হিন্দুধর্মের বিশ্বাস (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

হিন্দুধর্মের স্বরূপ ও বিশ্বাস - হিন্দুধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

194
Please, contribute by adding content to হিন্দুধর্মের বিশ্বাস.
Content

আমরা জানি যেকোনো ধর্ম কতগুলো ধর্মবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ঐ ধর্মবিশ্বাসগুলো তার ভিত্তি। কর্মবাদ ও জন্মান্তরবাদ হিন্দুধর্মের দু'টি প্রধান ভিত্তি। প্রত্যেক কর্মেরই শুভ-অশুভ যে ফল উৎপন্ন হয় সেটি কর্মকর্তাকে অবশ্যই ভোগ করতে হয়। চলতি জন্মে কর্মফলের ভোগ যদি শেষ না হয় তাহলে কৃতকর্মের ফল ভোগের জন্যই মানুষের পুনঃ পুনঃ জন্ম হয়। একেই বলে কর্মবাদ।

আর জন্মের পর মৃত্যু, মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম-একেই জন্মান্তর বলে। জন্মান্তরের পেছনে রয়েছে কর্মবাদ। জন্মান্তরে কর্মফল ভোগের একটি ধর্মীয় উপাখ্যান এখন বর্ণনা করা হলো।

অনেক অনেক কাল আগে বিষ্ণুভক্ত এক রাজা ছিলেন। তার নাম ছিল ভরত। বিশ্বরূপের কন্যা পঞ্চজনাকে তিনি বিয়ে করেন। তাদের সংসারে পাঁচ পুত্রের জন্ম হয়। রাজা ভরত পুত্রদের মধ্যে রাজ্য ভাগ করে দেন। এরপর তিনি তপস্যার জন্য বনে গমন করেন। সাধনার দ্বারা রাজা ভরত হলেন সাধকভরত মুনিভরত।

একদিন তিনি নদীতে স্নান করতে গেলেন। সেখানে দেখতে পেলেন এক হরিণী জল পান করতে এসেছে। হরিণীটির বাচ্চা প্রসবের সময় হয়ে এসেছে। এমন সময় বনের ভেতর থেকে সিংহের গর্জন শোনা গেল। ভয়ে হরিণী নদীর তীরে পড়ে যায় এবং তার গর্ভ থেকে এক বাচ্চা হরিণের জন্ম হয়। হরিণী মৃত্যুবরণ করে। এই দৃশ্য দেখে ভরতমুনি দয়াযুক্ত চিত্তে হরিণশিশুটিকে রক্ষার জন্য নিয়ে আসেন তার আশ্রমে। মাতৃহীন হরিণশিশুর যত্নে, আদরে তার সময় কাটে। এর ফলে মুনির তপস্যা আর রইল না। এই হরিণশিশুর চিন্তা করতে করতে তিনি দেহত্যাগ করেন। শাস্ত্রে বলে মানুষ যেরূপ চিন্তা করতে করতে দেহত্যাগ করেন তিনি সেই রকম জন্মলাভকরেন। তাই ভরতমুনিকেও হরিণরূপে জনন্মগ্রহণ করতে হলো। তবে হরিণ হয়ে জন্মালেও তাঁর পূর্বজন্মের কাহিনী স্মরণে ছিল। তাই হরিণজীবনেও তপস্বীদের আশ্রম প্রান্তে থেকে ধর্মকথা, তপস্যার কথা শুনতে শুনতে দেহত্যাগ করে পুনরায় মনুষ্যজনম প্রাপ্ত হন এবং ঈশ্বর আরাধনা করে তার অনুগ্রহ লাভ করেন।

কর্মফল অবশ্যই ভোগ করতে হয়। এই ধর্মীয় বিধান বিজ্ঞানসম্মত। প্রত্যেক কাজেরই একটা কারণ বা হেতু থাকে। আর যখনই একটা কারণ এসে পড়ে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসে কাজের ফল। এক বালক বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা জলে স্নান করে আনন্দ পায়। কিন্তু সে জানে না যে বৃষ্টিতে ভিজলে এবং ঠান্ডা জলে দীর্ঘ সময় থাকলে তার অসুখ হতে পারে। সে না জানলেও কাজের ফল হিসেবে তাকে অসুস্থ হতে হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে কর্মের সঙ্গে কর্মের ফল সম্বন্ধযুক্ত। কর্ম করলেই কর্মফল আসে। আর সে কর্মফল অবশ্যই কর্মকর্তাকে ভোগও করতে হয়। এই পরিবর্তনহীন ব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা সবাই সচেতন হব এবং শুভ-অশুভ কর্ম বিবেচনা করে জীবনের পথে শুভ কর্মের অনুশীলন করব।

একক কাজ: জন্মান্তরে কর্মফল ভোগের ধর্মীয় উপাখ্যানের শিক্ষা তোমার জীবনে কীভাবে প্রতিফলন করবে?
Content added By

