হিন্দুধর্মের স্বরূপ (প্রথম পরিচ্ছেদ)

হিন্দুধর্মের স্বরূপ ও বিশ্বাস - হিন্দুধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

229
Please, contribute by adding content to হিন্দুধর্মের স্বরূপ.
Content

প্রত্যেক ধর্মেরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। হিন্দুধর্মেরও বিশেষ তত্ত্ব, কতগুলো ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মকৃত্য রয়েছে, যেগুলো হিন্দুধর্মের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যেমন- ঈশ্বরতত্ত্ব, ঈশ্বরে বিশ্বাস ও ভক্তি, কর্মবাদ ও জন্মান্তর, অবতারবাদ, মোক্ষলাভ, জীব ও জগতের কল্যাণভাবনা ইত্যাদি। আর এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে হিন্দুধর্মের স্বরূপ। এখন হিন্দুধর্মের স্বরূপ প্রকাশক প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সংক্ষেপে জানব।

ঈশ্বরতত্ত্ব

হিন্দুধর্মে ঈশ্বরকে নিরাকার বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়- এ বিষয়ে সুদৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করা হয়েছে। আমরা জানি, নিরাকার ঈশ্বরকে বলা হয় ব্রহ্ম, যখন প্রভুত্ব করেন তখন তিনি ঈশ্বর। জীবকে যখন কৃপা করেন তখন তাকে বলা হয় ভগবান।

হিন্দুধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, নিরাকার ঈশ্বর প্রয়োজনে সাকার রূপ ধারণ করতে পারেন। সাকার রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে নেমে আসতে পারেন। আমরা জানি, ঈশ্বর এভাবে নেমে আসলে তাঁকে অবতার বলে। এ অবতারবাদ হিন্দুধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আবার ঈশ্বরের কোনো গুণ বা শক্তি আকার পেলে তার নাম দেব-দেবী। এ দেববাদও হিন্দুধর্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

আমরা জানি, জীবের মধ্যে আত্মরূপে ঈশ্বর অবস্থান করেন। তাই জীবমাত্রই শ্রদ্ধেয় এবং তার সেবা করতে হয়। কারণ জীবসেবা যে ঈশ্বরের সেবা। আর এখানেই রয়েছে হিন্দুধর্মের নৈতিক শিক্ষার মূলভিত্তি।
জীবকে ঈশ্বরজ্ঞান করলে আর কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা হানাহানির প্রশ্নই ওঠে না। জীবকে কষ্ট দেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। কারণ জীবকে কষ্ট দেওয়া মানেই ঈশ্বরকে কষ্ট দেওয়া।

হিন্দুধর্ম অনুসারে ব্রহ্ম বা ঈশ্বর, অবতার, দেব-দেবী এবং জীব- সব মিলিয়ে এক ঈশ্বর। এই হলো হিন্দুধর্মের ঈশ্বরতত্ত্ব।

একক কাজ : তোমার জানা একজন ব্যক্তির জীবসেবামূলক কর্মকান্ড বর্ণনা কর।
Content added By

হিন্দুধর্মের অনুসারীরা ঈশ্বরে গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। তাঁরই নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে বিশ্বসংসার চলছে। তিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের সর্বময় কর্তা। তিনি পরম দয়ালু-পরম করুণাময়। তাই তাঁকে ভক্তি করা কর্তব্য। দেব-দেবীরাও ঈশ্বরের অংশ। তাই তাঁদেরও ভক্তি করা হয়।

কর্মবাদ ও জন্মান্তরবাদ

ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। সকল কিছুর পরিচালক তিনি। জীবের জীবিকা অর্জনের জন্য কর্মও তিনি সৃষ্টি করেছেন। আমরা যা কিছু করি, সে সবই কর্ম। ঘর-বাড়ি তৈরি করা, ফসল উৎপাদন করা, ব্যবসা-বাণিজ্য করা, লেখাপড়া করা, পূজা-অর্চনা, ধ্যান-ধারণা সবই কর্মের মধ্যে পড়ে। প্রত্যেক কর্মেরই ফল আছে। শুভ কর্মের ফল শুভবা পুণ্য আবার অশুভ কর্মের ফল অশুভ বা পাপ। এই কর্মফল কিন্তু কর্মকর্তাকে অবশ্যই ভোগ করতে হয়। ভোগ ছাড়া কোনো কর্মফল নষ্ট হয় না। এটাই কর্মবাদ। এই কর্মফল ভোগের জন্য প্রয়োজনে পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয়। একে বলা হয় জন্মান্তর। এই কর্মবাদ ও জন্মান্তরবাদ হিন্দুধর্মের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।

