হলুদ টিয়া ও সাদা টিয়ারা ছিল অঢেল সম্পত্তির মালিক। ধনসম্পদে তারা ছিল ঐশ্বর্যপূর্ণ।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পের টিয়াদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অকল্পনীয়। তাদের সম্পত্তি ছিল অঢেল। বিশাল সুবর্ণ অট্টালিকায় তাদের বসবাস। সেখানে ছিল সোনার সিঁড়ি, রূপার সিঁড়ি দিয়ে ঊর্ধ্বারোহণের বন্দোবস্ত। খাওয়ার জন্য ছিল সোনার থালা, রূপার থালা। হরেক পদের সুস্বাদু ও তৃপ্তিকর খাবার ছিল আহারের জন্য। ঘুমানোর জন্য ছিল সোনার খাট, রূপার খাট। জুমচাষির মেয়েটিকে তারা সাত কলস সোনা-রুপার মোহর উপহার দিয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়ে হলুদ টিয়া সাদা টিয়াদের ঐশ্বর্য সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।
উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পের টিয়াদের ধনসম্পদ ছিল অভাবনীয়। অর্থনৈতিকভাবে তারা ছিল বিত্তশালী।
দরিদ্র জুমচাষি দম্পতির মেয়ে ধান শুকিয়ে ঘরে তুলতে গেলে টিয়ারা ধান খেয়ে ফেলে। বারবার একই ঘটনা ঘটায় মেয়েকে অলস ও অকর্মন্য ভেবে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা মেয়েকে তাড়িয়ে দেয়।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে এক গ্রামে এক সাধারণ জুমচাষি দম্পতি ছিল। তারা ভোরে জুমচাষের কাজে বেরিয়ে পড়ত, সন্ধ্যায় ফিরত। তাদের মেয়ে ঘর পাহারা দিত ও ঘরের খুঁটিনাটি কাজ করত। একদিন তাকে ধান শুকানোর দায়িত্ব দিয়ে যায় তার বাবা-মা। মেয়েটি সারাদিন পাশে বসে পাহারা দিয়ে ধান শুকায় যাতে কোনো পশু-পাখি খেতে না পারে। কিন্তু ধান শুকানো শেষ হলে তুলতে গিয়ে দেখে একদল হলুদ ও সাদা টিয়া তার ধান খেয়ে নিচ্ছে। টিয়াদের নিষেধ করেও ফেরানো যায়নি। সন্ধ্যায় তার বাবা-মা ফিরে এসে ধান দেখতে না পেয়ে রেগে গিয়ে মেয়েকে বকা দেয়। তারা মনে করে, সে পাহারা না দেওয়ায় পাখিরা ধান খেয়ে ফেলেছে। পরদিনও এভাবে ধান শুকাতে দিলে টিয়ারা খেয়ে যায়। সেদিন তার বাবা-মা ক্রোধে তাকে মারধর করে। পাখিরা পুনরায় ধান খেলে তাকে মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে বলে শাসায়। তার পরদিনও টিয়ারা তার ধান খেয়ে যায়। চাষি দম্পতি সন্ধ্যায় ফিরে এসে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে রেগে মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
জুমচাষি দম্পতির সহজসরল মেয়েটির ধান টিয়ারা খেয়ে গেলে সে ফেরাতে পারে না। ধান রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় বাবা-মা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
