"প্রাণ বাঁচানোর জন্য অনেক সময় এ জাতীয় কথা বলা হয়।"- উক্তিটি রফিক মেজর এজাজকে বলেছে। মুক্তিবাহিনীরকে নীলগঞ্জ গ্রামের লোকজন সহায়তা করেছে কি না মেজর জয়নাল মিয়ার কাছে তা জানতে চান। উত্তরে জয়নাল মিয়া জানায় তারা মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করেছে জঙ্গলা মাঠে অবস্থানকালীন সময়ে। তাদের খাদ্য, আশ্রয় ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে। কিন্তু সকল তথ্য মূলত মিথ্যা বলে দাবি রফিকের। কারণ মেজর জয়নালকে মেরে ফেলবে সেই ভয়েই সে মেজরকে এমন ভ্রান্ত তথ্য দেয়। অর্থাৎ প্রাণ বাঁচানোর জন্য এমন ভ্রান্ত তথ্য দেয় বলে রফিকের দাবি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একক কোনো গোষ্ঠীর যুদ্ধ নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণেই সংঘটিত হয়েছে এই যুদ্ধ। পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর অগণিত মানুষকে হত্যার নৃশংসতার পরই আমরা পেয়েছি চূড়ান্ত বিজয়। তবে স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতিকে রক্তগঙ্গার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণেই এই বিজয়। '১৯৭১' উপন্যাসেও লেখক জাতভেদাভেদ ভুলে মুক্তিসংগ্রামের দৃশ্যপট অঙ্কন করেছেন। নীলগঞ্জ গ্রামের কৈবর্তপাড়াকে করেছেন মিলিটারির মূল আকর্ষণের জায়গা। কারণ তাদের কাছে পূর্ব থেকেই তথ্য ছিল মুক্তিবাহিনীকে কৈবর্তবাসীরা আশ্রয় দিয়েছে। ফলে সর্বদা ভীতি ও জ্বালাও পোড়াও নীতির কবলে পড়ে তাদের জীবন বিপন্ন হয়। তারা তাদের আশ্রয়স্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। অবশ্য উপন্যাসের শেষাংশে আমরা জানতে পারি, কৈবর্তবাসীরাই আশ্রয়, সেবা ও খাবার দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করেছে।
'১৯৭১' উপন্যাসে মিলিটারি নীলগঞ্জে প্রবেশের প্রথম পর্যায়েই চিত্রা বুড়ির ভয়ের কথা বলা হয়েছে। এই ভয় আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েই। নিজ গোত্রের মানুষকে বাঁচাতে প্রথমে তাদের খবর দেওয়ার কথা বলা হলেও উপন্যাসের শেষাংশে আমরা জানতে পারি, আসলে ছয়-সাতজন মুক্তিসেনা কৈবর্তপাড়ায় ছিল সেবা নিতে। সুতরাং বুড়ি মূলত মুক্তিবাহিনীকে খবর দিতেই কৈবর্তপাড়ায় গিয়েছে একথা বোঝা যায়। আবার কৈবর্তদের দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ার কথা বলা হয়েছে। অতি সুচতুর এই জেলে সম্প্রদায়ের মানুষগুলো তাদের নৌকা ও ঘরের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেরিয়ে যায় পাড়া থেকে। কারণ একটাই, মিলিটারি তাদের পাড়ায় তান্ডব চালাবে মুক্তিবাহিনী ধরতে। জঙ্গলা মাঠে মুক্তিবাহিনীকে খাবার পৌছে দেওয়ার মতো মহৎ কাজও করে কৈবর্তরা। উপন্যাসে সবকিছুই নাটকীয়ভাবে ঘটতে থাকে। সবকিছুই যেন সন্দেহ কিন্তু সন্দেহই যে বাস্তবসত্য তা শেষাংশে প্রমাণিত হয় রফিক ও মেজরের কথোপকথনে। তাইতো মেজর এজাজের নির্দেশে কৈবর্তপাড়ায় আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কৈবর্তদের এরূপ আচরণের প্রেক্ষিতে বলা যায়, কোনো বিশেষ পেশার বা জাতিগোষ্ঠীর নয় বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ হয়েছে কৈবর্তদের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবে।
Related Question
View Allসফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ তার প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা। তার মধ্যে এই প্রতিশোধপ্রবণতা জাগ্রত হয় মূলত ঝড়ের রাতে পাকিস্তানি মিলিটারির একজন সুবাদার ও তিনজন রাজাকার কর্তৃক তার স্ত্রী ও বারো বছরের শ্যালিকার ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বর্বর, পিশাচ ঘাতকের দল সফদরউল্লাহর অনুপস্থিতিতে এমন কাপুরুষোচিত ঘটনা ঘটায়। ফলে সে সেই ঘাতকদের খুন করার উদ্দেশ্যে দা হাতে বেরিয়ে যায়। ভীতু প্রকৃতির সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তন অপমানজনক লাঞ্ছনাকে কেন্দ্র করেই বলা যায়।
'১৯৭১' উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ ময়মনসিংহ বিভাগের ছোট গ্রাম নীলগঞ্জকে আখ্যান হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিচিত্র শ্রেণি, পেশা, শিক্ষা ও ধর্মের মানুষের বসবাস শান্ত নিবিড় এই গ্রামে। ভৌগোলিকভাবে গ্রামটি শহর থেকে অনেকটা ভেতরে অবস্থিত। ময়মনসিংহ-ভৈরব রেল লাইনে একটি স্টেশন নান্দাইল রোড। নান্দাইল রোড থেকে সোজা উত্তরে দশ মাইল দূরে রুয়াইল বাজার। রুয়াইল বাজারকে পেছনে ফেলে আরও মাইল ত্রিশেক উত্তরে মধুরন বাজার। মধুবন বাজার পেছনে ফেলে পূর্ব দিকে সাত-আট মাইলের ঘন জঙ্গল পেরিয়ে জঙ্গলা মাঠ। আর সেই জঙ্গলা মাঠের পেছনেই নীলগঞ্জ গ্রাম। দরিদ্র, শ্রীহীন, মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ ঘরের একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ নীলগঞ্জ। চারদিকে জলাভূমি গ্রামকে ঘিরে রেখেছে। শীতকাল ছাড়া চাষাবাদ তেমন হয় না। পাখি-যারা জাল দিয়ে পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে গ্রামের কতিপয় মানুষ। বর্ষার আগে তরমুজ ও বাঙ্গি চাষ করে সামান্য অর্থ-কড়ি হাতে আসে তাদের। গ্রামের অধিকাংশ ঘর খড়ের তৈরি। তবে যাদের হাতে কাঁচা পয়সা আসে তারা টিনের ঘরও তৈরি করে।
বিচিত্র শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাস নীলগঞ্জ গ্রামে। সম্পদশালী কিন্তু মেরুদণ্ডহীন নীলু সেনের মতো মানুষ যেমন এখানে বাস করেন তেমনই মনিহারি দোকানি বদিউজ্জামানের মতো লোকও আছে। অন্য গ্রাম থেকে এসে বসবাস করা ইমাম সাহেব ও স্কুলমাস্টার আজিজও এখানে থাকেন। এছাড়াও অন্ত্যজ কৈবর্ত শ্রেণির লোকজনের বসবাস এই নীলগঞ্জ গ্রামে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষের অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক অতি সুচারুভাবে। সহজ-সরল গ্রামীণ জনপদের এই মানুষগুলো যুদ্ধ কী তা জানে না, পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে আসার পরও তাদের বিশ্বাস হয় না- তারা তাদের ক্ষতি করবে, গ্রামের মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করবে। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক তাঁর নিখুঁত শিল্পীগুণে '১৯৭১' উপন্যাসের পটভূমিকে নীলগঞ্জ গ্রামের জনজীবনের আলোকে চিত্রিত করেছেন।
"মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে।"- এ উক্তিটি রফিকের। মেজর এজাজ যখন আজিজ মাস্টারকে মৃত্যু নাকি লজ্জাজনক শাস্তি দেওয়ার দোলাচলে ফেলে তখন আজিজ বিচলিত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটেই আলোচ্য উক্তিটি করা হয়েছে। নীলগঞ্জ - গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজকে অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও যখন সে কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে না তখন মেজর তাকে হত্যা কিংবা পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে গ্রামের মধ্যে ঘোরানোর কথা বলে। এতে আজিজ প্রথমে অপমানজনক শাস্তি বরণ করতে চায় কিন্তু পরবর্তীতে মৃত্যুকেই বরণ করে। মেজরের মতে বাঙালির মান-অপমান বলে কিছুই নেই। কিন্তু রফিকের মতে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে। তাই রফিক প্রশ্নোত্ত কথাটি বলে কারণ সে বাঙালির অপমান সহ্য করতে পারছিল না।
