সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ তার প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা। তার মধ্যে এই প্রতিশোধপ্রবণতা জাগ্রত হয় মূলত ঝড়ের রাতে পাকিস্তানি মিলিটারির একজন সুবাদার ও তিনজন রাজাকার কর্তৃক তার স্ত্রী ও বারো বছরের শ্যালিকার ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বর্বর, পিশাচ ঘাতকের দল সফদরউল্লাহর অনুপস্থিতিতে এমন কাপুরুষোচিত ঘটনা ঘটায়। ফলে সে সেই ঘাতকদের খুন করার উদ্দেশ্যে দা হাতে বেরিয়ে যায়। ভীতু প্রকৃতির সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তন অপমানজনক লাঞ্ছনাকে কেন্দ্র করেই বলা যায়।
'১৯৭১' উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ ময়মনসিংহ বিভাগের ছোট গ্রাম নীলগঞ্জকে আখ্যান হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিচিত্র শ্রেণি, পেশা, শিক্ষা ও ধর্মের মানুষের বসবাস শান্ত নিবিড় এই গ্রামে। ভৌগোলিকভাবে গ্রামটি শহর থেকে অনেকটা ভেতরে অবস্থিত। ময়মনসিংহ-ভৈরব রেল লাইনে একটি স্টেশন নান্দাইল রোড। নান্দাইল রোড থেকে সোজা উত্তরে দশ মাইল দূরে রুয়াইল বাজার। রুয়াইল বাজারকে পেছনে ফেলে আরও মাইল ত্রিশেক উত্তরে মধুরন বাজার। মধুবন বাজার পেছনে ফেলে পূর্ব দিকে সাত-আট মাইলের ঘন জঙ্গল পেরিয়ে জঙ্গলা মাঠ। আর সেই জঙ্গলা মাঠের পেছনেই নীলগঞ্জ গ্রাম। দরিদ্র, শ্রীহীন, মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ ঘরের একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ নীলগঞ্জ। চারদিকে জলাভূমি গ্রামকে ঘিরে রেখেছে। শীতকাল ছাড়া চাষাবাদ তেমন হয় না। পাখি-যারা জাল দিয়ে পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে গ্রামের কতিপয় মানুষ। বর্ষার আগে তরমুজ ও বাঙ্গি চাষ করে সামান্য অর্থ-কড়ি হাতে আসে তাদের। গ্রামের অধিকাংশ ঘর খড়ের তৈরি। তবে যাদের হাতে কাঁচা পয়সা আসে তারা টিনের ঘরও তৈরি করে।
বিচিত্র শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাস নীলগঞ্জ গ্রামে। সম্পদশালী কিন্তু মেরুদণ্ডহীন নীলু সেনের মতো মানুষ যেমন এখানে বাস করেন তেমনই মনিহারি দোকানি বদিউজ্জামানের মতো লোকও আছে। অন্য গ্রাম থেকে এসে বসবাস করা ইমাম সাহেব ও স্কুলমাস্টার আজিজও এখানে থাকেন। এছাড়াও অন্ত্যজ কৈবর্ত শ্রেণির লোকজনের বসবাস এই নীলগঞ্জ গ্রামে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষের অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক অতি সুচারুভাবে। সহজ-সরল গ্রামীণ জনপদের এই মানুষগুলো যুদ্ধ কী তা জানে না, পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে আসার পরও তাদের বিশ্বাস হয় না- তারা তাদের ক্ষতি করবে, গ্রামের মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করবে। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক তাঁর নিখুঁত শিল্পীগুণে '১৯৭১' উপন্যাসের পটভূমিকে নীলগঞ্জ গ্রামের জনজীবনের আলোকে চিত্রিত করেছেন।
"মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে।"- এ উক্তিটি রফিকের। মেজর এজাজ যখন আজিজ মাস্টারকে মৃত্যু নাকি লজ্জাজনক শাস্তি দেওয়ার দোলাচলে ফেলে তখন আজিজ বিচলিত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটেই আলোচ্য উক্তিটি করা হয়েছে। নীলগঞ্জ - গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজকে অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতনের পরও যখন সে কোনো তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে না তখন মেজর তাকে হত্যা কিংবা পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে গ্রামের মধ্যে ঘোরানোর কথা বলে। এতে আজিজ প্রথমে অপমানজনক শাস্তি বরণ করতে চায় কিন্তু পরবর্তীতে মৃত্যুকেই বরণ করে। মেজরের মতে বাঙালির মান-অপমান বলে কিছুই নেই। কিন্তু রফিকের মতে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে। তাই রফিক প্রশ্নোত্ত কথাটি বলে কারণ সে বাঙালির অপমান সহ্য করতে পারছিল না।
'১৯৭১' উপন্যাসের রফিক ও মেজরের মধ্যে মূলত সহযোগিতামূলক, সম্পর্ক। নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশের দিন থেকেই জানা যায়, মেজর এজাজের সাথে নীল শার্ট পরা এক রহস্যময় চরিত্রের কথা। যার নাম রফিক। লেখক শুরু থেকেই প্রতীকী আদলে রফিককে উপস্থাপন করেছেন। সে আসলে কোন পক্ষের তা বোঝা মুশকিল। কারণ সে যখন গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে তখন মনে হয় সে বুঝি পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক। আবার যখন মেজর এজাজের সাথে থাকে এবং বাঙালি প্রসঙ্গে কোনো কথা বলে তখন এমন সব আচরণ করে যাতে মেজর তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। লেখক কিছুটা আলো-আঁধারি করেই যেন রফিককে উপস্থাপন করেছেন। তবে সেই আলো-আঁধারের খেলা উপন্যাসের শেষাংশে স্পষ্ট করেছেন লেখক। রফিক বাঙালি দেশপ্রেমিক যুবক বলেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে পাঠকের সব সংশয় মুক্ত করে।
রফিক ও মেজর এজাজের মধ্যকার যে সংঘাত উপন্যাসে দেখানো হয়েছে তা মূল্যবোধজাত। মূল্যবোধ একটি সহজাত প্রবৃত্তি। এটি মানুষকে ন্যায়-অন্যায় বোধের শিক্ষা দেয়। মেজর এজাজ যখন নীলগঞ্জ গ্রামের সাধারণ মানুষের উপর অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন চালায় তখন মেজরের সহযোগী হিসেবে রফিক সব বিষয় প্রত্যক্ষ করে। ধর্মের নামে দেশ গড়ার যে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশিদের উপর হত্যাকাণ্ড চালায় তা মূলত পাশবিক। কারণ তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের মাটি দখল করা। ফলে পাকিস্তানি মেজর ও তাদের দোসররা নীলগঞ্জ গ্রামের হিন্দুদের তো হত্যা করেই, তাদের হাত থেকে মুসলিম নারী-পুরুষ কেউই রক্ষা পায়নি।
অত্যাচারী যখন তার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন যেকোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে তা চুপ করে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে যায়, যা রফিক চরিত্রের মধ্যে লেখক অঙ্কন করেছেন। আর এই বিবেকবোধই মেজরের সাথে তার সংঘাত বাড়ায়।
আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি হয়েছিল মর্মান্তিক মৃত্যু। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এ দেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বাদ যায়নি। আজিজ মাস্টার একজন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব কিন্তু ভীতু প্রকৃতির। নীলগঞ্জ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি গড়ার প্রথম দিনেই তাকে তলব করা হয়। তারপর থেকেই আজিজ মাস্টারসহ ইমাম সাহেবকে স্কুলের টিচার্স রুমে আটকে রেখে নানান অত্যাচার-নির্যাতন করে। কারণ সেনাদের ধারণা ছিল মাস্টার মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং সাহায্য করেছে। তাই তো মাস্টারকে অপমানজনক শাস্তি হিসেবে প্রথমে উলঙ্গ করে রাখে, তারপর তাকে গ্রামে ঘুরিয়ে আনার কথা বলে। কিন্তু সম্মানহানির চেয়ে মৃত্যুকে বরণ করা শ্রেয় মনে করায় আজিজ মাস্টার মেজরকে অনুরোধ করে যেন তাকে বিলের ধারে গুলি করে মারা হয়। মাস্টার শেষ পর্যন্ত অপমান অথবা মৃত্যুর মধ্যে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকেই বেছে নেয়।
না, রফিক চরিত্রটি আমার কাছে দ্বিমুখী চরিত্র বলে মনে হয় না। আমার উত্তরের পক্ষে কারণ দেখানো হলো-
'১৯৭১' উপন্যাসের অন্যতম এক চরিত্র রফিক। সে পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার এজাজের সহযোগী। এজাজ যখন নীলগঞ্জ গ্রামে আসে মুক্তিবাহিনীর খোঁজে তখন এজাজের দোভাষী হিসেবে রফিকও আসে। বাঙালি যুবক রফিক এই উপন্যাসের শুরু থেকেই এক রহস্যময় চরিত্র। পাকিস্তানিদের সহচর হলেও বাঙালিদের প্রতিও তার বিশেষ সহানুভূতি ছিল। যেমন- কালীমূর্তির পিছনে লুকানো বলাইকে দেখতে পেয়েও মেজরের দৃষ্টি থেকে তাকে আড়াল করার প্রয়াস, কৈবর্ত্য পাড়ায় তল্লাসি করতে না দেওয়া, আজিজ মাস্টারকে লজ্জাজনক শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা ইত্যাদি।
রফিক চরিত্রটি বিশেষত্ব লাভ করেছে মূলত তার নিশ্চুপ ভঙ্গির কারণে। কোনো বিষয়েই তার খোলাখুলি বক্তব্য নেই। ফলে উপন্যাসে তাকে সবচেয়ে জটিল চরিত্র বলে মনে হয়। তাকে বাস্তব কম বরং প্রতীকী চরিত্র বলেই অধিক মনে হয়। রফিক কখনো নীলগঞ্জ গ্রামে আসেনি। অথচ সে গ্রামের সকল রাস্তাঘাট, মানুষ এবং প্রকৃতির সাথে খুব পরিচিত। সে কোন এলাকার মানুষ তা ইমাম সাহেব জানতে চাইলে তার কোনো উত্তর দেয়নি।
রফিক মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও 'আমরা' হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধি হয়েই সে কথা বলেছে। উপন্যাসের শেষের দিকে রফিকের সংলাপে বোঝা যায় সে পুরোপুরি পাকিস্তান বিরোধী। এটা বুঝতে পেরে এজাজ তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে তখন কৈবর্ত পাড়া আগুনে পুড়ছে। রফিক তখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে বিলে নামে। তখন আগুনের আলোয় তার মুখে অন্য রকম এক দীপ্তি আবিষ্কার করে মেজর এজাজ। 'এ অন্য রফিক' এমন এক অভিব্যক্তির উদয় হয় মেজরের মনে। অর্থাৎ মেজরের সহযোগী হয়েও রফিকের এমন বিদ্রোহ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তাই বলা যায়, রফিক কোনো দ্বিমুখী চরিত্র নয়, বরং বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামের প্রতিবাদী দেশপ্রেমিক যুবক।
পাকিস্তানের রোশাবা গ্রামের ছেলে মেজর এজাজ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধিনায়ক। নীলগঞ্জ গ্রামের মীর আলি অশীতিপর এক অন্ধ বৃদ্ধ। যাকে দেখে মেজরের মনে পড়ে রোশাবা গ্রামে থাকা তার অন্ধ পিতার কথা। তাই তো মীর আলিকে উঠানে বসে থাকতে দেখে তাকে সালাম দেয়। মূলত নিজের বাবার কথা মনে পড়ায় মেজর পিতৃসমতুল্য বৃদ্ধকে সালাম জানায় বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু পরোক্ষভাবে 'বিচার করলে মেজরের এই আচরণের মধ্যে লুকিয়ে আছে গোপন অভিসন্ধি। গ্রামের মানুষের মনে বিশ্বাস স্থাপনের চেষ্টা থেকেই মেজর বৃদ্ধ মীর আলির সাথে এমন নমনীয় আচরণ করে। যা একজন সুচতুর শোষকের চারিত্রির বৈশিষ্ট্য।
'১৯৭১' উপন্যাসের পটভূমি নেওয়া হয়েছে ময়মনসিংহের নীলগঞ্জ নামক এক জনবিচ্ছিন্ন জনপদের কাহিনিকে অবলম্বন করে। একেবারে ছকে কষে মাটি, মানুষ, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যনির্মিত অবকাঠামোয় এঁকে হুমায়ূন আহমেদ বাংলার এই নিভৃত গ্রামকে তুলে এনেছেন যুদ্ধের ময়দানে। নীলগঞ্জ গ্রামে মুক্তিবাহিনী আশ্রয় নিয়েছে এমনই এক সন্দেহের বার্তা নিয়ে মিলিটারি মেজর সেই গ্রামে আগমন করে। তাদের বর্বরোচিত অত্যাচার ও হত্যার দৃশ্যপটের নানান ঘটনার অবতারণা করেছেন লেখক এ উপন্যাসে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বের মিথ নীলগঞ্জ গ্রামে প্রচলিত ছিল প্রবলভাবে। তারা গ্রামের মানুষকে কোনো ক্ষতি করবে এটা গ্রামবাসীর মনে হয়নি অথবা করতে চায়নি। কারণ গ্রামের মানুষ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি তাদের অজপাড়াগাঁয়ে মিলিটারি আসতে পারে। কিন্তু মিলিটারি আগমনের পরদিন থেকে তাদের বিশ্বাসে ফাটল ধরে। পাকিস্তানিরা ছিল বর্বর। তারা ধর্মের নামে বাঙালিদের প্রতি অমানবিক অত্যাচার করেছিল। অত্যাচারের নির্মম চিত্র প্রকাশিত হয়েছে আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেবকে প্রথমে স্কুলঘরে আটকে রাখার মধ্য দিয়েই। মধুবনের জঙ্গলা মাঠের বনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ানদের খবর নেওয়াই মেজরের উদ্দেশ্য। মেজর আজিজ মাস্টারের কাছ থেকে তথ্য আদায় করার জন্য বিলের ধারে চিত্রা বুড়ির ছেলের হত্যাকারী মনার নির্মম মৃত্যুর দৃশ্য রচনা করে। মনার মৃত্যুর দৃশ্যপটকে নিষ্ঠুরতাপূর্ণ করতে তার ছোট ভাইকেও তার সঙ্গে গুলি করে হত্যা করা হয়। এখানেই শেষ নয়, আজিজ মাস্টারকে অপমানজনক পরিস্থিতিতেও ফেলে। আবার গ্রামের সম্পদশালী হিন্দু মৃত্যুপথযাত্রী নীলু সেনকে ঘুম থেকে তুলে হত্যার ঘটনা আরও ভয়াবহ। এছাড়াও মিলিটারির হাত থেকে গ্রামের নারীরাও রক্ষা পায়নি। ঝড়ের রাতে সফদরউল্লাহর অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে গিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারির একজন সুবাদার ও তিনজন রাজাকার তার স্ত্রী ও বারো বছরের শ্যালিকাকে ধর্ষণ করে।
উপন্যাসের শেষাংশে দেখতে পাই কৈবর্ত পাড়ায় আগুন দিয়ে বিলের ডোবায় নিয়ে মেজরের সহযোগী রফিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। এভাবেই অত্যন্ত ছোট একটি উপন্যাসে বিচিত্র কাহিনির ঘেরাটোপে লেখক নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবনে যুদ্ধের বর্বরতা রূপায়িত করেছেন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সম্পর্কে গ্রামবাসীর মনে ভীতির রাজত্ব কায়েম করতে মেজর এজাজ খুনের বিচার করতে এতটা আগ্রহী হয়েছিল। আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেব মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে রাজি হচ্ছিল না বলে মেজর তাদের সামনে সেই খুনের বিচার করতে চায়। ডাকাত মনা কৈবর্ত চিত্রা বুড়ির ছেলেকে খুন করেছিল। সেই খুনের বিচার গ্রামবাসীরা না করলে মেজর করার আগ্রহ দেখায়। মনাকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিলে তার ছোট ভাইকেও সাথে হত্যা করা হয়। গ্রামবাসীর মনে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে যে ভালো মানসিকতার ভ্রান্ত ধারণা ছিল এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তা পালটে যায়। মূলত খুনের বিচার করা মেজর এজাজের কৌশল ছিল মাত্র। সে এর দ্বারা গ্রামবাসীর মনে তার সম্পর্কে ভীতির সঞ্চার করতে চেয়েছিল।
ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ '১৯৭১' উপন্যাসে জনবিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র এক শান্ত গ্রামকে করেছেন উপন্যাসের পটভূমি। গ্রামটির নাম নীলগঞ্জ। এ গ্রামের মানুষ যুদ্ধ বুঝে না, সংগ্রাম কী তা জানে না। কিন্তু সেই গ্রামেই একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগমন গ্রামের মানুষের জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসে। লেখক স্পষ্ট করে কোথাও বলেননি যে নীলগঞ্জ গ্রামে মুক্তিবাহিনী আছে, শুধু সন্দেহের বেড়াজাল বুনে গেছেন সমগ্র উপন্যাসজুড়ে। সন্দেহের বশেই নীলগঞ্জ গ্রামে হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক মেজর এজাজের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়, যেটাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিচ্ছবি বলা যায়।
'১৯৭১' 'উপন্যাসে বলা হয়েছে নীলগঞ্জ গ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল জোয়ান পাকিস্তানি এক সেনাকে বন্দি করেছে। যার নাম মেজর বখতিয়ার। তাকে উদ্ধার করতেই মেজর এজাজ গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে প্রথম থেকেই তারা গ্রামবাসীর উপর আগ্রাসী হয়ে ওঠে। প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজকে ধরে এনে অমানবিক অত্যাচার করে। এক পর্যায়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। শুধু এই একটি নয়, অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনা ঘটনায় তারা। গ্রামবাসীকে ভয়-ভীতি দেখানোর জন্য এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে মনাকে ও বিরুকে সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে। নীলগঞ্জের সম্ভ্রান্ত হিন্দু নীলু সেনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে হত্যা করে। বর্বর পাকিস্তানিরা গণহত্যার যে নজির স্থাপন করেছিল নীলগঞ্জেও তাই ঘটেছে। মধুবনের জঙ্গলা মাঠের বিলকে তারা বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
শুধু পুরুষ নয়, দখলদার পিশাচ হানাদার বাহিনীর হাত থেকে গ্রামের মেয়েরাও রক্ষা পায়নি। সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকাকে তারা ধর্ষণ করে, লাঞ্ছিত করে। মুক্তিযুদ্ধে নারী লাঞ্ছনার দিকটা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে অন্যায় ও শোষণ কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ এক সময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সফদরউল্লাহ তার স্ত্রী ও শ্যালিকার লাঞ্ছনার প্রতিশোধ নিতে দা হাতে বেরিয়ে পড়ে। আজিজ মাস্টার লজ্জাজনক পরিস্থিতি বাদ দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে এবং বিবেকের তাড়নায় ও প্রতিবাদস্বরূপ রফিক মেজর এজাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং মৃত্যুবরণ করে।
প্রত্যক্ষ কোনো প্রতিরোধ না হলেও দেশপ্রেমের চেতনাবোধ জাগ্রত হয় বেশকিছু চরিত্রে। যা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এছাড়াও এ দেশীয় রাজাকারদের উল্লেখ রয়েছে এই উপন্যাসে।
তাই বলা যায়, '১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জ গ্রাম আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
বদিউজ্জামান নীলগঞ্জ গ্রামে আসা চল্লিশজন রাজাকারসহ দ্বিতীয় মিলিটারি দলের ভয়ে জঙ্গলা মাঠের পাশে একটা ডোবায় গলা পর্যন্ত ডুবে লুকিয়ে ছিল।
বদিউজ্জামান যুদ্ধময় পরিস্থিতিতেও জীবিকার তাগিদে মধুবন বাজার তার মনিহারি দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তখন মিলিটারির দ্বিতীয় দল গ্রামে প্রবেশ করায় সে বাজারে যাওয়া বাদ দিয়ে নীলগঞ্জে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে উলটা দিকে রওয়ানা হয়। ভয়ে সে অসতর্কতাবশত এক ডোবায় পড়ে যায়। সেখান থেকে উঠে ফেরার রাস্তা প্রায় বন্ধ কারণ মিলিটারি তার সন্নিকটে। তাই প্রাণ বাঁচাতে সে গলা পানিতে নিজেকে ডুবিয়ে একটা মোরতা ঝোপের আড়ালে মাথা ঢেকে রাখে, তার মাথার উপর রোদ ঝাঁঝাঁ করতে থাকে। শীতে ও ঠান্ডা পানিতে অবস্থান এবং সাথে পানির পচা গন্ধ ও গিরগিটির উৎপাত এমনই এক বিপজ্জনক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল সে।
'১৯৭১' উপন্যাসটি ক্ষুদ্র পরিসরে রচিত একটি উপন্যাস। কিন্তু এটির বিষয়বস্তুর ভাবগম্ভীর্য বিশাল। কাহিনির প্রয়োজনেই লেখক বেশকিছু চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছেন উপন্যাসটিতে। চরিত্রগুলোর মধ্য একটি উজ্জ্বল চরিত্র নীলগঞ্জ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান মল্লিক। হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের দৃশ্য দেখা যায় এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে। মিলিটারি গ্রামে আগমনের পরপরই তলব করে তাকে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কতিপয় জোয়ান এবং কয়েকজন অফিসার নীলগঞ্জ গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে এবং পাকিস্তানি মেজর বখতিয়ারকে বন্দি করে রেখেছে এমনই কাহিনি সাজিয়ে মিলিটারি গ্রামে আসে। আর গ্রামবাসী বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহযোগিতা করেছে এমন অভিযোগও তাদের। মুক্তিবাহিনীকে সাহায্যকারীদের মধ্যে স্কুলমাস্টার আজিজ একজন বলে সন্দেহ মিলিটারি অধিনায়ক মেজর এজাজের। তাই তো উপন্যাসে মেজর এজাজকে দেখতে 'পাই স্কুলমাস্টারের প্রতি অত্যাচারী, অমানবিক ও অসম্মানজনক আচরণ করতে।
শুধু অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণ নয় বরং অপমানজনক নির্যাতন করে স্কুলমাস্টার আজিজের সাথে। তার দোষ একটাই- সে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়নি। প্রথমে স্কুলের টিচার্স রুমের কামরায় অবর্ণনীয় অত্যাচার চলে আজিজের সাথে। চিত্রা বুড়ির ছেলের হত্যাকারী মনাকে বিচারের মঞ্চে প্রধান দর্শক হিসেবে আজিজকে উপস্থিত করে মেজর। কিন্তু এসব আচরণে আজিজ দমে যায় না দেখে মেজর শেষাংশে তাকে এক অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। হয় মৃত্যু নয়তো উলঙ্গ হয়ে পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো। ।। স্কুলের হেডমাস্টার আজিজ তার চরিত্রে কিছুটা স্থূলতা থাকলেও আত্মসম্মানকে বিসর্জন দেয়নি। লজ্জাজনকভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে সে মৃত্যুকেই পরম সত্য বলে মেনে নেয়। এই আত্মসম্মানবোধেই বাঙালি জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছিল। বাঙালি জাতি আত্মসম্মানবোধকে কুকুরের আত্মসম্মানবোধের সাথে তুলনা করে মেজর এজাজ যে ভুল করেছিল সেখানে স্কুলমাস্টার আজিজের মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া যেন আত্মসম্মানবোধের জাগরণ। তাই বলা যায়, অপমানজনকভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে সম্মানের সাথে হেডমাস্টার আজিজের মৃত্যুই তাকে উপন্যাসে উজ্জ্বল করে তুলেছে। এ কারণে আলোচ্য উক্তিটি আজিজ মাস্টারের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সত্য।
'১৯৭১' উপন্যাসের একমাত্র উজ্জ্বল নারী চরিত্র অনুফা। নীলগঞ্জের সত্তর বছর বয়স্ক বৃদ্ধ মীর আলির পুত্রবধূ এবং বদিউজ্জামানের স্ত্রী সে। নীলগঞ্জ গ্রামে দ্বিতীয় মিলিটারি বাহিনীর আগমনের সাথে সাথে গ্রামে যুদ্ধের তান্ডব মারাত্মক আকার ধারণ করে; সেই সাথে প্রকৃতিও তার বৈরী রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে বদিউজ্জামানের নতুন চিনের ঘরের চালা উড়ে যায়। একদিকে যুদ্ধের দামামা অন্যদিকে বিপর্যস্ত ঘরবাড়ি নিয়ে অনুফা যখন চিন্তিত সেই অবস্থায় বৃদ্ধ মীর আলি তাকে ভাত রান্নার কথা বলে। এরকম পরিবেশে ভাত খাওয়ার কথা বলায় সে মীর আলির উপর বিরক্ত হয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের শান্ত-নিবিড় পরিবেশে যুদ্ধের নৃশংসতা ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। বাঙালি বীরের জাতি বলেই কিনা গ্রামের সাধারণ স্কুলমাস্টার আজিজ, পাকিস্তানিদের সহযোগী হয়েও বাঙালি যুবক রফিক এবং ভীতু প্রকৃতির সফদরউল্লাহর মতো ব্যক্তিরা উপন্যাসে বিদ্রোহের বাণী উচ্চারণ করেছেন। নিচে এই তিনটি চরিত্রের আলোকে পাকিস্তানিদের অকারণ নিপীড়ন কীভাবে একটি যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধে উপনীত করেছিল তা আলোচনা করা হলো-
'১৯৭১' উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র নীলগঞ্জ প্রাথমিক স্কুলের হেডমাস্টার আজিজ। প্রথমে মেজর এজাজ তার সাথে অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করলেও তার কাছ থেকে কোনো প্রকারের তথ্য না পেয়ে তাকে অমানুষিক অত্যাচারের মুখোমুখি করে। মেজর তাকে মুক্তিবাহিনীর সহযোগী হিসেবে সন্দেহের জের থেকেই তার প্রতি বর্বর আচরণ করে। একপর্যায়ে তার সামনে গণহত্যার মতো নারকীয় দৃশ্যের প্রেক্ষাপট সাজিয়েও যখন তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারে না তখন মেজর আজিজ মাস্টারের সাথে অসম্মানজনক আচরণ করে। অপমানজনকভাবে বেঁচে থাকা কিংবা মৃত্যু এমনই শর্ত জুড়ে দেয় মেজর। গ্রামে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো দৃশ্যপট, সেই সাথে পুরুষাঙ্গে ইটের বোঝা। এমন অপমান যেকারও জন্যই অপমানের। তাই তো আজিজ মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করে। শুধু একপক্ষীয় নিপীড়নের কারণেই আজিজ মাস্টারের মতো ব্যক্তিও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
উপন্যাসের রহস্যময় চরিত্র রফিক। নীল শার্ট পরিহিত মেজর এজাজের দোভাষী হিসেবে পরিচিত রফিক। গ্রামের রাস্তাঘাট সবকিছু তার পরিচিত। কিছুটা প্রতীকীভাবেই লেখক তাকে উপস্থাপন করেছেন উপন্যাসে। হানাদার বাহিনীর সহযোগী হলেও সে গ্রামবাসীর সাথে নমনীয় আচরণ করে, কৈবর্ত পাড়ায় আগুন দিতে মেজরকে নিষেধ করে। নীলু সেনের ভাগ্নে বলাইকে বাঁচাতে চায়, হেডমাস্টার আজিজের সাথে অন্যায়মূলক আচরণের সময় প্রতিবাদ করে। উপন্যাসের শেষাংশে, সে একজন বীরের ন্যায় মৃত্যুকে বরণ করে। কারণ রফিক দেখে যে, পাকিস্তানিরা সহজ-সরল মানুষের প্রতি নিপীড়ন চালায়।
সফদরউল্লাহ আরেকটি প্রতিবাদী চরিত্র। কালবৈশাখি ঝড়ের রাতে রাজাকারদের সহযোগে পাকিস্তানি সেনারা তার স্ত্রী ও শ্যালিকাকে লাঞ্ছিত করে। এই অন্যায় সে সহ্য করতে না পেরে দা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অন্যায়কারীদের মূল হোতা সুবাদার ও তার এক সহযোগীর খোঁজে। পৈশাচিক পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসা হত্যাকান্ড ও নিপীড়নের মঝে সফদরউল্লাহর এই সামান্য প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে সেও মুক্তি চায়।
উপর্যুক্ত তিনটি চরিত্রের আলোচনায় দেখা যায়, তারা ধীরে ধীরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এভাবেই নিপীড়ন মানুষকে বিদ্রোহী করে তোলে। তাকে মুক্তির জন্য লড়াই করতে বাধ্য করে। তাই বলা যায়, অকারণ নিপীড়নই একটি যুদ্ধকে জনগণের মুক্তিযুদ্ধে উপনীত করেছিল।
"আপনে মানুষ না আর কিছু"- কথাটি '১৯৭১' উপন্যাসে বদিউজ্জামানের স্ত্রী অনুফা মীর আলিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন। মীর আলি '১৯৭১' উপন্যাসে এক সত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধ। নীলগঞ্জ গ্রামে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগমন ঘটে তখন সবার অবস্থা বেশ করুণ হয়। ভয়ে সবাই তটস্থ হয়ে থাকে। এর মধ্যেই গ্রামে ঝড় হয়। ঝড়ে কারও তেমন ক্ষতি না হলেও বদিউজ্জামানের ঘরের চাল উড়ে যায়। একদিকে ঝড়ের তাণ্ডব অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে তটস্থ অবস্থা। এর মধ্যেই মীর আলি তার ক্ষুধার কথা জানায়। মীর আলির ক্ষুধা এত বেশি প্রচন্ড যে, সে অনুফাকে বলে ভাত রেঁধে দিতে। এরকম দুশ্চিন্তার মুহূর্তে মীর আলির এমন আবদার শুনে অনুফা প্রশ্নোক্ত কথাটি বলে। আসলে অনুফা বিরক্তিবোধ থেকেই এমন কথা বলে।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদের যুদ্ধকেন্দ্রিক একটি বিশেষ উপন্যাস। উপন্যাসের দৈর্ঘ্য তেমন বড় নয় তবে লেখক ছোট্ট পরিসরে যে বৃহৎ বার্তা প্রদান করেছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। '১৯৭১' উপন্যাসের কাহিনি এগিয়ে যায় নীলগঞ্জ গ্রামে হানাদার বাহিনীর আগমন ও তাদের নৃশংস কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। উপন্যাসে পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার এজাজ তার সেনা নিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে আসে। তার ধারণা মুক্তিবাহিনীর একটি দল নীলগঞ্জ গ্রামের কৈবর্তপাড়ায় লুকিয়ে আছে। আর তার এই ধারণা থেকেই নীলগঞ্জ গ্রামের মানুষের প্রতি সে অমানবিক অত্যাচার চালায়।
অফিসার এজাজের কাছে বন্দি হয়ে থাকে নীলগঞ্জ গ্রামের বাইরে থেকে আসা দুজন ব্যক্তি। একজন মসজিদের ইমাম আর অন্যজন নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। স্কুলমাস্টার আজিজের প্রতি এজাজের যে নৃশংসতার চিত্র তা সত্যিই ঘৃণ্য। এছাড়াও উপন্যাসে দেখা যায়, মিলিটারি অফিসার নীলু সেনকে হত্যা করে। তারপর আবার বলাইকে খুঁজেছেন হত্যা করার জন্য। আসলে নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগমনের 'পর থেকেই সেই অঞ্চলের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
সাধারণত যুদ্ধ তখনই হয় যখন দুটি পক্ষ থাকে। দুদল সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু '১৯৭১' উপন্যাসে দেখা যায়, সেখানে কেবল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দৌরাত্ম্য, এর বিপরীতে যে মুক্তিবাহিনীর কর্মতৎপরতা তার কোনো বর্ণনা নেই। অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে অন্যপক্ষ অনুপস্থিত। এই উপন্যাসে যুদ্ধ মানে নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। ঝাঁপিয়ে পড়ার নানা কলা আর ছলা। পেছনের জঙ্গলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেশকিছু জোয়ান এবং কয়েকজন অফিসার লুকিয়ে ছিল কি না, তাদের সঙ্গে মেজর বখতিয়ার ছিল কি না, কিংবা তাদের আহত কয়েকজনকে কৈবর্তপাড়ার লোকেরা আশ্রয় দিয়েছিল কি না, সেসব কথা কোথাও স্পষ্ট করা হয়নি। প্রতিটি সম্ভাবনাই আছে। আবার এমনও হতে পারে যে, এ ধরনের কোনো ঘটনাই নীলগঞ্জে ঘটেনি। কিন্তু দখলদার বাহিনী গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এক পরিকল্পিত অভিযানে নেমেছে নীলগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে। প্রকৃত অর্থে হানাদার বাহিনীর বৈশিষ্ট্যই ছিল এমন। তারা যুদ্ধের কোনো নিয়ম মানত না। ১১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে হানাদার বাহিনী যখন বিভিন্নভাবে অত্যাচার করতে থাকে তখন কারও কোনো প্রতিবাদ দেখা যায় না। আসলে তাদের জীবন ছিল খুবই সহজ-সরল। তাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহের কোনো প্রবণতা দেখা যায় না। সেখানে শুধু হানাদার বাহিনীর দৌরাত্ম্য দেখা যায়। তাদের প্রতিহত করার কোনো দৃশ্য দেখা যায় না। মনে হয় যেন যুদ্ধটা শুধু হানাদার বাহিনী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের বা পৈশাচিক তৃপ্তির জন্য করছে। উপর্যুক্ত এই আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, ১৯৭১ উপন্যাসে যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত একপক্ষীয়। সেখানে পালটা যুদ্ধের কোনো দৃশ্য অঙ্কিত হয়নি।