জুমচাষি দম্পতির জীবনযাপন ছিল সরল ও অনাড়ম্বর। জুমচাষ ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সাধারণভাবে দিন কেটে যেত।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে এক জুমচাষি দম্পতির কথা বলা হয়েছে। জুমচাষ করে তারা জীবিকানির্বাহ করত। তাদের ছিল একটি মেয়ে। সহজসরলভাবে তাদের দিন অতিবাহিত হতো। তারা প্রতিদিন ভোরে উঠে রান্নাবান্না সেরে, খেয়ে-দেয়ে জুমচাষে চলে যেত, আবার সন্ধ্যায় ফিরত। মেয়েটি ঘর পাহারা দিতো ও ঘরের খুঁটিনাটি কাজ করত। তাদের জীবনযাপন ছিল অনাড়ম্বর। অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল সাধারণ। জুমচাষ করে যে ফসল ফলত, তা দিয়েই তাদের জীবন-জীবিকার বন্দোবস্ত হতো।
জুমচাষি দম্পতি পরিশ্রমী ও সহজসরল ছিলেন। নিত্যনৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাদের দিন সুখেই কেটে যেত।
জুমচাষি দম্পতি তাদের মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে সে টিয়াদের দেশে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দেয়। পথিমধ্যে সবাই তাকে খাবার দিয়ে ও টিয়াদের দেশের পথ দেখিয়ে দিয়ে সাহায্য করে।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পের জুমচাষি দম্পতি ধান রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। মেয়েটির ধান এক ঝাঁক হলুদ ও সাদা টিয়া খেয়ে নেয়। সে তাদের বারণ করতে গেলে তারা মা-বাবা বকলে-মারলে তাদের কাছে চলে যাওয়ার নিমন্ত্রণ দেয়। মা-বাবা তাড়িয়ে দিলে তাই সে টিয়াদের দেশে যাওয়ার জন্য পথচলা শুরু করে। চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে এক রাখালের দেখা পায়। রাখাল তাকে এক মুঠো ভাত ও এক আঁজলা পানি খাইয়ে টিয়াদের দেশে যাওয়ার পথের সন্ধান দেয়। এরপর সে দেখা পায় এক মেষপালকের। সেও তাকে এক মুঠো ভাত ও এক আঁজলা পানি খাইয়ে টিয়াদের দেশে যাওয়ার পথের সন্ধান দেয়। সারাদিন যেতে যেতে পরিশ্রান্ত হয়ে এক অশ্বরক্ষকের কাছে পৌছায়। সেও তাকে এক মুঠো ভাত ও এক আঁজলা পানি খাইয়ে টিয়াদের দেশে যাওয়ার পথের সন্ধান দেয়। সবশেষে ক্লান্ত হয়ে এক হস্তীরক্ষকের কাছে পৌঁছালে সেও তাকে এক মুঠো ভাত ও এক আঁজলা পানি খাইয়ে একটু জিরাতে বলে। হস্তীরক্ষক জানায়, আর এক ক্রোশ গেলেই টিয়াদের দেশ। হস্তীরক্ষকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আর এক ক্রোশ পথ হেঁটে অবশেষে সে টিয়াদের দেশে পৌছায়।
জুমচাষি দম্পতির মেয়েটি টিয়ার দেশে পৌছাতে পথিমধ্যে সবার কাছ থেকেই আন্তরিক ব্যবহার পায়। সবাই তাকে স্নেহ-যত্ন করে ও সঠিক পথের সন্ধান দেয়।
টিয়াদের আপ্যায়ন আন্তরিকতাপূর্ণ। অতিথি মেয়েটির সেবা-যত্নে তারা ঔদার্যের পরিচয় দেয়।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে হলুদ টিয়া ও সাদা টিয়াদের দেশ ও তাদের জীবনযাপন সম্বন্ধে জানা যায়। ঐশ্বর্য ও সম্পদে ভরপুর টিয়াদের আতিথেয়তাও সৌহার্দপূর্ণ। জুমচাষি দম্পতির মেয়েটি সেখানে পৌছালে তাকে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানায়। স্নান করিয়ে সুন্দর ও মনোরম পোশাক পরায়। আহারের জন্য হরেক পদের সুস্বাদু ও মজাদার খাবারের আয়োজন করে। সোনার থালা, রূপার থালায় খেতে দেয়। ঘুমাতে দেয় সোনার খাট, রূপার খাট। আদর-যত্নে মেয়েটির মন ভরিয়ে দেয়। এমনকি লোভী মেয়েটির ক্ষেত্রেও তারা আতিথেয়তার ত্রুটি রাখেনি।