'১৯৭১' উপন্যাসের রফিক ও মেজরের মধ্যে মূলত সহযোগিতামূলক, সম্পর্ক। নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশের দিন থেকেই জানা যায়, মেজর এজাজের সাথে নীল শার্ট পরা এক রহস্যময় চরিত্রের কথা। যার নাম রফিক। লেখক শুরু থেকেই প্রতীকী আদলে রফিককে উপস্থাপন করেছেন। সে আসলে কোন পক্ষের তা বোঝা মুশকিল। কারণ সে যখন গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে তখন মনে হয় সে বুঝি পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক। আবার যখন মেজর এজাজের সাথে থাকে এবং বাঙালি প্রসঙ্গে কোনো কথা বলে তখন এমন সব আচরণ করে যাতে মেজর তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। লেখক কিছুটা আলো-আঁধারি করেই যেন রফিককে উপস্থাপন করেছেন। তবে সেই আলো-আঁধারের খেলা উপন্যাসের শেষাংশে স্পষ্ট করেছেন লেখক। রফিক বাঙালি দেশপ্রেমিক যুবক বলেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে পাঠকের সব সংশয় মুক্ত করে।
রফিক ও মেজর এজাজের মধ্যকার যে সংঘাত উপন্যাসে দেখানো হয়েছে তা মূল্যবোধজাত। মূল্যবোধ একটি সহজাত প্রবৃত্তি। এটি মানুষকে ন্যায়-অন্যায় বোধের শিক্ষা দেয়। মেজর এজাজ যখন নীলগঞ্জ গ্রামের সাধারণ মানুষের উপর অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন চালায় তখন মেজরের সহযোগী হিসেবে রফিক সব বিষয় প্রত্যক্ষ করে। ধর্মের নামে দেশ গড়ার যে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশিদের উপর হত্যাকাণ্ড চালায় তা মূলত পাশবিক। কারণ তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের মাটি দখল করা। ফলে পাকিস্তানি মেজর ও তাদের দোসররা নীলগঞ্জ গ্রামের হিন্দুদের তো হত্যা করেই, তাদের হাত থেকে মুসলিম নারী-পুরুষ কেউই রক্ষা পায়নি।
অত্যাচারী যখন তার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন যেকোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে তা চুপ করে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে যায়, যা রফিক চরিত্রের মধ্যে লেখক অঙ্কন করেছেন। আর এই বিবেকবোধই মেজরের সাথে তার সংঘাত বাড়ায়।
আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি হয়েছিল মর্মান্তিক মৃত্যু। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এ দেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বাদ যায়নি। আজিজ মাস্টার একজন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব কিন্তু ভীতু প্রকৃতির। নীলগঞ্জ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি গড়ার প্রথম দিনেই তাকে তলব করা হয়। তারপর থেকেই আজিজ মাস্টারসহ ইমাম সাহেবকে স্কুলের টিচার্স রুমে আটকে রেখে নানান অত্যাচার-নির্যাতন করে। কারণ সেনাদের ধারণা ছিল মাস্টার মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং সাহায্য করেছে। তাই তো মাস্টারকে অপমানজনক শাস্তি হিসেবে প্রথমে উলঙ্গ করে রাখে, তারপর তাকে গ্রামে ঘুরিয়ে আনার কথা বলে। কিন্তু সম্মানহানির চেয়ে মৃত্যুকে বরণ করা শ্রেয় মনে করায় আজিজ মাস্টার মেজরকে অনুরোধ করে যেন তাকে বিলের ধারে গুলি করে মারা হয়। মাস্টার শেষ পর্যন্ত অপমান অথবা মৃত্যুর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বেছে নেয়।