"এদের অভ্যাস আছে- অতি দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে সরে পড়তে পারে" কথাটি '১৯৭১' উপন্যাসে বর্ণিত কৈবর্তপাড়ার মানুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। উপন্যাসে দেখা যায়, পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার নীলগঞ্জ গ্রামে আক্রমণ করে। অফিসার এজাজের ধারণা, কৈবর্তপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল লুকিয়ে আছে। তাই তার যত রোষ সব কৈবর্তপাড়াকে ঘিরে। কৈবর্তপাড়ার মানুষ এটা বুঝতে পেরে চলে যেতে চায়। তাদের জীবনধারা অন্যরকম। তারা গ্রায় থেকে সরে পড়ে নিঃশব্দে। অন্ধকারেই তারা কাজ করে। ওদের শিশুরা চোখ বড় বড় করে দেখে, হইচই করে না, কিছুই করে না। মেয়েরা জিনিসপত্র নৌকায় তুলতে থাকে। হাঁস, মুরগি, ছাগল সবই উঠানো হয়, কোনো কিছু বাদ পড়ে না। প্রবীণরা হুঁকো হাতে বেশ খানিকটা দূরে বসে থাকে। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় কী হচ্ছে না হচ্ছে এরা কিছুই জানে না। আসলে কৈবর্তপাড়ার মানুষেরা যে বিপদের সময় এমন নিঃশব্দে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সরে পড়তে পারে তাদের এই বৈশিষ্ট্যের কারণে লেখক প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।
'১৯৭১' উপন্যাসটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের উপর যে অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছিল তার আখ্যান রচিত হয়েছে আলোচ্য উপন্যাসে। উপন্যাসে দেখা যায়, পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার এজাজ তার সেনাবাহিনী নিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে হাজির হয়। কারণ তার ধারণা যে, নীলগঞ্জ গ্রামের পাশে কৈবর্তপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল লুকিয়ে আছে। গ্রামে আসার পর থেকেই শুরু হয় তার অমানবিক অত্যাচার। অফিসার এজাজ যখন নীলগঞ্জ গ্রামে আসে তখন তার সঙ্গী হয় বাঙালি 'রফিক'।
'রফিক' আলোচ্য উপন্যাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র বলা যায়। সে মেজর এজাজের সঙ্গে থাকে এবং দোভাষী হিসেবে কাজ করে। রফিক চরিত্রটি যেন রহস্যময়। রফিক হলো '১৯৭১' উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল চরিত্র। তাকে বাস্তব চরিত্র না বলে বরং প্রতীকী চরিত্র 'বলাই শ্রেয়। উপন্যাসে দেখা যায়, রফিক কখনো নীলগঞ্জ গ্রামে আসেনি অথচ সে এমনভাবে কাজ করেছে, যেন শুধু নীলগঞ্জের রাস্তাঘাট নয়, মানুষজন এবং প্রাকৃতিক অবকাঠামোও তার খুবই চেনা। সে মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধি হয়েই কথা বলেছে। আর এভাবেই সে হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের যেকোনো গ্রামের যেকোনো রফিক।
'১৯৭১' উপন্যাসে রফিক আসলে যুদ্ধই করতে চেয়েছে। তাই উপন্যাসের শুরু থেকেই মেজর এজাজের কর্মকাণ্ডের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে এসেছে। অবশেষে যখন সে নিশ্চিত হয়েছে, এটা যুদ্ধ নয়, অন্যায় যুদ্ধ মাত্র, তখন প্রতিবাদ ছাড়া তার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। যুদ্ধের শুরুর পর্বে বাংলাদেশের আপামর জনতা যখন বুঝতে পারে তাদের সামষ্টিক বেঁচে থাকা কেবল ব্যক্তিক জীবনদানের মধ্য দিয়েই সম্ভবপর; তখনই আসলে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে থাকে যুদ্ধে। যুদ্ধ রূপান্তরিত হতে থাকে সর্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে। উপন্যাসে রফিক চরিত্রটির মধ্য দিয়ে এই চেতনার প্রকাশই দেখা যায়। সেও যেন বুঝতে পেরেছিল তার জীবন দেওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হবে যুদ্ধ। যে রফিক এক সময় মেজর এজাজের সঙ্গী ছিল, সেই এজাজের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। কৈবর্তপাড়ায় লাগিয়ে দেওয়া আগুনের আঁচে বিলের পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর এজাজের কাছে অচেনা হয়ে ওঠে রফিক। রফিকের চোখেমুখে হানাদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে যে ঘৃণার প্রকাশ এটিই মূলত উপন্যাসের মূল। উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই বলা যায়, রফিকই আসলে '১৯৭১' উপন্যাসের একাত্তর, এই উপন্যাসের মুক্তিযুদ্ধ।
"কোনো কোনো সময় মানুষের ইন্দ্রিয় অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে"- '১৯৭১' উপন্যাসে কথাটি সফদরউল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। '১৯৭১' উপন্যাসে পাকিস্তানি মিলিটারি যখন নীলগঞ্জ গ্রামে আক্রমণ করে তখন নীলগঞ্জ গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ছিল যে, পাকিস্তানিরা মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিল ভিত্তিহীন। পাকিস্তানি সুবাদার সফদরউল্লাহর বাড়িতে গিয়ে তার অনুপস্থিতিতে বাড়ির মেয়েদের ওপর নির্যাতন চালায়। এটা জানার পর সফদরউল্লাহ একটা দা হাতে মাঠে নেমে পড়ে। সে সুবাদারকে খুন করবে। সে কোনো রকম শব্দ না করে হাঁটে।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে যেভাবে হাঁটে তাতে মনে হয় অন্ধকারেও সে সব দেখছে। এরকম অন্ধকারে সফদরউল্লাহর নির্বিঘ্নে চলাচলের কারণেই লেখক প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।
'১৯৭১' উপন্যাসে লেখক প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাকিস্তানি মিলিটারি কর্তৃক আক্রমণের শিকার হওয়ার চিত্র তুলে ধরেছেন। গ্রামে এসেই মেজর এজাজ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সে গ্রামের ইমাম ও আজিজ মাস্টারকে স্কুলে বন্দি করে রাখে। তারা বাঙালির ওপর যে নির্যাতন চালিয়ে আনন্দবোধ করত তা এজাজের নানা কথায় বোঝা যায়।
উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র হলো বদিউজ্জামান। তার উপর এজাজ প্রত্যক্ষ নির্যাতন না চালালেও সে যেন হানাদারদের অত্যাচারের শিকার হওয়া লোকদের প্রতিভূ। উপন্যাসে বদিউজ্জামান একজন মনিহারি দোকানদার। মধুবন বাজারে তার একটি মনিহারি দোকান আছে। বদিউজ্জামানের সাংসারিক অবস্থা মোটামুটি ভালো। গ্রামে মিলিটারি আসার পরে সে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। তাই সে মধুবন বাজারে যেতে চায় না। এদিকে তার মধুবন বাজারে যাওয়াও খুব প্রয়োজন ছিল। তাই সে বুকে সাহস সঞ্চার করে বাজারের দিকে যেতে থাকে। যাওয়ার পথে যখন সে দ্বিতীয়বারের মতো মিলিটারি দেখে তখন ভয় পেয়ে যায়। তারপর সে জঙ্গলা মাঠের দিকে যায়। ইতোমধ্যে গুলির আওয়াজ পেয়ে সে ভয়ে জঙ্গলের মধ্যে পচা এক ডোবায় গলা পর্যন্ত নিজেকে ডুবিয়ে রাখে।
পচা ডোবায় থাকা অবস্থায় তার মধ্যে বিভিন্ন অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। পচা পানিতে ডুবে থাকতে তার প্রথমদিকে অনেক কষ্ট হয়। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অনুভূতি শিথিল হতে থাকে। একটা সময় প্রবল পিপাসায় সে পচা ডোবার পানি পান করে। এদিকে তার মধ্যে নানা ধরনের চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়। তার একসময় মনে হয় জ্বর এসেছে। কিন্তু মাথায় হাত দিয়ে সে কোনো উত্তাপ পায় না। একসময় তার মনে হয় শার্টের ভেতর শীতল ও লম্বা কিছু ঢুকছে। পরে দেখে এটা তার মনের ভুল। এরকম নানা ধরনের অনুভূতির বিপর্যয় তার মধ্যে দেখা যায়। সে একসময় নিঃসঙ্গবোধ করলে শেয়ালের উপস্থিতিকে সে সঙ্গী ভাবে।
বদিউজ্জামানের পশুকে সঙ্গী ভাবার বিষয়টির মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, তার অনুভূতি পশুর মতো হয়ে গেছে। আর উপর্যুক্ত আলোচনায় এটাও প্রতীয়মান যে, তার অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়। তাই বলা যায় পাকিস্তানিদের বর্বরতা মানুষকে অনুভূতিশূন্য করে দিয়েছিল।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ তার পাকিস্তানি বাহিনী নিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে আসে। তাদের ধারণা নীলগঞ্জ গ্রামের কৈবর্তপাড়ায় একদল মুক্তিবাহিনী লুকিয়ে আছে। 'মেজর এজাজ গ্রামের মসজিদের ইমাম ও আজিজ মাস্টারকে নানাভাবে নির্যাতন করে। তারপরেও তারা কোনো তথ্য দেয় না। অবশেষে উপন্যাসের আরেক চরিত্র জালাল মিয়া ভয়ে এজাজকে তথ্য দিয়ে দেয়। যদিও তথ্যগুলো সত্য কি না তা স্পষ্ট নয়। জালাল মিয়া মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে যেসব তথ্য দেয় সেগুলো হলো- কৈবর্তপাড়ার জেলেপাড়ায় প্রায় একশ মুক্তিবাহিনী আছে। তারা পরশুদিন থেকে এ গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। জয়নালদের গ্রাম থেকে তিনবার খাবার পাঠানো হয়েছে। মুক্তিবাহিনীর মধ্যে আহত রয়েছে ছয়-সাতজন। বনে মুক্তিবাহিনীর জন্য খাবার নিয়ে যেত কৈবর্তরা।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান। এই উপন্যাসে লেখক হানাদার বাহিনীর আক্রমণে নীলগঞ্জ গ্রামের মানুষের জীবনের বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। নীলগঞ্জ প্রত্যন্ত একটি অঞ্চল। সেই গ্রামে সহজ-সরল সব মানুষের বসবাস। হানাদার বাহিনীর মেজর এজাজ তার সেনাবাহিনী নিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে আসে। তার ধারণা, নীলগঞ্জ গ্রামের পাশে কৈবর্তপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল আশ্রয় নিয়েছে। সেই মুক্তিবাহিনীর ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য পাওয়ার জন্য মেজর এজাজ গ্রামের বিভিন্ন মানুষের প্রতি অমানবিক অত্যাচার চালায়।
উপন্যাসে দেখে যায়, মেজর এজাজ গ্রামের ইমাম ও স্কুল মাস্টার আজিজকে স্কুলে বন্দি করে রাখে। মেজর এজাজ সন্দেহ করে যে, ইমাম অথবা মাস্টার আজিজ মুক্তিবাহিনীর বিষয়ে তথ্য জানে। এজন্য সে ওদের দুজনের উপর নানাভাবে অত্যাচার করে। মেজর এজাজ ঘটনাক্রমে জানতে পারে যে, আজিজ মাস্টার জয়নালের মেয়ে মালাকে পছন্দ করে। এই বিষয়টি কেন্দ্র করে সে আজিজ মাস্টারকে ভীষণভাবে অপমান করে।
মেজর এজাজ আসলে বাঙালিদের প্রতি নির্যাতন করে পৈশাচিক আনন্দ পেত। সে এমনসব অত্যাচারের কৌশল উদ্ভাবন করে যা মানুষের মৃত্যুর সমান। একপর্যায়ে মেজর এজাজ তার সঙ্গী রফিককে বলে বাঙালিদের কোনো সম্মান নেই। তারা বেঁচে থাকার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। এরপর সে আজিজ মাস্টারকে বলে বেঁচে থাকতে চাইলে উলঙ্গ হতে হবে। ভয়ে তটস্থ আজিজ মাস্টার বেঁচে থাকার জন্য প্রথমত বিষয়টিতে সম্মতি জানায়। ঠিক একারণেই মেজর এজাজ প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি করে। কিন্তু তার এ মন্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আজিজ মাস্টারের অপমান যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন সে মৃত্যুকে বেছে নেয়। আর কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই সে পুকুরে নামে এবং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। বাঙালির চরিত্র আসলে এমনই। তারা নিজের মান রাখার জন্য হয় লড়বে, না হয় মরবে। মেজর এজাজ আজিজ মাস্টারকে কেন্দ্র করেই প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছিল। আর সেই আজিজ মাস্টারই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে কথাটি মিথ্যা প্রমাণিত করল। তাই বলা যায়, "একটা কুকুরেরও আত্মসম্মান থাকে, এদের তাও নেই"-এজাজের এই উক্তি ভিত্তিহীন।
'১৯৭১' উপন্যাসের এক অন্যতম চরিত্র চিত্রা বুড়ি। সে কৈবর্তপাড়ায় থাকে। উপন্যাসে দেখা যায়, গত বছর কৈবর্তপাড়ায় চিত্রা বুড়ির ছেলে খুন হয়। কৈবর্তপাড়ায় বুড়ির আর জায়গা হয় না। নীলু সেনের দালানের এক প্রান্তে পাকা কালীমন্দিরের চাতালে থাকতে শুরু করে সে। কিন্তু চিত্রা বুড়ি একনাগাড়ে কখনো ঘুমায় না। ক্ষণে ক্ষণে জেগে ওঠে। গভীর রাতে কালী দেবীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ কথাবার্তা হয়। সে মা কালীকে তার অনেক কথা বলে। দেবীকে তার ছেলের হত্যার প্রতিশোধ নিতে বলে। আর এজন্য সে দেবীর কাছে জোড়া পাঁঠা বলি দেওয়ার কথাও বলে। আসলে চিত্রা বুড়ি ছিল অতিশয় বৃদ্ধ। সে তার ছেলেকে হারিয়ে খুবই মর্মাহত। ছেলের মৃত্যুর বিচার প্রাপ্তির আশায় অনেক ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু কোথাও সে বিচার পায় না। অবশেষে সে দেবীর কাছে পুত্রহত্যার বিচার চায়। দেবীর কাছে সে নানান দুঃখের কথা বলে ফলে একনাগাড়ে কখনো ঘুমায় না। মাঝে মাঝেই জেগে জেগে দেবীর সঙ্গে কথা বলে।
হুমায়ূন আহমেদের '১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামের মানুষের উপর অমানবিক অত্যাচার চালায়। সে স্কুলঘরে গ্রামের ইমাম ও স্কুলমাস্টার আজিজকে বন্দি করে রাখে। তাদের উপর দফায় দফায় অত্যাচার চালায়। এছাড়া নীলু সেন, মনা এদেরকে হত্যা পর্যন্ত করে। গ্রামের নারীদের উপরও অবিচার করে।
উপন্যাসে দেখা যায়, নীলগঞ্জ গ্রামের অধিবাসীরা খুবই সহজ-সরল। তারা মুক্তিযুদ্ধের বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। অথচ মেজর এজাজ তাদের প্রতি এত বেশি নিষ্ঠুর ছিল যে, মনে হয় তারা যুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। '১৯৭১' উপন্যাসে পাকিস্তানি বাহিনী শুধু নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর অত্যাচার করেছে, বাঙালিদের প্রতিহত করার কোনো চিত্র উপন্যাসে নেই। এখানে যুদ্ধ মানেই নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া আর ঝাঁপিয়ে পড়ার নানা কলা আর ছলা। পেছনের জঙ্গলে মুক্তিবাহিনী লুকিয়ে ছিল কি না, সেই বিষয়টিও পরিষ্কার নয়। কেননা তাদের কোনো কর্মতৎপরতা পরিষ্কার করা হয়নি।
আসলে এই উপন্যাসের এটাকে যুদ্ধ বলা যায় না। এখানে কেবল পাকিস্তানি বাহিনী একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের উপর হামলা চালিয়েছে। উপন্যাসের মিলিটারি অফিসার এজাজের ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রকাশও তার নির্যাতনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। প্রতিটি যুদ্ধেরই কিছু নিয়ম থাকে। দুটি পক্ষ থাকে। কিন্তু আলোচ্য উপন্যাসে কোনো প্রতিপক্ষ পাওয়া যায় না। কেবল হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা। বাঙালি বিদ্বেষ থেকেই তারা এরূপ আচরণ করেছে। তারা কোনো কারণ ছাড়াই একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের উপর অমানবিক অত্যাচার করেছে। তাই বলা যায়, "এটা যুদ্ধ নয়, অন্যায় যুদ্ধ মাত্র"- কথাটি যুক্তিযুক্ত।
'১৯৭১' উপন্যাসে অনুফার সৌভাগ্যবতী বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছে বৃদ্ধ মীর আলি। এটি মূলত তার একটি বিশ্বাস। মীর আলির ছেলে বদিউজ্জামান ও অনুষ্কার বিয়ের পূর্বে তাদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। মাতৃহীন এই মেয়েটি সংসারে আসার সাথে সাথে পারিবারিক অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করে। তাদের সংসারে আয়-উন্নতি হতে থাকে। বদি মনিহারি দোকানি হয়েও টিনের চালার নতুন ঘর বানায়, সাইকেল কেনে, এমনকি শীত নিবারণের জন্য বৃদ্ধ পিতাকে লেপ পর্যন্ত কিনে দেয়। পরিবারের এসব পরিবর্তনের একমাত্র কারণ হিসেবে বৃদ্ধ পুত্রবধূর ভাগ্যকেই শ্রেয় মনে করে। তাই সে অনুফাকে ভাগ্যবতী বলেছে।
পাকিস্তানিরা ছিল বর্বর। তারা ধর্মের নামে বাঙালিদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করেছিল; '১৯৭১” উপন্যাসের গ্রামবাসীর বিশ্বাস ছিল মিলিটারিরা কেবল অন্য ধর্মের মানুষ হত্যা করে, মুসলমানদের তারা মারে না। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানিরা সরল গ্রামবাসীর এই বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করে উপন্যাসের প্রথমেই। আমলে 'হিন্দু বা মুসলমান নয়, পাকিস্তানিরা মূলত বাঙালির শত্রু। মসজিদের ইমাম সাহেবকে আটকে রাখতে তাদের বুক কাঁপে না। মুসলিম মেয়েদের লাঞ্ছিত করতেও তাদের বিবেকে বাধে না। কোনো ধর্মীয় বোধসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এমন আচরণ সম্ভব নয়। তারা যে ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে তা তাদের আচরণে স্পষ্ট।
পাকিস্তানিদের ধর্মীয় লেবাস প্রবলভাবে উন্মোচিত হয় মনা ও তার ছোট ভাইকে নির্মম মৃত্যু দানে। মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করে তারা আনন্দ পায়। তাদের ত্রাসের রাজত্ব এতই বিশাল যে, প্রাণের ভয়ে মুসল্লিরা নামাজে যেতে পর্যন্ত ভয় পায়। গ্রামের সহজ-স্বাভাবিক জীবনে তারা তাণ্ডবের ঝড় নিয়ে আবির্ভূত হয়, যা সত্যিকারের কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে না।
মুসলমানরা যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে কোনো সহানুভূতি পায়নি হিন্দুরা তো সেখানে তা কল্পনাও করত না। পাকিস্তানিরা গ্রামে প্রবেশের সময় বৃদ্ধ চিত্রা বুড়ি তাদের আগমনে ভয় পায়। কৈবর্তপাড়ায় জ্বালাও-পোড়াও তান্ডব চালায় মিলিটারি। এমনকি হিন্দু নীলু সেনকে ডেকে তুলে হত্যা পর্যন্ত করে। বাঙালিকে পঁচাত্তর ভাগ হিন্দু বলে কটাক্ষও করে। মেজর কালীমন্দিরের দেবীকে মাকড়সার মতো লাগছে বলে হাস্য-পরিহাসও করে। হিন্দু বা মুসলমান কোনো ধর্মের প্রতিই বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর সম্মান ছিল না। তাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষার বিষয় ছিল এদেশের মাটি। তাই তো তারা বাঙালি জাতির উপর অমানবিক অত্যাচার চালায়, যা '১৯৭১' উপন্যাসেও দৃশ্যমান। উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
নীলগঞ্জ গ্রামে দ্বিতীয় মিলিটারি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের দল প্রবেশের পরপরই বদিউজ্জামান এক ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। মধুবন বাজারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওয়ানা দিলেও জঙ্গলা মাঠে এসেই সে মত পালটায় বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে বাড়িতেই ফেরত যাবে বলে। কিন্তু জঙ্গলা মাঠের একটি গর্তে পড়ে যায় সে। কোমড় পর্যন্ত পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে প্রাণ রক্ষা করতে চায়। কারণ মিলিটারি তার সন্নিকটেই গোলাগুলির তাণ্ডব চালিয়েছে। একদিকে প্রাণভয় অন্যদিকে বৈরী পরিবেশে তার অবস্থান। এমন অবস্থায় বদিউজ্জামানের চোখ লাল হয়ে যায়।
'১৯৭১' উপন্যাসের রফিক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অধিনায়কের সহযোগী হিসেবে নীলগঞ্জ গ্রামে আসে। রফিক এ উপন্যাসের সম্ভবত সবচেয়ে জটিল চরিত্র। সে পাকিস্তানিদের সাহায্য করলেও তার চরিত্রে বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। হানাদার বাহিনীর নৃশংস রূপ প্রত্যক্ষ করে সে শেষ পর্যন্ত তার বিবেককে জাগ্রত করে প্রবল প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ তাকে উপন্যাসের উজ্জ্বল চরিত্রে রূপান্তরিত করেছে। ফলে সে'বাঙালি মুক্তিসেনাদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে হানাদার বাহিনীর তাণ্ডবের যেসব ঘটনা ঘটেছে তা আরও প্রবল হতে পারত কিন্তু আসন্ন সেই তাণ্ডব থেকে অনেক ক্ষেত্রে রফিক তাদের বাঁচিয়েছে। মেজর এজাজের এই সহযোগী নীলগঞ্জ গ্রামে কখনো প্রবেশ না করলেও সে রাস্তাঘাট সবকিছু চেনে। মিলিটারি যখন কৈবর্তপাড়ায় তল্লাশি করতে চায় তখন সে তাতে বাধা দেয়। বলাইকে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। আজিজ মাস্টারকে লজ্জাজনক শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে। মুসল্লিদের বিপদ থেকে বাঁচাতে চুপ রাখে। উপন্যাসের শেষাংশে রফিক চরিত্রের সকল রহস্যের উন্মোচন হয়। সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সে মেজর এজাজের কাছে স্বীকার করে যে, মুক্তিবাহিনী নীলগঞ্জ গ্রামের বনে লুকিয়ে ছিল। কৈবর্তপাড়া থেকে আহত মুক্তিসেনাদের সরে যেতে সাহায্য করেছে সে। পাগলা নিজামের জঙ্গলা বনে মুক্তিবাহিনীর কাছে খবর দেওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করে। এমনকি বাঙালি সেনারা ঝড়ের সময় পালিয়ে গেছে তাও স্বীকার করে। মোট কথা, রফিকই মিলিটারির সহযোগী হয়ে মূলত বাঙালি সেনাদের সাহায্য করত। উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, রফিক বাঙালি মুক্তিকামী সেনা চরিত্রের প্রতিনিধি।
নীলগঞ্জ গ্রামে হঠাৎ পাকিস্তানি মিলিটারি প্রবেশ করলে গ্রামের সকলেই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সবার মধ্যে আতঙ্ক ও চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কেননা কেউই ভাবেনি যে গ্রামে কখনো মিলিটারি আসবে। চার-পাঁচজন মুসল্লি মাগরিবের নামাজ আদায় করতে মসজিদে যায়। আজানের পরপরই কয়েকটি গুলির শব্দ হওয়ায় তারা নামাজ না পড়েই ফিরে যেতে চায়। কাজটা ঠিক হবে না ভেবে তারা পুনরায় ফিরে আসে এবং মাগরিবের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় তারা মিলিটারি দেখে। তাই ভয়ে তারা মসজিদেই রাত কাটায়।
"পাকিস্তানিদের ব্যাপারে গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ভিত্তিহীন"-মন্তব্যটি যৌক্তিক। '১৯৭১' উপন্যাসে দেখা যায়, নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারি প্রবেশ করলে গ্রামের মানুষগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত এ হানাদার বাহিনীর প্রতি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ভীত হলেও তাদের মধ্যে কিছু মানুষ আবার ইতিবাচক বিশ্বাসও ধারণ করে। তারা মনে করে যেহেতু তারা কোনো অন্যায় করেনি সেহেতু পাকিস্তানি বাহিনী তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তাদের এমন বিশ্বাস ভেঙে যায়।
বদিউজ্জামান মনে করে, মিলিটারিরাও আল্লাহর বান্দা, তারাও তো মানুষ। তাদের রক্ত একটু গরম আর পোশাকটাই ওই রকম। তাই বদি মনে করে, এটা দোষের কিছুই নয়। অথচ এই মিলিটারি থেকে নিজের প্রাণ রক্ষা করার জন্য সে পাগলের মতো দৌড়েছে, জঙ্গলে লুকিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে, গুলির আওয়াজ শুনে ভয়ে অস্থির হয়েছে।
মিলিটারিরা গ্রামে এসে স্কুলঘরে অবস্থান করলে জয়নাল মিয়া মনে করে ওরা মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করবে না। তারা মনে করে তাদের কোনো ক্ষতি করার প্রশ্নই ওঠে না। কেননা তারা মিলিটারির কোনো ক্ষতিই করেনি।
ঝড়ের সময় মিলিটারি সুবাদার ও রাজাকার মিলে সফদরউল্লাহর ঘরে ঢুকে তার স্ত্রী ও শ্যালিকার উপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। তাদের সম্ভ্রম কেড়ে নেয়। অথচ জয়নাল মিয়া সফদরউল্লাহকে বলেছিলেন মুসলমান মেয়েদের কোনো ভয় নেই। মুসলমানদের শরীরে নাকি এরা হাত দেয় না।
মেজর এজাজের কথাবার্তায়ও মানুষগুলোর এমন বিশ্বাস ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। তিনি মনে করেন, মুসলমানরা যদি মন্দিরে ঢুকে মূর্তিকে প্রণামও করে তবুও নাকি তিনি কিছুমাত্র অবাক হবেন না। আবার মেজর এজাজের নির্দেশেই ইমাম ও আজিজ মাস্টারকে শারীরিক নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করা হয়। ফলে মিলিটারিদের এমন নৃশংস আচরণগুলোর ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, "পাকিস্তানিদের ব্যাপারে গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ভিত্তিহীন।"-মন্তব্যটি যৌক্তিক।
"প্রাণ বাঁচানোর জন্য অনেক সময় এ জাতীয় কথা বলা হয়।"- উক্তিটি রফিক মেজর এজাজকে বলেছে। মুক্তিবাহিনীরকে নীলগঞ্জ গ্রামের লোকজন সহায়তা করেছে কি না মেজর জয়নাল মিয়ার কাছে তা জানতে চান। উত্তরে জয়নাল মিয়া জানায় তারা মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করেছে জঙ্গলা মাঠে অবস্থানকালীন সময়ে। তাদের খাদ্য, আশ্রয় ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে। কিন্তু সকল তথ্য মূলত মিথ্যা বলে দাবি রফিকের। কারণ মেজর জয়নালকে মেরে ফেলবে সেই ভয়েই সে মেজরকে এমন ভ্রান্ত তথ্য দেয়। অর্থাৎ প্রাণ বাঁচানোর জন্য এমন ভ্রান্ত তথ্য দেয় বলে রফিকের দাবি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একক কোনো গোষ্ঠীর যুদ্ধ নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণেই সংঘটিত হয়েছে এই যুদ্ধ। পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর অগণিত মানুষকে হত্যার নৃশংসতার পরই আমরা পেয়েছি চূড়ান্ত বিজয়। তবে স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতিকে রক্তগঙ্গার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণেই এই বিজয়। '১৯৭১' উপন্যাসেও লেখক জাতভেদাভেদ ভুলে মুক্তিসংগ্রামের দৃশ্যপট অঙ্কন করেছেন। নীলগঞ্জ গ্রামের কৈবর্তপাড়াকে করেছেন মিলিটারির মূল আকর্ষণের জায়গা। কারণ তাদের কাছে পূর্ব থেকেই তথ্য ছিল মুক্তিবাহিনীকে কৈবর্তবাসীরা আশ্রয় দিয়েছে। ফলে সর্বদা ভীতি ও জ্বালাও পোড়াও নীতির কবলে পড়ে তাদের জীবন বিপন্ন হয়। তারা তাদের আশ্রয়স্থল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। অবশ্য উপন্যাসের শেষাংশে আমরা জানতে পারি, কৈবর্তবাসীরাই আশ্রয়, সেবা ও খাবার দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করেছে।
'১৯৭১' উপন্যাসে মিলিটারি নীলগঞ্জে প্রবেশের প্রথম পর্যায়েই চিত্রা বুড়ির ভয়ের কথা বলা হয়েছে। এই ভয় আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েই। নিজ গোত্রের মানুষকে বাঁচাতে প্রথমে তাদের খবর দেওয়ার কথা বলা হলেও উপন্যাসের শেষাংশে আমরা জানতে পারি, আসলে ছয়-সাতজন মুক্তিসেনা কৈবর্তপাড়ায় ছিল সেবা নিতে। সুতরাং বুড়ি মূলত মুক্তিবাহিনীকে খবর দিতেই কৈবর্তপাড়ায় গিয়েছে একথা বোঝা যায়। আবার কৈবর্তদের দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ার কথা বলা হয়েছে। অতি সুচতুর এই জেলে সম্প্রদায়ের মানুষগুলো তাদের নৌকা ও ঘরের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেরিয়ে যায় পাড়া থেকে। কারণ একটাই, মিলিটারি তাদের পাড়ায় তান্ডব চালাবে মুক্তিবাহিনী ধরতে। জঙ্গলা মাঠে মুক্তিবাহিনীকে খাবার পৌছে দেওয়ার মতো মহৎ কাজও করে কৈবর্তরা। উপন্যাসে সবকিছুই নাটকীয়ভাবে ঘটতে থাকে। সবকিছুই যেন সন্দেহ কিন্তু সন্দেহই যে বাস্তবসত্য তা শেষাংশে প্রমাণিত হয় রফিক ও মেজরের কথোপকথনে। তাইতো মেজর এজাজের নির্দেশে কৈবর্তপাড়ায় আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কৈবর্তদের এরূপ আচরণের প্রেক্ষিতে বলা যায়, কোনো বিশেষ পেশার বা জাতিগোষ্ঠীর নয় বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ হয়েছে কৈবর্তদের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবে।
'১৯৭১' উপন্যাসের এক বৃদ্ধ চরিত্র হলো মীর আলি। মীর আলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক আসলে শাশ্বত গ্রামীণ পিতার রূপ অঙ্কন করেছেন। বৃদ্ধ মীর আলি গত দুই বছর থেকে চোখে কিছু দেখেন না। প্রায় সত্তর বছরের মীর আলি চোখ নষ্ট হলেও কানের অবস্থা বেশ ভালো। তার ছোট নাতনিটি যতবার কেঁদে ওঠে ততবার তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। বয়স বেড়ে যাওয়ায় মীর আলি শব্দ সহ্য করতে পারে না। কারণ শব্দের কারণে মাথার মাঝখানে তার ঝনঝন শব্দ হয়। বৃদ্ধ হয়ে গেলে মানুষের শরীর ও মনে অনেক পরিবর্তন আসে। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে বৃদ্ধ মীর আলি আজকাল শব্দ সহ্য করতে পারেন না।
মীর আলি '১৯৭১' উপন্যাসে বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে অসহায় একজন প্রবীণ ব্যক্তি। বয়সের ভারে ন্যুজ প্রবীণ ব্যক্তিরা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে পরিবারের সদস্যদের কাছে কতটা নির্ভরশীল ও অসহায় হয়ে পড়েন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মীর আলি। মীর আলি দৃষ্টিহীন অসহায় এক বৃদ্ধ। দুবছর আগে চোখে সামান্য দেখতে পেলেও এখন একদমই দেখতে পান না তিনি। তার সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি হলো রাতের বেলায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে একা বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে পুত্র বদিউজ্জামান ও তার পুত্রবধূর সাহায্য নিতে হয়। অন্ধ মীর আলি পুত্রবধূকে চাঁদনি রাত কি না জিজ্ঞেস করলে সে বিরক্তি বোধ করে। অসহায় বৃদ্ধ রাতে একবার ঘুম ভাঙলে আর ঘুমাতে পারে না। তবুও সে অনুফার কথায় বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করে।
রাতে দ্বিতীয়বার প্রকৃতির ডাক অর্থাৎ প্রস্রাবের চাপ দিলে সে আবার বদিকে ডাকতে শুরু করে এবং অস্থিরতা প্রকাশ করে। বদি পিতার ডাকে সাড়া দিতে আসার আগেই সে বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলে। নিজের এই চরম অসহায়ত্ব সে তার পুত্রের কাছে লুকাতে পারে না। বিছানা নষ্ট করার কারণে বদি তার পিতার জন্য পাতিলের বন্দোবস্ত করে। রাতে যাতে প্রস্রাব না করে সেজন্য পানি কম খেতে বলে। সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা বৃদ্ধ পিতার খেদমত করলেও মনে মনে চরম বিরক্তি বোধ করে। মীর আলি পুত্র বদির কাছে গোসলের পানি চাইলেও সে. বিরক্তি দেখায়। বয়সের কারণে বৃদ্ধ মানুষের শারীরিক ও মানসিক-বিভিন্ন পরিবর্তন আসে। মীর আলির নিঃসঙ্গ জীবন, নিদ্রাহীনতা, প্রাত্যহিক কাজে অপরের উপর নির্ভরশীলতা, দৃষ্টিহীনতা প্রভৃতি তাকে চরম অসহায় অবস্থায় উপনীত করেছে। এ অবস্থায় সে পুত্র ও পুত্রবধূর কাছ থেকে সহযোগিতা পেলেও তাদের মনে বিরক্তি তৈরি করেছে। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, "মীর আলি অসহায় গ্রামীণ বৃদ্ধ পিতার প্রতিরূপ”- উক্তিটি যথার্থ।
