১.৪.১ লেয়ার মুরগি পালনের বিভিন্ন পদ্ধতি (Different Methods of Rearing Laver Chickens)
মোরগ-মুরগির সঠিক উৎপাদন পেতে হলে অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নির্মাণ করতে হবে। মুরগির বাসস্থান যে এলাকায় তৈরি করা হবে, সে এলাকায় প্রাপ্ত উপকরণের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা উচিত। এতে নির্মাণ ব্যয় অনেক কম হবে এবং খামারিরা অতি সহজেই নির্মাণ করতে পারবেন। আমাদের দেশে খামারিরা ৩টি পদ্ধতিতে ডিমপাড়া মুরগি পালন করে থাকে। যথা-
১) লিটার পদ্ধতি
২) মাচা পদ্ধতি
৩) খাঁচা পদ্ধতি
তবে সার্বিক ব্যবস্থাপনা, স্থায়ী খরচ ও স্বাস্থ্যসম্মত দিক বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে মাচা ও খাঁচা পদ্ধতিতে ডিমপাড়া মুরগি পালন অধিক লাভজনক ।
১. লিটার পদ্ধতি (Litter Method):
এই পদ্ধতিতে ঘরের মেঝের উপর বিছানা হিসাবে কাঠের গুঁড়া, তুষ, খড়ের ছোট ছোট টুকরা ইত্যাদি ব্যবহার করে মুরগি পালন করা যায়। লিটারের সহজলভ্যতা ও দামের উপর নির্ভর করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম লিটার ব্যবহার করা হয়।
লিটার পদ্ধতি আবার দুই প্রকার :
(ক) লাইট লিটার পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে ঘরের মেঝেতে ২-৩ ইঞ্চি পুরু করে লিটার বিছানো থাকে ।
(খ) ডিপ লিটার পদ্ধতি: ঘরের মেঝেতে পুরু বা মোটা করে লিটার দেওয়া হয়। সাধারণত ৪-৮ ইঞ্চি, পুরু করে লিটার দেওয়া হয় ।
লিটার পদ্ধতিতে বাচ্চা মুরগির জন্য ২-৩ ইঞ্চি, বাড়ন্ত মুরগির জন্য ৩-৪ ইঞ্চি ও ডিম উৎপাদনকারী | মুরগির জন্য ৪-৮ ইঞ্চি পুরু করা উচিত। মুরগি ঘরে উঠানোর ১ সপ্তাহে পূর্বে লিটার সরবরাহ করতে হবে।
এই পদ্ধতিতে সুবিধাঃ
- নির্মাণ ব্যয় কম।
- লিটার ব্যবহার করলে মুরগির বিষ্ঠা ঘরের মেঝের সাথে লেপ্টে থাকে না।
- ঘর শুকনা ও দুর্গন্ধমুক্ত থাকে।
- ঘরে মুরগির অবস্থানকাল পর্যন্ত পরিষ্কার করতে হয় না।
- ডিম পাড়া শেষে বাতিল মুরগি বিক্রয়ের পর লিটার পরিষ্কার করতে হয়।
- ডিমের গুণাগুণ ভালো হয় ও ডিম কম ভাঙে ।
- ডিম উৎপাদন বেশি হয়।
- মুরগির স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
- মুরগি বেশি আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে ।
- তুলনামূলক সহজ ব্যবস্থাপনা ।
- লিটারের মধ্যে এক প্রকার ভিটামিন ও আমিষ তৈরি হয় যা মুরলি লিটার থেকে খুঁটে খায়।
- লিটার জৈব সার হিসাবে জমিতে ব্যবহার করা যায় এবং জৈব খাদ্য হিসাবে মাছের জন্য ব্যবহার করা যায়।
এই পদ্ধতিতে অসুবিধা:
- শ্রমিক খরচ বেশি।
- ডিম ময়লা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অধিক জায়গা প্রয়োজন হয়।