না, রফিক চরিত্রটি আমার কাছে দ্বিমুখী চরিত্র বলে মনে হয় না। আমার উত্তরের পক্ষে কারণ দেখানো হলো-
'১৯৭১' উপন্যাসের অন্যতম এক চরিত্র রফিক। সে পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার এজাজের সহযোগী। এজাজ যখন নীলগঞ্জ গ্রামে আসে মুক্তিবাহিনীর খোঁজে তখন এজাজের দোভাষী হিসেবে রফিকও আসে। বাঙালি যুবক রফিক এই উপন্যাসের শুরু থেকেই এক রহস্যময় চরিত্র। পাকিস্তানিদের সহচর হলেও বাঙালিদের প্রতিও তার বিশেষ সহানুভূতি ছিল। যেমন- কালীমূর্তির পিছনে লুকানো বলাইকে দেখতে পেয়েও মেজরের দৃষ্টি থেকে তাকে আড়াল করার প্রয়াস, কৈবর্ত্য পাড়ায় তল্লাসি করতে না দেওয়া, আজিজ মাস্টারকে লজ্জাজনক শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা ইত্যাদি।
রফিক চরিত্রটি বিশেষত্ব লাভ করেছে মূলত তার নিশ্চুপ ভঙ্গির কারণে। কোনো বিষয়েই তার খোলাখুলি বক্তব্য নেই। ফলে উপন্যাসে তাকে সবচেয়ে জটিল চরিত্র বলে মনে হয়। তাকে বাস্তব কম বরং প্রতীকী চরিত্র বলেই অধিক মনে হয়। রফিক কখনো নীলগঞ্জ গ্রামে আসেনি। অথচ সে গ্রামের সকল রাস্তাঘাট, মানুষ এবং প্রকৃতির সাথে খুব পরিচিত। সে কোন এলাকার মানুষ তা ইমাম সাহেব জানতে চাইলে তার কোনো উত্তর দেয়নি।
রফিক মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও 'আমরা' হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধি হয়েই সে কথা বলেছে। উপন্যাসের শেষের দিকে রফিকের সংলাপে বোঝা যায় সে পুরোপুরি পাকিস্তান বিরোধী। এটা বুঝতে পেরে এজাজ তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে তখন কৈবর্ত পাড়া আগুনে পুড়ছে। রফিক তখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে বিলে নামে। তখন আগুনের আলোয় তার মুখে অন্য রকম এক দীপ্তি আবিষ্কার করে মেজর এজাজ। 'এ অন্য রফিক' এমন এক অভিব্যক্তির উদয় হয় মেজরের মনে। অর্থাৎ মেজরের সহযোগী হয়েও রফিকের এমন বিদ্রোহ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তাই বলা যায়, রফিক কোনো দ্বিমুখী চরিত্র নয়, বরং বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামের প্রতিবাদী দেশপ্রেমিক যুবক।
পাকিস্তানের রোশাবা গ্রামের ছেলে মেজর এজাজ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধিনায়ক। নীলগঞ্জ গ্রামের মীর আলি অশীতিপর এক অন্ধ বৃদ্ধ। যাকে দেখে মেজরের মনে পড়ে রোশাবা গ্রামে থাকা তার অন্ধ পিতার কথা। তাই তো মীর আলিকে উঠানে বসে থাকতে দেখে তাকে সালাম দেয়। মূলত নিজের বাবার কথা মনে পড়ায় মেজর পিতৃসমতুল্য বৃদ্ধকে সালাম জানায় বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু পরোক্ষভাবে 'বিচার করলে মেজরের এই আচরণের মধ্যে লুকিয়ে আছে গোপন অভিসন্ধি। গ্রামের মানুষের মনে বিশ্বাস স্থাপনের চেষ্টা থেকেই মেজর বৃদ্ধ মীর আলির সাথে এমন নমনীয় আচরণ করে। যা একজন সুচতুর শোষকের চারিত্রির বৈশিষ্ট্য।
