ছেলেটি ছোটো থাকাকালীন আমগাছের সঙ্গে ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সম্পর্ক। বড়ো হতে গিয়ে যা তার প্রয়োজনীয়তায় রূপ নেয়।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পে একটি ছেলে একটি আমগাছের ছায়ায় খেলা করত। তার ডালে দোল খেত। তার আম পেড়ে খেত। আমগাছটির সঙ্গে লুকোচুরি খেলত। ক্লান্ত হয়ে পড়লে তার ছায়ায়ই ঘুমিয়ে যেত। নিঃসঙ্গ গাছটি ছেলেটির সঙ্গ উপভোগ করত। সে নিজেকে সুখী মনে করত।
ছেলেটিকে দেখলেই আনন্দিত হতো। ছেলেটির ছিল অল্পবয়স। সামান্য প্রয়োজন আর সরল মন। সে তখন গাছের সঙ্গে খেলা করেই আনন্দ পেত। তার মধ্যে বাড়তি কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের।
ছোটোবেলায় আমগাছের সঙ্গে ছেলেটির সরল ও নিঃস্বার্থ সম্পর্ক থাকে। বড়ো হতে গিয়ে সেখানে জায়গা নেয় জীবনের জটিলতা।
নিঃসঙ্গ আমগাছটির ছায়ায় একটি ছেলে খেলতে এসে তাকে সঙ্গ দিত। ছেলেটির প্রতি আমগাছটির ছিল অসীম মমতা। ফলে সে ছেলেটিকে তার সবকিছু বিলিয়ে দিতে পারলেই সুখী হতো।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পের আমগাছটির ছায়ায় একটি ছোটো ছেলে খেলা করত। তার ঝরাপাতা দিয়ে মুকুট বানিয়ে রাজা সাজত। তার কাণ্ড বেয়ে উপরে উঠে ডাল ধরে দোল খেত, আম খেতো। মাঝে মধ্যে তারা লুকোচুরি খেলত। তারপর এইসব করে ক্লান্ত হয়ে গেলে তার ছায়ায় ঘুমিয়ে যেত। গাছটি ছিল একা। তার নিঃসঙ্গ জীবনে ছেলেটি আনন্দ নিয়ে আসত। সে ছেলেটির সঙ্গ উপভোগ করত। এভাবে ছেলেটির প্রতি তার স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসা জন্মে যায়। সে ছেলেটির জন্য নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে। দেখতে দেখতে ছেলেটি বড়ো হয়ে যায়। অনেক দিন পর পর আসে। তবুও গাছটি তাকে পূর্বের ন্যায়ই ভালোবাসত। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে এলেও তার প্রতি গাছটির মমতা কমত না। বড়ো হয়ে ছেলেটি তার কাছে নিজ প্রয়োজনে আসত। আমগাছ তাকে ভালোবাসা হিসেবেই বিবেচনা করত। সে ছেলেটিকে সাহায্য করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠত। এভাবে ছেলেটির প্রয়োজন মাফিক তার আম, ডালপালা, কান্ড সবই সে দিয়ে দেয়। নিজেকে নিঃস্ব করে বিলিয়ে দেওয়াতেও তার ছিল অপরিসীম আনন্দ।
ছেলেটি আমগাছটির নিঃসঙ্গ জীবনে আনন্দ নিয়ে এসেছিল বলে ছেলেটির প্রতি তার ছিল ভীষণ কৃতজ্ঞতা। আর ছিল অসীম মমতা, স্নেহ ও ভালোবাসা। ফলে ছেলেটির জন্য সে তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েও আনন্দ পেত, সুখী হতো।
ছেলেটি জীবনে চলতে চলতে ক্লান্ত। বৃদ্ধ বয়সে একটু বিশ্রামের প্রয়োজনে সে নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিল।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পে একটি ছেলের জীবন পরিক্রমা দেখানো হয়েছে। শৈশব থেকে তার বার্ধক্য পর্যন্ত উঠে এসেছে গল্পে। যে দুরন্ত ছেলেটি একদিন আমগাছের ছায়ায় নানাবিধ খেলা খেলত, তরতরিয়ে গাছে উঠে যেত, সেই ছেলেটি এখন বার্ধক্যে নিস্তেজ প্রায়। হাঁটার শক্তিও তার কমে এসেছে। বয়স তাকে জীর্ণ করে দিয়েছে। তার এখন একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। তার বাকি সব প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। জীবনের যাত্রায় সে এখন পরিশ্রান্ত। কোথাও কোনো নিরিবিলিতে বসে একটু জিরিয়ে নিতে পারলেই তার শান্তি।