মধুবন বাজারে বদিউজ্জামানের একটি মনিহারি দোকান ছিল। সেখানে যেতে তার সাত মাইল হাঁটতে হতো। সে একদিন বগলে ছাতা নিয়ে হনহন করে আসার সময় ছাতিম গাছের নিচে একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষকে দেখে হকচকিয়ে যায়। পরে জয়নাল মিয়ার কথায় জানতে পারে গ্রামে মিলিটারি এসেছে। তাই নিজের দোকানটির খোঁজ নিতে সে মধুবন বাজারে যেতে থাকে।
বদিউজ্জামান সেখানে যাওয়ার জন্য হনহন করে হাঁটতে থাকে। তখন পুরো গ্রামে মিলিটারির আগমনে ভয় ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের নৃশংস আচরণ সম্পর্কে বদি খুব ভালোভাবেই অবগত ছিল। ফলে হাঁটতে হাঁটতে বদিউজ্জামান অনেক আশঙ্কার কথা ভাবতে থাকে। সে ভাবতে থাকে মিলিটারির অবস্থানের কথা। যে সময়টায় সে হনহন করে হেঁটে চলেছে সেটি তার জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। যেকোনো সময় মিলিটারি তার প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। এসব শঙ্কা ও ক্ষতির আশঙ্কার কথা ভেবেই বদিউজ্জামান একসময় উপলব্ধি করে খারাপ সময়টায় তার বাড়ি থেকে বের হওয়া ঠিক হয়নি। তাই সে মাঝামাঝি পথে মত বদলে নীলগঞ্জের দিকে ফিরতে থাকে।
নীলগঞ্জ গ্রামে আকস্মিকভাবে হানাদার মিলিটারি বাহিনী প্রবেশ করলে জনমনে চাপা আশঙ্কা ও ভয় বিরাজ করে। গ্রামের সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বদিউজ্জামান তার মধুবন বাজারের মনিহারি দোকানটির কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ে। সে মনে করে তার দোকানটি মিলিটারি জ্বালিয়ে দিতে পারে। তাই সেটি দেখার জন্য সে দ্রুত মধুবন বাজারের দিকে হনহন করে হাঁটতে থাকে। কিন্তু হানাদার বাহিনীর ভয়ে সে হঠাৎ মনে করে তার বাড়ির বাইরে বের হওয়া ঠিক হয়নি। সেজন্যই সে তার মত বদলে নীলগঞ্জের দিকে চলতে থাকে। নীলগঞ্জে ফেরার পথে সে যখন জঙ্গলা মাঠের কাছাকাছি আসে তখন সে দ্বিতীয় মিলিটারি দলটিকে দেখতে পায়।
বদিউজ্জামান জঙ্গলা মাঠের দিকে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকলে একসময় সে হুমড়ি খেয়ে নিচু একটা গর্তে পড়ে যায়। সেখানে কোমর সমান পানি ছিল। সেই পানিতে সে ঘণ্টাখানেক বসে থাকে। মিলিটারি দলটি তখনও তার আশেপাশেই ছিল। অনেক সময় হয়ে গেলেও ওরা সেখান থেকে যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পরই বদি খুব কাছেই তাদের কথাবার্তা শুনতে পায়। বদিউজ্জামান এর মানে বুঝে উঠতে পারে না। সে একসময় মাথা উঁচু করে দেখতে চেষ্টা করল। তার মনে হলো মিলিটারি জঙ্গলা মাঠ ঘিরে বসে আছে। তার শীত শীত করতে লাগল আর অনেকক্ষণ বসে থেকে গা কুটকুট করছিল। তখন সবুজ রঙের একটা গিরগিটি চোখ বড় বড় করে তাকে দেখছিল।পানি থেকে পচা গন্ধ আসছিল। বদিউজ্জামান গিরগিটিটা তাড়াতে একটু শব্দ করলে নীলগঞ্জের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলির শব্দ আসতে থাকে। জঙ্গলা মাঠের প্রতিকূল পরিবেশ বদিউজ্জামানকে একসময় সাহসী করে তোলে। সে যেন জঙ্গলের ক্ষতিকর পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। গিরিগিটিটা তাকে বারবার বিরক্ত করলে বদিউজ্জামান তাকে তাড়িয়ে দেয়। একটি শেয়াল আরেকটি শেয়ালকে নিয়ে এলে সে এগুলোকে দেখে মজা পায়। মিলিটারির ভয়ও সে একসময় কাটিয়ে ওঠে। সে ঠিক করে রাখে মিলিটারি যখন তাকে মেরে ফেলবে তখন সে মিলিটারির সঙ্গে কুশল বিনিময় করার চেষ্টা করবে। আবার শেয়াল দেখে উচ্চ স্বরে হাসতে থাকে। এখানে শেয়াল যেন শত্রুর প্রতীক। আর সেই শত্রুকে দেখে ভয় না পেয়ে বদিউজ্জামান শব্দ করে হাসতে থাকে।
"আপনারা মৌলবি মুসল্লিরা বেশি কথা বলেন আর ঝামেলা সৃষ্টি করেন।"- কথাটি রফিক ইমাম সাহেবকে বলেছে। পাকিস্তানি মিলিটারি নীলগঞ্জ গ্রামে এসে স্কুলঘরে অবস্থান নেয়। তারপর মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ গ্রামের দুজন বিদেশি মানুষ ইমাম সাহেব ও আজিজ মাস্টারকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকে রাখেন। একদিন মেজর এজাজের নির্দেশে রফিক হঠাৎ ইমাম সাহেব ও আজিজ মাস্টারকে তার সঙ্গে যেতে বলে। ইমাম সাহেব ভীতস্বরে জানতে চায়, কোথায় যেতে হবে। রফিকের মুখ তখন অস্বাভাবিক গম্ভীর দেখা যায়। ইমাম সাহেব তাই দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার সাহস পায় না। তবুও আবার জিজ্ঞেস করে কোথায় যেতে হবে। রফিক জবাব দেয় বিলের কাছে। ইমাম সাহেব সেখানে যাওয়ার কারণ জানতে চায়। 'তখন সে বলে মেজর সাহেব নিয়ে যেতে বলেছেন। ইমাম সাহেব আবার জানতে চায় কীসের জন্য যেতে বলেছেন। তখন সে বলে এতকিছু তাদের জানার কোনো দরকার নেই। মেজর সাহেব অপেক্ষা করছেন। আজিজ মাস্টার কোনো কথা বলেননি। নিঃশব্দে বেরিয়ে যান। সবার শেষে বের হন ইমাম সাহেব। স্কুলঘরের বারান্দায় কেউ ছিল না। চারদিকে ধু ধু করছিল। তাই ইমাম সাহেব অবাক হয়ে জানতে চান এরা সব গেল কোথায়। ইমাম সাহেবের এত প্রশ্ন শুনে রফিক তাকে বেশি কথা বলতে নিষেধ করে। মূলত রফিক সাহেবের এমন অতিরিক্ত কথা বলার কারণেই রফিক প্রশ্নোক্ত কথাটি বলে।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করেই গ্রামের মানুষকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতে থাকেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ান ও অফিসারেরা তার দুজন মিলিটারি অফিসারকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে একজন তার বন্ধু মেজর বখতিয়ার। মেজর এজাজের ধারণা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দলটি জঙ্গলা মাঠে লুকিয়ে আছে। নীলগঞ্জ গ্রাম থেকেই তাদেরকে খাবার দেওয়া হচ্ছে, বিভিন্ন খবর পৌঁছানো হচ্ছে। তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানার জন্য মেজর এজাজ গ্রামের নিরপরাধ মানুষগুলোকে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। ইমাম সাহেব ও আজিজ মাস্টারকে সেজন্যই ডেকে নিয়ে টিচার্স রুমে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। তারা দুজনই অন্য এলাকা থেকে চাকরির সুবাদে নীলগঞ্জ গ্রামে থাকত। তাই গ্রামের সবকিছু তারা জানে না। অথচ মেজর তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার জন্য নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। তারা কিছুই জানে না সেজন্য কিছু বলতেও পারে না। এ ব্যাপারে রফিকও আজিজ মাস্টার এবং ইমাম সাহেবের পক্ষে কথা বলে। কিন্তু মেজর এজাজ এটা মানতে নারাজ। তাই সে তাদের কাছ থেকে যেভাবেই হোক তথ্য নেওয়ার জন্য তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। ইমাম সাহেবকে চড় মেরে ফেলে দেয়। আজিজ মাস্টারকেও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ তার অফিসারদের হারিয়ে এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পাগলের মতো আচরণ করে। এর অংশ হিসেবে সে মানুষকে ভয় দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে চায়। আর এজ্যই মেজর মনার বিচার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মনার শাস্তি দেখানোর জন্য আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেবকে ডেকে নিয়ে যায় বিলের কাছে। মনার সঙ্গে তার ছোট ভাই বিরুকেও গুলি করে মারার নির্দেশ দেয় মেজর এজাজ নামের পাষণ্ড ব্যক্তিটি। এভাবে সে নিষ্ঠুরতার একটি নমুনা দেখাতে চায়। সে মনে করে এমন ঘটনা দেখলে গ্রামের সবাই মিলিটারির নাম শুনলেই ভয়ে কাপড় নষ্ট করে দেবে, গর্ভবতী মেয়েদের গর্ভপাত হয়ে যাবে। তাই মেজর এজাজ মনা ও তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড সবাইকে দেখাতে চায়। উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
মীর আলি '১৯৭১' উপন্যাসের একটি বৃদ্ধ ও অন্ধ চরিত্র। ছেলে, ছেলের বউ অনুফা ও এক নাতনি পরীবানুকে নিয়ে তাদের ছোট সংসার। বৃদ্ধ হওয়ায় বিভিন্ন সময় মীর আলিকে ছেলে বদিউজ্জামান কিংবা ছেলের বউ অনুফার সহায়তায় জীবনযাপন করতে হয়। অন্যদিকে গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করলে সকলে ভয়ে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেও মীর আলি তার ব্যক্তিগত চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। সে বলতে চায় মিলিটারির আগমনে তার স্বাভাবিক জীবনযাপনকে অস্বীকার করতে পারবে না। কেননা তাদের আগমনে তার পেটের ক্ষুধা থেমে নেই। খিদের যন্ত্রণায় সে অস্থির। তাই সে অনুফাকে কয়েকবার ভাতের কথাটা বলেছে। কিন্তু অনুফার এদিকে কোনো খেয়াল নেই। গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করায় সে চিন্তিত, আবার তার স্বামী বদিউজ্জামানেরও কোনো খোঁজ পাচ্ছে না। এমতাবস্থায় ভাত রাঁধায় তার কোনো ইচ্ছা নেই। ফলে মীর আলি নিরুপায় হয়ে অন্য উপায়ে নিজের পেটের খিদে মেটানোর চেষ্টা করে। আর সেটি হলো মুড়ি চিবানো। এজন্যই মীর আলি এক থালা মুড়ি নিয়ে উঠানে বসেছিল।
"ভাত রাঁধায় অনুফার মন না থাকা যেন মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রামের মা-বোনদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার দিকটিকেই নির্দেশ করে।"- মন্তব্যটি যথার্থ। '১৯৭১' উপন্যাসটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে রচিত। উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গ্রামীণ অঞ্চলের বাস্তবচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। উপন্যাসের কাহিনি ও ঘটনাগুলো মহান মুক্তিযুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাকেই স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে। এ উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনা যেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অমানবিকতা ও পাশবিকতার চিত্রগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব ঘটনা কোনো হৃদয়বান মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। এগুলো যেকোনো হৃদয়কে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেবে। যেকোনো মানুষকে করে তুলবে মর্মাহত ও শোকাহত।
'১৯৭১' উপন্যাসে পাকিস্তানি মিলিটারির পাশবিক আচরণের বিভিন্ন ঘটনা ফুটে উঠেছে। এ উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করে তারা একটি অন্যায়ের রাজত্ব কায়েম করে। পুরো গ্রামে তারা ভয়ের বাতাস ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে গ্রামের প্রতিটি মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। গ্রামের একজন মানুষ হিসেবে অনুফার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারির নৈরাজ্য ও নির্মম নির্যাতন চালানোর খবরে সেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। এভাবে সে হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মা-বোনদের প্রতীক।
তার বুড়ো শ্বশুর মীর আলি বেশ কয়েকবার তাকে ভাত রেঁধে দিতে বললেও সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। একদিকে মিলিটারির নির্মম নির্যাতন, অন্যদিকে স্বামী বদিউজ্জামানের কোনো খোঁজ না পাওয়া অনুফাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। অনুফা যেন স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের মমতাময়ী মা-বোনের। এভাবেই তারা দেশের সন্তানদের জন্য তাদের প্রিয় মানুষগুলোর জন্য চিন্তিত হয়েছিলেন। প্রিয়জনদের জন্য এভাবেই তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ফলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
"দাদা, বড় ভয় লাগে!"- এ কথাটি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনার ছোট ভাই বিরু বলেছিল। মনা চিত্রা বুড়ির ছেলেকে খুন করে। তাই চিত্রা বুড়ির অভিযোগের ভিত্তিতে, মেজর এজাজ মনাকে সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে শাস্তি দিতে চায়। মনাকে যখন শাস্তি দেওয়ার জন্য বিলের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তার সঙ্গে এগারো বছরের ছোট ভাই বিরুও যায়। বিরু ছোট হলেও বুঝতে পারে তার ভাইকে মিলিটারিরা মেরে ফেলবে। তাই সে মনার লুঙ্গির এক প্রান্ত শক্ত করে ধরে রাখে। একপর্যায়ে মেজর এজাজ নিষ্ঠুরতার একটা নমুনা দেখানোর জন্য বিরুকেও মনার সঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করার নির্দেশ দেয়। রাজাকাররা মনা আর বিরুকে ঠেলে পানিতে নামিয়ে দেয়। বিরু তার ভাইয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে রাখে। সে খরথর করে কাঁপতে থাকে। রাইফেল তাক করামাত্র বিরু চিৎকার করে তার ভাইকে বলতে থাকে যে, তার ভয় লাগছে। বিরু তার ভয় বোঝাতেই প্রশ্নোক্ত কথাটি তার ভাই মনাকে বলে।
'১৯৭১' উপন্যাসটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকে অরলম্বন করে রচিত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জন্য একদিক দিয়ে যেমন গর্বের, আনন্দের অপরদিকে আবার বেদনার। '১৯৭১' উপন্যাসে বেদনার এ মর্মান্তিক দিকগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এ উপন্যাসে গ্রামের মা-বোনদের উপর মিলিটারির যে নির্মম নির্যাতন লক্ষ করা যায় তাতে তাদের পাশবিকতার স্বরূপটি উন্মোচিত হয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারীলোভী দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। তাদের মধ্যে মেজর এজাজ থেকে নিয়ে মিলিটারি সুবাদার পর্যন্ত প্রত্যেকেই হীন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। নারীর প্রতি হানাদার বাহিনীর লোভী দৃষ্টিভঙ্গির দিকটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে মেজর এজাজের মধ্যে। তার কথাবার্তায় নারীদেহের প্রতি তার লোভী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ লক্ষ করা যায়। মনার সঙ্গে যখন সে কথা বলে তখন মনার স্ত্রীর সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে চায়। আবার 'বলে মনা তার স্ত্রীকে শাস্তি না দিয়ে ভালো করেছে। কেননা কোনো সুন্দরী নারীকে শাস্তি দেওয়ার কোনো মানে নেই।
মিলিটারির আসল রূপ ধরা পড়ে সফদরউল্লাহর চালাঘরের নির্মম ঘটনায়। ঝড়ের সময় একজন মিলিটারি সুবাদার ও তিনজন রাজাকারের একটি দল ছুটতে ছুটতে সফদরউল্লাহর চালাঘরে এসে উঠেছিল। ওরা ঘরে ঢুকেই টর্চ টিপল। সেই টর্চের আলো পড়ল জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও তার ছোট বোনের মুখে। তখন মিলিটারি তার বাসনা পূরণ করার জন্য তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। ঝড়ের জন্য দুই বোনের চিৎকার বাইরের কেউ শুনতে পায়নি। মেজর এজাজ ও তার সৈন্যদের নারীদের নিয়ে মন্তব্য ও পাশবিক আচরণ মূলত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চিরাচরিত নারীর প্রতি লোভ ও পাশবিক আচরণের দিকটিকেই নির্দেশ করে।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলু সেনের পূর্বপুরুষ নিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে একটা মিথ প্রচলিত আছে। নীলু সেনের পূর্বপুরুষ চন্দ্রকান্ত সেন সুসং দুর্গাপুরের মহারাজার নায়েব ছিলেন। নীলগঞ্জ গ্রামে মস্ত এক পাকা বাড়ি বানিয়ে গৃহপ্রবেশের দিন তিনি সর্পাঘাতে মারা যান। মৃত্যুর পর তার উপার্জিত ধন-সম্পদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। লোকশ্রুতি মতে, সোনাদানা পিতলের কলসিতে ভরে তিনি যখ করে গেছেন। তার উত্তরাধিকারীরা প্রচুর খোঁজাখুঁজি করেও ধন-সম্পদের কোনো সন্ধান পায়নি। গ্রামের মানুষজন নীলু সেনের পরিবারের এই কাহিনিটি রহস্যময় বলে বিশ্বাস করে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাড়িতে বর্তমানে নীলু সেন ও তার ভাগ্নে বলাই বসবাস করে। অত্র অঞ্চলের অন্যতম ধনাঢ্য এ পরিবারটি সম্পর্কে গ্রামের-মানুষের প্রবল কৌতূহল ও রহস্যময় ধারণা লেখক এ উপন্যাসের বর্ণনায় তুলে ধরেছেন।
'১৯৭১' উপন্যাসে মিলিটারি মেজরের নির্দেশে ইমাম সাহেবকে ধরে নিয়ে আসা হয় ক্যাম্পে। অত্যন্ত ধর্মভীরু ও নিরীহ এ মানুষটি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে আটক হয়ে চরম বিচলিত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে সেনারা নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টারকে ধরে নিয়ে আসে। তিনি টিচার্স রুমে এসে ইমামকে রক্তাক্ত ও শারীরিকভাবে নির্যাতিত অবস্থায় আবিষ্কার করেন। হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে ইমাম সাহেবের নাক-মুখ ফুলে গেছে, ঠোঁট কেটে গেছে, পাঞ্জাবিতে রক্তের দাগ এবং কাটা ঠোঁট দিয়ে হলুদ রঙের রস বের হচ্ছে। পাকিস্তানি সেনারা মুসলমান হওয়ায় তারা সাচ্চা মুসলিমদের ক্ষতি করে না বলে যে বিশ্বাস বাঙালিদের মনে ছিল তা ভূলুণ্ঠিত হয় ইমামের চরম নির্যাতিত অবস্থার মাধ্যমে।
মেজরের ধারণা ছিল গ্রামের ইমাম সাহেব মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য জানেন। তাই তাকে নির্যাতন করে তথ্য বের করার চেষ্টা করে তারা। মনা ও বিরুকে হত্যা করে ইমামের মনে ত্রাসের সঞ্চার করার চেষ্টা করা হয়। ইমাম সাহেবকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে তিনি মেজরের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেন না এবং তার প্রশ্নের বাণে ক্ষতবিক্ষত হন। মেজরের উপর্যুপরি আঘাতের পরও. তিনি পাকিস্তানের পক্ষে সাফাই গাননি। তিনি বিপদ থেকে পরিত্রাণ কামনা করলেও নিজের দেশমাতৃকার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। ইমাম সাহেব চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন শুধু বাঙালি হওয়ার কারণে। '১৯৭১' উপন্যাসে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের উপর পাকবাহিনীর সর্বব্যাপী আগ্রাসনের চিত্র অঙ্কন করেছেন যা ইমাম সাহেবের মতো চরিত্রগুলোর মাধ্যমে উঠে এসেছে। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করা প্রসঙ্গে মতি মিয়া ইমাম সাহেবকে উদ্দেশ্য করে উক্তিটি করেছে। মতিগঞ্জ গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব ভোরবেলায় ফজরের নামাজের পূর্বে মসজিদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সূরা ইয়াসিন পড়ার সময় মিলিটারির পদচারণা লক্ষ করেন। তিনি দেখেন মিলিটারি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের দিকে যাচ্ছে। ইমাম সাহেব গ্রামে মিলিটারি আসার বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেন না। নামাজ শেষে মতি মিয়াকে তিনি জিজ্ঞেস করেন স্কুলঘরে অবস্থান নেওয়া মিলিটারিদের সে দেখেছে কি না। কিন্তু মতি মিয়া কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চায় না গ্রামে মিলিটারি আসার বিষয়টি, কারণ তার শালা নিজামের বড় ভাই তাকে নিশ্চিত করেছে যে নান্দাইল রোডেও এখনও মিলিটারি আসেনি। ইমাম সাহেবের চোখের দেখাকে সে অস্বীকার করতে চায়, কারণ তার মতে মিলিটারিরা সোজা জিনিস নয় এবং তারা এলে এতক্ষণে গুলি শুরু হয়ে যেত। প্রশ্নোক্ত কথাটির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন মতি মিয়ার ধারণার প্রকাশ ঘটেছে অন্যদিকে আবার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার প্রকাশও ঘটেছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সর্বস্তরের বাঙালিদের উপর নির্মম আগ্রাসন শুরু করেছিল। দেশের বৃহৎ শহরগুলোর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও শুরু করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। '১৯৭১' উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ নীলগঞ্জ গ্রামের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহকে সুবিন্যস্ত করেছেন। বাঙালিদের উপর আগ্রাসনের ক্ষেত্রে তারা ধর্মকেও পাত্তা দেয়নি। মসজিদ, মন্দির থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়েছে মানুষজনকে।
নীলু সেনের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মেজর এজাজ কালীমন্দির দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বাঙালিদের পঁচাত্তর ভাগ হিন্দু এবং বাকি পঁচিশ ভাগ মুসলিম বলে মন্তব্য করেন। মেজর সাহেব দীর্ঘ সময় মূর্তি নিরীক্ষণ করে এর পিছনে কেউ লুকিয়ে আছে বললেন। যে ব্যক্তি মূর্তির পিছনে আশ্রয় নিয়েছে মেজরের মতে সে বিশ্বাস করে যে দেবী তাকে মিলিটারির হাড় থেকে রক্ষা করবে। পাকিস্তানি মেজর বাঙালি হিন্দুর এমন বিশ্বাসকে তির্যকভাবে ব্যঙ্গ করলে তার সহকারী রফিক প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছে। বাঙালিদের মাঝে একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে যারা সাচ্চা মুসলিম, নামাজ-কালাম পড়ে মিলিটারিরা তাদের কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু তাদের এই ধারণা ভেঙ্গে দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি মুসলিমদের উপর নির্মম আগ্রাসন চালিয়েছে। তাই রফিকের মতে অনেক জায়গায় মসজিদ থেকে মুসল্লিদের টেনে বের করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের রক্ষা করতে পারেননি। পাকবাহিনী বাঙালিদের উপর যে গণহত্যা চালিয়েছে তাতে ধর্ম রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারেনি। তাই বাঙালি হিন্দুদের মতো মুসলমানরাও পাকিস্তানিদের নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক দেখাতে চেয়েছেন পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালিদের উপর যে আগ্রাসন চালিয়েছে তা সর্বব্যাপী আগ্রাসন ছিল। সেখানে ধর্মের কোনো বেড়াজাল ছিল না। পাকিস্তানিরা হিন্দু বা মুসলিম বলে নয়, যে বাঙালি তার প্রতিই তাদের বিদ্বেষ। মূলত প্রশ্নোক্ত কথাটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে ধর্ম ছিল পাকিস্তানিদের মুখোশ মাত্র। ওদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি ছিল না। যা ছিল তা হলো বাঙালি বিদ্বেষ।
'১৯৭১' উপন্যাসে সফদরউল্লাহ আলোচ্য উক্তিটি দ্বারা পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি তার প্রতিশোধস্পৃহা ব্যক্ত করেছে। মিলিটারিরা নীলগঞ্জ গ্রামে এসে স্কুলঘরে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং গ্রামের সাধারণ মানুষের উপর নিপীড়ন চালাতে থাকে। হঠাৎ ঝড় শুরু হলে একজন মিলিটারি সুবাদার ও তিনজন, রাজাকারের একটি দল ছুটতে ছুটতে সফদরউল্লাহর চালাঘরে আশ্রয় নেয়। সফদরউল্লাহ তখন পরিবারের নারীসদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ করতে গ্রামের মাতব্বর জয়নাল মিয়ার বাড়িতে অবস্থান করছিল। সুবাদার ও রাজাকাররা সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও তার বোনের সম্ভ্রমহানি করে। এরপর সফদরউল্লাহ প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে দুজনকে খুঁজতে থাকে যাদের মধ্যে একজন তালগাছের মতো লম্বা ও গোঁফওয়ালা এবং অন্যজন বাঙালি যার মুখে বসন্তের দাগ আছে। তাদের শাস্তি দিতে অর্থাৎ নিজের স্ত্রী ও শ্যালিকার সম্ভ্রমহরণের প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর সফদরউল্লাহ প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছে।
ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ '১৯৭১' উপন্যাসে চরিত্রগুলোকে অনুপম শিল্পকুশলী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিনির্মাণ করেছেন। সংলাপনির্ভর এ উপন্যাসে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মধ্যে অন্যতম গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজ মাস্টার। অত্যন্ত নিরীহ ও নির্বিরোধী এ চরিত্রটি পাকিস্তানি মেজরের নির্মম নির্যাতন ও জেরার মুখে বিপন্ন হয়েছিল। মৃত্যুভয়ে ভীত আজিজ মাস্টার প্রথমদিকে ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতে না পারলেও পরে সংকটময় মুহূর্ত প্রবল ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সংকটময় পরিস্থিতি তার ব্যক্তিত্বের রূপান্তর ঘটিয়েছে।
নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারিরা প্রবেশ করার পর মেজর স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করে আজিজ মাস্টারকে ডেকে নেন। তাকে প্রচুর সময় ও ধৈর্য নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন মেজর এজাজ আহমেদ। তিনি তাকে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু আজিজ মাস্টার মেজরের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেন না। তখন তাকে ইমাম সাহেবের সাথে স্কুলের টিচার্স রুমে আটকে রাখা হয়। আজিজ মাস্টারের জয়নাল মিয়ার মেয়ে মালার প্রতি অনুরাগের কথা শুনে মেজর তাদের বিয়ে দিতে চান। মেজরের বক্তব্যের চাতুর্য আজিজ মাস্টার বুঝতে পারেনি। মনা কৈবর্ত ও তার ভাই বিরুকে মাস্টারের চোখের সামনে হত্যা করে ত্রাস সৃষ্টি করেন মেজর এজাজ। তার উদ্দেশ্য ছিল আজিজকে ভয় দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করা।
দ্বিতীয় পর্যায়ের জেরায় আজিজ মাস্টারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। তবুও সে প্রাণের ভয়ে শারীরিক নিপীড়ন সহ্য করে নেয়। বাঙালিদের অথর্ব, ভীতু প্রমাণিত করার জন্য মেজর এজাজ ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে নিপীড়ন করেছেন। আজিজ মাস্টারকে বিবস্ত্র করে তার সম্মান নিয়ে তিরস্কার করেছেন। এমনকি মাস্টারের পুরুষাঙ্গে ইটের টুকরা বেঁধে মালার সামনে উপস্থিত করতে চান মেজর। তখন আজিজ মাস্টার মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে মেজরের কাছে তাকে হত্যা করতে বলে। জনসম্মুখে বিবস্ত্র করে উপস্থাপনের পর যে সম্মানহানি তারপর তার বেঁচে থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পায়নি আজিজ মাস্টার। তাই সাধারণ ভীতু গ্রামের মানুষ হয়েও সে তার ভয়কে অতিক্রম করতে পেরেছে। তাই বলা যায়, "স্কুলশিক্ষক আজিজ মাস্টার মৃত্যুভয়কে জয় করে সাহসিকতায় উত্তীর্ণ হয়েছে"- মন্তব্যটি যথার্থ।
'১৯৭১' উপন্যাসে অন্যতম একটি চরিত্র হলো নীলু সেন। কাহিনির পরম্পরায় উপন্যাসে দেখা যায়, নীলু সেন গত রাতে এক পলকের জন্যও ঘুমাতে পারেননি। তিনি দোতলায় তার শোয়ার ঘরের বারান্দায় সারা রাত গড়াগড়ি করেছেন। নীলু সেনের ভাগ্নে বলাই মামার সংকটজনক অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই রাত দুটোর সময় সে ঠিক করে মামার জন্য ডাক্তার আনতে সরাইল রাজারে যাবে। পথঘাট শুকনা থাকায় সে বদিউজ্জামানের সাইকেল নিয়ে যেতে চায়। অসুখের তাড়নায় নীলু সেন তখন প্রলাপ বকতে শুরু করেন। তার মনে হয়েছে তিনি আর বেশি সময় বাঁচবেন না তাই বুলাইকে পাশে রাখতে চেয়েছেন। নীলু সেন তলপেটের ব্যথায় কাতর হওয়ায় মুখ দিয়ে গাঁজলা বের হতে থাকে। অর্থাৎ প্রবল পেটের ব্যথার কারণে মরণাপন্ন হওয়ায় নীলগঞ্জের নীলু সেন সেই রাতে এক পলকের জন্যও ঘুমাতে পারেননি।
হুমায়ূন আহমেদের '১৯৭১' উপন্যাসটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত। ময়মনসিংহ জেলার এক দুর্গম গ্রাম নীলগঞ্জ এ উপন্যাসের কেন্দ্রভূমি। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকের সময়কালকে ধারণ করে এর ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে।
নীলগঞ্জ গ্রামে অতর্কিতে পাকসেনাদের আগমন ও বাঙালিদের উপর নির্যাতন-নিপীড়নের বিষয়গুলো ঐতিহাসিক তথ্যকে উপজীব্য করেছে। পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালিদের উপর নির্যাতনের জন্য রাজাকার বাহিনী গঠন করেছিল। এমনকি এদেশীয় কিছু লোক নিজের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় পাকবাহিনীকে সাহায্য করতে বাধ্য হয়েছে। ঔপন্যাসিক বাঙালিদের উপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ, নারীদের শ্লীলতাহানি প্রভৃতি বিষয় আলোচ্য উপন্যাসে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করেছেন।
পাকস্তানি মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করার পর গ্রামের মসজিদের ইমাম ও স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা, গ্রামের মাতবর জয়নাল মিয়াকে জেরা করা এরকম নানা বিষয় উপন্যাসে উঠে এসেছে। সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের উত্তরসূরি নীলু সেনকে নির্মমভাবে হত্যা, হত্যাকাণ্ডের বিচারের ধুয়া তুলে মনা কৈবর্ত ও বিরু কৈবর্তকে হত্যা, সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকার সম্ভ্রমহানি প্রভৃতি বিষয় যেন মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ঘটনার প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বাঙালি মৃত্যুভয়ে পালিয়ে ছিল। যে বিষয়টি বদিউজ্জামানের পালিয়ে থাকার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। পাকিস্তানি সেনারা মুসলমানদের হত্যা করে না বলে যে মিথ প্রচলিত ছিল তা সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন ঔপন্যাসিক। ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নিজস্ব বয়ান রচনা করেছেন। ইতিহাসের খেরো খাতা থেকে অকপটে তথ্য গ্রহণ করেছেন।