হলুদ টিয়া সাদা টিয়াদের আতিথেয়তা অসাধারণ। অতিথি আপ্যায়নে তারা চমৎকার সৌহার্দের পরিচয় দেয়।
লোভী পরিবারটির মেয়ের লোভ ও কুটিলতা দেখে টিয়ারা তাকে সোনার মোহরের বদলে অজান্তে সাতটি কলস ভরতি বিষধর সাপ উপহার দেয়।
উপঢৌকন ভেবে পুরো বংশের সবাইকে নিয়ে কলসের মুখ খুললে বিষধর সাপ বেরিয়ে তাদের সবাইকে মেরে ফেলে।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে টিয়াদের হাত থেকে ধান রক্ষায় ব্যর্থ জুমচাষি দম্পতি তাদের মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। সে কাঁদতে কাঁদতে টিয়াদের দেশে গেলে টিয়ারা তার সরলতা, সততা ও নির্লোভ মানসিকতা দেখে তার প্রতি মুগ্ধ ও সদয় হয়। তাকে আদর-যত্নে বরণ করে সাত কলস সোনা ও রূপার মোহর দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তাদের এমন সাফল্য দেখে এক লোভী দম্পতি তাদের মেয়েকে তাড়িয়ে দেয়, যাতে সে টিয়াদের দেশে যায়। সে পথ চিনে চিনে ঠিকই টিয়াদের দেশে পৌছায়। এই মেয়েটিকেও টিয়ারা পূর্বের মেয়েটির মতো আদর-যত্ন করে। কিন্তু সে তার লোভ সংবরণ করতে পারে না। আগের মেয়েটি যেখানে সরল ও দৈনন্দিন চাহিদা অনুযায়ী আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিল, সেখানে এই মেয়েটি বিলাসী বস্তু গ্রহণ করা শুরু করে। টিয়ারা তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারে। অতঃপর তারা তাকে এবং তার পরিবারকে শাস্তি দেওয়ার বন্দোবস্ত করে। বিষধর সাপ দিয়ে ভরতি করে সাতটি কলস ভালো করে মুখ এঁটে পাঠিয়ে দেয়। বাড়ি ফিরে বংশের সবাইকে নিয়ে কলসের মুখ খোলার জন্য পরামর্শ দেয়। টিয়াদের পরামর্শ অনুযায়ী মেয়েটির পরিবার বংশের সবাইকে নিয়ে কলসের মুখ খুললে বিষধর সাপ বের হয়ে সবাইকে দংশন করে মেরে ফেলে। এভাবেই লোভী পরিবারটি নির্বংশ হয়ে যায়।
লোভের বশবর্তী হয়ে লোভী পরিবারটি টিয়াদের কাছ থেকে ধনসম্পদ লাভ করতে চেয়েছিল। টিয়ারা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে শাস্তিস্বরূপ তাদের পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়।
টিয়া পাখিরা চাষি দম্পতির ধান খেয়ে তাদের ক্ষতির কারণ হয়েছিল।
জুমচাষি দম্পতি তাদের মেয়েকে ধান শুকানোর দায়িত্ব দিয়ে কাজে যেত। মেয়েটি সারাদিন পাহারা দিয়ে শুকালেও ধান তুলতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে এক ঝাঁক টিয়া এসে সব ধান খেয়ে শেষ করে ফেলে। পরপর কয়েকদিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। ধানই ছিল জুমচাষি দম্পতির আয়ের প্রধান উৎস। ফলে সেই ফসল খেয়ে ফেলে টিয়া পাখিরা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এভাবে আয়ের প্রধান উৎস ধান খেয়ে ফেলে টিয়া পাখিরা জুমচাষি দম্পতির ক্ষতির কারণ হয়েছিল।
