গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর তাঁর নতুন অর্জিত জ্ঞান প্রচারের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, কার কাছে এই গভীর ধর্ম বোঝানো যায়। তখন তাঁর মনে পড়ে যায় তাঁর পুরাতন সাধনসঙ্গী পাঁচজনের কথা। এঁরা হলেন- কোন্ডিন্য, ভদ্দিয়, বপ্ন, মহানাম ও অশ্বজিৎ। তাঁদের উদ্দেশ্যে বুদ্ধ যাত্রা করেন বারাণসীর নিকটবর্তী সারনাথের ঋষিপত্তন মৃগদাবে। আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সেখানে পৌছে তিনি প্রথয় ধর্মদেশনা দেন। এই দেশনা "ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র" নামে পরিচিত। এতে তিনি চতুরার্য সত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গের শিক্ষা প্রদান করেন। তাঁর পাঁচ সাথি নিয়েই গঠিত হয় প্রথম ভিক্ষু সংঘ। যারা পরে ধর্ম প্রচারে বেরিয়ে পড়েন। এভাবে সারনাথ বুদ্ধের প্রথম ধর্মপ্রচারের স্মরণীয় স্থান হিসেবে ইতিহাসে চিরঅম্লান হয়ে আছে।
দীর্ঘ নিকায় ও মধ্যম নিকায়ের মধ্যে পার্থক্যসমূহ হলো-
| বিষয় | দীর্ঘ নিকায় | মধ্যম নিকায় |
| অবস্থান | এটি সূত্র পিটকের প্রথম গ্রন্থ। | এটি সূত্র পিটকের দ্বিতীয় গ্রন্থ। |
| সূত্রসংখ্যা | এতে ৩৪টি সূত্র আছে। | এতে ১৫২টি সূত্র আছে। |
| সূত্রের দৈর্ঘ্য | দীর্ঘ আকৃতির সূত্রগুলো এখানে স্থান পেয়েছে। | মধ্যম আকৃতির সূত্রগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত। |
| বিষয়বস্তু | দান, শীল, ধ্যান, প্রজ্ঞা, নির্বাণ, বুদ্ধের শেষ জীবনের ঘটনা ইত্যাদি। | ভিক্ষুদের জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা ও ধর্মীয় আচরণের বর্ণনা। |
| ধর্মীয় উদ্দেশ্য | সাধারণ মানুষকে 'নৈতিক ও মানবিক জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করা। | ভিক্ষুদের জন্য বুদ্ধের বাস্তব জীবনদর্শন তুলে ধরা। |
চতুরার্য সত্য আমাকে জীবনের প্রকৃত অর্থ বুঝতে সাহায্য করেছে। আমি বুঝেছি জীবন দুঃখময়। আর দুঃখের কারণ হচ্ছে তৃষ্ণা বা অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা। তাই আমি আসক্তি কমাতে চেষ্টা করি। অপ্রাপ্তি বা ব্যর্থতায় হতাশ হই না আগের মতো; বরং কারণ খুঁজে তা দূর করার চেষ্টা করি। দুঃখের নিরোধ শিক্ষা আমাকে আত্মসংযম ও সহনশীলতার পথ দেখায়। এখন আমি বুঝতে পারি যে, কষ্টেরও শেষ আছে, যদি সঠিকভাবে চিন্তা ও আচরণ করা যায়। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আমাকে সৎ চিন্তা, সৎ কথা ও সৎ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। বুদ্ধের এই তত্ত্ব আমাকে রাগ, লোভ ও মোহ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। সব মিলিয়ে, চতুরার্য সত্য আমার জীবনের পথনির্দেশক ও মানসিক শান্তির মূল ভিত্তি।
বৈশাখী পূর্ণিমার পূর্বে গৌতম বুদ্ধ মল্লদের শালবনে উপস্থিত হন, সেখানে তিনি শিষ্য আনন্দকে উপদেশ দেন, "হে আনন্দ নিজেই নিজের দীপ হয়ে বিচরণ করো, আত্ম শরণ, অনন্য শরণ, ধর্মদীপ হয়ে বিচরণ করো, ধর্মের শরণই অনন্য শরণ।" তিনি আরও বলেন, তাঁর অবর্তমানে ধর্ম-বিনয়কে শাড়া বলে জানতে। তিনি তাঁর শেষ উপদেশে বলেন "হে ভিক্ষুগণ! সংস্কারসমূহ ব্যয় ও ক্ষয়শীল। অপ্রমাদের সঙ্গে নিজ নিজ কর্তব্য পালনে তৎপর হও। এরপর তিনি ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে শান্তভাবে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল আশি বছর।