মেজর এজাজ আহমেদের মনস্তত্ব সম্পর্কে আলোচনা ও বিশ্লেষণ, রফিক চরিত্রটিকে রহস্যময় করে নির্মাণ লেখকের কল্পনার ফসল। লেখক তাঁর কল্পনায় মেজরের চরিত্রকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন যিনি একই সাথে নিষ্ঠুর ও বুদ্ধিমান। মুক্তিযুদ্ধের সময়টিকে ভিন্ন মাত্রায় পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন এ উপন্যাসে। তাই বলা যায়, '১৯৭১' উপন্যাসটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার সাথে ঔপন্যাসিকের কল্পনার অনবদ্য মেলবন্ধন। মন্তব্যটি যৌক্তিক।
উপন্যাসের নাম রাখা হয়েছে '১৯৭১'। উপন্যাসের আরম্ভ হয়েছে প্রান্তিক এলাকা নীলগঞ্জের পটভূমিতে। ময়মনসিংহ-ভৈরব লাইনের স্টেশন নান্দাইল রোড থেকে সোজা উত্তরে দশ মাইল গেলে পাওয়া যায় বুয়াইল বাজার। এই বাজারকে পিছনে ফেলে আরও মাইল ত্রিশেক উত্তরে মধুবন বাজার। এখানে যাতায়াতের একমাত্র ব্যবস্থা হচ্ছে গরুরগাড়ি। তাও শীতকালে। বর্ষাকালে হাঁটা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কারণ রাস্তা খুব খারাপ। নদীনালা নেই যে নৌকা চলবে। নদীনালাবিহীন এই অঞ্চলকে ঔপন্যাসিক অভিহিত করেছেন উজান দেশ বলে। মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড়, বিল ও নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ এলাকা ভাটি অঞ্চল নামে পরিচিত। '১৯৭১' উপন্যাসে উজান দেশ বলতে ভাটি অঞ্চলের বাইরের এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। যেখানে নদীনালা, হাওড়, বিল প্রায় নেই বললেই চলে। অর্থাৎ জলবেষ্টিত এলাকার প্রতিকূল বা বিপরীত দিকে অবস্থিত দেশই এখানে উজান দেশ হিসেবে অভিধা লাভ করেছে।
'১৯৭১' উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল চরিত্র হচ্ছে রফিক। উপন্যাসে রফিক মেজর এজাজ আহমেদের সহযোগী। পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে থেকেও সে কাজ করে গেছে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে। বিভিন্ন সময়ে মেজর এজাজ আহমেদের বিরোধিতা করে হয়ে উঠেছে প্রতিবাদী চরিত্র। তবে শেষ পর্যন্ত লেখক রফিক চরিত্রের গূঢ় তত্ত্ব রেখে দিয়েছেন ধোঁয়াশার মধ্যেই। তাই রফিক চরিত্রটিকে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে রফিক রোগা ও বাঙালির মতো। যার গায়ে আছে চকচকে নীল রঙের একটি শার্ট। রফিক নীলগঞ্জ গ্রামে আগে কখনো আসেনি। কিন্তু তার সম্পর্কে লেখক বর্ণনা করেছেন, সে হাঁটছে মাথা নিচু করে। এমনভাবে হাঁটছে যেন পথঘাট ভালো চেনা। লেখক বর্ণনার মধ্য দিয়েই ক্রমান্বয়ে রফিক চরিত্রকে করে তুলেছেন রহস্যময়।
উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, উপন্যাসের সর্বাধিক জটিল চরিত্র হচ্ছে রফিক। তাকে বাস্তব হিসেবে না পড়ে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে পড়াই শ্রেয়। উপন্যাসে লেখক পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, রফিক কখনো নীলগঞ্জ গ্রামে আসেনি অথচ সে এমনভাবে কাজ করেছে যেন শুধু এ গ্রামের রাস্তাঘাট নয়, মানুষজন এবং প্রাকৃতিক অবকাঠামোও তার খুবই চেনা। ইমাম সাহেব তার কাছে জানতে চান যে সে কোন এলাকার মানুষ। কিন্তু রফিক কোনো জবাব দেয়নি। মেজর এজাজ আহমেদের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও 'আমরা' হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে রফিক। সেই সাথে হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের যেকোনো গ্রামের যেকোনো রফিক।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে পরিশেষে আমরা একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, রফিক চরিত্রটিকে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে পড়ার নিগূঢ় আমন্ত্রণ রয়েছে '১৯৭১' উপন্যাসে।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করে ১৯৭১ সালের পহেলা মে তারিখে। পাকিস্তানি মিলিটারি নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলঘরে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। স্কুলের দপ্তরি ও দারোয়ান রাসমোহনের মাধ্যমে তারা আজিজ মাস্টারের কাছে খবর পাঠায় দেখা করতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু হাঁপানির রোগী আজিজ মাস্টার একা মিলিটারির সাথে দেখা করতে যাওয়ার সাহস পায়নি। তাই ছয়জনের একটি দল পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে স্কুলে মিলিটারিদের সাথে দেখা করতে যায়। কিন্তু মিলিটারি মেজর এজাজ আহমেদ আজিজ মাস্টার বাদে বাকি সবাইকে স্কুল থেকে চলে যেতে বলেন। তখন ছয়জনের দলের মধ্যে জয়নাল মিয়াসহ পাঁচজন স্কুল থেকে ফিরে গিয়ে ছাতিম গাছের নিচে আজিজ মাস্টারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
হুমায়ূন আহমেদ রচিত অন্যতম উপন্যাস '১৯৭১' এর পটভূমি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় নীলগঞ্জের মতো প্রান্তিক অঞ্চলে যুদ্ধের কোনো প্রভাব সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সেই এলাকার যুদ্ধের বর্ণনা করেছেন নিপুণভাবে। যেখানে যুদ্ধের ময়দানে কেবল এক পক্ষ উপস্থিত। নীলগঞ্জ এলাকার এক পক্ষ তথা পাকিস্তানি বর্বরতার কিছু দৃশ্য লেখক এ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন বাস্তবধর্মী করে। কাজেই '১৯৭১' উপন্যাসে সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধের চিত্র পাওয়া যায় না, কিছু খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়।
'১৯৭১' উপন্যাসের কাহিনি শুরু হয়েছে নীলগঞ্জ গ্রামের অদ্ধ বৃদ্ধ মীর আলির বর্ণনার মধ্য দিয়ে। লেখক খুব বেশি বর্ণনা না দিয়ে দ্রুতই জানিয়ে দিয়েছেন গ্রামে মিলিটারি প্রবেশের কথা। গ্রামে মিলিটারি এসে স্কুলঘরে আশ্রয় নিয়েছে। তারপর স্কুলের দপ্তরি রাসমোহনকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে আজিজ মাস্টারের কাছে। স্কুলঘরে বন্দি রেখে গ্রামের ইমাম সাহেব ও আজিজ মাস্টারের কাছে তথ্য সংগ্রহ পাশাপাশি গ্রামের কিছু খণ্ডচিত্র বর্ণনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে উপন্যাসের কাহিনি। অল্প বর্ণনার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক মুক্তিযুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। নীলগঞ্জ গ্রামের পটভূমিতে রচিত এ উপন্যাস স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে গ্রামের মানুষের যাপিত জীবনের কিছু চিত্র।
'১৯৭১' উপন্যাসের সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপন্যাসটি প্রাথমিকভাবে যুদ্ধের কাহিনি, মুক্তিযুদ্ধের নয়। মুক্তিযুদ্ধটা আবিষ্কৃত হয়েছে পরে, যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। নীলগঞ্জ গ্রামের মতো অসংখ্য গ্রাম ও শহরের কাহিনি, মেজর এজাজ আহমেদের মতো আরও অনেক মিলিটারি সুবাদার, রফিক, জয়নাল, মতি মিয়া, নীলু সেন, বলাই, মীর আলি, ইমাম সাহেব ও আজিজ মাস্টারের মতো আরও অনেক মানুষের খণ্ড খণ্ড সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে একটি সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধ। পরিশেষে তাই বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত হলেও '১৯৭১' উপন্যাসটি সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকে নয়, বরং যুদ্ধের কিছু খণ্ডচিত্রকে ধারণ করেছে মাত্র।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সাধারণ জনতার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। '১৯৭১' উপন্যাসেও নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি নৃশংসতা চালায়। পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে এদেশের মানুষের মধ্যে কিছু ধারণা প্রচলিত ছিল। নীলগঞ্জ গ্রামে মেজর এজাজ আহমেদের নেতৃত্বে মিলিটারি প্রবেশের পর গ্রামের মানুষ অনিশ্চিত পরিস্থিতির জন্য শঙ্কিত হয়ে ওঠে। নীলগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধ মীর আলির বড় ছেলে বদিউজ্জামানের কাছ থেকে সেনাদের সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়; যা সে শুনে এসেছে নান্দাইল রোড থেকে। দলবল নিয়ে ছাতিম গাছের নিচে অপেক্ষারত জয়নাল মিয়ার কাছে সেনাদের সম্পর্কে বদিউজ্জামান বলে যে, মুসলমানদের জন্য ভয়ের কিছুই নেই, কারণ মিলিটারিরা মুসলমানদের খুব খাতির করে। তবে পাক্কা মুসলমান হওয়া লাগে। সাথে জানা লাগে চার কালেমা। সুন্নত হয়েছে কিনা এটাও দেখে। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মিলিটারি সম্পর্কে বদিউজ্জামান যে ধারণা ব্যক্ত করেছে তা অনেকাংশে সত্য, কিন্তু সর্বাংশে নয়। কারণ ধর্ম ছিল পাকিস্তানিদের মুখোশ মাত্র, আসলে তারা ছিল বাঙালি বিদ্বেষী।
পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের জাতিগতভাবেই ঘৃণা করত। বাঙালিদের তারা মনে করত হিন্দুস্তানপন্থি লোক। যার প্রতিফলন '১৯৭১' উপন্যাসেও পাওয়া যায়। মেজর এজাজ আহমেদ কোনো আড়ষ্টতা না রেখে রফিকের কাছে নিশ্চিতভাবেই বলেছেন তোমরা তথা বাঙালিরা পঁচিশ ভাগ মুসলমান মাত্র, বাকি পঁচাত্তর ভাগ হিন্দু। এর মধ্য দিয়েই মূলত বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের জাতিগত ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
'১৯৭১' উপন্যাসের মেজর এজাজ আহমেদের মতে, বাঙালিদের মান-অপমান বলে কিছুই নেই, একটা কুকুরেরও আত্মসম্মান থাকে। বাঙালিদের সেটাও নেই। মেজর এজাজের এই ধারণা বৃহত্তর অর্থে বাঙালিদের সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ধারণাকে তুলে ধরে। এই উপন্যাসে মেজর এজাজ পাকিস্তানিদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বাঙালি সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মেজর এজাজের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। ঝড়ের সময় মেজর এজাজ কালীমন্দির দেখে সেটিকে উল্লেখ করেছেন 'তোমাদের কালী মন্দির' বলে। অথচ রফিক একজন বাঙালি মুসলিম। তাদের মতে বাঙালি এবং হিন্দুদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। বাঙালিদের তিন-চতুর্থাংশই হিন্দু, বাকি এক ভাগ মুসলমান। তাদের দৃষ্টিতে তারা এতটাই অনড় যে মেজর এজাজ বলেছেন রফিক যদি কালীমন্দিরে ঢুকে মূর্তিকে প্রণাম করে পূজা করে তাহলেও সে তথা পাকিস্তানিরা বিন্দুমাত্র অবাক হবে না। তাদের দৃষ্টিতে বাঙালিদের মূর্তি পূজা করার বিষয়টি অত্যন্ত স্বাভারিক, বরং না করাটাই অস্বাভাবিক। এর মূলে রয়েছে মূলত জাতিগত ঘৃণা।
পরিশেষে বলা যায়, বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত হীনতর। এই হীন মানসিকতার কারণেই এজাজ তার সহচর রফিককে কোনো রাখঢাক না রেখেই বাঙালির জাতিগত উনতা বিষয়ে তার এবং তাদের নিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে। বাঙালি মুসলমানের মুসলমানত্ব যে মোটেই ধর্তব্যের মধ্যে নয়, বরং তারা যে প্রায় হিন্দুর কাছাকাছি এবং তাদের অধিকাংশই যে হিন্দু এ বিষয়ে মেজর এজাজ কোনো অনিশ্চয়তা রাখেননি। বৃহত্তর অর্থে যা বাঙালিদের সম্পর্কে পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরে।
নান্দাইল রোড রেলস্টেশন থেকে বুয়াইল বাজার হয়ে মধুবন বাজারে যেতে হয়। '১৯৭১' উপন্যাস যে জনপদকে ঘিরে রচিত তার নাম নীলগঞ্জ গ্রাম। ময়মনসিংহ-ভৈরব রোড হয়ে ভেতরে চল্লিশ মাইল গহিনে এই গ্রাম। অখ্যাত স্টেশন নান্দাইল রোডে মেল ট্রেন থামে না। লোকাল ট্রেন থামে মিনিট খানেকের জন্য। এই অখ্যাত স্টেশন ছেড়ে দশ মাইল ভেতরে বুয়াইল বাজার। স্থানীয় লোকজন এই বাজারটিকে নিয়ে অহংকার করে। ধান-চালের আড়ত, পাটের গুদাম, ধান ভাঙানোর কল, চায়ের দোকান থেকে রেডিও সারার কারিগর পর্যন্ত সবকিছু এই বাজারে পাওয়া যায়। বুয়াইল বাজার হয়ে মাইল ত্রিশ গেলে তবে মধুবন বাজার। যাতায়াতের একমাত্র ব্যবস্থা গরুরগাড়ি। তাও শীতকালে। বর্ষাকালে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। উজানের দেশ। তাছাড়া এই এলাকায় নদীনালা না থাকায় নৌ চলাচলের ব্যবস্থা নেই। তাই নান্দাইল রোড স্টেশন থেকে রুয়াইল বাজার হয়ে গরুরগাড়ি অথবা হেঁটে তিরিশ মাইল পাড়ি দিয়ে মধুবন বাজারে যেতে হয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে ঔপন্যাসিক কাহিনির ক্ষেত্রে কোনো নিশ্চিত মীমাংসার পৌঁছাননি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্ভাবনার বীজ বপন করে দিয়েছেন। উপন্যাসের সূচনায় ঔপন্যাসিক মতি মিয়ার শালা নিজাম আলিকে পাগল বলে উল্লেখ করেছেন। নিজাম আলিকে তিনি নিত্যদিনের পাগল বলেননি। এমনিতে নিজাম সুস্থ থাকে। শুধু মাঝে মাঝে দু-একদিন মাথা গরম হয়। মাথা গরম হলেও নিজাম কোনো কিছু ভাঙচুর করে না, কারও ওপর আক্রমণ করে না। শুধু গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছোটাছুটি করে। আর সে মধুবন জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। হুমায়ূন আহমেদ স্পষ্ট করে কিছুই প্রকাশ করেননি। অথচ মেজর এজাজ আহমেদ ঝড়ের মধ্যে মধুবন জঙ্গল থেকে নিজাম আলিকে বের হতে দেখে মুক্তিবাহিনীর সাথে নিজামের সম্পর্ক রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
দ্বিতীয়ত, আজিজ মাস্টারকে তুলে নিয়ে প্রশ্ন করলে সে সততার সঙ্গে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। এমনকি তার আশ্রয়দাতা জয়নাল মিয়ার ঘরে ট্রানজিস্টার আছে, সেই সত্যও আজিজ মাস্টার মেজর এজাজের কাছ থেকে লুকায়নি। কিন্তু স্বাধীন বাংলা বেতার শোনা প্রসঙ্গে প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি করার জন্য মেজর এজাজ আজিজ মাস্টারকে মুক্তিবাহিনীর দোসর ভেবে নেন। এর জের ধরে আজিজ মাস্টারের প্রতি বর্বরতম আত্মসম্মানহীনতার শাস্তি আরোপ করেন। অপমান সহ্য করতে না পেরে আজিজ মাস্টার মৃত্যুকে বেছে নেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত জয়নাল মিয়ার বক্তব্যে প্রকাশ পায়, আজিজ মাস্টার মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে কিছুই জানে না, জানার কথাও নয়।
তৃতীয়ত, রফিকের মতো সহযোগীকে মেজর এজাজ আহমেদ সন্দেহ করেন। রফিক নীলগঞ্জ গ্রামে এজাজ আহমেদের সফরসঙ্গী। রফিকের অপরাধ সে নীলগঞ্জবাসীর পক্ষে, বিশেষত আজিজ মাস্টারের শাস্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। বাঙালি হিসেবে আরেকজন বাঙালির প্রতি ভালোবাসা জাগার বিষয়টিকে মেজর এজাজ সন্দেহের চোখে দেখেছেন। সন্দেহকে সত্যি ভেবে নিজের দোসর রফিককেও শেষপর্যন্ত হত্যা করেছেন তিনি। তাই বলা যায় যে, '১৯৭১' উপন্যাসের কাহিনির ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ যেখানে প্রত্যক ক্ষেত্রেই বপন করেছেন সম্ভাবনার বীজ; সেখানেই মেজর এজাজ আহমেদ জানিয়েছেন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত।
স্কুলঘরে মিলিটারির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে যাওয়ার কারণ মিলিটারি কর্মকর্তার সুনজরে আসা। '১৯৭১' উপন্যাসে পাকবাহিনী ১ মে নীলগঞ্জ গ্রামে হানা দেয়। মিলিটারির ভয়ে গ্রামের মানুষ তটস্থ হয়ে পড়ে। মিলিটারি গ্রামে পৌছার পর প্রাইমারি স্কুলে তাদের ঘাঁটি বানায়। মিলিটারি কর্মকর্তা স্কুলের দপ্তরিকে হেডমাস্টারের কাছ থেকে চাবি আনতে বলে। হেডয়াস্টার আজিজুর রহমান মল্লিককে মেজর এজাজ তলব করেন। গ্রামের সবাই হেডমাস্টারকে অভয় দিলেও সে একা যেতে রাজি হয় না। ভয়ে তার হাঁপানি রোগ বেড়ে যায়। ফলে সবাই মিলে যুক্তি করে দল বেঁধে মিলিটারি ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যায়। গ্রামবাসী নিজেদের পাকিস্তানের পক্ষে বোঝাতে তারা পাকিস্তানের পতাকা ও তাদের পক্ষে স্লোগান দেয়। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছয়জনের দলটি পাকিস্তানের পতাকা হাতে স্কুলঘরে পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে দেখা করতে যায়।
"নীলগঞ্জের মতো প্রান্তিক অঞ্চলে যুদ্ধের নিপুণ বর্ণনাই। প্রমাণ-করে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক বিস্তার।" '১৯৭১' উপন্যাসের বাস্তবতায় আলোচ্য উক্তিটি তাৎপর্যপূর্ণ।
'১৯৭১' উপন্যাসে বর্ণিত নীলগঞ্জ দুর্গম এলাকা। নান্দাইল রোড নামক অখ্যাত স্টেশন থেকে চল্লিশ মাইল ভেতরে অরণ্য ঘেরা এ অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই নড়বড়ে। গরুরগাড়িতে করে আসতে হয় ত্রিশ মাইল, বর্ষাকালে সেই উপায়ও থাকে না। জনদুর্ভোগ ও বসবাসের অনুপোযোগী বলে একমাত্র প্রাইমারি স্কুলে হেডমাস্টার ছাড়া কোনো শিক্ষক টিকতে পারে না। অথচ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাসখানেকের মাথায় মে মাসের প্রথম দিনই মিলিটারি প্রবেশ করে গ্রামে। সাধারণের নির্বিকার জীবনকে তছনছ করে ফেলে মুহূর্তে।
পাক হানাদার বাহিনীর একটি ইউনিট গোপন তথ্যের সূত্র ধরে নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করে। গোপন সংবাদটি হলো পাকবাহিনীর এই ইউনিটের মেজর এজাজ আহমেদের বন্ধু মেজর বখতিয়ারকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ইউনিট জিম্মি করেছে। মুক্তিবাহিনীর সেই দলটি নীলগঞ্জ গ্রামের পার্শ্ববর্তী মধুবন জঙ্গলে অবস্থান করছে। পাকিস্তানি মিলিটারির মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামের অধিবাসীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে মুক্তিবাহিনীর খবর পেতে মরিয়া। তারা প্রথমত নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেবকে ও হেডমাস্টার আজিজুর রহমান মল্লিককে সন্দেহের বশে তুলে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ধীরে ধীরে তারা কঠোর থেকে কঠোরতর পন্থা অবলম্বন করে।
গ্রামের মাতবর গোছের লোক জয়নাল মিয়ার বক্তব্যে মেজর এজাজের অনুমানকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বাধ্য করে। জয়নাল মিয়া মুক্তিবাহিনীর কথা স্বীকার করে। তাদের মধুবন জঙ্গলেই মুক্তিবাহিনী অবস্থান করছে। তাদের সদস্যসংখ্যা একশজন প্রায়। এছাড়াও উপন্যাসের শেষে রফিকের কথাতেও স্পষ্ট হয় যে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী আছে। নীলগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতাই প্রমাণ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ লাভ করেছিল।
প্রথম সাক্ষাতে আজিজ মাস্টার মেজর এজাজকে সুদর্শন ও রফিককে রোগা শীর্ণ বাঙালি যুবক হিসেবে সাব্যস্ত করে।
গ্রামের স্কুলে ক্যাম্প বসিয়ে পাকবাহিনী প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান মল্লিককে তলব করে। হাঁপানি রোগী আজিজ মাস্টার একাকী স্কুলে আসতে ভয় পায়। তাই ছয়জনের দল নিয়ে তারা পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে। মিলিটারি ভেবে ভয় পেলেও প্রথম দেখায় আজিজ মাস্টারের কাছে মিলিটারি মেজর এজাজ আহমদকে রাজপুত্রের মতো লাগে। অত্যন্ত রূপবান পুরুষ তিনি। চোখে-মুখে কোনো ক্লান্তি ছিল না তার। তবে বসে থাকার ভঙ্গিটি ছিল শ্রান্তির। এজাজ বসেছিলেন তার সামনে রাখা টেবিলে পা তুলে। এজাজের শরীর প্রকান্ড, তবে সেই তুলনায় তার পায়ের পাতা দুটি ছোট লাগছিল। রফিক দাঁড়িয়ে ছিল এজাজ আহমেদের পাশে। আজিজ মাস্টারের কাছে রফিককে রোগা বাঙালি যুবকের মতো দেখাচ্ছিল। সে খুব ঘামছিল আর ময়লা রুমাল দিয়ে নিজের ঘাড় মুছছিল।
"মেজর এজাজের যুদ্ধকৌশল ছিল একটি জাতিকে/ জনগোষ্ঠীকে অস্তিত্বের পরীক্ষায় ফেলে দেওয়া।"- উদ্ধৃতিটি যৌক্তিক।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭১ সালের ১ মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি ইউনিট নীলগঞ্জ গ্রামে শেষরাতে নিঃশব্দে প্রবেশ করে। মেজর এজাজ আহমেদ খবর পান নীলগঞ্জ গ্রামের পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিয়েছে। তাদের হাতে আটক হয়েছেন মেজর এজাজের বন্ধু মেজর বখতিয়ার। স্কুলে ক্যাম্প বানিয়ে মিলিটারিরা আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেবকে আটকে রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানতে চায়। নিরপরাধ এই লোক দুটিকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তির মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কিত তথ্য আদায়ের প্রচেষ্টা চালানো হয়।
মিলিটারি গ্রামে প্রবেশের পর জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরল গ্রামবাসীর অনেকেই মনে করে হানাদার বাহিনী নির্দোষ কাউকে শাস্তি দেয় না। প্রথম দিকে তা-ই ঘটে। নীলু সেনকে হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। মিলিটারি সম্পর্কে জয়নাল মিয়াও মনে করে মুসলমান হিসেবে মুসলিম নারীদের শ্লীলতাহানির ভয় নেই। কিন্তু সেই রাতেই এ বিশ্বাস ভাঙতে থাকে। মিলিটারি সুবেদার তিনজন রাজাকার নিয়ে সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও বালিকা শালিকে ধর্ষণ করে। কৈবর্তদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সংশ্লিষ্টতার সূত্র ধরে কৈবর্তপাড়ায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
বাঙালিদের আত্মসম্মানবোধ নেই বলে দাবি করেন পাকিস্তানি মেজর এজাজ আহমেদ। মৃত্যুর মুখে আজিজ মাস্টারকে ঘৃন্যতম সম্মানহানির শাস্তি দেন। এতে তার সহকারী রফিক প্রতিবাদ জানায়। ফলে বাঙালি হিসেবে রফিককেও সন্দেহ করেন মেজর এজাজ। তার বন্ধু মেজর বখতিয়ার বাঙালিদের বিশ্বাস করে দুর্ভোগ বয়ে আনেন। তাই তিনি বাঙালি জাতিকে বিশ্বাসঘাতক বলে উল্লেখ করেন। জাতিগত নিন্দা মাথায় নিয়ে রফিক আর বেঁচে থাকতে চায় না। কেননা রফিক জানে মৃত্যু ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। ফলে রফিক তার জাতিগত অস্তিত্বকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে মৃত্যুকে বেছে নেয়। অসম্মানের কবল থেকে মুক্তি পেতে সম্মানের মৃত্যু গ্রহণ করেছিল আজিজ মাস্টার। রফিকও সেই পথ ধরে। আর এটাই ছিল মেজর এজাজের যুদ্ধকৌশল। জাতিগত অহংকারকে চূর্ণ করে, বল প্রয়োগ করে পাকিস্তানবাদকে প্রতিষ্ঠা করা। বাঙালি তা মেনে নেয়নি। তাই বলা যায় যে, মেজর এজাজের যুদ্ধকৌশল ছিল একটি জাতিকে অস্তিত্বের পরীক্ষায় ফেলে দেওয়া।
'১৯৭১' উপন্যাসের একটি পার্শ্বচরিত্র নিজাম আলি। নীলগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা মতি মিয়ার শালা সে। নীলগঞ্জ গ্রামের একমাত্র পাগল সে। তবে বেশিরভাগ সময়ই নিজাম আলি সুস্থ থাকে। শুধু দু-একদিন তার মাথা গরম হয়ে যায়। তখন তার গায়ে কাপড় থাকে না। গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ায়। দুপুর বেলায় রোদ খুব চড়ে গেলে সে মধুবন জঙ্গলে ঢোকে। মধুবন জঙ্গল বিষাক্ত সাপের জন্য কুখ্যাত। বর্ষায় জঙ্গলে ঢুকলে আর রক্ষা নেই। কিন্তু নিজাম আলিকে কখনো সাপে কাটে না। লেখক এ প্রসঙ্গে একটি প্রচলিত প্রবাদ উল্লেখ করে বিষয়টিকে রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেন।' প্রবাদে আছে নাকি 'পাগলকে সাপে কাটে না'। নিজাম বহাল তবিয়তেই বন থেকে বেরিয়ে আসে। ছোটাছুটি করা, বনের ভেতরে বসে থাকা ছাড়া নিজাম অন্য কোনো উপদ্রব করে না। তাকে বন থেকে বেরিয়ে হাসতে দেখলে মেজর এজাজ তাকে সন্দেহ করেন। তার সঙ্গে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের যোগসূত্র আছে বলে অনুমান করেন।
মানুষের চেয়ে গাছকে তারা বড় বন্ধু মনে করে- রফিক কথাটি বলেছে পাগল নিজাম আলির মধুবন জঙ্গলে ঘোরাঘুরি সম্পর্কে।
নীলগঞ্জ গ্রামের একমাত্র পাগল নিজাম আলি। তবে সে বেশিরভাগ সময়ই সুস্থ থাকে। মাঝেমধ্যে দু-একদিন মাথা গরম হয়ে যায়। তখন তার গায়ে কাপড় থাকে না। গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছোটাছুটি করে। দুপুরে রোদের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সে মধুবন জঙ্গলে ঢুকে পড়ে।
১৯৭১ সালের ১ মে মেজর এজাজের নেতৃত্বে পাকবাহিনীর একটি ইউনিট গ্রামে ঢোকে। গোপন তথ্যের মাধ্যমে তারা জানতে পারে নীলগঞ্জ গ্রামের পার্শ্ববর্তী মধুবন জঙ্গলে ইস্ট-বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ইউনিট সক্রিয় আছে। মুক্তিবাহিনীর এই দলটির হাতে আটক হয়েছেন মেজর এজাজের বন্ধু মেজর বখতিয়ার। মেজর এজাজ পাগল নিজাম আলিকে ঝড়ের মধ্যে মধুবনের জঙ্গল থেকে আনন্দের সাথে বের হতে দেখেন। এত তার সন্দেহ হয়, নিজাম আলির সাথে মুক্তিবাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে। মেজর এজাজের দোভাষী ও সহকারী রফিক বিষয়টিকে পাগলের কর্মকাণ্ড বলে উড়িয়ে দিতে চায়। তার মতে, পাগলরা মানুষের চেয়ে গাছকে বড় বন্ধু মনে করে। সামাজিক বন্ধন থেকে স্বাধীন বলে পাগলরা গাছপালা ও প্রাণীদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করে। কিন্তু মেজর এজাজ রফিকের এ কথা বিশ্বাস করেননি।
'১৯৭১' উপন্যাস পাঠে বোঝা যায়, নিজাম আলি মূলত পাগল নয়। মাঝেমধ্যে সে পাগলের অভিনয় করে, যাতে গ্রামবাসী তাকে সন্দেহ করতে না পারে। রফিক নিজামের পাগলামির পক্ষে কথা বলার কারণ সে চায় না নিজামের কোনো ক্ষতি হোক। তাই সে পাগল নিজামের গাছপালা তথা প্রকৃতিপ্রেমের কথা বলে তার প্রতি এজাজ আহমেদের সন্দেহকে মুছে ফেলতে চায়।
গভীর রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মীর আলি ছেলের অপেক্ষা করতে করতে একসময় বিছানাতেই প্রস্রাব করে ফেলে। এতে বিছানার একাংশ ভিজে যায়। এর আগে কখনই তার সাথে এমন ঘটেনি। যার ফলে মীর আলি অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে। মীর আলি সত্তর বছর বয়সি বৃদ্ধ মানুষ। তার কাছে বুড়ো বয়সের সবচেয়ে যন্ত্রণা রাত-দুপুরে বাইরে যেতে হয়। কিন্তু সে একা একা যেতে পারে না। অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হয়। এমনই একদিন গভীর রাতে তার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। শুরুতে তার পুত্রবধূ অনুফা তাকে সাহায্য করে এবং সে বাইরে যায়। কিন্তু কিছু সময় পর তার আবার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। ছেলেকে ডাকলেও সে আসতে দেরি করায় একসময় মীর আলি অজান্তেই বিছানায় মূত্রত্যাগ করে। আর এটাই তাকে অত্যন্ত বিচলিত বোধ করায়।
হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের উপরে যে কয়েকটি উপন্যাস, রচনা করেছে সেগুলোর মধ্যে '১৯৭১' উপন্যাসটি অন্যতম। এ উপন্যাসে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় তথা পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক সৃষ্ট অরাজক পরিবেশের বর্ণনার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কালবৈশাখিরও বর্ণনা রয়েছে। সেই ঝড়ে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে মীর আলি ও তার পরিবার। উপন্যাসের এই দুই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে মীর আলি হয়ে উঠেছে মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।
প্রথমে কালবৈশাখির আঘাত আসে বদিউজ্জামানের বিয়ের সময়। ঝড়ে গ্রামে কারও কোনো ক্ষতি না হলেও তার ঘরটি ভেঙে যায়। পরবর্তীতে যুদ্ধ চলাকালে যে কালবৈশাখির ঝড় হয় সেখানেও গ্রামের কারও কোনো ক্ষতি না হলেও তার টিনের চালা উড়ে যায়। বৃদ্ধ মীর আলির উপর নেমে আসা বারবার বিপর্যয় মিশে যায় ১৯৭১ সালের অন্যায় যুদ্ধের সঙ্গে।
প্রাকৃতিক পীড়নের পাশাপাশি মেজর এজাজ আহমেদের প্রযোজনায় অধিকতর বিপর্যয়কর যে ঘটনা ঘটেছে সেখানে তার জোয়ান ছেলে ঘরে ফিরে আসেনি, ফিরে আসার সম্ভাবনাও তিরোহিত; সেখানে মীর আলির পক্ষে সামলে ওঠার আর কোনো আশা থাকে না। ঝড় কবলিত মীর আলিকে তাই একাত্তরের অন্যায় সময়ে সংঘটিত মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে পড়াই সংগত।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে তাই বলা যায়, '১৯৭১' উপন্যাসে ঝড় কবলিত মীর আলি একাত্তরের অন্যায় যুদ্ধে সংঘটিত মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।
নীলগঞ্জ গ্রামের এক দরিদ্র, অসহায় ও বৃদ্ধ মানুষ চিত্রা বুড়ি। গ্রামের কৈবর্তপাড়ায় তার বাস ছিল। তার ছিল একটি ছেলেসন্তান। সেই ছেলে মনা কৈবর্ত নামক একজনের স্ত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মনা চিত্রা বুড়ির সেই সন্তানকে হত্যা করে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বুড়ি একা হয়ে পড়ে। ছেলে হত্যার বিচার চাইতে নীলু সেনের বাড়িতে ঘোরাঘুরি করলেও কোনো ফল হয় না। অন্যদিকে মনা কৈবর্তও তাকে হুমকি দিয়ে রেখেছিল যে থানা-পুলিশ করা যাবে না। এমতাবস্থায় বুড়ি নীলু সেনের বাড়িতে থাকতে আরম্ভ করে। কেননা কৈবর্ত পাড়ায় তাকে আর গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু তার নাকি নীলু সেনের বাড়িতে থাকতে ভালো লাগত না। তাই সে কালী মন্দিরে থাকতে আরম্ভকরে। এরপর সে ক্রমে এ-বাড়ি, ও-বাড়ি ভিক্ষা করতে শুরু করে। আর এভাবেই সে হয়ে ওঠে নীলগঞ্জ গ্রামের প্রথম ভিক্ষুক।
মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামে এসেছে মিলিটারি বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে। যারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এ গ্রামের প্রতিটি মানুষের বিরুদ্ধে। যে যুদ্ধ হলো একপাক্ষিক যুদ্ধ। নিরস্ত্র-সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে ঘোষণা করা যুদ্ধ। যার মাধ্যমে তারা আরম্ভ করে ধর্ষণ, হত্যা, লুণ্ঠন, অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন। যার উদাহরণ আমরা দেখতে পাই উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনায়।