বাড়ি থেকে বিতাড়িত জুমচাষি দম্পতির মেয়েটিকে টিয়া পাখিরা তাদের অট্টালিকায় রাজকীয়ভাবে অভ্যর্থনা জানালে সে লোভ না করে তার নিত্যনৈমিত্তিক জীবনযাত্রার সরলতা বেছে নেয়। এতে টিয়ারা খুশি হয়ে ঐশ্বর্য দ্বারা তাকে পুরস্কৃত করে।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে জুমচাষি দম্পতির মেয়েটিকে দায়িত্ব অবহেলার দায়ে পিতামাতা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। টিয়ারা তার ধান খেতে গেলে শত বারণ সত্ত্বেও সে তাদের থামাতে পারে না বরং বিপদগ্রস্ত হলে টিয়ারা তাকে নিজেদের দেশে আমন্ত্রণ জানায়। অতঃপর বাড়ি থেকে বিতাড়িত মেয়েটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে টিয়াদের দেশে পৌছালে টিয়াদের ঐশ্বর্য ও আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তার মুখোমুখি হয়। টিয়ারা তাকে সোনার সিঁড়ি, রূপার সিঁড়ি দিয়ে তাদের অট্টালিকায় প্রবেশের প্রস্তাব দিলে নির্লোভ মেয়েটি নিজের দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের অভ্যস্ততা অনুযায়ী কাঠের সিঁড়ি দিয়ে প্রবেশ করে। আহারের জন্য সোনার থালা, রূপার থালার পরিবর্তে সাধারণ থালায় খাবার খায়। ঘুমানোর জন্য সোনা-রুপার খাটের শুভ্র কোমল বিছানা রেখে দৈনন্দিন অভ্যস্ততাহেতু মেঝেতেই ঘুমিয়ে যায়। তার এই সরলতা, প্রাচুর্যের সুযোগ লুফে নেওয়ার বিপরীতে যাপিত জীবনের সততায় টিয়ারা মুগ্ধ হয়। এরপর তার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার দুঃখ শুনে টিয়ারা তাকে সাত কলস সোনা ও রূপার মোহর দিয়ে রক্ষীসমেত বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
জুমচাষি দম্পতির মেয়েটি টিয়াদের দেশে তাদের সম্পদের প্রাচুর্যের মোহে পড়েনি। মেয়েটির নির্লোভ হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে টিয়ারা তার প্রতি প্রসন্ন হয়ে তাকে সাত কলস সোনার ও রুপার মোহর দিয়ে পুরস্কৃত করে।
দরিদ্র জুমচাষি দম্পতির মেয়েটি টিয়াদের কাছ থেকে সাত কলস সোনা ও রূপার মোহর লাভ করায় পাড়াপ্রতিবেশীরা তাজ্জব হয়ে যায়।
জুমচাষি দম্পতির মেয়েটি সহজসরল ও সৎ ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে টিয়া পাখিরা দুর্দিনে তার পাশে দাঁড়ায়। তারা চাষি দম্পতির ধান খেয়ে ফেলায় মেয়েটিকে তার বাবা-মা বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তখন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা মেয়েটিকে নিজেদের কাছে আশ্রয় দেয়। মেয়েটির সততা ও সরলতা দেখে তারা মুগ্ধ হয়। অতঃপর তাকে সাত কলস সোনা ও রূপার মোহর দিয়ে সাহায্য করে। এই বিষয়টি জানতে পেরে পাড়াপ্রতিবেশীরা অবাক হয়। চাষি দম্পতির সহজসরল মেয়েটির এমন অসাধ্য সাধন পাড়াপ্রতিবেশীদের বিশ্বাসের বাইরে থাকায় তারা তাজ্জব হয়ে যায়।