মোক্ষলাভ

হিন্দুধর্মের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মোক্ষলাভ। 'মোক্ষ' কথাটির মানে হচ্ছে চিরমুক্তি লাভ। কোথা থেকে মুক্তি? বারবার জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি। জীবের আত্মা ঈশ্বর বা পরমাত্মার অংশ। চিরমুক্তি লাভ করে জীবাত্মা ঈশ্বর বা পরমাত্মার সঙ্গে মিশে যায়। তখন আর জন্মগ্রহণ করতে হয় না। একেই বলে মোক্ষ।

মোক্ষ লাভের উপায় হচ্ছে সকল কর্ম ঈশ্বরে সমর্পণ করা। অর্থাৎ সকল কাজ ঈশ্বরের কাজ মনে করে সম্পাদন করা, ভোগের আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করে ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করা এবং জীব ও জগতের জন্য কল্যাণকর কাজ করে যাওয়া।

একক কাজ: কর্মবাদ ধারণাটি কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে লেখ।
Content added By

হিন্দুধর্ম অনুসারে ধর্মাচরণের মূল লক্ষ্য হচ্ছে: 'আত্মমোক্ষায় জগদ্ধিতায় চ।' অর্থাৎ ধর্মাচরণের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিজের মোক্ষলাভ ও জগতের কল্যাণ। কেবল নিজের মোক্ষলাভের বিষয়ে চিন্তা করলেই হবে না। তাহলে তা হবে একান্তই আত্মসুখের চিন্তা। হিন্দুধর্ম কেবল নিজের সুখের চিন্তা করার বিষয়টি মোটেই অনুমোদন করে না। আত্মমোক্ষ চিন্তার পাশাপাশি জগতের কল্যাণ করতে হবে। নইলে ধর্মাচরণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আর মোক্ষও লাভ হবে না। সুতরাং জীব ও জগতের কল্যাণ করা মোক্ষলাভের অন্যতম উপায়।

ধর্মকৃত্য

ধর্মের প্রয়োগ তার কৃত্য বা উপাসনায়, ধর্মাচারে ও আচরণীয় সংস্কারে। হিন্দুধর্ম অনুসারে ঈশ্বরের নিরাকার রূপকে উপাসনা করা হয় মন্ত্র জপে ও গানে-কীর্তনে। আবার সাকার উপাসনা করা হয় দেব-দেবীর প্রতিমা নির্মাণ করে তাঁদের সুনির্দিষ্ট পূজাবিধি অনুসরণ করে পূজা করার মাধ্যমে।

হিন্দুধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে কিছু ধর্মাচার ও সংস্কার পালন করতে হয়। ধর্মাচারের মধ্যে রয়েছে নিত্যকর্ম ও যোগাসন, রয়েছে তীর্থভ্রমণ, গঙ্গা নদীসহ পবিত্র জলাশয়ে স্নান, অতিথি সেবা, তুলসী সেবা ইত্যাদি। সংস্কার হচ্ছে প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা দৈনন্দিন জীবনের ক্ষেত্রে করণীয় কিছু কাজ। যেমন- জন্মকৃত্য, বিবাহ, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শ্রাদ্ধ ইত্যাদি।

সুতরাং ঈশ্বরতত্ত্ব, ঈশ্বরে বিশ্বাস ও ভক্তি, কতিপয় মৌলিক ধারণা ও বিশ্বাস এবং ধর্মকৃত্যের মধ্য দিয়ে হিন্দুধর্মের স্বরূপ প্রকাশ পায়।

একক কাজ: মোক্ষলাভের কয়েকটি উপায়ের ক্ষেত্র উল্লেখ কর
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...