- রোগব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- মেঝেতে ডিম পাড়ার প্রবণতা হতে পারে।
- ভিজা লিটার মুরগির স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে ।
- লিটারের আর্দ্রতা বেশি থাকলে অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপন্ন হয় যা মুরগির জন্য ক্ষতিকর।
২. মাচা পদ্ধতি (Slat System):
ঘরের মধ্যে সমস্ত মেঝে জুড়ে মেঝের উপর ২৭ ইঞ্চি উঁচুতে মাচা তৈরি করা হয়। অনেক সময় পরিবেশ অনুসারে আরও উঁচু মাচা যুক্ত ঘর তৈরি করা হয়। মাচার ফাঁক দিয়ে মুরগির বিষ্ঠা মাচার নিচে জমা হলে নিচে ঢুকে পরিষ্কার করতে হয়। ডিম পাড়া শেষ হওয়া পর্যন্ত ঘরের নিচে পায়খানা জমা হয়। এই পদ্ধতিতে মাচার নিচে মাছির উপদ্রব হয় এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, ফলে মাঝে মাঝে বিষ্টা পরিষ্কার করে ফেলা হয়। বড় বাণিজ্যিক খামারে এ পদ্ধতি তেমন জনপ্রিয় নয়।
এই পদ্ধতির সুবিধাঃ
- রোগব্যাধি কম হয় ।
- লিটার পদ্ধতির তুলনায় বেশি মুরগি রাখা যায় ।
- বিছানার দরকার হয় না।
- মুরগির বিষ্ঠা মাছের খাদ্য হিসেবে বেশি উপযোগী।
এই পদ্ধতিতে অসুবিধাঃ
- নির্মাণ ব্যয় বেশি ।
- ডিম ভাঙার সম্ভাবনা বেশি।
- প্রজননে জন্য অসুবিধা।
- মুরগির বিষ্ঠা পরিষ্কার করতে অসুবিধা।
- মাছির উপদ্রব বেশি।
৩. খাচা পদ্ধতিঃ
বর্তমানে আধুনিক বিশ্বে খাচা পদ্ধতিতে ভাবে ডিমপাড়া মুরগি পালন করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে প্রতিটি পীচার শোপের মাপ দৈর্ঘ্য ১৮'' গ্রন্থ ১২'' x উচ্চতা ১৯'' হলে, সেখানে অনায়াসে ৩ টি ডিম পাড়া মুরগি রাখা যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের খাঁচা বাজারে পাওয়া যায় ।
(ক) একক ডেক খাচাঃ
স্বপ্নের মধ্যে এক সারিতে স্থাপন করা হয়। প্রতি বলে ঘরের মধ্যে একই থাকে। মুরগির বিষ্ঠা সরাসরি ধাতার নিচে ঘরের মেঝেতে পরে। খাঁচা যত্নের সিপিং-এর সাথে ঝুলিয়ে বা পিলারের উপর স্থাপন করা যায়।
(খ) দুই ডেক খাঁচাঃ
খাঁচা সিঁড়ির আকারে একটির উপর অপরটি দুই সারিতে স্থাপন করা যায়। প্রতি সারিতে চায় অবস্থিত মুরগির পায়খানা সরাসরি খাঁচার নিচে মেঝের উপর পড়ে। খোলামেলা যন্ত্রের জন্য এই বাঁচা উপযোগী।
(গ) তিন ডেক খাচাঃ
এই প্রকৃতির খাঁচা একটির উপর অপরটি দুইভাবে সারিবদ্ধ করে স্থাপন করা যায় ।