সৎ, নির্লোভ ও নির্মোহ থাকার পুরস্কার ও লোভী মানুষের নির্মম পরিণতিই 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পের শিক্ষণীয় দিক।
'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে দরিদ্র জুমচাষি দম্পতির মেয়েটি ধান শুকাতে গেলে এক ঝাঁক টিয়া তার সব ধান খেয়ে ফেলত। সে বারণ করলে টিয়ারা মেয়েটিকে তার বিপদে সাহায্য করার আশ্বাস দিত। এমতাবস্থায় কর্তব্যে অবহেলার জন্য জুমচাষি দম্পতি মেয়েটিকে মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। সে অনেক কষ্টে টিয়াদের দেশে উপস্থিত হলে টিয়ারা তাকে সাদরে গ্রহণ করে। টিয়াদের ঐশ্বর্য দেখে মেয়েটি অবাক হয়ে যায়। কিন্তু তার মধ্যে মোহ বা লোভ জাগ্রত হয় না। সে টিয়াদের ঐশ্বর্যমন্ডিত আপ্যায়নের বিপরীতে তার দৈনন্দিন জীবনের অভ্যস্ততা অনুযায়ী সাধারণ সেবাই গ্রহণ করে। তার সারল্য ও সততায় মুগ্ধ হয়ে টিয়ারা তাকে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে পুরস্কৃত করে। মেয়েটির এমন সাফল্য দেখে এক লোভী দম্পতি তাদের মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। লোভী দম্পতির মেয়েটিও লোভী বলে সে টিয়াদের ঐশ্বর্য দেখে নিজের লোভ সংবরণ করতে পারে না। টিয়ারা তাকেও পূর্বের মেয়েটির মতো অভ্যর্থনা জানায়। সে সোনার সিঁড়ি দিয়ে অট্টালিকায় ওঠে, সোনার থালায় খাবার গ্রহণ করে এবং সোনার খাটে ঘুমায়। টিয়ারা তার অসৎ উদ্দেশ্য ও লোভী মানসিকতা বুঝতে পেরে সাতটি কলস ভর্তি করে বিষধর সাপ পাঠিয়ে দেয়, যা তাদের পুরো পরিবার নির্বংশ করে দেয়। কীভাবে নির্লোভ মানসিকতা ও সততা মানুষকে পুরস্কৃত করে আর লোভ ও অসততা মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে, গল্পটি পাঠ করে সে শিক্ষাই পাওয়া যায়।

অনেক দিন আগের কথা। এক গ্রামে এক জুমচাষি দম্পতি ছিল। তাদের একটি মেয়ে ছিল। খুবই সুখে দিন কাটছিল তাদের। প্রতিদিন অতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে ওই দম্পতি রান্না বান্না সেরে, খেয়ে, জুমচাষের কাজে বেরিয়ে পড়ত। মেয়েটিকে ঘরে রেখে যেত। সে ঘর পাহারা দিত আর ঘরের খুঁটিনাটি কাজ করত। সন্ধ্যায় মা-বাবা ফিরে আসত। আবার রাতের রান্না সেরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। এভাবে তাদের দিন অতিবাহিত হতে লাগল। একদিন তারা মেয়েকে ধান শুকাতে বলে গেল। মা-বাবা বেরিয়ে যাবার পর তাদের নির্দেশমতো উঠানে ধান শুকাতে দিল। পাশে বসে সে পাহারা দিতে লাগল যাতে কোনো পশুপাখি খেতে না-পারে। ধান প্রায় শুকিয়ে এসেছে। তুলতে যাবে এমন সময় হঠাৎ কোথেকে এক ঝাঁক সাদা টিয়া আর হলুদ টিয়া এসে ধানের ওপর বসল। একটা-দুটো করে এক নিমেষে সব ধান খেয়ে শেষ করে ফেলল। মেয়েটি তাদেরকে অনেক নিষেধ করল। বলল, 'লক্ষ্মী টিয়ারা, তোমরা ধান খেয়ো না। বাবা-মা ফিরে এসে ধান না দেখলে আমাকে মেরে ফেলবে।' টিয়ারা বলল, 'আমরা একটু খাব, মা-বাবা বকলে, মারলে, আমাদের কাছে চলে এসো।' সন্ধ্যায় মা-বাবা ফিরে এসে ধান না দেখে মেয়েকে ভীষণ বকুনি দিল। তারা মনে করল, সে নিশ্চয় পাহারা দেয়নি।