প্রথমত নীলু সেনের হত্যাকান্ডের ঘটনায় আমরা দেখতে পাই, নীলু সেনের কোনো অপরাধ ছিল না। তার একমাত্র অপরাধ তিনি হিন্দু। কোনো রকম ন্যায়-অন্যায়ের বিচার না করে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর আমরা দেখতে পাই আজিজ মাস্টারের হত্যাকান্ড। তিনি ছিলেন নিরপরাধ। মুক্তিবাহিনী সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা তার ছিল না। তবুও শুধু সন্দেহের বশে এবং ভীতির রাজত্ব কায়েম করতে আজিজকে হত্যা করা হয়। তারপরে আমরা দেখি যে কীভাবে একজন মিলিটারি সুবাদার ও তিনজন রাজাকার মিলে সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও বারো বছর বয়সি শ্যালিকার সম্ভ্রমহানি করে। এরপর মিলিটারি বাহিনীর মদদে অগ্নিসংযোগ করা হয় কৈবর্ত পাড়ায়। লুন্ঠনও চালানো হয় সেখানে।
মেজর এজাজ উপন্যাসে যতই যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলুন না কেন, নিজেদের সারভাইভালের প্রশ্ন বলে বৈধতা আদায়ের চেষ্টা করুন না কেন- মূলত যুদ্ধের নামে তারা শুধু ধর্ষণ, হত্যা, লুণ্ঠন ও ভীতির রাজত্ব কায়েম করতে সচেষ্ট ছিলেন।
গ্রামে মিলিটারি বাহিনীর ঢোকার দৃশ্য দেখতে পান সবার আগে ইমাম সাহেব। মিলিটারি গ্রামে ঢুকেছিল শেষ রাতে অর্থাৎ ফজরের নামাজের পূর্ব মুহূর্তে। সেই সময় ইমাম সাহেব আজান দিতে গিয়েছেন মসজিদে। তিনি প্রতিদিন আজান দেওয়ার আগে তিনবার সুরা ইয়াসিন পড়তেন। সেদিনও সেই রকমই পড়ছিলেন। দ্বিতীয়বার পড়ার সময়ই তিনি দেখতে পান মিলিটারিদের। যা দেখে তিনি অত্যন্ত ভীত ও সন্ত্রত হয়ে পড়েন। আর এই শঙ্কাতেই তিনি সেদিনের নামাজ অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে পড়েন। মিলিটারি বাহিনীকে দেখার পর তিনি এতটাই ভয় পেয়ে যান যে তার প্রবল ইচ্ছে হতে লাগল নামাজ না পড়েই বাড়ি চলে যেতে। এমনকি তিনি প্রতিদিন নামাজ শেষে কোরআন-হাদিস থেকে কথা বলতেন, সেদিন তাও করলেন না। তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। মূলত তিনি মিলিটারির ভয়েই সেদিন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নামাজ পড়েছিলেন।
মেজর এজাজ '১৯৭১' উপন্যাসের একটি অন্যতম চরিত্র। নীলগঞ্জ গ্রামে আসা মিলিটারি বাহিনীর কমান্ডার তিনি। তিনি এসেছেন যুদ্ধ করতে। তার যুদ্ধ ছিল একপক্ষীয়। নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াই তার কাছে যুদ্ধ।
তার ধারণা ছিল গ্রামবাসীর সাথে মুক্তিবাহিনীর যোগাযোগ রয়েছে। যদিও নিশ্চিত ছিলেন না। তাই তার সন্দেহকে সত্য প্রমাণিত করতে পছন্দ করেছেন নির্যাতন-নিপীড়নের রাস্তা। ভীতি সঞ্চার করে অপরের মুখ থেকে সত্যি আদায়ের প্রচেষ্টা। যা দেখতে পাই মনাকে বিচারের নামে হত্যা করার ঘটনায়।
যদি বিচারই করা হতো, তাহলে মনার সাথে তার ভাই বিরুকে হত্যা করা হতো না। এর পেছনে ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্য। মেজরের বিশ্বাস, সেই হত্যাকান্ডের দৃশ্য দেখলে ইমাম সাহেব ও আজিজ মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে তাকে তথ্য দিয়ে দিবেন।
তারপর আমরা দেখতে পাই কৈবর্তপাড়ায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা। যা হয় মেজরের নির্দেশে। এর মাধ্যমেও তিনি জনমনে ভীতির সঞ্চার করতে চেয়েছেন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির সঙ্গে যা করেছে তা অন্যায়। তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল নিরীহ বাঙালিদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। '১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজের চরিত্রে সেরকম আচরণের প্রকাশ দেখা যায়। মেজর এজাজের প্রতিটি কর্মকাণ্ডেই আমরা দেখতে পাই ভীতির মাধ্যমে নিজের স্বার্থ হাসিলের প্রচেষ্টা। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথার্থ।
নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি বাহিনী প্রবেশের দৃশ্য প্রথম দৃষ্টিগোচর হয় গ্রামের ইমাম সাহেবের। মিলিটারি প্রবেশ করে শেষরাতের দিকে, যে সময় ইমাম সাহেব ফজরের আজান দেওয়ার জন্য মসজিদে ছিলেন। যে সময় তিনি মিলিটারিকে দেখেন সে সময় তিনি পাকা সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সুরা ইয়াসিন পাঠ করছিলেন। প্রতিদিন তিনি আজানের আগে তিনবার সুরা ইয়াসিন পড়তেন। সেদিনও পড়ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়ার সময়ই তিনি দলটাকে দেখতে পান। যারা গ্রামের স্কুলঘরের দিকে যাচ্ছিল। প্রথম কয়েক মুহূর্ত তিনি কিছু বুঝতেই পারেনি, বরং স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তার বেশ কিছু সময় পর মতি মিয়া মসজিদে এ তাকে জিজ্ঞেস করেন তারা কিছু দেখেছে কি না। সে বলে সে কিছুই দেখেনি। আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করা হলে তারাও একই উত্তর দেয়। কিন্তু ইমাম সাহেব মিলিটারি দেখেছে এটা সে নিশ্চিত। তাই শেষ পর্যন্ত ইমাম সাহেব দ্রুত সংক্ষিপ্তভাবে নামাজ আদায় করে বাড়ির দিকে রওয়ানা হন।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। নাতিদীর্ঘ এই উপন্যাসে লেখক একটি গ্রামের মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থা তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জন্য যেমন গর্বের তেমনই আবার বেদনার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপর নির্বিচারে যে অমানবিক অত্যাচার করেছে তারই আখ্যান লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক আলোচ্য উপন্যাসে। উপন্যাসের আখ্যানভাগে দেখা যায়, মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামে এসেছেন মিলিটারি কমান্ডিং অফিসার হিসেবে। তিনি এসেছেন তথাকথিত যুদ্ধ করতে। যুদ্ধের নামে তিনি আরম্ভ করেছেন পাশবিক নির্যাতন, হত্যা, লুণ্ঠন। যে যুদ্ধকে তিনি যুদ্ধ বলে জাহির করতে চেয়েছেন সারভাইভাল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন তা মূলত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন ছাড়া কিছুই নয়। যা আমরা দেখতে পাই তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে। প্রথমেই তিনি হত্যা করেন নীলু সেনকে। যিনি সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন। তার অপরাধ তিনি হিন্দু। আবার, বিচারের নামে হত্যা করা হয় মনা কৈবর্তকে, সাথে তার এগারো বছরের ভাই বিরুকে। কিন্তু এর পেছনের উদ্দেশ্য ছিল জনমনে ভীতির সঞ্চার করা। এরপর মেজর এজাজ ব্যবহার করেছেন তার নিকৃষ্টতম অন্ধ্র। আজিজ মাস্টারকে উলঙ্গ করে পুরুষাঙ্গে ইট ঝুলিয়ে সারা গ্রামে ঘুরিয়ে আনতে নির্দেশ দেন।
একপর্যায়ে তিনি কৈবর্তপাড়ায় আগুন লাগিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। মেজর এজাজের যেসব কর্মকাণ্ড উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে তা কোনো যুদ্ধনীতি নয়। আবার সে যে সারভাইভালের বুলি আওড়ায় সেটাও ভিত্তিহীন। সে আসলে নীলগঞ্জ গ্রামের মানুষের সঙ্গে যা করেছে তা পুরোটাই নৃশংসতা। অমানবিক নির্যাতন করে সে আসলে পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করেছে। উপন্যাসের শেষে দেখা যায় এজাজ রফিককে পর্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। যত সময় গড়িয়েছে এজাজ তত নির্মম হয়েছে। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
আজিজ মাস্টার নীলগঞ্জের গ্রামের সাধারণ শিক্ষক। মেজর এজাজের নির্দেশে তাকে স্কুলঘরে নিয়ে আসা হয়। আসার আগে থেকেই সে অনেক ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে ছিলেন। এরপর মেজর এজাজ তাকে প্রশ্ন করা শুরু করলে তিনি আরও ভয় পেয়ে যান।
একপর্যায়ে মেজর তাকে কফি খাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় তিনি কফি খাওয়ার জন্য হ্যাঁ বলে দেন এবং কফি খেতে শুরু করেন। মেজর তাকে জিজ্ঞেস করেন তিনি রেডিও শোনেন কি না। এই প্রশ্ন শুনেই তার গলায় কফি আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়। কারণ তিনি রেডিও শুনতেন। স্বাধীন বাংলা: বেতার শুনতেন। যেহেতু তিনি শোনেন এবং এর পরিণামে মেজর তাকে কী শাস্তি দেন সেই চিন্তায় ও ভয়ে তার কফি গলায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিতটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। ছোট্ট পরিসরে রচিত এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত রূপ সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সাথে কীভাবে মানুষ নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে বিপ্লবী হয়ে ওঠে সেই চিত্রও চিত্রায়ণ করেছেন। '১৯৭১' উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই প্রথম দিকে গ্রামের মানুষ মিলিটারির ভয়ে তটস্থ থাকলেও পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছে সাহসী।
কেউ জীবন অপেক্ষা আত্মমর্যাদাকে প্রাধান্য দিতে শিখেছে। আবার কেউ মৃত্যুর আগমূহূর্তেও হাসতে শিখে গিয়েছে। যা আমরা দেখতে পাই সফদারউল্লাহর মাঝে, আজিজ মাস্টারের মাঝে, রফিকের মাঝে।
সফদরউল্লাহ্ উপন্যাসের অন্যতম একটি চরিত্র। সে যুদ্ধ কী তা জানেই না। গ্রামে মিলিটারি আক্রমণ করার পরে গ্রামবাসীরা নারীদের ব্যাপারে কী করা যায় এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এদিকে দেখা যায়, হানাদার বাহিনীর সদস্য সফদরউল্লাহ্র অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে এসে স্ত্রী ও শ্যালিকার সম্ভ্রমহানি করে। এটা জানার পর সে হাতে দা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনীর খোঁজে। তার মধ্যে তখন আর কোনো ভয় কাজ করে না। সে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী।
উপন্যাসের আরেক চরিত্র হলো আজিজ মাস্টার। ভীতু ও সন্ত্রস্ত এই চরিত্রটির মধ্যেও সময়মতো বিপ্লবী সত্তার সঞ্চার দেখতে পাই। জীবনকে ভালোবাসা এই চরিত্রটিও একসময় জীবন ও সম্মানের মধ্যে সম্মানকেই বেছে নেয়। যা তার বিপ্লবী সত্তার পরিচায়ক। আবার রফিকের মধ্য দিয়ে লেখক সেই চরিত্র অঙ্কন করেছেন যারা দেশের জন্য জীবন দিতেও দ্বিধা করে না। পাকিস্তানির সহযোগী হয়েও তার মধ্যে বিবেকের তাড়নায় যে বিপ্লবী সত্তার পরিচয় পাওয়া যায় তা সত্যি অভাবনীয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আসলে যা করেছে তা অন্যায়। তাদের অত্যাচার যখন সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তখন বাঙালিরা উপর্যুক্ত চরিত্রগুলোর মতোই সাহসী ও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল।
আজিজ মাস্টার নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। তিনি স্কুলে প্রতিনিয়তই যান। তিনি স্কুলের টিচার্স রুমে নিয়মিত বসেন। যা তার কাছে অতি পরিচিত একটি জায়গা। কিন্তু মেজর এজাজ তাকে সেখানে বসতে বলার পরে তিনি যখন ওই ঘরে যান তখন ওই ঘর তার কাছে অপরিচিত মনে হয়। কারণ তার ভীতি ও উৎকণ্ঠা। অতিরিক্ত ভয় ও দুশ্চিন্তায় তিনি নিজের পরিচিত স্থানকেও অপরিচিত বোধ করছেন। এর প্রমাণ আরও পাওয়া যায় যখন তিনি পায়জামাতেই প্রস্রাব করে দেন। এটি মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থারও প্রকাশ। আজিজ মাস্টার আসলে একজন ভীতু ও সহজ-সরল মানুষ। যুদ্ধের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততাই নেই। তারপরও মিলিটারি ভীতি তার মধ্যে সর্বদাই ছিল। যে কারণে অতি পরিচিত একটি জায়গাও মুহূর্তে অপরিচিত মনে হতে শুরু করে।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস'। '১৯৭১' উপন্যাসের আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে নীলগঞ্জ গ্রামকে কেন্দ্র করে। গ্রামের অন্যতম একজন বাসিন্দা হলো মীর আলি। মীর আলির পুত্রবধূ হলো অনুফা, বদিউজ্জামানের স্ত্রী সে।
মীর আলি আলোচ্য উপন্যাসের বয়োবৃদ্ধ চরিত্র। গ্রামীণ বৃদ্ধ ব্যক্তির প্রতিনিধি হিসেবে লেখক তাকে অংকন করেছেন। গ্রামের বৃদ্ধদের মধ্যে যেমন নানা সংস্কার ও বিশ্বাস থাকে, মীর আলির মধ্যেও তাই।
"অনুফা এ সংসারে ভাগ্য নিয়ে এসেছে"- উক্তিটি মূলত মীর আলির যনের ভাবনা। একদিন কাশির মাঝে চা খেতে খুব ইচ্ছে করলে অনুফা যীর আলিকে চা করে দেয়। আর এতেই তার প্রতি মমত্ববোধ বেড়ে যায় মীর আলির। আর তখনই এ উক্তিটির জন্ম।
মীর আলির মতে, অনুফার বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে সংসারের যাবতীয় মঙ্গল সাধিত হয়েছে, যা পূর্বে হয়নি। সংসারের আয়-উন্নতি বেড়েছে। নতুন সাইকেল আছে, নতুন চামচ আছে। তাকে গত বছর নতুন লেপ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মীর আলির মনে পড়ে, অনুফা আসার পর থেকে তাদের পরিবার এমন কোনো দিন ছিল না যে তারা এক বেলা না খেয়ে থেকেছে।
উপর্যুক্ত কথাগুলো হলো এক বৃদ্ধ লোকের তার পুত্রবধূর সম্পর্কে হঠাৎ মমত্ববোধ জেগে ওঠায় যে ধারণা রা ভাবনা, তার প্রস্ফুটন। এটাই মীর আলির বিশ্বাস। মীর আলির এই বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ বৃদ্ধদের বিশ্বাসের দিকটি প্রতীয়মান হয়েছে। সুলক্ষণ ও কুলক্ষণ কেন্দ্রিক নানা বিশ্বাস গ্রামে প্রচলিত থাকে। মীর আলির অনুফাকে নিয়ে করা প্রশ্নোক্ত কথাটির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন পুত্রবধূর প্রতি মমত্ববোধের প্রকাশ অন্যদিকে তেমন নীলগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দাদের সংস্কার ও বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটেছে।
নীলগঞ্জের সেন বংশ বর্তমানে হতদরিদ্র হওয়ায় তাদের বাড়িতে ডাকাত আসার কথা নয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে ভোরের দিকে হালকা আলোতে চিত্রা বুড়ি দেখে সেনবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু লোক টর্চ লাইট ফেলছে। বুড়ি ভাবে তারা হয়তো ডাকাত। কিন্তু সেনদের এখন যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তাতে ডাকাত আসার কথা নয়। নীলগঞ্জ গ্রামে সেনবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা দুর্গাপুরের মহারাজের নায়েব চন্দ্রকান্ত সেন। সেনবাড়িটি দুই বিঘা জমির উপর বিস্তীর্ণ। পূর্বে চন্দ্রকান্ত সেনের অনেক ধনসম্পদ ছিল। তবে বর্তমানে তাঁর উত্তরাধিকারীরা এই সম্পদের সন্ধান জানে না। সেনবাড়িতে বর্তমানে কেবল একটি প্রকান্ড দালান আছে। এই বাড়িতে ইট ছাড়া মূল্যবান কিছুই নেই। বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী নীলু সেন বাড়িটিতে বসবাস করেন। তবে তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। মূলত সেনদের বর্তমানে কোনো অর্থসম্পদ না থাকায় ডাকাতের আসার কথা নয়।
হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২)। সহজসরল ভাষা, গভীর জীবনবোধ, রহস্যময়তা এবং মানবিকতার মিশ্রণে তিনি এক নতুন ধারার সূচনা করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর অন্যতম সৃষ্টি '১৯৭১' উপন্যাস। গ্রামের সাধারণ মানুষের সাবলীল পথচলার ক্ষেত্রে যুদ্ধ কীভাবে বাধা সৃষ্টি করে, তা সুনিপুণভাবে তিনি এ উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন।
'১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জ গ্রাম একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। এই গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা খুবই সাধারণ। গ্রামের মানুষ যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অনুফা সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। চিত্রা বুড়ি নিজের মতো একা একা থাকে। গ্রামের বদিউজ্জামান ব্যাবসার সাথে জড়িত। এ অঞ্চলে কৈবর্তপাড়া আছে। তারা মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করে। গ্রামে দুইজন অস্থায়ী লোক বসবাস করেন। একজন মসজিদের ইমাম; তিনি মসজিদে থাকেন। অন্য জন স্কুল মাস্টার, তিনি জয়নাল মিয়ার বাড়িতে থাকেন। তারাও নীলগঞ্জ গ্রামে স্বচ্ছন্দময় জীবনযাপন করেন। পহেলা মে পাকিস্তানি বাহিনী. রাতের অন্ধকারে নীলগঞ্জ গ্রামে ঢোকে। তাদের আগমন গ্রামের সাবলীল জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বৃদ্ধ মীর আলি চোখে দেখতে না পেলেও কানে শুনতে পান কেউ গ্রামে ঢুকছে। ইমাম সাহেব মিলিটারি দেখে বারবার দোয়াদরুদ পড়তে থাকেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর আগমনের কথা শুনে হতবাক হয়ে পড়ে। কারণ এ গ্রামে আগে কখনো মিলিটারি আসেনি। উপন্যাসে দেখা যায় পাকিস্তানি বাহিনী নীলগঞ্জ গ্রামে এসেই তাণ্ডব চালাতে শুরু করে। তারা ইমাম ও মাস্টারকে স্কুলঘরে নিয়ে অমানবিক অত্যাচার করে। ইমামকে মারধর এবং মাস্টারকে সম্ভ্রমহানি করে। গ্রামের চিত্রা বুড়ির ছেলে হত্যার বিচার করতে গিয়ে মনা এবং তার এগারো বছরের ভাইকে মেজর নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। সফদরউল্লাহর পরিবারের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম অত্যাচার তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন করে তোলে। গ্রামে অন্য একজন সহজ-সরল বদিউজ্জামানের
গ্রামের কৈবর্তরা মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করত। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশে তাদের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। মুক্তিবাহিনীকে আশ্রয় দেওয়ার সংবাদে কৈবর্তপাড়ায় তারা গণহত্যা শুরু করে। আগুন জ্বালিয়ে পুরো কৈবর্তপাড়া খালি করে ফেলে পাকিস্তানি বাহিনী। তাই বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধ নীলগঞ্জের মতো একটি গ্রামের স্বাভাবিক জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছে। গ্রামের মানুষের মনে একদিকে যেমন আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে তাদের মধ্যে প্রতিরোধের এক নতুন স্পৃহাও জন্ম নেয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ আহমেদ এবং তার সহযোগী রফিকের সম্পর্ক মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জটিল পরিস্থিতি এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন তুলে ধরে। রফিক একজন মুক্তিযোদ্ধা। রফিকের দেশপ্রেমের কারণে মেজর এজাজ তাঁকে চিনতে পারেনি। উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল চরিত্র রফিক। রফিক মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে নীলগঞ্জ গ্রামে আসেন। মেজর এজাজের নির্দেশে গ্রামে স্থানীয় মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জানতে তিনিও কৌতূহলী হয়ে ওঠেন কিন্তু তিনি মেজরের বিভিন্ন পদক্ষেপে বাধা দিতে থাকেন। রফিকের সমালোচনা ও বাধা দেওয়া মেজর এজাজের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। মেজর এজাজ বুঝতে পারে তার সহযোগী একজন মুক্তিবাহিনীর সদস্য। মেজর তাই রফিককে জলাভূমিতে পাঠায় এবং দুইজন মিলিটারিকে নির্দেশ দেয় রফিককে গুলি করার জন্য। রফিক মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও রক্তিম সূর্যের মতো জলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। রফিকের পরিবর্তন মেজরকে দুশ্চিন্তায় ফেলে। তার মনে হয় এ যেন এক অন্য রফিক। এই রফিককে সে আগে কখনো দেখেনি। এই রফিক যেন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও রাহক। তাই বলা যায়, ১৯৭১ উপন্যাসের রফিক একজন দেশপ্রেমিক ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীদের রক্ষার কৌশল ছিল খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, যা ছিল মেজর এজাজের কাছে অপ্রত্যাশিত।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল, ভাষার প্রশ্নে তার সম্ভাবনা শুরুতেই হোঁচট খায়। এরপর ভাষাগত পার্থক্যের পথ ধরে দেশটির আঞ্চলিক দূরত্ব এগোতে থাকে নানাবিধ বৈষম্যের দিকে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক এককেন্দ্রিকতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পাকিস্তান রাষ্ট্রকে আরও বিপন্ন করে তোলে। পশ্চিম পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি দিনে দিনে আত্মগরিমায় রূপ নিতে থাকে। বাঙালিদের দেখতে থাকে নীচ হিসেবে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে জাতিগত উন্নাসিকতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিপীড়িত পূর্বাঞ্চল যখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ঘুরে দাঁড়াতে যায়, তখন সে টের পায়, তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বৈষম্যের মতোই আরেকটি উপাদান পদানত করে রেখেছে। তার নাম জাতিগত বিদ্বেষ। যার চূড়ান্ত পরিণতি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। '১৯৭১' উপন্যাসের লেখক তারই একটি স্বরূপ তুলে ধরেছেন নীলগঞ্জে আগত পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্য দিয়ে।
'১৯৭১' উপন্যাসে লেখক নীলগঞ্জ নামক একটি সাধারণ গ্রামের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দেখাতে চেয়েছেন। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ক্ষুদ্র দল এসে যুদ্ধের বিভীষিকা ছড়িয়ে দেয়। দলটির অধিনায়ক মেজর এজাজ। লেখক মেজর এজাজকে এখানে উপস্থিত করেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের একজন প্রতিনিধি হিসেবে। তার ভাষা, চিন্তা, কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সম্মিলিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। রফিকের সাথে মেজর এজাজের কথোপকথনে ফুটে ওঠে তার গোষ্ঠীগত চেতনার স্বরূপ। এজাজ এ দেশের মানুষদের ভীরু, কাপুরুষ, বেইমান হিসেবে উল্লেখ করে। এ দেশের মুসলমানরা তার চোখে পুরোপুরি মুসলমান নয়। ধর্মীয় সমতার ধারণা এখানে ভেঙে পড়ে। সে এ অঞ্চলের মুসলমানদের চিহ্নিত করে আধা-হিন্দু হিসেবে। হিন্দুদের প্রতি রয়েছে তার জাতিগত বিদ্বেষ। হিন্দুদের মূর্তি নিয়ে তার মন্তব্যে ঝরে পড়ে তাচ্ছিল্য। এ অঞ্চলের নারীদের প্রতি তার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি তির্যকভাবে প্রকাশ পায়। উপন্যাসের কাহিনির অগ্রগতির সাথে এ দেশের মানুষকে মানুষ মনে করাই তার জন্য দুরূহ হয়ে ওঠে। এ অঞ্চলের মানুষের মান-অপমান থাকা তার বিশ্বাসের বাইরে মনে হয়। সে মূলত এ দেশের মানুষদের বিশ্বাসেরই যোগ্য মনে করে না। ইমাম সাহেব, আজিজ মাস্টার, জয়নালের মতো নীলগঞ্জের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিরা তার কাছে ক্রীড়নকে পরিণত হয়। এমনকি, তাদের সাহায্যে নিবেদিত রাজাকাররা ভালো মুসলমান হিসেবে বিবেচিত হলেও ওঠা-বসা কিংবা মেলামেশার ক্ষেত্রে এ দেশের 'অধিবাসী হিসেবে নিচু দৃষ্টিভঙ্গির আওতায়ই থেকে যায়। এর সবকিছুর পিছনে যুদ্ধের বাহ্যিক আয়োজনের সাথে কাজ করে পাকিস্তানিদের জাতিগত অহংকার।
'১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জের মধ্য দিয়েই দেখা যায় পুরো পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে। আর মেজর এজাজের চিন্তা ও কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সামগ্রিক চেতনা। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বাইরে জাতিগত বিদ্বেষের একটি স্বরূপ ফুটে উঠেছে উপন্যাসের এজাজসহ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কর্মকান্ড ও চিন্তার মধ্যে।
আজিজ মাস্টারকে উলঙ্গ করে সারা গ্রাম ঘোরাতে চাইলে তিনি তাতে রাজি হন এবং যেকোনো উপায়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে চান। তখন তার এই কর্মকান্ড সম্পর্কে রফিক মেজর এজাজ আহমেদের কাছে উক্ত উক্তিটি করেন।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের নিরপরাধ সাধারণ মানুষের উপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। উপন্যাসটিতে আজিজ মাস্টার মেজর এজাজের অমানবিক অত্যাচারের শিকার হন। মেজর এজাজ তাকে নানা রকম প্রশ্ন করে, কিন্তু মাস্টার সেগুলোর উত্তর দিতে না পারায় মেজর তাকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে আজিজ মাস্টারকে উলঙ্গ করে তার পুরুষাঙ্গে, ইট বেঁধে সারা গ্রাম ঘোরাতে বলে। নিরুপায় আজিজ মাস্টার জীবন বাঁচানোর সর্বশেষ উপায় হিসেবে এভাবে অপমানিত হওয়াকে বেছে নেন। আজিজ মাস্টারের এরূপ আচরণে মেজর বিদ্রূপ করে বলে যে, বাঙালিদের কোনো আত্মসম্মানবোধ নেই। তার এ কথায় রফিক অপমানিত বোধ করেন। কারণ তিনি নিজেও একজন বাঙালি। রফিক তখন প্রতিবাদ করে বলেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে মানুষ যেকোনো কিছু করতে পারে। এ সময় কে কী আচরণ করবে তা আগে থেকে বলার কোনো উপায় নেই। মৃত্যুর মুখোমুখি হলে মেজর নিজেও কাপুরুষের মতো আচরণ করতে পারে। এভাবে' রফিক মেজরের মুখের উপর অপমানের জবাব দেন। মৃত্যুর ভয়াবহতার কাছে যে আত্মসম্মানবোধ তুচ্ছ, সেই বিষয়টি মেজরকে বোঝানোর জন্যই রফিক প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।
হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) বাংলা সাহিত্যের একজন অনন্য প্রতিভা। গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান অসাধারণ। তিনি বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার সূচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে তিনি অসংখ্য গল্প ও উপন্যাস রচনা করেছেন। '১৯৭১' উপন্যাসে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
দেশপ্রেম একটি অদম্য ও অন্তর্নিহিত অনুভূতি, যা সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। হুমায়ূন আহমেদের '১৯৭১' উপন্যাসের রফিক এমন একজন ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি, যার মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা গভীরভাবে নিহিত ছিল, যা তার কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠেছে।
রফিক পাকিস্তানি মেজর এজাজের সাথে নীলগঞ্জে আসেন। তাদের সহযোগী হলেও গ্রামের অপরিচিত মানুষদের রক্ষা করতে তিনি জীবনের ঝুঁকি নেন। তার আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয় গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে। গ্রামের বৃদ্ধ মীর আলি যেন তার পরিচিত কেউ। মেজর এজাজ মীর আলিকে সালাম দিয়ে কথা বলতে চাইলে রফিক বাধা দেন। মীর আলি বৃদ্ধ তাই তাকে ছেড়ে দিতে বলেন।
গ্রামের যুবক বলাইয়ের সাথেও রফিকের সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়। রফিক বলাইকে কখনো দেখেননি কিন্তু বলাইকে বারবার সচেতন করার জন্য তিনি উদবিগ্ন হয়ে ওঠেন। মন্দিরে আত্মগোপনে থাকা বলাইকে মেজরের হাত থেকে রক্ষা করেন। নীলগঞ্জ গ্রামের নিজাম পাগলাকে গ্রামের জঙ্গলার দিকে ছুটে যেতে দেখে রফিক খুব আনন্দিত হন।
গ্রামের দুইজন অস্থায়ী বাসিন্দা ইমাম সাহেব এবং আজিজ মাস্টারকে মেজর এজাজের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তিনি মাস্টার ও ইমাম সাহেবকে কৌশল অবলম্বন করে এজাজের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। মাস্টারের অসম্মান এবং ইমাম সাহেবকে মারধর রফিককে বিচলিত করে তোলে।
রফিক পাকিস্তানি বাহিনীকে কৈবর্তপাড়ায় তল্লাশি চালাতে নিষেধ করেন। কৈবর্তরা খুবই নিরীহ, তাদের এই পাড়ায় কিছুই নেই, সেখানে গিয়ে কোনো লাভ নেই, এই বিষয়গুলো এজাজকে বলে কৈবর্তপাড়াকে সাময়িকভাবে তিনি রক্ষা করেন।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধ মীর আলি। তিনি শারীরিক অবস্থার কারণে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
নীলগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধ মীর আলি। তার বয়স প্রায় সত্তর। তিনি চোখে দেখতে পান না। তার মতে, বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণা রাত-দুপুরে বাইরে যাওয়া। তিনি তার বড়ো ছেলে এবং ছেলের বউয়ের উপর নির্ভরশীল। ছেলের বউ মাঝে মাঝে তার উপর বিরক্তি বোধ করে। তার তখন মনে হয় অনুফা ভালো নয়। আবার মাঝে মাঝে তার জন্য মীর আলির মমতা হয়, যখন সে মীর আলির যত্ন করে। নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব শুরু হলে বৃদ্ধ মীর আলি অসহায় হয়ে পড়েন। তার ছেলে বদিউজ্জামান দোকান থেকে ফিরে আসে না। বৈশাখী ঝড়ের আণ্ডবে ঘরের টিন উড়ে যায়। অন্যদিকে অনুফা রান্না করা বন্ধ করে দেয়। ক্ষুধার যন্ত্রণা মীর আলি সহ্য করতে পারেন না। তাই তিনি বলেন, যুদ্ধ হলেও মানুষের ক্ষুধা-তৃষ্ণা তো চলে যায়নি। একদিকে অনিশ্চিত জীবন, অন্যদিকে ক্ষুধার যন্ত্রণা যেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারকেও ছাপিয়ে যায়। তাই বলা যায়, মীর আলির অসহায়ত্ব যুদ্ধের ভয়াবহতাকেও ছাপিয়ে যায়।
