টিমের নির্ভরযোগ্য গোলকিপার। সে প্রতিবেশীর বিপদে-আপদে সহযোগিতা করার চেষ্টা করে। অবসর সময়ে সে প্রায়ই কাগজ কেটে বিভিন্ন রকমের ফুল, পাখি ও নকশা তৈরি করে। এছাড়া ডাকটিকিট সংগ্রহ করা এবং বই পড়াও তার অন্যতম শখ।

ক. দাবা কোন ধরনের খেলা?
খ. মুদ্রা সংগ্রহ করার অভ্যাস কেন বিনোদনের পাশাপাশি জ্ঞান বৃদ্ধিতেও সহায়ক?
গ. অবসর সময় কাটানোর উপায়টি ফারাজের মাঝে কোন ধরনের বিকাশ ঘটায়? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ফারাজকে অনুসরণ করার মাধ্যমে সামাজিক গুণ অর্জন সহজেই সম্ভব- বিশ্লেষণ করো।

২. সুমিতা একজন কর্মজীবী গৃহিণী। পাঁচ বছর বয়সি একমাত্র মেয়ে মিতাকে তিনি সব সময় পুষ্টিকর খাবার খেতে দেন। মিতা টিভি দেখে ও কম্পিউটারে গেমস খেলে অবসর সময় কাটায়। ইদানীং সুমিতা খেয়াল করছেন মিতা দিন দিন মোটা হয়ে যাচ্ছে এবং সমবয়সি বাচ্চাদের সাথে মেশার পরিবর্তে একা একা গেমস খেলে।

ক. প্রতিটি সুস্থ শিশু দিনের অধিকাংশ সময় কী করে কাটায়?
খ. বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে খেলার প্রকৃতি পরিবর্তিত হয় বুঝিয়ে লেখো।
গ. মিতার শারীরিক পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করো।
ঘ. মিতার সময় কাটানোর প্রক্রিয়া তার সামাজিক বিকাশে কীরূপ প্রভাব ফেলবে-বিশ্লেষণ করো।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...