প্রথমত, সরাসরি একটি উপর অপর সারির খাঁচা স্থাপন করা যায়। প্রপ্তি সারিতে খাঁচার নিচে মুরগির বিষ্ঠা জান্নার । প্রতিদিন এ পরিষ্কার করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, তিন সারিতে পরস্পরের উপর সিঁড়ির আকারে খাঁচা সাজানো হয়। প্রতি তলার খাঁচার মুরগির বিষ্ঠা সরাসরি খাঁচার নিচে মেঝেতে পড়ে। লোহার অ্যানেল দ্বারা তৈরি করে এক সারিতে সিঁড়ির আকারে প্রতিটি অবকাঠামোর উপর ২৪ টি খাঁচা স্থাপন করা যায়। প্রতি খাঁচায় ৩ টি মুরগি হিসাবে ২৪ টি খাঁচায় ৭২টি মুরগি পালন করা যায়। অনুরূপভাবে স্থাপিত খাঁচার প্রচলন বেশি। প্রতি অবকাঠামো ৬''-৭'' এবং পারাসহ উচ্চতা ৪.৫''-৫'' এ-এ। এভাবে ৪ বা ৫ ডেক স্থাপন করা যায়।
(ঘ) ফ্লাট ডেক টাইপঃ
একই সারিতে একই সমতলে ঘরের মধ্যে খাঁচা স্থাপন করা হয়। প্রতি সারিতে খাঁচা খুব কাছাকাছি স্থাপন করা হয়। পরিচর্যা করার জন্য সারির মধ্যভাগে যাতায়াতের রাস্তা থাকে না। প্রতি সারির নিচ দিয়ে মটর চালিত চওড়া কেট চালু থাকে। যেখানে মুরগির বিষ্ঠা পড়ে। এই চলন্ত বেল্ট বিষ্ঠা টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। ডিম সংগ্রহের জন্য চওড়া কনভেয়র বেল্ট মটরের সাহায্যে চালু করা হয়।
(ঙ) পিরামিড টাইপ বহুতল খাচাঃ
তিন সারিতে পরস্পরের উপর সিঁড়ির আকারে খাঁচা সাজানো হয়। এ ভাবে উত্তর পার্শ্বে যখন এ সারিতে পরস্পরের উপর সিঁড়ির আকারে বাঁচা সাজানো হয়, তখন এতে পিরামিডের মতো মনে হয়। প্রতি তলার বাঁচার মুরগির বিষ্ঠা সরাসরি খাঁচার নিচে মেঝেতে পড়ে। লোহার অ্যাঙ্গেল দ্বারা তৈরি করে এক সারিতে সিঁড়ির আকারে প্রতি অবকাঠামোর উপর ২৪ টি হিসাবে উভয় পার্শ্বে মোট ৪৮টি খাঁচা স্থাপন করা যায় । প্রতি খাঁচায় ৩ টি মুরগি হিসাবে ৪৮ টি খাঁচায় ১৪৪ টি মুরগি পালন করা যায় ।
(চ) এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া টাইপের বহুতল খাঁচায়ও মুরগি পালন করা হয়।
এ পদ্ধতির সুবিধা:
- অল্প জায়গার বেশি মুরগি পালন করা যায়।
- পরিচর্যা ও যত্ন নেওয়া সহজ ।
- রোগ বিস্তারের সম্ভাবনা কম।
- বাঁচার মধ্যে মুরগি কখনও কুঁচে হয় না।
- ডিম পাড়ার সাথে সাথে গড়িরে পাচার বাইরে চলে আসে।
- মুরগির ডিম খাওয়ার অভ্যাস জন্মাতে পারে না ।
- ডিম ময়লা হয় না ।
- মুরগির কৃমিতে আক্রন্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
- বিষ্ঠা দিয়ে বারোগ্যাস তৈরি করা যায়।
এ পদ্ধতির অসুবিধাঃ
- খাঁচার নিচে মুরগির বিষ্ঠা জমে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয় ও মাছির উপদ্রব হয়।
- নিয়মিত বিষ্ঠা পরিষ্কার করা বিরক্তিকর।
- দুর্গন্ধে পার্শ্ববর্তী পরিবেশ সুষিত হয়।
- খাঁচা তৈরিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি।
- ডিমে রক্তজমা সৃষ্টির হার বেশি।
- পারের নিচে খাঁচার ঘর্ষণে কড়া পড়ে। একে 'বাম্বল ফুট' বলে।
- খাঁচায় পালিত মুরগির হাড় অত্যন্ত অনুর হয় এবং বাতিল মুরগির দাম কম পাওয়া যায় ।
- মুরগির ভিটামিন বি গ্রুপের অভাব বেশি হয়।
Read more