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এ অঞ্চলটিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দমিয়ে রাখতে গিয়ে একটা যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। যদিও যুদ্ধটা ছিল পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক পূর্বাঞ্চলের উপর চাপিয়ে দেওয়া এক অন্যায় যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ প্রাথমিকভাবে জনযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ ছিল না। এর প্রথম পর্যায়কে গণহত্যা হিসেবে দেখা যায়। '১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের মধ্য দিয়ে এরই একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। '১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জ এক প্রান্তিক গ্রাম। গ্রামের পাশের জঙ্গলায় মুক্তিযোদ্ধারা দুজন পাকিস্তানি অফিসারকে আটক করে নিয়ে লুকিয়ে আছে এমন অভিযোগে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল সেই গ্রামে আসে। দলটি গ্রামে প্রবেশ করেই প্রথমে ভীতিসঞ্চার করতে চায়। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতি অনুরাগ-বিরাগ কিছুই প্রকাশ পায় না উপন্যাসের শুরুতে। তবে মানুষের মনে সৃষ্ট আতঙ্ককে বিরাগ হিসেবেই ধরা যায়। প্রাথমিক এই বিরাগ নীলগঞ্জের মানুষদের পাকিস্তানি বাহিনীর শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকান্ড পুরো নীলগঞ্জকেই তার শত্রু হিসেবে সাব্যস্ত করে। পাকিস্তানি বাহিনী নীলগঞ্জে প্রবেশ করেই স্থানীয় ইমাম এবং মাস্টারকে আটক করে নেয়। এই শ্রেণির মানুষেরা গ্রামে মান্যজন হিসেবেই বিবেচিত হন। তারা ইমাম ও আজিজ মাস্টারের উপর অমানবিক নির্যাতন করে। অকারণেই হত্যা করে নীলু সেনকে। তার ধর্মীয় পরিচয়ই ছিল এই হত্যার কারণ। কৈবর্ত যুবক মনাকে তার অপরাধের জন্য শাস্তিস্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার করেনি, বরং ত্রাস সৃষ্টি করেছে। সফদরউল্লাহর পরিবারের নারীদের ধর্ষণ করে। কৈবর্তপাড়া পুড়িয়ে দেয়।
নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর এমন সামরিক আগ্রাসনে ফুটে ওঠে পুরো পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্রাসনের প্রতিচ্ছবি। তারা রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে সামরিকভাবে মোকাবিলা করে। নীলগঞ্জের মতো সাধারণ একটি জনপদে পাকিস্তানি বাহিনী ত্রাস সৃষ্টি করতে গিয়ে সকল নিরীহ মানুষকেই শত্রু হিসেবে গণ্য করে। সেখানে তাদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা পুরো নীলগঞ্জকেই শত্রুতে রূপান্তরিত করে। এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে পুরো পূর্বাঞ্চলের এক সাধারণ চিত্র। সামরিক কায়দায় মোকাবিলা করতে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিরীহ মানুষের উপর ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মধ্য দিয়ে '১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জের মতো পুরো ভূখণ্ডকেই শত্রু বানিয়ে ফেলে। মুক্তিযুদ্ধ তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
"ওদের শাস্তি একটাই"- এখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতাকে বোঝানো হয়েছে। যাদের একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। উক্তিটি করেছে ঔপন্যাসের চরিত্র রফিক। ইমাম সাহেব ও আজিজ মাস্টারের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যখন তাদেরকে মনার হত্যাকান্ড দেখতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন ইমাম সাহেবের প্রশ্নের জবাবে রফিক এ কথা বলে। মিলিটারি যে শাস্তি দেয় তা বিচার বা ন্যায়বিচার নয় বরং ভীতির সৃষ্টি করা। যাতে অন্যরা ভয় পেয়ে তাদের সাহায্য করে। তারা এতটাই পাশবিক যে মনা কৈবর্তকে মারার সাথে সাথে তার নিরপরাধ এগারো বছর বয়সি ছোট ভাইকেও মেরে ফেলে। রফিক জানত মিলিটারি যাকেই শাস্তি দেয় তাকেই মরতে হয়। তাই সে বলেছে 'ওদের শাস্তি একটাই'।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদের এক মুক্তিযুদ্ধের দলিল। এর আখ্যানভাগ রচিত হয়েছে নীলগঞ্জ নামক এক গ্রামে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের প্রেক্ষাপটে। পাকিস্তানি মিলিটারি মেজর এজাজের সারভাইভালের নামে নৃশংসতা এই উপন্যাসের মূল। উপন্যাসের প্রয়োজনেই লেখক আলোচ্য উপন্যাসে অনেক চরিত্র চিত্রণ করেছেন। তবে উপন্যাসের অন্যতম এবং প্রধান চরিত্র বলা যায় রফিককে। রফিক হলো '১৯৭১' উপন্যাসের জটিল চরিত্র। সে শুধু একজন রফিক নয় বরং প্রতিনিধিত্ব করেছে হাজার হাজার বাঙালি মুক্তিকামী জনতার। সে পাকিস্তানিদের সাথে থেকেছে। কিন্তু পুরো উপন্যাস পড়ে জানি সে আসলে আপাদমস্তক বাঙালি এবং মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে সবই জানত। সে পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করার পরিবর্তে গ্রামের মানুষ ও মুক্তিবাহিনীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।
শুরু থেকেই সে অযাচিত নির্যাতনের বিপক্ষে ছিল। সে মিলিটারির সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও কখনোই তাদের পরিচয় দেয়নি। সে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে। চারদিকে চোখের সামনে নির্যাতন-নিপীড়ন দেখতে দেখতে সে মেজর এজাজের মুখোমুখি হয়। ভীত না হয়ে সে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী।
নিজের মৃত্যু আসন্ন জেনেও এজাজের আশু ধ্বংসবার্তা প্রচার করে নামতে থাকে বিলের পানিতে। তখনই আসলে জন্ম নিতে থাকে বাংলাদেশ। রফিকের মতো হাজারো বাঙালি বুঝতে পারে তাদের সামষ্টিক বেঁচে থাকার জন্য ব্যক্তিজীবন উৎসর্গ করার গুরুত্ব। তখনই বাংলাদেশ প্রবেশ করে যুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। মূলত এভাবেই রফিকের মতো সাহসী ছেলেদের মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া একটি নতুন বাংলাদেশ জন্ম দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
নীলগঞ্জ ছোট একটি গ্রাম। ময়মনসিংহ-ভৈরব লাইনের একটি স্টেশন 'নান্দাইল রোড'। সেখান থেকে দশ মাইল উত্তরে গেলে বুয়াইল বাজার এলাকার বিখ্যাত বাজার। স্টেশন থেকে রিকশায় যাওয়া যায় কিন্তু বর্ষার সেই জো নেই। বাজার থেকে মাইল ত্রিশেক উত্তরে মধুবন বাজার। সেখান থেকে পূর্ব দিকে সাত-আট মাইল গেলে মধুবনের জঙ্গলা মাঠ। এই মাঠের পেছনেই নীলগঞ্জ গ্রাম। চল্লিশ ঘরের একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। সেখানকার মাটি উর্বর নয়, ফসল ভালো উৎপাদন হয় না। তবে শীতকালে ভালো সবজির চাষ হয়। গ্রামের মাঝখানে জলাভূমি কাস্তের মতো গ্রামটাকে দু'ভাগ করেছে। নিভৃত গ্রামেই এই উপন্যাসের যুদ্ধের ময়দান।
'১৯৭১' উপন্যাসে এমন এক সময়ের বর্ণনা উঠে এসেছে, যা পাঠ করে আমরা দেখতে পাই চারদিকে শুধু হতাশার ঘটনা। প্রীতিকর কোনো বিষয় আমরা লক্ষ করতে পারি না। এখানে বর্ণিত হয়েছে যুদ্ধের ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধের নয়। বরং কীভাবে এই যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়েছে তা দেখানো হয়েছে।
বর্ণবাদ, আইনের নামে অপব্যবহার, পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রভৃতি দৃশ্য ফুটে উঠেছে উপন্যাসের মাঝে। এ ছাড়াও ধর্ষণ, খুন, লুণ্ঠন তো আছেই। শুরুতেই মসজিদের ইমাম সাহেবকে স্কুলঘরে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানোর বর্ণনা। তারপর নীলু সেনকে হত্যা। মনা কৈবর্তকে বিচারের নামে হত্যা, তার ভাইকে বিনা অপরাধে হত্যা করা। সফদারউল্লাহর বোন ও স্ত্রীর সম্ভ্রমহানি করা। কৈবর্তপাড়ায় অগ্নিসংযোগ করা। আজিজ মাস্টারের মতো একজন সাধারণ নিরপরাধ মানুষের সম্মানহানি ও অন্যায়ভাবে হত্যা। এ রকম আরও অনেক ঘটনার বর্ণনাই আমরা পাই উপন্যাসটিতে।
যুদ্ধ সংঘটনের কারণে আসা মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি আবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও যেন এ পরিস্থিতিকে আরও বেদনাতুর করে তুলেছে। ঝড়ে মীর আলির ঘরের চালা উড়ে যায়। সেই রাতেই ঝড়ের সময় সফদারউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকার সম্ভ্রমহানি হয়।
অর্থাৎ চারদিকে শুধু হতাশা ও দুঃখজনক বিষয় ঘটতে দেখা যায়। তাই '১৯৭১' উপন্যাসে সময়কে বারবার খারাপ বলা হয়েছে, যা যথাযথ।
"চারদিকে সীমাহীন অন্ধকার"- উদ্ধৃতিতে মীর আলির বার্ধক্যজনিত অন্ধত্ব প্রকাশ পেয়েছে। '১৯৭১' উপন্যাসে বর্ণিত, মীর আলি চরিত্রটি চোখে দেখে না। তার বয়স প্রায় সত্তর বছর।
আগে আবছা আবছা দেখতে পেত। দুপুরের রোদের দিকে তাকালে হলুদ কিছু ভাসত চোখে। দুই বছর ধরে তা-ও দেখতে পায় না। তাই তার চারদিকে সীমাহীন অন্ধকার। বয়সের ভারে তার এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ বয়সে অনেকেরই চোখ-কান নষ্ট হতে থাকে। পৃথিবী শব্দহীন, বর্ণহীন হতে থাকে। মীর আলির কান অবশ্য ভালো আছে। কিন্তু আজকাল তার শব্দও সহ্য হয় না। সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার বিষয় হলো আজকাল প্রায়ই তার রাতদুপুরে বাইরে যেতে হয়। একা একা সে চলতে পারে না। ছেলে বদিউজ্জামান অথবা পুত্রবধূ অনুফার সাহায্য নিতে হয় তাকে। অন্যের ওপর নির্ভরশীল বার্ধক্যজীবনের নানামাত্রিক সমস্যাকে লেখক মীর আলির চারদিকে সীমাহীন অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে সমস্যাবহুল পরনির্ভরশীল অনিশ্চিত জীবনের প্রতীক।
"মানুষকে এভাবে লজ্জা দেওয়ার অর্থ হয় না"- উক্তিটি মেজর এজাজ আহমেদকে উদ্দেশ্য করে রফিক বলেছে।
মেজর এজাজ আহমেদের বাঙালি দোসর রফিক দোভাষীর কাজ করে। শুরু থেকে পাক মেজর এজাজ আহমেদের সব কাজ রফিক বিশ্বস্ততার সঙ্গে করে এসেছে। তবে বাঙালিদের প্রতি রফিকের মমত্ববোধ রয়েছে।
আজিজ মাস্টারকে মিলিটারি হেফাজতে নিয়ে এলে রফিক তাকে এজাজ আহমেদের প্রশ্নের সত্য উত্তর দিতে বলে। রফিক বুঝতে পারে আজিজ মাস্টার সম্পূর্ণ নির্দোষ। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কেননা আজিজ মাস্টার এই গ্রামের লোক নয়। চাকরিসূত্রে তার নীলগঞ্জে বসবাস। তাই এই এলাকায় কোনো সামষ্টিক সিদ্ধান্তে তার অন্তর্ভুক্তি প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া আজিজ মাস্টার আত্মভোলা মধ্যবিত্ত কবি মানুষ। প্রকৃতি বিচারেও সে অনেক ভীতু প্রকৃতির। ফলে তার পক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানা সম্ভব নয়।
মেজর এজাজ আহমেদ সন্দেহের বশে আজিজ মাস্টারকে ধরে আনেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, আজিজ মাস্টারের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কোনো না কোনো যোগসূত্র আছে। তাই তিনি প্রথমে ভালো ব্যবহার, আদর-আপ্যায়নের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতে চান। তাতে কোনো ফল না পাওয়া গেলে চোখের সামনে মৃত্যু দেখিয়ে কথা বের করার চেষ্টা করেন। এই চেষ্টাও ব্যর্থ হলে মেজর এজাজ আজিজ মাস্টারকে চরম অবমাননাকার শাস্তি দেন। এতে রফিক প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।
মেজর এজাজের সঙ্গে কাজ করলেও জাতিগত দিক থেকে রফিক বাঙালি। বাঙালি জাতির কারও' এমন অবমাননা সব বাঙালির আত্মসম্মানের প্রশ্ন। ফলে রফিক মেজর এজাজের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে বলে ওঠে, "মানুষকে এভাবে লজ্জা দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।" রফিক জানে মেজর এজাজের বিরুদ্ধাচার করা মানে নিজের প্রাণ সংশয়। তবু সে স্বজাতির অপমান মেনে নিতে পারেনি।
বাংলা সাহিত্যের পাঠকপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের তালিকায় হুমায়ূন আহমেদের নাম প্রথম সারিতে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন শরৎচন্দ্র বাঙালি পাঠকদের পাঠ-অভ্যাস তৈরি করেছিলেন, পূর্ব বাংলায় তথা বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) সেই কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর উপন্যাস প্রকাশের পর বিক্রির তালিকায় থাকত সবার ওপরে। উপন্যাস, গল্প, চিত্রনাট্য ও গান রচনায় হুমায়ূন আহমেদ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর লেখার মূল বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি ও মানবজীবনের সম্পর্ক; নগর মধ্যবিত্ত শ্রেণির দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন। তাঁর লেখালেখির একটা বিশেষ অংশ মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত। নন্দিত নরকে, জোছনা ও জননীর গল্প, ১৯৭১, শঙ্খনীল কারাগার, আগুনের পরশমণি ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকার হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। একুশ শতকের প্রথম দশক ছিল বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের কাল। তাঁর রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম '১৯৭১'।
"হুমায়ূন আহমেদ '১৯৭১' উপন্যাসে কোনো কিছুই স্পষ্ট করেননি, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই রেখে দিয়েছেন সম্ভাবনার বীজ।"-মন্তব্যটি যথার্থ।
'১৯৭১' উপন্যাসের কোনো দিকেই লেখক মীমাংসায় পৌঁছাননি। প্রথমত নীলু সেনের হত্যাকাণ্ডের পর তার লাশের ওপর মাছি উড়ছে। সেটি দরজার সামনে থেকে সরানো হয়নি। হবে কি-না সেটা সম্পর্কেও কোনো ইঙ্গিত নেই। দ্বিতীয়ত বদিউজ্জামান বাড়ি ফেরার সময় মিলিটারির আক্রমণের মুখে পরিত্যক্ত ডোবায় আশ্রয় নেয়। সারা দিন একটা গিরগিটি এবং বিকেলের পর একটা শিয়াল তার দিকে চেয়ে থাকে। তার ক্ষুধার্ত বাবা খাবারের জন্য আর্তনাদ করে, ঝড়ে টিনের চাল উড়ে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বদিউজ্জামান কি বাড়ি ফিরতে পেরেছে- সেই মীমাংসা লেখক জানাননি। তৃতীয়ত রাজাকার ও মিলিটারি দফাদারের হাতে ধর্ষিত স্ত্রী ও শালির শ্লীলতাহানির বিচার করতে হাতে দা নিয়ে সফদরউল্লাহ দুজন ব্যক্তিকে খুন করার উদ্দেশ্যে গভীর রাতে তাদের খুঁজতে বের হয়। সফদরউল্লাহ তাদের খুঁজে পেয়েছিল কি না সেই বিষয়ে লেখক মীমাংসায় পৌঁছাননি। চতুর্থত নিজাম আলি পাগল হয়ে বনে ঢোকে। এজাজ আহমেদের সন্দেহ, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে নিজাম আলির যোগসূত্র রয়েছে। নিজাম আলির সঙ্গে সত্যিই মুক্তিবাহিনীর সম্পর্ক আছে কি না তা লেখক স্পষ্ট করেননি। পঞ্চমত পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রফিক বারবার বলে, আমরা একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। স্কুলের জানালা দিয়ে বারবার বাইরে জঙ্গলের দিকে তাকায়। মেজর এজাজ তাকে সন্দেহ করেন। মেজর এজাজের এরূপ সন্দেহ ঠিক কি না'তা স্পষ্ট হওয়ার আগেই রফিক নিঃসংকোচে মৃত্যুকে মেনে নেয়। ষষ্ঠত জয়নাল মিয়া স্বীকার করে মধুবন জঙ্গলে প্রায় একশ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। তাদের ছয়-সাতজন আহত হয়ে কৈবর্তপাড়ায় অবস্থান করছে। রফিক জানায়, জয়নাল মিয়া ভয়ের কারণে এসব বানিয়ে বলছে। এসব জয়নাল মিয়ার বানিয়ে বলা নাকি সত্য কথা, লেখক তার মীমাংসা করেননি।
তাই বলা যায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
নীলগঞ্জের দুজন বিদেশি মানুষের মধ্যে একজন আজিজ মাস্টার। তার পুরো নাম আজিজুর রহমান মল্লিক। সে নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার এবং সেই একমাত্র শিক্ষক ওই স্কুলের। সে একজন ভালো কবি। তার সব কবিতাই একজন নারীকে নিয়ে। আর সেই নারী হলো মালা। মালা জয়নাল মিয়ার বড় মেয়ে। জয়নাল মিয়ার বাড়িতেই আজিজ মাস্টার থাকে। মালাকে সে' বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে ডেকেছে তার কবিতায়। কখনো ডেকেছে স্বপ্ন-রানী, কখনো বলেছে কেশবতী, আবার কখনো বলেছে অচিন পাখি। মালা মাঝে মাঝে তাকে ভাত বেড়ে দেয়। সে সময়টা আজিজ মাস্টারের কাছে বড় অস্বস্তি লাগে। মালা যখন তাকে বলে, 'মামা, আরেকটু ভাত দেই?' তখন কোনো কারণ ছাড়াই আজিজ মাস্টারের কান লাল হয়ে যায়। আজিজ মাস্টার মালাকে নিয়ে 'মালা রানী' নামে দীর্ঘ একটি কবিতা রচনা করেছে। কবিতাটি 'কিষাণ' পত্রিকায় পাঠাবে কি না তা নিয়ে সে বেশ চিন্তিত। আজিজ মাস্টার মালাকে দেওয়ার জন্য একটি আয়না কিনেছিল। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর সে সেই আয়না মালাকে দিয়েছিল।
"নিম্নশ্রেণির প্রাণীরা অনেক কিছু বুঝতে পারে। তাঁরা টের পায়।"- আলোচ্য উক্তিটি করা হয়েছে নীলগঞ্জ গ্রামে যখন মিলিটারি প্রবেশ করে তখন। '১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। অল্প দৈর্ঘ্যের এই উপন্যাসে লেখক যুদ্ধের একটি পরিপূর্ণ দৃশ্য অঙ্কন করেছেন। উপন্যাসটি এগিয়ে গেছে নীলগঞ্জ নামক একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। লেখক এ উপন্যাসে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবনধারার নানা বিষয় তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের একটি অন্যতম বিষয় হলো নিম্নশ্রেণির প্রাণীর প্রসঙ্গ। ১৯৭১ সালের পয়লা মে মীর আলির বাড়ির সামনে দিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে প্রায় পঞ্চাশ সদস্যের মিলিটারির একটি দল প্রবেশ করে। সে সময় মীর আলি তার উঠোনে বসে ছিল। মিলিটারির চলে যাওয়া মীর আলি বুঝতে পারে না। সে ভীত হয়ে তার ছেলেকে ডাকতে থাকে। কিন্তু তার সাথে বসে থাকা কুকুরটি তারস্বরে ডাকতে থাকে। কুকুরটি একসময় ডাকা বন্ধ করে দেয় এবং মিলিটারির পেছনে পেছনে যায়। কুকুরটি কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। তারপর ফিরে আসে মীর আলির কাছে। কুকুরটি চুপ করে যায়। এর মাধ্যমে মূলত বোঝনো হয়েছে যে কুকুরটি নিম্নশ্রেণির প্রাণী হলেও তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা অনেক বেশি। মীর আলি যা বুঝতে পারেনি হয়তো কুকুরটি তা বুঝতে পেরেছিল।
নিম্নশ্রেণির প্রাণীরা অনেক কিছু বুঝতে পারে তার প্রমাণ আমরা আরও একবার পাই। চিত্রা বুড়ি কালীমন্দিরে থাকা অবস্থায় মিলিটারির দল মন্দিরের সামনে দিয়ে যায়। কুকুরগুলো মিলিটারির উপস্থিতি টের পেয়েছিল বলেই একসঙ্গে চেঁচাচ্ছিল। মানুষ যা বুঝতে পারে না বা দেরি করে বোঝে, নিম্নশ্রেণির প্রাণীরা তা দ্রুতই অনুধাবন করতে পারে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের আচরণে।
সুতরাং প্রশ্নোক্ত উক্তিটি নিম্নশ্রেণির প্রাণীদের ক্ষেত্রে যথার্থ হয়েছে।
"দুজন বিদেশি লোক আছেন নীলগঞ্জে।"- এই দুজন লোকের একজন হলেন নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব, অন্যজন হলেন নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের 'হেডমাস্টার আজিজুর রহমান মল্লিক। তাদেরকে বিদেশি বলা হয়েছে কারণ তারা কেউই শুরু থেকে নীলগঞ্জ গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নন। ইমাম সাহেব অন্য এলাকায় থাকতেন। তবে এত জায়গা থাকতে তিনি কেন এই দুর্গম এলাকায় এসেছেন, তা নিয়ে সন্দেহ জাগে। আর আজিজ মাস্টার হলো দ্বিতীয়জন। সে এ গ্রামে এসেছে স্কুলের শিক্ষকতা করতে। তৎকালীন সমাজের মানুষদের কাছে নিজের গ্রাম বা এলাকার বাইরের কোনো এলাকাই বিদেশ বলে পরিগণিত হতো। তাই তারা নিজ গ্রামের বাইরের লোকদের বিদেশি মানুষ হিসেবে সম্বোধন করত। আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেবকেও এ কারণে বিদেশি বলা হয়েছে।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের বিদেশি দুজন ব্যক্তি হলো নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব আর নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজুর রহমান মল্লিক। ইমাম সাহেব সাদাসিধা, সহজ-সরল মানুষ। তিনি মসজিদে নামাজ পড়ান, সেখানেই থাকেন। মাসের পনেরো দিন এই গ্রামেরই জয়নাল মিয়ার বাড়িতে খাবার খান। আর বাকি পনেরো দিন পালাক্রমে অন্য বাড়িতে খান। তিনি কিছুদিন পূর্বে এ গ্রামেই বিয়ে করে স্থায়ী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। কিন্তু সেই ব্যাপারে কেউ উৎসাহ দেখায় না। ইমাম সাহেব লোকটা ভীতু। যার প্রমাণ পাওয়া যায় গ্রামে মিলিটারি ঢোকার দৃশ্য দেখার পর তার অবস্থা দেখে। তিনি এতটাই ভীতু যে সেদিন নামাজ না পড়েই চলে যেতে চাইছিলেন এবং শেষপর্যন্ত অতি সংক্ষেপে নামাজ আদায় করে চলে যান।
আজিজ মিয়াও ভালো মানুষ। পঁয়ত্রিশের মতো বয়স। সে নীলগঞ্জ গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ। তবে সে রোগা মানুষ, নানা অসুখ লেগেই থাকে। প্রধান অসুখ হাঁপানি। শীতকালে তা বেড়ে যায়। সে কবিতা লেখে। তার তিনটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়।সে একজনের জন্য কবিতা লেখে। সে হলো মালা। মালা নীলগঞ্জ গ্রামের অবস্থাপন্ন জয়নাল মিয়ার মেয়ে, যার বাড়িতে আজিজ মিয়া থাকে। সে বিএ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। গ্রামের লোকজন তাকে যথেষ্ট সমীহ করে। গ্রামে মিলিটারি আসার পরে আজিজ মাস্টারকে নিয়ে যায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। ভীতু প্রকৃতির আজিজ মাস্টারের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তারপরও মেজর এজাজ তাকে সন্দেহ করেন এবং তাকে হীনভাবে-অপমান করেন। একজন ভীতু সহজ-সরল মানুষও যে অস্তিত্বের লড়াইয়ে বিপ্লবী হয়ে ওঠে তার প্রমাণ পাওয়া যায় আজিজ মাস্টার চরিত্রের মধ্য দিয়ে।
নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি দল প্রবেশ করে পয়লা মে ১৯৭১ সালে। প্রায় ফজরের নামাজের আগ মুহূর্তে তারা গ্রামে ঢোকে।
গ্রামে মিলিটারি প্রবেশের বিষয়টি সবার আগে টের পায় মীর আলি। কিন্তু সে অন্ধ হওয়ায় বুঝতে পারেনি এরা কারা। এরপর দেখতে পায় চিত্রা বুড়ি। সে কালীমন্দিরে শুয়ে ছিল। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারেনি। বরং সে ভেবেছিল এরা ডাকাত। এরপর মিলিটারি দলকে দেখতে পায় নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব এবং সেই প্রথম বুঝতে পারে গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে, মিলিটারি গ্রামে ঢুকে মীর আলির বাড়ির সামনে দিয়ে সেনবাড়ির কালীমন্দির হয়ে মসজিদ পেরিয়ে স্কুলঘরে প্রবেশ করেছিল। তারা প্রবেশের সময় মার্চ করছিল না বরং এলোমেলোভাবে চলছিল। তাদের সাথে নীল শার্ট ও ফুলপ্যান্ট পরা একজন লোক ছিল, যার নাম রফিক। মিলিটারি দলটির অধিনায়ক ছিলেন মেজর এজাজ।
"বিপদের সময় নিজ গোত্রের মানুষের কথাই প্রথম মনে পড়ে।"- উক্তিটি করা হয়েছে যখন গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করে তখন চিত্রা বুড়ির ভাবনাকে কেন্দ্র করে।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস হলেও এ উপন্যাসে লেখক নানা বিষয় তুলে ধরেছেন। নীলগঞ্জ নামক প্রত্যন্ত এক গ্রামের জীবনাচার, তাদের বিশ্বাস, তাদের ধারণা এরকম নানা বিষয় তিনি উপন্যাসে আলোকপাত করেছেন। নীলগঞ্জ গ্রামের-পাশেই কৈবর্তদের বসবাস। তাদের জীবনবোধ ও জ্ঞাতিত্ববোধের চিত্র তিনি সুনিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন। কৈবর্তপাড়ার একজন হলো চিত্রা বুড়ি। মনা কৈবর্ত তার ছেলেকে খুন করে। সে পুত্রহত্যার বিচার চায় নীলু সেনের কাছে। এসব দ্বন্দ্বের কারণে চিত্রা বুড়িকে তার নিজ গোত্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে সে সেনবাড়িতে থাকে। তবু সে মিলিটারি ঢোকার পর সেই খবর সর্বপ্রথম কৈবর্তপাড়ায় পৌছে দেওয়াকেই প্রাধান্য দেয়। এটা মানুষের মানবীয় প্রবৃত্তি। তার আপন মানুষদের সঙ্গে যতই খারাপ সম্পর্ক বা অমিল থাকুক না কেন, মনের অন্তরালে তাদের জন্য গভীর টান থেকেই যায়। যা আমরা দেখতে পাই চিত্রা বুড়ির মাঝে।
সে যখন প্রথম মিলিটারিকে দেখে তখন সে আজিজ মাস্টারকে খবর দেওয়ার কথা ভাবে। সেনবাড়িতে খবর দেওয়ার কথা ভাবে। আবার কৈবর্তপাড়ায়ও খবর দেওয়ার কথা ভাবে। কিন্তু এদের সবার মাঝে সে নিজের স্বগোত্রীয়দের কথাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়। তারপর সে কালীমন্দিরের চাতাল থেকে নেমে আসে। এর মাধ্যমে মূলত বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, আপৎকালীন সময়ে মানুষের মনে আপনজনেরাই সর্বাগ্রে গুরুত্ব পেয়ে থাকে। তাছাড়া উপন্যাসে দেখা যায়, কৈবর্তপাড়ার মানুষের মধ্যে একতা ছিল। যখন তাদের গ্রাম থেকে পালানোর সময় হয় তখন নীরবে সবাই কাজ করে যায়। কোনো হইচই নেই। তারা যেন একজন হয়ে সব করছে। কৈবর্তদের এরূপ ঐক্যের প্রকাশ চিত্রা বুড়ির চেতনার মধ্যে ঘটেছে।
রাসমোহন নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের দপ্তরি ও দারোয়ান। সে রাতে স্কুলঘরেই ঘুমায়। সে-ই মিলিটারি কর্তৃক আজিজ মাস্টারকে ডাকার কথা জানায়। রাসমোহনের বর্ণনামতে, সে স্কুলঘরে ঘুমাচ্ছিল। চারদিক তখনও অন্ধকার ছেয়ে ছিল। কে যেন তার পায়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মুখে টর্চের আলো ফেলল। সে উঠে দেখে স্কুলে মিলিটারি গিজগিজ করছে। চার-পাঁচশ জনের বেশি মিলিটারি ছিল সেখানে। সবাই ছিল মস্ত জোয়ান যুবক। তাদের হাতে অস্ত্রপাতি ছিল। তারা বাংলায় কথা বলছিল। রাসমোহনকে নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করেছে। এরপর তারা আজিজ মাস্টারকে ডাকার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেয়। মিলিটারি দেখে রাসমোহন প্রচন্ড ভীত ছিল, যা তার আচরণে বোঝা যাচ্ছিল।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজের ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিশোধস্পৃহার প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক- মন্তব্যটি যথার্থ।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার চিত্র এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের কাছে ধর্ম ছিল একটি মুখোশ মাত্র। তারা শুধু জাতিগত বিদ্বেষের কারণে বাঙালিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাত।
'১৯৭১' উপন্যাসের আখ্যানভাগে দেখা যায়, পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ তার সৈন্যবাহিনী নিযে নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করে। তার ধারণা নীলগঞ্জ গ্রামের পাশে কৈবর্তপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল লুকিয়ে আছে। তাদের সন্ধান পাওয়ার জন্য সে নীলগঞ্জ গ্রামের মানুষদের ওপর অমানবিক অত্যচার চালায়। অবশ্য উপন্যাসের বর্ণনায় এটাও জানা যায়, মেজর এজাজের এরূপ আচরণের নেপথ্যে ব্যক্তিগত ক্ষোভও ছিল। মেজর এজাজের ক্ষোভ তার বন্ধু মেজর বখতিয়ারের নিখোঁজ হওয়া। যদিও তিনি সন্দেহের সাগরে ভাসছিলেন। কিন্তু এই ক্ষোভ থেকেই তিনি শুরু করেন একপক্ষীয় যুদ্ধ। একপক্ষীয়ই বটে। যেখানে প্রতিপক্ষ হিসেবে কেউ থাকে না, সেখানে যুদ্ধ তো একপক্ষীয়ই। এজাজ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের ওপর। তিনি যুদ্ধকে আরোপ করেছেন তাদের ওপর। পুরো পরিস্থিতিকে বিরোধীপক্ষ ধরে নিয়ে তিনি ছক করেছেন যুদ্ধের। কিন্তু প্রতিপক্ষ যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নেই সেখানে যুদ্ধের যেকোনো পদক্ষেপই অন্যায্য হতে বাধ্য।
মেজর এজাজের কাছে এটাই যুদ্ধ। এটাকে তিনি বৈধতা দিতে চেয়েছেন সারভাইভালের প্রশ্ন হিসেবে, বীরত্ব হিসেবে। যুদ্ধের নামে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর আগ্রাসী হামলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাই প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথাযথ বলে আমি মনে করি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত '১৯৭১' উপন্যাসটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দলিল হিসেবে স্বীকৃত। হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসের শুরু করেছেন মীর আলির বর্ণনা দিয়ে। উপন্যাসের প্রথম লাইন- মীর আলি চোখে দেখে না। চোখে না দেখলেও বৃদ্ধ মীর আলি তার প্রত্যহ সময় অতিবাহিত করতে কিছু কাজ করে। লেখক মীর আলির পরিবারের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন মীর আলির বড় ছেলে বদিউজ্জামানের তিন বছর বয়সের একজন মেয়ে আছে। দিনের বেলায় মীর আলির কাজ হচ্ছে নাতনি পরীবানুকে কোলে নিয়ে বারান্দায় বসে থাকা। দাদাকে সে খুবই পছন্দ করে। মীর আলিও জগতের অনেক জটিল বিষয় নিয়ে পরীবানুর সঙ্গে কথা বলে। মীর আলি তিন বছরের পরীবানুর মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। সুতরাং বলা যায়, দিনের বেলায় মীর আলির অন্যতম কাজ হচ্ছে পরীবানুকে কোলে নিয়ে বারান্দায় বসে থাকা এবং তার সঙ্গে গল্প করা।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদ রচিত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এ উপন্যাসে বিধৃত হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা যুদ্ধকালীন তাদের বর্বরতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়। '১৯৭১' উপন্যাসের আখ্যানভাগে দেখা যায়, নীলগঞ্জ এক প্রত্যন্ত অঞ্চল। একদিন পাকিস্তানি মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে নীলগঞ্জে আসে। গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে পাকিস্তানিরা মুসলমানদের কিছু করে না। তাই তারা গ্রামের মহিলাদের দূরে সরানোর কথা ভাবলেও সেটা বাদ দেয়। কিন্তু গ্রামবাসীর বিশ্বাস ছিল ভিত্তিহীন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আসলে কোনো নারীকেই সম্মান করত না। যার প্রথম প্রমাণ মেলে মিলিটারি কমান্ডার এজাজ কর্তৃক আজিজ মাস্টারকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়। মালা সম্পর্কে মেজর এজাজের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা শোনার যে ভঙ্গিমা তাতেই-নারী সম্পর্কে তার নিকৃষ্ট মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। এরপর আমরা দেখতে পাই সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও তার বারো বছরের শ্যালিকাকে ধর্ষণের ঘটনা। বাড়ের রাতে নিজ বাড়িতে রাজাকার ও মিলিটারি মিলে তাদের সম্ভ্রমহানি করে। উপন্যাসের বহু জায়গায় এরকম নারী নির্যাতন ও নারী লাঞ্ছনার দৃশ্য দেখা যায়।