জীবনের পরিক্রমায় বার্ধক্যে উপনীত হয়ে ছেলেটির মধ্যে যে ক্লান্তি চেপেছে, তা থেকে একটু জিরিয়ে নিতেই সে নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিল।
ছেলেটির জীবনের ধাপে ধাপে আমগাছটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছেলেটির জীবনব্যাপী তার প্রয়োজন অনুযায়ী আমগাছটি তার সবকিছু বিলিয়ে দিতে থাকে। এভাবে আমগাছটি ছেলেটির পুরো জীবন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পের আমগাছ ও ছেলেটি পরস্পরের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। পুরো জীবনব্যাপী তারা ছিল পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ছেলেটির ছোটোবেলায় সে আমগাছটির সঙ্গে খেলা করত, তার নিঃসঙ্গ জীবনে আনন্দ নিয়ে আসত। ছেলেটির প্রতি আমগাছটির কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা ছিল অসীম। ছেলেটি বড়ো হয়ে যখন নানান জিনিস কেনার জন্য টাকা চায়, আমগাছ তখন বিক্রি করে টাকা পাবে বলে তার সব আম ছেলেটিকে বিলিয়ে দেয়। অনেক দিন পর ছেলেটি আসে বাড়ি বানানোর সাহায্য চাইতে। আমগাছ তার ডালপালাগুলো ছেলেটিকে দিয়ে দেয় বাড়ি বানানোর জন্য। আবার অনেক দিন পর ছেলেটি আসে। তার মনে শান্তি নেই। সে একটি নৌকা বানিয়ে কোথাও ভেসে যেতে চায়। গাছটি তার কাণ্ডটা ছেলেটিকে দিয়ে দেয় নৌকা বানিয়ে ভেসে বেড়ানোর জন্য। আরও বহুদিন পরে ছেলেটি আসে বৃদ্ধ হয়ে। তার তখন চাই একটু বিশ্রাম। কোথাও বসে সে জিরোতে চায়। সর্বস্ব হারিয়ে শুধু গুঁড়ি নিয়ে বেঁচে থাকা গাছটি তখন তার গুঁড়ি পেতে দেয় ছেলেটির আরামের জন্য।
ছেলেটির পুরো জীবন ধরেই আমগাছটি তাকে নানাভাবে সাহায্য করে। এতে সে নিজে নিঃস্ব হয়ে যায়, তবুও ছেলেটির আনন্দে সুখী হয়। এভাবেই ছেলেটির জীবন প্রক্রিয়ায় আমগাছটি একজন ত্রাতা হয়ে ওঠে।
ছেলেটি তার জীবনব্যাপী বিভিন্ন প্রয়োজনে আমগাছটির কাছ থেকে আম, ডালপালা, কাণ্ড, গুঁড়িসহ নানাবিধ জিনিস নিয়ে সুবিধা ভোগ করে।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পে আমগাছ ও ছেলেটির সম্পর্ক ছিল প্রকৃতির মতোই সহজাত। তারা পরস্পর মমতার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। একসময় ছেলেটি বড়ো হতে থাকলে জীবনের জটিলতায় বিভিন্ন প্রয়োজন মিটানোর জন্য আমগাছের দ্বারস্থ হয়। আমগাছ তার আম বিক্রি করে ছেলেটিকে টাকার প্রয়োজন মিটাতে বলে। এরপর ছেলেটি গাছটির ডালপালা কেটে নিয়ে বাড়ি বানায়। আরও অনেক দিন পরে তার কাণ্ড কেটে নিয়ে নৌকা বানিয়ে ভেসে যায় বহু দূর। শেষমেশ বৃদ্ধ হয়ে গাছের গুঁড়িতে এসে বিশ্রাম নেয়।
তাই দেখা যায়, ছেলেটি পুরো জীবনব্যাপীই গাছটিকে ব্যবহার করতে থাকে বিভিন্ন প্রয়োজনে। আর গাছটিও ছেলেটিকে ভালোবেসে নিজেকে বিলিয়ে দিতে থাকে।
আমগাছ ও ছেলেটি ছিল পরস্পর ভালোবাসা ও মমতার বন্ধনে আবদ্ধ। যদিও ছেলেটি বড়ো হতে হতে আমগাছকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, আমগাছটি থাকে নিঃস্বার্থ।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পে একটি আমগাছ ও একটি ছেলের গল্প বলা হয়েছে। ছেলেটির ছোটোবেলায় তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল ভালোবাসার সম্পর্ক। ছেলেটি আমগাছের ছায়ায় খেলা করতে করতে তারা পরস্পরের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে যায়। সময়ের পরিক্রমায় ছেলেটি বড়ো হয়ে ওঠে। নিজের জীবনের ব্যস্ততায় আটকে যায়। বড়ো হয়ে দীর্ঘদিনের ব্যবধানে ছেলেটি আমগাছের কাছে