১৪৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্লোরেন্সের নিকটবর্তী ক্যাসেল ক্যাপরিজ নামক একটি ক্ষুদ্র শহরে মাইকেল এঞ্জেলোর জন্ম হয়। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। একাধারে চিত্রকলা ভাস্কর্য স্থাপত্য ও কলাবিদ্যার প্রতি পুত্রের আকর্ষণ লক্ষ করে পিতা পুত্রকে ১৩ বছর বয়সে গিরল্যান্ডো এর নিকট শিল্পশিক্ষার জন্য প্রেরণ করেন। এখানে তিনি মাত্র তিন বছর শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। গিরল্যান্ডো এর নিকট আগমনের পূর্ব থেকেই ভাস্কর্যে, মাইকেল এঞ্জেলোর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল। এখানে ভাস্কর্য, চিত্র ও স্থাপত্য বিষয়েও তিনি জ্ঞান লাভ করেন।

মানুষের ছবি আঁকায়, ভাস্কর্য সৃষ্টিতে এবং তার নিখুঁত সুন্দর লাবণ্য ফুটিয়ে তুলতেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। মাইকেল এঞ্জেলোর জীবন লিওনার্দোর ন্যায় সুখে অতিবাহিত হয়নি। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে তিনি শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, অর্থ ও যশ অর্জন করেছিলেন। শিল্পী জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে শেষ জীবন পর্যন্ত দুঃখই পেয়েছেন। তবুও নিজের সৃষ্টির উপর গভীর আত্মবিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল তাঁর। মানবদেহের মাংসপেশীর গড়ন, গতি-প্রকৃতির আসল রূপ দেখার জন্য শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো তিনিও মৃতদেহকে কেটে দেখেছেন। সে অভিজ্ঞতার ফল তার আঁকা ছবি বা ভাস্কর্যে নজর দিলে সহজেই বোঝা যায়।

শিল্পকর্মে তিনি মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ বা অংশ যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। মাইকেল এঞ্জেলো ছবির চেয়ে ভাস্কর্য কর্মকেই অধিক পছন্দ করতেন এবং ভাস্কর্য কর্মের জন্যই তিনি অধিক বিখ্যাত। মূর্তিগুলি ধাতু ও প্রস্তরে নির্মিত হতো। তাঁর পিয়েটা ভাস্কর্য জগতে এক অবিনশ্বর সৃষ্টি। এই মূর্তিটি এখন রোমের সেন্ট পিটার্স গির্জার সম্পত্তি। ডেভিড মূর্তিটি ফ্লোরেন্সের একাডেমিতে আছে। বন্ড স্লেভআছে ল্যুভর মিউজিয়ামে।
শুধু ভাস্কর্য সৃষ্টিতেই নয়, চিত্রাঙ্কনেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। ভ্যাটিক্যানের সিসটাইন চ্যাপেলের ছাদে এবং দেয়ালের গায়ে মাইকেল এঞ্জেলো যে ফ্রেসকো এঁকেছিলেন তাঁর সে কাজগুলো আজও সকলে বিস্ময় নিয়ে দেখে। এখানের চিত্রকলার সুন্দর রূপ দিতে তিনি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি ও কলাকৌশল ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ মূর্তি নির্মাণের মতো সেখানেও তেমনি মানবদেহের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন। মাইকেল তাঁর কাজে পূর্বের প্রচলিত নিয়মকানুন, ধ্যানধারণা সব বদলে দিলেন। তাঁর শিল্পকর্মে সৃষ্টি করলেন নতুন চমক। তাঁর এ রকম শিল্পকর্মগুলো অতুলনীয় এবং রূপলাবণ্য ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। আদমকে জীবন দানের চিত্রটি সিসটাইন চ্যাপেলের ছাদে আঁকা রয়েছে তাতে আছে আশ্চর্যজনক দরদ সৃষ্টির পরিচয়। পরবর্তীকালে লাস্ট জাজমেন্ট ছবিটি এঁকেছিলেন।
মাইকেল এঞ্জেলো ছিলেন চিরকুমার। সাধু-সন্ন্যাসীদের ন্যায় জীবনযাপন করেছিলেন। শেষ বয়সে শিল্পী মাইকেল অত্যন্ত খিটখিটে হলেও জনসাধারণ তাঁর প্রতিভার জন্য তাঁকে শ্রদ্ধা করত।
১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি এঞ্জেলো বিখ্যাত পিয়েটা মূর্তির পায়ের কিছু অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে জ্বরে আক্রান্ত হন। ১৭ তারিখ ডাক্তারের পরামর্শে তাঁকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হয়। তখন পূর্ণজ্ঞানে একটা উইল করার কথা বলেন। তাতে লেখা হয় 'আমার আত্মা ঈশ্বরের জন্য রইল, দেহ রইল পৃথিবীর জন্য' বেলা পাঁচটায় এই মহান শিল্পী ৮৯ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।
Read more