পরদিন তারা আবার ধান শুকাতে দিয়ে গেল। সেদিনও একই ঘটনা ঘটল। সেদিন মা-বাবা মেয়েকে অলস ভেবে ভীষণ মারধর করল। মেয়েকে সাবধান করে বলল, 'আবার যদি টিয়াদের ধান খাওয়াস তাহলে তোকে মেরে তাড়িয়ে দেব।' তার পরদিনও ধান শুকাতে দিয়ে গেল। মেয়েটি শত চেষ্টা করেও টিয়াদের বারণ করে ধান রাখতে পারল না। সে বসে কাঁদতে লাগল। মা-বাবা ফিরে এসে বুঝতে পারল একই ঘটনা। এতে আর কোনো ভুল নেই। যেই কথা সেই কাজ। মেয়েকে তাড়িয়ে দিল। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে টিয়াদের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। অচেনা পথে যেতে যেতে যখন ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়ল, তখন একজন রাখালের দেখা পেল। মেয়েটি রাখালকে জিজ্ঞেস করল, 'রাখাল ভাই, তুমি কি সাদা টিয়া, হলুদ টিয়ার দেশের সন্ধান দিতে পারো?' রাখাল উত্তর দিল-
লক্ষ্মী মেয়ে বলছি তোমায় শোনো,
সাদা টিয়ে হলুদ টিয়ের সন্ধান তোমায় দেবো।
এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খেয়ে একটু জিরিয়ে নাও
তারপরেতে সোজা ওই দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যাও।
মেয়েটি তা-ই করল। একটু বিশ্রাম করে আবার পথ চলা শুরু করে দিল। যেতে যেতে এবার পৌঁছাল মেষপালকের কাছে। মেয়েটি মেষপালককে জিজ্ঞেস করল, 'মেষপালক ভাই, তুমি কি সাদা টিয়া হলুদ টিয়ার দেশ কোনদিকে বলতে পারো?' মেষপালক মেয়েটিকে আদর-যত্ন করে বসতে দিল। বলল-
লক্ষ্মী মেয়ে শোনো তোমায় বলি
এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খাও, এই অনুরোধ করি।
সাদা টিয়ে হলুদ টিয়ের দেশে যেতে চাও
তো দক্ষিণপূর্ব দিকের পথটি ধরে যাও।
মেয়েটি মেষপালকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগিয়ে চলল। সারাদিন যেতে যেতে সন্ধ্যায় পরিশ্রান্ত হয়ে এক অশ্বরক্ষকের কাছে পৌঁছাল। সে অশ্বরক্ষককে সাদা টিয়া, হলুদ টিয়ার দেশে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিতে বলল। অশ্বরক্ষক বলল-
লক্ষ্মী মেয়ে, এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খাও
শ্রান্ত তুমি, একটু জিরিয়ে নাও।
দক্ষিণপূর্ব দিকে তোমায় যেতে হবে
সাদা টিয়ে, হলুদ টিয়ের দেখা তবে পাবে।
এই বলে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর অশ্বরক্ষক মেয়েটিকে বিদায় দিল। মেয়েটি সারা দিন যেতে যেতে এবার সন্ধ্যায় হস্তীরক্ষকের কাছে গিয়ে পৌঁছাল। পথ যেন ফুরাতে চায় না। মেয়েটির মনে হলো সে, ক্লান্ত। তারপর হস্তীরক্ষকের কাছে জিজ্ঞাসা করল, 'সাদা টিয়া, হলুদ টিয়ার দেশে পৌঁছাতে আর কতদিন লাগবে?'