আমরা দেখতে পাই মনা কৈবর্তকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মেজর এজাজ কীভাবে তার স্ত্রী সম্পর্কে জানতে চাইছিলেন- সে কেমন রূপবর্তী। সে কোথায় থাকে প্রভৃতি। এখানেও এজাজের নিকৃষ্ট চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। যার দ্বারা তিনি নারীদের লাঞ্ছিত করতে ইচ্ছুক, সেই ধারণা পাওয়া যায়। আবার জয়নাল মিয়াকে তার মেয়ের সম্পর্কে জানতে চাওয়ার সময়ও আমরা দেখতে পাই, একজন পিতার সামনে তার মেয়েকে লাঞ্ছিত করার ইশারা দিতে পিছপা হননি মেজর এজাজ। এভাবেই উপন্যাসের অনেক জায়গায় নারী লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের বিষয় উঠে এসেছে, যা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারীলোলুপ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে মীর আলি একজন অন্ধ বৃদ্ধ। সে একা একা চলাফেরাও করতে পারে না সেই অর্থে। উপন্যাসে দেখা যায়, মীর আলির জন্য তার ছেলে ঘরে চা-পাতা এনে রেখেছে, কিন্তু অনুফার তাকে চা বানিয়ে দেওয়ার কথা খেয়ালই থাকে না। মীর আলি প্রতিদিন বেশ জোরে জোরে কাশে, যাতে অনুফার শ্বশুরকে চা দেওয়ার কথা মনে পড়ে; কিন্তু এতেও কাজ হয় না। এরকমই একদিন সে কাশতে থাকে। কিন্তু অন্যদিনের মতো না হয়ে অনুফা তাকে চা এনে দেয়। চায়ে তেজপাতা দেওয়া সুন্দর গন্ধ। এতেই মীর আলি অভিভূত হয়ে পড়ে। তার মনে অনুফার জন্য মমতাবোধ অনুভূত হয়। অনুফাকে সুন্দর সুন্দর কথা বলতে ইচ্ছা করে। অর্থাৎ সত্তরোর্ধ্ব একজন মানুষের সাথে প্রতিদিন হয়ে যাওয়া একটি বিষয়ের ব্যতিক্রমে তার মনে কী রকম পরিবর্তন দেখা যায় তাই বোঝা যায় মীর আলির অভিভূত হওয়ার দ্বারা।
মেজর এজাজ রেশোবা গ্রামের জনৈক অন্ধ পিতার সন্তান উল্লেখের মাধ্যমে উপন্যাসটি ভিন্ন তাৎপর্যে পরিবেশিত হয়।-উক্তিটি যথার্থ।
লেখক. '১৯৭১' উপন্যাসের দৈর্ঘ্য বড় করেননি, তবে এর মধ্যে পুরে দিয়েছেন রহস্যের ভান্ডার। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রহস্য রেখে গেছেন। পাঠকহৃদয়কে চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন। উপন্যাসের প্রয়োজনে লেখক বেশ কিছু চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। তবে আলোচ্য উপন্যাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং প্রধান চরিত্র হলো মেজর এজাজ। মেজর এজাজ উপন্যাসে একজন নির্দয় ও অত্যাচারী চরিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে তার বলা অন্ধ পিতার সন্তান কথাটি পাঠকহৃদয়কে নতুন করে ভাবায়।
উপন্যাসের শুরুতে এসব কথা খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। উপন্যাসের মূল অংশের বাইরের অংশ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু উপন্যাসটির ছোট আয়তনের কথা মাথায় রাখলেই ধারণা করা যায় যে এটিও উপন্যাসেরই অংশ।
মেজর এজাজ যদি বেশ রূপবান তরুণই হন, অখ্যাত গ্রাম থেকে উঠে আসা তরুণই হন, তার পিতা যদি মীর আলির মতো অন্ধই হন, তাহলে উপন্যাসে মেজর এজাজের কথা নতুন করে ভাবতে হয়। কারণ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তিনি যেসব কর্মকাণ্ড করছেন তা সম্পূর্ণ বিপরীত। তার গ্রামের বা পিতার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তার কখনোই খারাপ মানুষ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কেন তিনি নীলগঞ্জ গ্রামে এসে এরকমভাবে অত্যাচার-নিপীড়ন চালান তা নিয়ে সন্দেহ জাগে। পাঠকরা পড়ে যান দ্বিধাদ্বন্দ্বে।
নীলগঞ্জে তার কর্মকাণ্ডকে তার ব্যক্তিগত স্বভাব হিসেবে না দেখে দেখতে হয় কাঠামোগত সন্ত্রাস হিসেবে। এই কাঠামোগত সন্ত্রাসের উৎস সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা করে। তাই বলা যায়, প্রশ্নে উল্লিখিত কথাটি চিন্তা করলে উপন্যাসটি অন্য এক তাৎপর্যে পরিবেশিত হয়।
আলোচ্য উক্তিটি বলা হয়েছে মেজর এজাজ যখন মীর আলিকে বৃদ্ধ ও অন্ধ মানুষ হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করে সালাম দেন এবং রফিককে বলেন যে, তার বাবাও আন্ধ, তিনিও রেশোবা গ্রামে এভাবেই উঠানে বসে থাকেন- সেই প্রসঙ্গে। মেজর এজাজ মীর আলির মাঝে তার বাবার চিত্র দেখতে পেয়ে তাকে সহানুভূতি দেখান ঠিকই কিন্তু একই গ্রামের অন্য মানুষের ওপর যে অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতা চালিয়েছেন তা বিপরীতধর্মী কর্মকাণ্ড। তখনই রফিক আলোচ্য উক্তিটি করেছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে তার বাবা অন্ধ, বৃদ্ধ মানুষ, তার ওপর যেমন এজাজের ভালোবাসা-আছে, তেমনই তো নীলগঞ্জ গ্রামের এরাও মানুষ, এদের প্রতিও তো ডালোবাসা প্রকাশ করা দরকার। কিন্তু তা হয় না। এতেই এজাজের প্রকৃত ক্ষোভের জায়গা পাওয়া যায়। তা হলো কাঠামোগত সন্ত্রাস ও জাতিগত বিদ্বেষ, যা এজাজের চোখে বিভাজিত করে মানুষকে।
'১৯৭১' উপন্যাস। হুমায়ূন আহমেদ এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রত্যন্ত এক অঞ্চলের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের আখ্যানভাগে দেখা যায়, নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারির অফিসার মেজর এজাজ তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করে। তাদের ধারণা নীলগঞ্জ গ্রামের কৈবর্তপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর একটা দল লুকিয়ে আছে। এই সন্দেহের ওপর ভিত্তি করেই তারা গ্রামবাসীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। উপন্যাসটি পাঠ করলে মুক্তিযুদ্ধকালীন অবস্থা এবং হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। মূলত বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাসকে সমুন্নত রাখা, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের কাহিনি পৌছে দেওয়াসহ আরও নানাবিধ কারণে উপন্যাসটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
এ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ একেবারে ছক কষে কষে মাটি, মানুষ, প্রাকৃতিক ও মনুষ্য নির্মিত অবকাঠামো এঁকে বাংলার এক নিভৃত গ্রামকে বানিয়ে তুলেছেন যুদ্ধের ময়দান।
একই পাকিস্তানের মানুষ হয়ে, মুসলিম হয়েও জাতিগত বিদ্বেষ কীভাবে একটি জাতিকে গণহত্যার শিকার হতে বাধ্য করেছিল তা ফুটে উঠেছে এখানে। পৃথিবীর সব মুসলিম ভাই ভাই- এ বাণী প্রচার করেও তারা নির্বিচারে হত্যা করেছে হাজার হাজার বাঙালিকে। কীভাবে একটি গ্রামের সাধারণ নিরস্ত্র মানুষ হয়ে উঠেছে ভীতু থেকে সাহসী, সাধারণ থেকে অসাধারণ- তা-ই উঠে এসেছে হুমায়ূন আহমেদের লেখায়।
প্রতিপক্ষহীন যুদ্ধে কীভাবে আমাদের মানুষকে গণহত্যা করা হয়েছে সেই দৃশ্য উঠে এসেছে এই উপন্যাসে, যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে দেবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সত্যতা। তাই বলা যায়, '১৯৭১' উপন্যাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
আজিজ মাস্টারের জন্য সবাই ছাতিম গাছের নিচে অপেক্ষা করে। কারণ স্কুলঘরের ভেতরে মিলিটারি হেফাজতে থাকা আজিজ মাস্টারকে নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা, মিলিটারি নিয়ে আগ্রহ এবং ভয়। মিলিটারি নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশের পর মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ স্কুলের দপ্তরি রাসমোহনের মাধ্যমে আজিজ মাস্টারকে স্কুলঘরে ডাকেন। কিন্তু আজিজ মাস্টার ভীতু লোক। সে কিছুতেই একা সেখানে যেতে চাইছিল না। অবশেষে জয়নাল মিয়াসহ ছয়জনের একটি দল স্কুলঘরের দিকে রওয়ানা দেয়। যদিও নেতৃত্ব দেয় আজিজ মাস্টার। স্কুলঘরে পৌছানোর পর রফিক তাকে মেজর এজাজের কাছে নিয়ে যায়। বাকিদের স্কুলঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বলা হয়। কিন্তু তারা চলে যায় না। তারা অপেক্ষা করতে থাকে স্কুলঘর থেকে বেরিয়ে এসে জুম্মাঘরের কাছে ছাতিম গাছের নিচে। তারা আজিজ মাস্টারের অপেক্ষায় বসে থাকে সেখানে। এর পেছনের কারণ হলো তাদের ঔৎসুক্য। তারা জানতে চায় আজিজ মাস্টারের সঙ্গে স্কুলঘরের ভেতরে কী ঘটে! এর আগে গ্রামে এরকম ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। এক দিক দিয়ে প্রচন্ড ভয়, আরেক দিকে মিলিটারি সম্পর্কে তাদের আগ্রহ এবং সেই সঙ্গে নানা রকম চিন্তা-ভাবনা, দুশ্চিন্তা তাদের ভেতরে উঁকি দিচ্ছিল।
ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ '১৯৭১' উপন্যাসে একেবারে ছক কষে- মাটি, মানুষ, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট অবকাঠামো এঁকে বাংলার এক নিভৃত গ্রামকে বানিয়ে তুলেছেন যুদ্ধের ময়দান। যেখানে তিনি সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ না করলেও খন্ড খন্ড অংশের মাধ্যমে। পুরো মুক্তিযুদ্ধের চিত্র তুলে আনতে চেষ্টা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। '১৯৭১' উপন্যাসে হঠাৎ একদিন নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি দলের প্রবেশ। গ্রামের লোকজন জানেও না মিলিটারি কেন তাদের গ্রামে প্রবেশ করেছে। তারা তাদের অজান্তেই প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে।
শুরুতেই আমরা দেখতে পাই নীলু সেনকে বিনা কারণে হত্যার ঘটনা। যার মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশব্যাপী ধর্মের দোহাই দিয়ে ঘটে যাওয়া নির্বিচারে গণহত্যাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আবার আমরা দেখতে পাই সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও বারো বছরের শ্যালিকার সম্ভ্রমহানির ঘটনা। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন আমাদের দেশের নারীদের ওপর হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের দৃশ্য অনুমান করতে পারি। এরপর ইমাম সাহেবের ওপর করা শারীরিক নিপীড়নের চিত্র দেখতে পাই এ উপন্যাসে। যার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় কীভাবে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের দেশে এসে আমাদের দেশেরই নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।
পর সফদরউল্লাহ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ থেকে উপন্যাসের প্রতিবাদী চরিত্র। যে হাতে দা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় প্রতিশোধের স্পৃহায়। আবার এই ঝড়ের সুযোগ নিয়েই পাগল নিজাম ছুটতে ছুটতে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে সংবাদ পৌছে দিতে সক্ষম হয় মুক্তিবাহিনীর কাছে। যার ফলে তারা নিরাপদে এলাকা ছাড়তে পারে।
এই ঝড়ের মতো নানা বিপর্যয়ের ফলেই ধীরে ধীরে পাকবাহিনীর সহযোগী রফিকের চরিত্রে আমরা দেখতে পাই সাহসী পরিবর্তন। যে রফিক মেজর এজাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, একটুও ভীত না হয়ে এজাজের আশু ধ্বংসের বার্তা প্রচার করে। মেজর এজাজের সঙ্গে রফিকের গড়ে ওঠে একটি গভীর দ্বন্দ্ব, যা শেষ পর্যন্ত গড়ায় রফিকের মৃত্যু পর্যন্ত। এভাবেই রফিকের নির্ভয় আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সূচনা হতে থাকে নতুন এক বাংলাদেশের।
তাই একথা, বললে অত্যুক্তি হবে না যে, '১৯৭১' উপন্যাসে কালবৈশাখি ঝড় নানা রকম ভূমিকা পালন করেছে, যার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মাঝে ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর উপন্যাসকে নিয়ে গেছে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে।
আজিজ মাস্টারের বেশ অবাক হওয়ার কারণ হলো মেজর এজাজের স্মৃতিশক্তি। আজিজ মাস্টারকে স্কুলঘরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথম দিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় এজাজ তার কাছ থেকে শুনেছিলেন গ্রামে কার কার বাড়িতে ট্রানজিস্টার আছে। আজিজ মাস্টার যার যার নাম বলেছে তাদের মধ্যে জয়নাল মিয়ার নামও ছিল। তার বাড়িতেও ট্রানজিস্টার আছে। পরবর্তী সময়ে যখন এজাজ আজিজ মাস্টারের কাছ থেকে শুনতে পান যে সে যাকে নিয়ে কবিতা লিখেছে তার নাম মালা এবং মালা সম্পর্কে বিস্তারিত শোনার সময় জানতে পারেন যে তার বাবার নাম জয়নাল মিয়া, তখন তিনি তার নাম শুনেই জানতে চান, যে জয়নাল মিয়ার বাড়িতে ট্রানজিস্টার আছে ইনি সেই জয়নাল মিয়া কি না। তখন মেজর এজাজের স্মৃতিশক্তি দেখে আজিজ মাস্টার বেশ অবাক হয়ে যায়। তিনি ভাবেন যে মেজর এজাজের মনেই আছে জয়নাল মিয়ার বাড়িতে ট্রানজিস্টার থাকার কথা।
'১৯৭১' উপন্যাসে কালবৈশাখি ঝড় নানা রকম ভূমিকা পালন করেছে। এজাজের সাহসিকতা ও বোধবুদ্ধির অন্যতম প্রমাণ দাখিল করা থেকে শুরু করে মুক্তিসেনাদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার কল্পিত কিংবা সত্য ঘটনা ঘটতে দেওয়া পর্যন্ত।
একটা গুরুতর ব্যাপার এই যে, ঝড়ে মীর আলির ঘরের চালাটি উড়ে যায় মানুষ এবং অপরাপর বস্তুসামগ্রী যথাস্থানে রেখেই; আর আমাদের জানানো হয় মীর আলির ভাগ্যে এর আগেও এই ঘটনা একবার ঘটেছিল। সেবার পরিবারটি দ্রুত সামলে ওঠে। কিন্তু এবারে প্রাকৃতিক পীড়নের পাশাপাশি এজাজদের প্রযোজনায় অধিকতর বিপর্যয়কর যে ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তার একমাত্র জোয়ান ছেলের ঘরে ফিরে আশার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, তা সামলে ওঠার কোনো আশা আর থাকে না। ঝড়কবলিত মীর আলিকে তাই একাত্তরের অন্যায় সমরে সংঘটিত মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে ধরে নেওয়াই সংগত।
ঝড়ের ফলেই মেজর এজাজের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হয় বলাই। এই ঝড়ের রাতেই স্ত্রী ও শ্যালিকার সম্ভ্রম হারানোর পর সফদরউল্লাহ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ থেকে উপন্যাসের প্রতিবাদী চরিত্র। যে হাতে দা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় প্রতিশোধের স্পৃহায়। আবার এই ঝড়ের সুযোগ নিয়েই পাগল নিজাম ছুটতে ছুটতে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে সংবাদ পৌঁছে দিতে সক্ষম হয় মুক্তিবাহিনীর কাছে। যার ফলে তারা নিরাপদে এলাকা ছাড়তে পারে।
এই ঝড়ের মতো নানা বিপর্যয়ের ফলেই ধীরে ধীরে পাকবাহিনীর সহযোগী রফিকের চরিত্রে আমরা দেখতে পাই সাহসী পরিবর্তন। যে রফিক মেজর এজাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, একটুও ভীত না হয়ে এজাজের আশু ধ্বংসের বার্তা প্রচার করে। মেজর এজাজের সঙ্গে রফিকের গড়ে ওঠে একটি গভীর দ্বন্দ্ব, যা শেষ পর্যন্ত গড়ায় রফিকের মৃত্যু পর্যন্ত। এভাবেই রফিকের নির্ভয় আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সূচনা হতে থাকে নতুন এক বাংলাদেশের।
তাই একথা, বললে অত্যুক্তি হবে না যে, '১৯৭১' উপন্যাসে কালবৈশাখি ঝড় নানা রকম ভূমিকা পালন করেছে, যার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মাঝে ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর উপন্যাসকে নিয়ে গেছে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে।
মেজর এজাজের মুখে আমরা শুনতে পাই, তিনি আজিজ মাস্টারকে বলেছেন যে, তারা মুক্তিবাহিনীকে খুঁজে বের করার জন্য তাদের অপারেশন শুরু করবেন। কিন্তু তাদের কাছে পর্যাপ্ত সৈন্য নেই, আরেকটি বড় বাহিনী আসবে তাদের সাহায্য করার জন্য। তারা তাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন। পরদিন ভোরে মিলিটারির দ্বিতীয় বাহিনীটি নীলগঞ্জ গ্রামে আসে। মেশিনগানের গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা গ্রামে প্রবেশ করে। তারা মার্চ করতে করতে গ্রামে ঢোকে। এরা অনেক দূর থেকে এসেছে, যার ফলে এদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে ক্লান্তির ছাপ। মার্চ করার সময় তারা প্রাণপণ চেষ্টা করছিল তাল মিলিয়ে পা ফেলার। তারা হয়তো সারা রাত ধরেই হেঁটেছে, কোথাও বিশ্রাম করেনি। এ কারণেই গ্রামে প্রবেশের সময় তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তি দেখা যাচ্ছিল।
'১৯৭১' উপন্যাসে লেখক মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান রচনা করেছেন। নীলগঞ্জ নামক এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর কর্মতৎপরতা এই উপন্যাসের মূল। পাকস্তিানি মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামে আসে মুক্তিবাহিনী লুকিয়ে থাকা সন্দেহে। গ্রামে আসার পরই মেজর এজাজ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। ভয় দেয়িয়ে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে তথ্য নিতে চায়। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপটে অস্তিত্বের ভয় কেটে গেলে মানুষ হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। যেমনটা আমরা দেখতে পাই জয়নাল মিয়ার মধ্যে। মেজর এজাজ জয়নাল মিয়াকে তার মেয়ের সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলে তার ভীতির সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করিয়েছেন। এছাড়া চোখের সামনে আজিজ মাস্টারকে আত্মসম্মানকে জীবন অপেক্ষা প্রাধান্য দিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে দেখে তার মাঝে সঞ্চিত হয় অসীম সাহস। যার ফলে জয়নাল মিয়ার ভেতরে থাকে না আর কোনো অস্তিত্বের সংশয়। সে জীবনের ভয় না করে শুরু করে এজাজের বিরুদ্ধে বুদ্ধির খেলা। সে এজাজকে তথ্য দেয় ঠিকই, কিন্তু সবই ছিল ভুল তথ্য।
সে মুক্তিবাহিনীর সম্পর্কে কিছু তথ্য নির্দ্বিধায় বলে দিলেও অনেক খবরই বলে না। যেমন, সে তাকে বলে সেখানে প্রায় একশজন সৈন্য আছে, তাদেরকে খাবার পাঠায় কৈবর্তরা, এ পর্যন্ত তিনবার খাবার পাঠিয়েছে, কিংবা সেখানে কতজন আহত আছে কিন্তু সে বলে না তাদের কাছে কত গোলাবারুদ আছে কিংবা কতজন অফিসার আছে। সে এজাজকে বলে যে মুক্তিবাহিনী জঙ্গলে নেই, তারা আছে কৈবর্তপাড়ায়, জেলেপাড়ায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুক্তিবাহিনী ওই জঙ্গলেই ছিল। যার পেছনে কারণ ছিল এজাজকে বিভ্রান্ত করা এবং মুক্তিবাহিনীকে নিরাপদে বের হতে দেওয়া অথবা যাতে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলিটারি মুখোমুখি হলে এজাজের ভুল ধারণার কারণে সংঘর্ষে তারা পরাজিত হয়।
সে জানে, সে যদি সঠিক তথ্য এজাজকে দিয়ে দেয় তাহলে তিনি মুক্তিবাহিনীকে ধরে ফেলতে সক্ষম হবেন, এতে শুরু হবে গণহত্যা। তাই সে এজাজকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে। তাই জয়নাল মিয়ার সবজান্তা গোয়েন্দার মতো তথ্য আওড়ানো ছিল মেজর এজাজকে আহমেদকে বিভ্রান্ত করার কৌশল মাত্র উক্তিটি যথার্থ।
পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য কৈবর্তপাড়ার লোকজন পাড়া ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। কারণ ইতোমধ্যে গ্রামে মিলিটারি কর্তৃক ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো সম্পর্কে প্রায় সবাই জেনে গেছে। মেজর এজাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে মনা কৈবর্তকে মেরে ফেলেছে, সঙ্গে তার ছোট ভাই বিরুকেও হত্যা করেছে। শুধু হিন্দু হওয়ার অপরাধে নীলু সেনকে মেরে ফেলা হয়েছে। এছাড়া ইমাম সাহেবের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন সম্পর্কেও গ্রামের সবাই জেনে গিয়েছিল। ফলে তাদের মাঝে একধরনের ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, জীবন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। এর ওপর সেদিন রাতের বেলায় মিলিটারি জঙ্গলে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। ফলে ভীত হয়ে কৈবর্তপাড়ার সবাই নিজেদের জীবন ও মালামালের নিরাপত্তার জন্য গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। তারা নিঃশব্দে অন্ধকারে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে সরে পড়ে। আমরা উপন্যাসে দেখতে পাই, সেই রাতেই কৈবর্তপাড়ায় আগুন দেওয়া হয়।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এ উপন্যাসের আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে নীলগঞ্জ নামক প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানি মিলিটারির একটি দল মেজর এজাজের নেতৃত্বে নীলগঞ্জ গ্রামে আসে মুক্তিবাহিনীর একটি দলের খোঁজে। তখন তার সঙ্গে দোভাষী হয়ে আসে রফিক। রফিক ছিল এজাজের দোসর। রফিক শুরু থেকেই মিলিটারির সহযোগী হিসেবে থেকেছে। কিন্তু সে নিজেকে তাদের একজন হিসেবে পরিচয় দেয়নি, বরং দিয়েছে একজন বাঙালি হিসেবে, প্রতিনিধিত্ব করেছে বাংলাদেশের মানুষের। মিলিটারি কমান্ডার এজাজের বিভিন্ন মতের সঙ্গেও সে দ্বিমত পোষণ করেছে।
মেজর এজাজ শুরু থেকেই রফিককে বিশ্বাস করতেন না। তার ধারণা, যারা বাঙালিদের বিশ্বাস করেছে তারা সবাই মারা পড়েছে। যেমনটা হয়েছিল তার বন্ধু মেজর বখতিয়ারের সঙ্গে। তাছাড়া শুরু থেকেই রফিকের মেজর এজাজের কথা অমান্য করার প্রবণতা থেকেও এজাজ তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন।
এর প্রমাণ আমরা পাই যখন সে নিজামকে পরিচয় করিয়ে দেয় একজন পাগল হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে ছিল মুক্তিবাহিনীর মিত্র। আবার যখন এজাজ তাকে আজিজ মাস্টারের বিশেষ অঙ্গে ইট ঝুলিয়ে দিতে বলেন তখন রফিক তার বিবেকবোধের কারণে সেই কাজ করে না। আবার আমরা শেষ দিকে বুঝতে পারি রফিক মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে অনেক কিছুই জানত। যেমন সে জানত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা কৈবর্তপাড়ায় অবস্থান করছে। কিন্তু মেজর এজাজ সেখানে তল্লাশি চালাতে চাইলে সে বলেছিল প্রয়োজন নেই। এর মাধ্যমে সে প্রকৃতপক্ষে মুক্তিবাহিনীকে বাঁচানোর চেষ্টাই করেছে। রফিক পদে পদে বিভ্রান্ত করেছে এজাজকে।
আবার ঝড়ের সময় নিজাম পাগলকে বনের ভেতর প্রবেশ করতে। দেখে তার উল্লসিত হওয়া দেখে মেজর এজাজ বুঝতে পারেন সে অনেক কিছুই জানত। কিন্তু শেষ দিকে গিয়ে মেজর এজাজের সন্দেহ তীব্র হয়ে ওঠে এবং তিনি বুঝতে পারেন রফিক সত্যিই তাকে এতদিন মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।
মূলত এসব কারণেই এজাজ রফিককে আর বিশ্বাস করতেন না। তাই উপন্যাসের শেষ দিকে এজাজ যখন মুক্তিবাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন তখনও এজাজ ভেবেছেন রফিক তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তাই রফিক এজাজকে বলেছে, "আপনি এখন আমার কোনো কথাই বিশ্বাস করবেন না।"
"তুমি দেখি দারুণ প্রেমিক মানুষ।"- এ কথাটি বলেছেন মেজর এজাজ। আজিজ মাস্টারের কবিতা 'শুনে তিনি তাকে এ কথা বলেছেন। আজিজ মাস্টার যত কবিতা লিখেছে তার প্রায় সবই প্রেমের কবিতা এবং একজন নারীকে নিয়েই লেখা। আর সেই নারী হলো জয়নাল মিয়ার মেয়ে মালা। আজিজ মাস্টার মালাকে পছন্দ করত। যেহেতু আজিজ মাস্টার মালাকে নিয়েই তার সব প্রেমের কবিতা লেখে তাই এজাজ তাকে দারুণ প্রেমিক মানুষ, বলেছেন। উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখতে পাই আজিজ মাস্টার একজন কবি মানুষ। গ্রামের সবাই' তার কবিতা সম্পর্কে জানে এবং তাকে সম্মান করে। প্রতিটি কবিতা একজন নারীকে কেন্দ্র করে লেখা। তাকে বিভিন্ন নামে ডেকেছে আজিজ মাস্টার তার কবিতায়। কখনো বলেছে স্বপ্নের রানী, কখনো কেশবতী, আবার কখনো অচিন পাখি।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের মানুষের ওপর নির্যাতনকারীদের প্রতিনিধিত্ব 'করেন। তার নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা আমরা উপন্যাসে বর্ণিত তার প্রতিটি কাজে দেখতে পাই। এমনই একটি উদাহরণ হলো ইমাম সাহেবের ওপর করা নির্যাতনের দৃশ্য। আজিজ মাস্টারের বর্ণনায় আমরা এর খানিকটা বুঝতে পারি।
আজিজ মাস্টারের বর্ণনা অনুযায়ী, সে যখন মেজর এজাজের নির্দেশে স্কুলঘরের টিচার্স রুমে যায়, সেখানে সে দেখতে পায় একটি চেয়ারে ইমাম সাহেব জড়সড়ো হয়ে বসে আছেন। ইমাম সাহেবের নাক-মুখ ফুলে গেছে। নিচের ঠোঁটটি কেটে গেছে। তার সাদা পাঞ্জাবিতে রক্তের ছোপ। কাটা ঠোঁট দিয়ে হলুদ রঙের রস পড়ছে। শুধু মনে ভয় ধরানোর জন্য ইমাম ও আজিজ মাস্টারের সামনে মনা কৈবর্ত ও তার ছোট ভাইকে হত্যা করেন মেজর এজাজ।
মনা কৈবর্তের হত্যার দৃশ্য দেখিয়ে আনার পর আবার ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হয়। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে। তাদের সংখ্যা কত? ইমাম সাহেব কখনো 'পাকিস্তানের জন্য দোয়া করেছেন কি না, বাংলাদেশের জন্য দোয়া করেছেন কি না এই প্রশ্নের জবাবে ইমাম সাহেব চুপ থাকায় হঠাৎ মেজর এজাজ তাকে প্রচন্ড জোরে একটা চড় বসিয়ে দেন। ইমাম সাহেব ব্যথা লাগেনি বলায় আবার 'প্রচন্ড জোরে তাকে চড় মারেন। এতে ইমাম সাহেব গড়িয়ে নিচে পড়ে যান। রফিক তাকে তুলতে গেলে এজাজ তাকে মানা করে বলেন যে তিনি নিজে নিজেই উঠবেন।
ইমাম সাহেব উঠে বসার পর আকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে তৃতীয়বারের মতো ইমাম সাহেবকে চড় মারেন মেজর এজাজ। এভাবেই '১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ যুদ্ধের নামে ইমাম সাহবের মতো অনেক নিরীহ মানুষের ওপর চালিয়েছেন অমানুষিক নির্যাতন।
বিরু হলো মনা কৈবর্তের ছোট ভাই। তার মাত্র এগারো বছর বয়স। মনার বিচারের জন্য এজাজ তাদের দুই ভাইকে তেঁতুল গাছের নিচে আনেন। তখন বিরু মেজর এজাজ ও তার বাহিনীকে দেখেই ভয় পেয়ে যায়। এ কারণেই সে মনার লুঙ্গির এক প্রান্ত শক্ত করে ধরে থাকে। এরপর যখন মেজর এজাজ এগিয়ে আসেন মনার দিকে তখন বিরু ভয় পেয়ে শক্ত হয়ে যায়। মেজর সাহেব তার দিকে তাকাতেই সে কুঁকড়ে যায়। তার চোখে-মুখে ভয়ের ছায়া পড়ে যায়। তার শিশুমন হয়তো অনেক কিছুই আগে থেকে বুঝতে পেরেছে। কারণ শিশুরা অনেক কিছুই বুঝতে পারে। মেজর এজাজ তাকে মনার লুঙ্গি ছাড়তে বললেও সে লুঙ্গি ছেড়ে দেয় না। বরং আরও গা ঘেঁষে দাঁড়ায় মনার। অতঃপর এজাজ তাদের দুজনকে হত্যার জন্য বিলের পানিতে নামিয়ে দেন। বিরু চিৎকার করে বলতে থাকে তার ভয় লাগছে। সে প্রাণপণে তার ভাইকে ধরে থাকে। তাই বলা যায় শিশুমনের অতিরিক্ত ভীতির কারণে বিরু তার ভাইয়ের লুঙ্গি ধরে টানাটানি করছিল।
"রাগ, ঘৃণা, হিংসা আমাদের মধ্যেও আছে, তোমাদের মধ্যেও আছে।"- মেজর এজাজের এই উক্তিটি সম্পর্কে আমি দ্বিমত পোষণ করছি।
হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি বিখ্যাত উপন্যাস হলো '১৯৭১'। এই উপন্যাসে লেখক নীলগঞ্জ নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামের যুদ্ধকালীন চিত্র তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের কাহিনি বিন্যাসে দেখা যায়, পাকস্তিানি মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামে মুক্তিবাহিনী লুকিয়ে আছে সন্দেহ করে তার সৈন্যদল নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন। গ্রামে আসার পরই তিনি সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন শুরু করেন। আর উপন্যাসে দেখা যায়, প্রসঙ্গক্রমে রফিকের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেন। এই কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার পেছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। প্রথমত, এখানে যে যুদ্ধের পটভূমি বর্ণিত হয়েছে সেটাকে কোনো যুদ্ধ বলা যায় না। কেননা যুদ্ধ হয় দুই পক্ষের মধ্যে। কিন্তু এই উপন্যাসে আমরা এজাজের বাহিনী ছাড়া আর কোনো প্রতিপক্ষকে দেখতে পাই না। এটি মূলত একপক্ষীয় ও সাধারণ নিরস্ত্র মানুষকে জোর করে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ঘোষণা করা একটি অন্যায় যুদ্ধ।
দ্বিতীয়ত, মেজর এজাজ শুধু ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে করা তার অত্যাচার-নির্যাতনকে বৈধতা দিতে চেয়েছেন বিভিন্নভাবে। কখনো এই যুদ্ধকে বলেছেন সারভাইভালের প্রশ্ন, আবার কখনো তার নৃশংসতাকে বলেছেন বীরত্ব।
তিনি তুলনা দিয়ে রফিককে বোঝাতে চেয়েছেন যে তার স্থানে অন্য কোনো বাঙালি সেনা থাকলেও সে একই কাজটি করত। কিন্তু এখানে প্রশ্ন জাগে, তাহলে তার মানবতা কোথায়? তার বিবেকের জায়গাটা কোথায়? নাকি আমরা ধরেই নেব যে যুদ্ধের ময়দানে মানবতা, বিবেকসম্পন্ন মানবিক গুণাবলির স্থান থাকে না? মেজর এজাজের সব যুক্তি, অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টার বিপক্ষে এই প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিলেই আমরা দেখতে পাই রাগ, ঘৃণা, হিংসা পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে থাকলেও এই সহজাত প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে করা সব কাজই সঠিক কিংবা বৈধ হয়ে যায় না। তাই প্রশ্নে উল্লিখিত মেজর এজাজের উক্তিটি শুধু সুশীলতার মুখোশ পরে-আওড়ানো বুলি ছাড়া অন্য কিছুই নয়।
