শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান- 'কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্'। জগতের কল্যাণের জন্য তিনি মানবরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দুষ্টকে দমন করে তিনি শিষ্টকে পালন করেছিলেন। আমরা এখানে শ্রীকৃষ্ণের শৈশবকালের কর্মকান্ড সম্পর্কে জানব।
তখন দ্বাপর যুগ। মথুরায় রাজত্ব করতেন রাজা কংস। তিনি ছিলেন ভীষণ অত্যাচারী। নিজের পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে সিংহাসন দখল করেন।
কংসের খুড়তুত বোন দেবকী। পরমা সুন্দরী। দেবকীকে কংস খুব ভালোবাসেন। তাই আদর করে রাজা শূরের পুত্র বসুদেবের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। বসুদেব ছিলেন পরম ধার্মিক ও রূপবান। বসুদেবের সঙ্গে বোনের বিয়ে হওয়ায় কংস খুব খুশি। নিজে রথ চালিয়ে তিনি তাঁদের রাজ্যে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। এমন সময় দৈববাণী হলো- 'শোন কংস, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান তোমায় হত্যা করবে।'
এ-কথা শুনে কংস ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। তিনি তরবারি দিয়ে দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। তখন বসুদেব মিনতি করে বললেন, 'আপনি ওকে হত্যা করবেন না। আমরা আমাদের প্রতিটি সন্তানকে জন্মমাত্র আপনার হাতে তুলে দেব।'
বসুদেবের কথায় কংস শান্ত হলেন। তিনি রাজধানীতে ফিরে বসুদেব ও দেবকীকে কারাগারে আটকে রাখলেন। একে একে তাঁদের ছয়টি পুত্র সন্তান হলো। বসুদেব তাদেরকে কংসের হাতে তুলে দিলেন। কংস তাদের পাথরে আছড়ে হত্যা করলেন।
দেবকীর সপ্তম সন্তান বলরাম। ভগবান তাঁকে দেবকীর গর্ভ থেকে বসুদেবের প্রথম স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে নিয়ে যান।
দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান শ্রীকৃষ্ণ। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে তাঁর জন্ম। সেদিন প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। বসুদেব তাকিয়ে দেখলেন কারাকক্ষের দরজা খোলা। কারারক্ষীরা সব ঘুমে অচেতন। কোথাও কেউ জেগে নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঐ অবস্থায়ই বসুদেব শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে, নদী পার হয়ে, গোকুলে চলে গেলেন। সেখানেও সবাই ঘুমে অচেতন। তিনি নন্দরাজার বাড়িতে ঢুকলেন। তাঁর স্ত্রী যশোদার পাশে কেবল জন্ম নেয়া একটি মেয়ে শিশু ঘুমাচ্ছে। বসুদেব মেয়েটিকে কোলে নিয়ে নিজের পুত্রকে সেখানে রাখলেন। তারপর দ্রুত চলে এলেন কংসের কারাগারে। মেয়েটিকে শুইয়ে দিলেন দেবকীর পাশে।
কারাগারের দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল। কারারক্ষীরা জেগে উঠলেন। পরের দিন প্রভাতে সবাই দেখল, দেবকীর এক মেয়ে হয়েছে। কংস এসে যখন মেয়েটিকে আছড়ে মারতে গেলেন, তখন সে হঠাৎ আকাশে উঠে গেল এবং কংসকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।'
এ-কথা শুনে কংস ভয়ে চমকে উঠলেন। ক্রোধে ক্ষিপ্তও হলেন। তিনি তক্ষুনি আদেশ দিলেন গোকুলে যত শিশু আছে সবাইকে মেরে ফেলতে।