হস্তীরক্ষক তাকে সাহস দিয়ে বলল-
লক্ষ্মী মেয়ে এসেছ তুমি সঠিক পথটি ধরে
তবে এক মুঠো ভাত, এক আঁজলা পানি খেয়ে একটু জিরোতে হবে
আর মাত্র এক ক্রোশ পথ যেতে হবে
সাদা টিয়ে হলুদ টিয়ের তবেই দেখা পাবে।
হস্তীরক্ষকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার পথ চলতে লাগল মেয়েটি। সে বুঝতে পারল, সবাই তাকে সত্যি কথা বলছে, সঠিক পথ দেখিয়ে দিয়েছে। সবাই তাকে ফেরার পথে তাদের আতিথ্য গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছে। এক ক্রোশ পথ অতিক্রম করার পর মেয়েটি ক্লান্ত অবসন্ন দেহে অবশেষে টিয়াদের দেশে পৌঁছাল।
চারিদিকে তাকাতেই সামনে সে দেখতে পেল এক সুবর্ণ অট্টালিকা। একটু জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটির পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানতে পেরে সাদা টিয়া, হলুদ টিয়ারা তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাল। সোনার সিঁড়ি, রূপার সিঁড়ি কোনটা বেয়ে ঘরে ওঠার ইচ্ছা তারা জানতে চাইল। মেয়েটি বলল তারা, গরিব তাই কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে অভ্যন্ত। মেয়েটিকে তাই করতে দিল। বাড়িতে ঢুকে চারিদিকে ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি দেখে সে অবাক হয়ে গেল। পরিশ্রান্ত মেয়েটিকে স্নান করিয়ে সুন্দর সুন্দর পোশাক পরতে দিল।
তারপর সোনার থালায় রূপার থালায় করে রকমারি খাবার খেতে দিল। মেয়েটি ওইসব থালায় খেতে অভ্যন্ত নয় তাই সে সাধারণ থালায় খেল। জীবনে কোনোদিন খায়নি এমন খাবার! তাই সে খুব তৃপ্তি সহকারে খেল। শোবার ঘরে নিয়ে গেল রাতে। সেখানেও সোনার খাটে রূপার খাটে শুভ্র কোমল বিছানা করা হয়েছে দেখতে পেল। কোনোটাতে ঘুমাবে জানতে চাইলে মেয়েটি বলল, তারা গরিব। জীবনে কোনোদিন ওইসব খাটে শোয়নি। মেঝেতে শুতেই অভ্যন্ত। তারা তাকে মেঝেতেই শুতে দিল। পরদিন সে টিয়াদের তার দুঃখের কথা জানাল। মা-বাবা অলস, অকর্মণ্য ভেবে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। টিয়ারা তাকে সান্ত্বনা দিল। সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ, সাত কলস সোনা ও রুপার মোহর আর কয়েকজন রক্ষী দিয়ে মেয়েটিকে মা-বাবার কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিল। ফেরার পথে তার শুভাকাঙ্ক্ষী রাখাল, মেষপালক, অশ্বরক্ষক, হস্তীরক্ষক সবার সঙ্গে দেখা করে তাদের সহযোগিতার জন্য অশেষ ধন্যবাদ জানাল। তারাও মেয়েটির ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে প্রাণভরে আশীর্বাদ করল।
অবশেষে মেয়েটি নিজের বাড়িতে এসে পৌঁছাল। মা-বাবা তাদের মেয়ে এবং সঙ্গে সোনা-রুপার মোহর পেয়ে তো মহাখুশি। পাড়াপ্রতিবেশীরাও মেয়েটির কাণ্ড দেখে তাজ্জব হয়ে গেল। সবাই কানাঘুষা করতে লাগল, এটা কীভাবে সম্ভব হলো। অনেকেই হিংসায় জ্বলে গেল। অনেকের লোভ সৃষ্টি হলো। এভাবে এক লোভী মা-বাবা তাদের মেয়েকে তাড়িয়ে দিল, সোনা-রুপার মোহর খোঁজ করে আনার জন্য। ওই মেয়েটি সবাইকে জিজ্ঞেস করে করে ঠিকই সাদা টিয়া হলুদ টিয়াদের দেশে পৌঁছাল।
লোভী বাপ-মায়ের সন্তানও লোভী ছিল। এই মেয়েটিকেও পূর্বের মেয়েটির অনুরূপ আদর-যত্ন করা হলো। লোভ সামলাতে না পেরে সে সোনার সিঁড়ি দিয়ে উঠল। সোনার থালায় খেল। সোনার খাটে ঘুমাল। পরদিন তার এখানে আগমনের কারণটা জানাল। টিয়ারা সব শুনে সাতটি কলস ভালো করে মুখ এঁটে মেয়েটিকে দিল। বলে দিল বাড়ি পৌঁছে চট করে যেন কলসের মুখ না খোলে। একটার ভিতর আরেকটা, এভাবে পরপর সাতটি তাঁবু খাটিয়ে সবচেয়ে ভিতরেরটাতে বংশের সব আত্মীয়স্বজনকে ডেকে জড়ো করে তারপর যেন কলসের মুখ খোলে। আত্মীয়স্বজন জড়ো হয়ে যখন কলসের মুখ, খুলল তখন সাতটি কলস থেকে বিভিন্ন জাতের বিষধর সর্প বের হয়ে সবাইকে দংশন করে নির্বংশ করল।
