বামাক্ষেপা ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ সাধক। তিনি তান্ত্রিক মতে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁর সাধনার স্থল ছিল তারাপীঠ। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় তারাপীঠ অবস্থিত। এখানে আরও অনেক তন্ত্রসাধক সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন। যেমন- আনন্দনাথ, কৈলাসপতি প্রমুখ। তারাপীঠ হিন্দুদের একটি বিশিষ্ট তীর্থস্থান।

তারাপীঠের নিকটে অটলা গ্রাম। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে শিব চতুর্দশী তিথিতে বামাক্ষেপা এখানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায়, মাতা রাজকুমারী দেবী। বামাক্ষেপা তাঁর পিতা-মাতার দ্বিতীয় সন্তান।
প্রথম সন্তান জয়কালী। এছাড়া দুর্গাদেবী, দ্রবময়ী ও সুন্দরী নামে তাঁর আরও তিন বোন এবং রামচন্দ্র নামে এক ভাই ছিলেন। বামাক্ষেপার আসল নাম বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়। পরে তারামায়ের সাধনায় তাঁর ক্ষেপামি বা একরোখা ভাব দেখে সবাই তাঁকে বামাক্ষেপা বলেই ডাকতেন। পিতা সর্বানন্দ খেত-খামারে কাজ করতেন। এতে যে সামান্য আয় হতো, তাতেই তাঁর সংসার কোনো রকমে চলে যেত। সর্বানন্দ ছিলেন বড়ই ধর্মভীরু ও সরল প্রকৃতির মানুষ। অল্প বয়সে দীক্ষা নিয়ে তিনি তারামায়ের সাধনায় ডুবে যান। স্ত্রী রাজকুমারীও ছিলেন ধর্মপ্রাণা ও ভক্তিমতী। এমন বাবা-মায়ের সন্তান হয়ে বামাচরণও তারামায়ের ভক্ত হন। 'জয়তারা জয়তারা' বলে তিনি মাটিতে লুটোপুটি খান। বামাচরণ বড়ই সরল ও আপনভোলা। তাঁর সরলতা অন্যের চোখে ছিল পাগলামি।
প্রথাগত লেখাপড়ার প্রতি বামাচরণের মন ছিলনা। পাঠশালা কোনোরকমে শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে আর যাওয়া হয়নি। তবে তাঁর একটি বিশেষ গুণ ছিল। তিনি সুমিষ্ট স্বরে গান গাইতে পারতেন। একদিন তারামায়ের মন্দিরে গানের আসর বসেছে। বেহালা বাজাচ্ছেন পিতা সর্বানন্দ। সর্বানন্দ এক সময় বামাচরণকে কৃষ্ণ সাজিয়ে দিলেন। আর বামা নেচে-নেচে মিষ্টি কণ্ঠে গান গাইতে লাগলেন। গাঁয়ের মানুষ বামার কৃষ্ণরূপ দেখে আর গান শুনে অতিশয় আনন্দ পেলেন।
একদিন বামাচরণ জেদ ধরেন শ্মশানে যাবেন। পিতা সর্বানন্দ কিছুতেই থামাতে পারেন না। অবশেষে বামাচরণকে নিয়ে তিনি শ্মশানপুরীতে গেলেন। মহাশশ্মশান দেখে বামার মনে ভাবান্তরের সৃষ্টি হয়। তিনি শ্মশানভূমিকে ভালোবেসে ফেলেন।
এ ঘটনার পর বামা যেন কেমন হয়ে গেছেন। সত্যি সত্যি তিনি ক্ষেপায় পরিণত হন। এ ক্ষেপাটি তাঁর গভীর ধর্ম নিষ্ঠার জন্য। শ্মশানভূমির সাথে, তারামায়ের সাথে তাঁর নিবিড় ভাব গড়ে উঠল। শুরু হলো বামাচরণের শ্মশানলীলা। সে সময় শ্মশানে ছিলেন তন্ত্রসাধক ও বেদজ্ঞ মোক্ষদানন্দ। আরও ছিলেন ব্রজবাসী কৈলাসপতি। কৈলাসপতি বামাকে দীক্ষা দেন। আর মোক্ষদানন্দ দেন সাধনার শিক্ষা। শুরু হলো মহাশ্মশানে বামাচরণের তন্ত্রসাধনা।