কংসের আদেশে পূতনা রাক্ষসীকে ডাকা হলো এবং তাকে বলা হলো গোকুলের সমস্ত শিশুকে মেরে ফেলতে হবে। বিনিময়ে তাকে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হবে।

স্বর্ণমুদ্রার লোভে পূতনা এক সুন্দরী নারীর রূপ ধরে গোকুলে চলল। প্রথমেই গেল নন্দরাজের বাড়ি। কেঁদে কেঁদে যশোদাকে বলল, 'মা, আমি বড়ই দুঃখিনী। আমার দুধের শিশু মারা গেছে। আমার কোনো টাকা-পয়সা চাইনে। দুবেলা দুটো খেতে দিও। বিনিময়ে আমি তোমার শিশুপুত্রকে পালন করব।'
পূতনার কথায় যশোদার মায়া হলো। তিনি পূতনাকে কাজে রাখলেন। একদিন পূতনা কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে বাইরে গেল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। তখন নিজের স্তন কৃষ্ণের মুখে ঢুকিয়ে দিল। স্তনে মাখানো ছিল তীব্র বিষ। তার ধারণা ছিল, এই বিষে কৃষ্ণের মৃত্যু হবে। কিন্তু কৃষ্ণ তো ভগবান। শিশু হলেও তিনি সবই বুঝতে পারলেন। তাই পূতনার স্তনে এমন টান দিলেন যে, তাতে পূতনারই মৃত্যু হলো। এভাবে পূতনাকে বিনাশ করে তিনি গোকুলের শত শত শিশুকে বাঁচালেন।
পূতনার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কংস খুবই চিন্তিত হলেন। তিনি ভাবলেন, কোনো নারীর পক্ষে কৃষ্ণকে মারা সম্ভব নয়। তাই তিনি তাঁর এক শক্তিশালী পুরুষ অনুচরকে ডাকলেন। তাকে সব বুঝিয়ে বললেন। অনুচর বলল, 'মহারাজ, চিন্তা করবেন না। আজ সূর্যাস্তের মধ্যেই আপনি শত্রুর মৃত্যু সংবাদ পাবেন।' এই বলে অনুচর গোকুলের দিকে চলল। সোজা গিয়ে উঠল নন্দরাজের বাড়িতে। মা যশোদা তখন একটা শকট বা গাড়ির নিচে কৃষ্ণকে শুইয়ে রেখে কাজ করছিলেন। এই সুযোগে অনুচর শকট চাপা দিয়ে কৃষ্ণকে মারতে এগিয়ে গেল। কৃষ্ণ তার মনোভাব বুঝতে পারলেন। তাই সজোরে এক লাথি মারলেন। ফলে শকটের চাপে অনুচর মারা গেল। এভাবে কৃষ্ণ কংসের অনুচরের হাত থেকেও গোকুলের শিশুদের রক্ষা করলেন।
এবার কংস তৃণাবর্ত নামক এক অসুরকে পাঠালেন কৃষ্ণকে মারার জন্য। তৃণাবর্ত গোকুলে গিয়ে প্রচন্ড ঘূর্ণিবায়ুর সৃষ্টি করল। সমস্ত গোকুল ভীষণ ঝড়ে অন্ধকার হয়ে গেল। তৃণাবর্তের উদ্দেশ্য কৃষ্ণকে অনেক উঁচুতে তুলে আছড়ে মারবে। ঘূর্ণিবায়ুর ফলে কৃষ্ণ অনেক উঁচুতে উঠে এলেন বটে। কিন্তু তাঁকে আছাড়
মারার আগে তিনিই তৃণাবর্তের বুকে দিলেন ভীষণ চাপ। ফলে মটিতে পড়ে সে মারা গেল। এভাবে শ্রীকৃষ্ণ শৈশব অবস্থায়ই দুষ্টের দমন করে শিষ্টের পালন করেছেন।
শ্রীকৃষ্ণের জীবনী থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষা পাই যে, ভগবান সর্বদা দুষ্টের দমন করেন এবং শিষ্টের পালন করেন। মানবরূপে জন্ম নিয়ে তিনি দুর্জনদের হত্যা করে জগতের মঙ্গল করেন। ভগবান সহায় থাকলে দুষ্টরা কিছু করতে পারেনা। তিনিই সবাইকে রক্ষা করেন। তাই আমরা সবাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ভক্তি করব। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণে সাহসী ভূমিকা নিয়ে শিশুদের কল্যাণে এগিয়ে যাব।
| একক কাজ: শ্রীকৃষ্ণের শৈশবকালের একটি ঘটনা লেখ। |
নতুন শব্দ : স্বয়ম্, শিষ্ট, দৈববাণী, ঘুটঘুটে, কারাগার, কারারক্ষী, ক্ষিপ্ত, পূতনা, শকট, ঘূর্ণিবায়ু।