Related Question
View Allজুমচাষি দম্পতির একটি মেয়ে।
টিয়ারা মেয়েটিকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাল।
অনেক খোঁজার পরে মেয়েটি টিয়াদের দেশে পৌছতে পেরেছিল। টিয়ারা তার পরিচয় পেয়ে তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাল। সোনার সিঁড়ি, রুপার সিঁড়ি বেয়ে মেয়েটিকে ঘরে ওঠার জন্য বলল। তারপর স্নান শেষ করে মেয়েটিকে সুন্দর পোশাক পরতে দিল। সোনার থালা, রূপার থালায় মেয়েটিকে অনেক খাবার খেতে দিল। সোনার খাটে, রুপার খাটে কোমল বিছানায় তাকে শুতে দিল। এভাবেই মেয়েটিকে টিয়ারা অভ্যর্থনা জানাল।
উদ্দীপকের চাষি 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পের লোভী মেয়ে চরিত্রের প্রতিনিধি।
লোভ করা কখনই ভালো নয়। লোভী মানুষ সবসময়ই সমাজে ঘৃণিত। অন্যদিকে লোভহীন মানুষ সমাজে সবসময় সমাদৃত।
উদ্দীপকে লোভী চাষি রাতারাতি ধনী হওয়ার জন্য তার সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে কেটে ফেলে। পরিণতিতে সে কিছুই পায়নি, কিন্তু হাঁসটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে। 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে লোভী মেয়েটি টিয়াদের দেশে গিয়ে ধন-দৌলতের প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগল। যেন টিয়ারা তাকে জুমচাষির মেয়ের মতো সোনা-রুপার মোহর দেয়। কিন্তু টিয়ারা বুঝতে পেরে তাকে মোহরের বদলে সাপ দিয়েছিল। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের চাষি 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পের লোভী মেয়েটির প্রতিনিধি।
উদ্দীপকটি 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পের লোভীদের প্রতিচ্ছবি-মন্তব্যটি যথার্থ।
অসততা, লোভ, হিংসা কখনই মানুষকে ভালো কিছু দিতে পারে না। তাই যতটা সম্ভব এগুলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে - পারা প্রত্যেক মানুষের জন্যই মঙ্গলজনক।
উদ্দীপকে বেশি লোড করার কারণে চাষি তার হাঁসটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে। 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পে লোভ করার কারণে লোভী বাবা-মায়ের লোভী মেয়েটিকে টিয়ারা সোনা-রুপার মোহর দেয় না। বরং সাত.কলস ভরে বিষধর সাপ দেয় এবং সেই সাপের ছোবলে তারা নির্বংশ হয়ে যায়।
উদ্দীপকে লোভীর নির্মম পরিণতি দেখানো হয়েছে। 'হলুদ টিয়া সাদা টিয়া' গল্পেও লোভীদের ভয়ানক পরিণতি প্রকাশ পেয়েছে। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
মা-বাবা মেয়েটিকে অলস ও অকর্মণ্য ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছে।
লোভীরা বিষধর সাপের দংশনে নির্বংশ হয়েছিল।
জুমচাষি দম্পতি তাদের মেয়েটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরে মেয়েটি টিয়াদের দেশ থেকে অনেক সোনা-রুপার মোহর এনেছিল। এ ঘটনা দেখে এক লোভী পরিবার তাদের মেয়েকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লোভী বাবা-মায়ের মেয়েও লোভী ছিল। টিয়াদের দেশে গিয়ে সে লোভ করেছিল এবং টিয়ারা তা বুঝতেও পেরেছিল। এজন্য টিয়ারা মেয়েটিকে সাতটি কলসি ভরে সোনার মোহর না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিষধর সাপ দিয়েছিল। আর সেই বিষধর সাপের দংশনে লোভীরা নির্বংশ হলো।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!