এরপর হঠাৎ একদিন পিতা সর্বানন্দের মৃত্যু হয়। বামাচরণের বয়স তখন ১৮ বছর। সংসারের কথা ভেবে মা রাজকুমারী ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। বামাকে বলেন কিছু একটা করতে। বামা একের পর এক কাজ নেন। কিন্তু কোথাও মন বসাতে পারেন না। তাঁর কেবল তারামায়ের রাঙা চরণের কথা মনে পড়ে। একবার এক মন্দিরে ফুল তোলার কাজ নেন। কিন্তু রক্তজবা তুলতে গিয়ে মনে পড়ে যায় তারামায়ের চরণযুগলের কথা। আর অমনি তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। কখনো বা ভাবে বিভোর হয়ে গান ধরেন। এক মনে গাছতলায় বসে থাকেন। ফলে তাঁর কোনো কাজই বেশিদিন টেকে না। এভাবেই তিনি বামাক্ষেপা নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
বামাক্ষেপার এই ক্ষেপামি চলতেই থাকে। তারামায়ের সাধনায় তিনি মন-প্রাণ ঢেলে দেন এবং এক সময় সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁর সিদ্ধিলাভের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় নাটোরের মহারানি অন্নদাসুন্দরী তাঁর কথা জানতে পারেন। তারাপীঠের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল তখন নাটোরের রাজপরিবার। তাই রানির নির্দেশে বামাক্ষেপাকে তারাপীঠের পুরোহিত নিয়োগ করা হয়।
বামাক্ষেপা ছিলেন খুবই সহজ-সরল এক আত্মভোলা মানুষ। খাদ্যাখাদ্য, পূজা-মন্ত্র কোনো কিছুই তিনি মানতেন না। 'এই বেলপাতা লে মা, এই অন্ন লে মা, এই জল লে মা, এই ফুল ধূপ লে মা'। এই ছিল বামার পূজা।
বামা তারামায়ের ভক্ত হলেও নিজের মাকেও খুব শ্রদ্ধা করতেন। মা রাজকুমারী মারা যাওয়ার পর তাঁর দেহ তারাপীঠে আনা হয়। বামা তখন দ্বারকা নদীর ওপারে তারাপীঠ শ্মশানে। বর্ষাকালে নদীতে প্রচন্ড ঢেউ। তাই ভয়ে কেউ মৃতদেহ ওপারে শ্মশানে নিতে চাইছে না। এপারেই দাহ করার আয়োজন করছে। কিন্তু মায়ের আত্মার সদ্গতির জন্য তারাপীঠের শ্মশানেই তাঁকে দাহ করা দরকার। এ কথা ভেবে বামাক্ষেপা মা-তারার নাম নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন। এপারে এসে মায়ের শরীর নিজের সঙ্গে বেঁধে সাঁতরে ওপারে গেলেন এবং শ্মশানে মায়ের দেহ দাহ করলেন।
বামাক্ষেপা লোকশিক্ষার জন্য বলতেন:
(১) ধর্ম অন্তরের জিনিস, বেশি আড়ম্বর করলে নষ্ট হয়।
(২) মায়াকে জয় করতে পারলেই মহামায়ার কৃপা পাওয়া যায়।
(৩) তারা মা-র করুণা পেলেও মোক্ষ লাভ হয়।
(৪) গুরু, মন্ত্র আর ভগবান- এঁদের মধ্যে পার্থক্য ভাবতে নেই। তোমরাও ভাববে না, তোমাদের মঙ্গল হবে। কলিযুগে মুক্তিসাধনা আর হরিনাম ছাড়া জীবের গতি নেই।
(৫) দিনরাত যে কালীতারা, রাধাকৃষ্ণ নাম করে, পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
তন্ত্রসাধনায় অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করে বামাক্ষেপা ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন।
বামাক্ষেপার জীবনী থেকে আমরা এই নৈতিক শিক্ষা পাই যে, মনে-প্রাণে কোনো কিছু চাইলে তা পাওয়া যায়। ধর্ম অন্তর দিয়ে পালন করতে হয়। বাইরে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। দেব-দেবীর পূজায় ভক্তিই প্রধান। মন্ত্র- তন্ত্র, নিয়ম-কানুন প্রধান বিষয় নয়। ভক্তি ভরে মা-তারা এবং রাধা-কৃষ্ণের নাম নিলে পাপ তাকে স্পর্শ করে না। পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে।
সাধক বামাক্ষেপার এই শিক্ষা আমরা আমাদের জীবনে কাজে লাগাব।
| একক কাজ: বামাক্ষেপার লোকশিক্ষাসমূহ উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর। |
নতুন শব্দ: ক্ষেপা, শ্মশান, বেদজ্ঞ, বেঁহুশ, আত্মভোলা, দাহ।