আমি জীবনের সব কাজে সম্যক দৃষ্টি রাখব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার ভালো-মন্দ ভেবে দেখব। সম্যক সংকল্প অনুযায়ী সর্বদা সৎ ও শান্ত মনোভাব রাখব, কারো ক্ষতি করব না। সম্যক বাক্য চর্চা করে সত্য ও মধুর কথা বলব, পরনিন্দা বা মিথ্যা পরিহার করব। সম্যক কর্ম করে সৎপথে কাজ করব, অন্যের ক্ষতি করে লাভ চাইবো না। সম্যক জীবিকা মেনে ন্যায্য ও সৎ উপায়ে জীবিকা অর্জন করব। সম্যক প্রচেষ্টা বা পরিশ্রমের মাধ্যমে সবসময় ভালো চিন্তা ও কাজ বজায় রাখব। সম্যক স্মৃতি ধরে রাখব সব কিছু অনিত্য, তাই অহংকার করব না। সম্যক সমাধি চর্চা করে মনকে শান্ত ও একাগ্র রাখব। এই আটটি পথ অনুসরণ করে আমি নিজের মন - ও আচরণকে শুদ্ধ রাখার চেষ্টা করব।
সূত্র পিটক হলো ত্রিপিটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেখানে গৌতম বুদ্ধের বাণী, ধর্ম ও জীবনকাহিনি সংরক্ষিত। এতে লেখা সূত্রগুলো গদ্য ও পদ্য আকারে রচিত। সূত্রপিটক পাঁচ ভাগে বিভক্ত। যথা- দীর্ঘ নিকায়, মধ্যম নিকায়, সংযুক্ত নিকায়, অঙ্গুত্তর নিকায় ও খুদ্দক নিকায়। দীর্ঘ নিকায় বুদ্ধের ধর্ম, ধ্যান ও সমাজজীবনের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মধ্যম নিকায় ভিক্ষুদের জীবন ও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা সহজভাবে পাওয়া যায়। সংযুক্ত নিকায় ছোটো কিন্তু গভীর সূত্র ও গল্প আছে, আর অঙ্গুত্তর নিকায় নৈতিকতা, প্রজ্ঞা ও ভিক্ষুদের দায়িত্বের বিষয়বস্তু রয়েছে। খুদ্দক নিকায় ছোটো ছোটো গ্রন্থের মাধ্যমে নৈতিক জীবন ও সুন্দর আচরণের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সূত্র পিটক আমাদের ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখায় এবং জীবনের ন্যায্য ও নৈতিক পথে চলার অনুপ্রেরণা দেয়। এটি শুধু বৌদ্ধদের জন্য নয়, সকল মানুষের জন্য মূল্যবান শিক্ষা।
গৌতম বুদ্ধ সকল প্রাণীর দুঃখ মুক্তি ও কল্যাণের জন্য কঠোর সাধনা করেছিলেন এবং পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে দিকে দিকে বিচরণ করে ধর্মপ্রচার করেন। এক মাঘী পূর্ণিমায় তিনি বৈশালীর চাপাল চৈত্যে উপস্থিত হয়ে ঘোষণা দেন যে, তিনি পরিনির্বাণ লাভ করবেন। এর তিন মাস পর কুশীনগরের পাবা নামক স্থানে ভিক্ষুসংঘসহ নিয়ে তিনি উপস্থিত হলেন এবং চুন্দের আতিথ্য গ্রহণ করেন। তারপর মল্লদের শালবনে যমক শালগাছের নিচে তিনি বিশ্রাম করেন। সেদিন ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা। বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের উপদেশ দিয়ে ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। রাত্রির তৃতীয় যামে তিনি ধ্যানে মগ্ন থেকে পরম সুখময় পরিনির্বাণ লাভ করেন। মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর দেহ' আটভাগে বিভক্ত করা হয়। বৌদ্ধরা এখনও বুদ্ধের দেহধাতুর উদ্দেশ্যে বন্দনা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
Contribute high-quality content, help learners grow, and earn for your efforts! 💡💰'
Related Question
View Allবুদ্ধ প্রথম ধর্ম দেশনায় চতুরার্য সত্য তত্ত্বটি সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন।
প্রথম বর্ষাবাসের পর গৌতমবুদ্ধ উরুবেলা সেনানী করেন। গ্রামে যাত্রা
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!