'১৯৭১' উপন্যাসের পটভূমি নেওয়া হয়েছে ময়মনসিংহের নীলগঞ্জ নামক এক জনবিচ্ছিন্ন জনপদের কাহিনিকে অবলম্বন করে। একেবারে ছকে কষে মাটি, মানুষ, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যনির্মিত অবকাঠামোয় এঁকে হুমায়ূন আহমেদ বাংলার এই নিভৃত গ্রামকে তুলে এনেছেন যুদ্ধের ময়দানে। নীলগঞ্জ গ্রামে মুক্তিবাহিনী আশ্রয় নিয়েছে এমনই এক সন্দেহের বার্তা নিয়ে মিলিটারি মেজর সেই গ্রামে আগমন করে। তাদের বর্বরোচিত অত্যাচার ও হত্যার দৃশ্যপটের নানান ঘটনার অবতারণা করেছেন লেখক এ উপন্যাসে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বের মিথ নীলগঞ্জ গ্রামে প্রচলিত ছিল প্রবলভাবে। তারা গ্রামের মানুষকে কোনো ক্ষতি করবে এটা গ্রামবাসীর মনে হয়নি অথবা করতে চায়নি। কারণ গ্রামের মানুষ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি তাদের অজপাড়াগাঁয়ে মিলিটারি আসতে পারে। কিন্তু মিলিটারি আগমনের পরদিন থেকে তাদের বিশ্বাসে ফাটল ধরে। পাকিস্তানিরা ছিল বর্বর। তারা ধর্মের নামে বাঙালিদের প্রতি অমানবিক অত্যাচার করেছিল। অত্যাচারের নির্মম চিত্র প্রকাশিত হয়েছে আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেবকে প্রথমে স্কুলঘরে আটকে রাখার মধ্য দিয়েই। মধুবনের জঙ্গলা মাঠের বনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ানদের খবর নেওয়াই মেজরের উদ্দেশ্য। মেজর আজিজ মাস্টারের কাছ থেকে তথ্য আদায় করার জন্য বিলের ধারে চিত্রা বুড়ির ছেলের হত্যাকারী মনার নির্মম মৃত্যুর দৃশ্য রচনা করে। মনার মৃত্যুর দৃশ্যপটকে নিষ্ঠুরতাপূর্ণ করতে তার ছোট ভাইকেও তার সঙ্গে গুলি করে হত্যা করা হয়। এখানেই শেষ নয়, আজিজ মাস্টারকে অপমানজনক পরিস্থিতিতেও ফেলে। আবার গ্রামের সম্পদশালী হিন্দু মৃত্যুপথযাত্রী নীলু সেনকে ঘুম থেকে তুলে হত্যার ঘটনা আরও ভয়াবহ। এছাড়াও মিলিটারির হাত থেকে গ্রামের নারীরাও রক্ষা পায়নি। ঝড়ের রাতে সফদরউল্লাহর অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে গিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারির একজন সুবাদার ও তিনজন রাজাকার তার স্ত্রী ও বারো বছরের শ্যালিকাকে ধর্ষণ করে।
উপন্যাসের শেষাংশে দেখতে পাই কৈবর্ত পাড়ায় আগুন দিয়ে বিলের ডোবায় নিয়ে মেজরের সহযোগী রফিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। এভাবেই অত্যন্ত ছোট একটি উপন্যাসে বিচিত্র কাহিনির ঘেরাটোপে লেখক নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবনে যুদ্ধের বর্বরতা রূপায়িত করেছেন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সম্পর্কে গ্রামবাসীর মনে ভীতির রাজত্ব কায়েম করতে মেজর এজাজ খুনের বিচার করতে এতটা আগ্রহী হয়েছিল। আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেব মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে রাজি হচ্ছিল না বলে মেজর তাদের সামনে সেই খুনের বিচার করতে চায়। ডাকাত মনা কৈবর্ত চিত্রা বুড়ির ছেলেকে খুন করেছিল। সেই খুনের বিচার গ্রামবাসীরা না করলে মেজর করার আগ্রহ দেখায়। মনাকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিলে তার ছোট ভাইকেও সাথে হত্যা করা হয়। গ্রামবাসীর মনে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে যে ভালো মানসিকতার ভ্রান্ত ধারণা ছিল এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তা পালটে যায়। মূলত খুনের বিচার করা মেজর এজাজের কৌশল ছিল মাত্র। সে এর দ্বারা গ্রামবাসীর মনে তার সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার করতে চেয়েছিল।
ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ '১৯৭১' উপন্যাসে জনবিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র এক শান্ত গ্রামকে করেছেন উপন্যাসের পটভূমি। গ্রামটির নাম নীলগঞ্জ। এ গ্রামের মানুষ যুদ্ধ বুঝে না, সংগ্রাম কী তা জানে না। কিন্তু সেই গ্রামেই একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগমন গ্রামের মানুষের জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসে। লেখক স্পষ্ট করে কোথাও বলেননি যে নীলগঞ্জ গ্রামে মুক্তিবাহিনী আছে, শুধু সন্দেহের বেড়াজাল বুনে গেছেন সমগ্র উপন্যাসজুড়ে। সন্দেহের বশেই নীলগঞ্জ গ্রামে হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক মেজর এজাজের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়, যেটাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিচ্ছবি বলা যায়।
'১৯৭১' 'উপন্যাসে বলা হয়েছে নীলগঞ্জ গ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল জোয়ান পাকিস্তানি এক সেনাকে বন্দি করেছে। যার নাম মেজর বখতিয়ার। তাকে উদ্ধার করতেই মেজর এজাজ গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে প্রথম থেকেই তারা গ্রামবাসীর উপর আগ্রাসী হয়ে ওঠে। প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজকে ধরে এনে অমানবিক অত্যাচার করে। এক পর্যায়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। শুধু এই একটি নয়, অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনা ঘটনায় তারা। গ্রামবাসীকে ভয়-ভীতি দেখানোর জন্য এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে মনাকে ও বিরুকে সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে। নীলগঞ্জের সম্ভ্রান্ত হিন্দু নীলু সেনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে হত্যা করে। বর্বর পাকিস্তানিরা গণহত্যার যে নজির স্থাপন করেছিল নীলগঞ্জেও তাই ঘটেছে। মধুবনের জঙ্গলা মাঠের বিলকে তারা বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
শুধু পুরুষ নয়, দখলদার পিশাচ হানাদার বাহিনীর হাত থেকে গ্রামের মেয়েরাও রক্ষা পায়নি। সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকাকে তারা ধর্ষণ করে, লাঞ্ছিত করে। মুক্তিযুদ্ধে নারী লাঞ্ছনার দিকটা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে অন্যায় ও শোষণ কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ এক সময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সফদরউল্লাহ তার স্ত্রী ও শ্যালিকার লাঞ্ছনার প্রতিশোধ নিতে দা হাতে বেরিয়ে পড়ে। আজিজ মাস্টার লজ্জাজনক পরিস্থিতি বাদ দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে এবং বিবেকের তাড়নায় ও প্রতিবাদস্বরূপ রফিক মেজর এজাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং মৃত্যুবরণ করে।
প্রত্যক্ষ কোনো প্রতিরোধ না হলেও দেশপ্রেমের চেতনাবোধ জাগ্রত হয় বেশকিছু চরিত্রে। যা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এছাড়াও এ দেশীয় রাজাকারদের উল্লেখ রয়েছে এই উপন্যাসে।
তাই বলা যায়, '১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জ গ্রাম আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
বদিউজ্জামান নীলগঞ্জ গ্রামে আসা চল্লিশজন রাজাকারসহ দ্বিতীয় মিলিটারি দলের ভয়ে জঙ্গলা মাঠের পাশে একটা ডোবায় গলা পর্যন্ত ডুবে লুকিয়ে ছিল।