আসে। সে তখন আর খেলাধুলা বা ভালোবাসার আকর্ষণে আসে না। নিজের প্রয়োজনে আসে। কখনো তার টাকার প্রয়োজনে আম পেড়ে নিয়ে যায় বিক্রি করবে বলে, কখনো ডালপালা কেটে নিয়ে বাড়ি বানায়, কখনো কাণ্ডটাই নিয়ে যায় নৌকা বানিয়ে ভেসে বেড়াবে বলে। গাছটি সানন্দেই তার সবকিছু ছেলেটির জন্য উৎসর্গ করে দেয়। এমনকি যখন আর কিছুই থাকে না, তখনো সে তার গুঁড়িটা পেতে দেয় বৃদ্ধ ও ক্লান্ত ছেলেটিকে জিরানোর জন্য। ছেলেটিকে দেখে তার আনন্দ লাগে, তাকে উপকার করতে পেরে সুখী হয়। কিন্তু ছেলেটির মধ্যে শৈশবের সারল্য আর থাকে না। সে বড়ো হতে হতে বুড়ো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত গাছটিকে ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজন মিটানোর জন্য। অবশ্য ছেলেটির মধ্যেও গাছটির প্রতি কোথাও একটা মমতা ও স্মৃতিকাতরতা কাজ করে বলেই সে শেষ মুহূর্তে গাছটির কাছেই আসে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।
আমগাছটির মধ্যে ছেলেটির জন্য ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ছেলেটিরও আমগাছটির জন্য ভালোবাসা থাকলেও সে তার প্রয়োজনে আমগাছকে ব্যবহার করে স্বার্থপরতার পরিচয় দেয়। তবুও তাদের মধ্যে একটা বন্ধন থেকে যায় আমৃত্যু।
ছেলেটি বড়ো হয়ে ওঠার পর আমগাছের সাথে আর নিয়মিত খেলতে আসত না বলে আম গাছটি প্রায়ই একলা দাঁড়িয়ে থাকত।
শৈশবে ছেলেটি প্রতিদিনই আমগাছের কাছে আসত। সেসময় আমগাছের সাথে সে নানা খেলায় মেতে উঠত। কিন্তু শৈশবকাল অতিক্রম করার পর স্বাভাবিকভাবেই তার খেলার ঝোঁক কমে আসে। ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। ফলে আমগাছের কাছে সে পূর্বের মতো প্রতিদিন আসত না। তাই আমগাছটিকে প্রায়ই একলা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। ছেলেটির বয়স বাড়ার সাথে তার জীবনযাপন প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হয়ে গেলে গাছটি একলা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে থাকত ছেলেটির জন্য।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পে দেখা যায় একটি আমগাছ একটি ছেলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে। যা তাকে করে তুলেছে মহত্ত্বের অধিকারী।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পটি একটি আমগাছ ও একটি ছেলেকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। গল্পটিতে দেখা যায় একটি ছেলের শৈশবে সে একটি নিঃসঙ্গ আমগাছের ছায়ায় আপন মনে খেলাধুলা করত। আমগাছটি তার একাকী জীবনে বালকটির সংস্পর্শ পেয়ে আনন্দিত হতো। বালকটির উপস্থিতি তাকে উৎফুল্ল করত। ধীরে ধীরে বালকটি বড়ো হয়ে উঠতে থাকলে তার জীবনযাপনের ধারা পালটে যায়। সে আর আমগাছের সাথে খেলতে আসে না। দীর্ঘদিন পর যখন ছেলেটি আমগাছটির কাছে আসে, তখন তার খেলাধুলা করার সেই সরল জীবন আর নেই। সে তার দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে আমগাছের কাছে সাহায্য চাইতে আসে। গাছটি তখন তার আমগুলো ছেলেটিকে দিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে ছেলেটির বাড়ি বানানোর প্রয়োজন হলে নিজের ডালপালা দিয়ে দেয়। আরও অনেকদিন পরে বিষণ্ণ ছেলেটির মন ভালো করতে নৌকা বানানোর প্রয়োজন হলে আমগাছটি নিজের কান্ডটাও দিয়ে দেয়। আরও বহুদিন পরে নিজের অবশিষ্ট থাকা গুঁড়িতেই ছেলেটিকে আশ্রয় দেয় আমগাছটি। ছেলেটির জীবন প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে বিলিয়ে দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে গেলেও গাছটির বিন্দুমাত্র অনুশোচনা থাকে না। অন্যের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে পারাতেই ছিল তার আনন্দ। গল্পটি পড়ে উপলব্ধি হয়, যারা মহৎ, তাদের কাছে অপরের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝে কোনো অনুশোচনা থাকে না, বরং এতেই তাদের জীবন সার্থক হয়ে ওঠে।
