জলজ উদ্ভিদ বলতে অতি ক্ষুদ্র শেওলা যা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায় সে রকম উদ্ভিদ থেকে কচুরিপানা, কলমিলতা পর্যন্ত সব উদ্ভিদকে বুঝায়। পুকুরে অল্প পরিমাণ উদ্ভিদ চিংড়ি চাষের সহায়ক হলেও এর পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হলে তা চিংড়ি চাষের জন্য অনেক সময় মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে। পুকুরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের সহাবস্থান প্রয়োজন। তবে চিংড়ি চাষের জন্য আগাছা সীমিত পর্যায়ে রাখতে এর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গলদা চিংড়ির পুকুরে জলজ উদ্ভিদের ক্ষতিকর দিকসমূহ নিম্নরূপ:
- চিংড়ির আশ্রয়স্থল দখল করে ফেলে,
- রাক্ষুসে মাছের আবাসস্থল সৃষ্টি করে,
- পুকুরের পানি থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে পানির উর্বরা শক্তি কমিয়ে ফেলে,
- অবাঞ্ছিত প্রাণী যেমন- সাপ, ব্যাঙ প্রভৃতির আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়,
- জলজ উদ্ভিদ পুকুর থেকে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে,
- পানিতে সূর্যালোক পৌঁছাতে বাধার সৃষ্টি করে, ফলে সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়া ব্যাহত হয়,
- জলজ উদ্ভিদ পঁচে পুকুরের পরিবেশ নষ্ট করে ফেলে,
- চিংড়ির চলাচলে বাঁধার সৃষ্টি করে ও
- চিংড়ি আহরণে বাঁধার সৃষ্টি করে।
বৃদ্ধি, স্বভাব ও বাসস্থলের প্রকৃতি অনুসারে জলজ উদ্ভিদকে নিচের কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
(১) শেওলা জাতীয় উদ্ভিদ: অণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ, তন্তু জাতীয় উদ্ভিদ এবং দলবদ্ধ উদ্ভিদ শেওলা জাতীয় উদ্ভিদের অন্তর্গত। শেওলা সাধারণত পানির উপরিভাগে অবস্থান করে। পুকুরে সাধারণত তিন ধরনের শেওলা দেখা যায়। যথা
ক) শাখাযুক্ত শেওলা এই জাতীয় শেওলা শাখাযুক্ত এবং পুষ্পবাহী উদ্ভিদের মতো। এই শেওলার কোনো অংশ পানির উপরিভাগের উপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না। যথা-চারা, নিটেলা ইত্যাদি।
খ) তন্তু জাতীয় শেওলা: এই জাতীয় শেওলা খালি চোখে দেখা যায়। পুকুরের পাড় ও তলদেশে এরা জন্মায় এবং পরে পানির উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন- ইউলোম্ব্রিক্স, স্পাইরোগাইরা, ক্লাডোফোরা ইত্যাদি।
গ) এককোষী বা দলবদ্ধ শেওলা : অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এই জাতীয় শেওলা ভালোভাবে দেখা যায়। এই জাতীয় শেওলা পানির উপরিভাগে জন্মায় যা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই শেওলার আধিক্য পানিতে সূর্যালোক পৌঁছাতে বাধা দেয়। যেমন- ইউগ্লেনা, ডায়াটম, ভলভক্স ইত্যাদি।
চিত্র ২.৯: শাখাযুক্ত শেওলা, তত্ত্বযুক্ত শেওলা ও এককোষী শেওলা
(২) নিমজ্জনশীল উদ্ভিদ: এই জাতীয় উদ্ভিদের কান্ড ও পাতা পানির তলদেশে জন্মায়। এ জাতীয় উদ্ভিদকে ভুবন্ধ উদ্ভিদ বলা হয়। এগুলি থাকলে চিংড়ি বা মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। যেমন- পাতা ঝাঝি, ক'টা মাৰি ইত্যাদি।
চিত্র ২.১০: নিমজ্জনশীল উদ্ভিদ
(৩) ভাসমান উদ্ভিদ: এ জাতীয় উদ্ভিদের শিকড় ও পাতা পানির উপরে ভাসতে থাকে। আবার কিছু উদ্ভিদের শিকড় পুকুরের তলদেশে মাটিতে থাকে। এগুলো প্রকৃতপক্ষে জলজ আগাছা হিসেবে পরিচিত। যথা- কচুরিপানা, ক্ষুদিপানা ইত্যাদি।
চিত্র ২.১১: ভাসমান উদ্ভিদ
(৪) নির্গমনশীল উদ্ভিদ: এই উদ্ভিদের শিকড় পুকুরের তলদেশে মাটির সাথে সংযুক্ত থাকে। এই উদ্ভিদের অংশ বিশেষ পানির উপরিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যেমনঃ বিষকাটালি, আড়াইন ইত্যাদি।
চিত্র ২.১২ : নির্গমনশীল
(৫) লতানো উদ্ভিদ: এই জাতীয় উদ্ভিদের শিকড় পুকুরের পাড়ে থাকে কিন্তু এদের কান্ড ও পাতা পানির উপরিভাগে থাকে এবং পানির উপরিভাগকে প্রায় আবৃত করে ফেলে। যেমন- কলমিলতা, হেলেঞ্চা, কেশরদাম ইত্যাদি
চিত্র ২.১৩: লতানো উদ্ভিদ
Read more