বদিউজ্জামান যুদ্ধময় পরিস্থিতিতেও জীবিকার তাগিদে মধুবন বাজার তার মনিহারি দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তখন মিলিটারির দ্বিতীয় দল গ্রামে প্রবেশ করায় সে বাজারে যাওয়া বাদ দিয়ে নীলগঞ্জে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে উলটা দিকে রওয়ানা হয়। ভয়ে সে অসতর্কতাবশত এক ডোবায় পড়ে যায়। সেখান থেকে উঠে ফেরার রাস্তা প্রায় বন্ধ কারণ মিলিটারি তার সন্নিকটে। তাই প্রাণ বাঁচাতে সে গলা পানিতে নিজেকে ডুবিয়ে একটা মোরতা ঝোপের আড়ালে মাথা ঢেকে রাখে, তার মাথার উপর রোদ ঝাঁঝাঁ করতে থাকে। শীতে ও ঠান্ডা পানিতে অবস্থান এবং সাথে পানির পচা গন্ধ ও গিরগিটির উৎপাত এমনই এক বিপজ্জনক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল সে।
'১৯৭১' উপন্যাসটি ক্ষুদ্র পরিসরে রচিত একটি উপন্যাস। কিন্তু এটির বিষয়বস্তুর ভাবগম্ভীর্য বিশাল। কাহিনির প্রয়োজনেই লেখক বেশকিছু চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছেন উপন্যাসটিতে। চরিত্রগুলোর মধ্য একটি উজ্জ্বল চরিত্র নীলগঞ্জ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান মল্লিক। হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের দৃশ্য দেখা যায় এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে। মিলিটারি গ্রামে আগমনের পরপরই তলব করে তাকে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কতিপয় জোয়ান এবং কয়েকজন অফিসার নীলগঞ্জ গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে এবং পাকিস্তানি মেজর বখতিয়ারকে বন্দি করে রেখেছে এমনই কাহিনি সাজিয়ে মিলিটারি গ্রামে আসে। আর গ্রামবাসী বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহযোগিতা করেছে এমন অভিযোগও তাদের। মুক্তিবাহিনীকে সাহায্যকারীদের মধ্যে স্কুলমাস্টার আজিজ একজন বলে সন্দেহ মিলিটারি অধিনায়ক মেজর এজাজের। তাই তো উপন্যাসে মেজর এজাজকে দেখতে 'পাই স্কুলমাস্টারের প্রতি অত্যাচারী, অমানবিক ও অসম্মানজনক আচরণ করতে।
শুধু অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণ নয় বরং অপমানজনক নির্যাতন করে স্কুলমাস্টার আজিজের সাথে। তার দোষ একটাই- সে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়নি। প্রথমে স্কুলের টিচার্স রুমের কামরায় অবর্ণনীয় অত্যাচার চলে আজিজের সাথে। চিত্রা বুড়ির ছেলের হত্যাকারী মনাকে বিচারের মঞ্চে প্রধান দর্শক হিসেবে আজিজকে উপস্থিত করে মেজর। কিন্তু এসব আচরণে আজিজ দমে যায় না দেখে মেজর শেষাংশে তাকে এক অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। হয় মৃত্যু নয়তো উলঙ্গ হয়ে পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো। ।। স্কুলের হেডমাস্টার আজিজ তার চরিত্রে কিছুটা স্থূলতা থাকলেও আত্মসম্মানকে বিসর্জন দেয়নি। লজ্জাজনকভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে সে মৃত্যুকেই পরম সত্য বলে মেনে নেয়। এই আত্মসম্মানবোধেই বাঙালি জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছিল। বাঙালি জাতি আত্মসম্মানবোধকে কুকুরের আত্মসম্মানবোধের সাথে তুলনা করে মেজর এজাজ যে ভুল করেছিল সেখানে স্কুলমাস্টার আজিজের মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া যেন আত্মসম্মানবোধের জাগরণ। তাই বলা যায়, অপমানজনকভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে সম্মানের সাথে হেডমাস্টার আজিজের মৃত্যুই তাকে উপন্যাসে উজ্জ্বল করে তুলেছে। এ কারণে আলোচ্য উক্তিটি আজিজ মাস্টারের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সত্য।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!