জীবনে নারী-পুরুষের নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। পুরুষের কর্মস্থল প্রায়ই থাকে গৃহের বাইরে। অপরদিকে অধিকাংশ নারীর কর্মস্থল তাঁর সংসারকে নিয়ে গড়ে ওঠে। জন্মের পরে কন্যা মা-বাবার স্নেহ-যত্নে বেড়ে ওঠে, শিক্ষা গ্রহণ করে। বিবাহিত জীবনে সে স্বামীর ঘরে যায়, স্বামীর সংসার তাকে দেখতে হয়। বৃদ্ধ বয়সে এই মহিলাকেই পুত্রকন্যাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এইভাবে সমাজের একজন নারীর তিনটি অবস্থা দেখা যায়-কন্যা, বধূ ও মাতা। বধূ হিসেবে স্বামীর সংসার দেখা-শোনা, ছেলে-মেয়েদের লালন-পালন, শিক্ষার ব্যবস্থা করা তার কাজ হয়ে পড়ে। এ কাজের মধ্য দিয়ে নারী তার সংসারধর্ম পালন করেন। একজন আদর্শ মায়ের হাতে আদর্শ সন্তান গড়ে উঠতে পারে। সন্তানের কাছে মায়ের মতো আর বন্ধু নেই। রোগে, শোকে, আনন্দে, উৎসবে মা-ই হচ্ছেন সন্তানের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়, উৎসাহদাতা ও আনন্দের উৎস। এমন মাতৃরূপী নারীর প্রতি সন্তানের কর্তব্য হচ্ছে মাকে শ্রদ্ধা করা, তাঁর সেবা শুশ্রুষা করা। হিন্দুধর্মের অন্যতম ধর্মশাস্ত্র হচ্ছে মনুসংহিতা। সেখানে সংসারজীবনে কেমন করে শান্তি এসে থাকে তার বর্ণনা দেওয়া আছে। সেখানে বলা হয়েছে, যে সংসারে নারীরা আনন্দে-উৎসবে সুখে জীবন যাপন করে সে সংসার ঈশ্বরের কৃপায় শান্তি সমৃদ্ধিতে ভরে উঠে। তাই নারীদের প্রতি সদয় শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ ধর্মের অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করা।

অন্যদিকে হিন্দুধর্মে ঈশ্বরের প্রকৃতি বা শক্তি হচ্ছে নারী। এই শক্তিকে বলা হয় আদ্যাশক্তি মহামায়া। শক্তি ছাড়া কোনো কাজ হয় না। আর সেই শক্তির দেবী হচ্ছেন নারী। এভাবে নারী শক্তির প্রতি হিন্দুধর্ম মর্যাদা প্রকাশ করেছে।

ধর্মগ্রন্থে আরও বলা হয়েছে, ঈশ্বর সৃষ্টির জন্য নিজেকে দুভাগ করলেন। এক ভাগ পুরুষ এবং এক ভাগ নারী। এ ভাগ কিন্তু সমান সমান, বেশি বা কম নয়।

'অর্ধনারীশ্বর' নামক একটি প্রতিমায় দেখা যায়, অর্ধেক শিব ও অর্ধেক পার্বতী (দুর্গা)। এর তাৎপর্যও পুরুষ ও নারীর সমতা এবং নারীর প্রতি পূর্ণ মর্যাদাবোধের প্রকাশ।

মহাভারতে বলা হয়েছে, যে পরিবারে নারীর প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করা হয়, দেবতারা সে পরিবারে আনন্দে বাস করেন। (অনুশাসন পর্ব, ৪৬/৫)। অন্যদিকে কোনো পরিবারে নারী যদি অশ্রদ্ধা পান, তাহলে সমস্ত শুভকর্ম নিষ্ফল হয়। (অনুশাসন পর্ব, ৪৬/৬)।

নারীর প্রতি মর্যাদা প্রদর্শনের উপায় হলো, তাঁকে পরমা প্রকৃতি দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার অংশ মনে করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা এবং ধর্মগ্রন্থের অনুশাসন মেনে সমতাপূর্ণ আচরণ করা। সর্বোপরি নারীর মধ্যেও আত্মরূপে ঈশ্বর অবস্থান করেন, তাই নারীর প্রতি মর্যাদা প্রকাশ তো ঈশ্বরের প্রতি মর্যাদা প্রকাশ।

হিন্দুধর্মগ্রন্থসমূহে নারীর প্রতি মর্যাদাবোধের যে সকল দৃষ্টান্ত রয়েছে, আমরা তা অনুসরণ করব। সর্বক্ষেত্রে সম অধিকার নারীর প্রাপ্য- এ সত্য মনে রেখে আমরা নারীর প্রতি মর্যাদা প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হব।
কর্মবাদ ও জন্মান্তর, নারীর প্রতি মর্যাদাবোধ, ঈশ্বরজ্ঞানে জীবসেবা, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ ও নরকের ধারণা ইত্যাদি আরও অনেক বিশ্বাসের ওপর হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠিত। আর এ ধর্মবিশ্বাসগুলোর লক্ষ্য হলো মানুষকে প্রকৃত মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষরূপে গড়ে তোলা এবং পরিবার ও সমাজকে শৃঙ্খলাপূর্ণ ও শান্তিময় করে গড়ে তোলার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করা।

দলীয় কাজ: নারীকে কীভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় ভূষিত করা যেতে পারে তার কয়েকটি উপায় লেখ।

নতুন শব্দ: কর্মযোগ, মাহাত্ম্য, অর্ধনারীশ্বর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...