মীর আলি সত্তর বছর বয়সি বৃদ্ধ লোক। নীলগঞ্জ গ্রামে সে তার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করে। তার পরিবারে চারজন সদস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে উপন্যাসে। মীর আলি নিজে, তার বড় ছেলে বদিউজ্জামান, বদিউজ্জামানের স্ত্রী অনুফা এবং তাদের মেয়ে পরীবানু। বদিউজ্জামানের মধুবন বাজারে মনিহারি দোকান আছে। সে প্রতিদিন দোকানের বেচাকেনা শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। অনুফা মীর আলির খেয়াল রাখে। তবে বদিউজ্জামান বাড়ি না থাকলে সে মীর আলির খাওয়াদাওয়ার দিকে অতটা খেয়াল রাখে না। বদিউজ্জামানের বিয়ের আগে তাদের সংসারের অবস্থা ভালো ছিল না। তবে বিয়ের পর থেকে সংসারের উন্নতি হয়েছে। তাদের এখন নতুন সাইকেল আছে, মীর আলির নতুন লেপ আছে। বদিউজ্জামানের মেয়ে পরীবানু, যে তার দাদার সঙ্গে থাকে বেশিরভাগ সময়। পরীবানুর বয়স তিন বছর। মীর আলিরও ওই একটাই কাজ। নাতনির সঙ্গে থাকলে তারও ভালো লাগে। সবাই মিলে তারা মোটামুটি ভালোই দিনাতিপাত করে।
"বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণা। অনেক কষ্ট।" এ কথাটি বলা হয়েছে বৃদ্ধ মীর আলি সম্পর্কে। সে সত্তর বছর বয়সি মানুষ, চোখে দেখে না। তবে সে কানে শুনতে পায়। তার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো রাতদুপুরে বাইরে যেতে হয়। কিন্তু সে একা যেতে পারে না। অন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কখনো তার ছেলে বদি তাকে নিয়ে যায়, আবার কখনো নিয়ে যায় পুত্রবধূ অনুফা।
এরকমই এক রাতে মীর আলির বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য। তখন সে তার ছেলে বদিকে ডাকে। কিন্তু বদি দোকান থেকে পরিশ্রম করে আসার ফলে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। তাই অনুফাই তাকে বাইরে নিয়ে যায়। অনুফা তাকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল বলে মীর আলির বড় লজ্জা লাগে। পুত্রবধূ হয়ে শ্বশুরের হাত ধরে বাইরে নিয়ে যাওয়া অনুফার জন্য যতটা লজ্জাজনক, মীর আলির কাছে তার চেয়েও বেশি। কিন্তু তার কাছে অন্য কোনো উপায়ও ছিল না।
ছেলে, ছেলের বউও তার খেয়াল রাখতে রাখতে একসময় বিরক্ত হয়ে পড়ে, যা আমরা দেখতে পাই বদির উক্তিতে। গভীর রাতে বাইরে যাওয়ার সময় বদি যখন বলে, "এখন থাইকা ঘরের মইধ্যে পেশাব করবেন। ঝামেলা ভালো লাগে না", তখনই বোঝা যায় বদি মীর আলির ওপর বিরক্ত।
বৃদ্ধ মীর আলি তার বয়সের ভারে অনেক কিছুই নিজে করতে পারে না। যার জন্য সে পরনির্ভরশীল, যা মীর আলিকে বিচলিত করে তোলে। নিজের কাছেই তার নিজেকে বিরক্তিকর মনে হয়। বৃদ্ধ মীর আলি হলো আলোচ্য উপন্যাসে গ্রামীণ প্রবীণ পিতার প্রতিনিধি। যারা বয়স হলে সংসারের বোঝায় পরিণত হয়। এজন্যই লেখক মূলত প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।
গ্রামে মিলিটারি প্রবেশের ব্যাপারটি চিত্রা বুড়ির কাছে অস্বাভাবিক লাগে। সবকিছু হারিয়ে চিত্রা বুড়ি সেনবাড়ির পাকা কালীমন্দিরের চাতালে ঘুমায়। পুরো রাত সে ঘুমায় না। কিছুক্ষণ পর পর ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সেদিন তার চোখের সামনে দিয়ে পুয়ো দলটি পার হয় কিন্তু বুড়ি তাদের চিনতে পারে না। সে ভাবে এরা ডাকাত দল। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় এই চিন্তাটাও আসে যে এরা এদিকে আসবে কেন। কারণ সেনরা এখন হতদরিদ্র। বুড়ি এগিয়ে গিয়ে দেখে ওরা কোন দিকে যাচ্ছে। একবার তার মনে হলো ওরা কৈবর্তপাড়ার দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এরপর মনে হলো, না, ওরা অন্যদিকে যাচ্ছে। এই পুরো ব্যাপারটি চিত্রা বুড়ির কাছে অস্বাভাবিক লাগে।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রাম থেকে মানুষদের ধরে নিয়ে এলে মেজর এজাজের সঙ্গে থাকা রফিক গ্রামের লোকদের আশ্বস্ত করার জন্য বলে, "ইনি লোক ভালো, ভয়ের কিছু নাই।" যদিও শেষ পর্যন্ত মেজর সম্পর্কে রফিকের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।
'১৯৭১' উপন্যাসে মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজের নেতৃত্বে একটা দল নীলগঞ্জ গ্রামে আসে একটা মিশনে। নীলগঞ্জ গ্রামের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ানদের ধরা এবং তার বন্ধু মেজর বখতিয়ারকে উদ্ধার করাই মূলত তার মিশন। তাই তিনি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রামের মসজিদের ইমাম, আজিজ মাস্টার প্রমুখকে ডেকে আনেন। কিন্তু তাদের চোখে-মুখে ভয় এবং মেজর এজাজের সঙ্গে কথা বলতে সংকোচ লক্ষ করে রফিক প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছিল।
বস্তুত উপন্যাসের শুরুতে আমরা মেজর এজাজকে একজন ভালো মানুষ হিসেবেই দেখি। উপন্যাসের শুরুতে তিনি কারও কোনো ক্ষতি করেন না এবং সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। আজিজ মাস্টারকে তিনি আপ্যায়ন করান এবং খুব সুন্দর করে কথা বলতে থাকেন। কিন্তু এরপর যত সময় গেছে তত আমরা মেজর এজাজের নৃশংস রূপ দেখতে পাই। তিনি কৈবর্তপাড়ার মনা এবং তার ছোট ভাই বিরুকে হত্যা করেন। নিলু সেনকেও তিনি হত্যা করেন। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে ইমাম সাহেব এবং আজিজ মাস্টারের ওপর নির্যাতন চালান। একসময় আজিজ মাস্টারকে তার নির্দেশে হত্যা করা হয় এবং সব সত্য জানার পর রফিককেও তিনি হত্যা করার জন্য নিয়ে যান। শুরুর দিকে ভালো ব্যবহার করলেও শেষে মেজর এজাজের বর্বরতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই বলা যায়, রফিকের ধারণা শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়।
'১৯৭১' হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি উপন্যাস। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে নীলগঞ্জ নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামকে কেন্দ্র করে। সেই গ্রামে মুক্তিবাহিনীর একটি দল লুকিয়ে আছে এমন সন্দেহে মিলিটারি মেজর এজাজ তার দলবল নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করেন। গ্রামে আসার পর থেকেই তারা গ্রামবাসীর প্রতি নির্মম নির্যাতন চালায়। '১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করে শেষরাতে। মিলিটারি প্রবেশের বিষয়টি প্রথম বুঝতে পারেন নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব। আজানের আগে সুরা ইয়াসিন পড়ার সময় তিনি দলটিকে দেখতে পান। কিন্তু শুরুতে তিনি বুঝতেই পারেন না যে গ্রামে মিলিটারি এসেছে। কারণ নান্দাইল রোডে কিংবা সোহাগীতে এখনো পর্যন্ত মিলিটারি আসেনি। এজন্য তিনি কার্য স্থির করতে পারছিলেন না যে তিনি বসে থাকবেন নাকি গ্রামের সবাইকে খবর দেবেন। আবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি মুসল্লিদের জিজ্ঞেস করছিলেন যে তারা কিছু দেখেছে কি না।
'১৯৭১' উপন্যাসটি হুমায়ূন আহমেদের একটি যুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাস। যেখানে একটি যুদ্ধের মাধ্যমে কাহিনিকে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিতে প্রবেশ করানো হয়েছে। উপন্যাসে একপক্ষীয় যুদ্ধ দেখানো হয়, যেখানে পাকিস্তানি মিলিটারি উপস্থিত কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষ বাঙালি সেনা অনুপস্থিত। উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে পাকিস্তানি সেনাদের তন্ডব দেখা যায়।
পাকিস্তানি মিলিটারির মেজর এজাজ আহমেদ একজন শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি খুব সাহসীও। উপন্যাসের নানা জায়গায় আমরা তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাই। তিনি জানেন যে তারা যেটা করছেন সেটা অন্যায়, কিন্তু যখন জাতির প্রশ্ন এসেছে তখন তিনি তার কাজ চালিয়ে গেছেন।
শুরুতে গ্রামে শুধু ভিন্নমীদের ওপর অত্যাচার করা হয়। গ্রামে ঢুকেই সবার আগে নীলু সেনকে হত্যা করা হয়। বলাইকেও খোঁজা হয় হত্যা করার জন্য। এরপর কৈবর্তপাড়ার দিকে নজর যায় মিলিটারির। তারা কৈবর্তপাড়ায় গিয়ে মনা এবং তার ছোট ভাই বিরুকে হত্যা করে। এতে গ্রামের মুসলমানরা এক রকম নিশ্চিত হয় যে মিলিটারিরা তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু তাদের এ ধারণা অচিরেই ভুল প্রমাণিত হয়। কেননা এরপর মিলিটারিরা ধর্ম-বর্ণ ভুলে যায়। তারা হত্যা, ধর্ষণ, অত্যাচার সবার ওপর করতে থাকে।
পাকিস্তানিদের আচরণই হলো এমন। তারা বাঙালি জাতির প্রতি তীব্র বিদ্বেষ লালন করে। এজন্য তারা বাঙালি বিনাশের খেলায় মেতে ওঠে। আর এখানে কে হিন্দু কে মুসলমান এটা চিন্তা করে না। তারা বাঙালি হলেই তার ওপর অত্যাচার চালিয়ে যায়। তাই বলা যায়, মেজর এজাজের নৃশংস আচরণ মূলত বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের জাতিগত ঘৃণার দিকটিকেই নির্দেশ করে।
সারা রাত ঘুমাতে না পারার কারণে বলাই নীলু সেনের ঘুম ভাঙায়নি।
নীলু সেন এবং তার বোনপো বলাই এ দুজনই প্রকান্ড বাড়িতে বাস করে। রাতে পেটের ব্যথায় নীলু সেনের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল। বলাই ডাক্তার ডাকতে যেতে চাইলে নীলু সেন তাকে থামিয়ে দেয় এবং বলে তার হাতে বেশি সময় নেই। ছটফট করতে করতে একসময় তার মুখ দিয়ে গাঁজলা বের হতে শুরু করে। কিন্তু শেষরাতের দিকে তার তলপেটের ব্যথা কমতে শুরু করে এবং একটু আরাম বোধ করলে সে ঘুমিয়ে যায়। সারা রাত নিদারুণ কষ্টে কেটেছে বলে সকালে বলাই নীলু সেনের ঘুম ভাঙায়নি।
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির যেমন গর্বের ইতিহাস তেমনই আবার কষ্টেরও ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি জনজীবনের দুর্দশার চিত্র ছিল অবর্ণনীয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে কতটা নৃশংস ছিল তা বোঝা যায় বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস পাঠ করলে। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত বিভিন্ন সাহিত্য ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল। তেমনই একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো '১৯৭১'।
হুমায়ূন আহমেদ এই রচনায় যেভাবে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছেন তা পাঠ করলে পাকিস্তানিদের সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নীলু সেনের হত্যাকাণ্ড।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলু সেন গ্রামের একজন মোটামুটি প্রভাবশালী ব্যক্তি। গ্রামে বিচার-সালিশে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি একজন ভালো মানুষ। গ্রামের কারও ক্ষতি তিনি করেন না। অবস্থাপন্ন হওয়ার দরুন তার বাড়িতে একটা ট্রানজিস্টারও আছে। গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। কারণ সেই রাতে তলপেটের অসহ্য যন্ত্রণায় সারা রাত তিনি ঘুমাতে পারেননি। এজন্য শেষরাতে তিনি ঘুমিয়ে গেলে তার বোনপো বলাই তার ঘুম ভাঙায় না। মিলিটারি এসে তার ঘুম ভাঙায় এবং নিচে গিয়ে মিলিটারিদের 'আদাব' বলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পুরো মুক্তিযুদ্ধজুড়ে তাদের বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। মানুষ মারার সময় তারা আসলে জাত-পাত বা ধর্মের বিচার করে না। বাঙালি জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে তারা এ দেশে এসেছিল। বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করে দেশ দখল করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে সামনে যাকেই পেয়েছে কোনো বিচার ছাড়াই তাকে হত্যা করেছে। মিলিটারি অফিসার মেজর এজাজ তার সেনাদল নিয়ে নীলগঞ্জ গ্রামে একটা মিশনে এলেও তারা শুরুতেই গ্রামে ত্রাস সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়। যার কারণে তারা হত্যা করে নীলু সেনকে। আবার শুরুতে শুধু অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করার মাধ্যমে তারা মুসলমানদের সাময়িক বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে যাতে মুসলমানরা মিলিটারিকে খারাপ না ভাবে। যদিও শেষ পর্যন্ত তারা পুরো গ্রামেই তাণ্ডব চালায়। যার শুরু হয়েছিল নীলু সেনকে হত্যার মধ্য দিয়ে।
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নীলু সেনের হত্যাকান্ড মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুর বর্বরতার প্রামাণ্য দলিল।
বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ইমাম সাহেব দোয়া ইউনুসটা আজিজ মাস্টারকে দমে দমে পড়তে বলেন। ইসলাম ধর্মে হজরত ইউনুস (আ.)-কে মাছ গিলে ফেলার পর মাছের পেট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য তিনি আল্লাহর নিকট দোয়া করতে থাকেন। আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি মাছের পেট থেকে উদ্ধার পান। সেই দোয়াটি দোয়া ইউনুস নামে পরিচিত। মুসলমানরা বিপদের সময় উদ্ধার পাওয়ার জন্য এই দোয়া পাঠ করেন। নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি আসায় গ্রামবাসী বিপদের মধ্যে পড়ে। আর মিলিটারি ইমাম সাহেব এবং আজিজ মাস্টারকে আটকে রাখে। এজন্য ইমাম সাহেব আজিজ মাস্টারকে দোয়া ইউনুসটা দমে দমে পড়তে বলেন।
মিলিটারির মেজর এজাজ নীলগঞ্জে এসে ত্রাস সৃষ্টি করেন। মানুষের ওপর নানাবিধ উপায়ে নির্যাতন শুরু করেন। যার ফলে ভীত মানুষরা একসময় সাহসী হয়ে ওঠে।
'১৯৭১' উপন্যাসটি মূলত একটি যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। এখানে একপক্ষীয় একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দেখানো হয়েছে। উপন্যাসের শুরুতে একটা গ্রাম দেখা যায় যার নাম নীলগঞ্জ। অত্যন্ত প্রত্যন্ত এই গ্রামে একদিন মিলিটারি প্রবেশ করে। মিলিটারির মেজর এজাজ একজন বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি শুরুতেই গ্রামের শিক্ষিত মানুষদের ডেকে আনেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য বের করতে না পেরে তিনি গ্রামের সবার মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি কৈতব্যপাড়ার মনার বিচারের ব্যবস্থা করেন। মনার সঙ্গে তার ছোট ভাই বিরুও ছিল। বিরুর বয়স ছিল ১১ বছর। তিনি মনাকে বিলের মধ্যে দাঁড় করিয়ে গুলি করার নির্দেশ দেন। সঙ্গে তার ছোট ভাই বিরুকেও গুলি করতে বলেন। আর এই নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটায় আজিজ মাস্টার ও ইমাম সাহেবের সামনে। এরপর স্কুলঘরে ফেরত এনে ইমাম সাহেবকে মারধর করেন এবং আজিজ মাস্টারকে বিবস্ত্র করেন।
নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি আসে একটা মিশনে। এ সম্পর্কিত তথ্য জানার জন্য মেজর এজাজ গ্রামবাসীর ওপর নানাবিধ উপায়ে অত্যাচার চালাতে থাকেন। অত্যাচারের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করে। অসহনীয় অত্যাচার চলতে থাকার এক পর্যায়ে নির্যাতিত লোকজন সাহসী হয়ে ওঠে। আজিজ মাস্টার নিজের কাপড় পরতে থাকে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়। জয়নাল মিয়া সবজান্তা গোয়েন্দার মতো তথ্য আওড়ায়। সফদরউল্লাহ দা হাতে ঘুরে বেড়ায় এবং রফিক মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে এজাজের আশু ধ্বংস বার্তা প্রচার করে। এভাবেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অস্তিত্বের পর্দা ঘুচে গেলে বদলে যেতে থাকে মানুষ। মানুষ আসলে এমনই। নিপীড়ন ও অত্যাচার যখন মানুষের সহ্যসীমা পেরিয়ে যায় তখন মানুষ হয়ে ওঠে বিপ্লবী। নিজের অস্তিত্ব টিকিযে রাখার জন্য তখন মানুষ রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। উপন্যাসে মেজর এজাজ যে অযৌক্তিক ও অমানবিক নির্যাতন চালায় তা শেষ পর্যন্ত উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্রগুলোকে প্রতিবাদী হতে বাধ্য করেছে। তাই বলা যায়, মেজর এজাজের বহুমাত্রিক নিপীড়ন অবদমিত জনতার বিপরীত মূর্তিতে আবর্তিত হওয়ার অন্যতম কারণ।
মিলিটারির নির্লিপ্ত চাহনি দেখে আজিজ মাস্টারের নেতৃত্ব দেওয়া ছোট 'দলটি বুকের মধ্যে কাঁপুনি অনুভব করে। নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করেই সবার আগে গ্রামের শিক্ষিত ব্যক্তিদের তলব করে। তাদের মধ্যে অন্যতম স্কুলের হেডমাস্টার আজিজুর রহমান মল্লিক। কিন্তু আজিজ মাস্টার একা আসতে সম্মত না হওয়ায় কয়েকজন মিলে ছোট একটি দল হয়ে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দিতে দিতে আসে। কিন্তু স্লোগান শুনে বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনাদের কোনো ভাবান্তর হয় না। তারা নির্লিপ্ত চোখে সামনের দিকে চেয়ে থাকে। তাদের সেই চাহনি দেখে আজিজ মাস্টারের নেতৃত্বে আগত দলটি বুকের মধ্যে কাঁপুনি অনুভব করে।
'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দিয়ে আসা আজিজ মাস্টারের ছোট দলটির প্রতি মিলিটারির কোনো উৎসাহ না থাকায় প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করা হয়েছে।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি প্রবেশ করে শেষরাতের দিকে। এরপর তারা গ্রামের মোটামুটি শিক্ষিত লোকদের তলব করতে শুরু করে। যার কারণে প্রথমেই মসজিদের ইমাম সাহেবকে তলব করে। এরপর স্কুলের হেডমাস্টার আজিজুর রহমান মল্লিককে তলব করে। কিন্তু আজিজ মাস্টার একা মিলিটারির কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। এজন্য সে কয়েকজনকে নিয়ে হাতে পাকিস্তানের পতাকা এবং মুখে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দিতে দিতে স্কুলের দিকে আসে। এখানে এসে তারা দেখে মিলিটারিরা স্কুলের বারান্দায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। স্লোগান দিয়ে আসা দলটির প্রতি তারা চোখ তুলেও তাকায় না।
পাকিস্তানি মিলিটারি নীলগঞ্জ গ্রামে এসেছে মূলত একটা মিশনে। তাদের ধারণা, নীলগঞ্জ গ্রামের জঙ্গলা মাঠে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু সেনা লুকিয়ে আছে এবং তারা মিলিটারির দুজন অফিসারকে তুলে নিয়ে গেছে। যার মধ্যে মেজর এজাজের বন্ধু মেজর বখতিয়ার অন্যতম। তাদেরকে উদ্ধার করা এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাদের ধরার জন্যই মিলিটারি এসেছে। এজন্যই তারা শুরুতেই গ্রামের শিক্ষিত লোকদের তলব করে। কারণ শিক্ষিত লোকরাই সাম্প্রতিক ঘটনার খবর রাখে। এছাড়া সারা রাত হেঁটে ভোর রাতে মিলিটারির দল এসে পৌছায় এ গ্রামে। এজন্য তারা অনেক ক্লান্ত ছিল। ফলে তাদের অনেকেই ঝিমাচ্ছিল। এ কারণে স্লোগান দিয়ে আসা দলটির প্রতি তাদের কোনো উৎসাহ দেখা যায় না। তারা সন্ন্যাসীদের মতো নির্লিপ্ত চোখে সামনে তাকিয়ে থাকে, যেন তারা কোনো কিছুর অপেক্ষায় আছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মধ্যে প্রকৃত অর্থে কোনো মমত্ববোধ ছিল না। তাদের মধ্যে না ছিল কোনো ভালোবাসা, না ছিল বাঙালিদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি নিধন। তারা বাঙালিদের কখনোই বিশ্বাস করত না। কোনো ভীতু, সরল মনের বাঙালি যদি তাদের দিকে এগিয়েও যেত তবুও তারা এগিয়ে আসত না। মূলত এসব কারণেই সেনাবাহিনীর দলটি নির্লিপ্ত ছিল।
মালার প্রতি ভালোবাসা থেকে তাকে উপহার দেওয়ার জন্য আজিজ মাস্টার আয়না কিনেছিল। নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজুর রহমান মল্লিক একজন বিদেশি মানুষ। অর্থাৎ সে নীলগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। তার বাড়ি কুমিল্লার নবীনগরে। সে গ্রামের অবস্থাপন্ন জয়নাল মিয়ার বাড়িতে থাকে এবং জয়নাল মিয়ার বউকে ভাবিসাব বলে ডাকে। কিন্তু জয়নাল মিয়ার বড় মেয়ে মালার প্রতি তার অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। আজিজ মাস্টার মালার প্রেমে পড়ে এবং তাকে নিয়ে কবিতা লেখে। মালা তাকে মামা বলে ডাকলে তার ভীষণ অস্বস্তি হয়। মালাকে উপহার দেওয়ার জন্যই আজিজ মাস্টার আয়না কিনেছিল, যাতে মালা সুন্দর বরে সম্মত পারে।
'১৯৭১' উপন্যাসে মেজর এজাজ নীলগঞ্জ গ্রামের মানুষের ওপর নানাভাবে অত্যাচার করেন। তার দল এই প্রত্যন্ত গ্রামে আসে মূলত তার বন্ধু মেজর বখতিয়ারকে উদ্ধার করতে।
'১৯৭১' উপন্যাসে বাঙালি জাতির প্রতি পাকিস্তানি মিলিটারির ঘৃণার। বহিঃপ্রকাশ দেখানো হয়েছে। পাকিস্তানিরা সব সময় বাঙালিকে। ঘৃণা করে এসেছে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি তাদের কোনো মায়া বা ভালোবাসা নেই। তারা নিজেদের সুবিধার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের দখলদারিত্ব চায়। এজন্য ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধনে নামে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এদেশের। জনগণ। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করে বাঙালিরা যুদ্ধে নেমে পড়ে। যার ফলে তারা মেজর বখতিয়ারের মতো অনেক মিলিটারিকে ধরে আনতে সক্ষম হয়।
মেজর এজাজের বাড়ি পেশোয়ারের এক অখ্যাত গ্রাম রেশোবায়। স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি তার কোনো মায়া থাকার কথা নয়। নিজের জন্মভূমিতে অন্ধ পিতাকে রেখে এত দূরে তিনি এসেছেন তার বন্ধু মেজর বখতিয়ারের সঙ্গে। কিন্তু তার বন্ধুকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা ধরে নিয়ে গেলে তিনি তার দলবল নিয়ে তাকে উদ্ধার করতে বেরিয়ে পড়েন এবং একসময় নীলগঞ্জে এসে পৌছান। তিনি খবর পান এখানের। জঙ্গলা মাঠে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা লুকিয়ে আছে। কিন্তু গ্রামের কারও কাছ থেকে কোনো তথ্য বের করতে না পারায় তিনি গ্রামবাসীর ওপর অত্যাচার শুরু করেন। যতক্ষণে তিনি। সবকিছু জানতে পারেন ততক্ষণে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়। যার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি কৈবর্তপাড়ায় আগুন লাগিয়ে দেন।
উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, মেজর এজাজের নিষ্ঠুরতার পেছনে দেশপ্রেম অপেক্ষা বন্ধু হারানোর ক্ষোভ অধিক।
দোকানপাট ঠিক আছে কি না তা দেখার জন্য বদিউজ্জামানের মধুবনে যাওয়ার দরকার। পাকিস্তানি মিলিটারি নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করলে সবার মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন সময় বদিউজ্জামান মধুবনে যেতে থাকে। রাস্তায় সবার কাছে মিলিটারি আসার ঘটনা শুনে সে চিন্তিত হয়ে পড়ে। মধুবন বাজারে তার দোকান আছে। মিলিটারিরা যেখানে যায় সেখানকার সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়। তার দুশ্চিন্তা হতে থাকে মধুবনে তার দোকান ঠিক আছে কি না। এজন্য তার মধুবনে যাওয়া দরকার।
'১৯৭১' উপন্যাসটি হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রচনা করেছেন। প্রতিটি চরিত্র তাদের স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এর পাশাপাশি তিনি উপন্যাসের প্লট নির্বাচন, কাহিনির বা ঘটনার পরম্পরা নির্মাণে নিজের পান্ডিত্য দেখিয়েছেন। চলচ্চিত্রীয় কৌশলে কাহিনি নির্মাণে সাফল্য অর্জন করেছেন।
'১৯৭১' উপন্যাসের শুরুটা হয়েছে মীর আলির মাধ্যমে। সে একজন অন্ধ মানুষ। চোখে দেখতে পায় না, কিন্তু কানে শুনতে পায় এবং সে অনুযায়ী সাড়া দেয়। তার সাড়া প্রদান কিংবা কথা বলা, বর্ণনাত্মকভাবে ফুটিয়ে তোলা নয়, পুরোটাই চলচ্চিত্রীয়। ঔপন্যাসিক আমাদের বলছেন এবং আমরা তা কল্পনা করছি। ঠিক তেমনই উপন্যাসে মিলিটারি প্রবেশ করা, গ্রামবাসীর ওপর নির্যাতন, পুরো বিষয়টাকে এমনভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে যে পাঠক তা পাঠ করছেন না, বরং পাঠক যেন চোখের সামনে তা ঘটতে দেখছেন। ঔপন্যাসিক একেবারে ছক কষে কষে মাটি, মানুষ, মনুষ্যনির্মিত অবকাঠামো এঁকেছেন। আর তাতেই গ্রামবাংলার এক সাধারণ গ্রামকে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত করেছেন। বিবরণের চিত্রধর্মিতা, চরিত্রের আগমন-তিরোভাব-ক্রিয়া-পটভূমির ফটোগ্রাফিক নির্মাণ সিমেনার কৌশলকেই মনে করিয়ে দেয়। লেখক পুরো কাহিনিকে পাঠকের চোখের সামনে চিত্রিত করেছেন। গুলির শব্দের বর্ণনাগুলোও সেরকমই। লেখক আমাদের জানাচ্ছেন না যে গুলি হয়েছে বরং তিনি বলছেন এবং পাঠকরা এদিক-সেদিক থেকে গুলির শব্দ শুনছেন।
উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদ চলচ্চিত্রের কৌশলে '১৯৭১' উপন্যাসটি নির্মাণ করেছেন।
Contribute high-quality content, help learners grow, and earn for your efforts! 💡💰'
Related Question
View Allজঙ্গল্য মাঠের পেছনে নীলগঞ্জ গ্রামের অবস্থান।
আজিজ মাস্টারের কাছ থেকে গ্রাম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেওয়ার জন্য মেজর এজাজ প্রথম দিকে তাকে বিশেষ খাতির করে।
মেজর এজাজ পাকিস্তানি মিলিটারির একজন অফিসার। নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করে তার বাহিনী স্কুলঘরে অবস্থান নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন ব্যক্তিকে ধরে এনে গ্রাম সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আজিজ মাস্টারকে মেজর ডেকে নিয়ে প্রথমে খুব খাতির করে। এমন ভদ্রতার কারণ হলো আজিজ মাস্টারের মন জয় করে তার কাছ থেকে জঙ্গলা মাঠের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ান ও অফিসারদের সম্পর্কে গোপন তথ্য জেনে নেওয়া।
উদ্দীপকের কলিমদ্দি দফাদার '১৯৭১' উপন্যাসের রফিক চরিত্রের সঙ্গে দেশপ্রেমের দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশে প্রবেশ করলে কিছু দেশপ্রেমিক সাহসী মানুষ রাজাকারের রূপ ধারণ করে হানাদারদের বিভ্রান্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উদ্দীপকের কলিমদ্দি দফাদার খান সেনাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করলেও ভিতরে ভিতরে তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। খান সেনারা নতুন কোনো জায়গায় অভিযান যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি আগেই তা মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দিয়ে তাদের সহায়তা করতেন। '১৯৭১' উপন্যাসেও প্রথমে রফিককে নীল শার্ট পরা লোক হিসেবে মেজর এজাজের ঘনিষ্ঠ সহকারী মনে হয়। কিন্তু উপন্যাসের গল্পধারায় বাঙালির প্রতি তার প্রবল অনুরাগ লক্ষ করা যায়। মেজর এজাজকে সে কৈবর্ত পাড়ায় তল্লাশি করতে নিষেধ করে সে মুক্তিসেনাদের বাঁচিয়েছে; স্বজাতিকে বঁচিয়েছে। এই দিক থেকে সে উদ্দীপকের কলিমদ্দি দফাদারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
"প্রকৃত দেশপ্রেমিকেরা লোকচক্ষুর অন্তরালে দেশের জন্য তাদের সবটুকু উৎসর্গ করেন।"- মন্তব্যটি যথার্থ।
যারা দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন তারাই দেশপ্রেমিক। দেশের সংকটময় মুহূর্তে তারা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে দেশ ও দেশের মানুষকে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন। আর এর জন্য তারা জীবন বাজি রাখতেও পিছপা হন না।
উদ্দীপকে কলিমদ্দি দফাদার কৌশলে খান সেনাদের সঙ্গী হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করে। তার সহায়তায় মুক্তিবাহিনী খান সেনাদের একটি দলকে আক্রমণ করে 'ক্ষতবিক্ষত করে। '১৯৭১' উপন্যাসে লক্ষ করা যায়, রফিক প্রথম থেকে মেজর এজাজের সহকারী হিসেবে তার নির্দেশ পালন করেছে। অথচ মেজর এজাজের প্রতিটি নৃশংস ত্মাচরণ ও পদক্ষেপের প্রতিবাদ করেছে সে। ফলে উপন্যাসের 'রফিক যেন উদ্দীপকের কলিমদ্দি দফাদারের মতোই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।
'১৯৭১' উপন্যাসে রফিক মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও সে একসময় বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার সার্থক প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। সে যেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেই নীলগঞ্জ গ্রামে প্রবেশ করেছে। তাই যখন সে নিশ্চিত হয় এটা যুদ্ধ নয়, অন্যায় যুদ্ধ মাত্র, তখন প্রতিবাদ ছাড়া তার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। সবশেষে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য সে জীবনকেও উৎসর্গ করে দেয়। এভাবেই রফিক ও কলিমদ্দি দফাদারের মতো প্রকৃত দেশপ্রেমিকরা লোকচক্ষুর অন্তরালে দেশের জন্য তাদের সবটুকু উৎসর্গ করেন। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
নীলগঞ্জের আজিজ মাস্টার, নীলু সেন ও জয়নাল মিয়ার বাড়িতে ট্রানজিস্টার আছে।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দলটির সদস্যরা দুজন মিলিটারি অফিসারকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় সেই দলটির প্রতি মেজর এজাজ ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
'১৯৭১' উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামে ঢুকে পাকিস্তানি মিলিটারি মেজর এজাজ গ্রামের মানুষদের ডেকে নিয়ে তাদেরকে গ্রামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। গ্রামের আজিজ মাস্টারকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে। মেজর একসময় তার কাছে জানতে চায় গ্রামের জঙ্গলা মাঠে কিছু আছে কিনা। কিন্তু আজিজ মাস্টার জানায় সেখানে কিছুই নেই। পরে মেজর এজাজ জানায় তারা জানে যে জঙ্গালা মাঠে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেশ কিছু জোয়ান এবং কয়েকজন অফিসার লুকিয়ে আছে। তারা দুজন মিলিটারি অফিসারকে ধরে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে একজন হলো মেজর এজাজের বন্ধু। এজন্যই মেজর এজাজ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কথিত সেই দলটির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!