বেশ কিছুদিন পর ছেলেটিকে পেয়ে আমগাছের সারা শরীর খুশিতে নেচে উঠেছিল।
ছেলেটি বড়ো হয়ে যাওয়ার ফলে আমগাছের থেকে সাহায্যস্বরূপ একদিন আম নিয়ে যাওয়ার পর অনেকদিন আর গাছের কাছে আসেনি। ছেলেটিকে দেখতে না পাওয়ায় আমগাছটি বিষণ্ণ হয়ে থাকে। অনেকদিন পর ছেলেটি যখন পুনরায় গাছের কাছে সাহায্যের জন্য আসে তখন আমগাছটির সারা শরীর খুশিতে নেচে ওঠে।
ছেলেটির সংস্পর্শ পছন্দ করত বলেই আমগাছটি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকত ছেলেটির জন্য। ছেলেটির আগমনে গাছটি আনন্দিত হয়ে উঠত।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পের ছেলেটিকে স্বার্থপর মনে হলেও জীবনের প্রয়োজনে তাকে আমগাছরূপী বিশ্বস্ত বন্ধুর সাহায্য নিতে হয়েছিল। যদিও আমগাছটি তাকে সাহায্য করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ছেলেটি সে বিষয়ে উদাসীন থাকায় তাকে আত্মমগ্ন হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পটি অসম বন্ধুত্বের। একটি ছেলের শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত তার জীবন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকা একটি আমগাছের মহত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে গল্পটিতে। ছেলেটির শৈশবে সে আমগাছের ছায়ায় খেলাধুলা করতে করতে বড়ো হয়ে ওঠে। নিঃসঙ্গ আমগাছটি ছেলেটির সংস্পর্শ ভালোবাসত। কিন্তু বড়ো হয়ে ওঠার সাথে সাথে ছেলেটির আমগাছের কাছে যাতায়াত কমে যেতে থাকে। একসময় আর তার খেলাধুলার বয়স থাকে না। তার অর্থের প্রয়োজন হয়, গৃহের প্রয়োজন হয়, জীবনের নানাবিধ চাহিদা তাকে ঘিরে ধরে। এসব প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে কখনো কখনো তাকে তার পুরোনো বন্ধু আমগাছটির শরণাপন্ন হতে হয়। আমগাছ ছেলেটির প্রয়োজনে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে থাকে। ছেলেটি আমগাছের সাহায্য নিলেও সে গাছটির ব্যাপারে উদাসীন থেকেছে। গাছটি যখন নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে বন্ধুর জন্য, ছেলেটি তখন আত্মচিন্তায় বিভোর। সেক্ষেত্রে ছেলেটিকে স্বার্থপর মনে হলেও আমগাছের উদারতা ও বন্ধুর জন্য আত্মবিসর্জনে ছেলেটির আত্মমগ্ন চরিত্রের ত্রুটি ঢাকা পড়ে যায়।
আমগাছের থেকে ক্রমাগত সহযোগিতা লাভ করলেও তার নিঃস্ব হওয়ার ব্যাপারে উদাসীন থাকায় ছেলেটিকে স্বার্থপর মনে হলেও গল্পে আমগাছের মহত্ত্বকেই প্রধান করে দেখানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে ছেলেটির আত্মমগ্ন চরিত্রকে জীবনযাপনের জটিলতায় বিপর্যস্ত হিসেবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
এক যে ছিল আমগাছ। খুব ভালোবাসত সে একটি ছোট্ট ছেলেকে। হররোজ সেই ছেলেটি এসে গাছটার সব ঝরাপাতা কুড়িয়ে তাই দিয়ে মুকুট বানিয়ে বনের রাজা সাজত। কখনো-বা গাছটার কাণ্ড বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে ডাল ধরে দোল খেতো, আর আম খেতো। মাঝে মাঝে তারা লুকোচুরি খেলত। তারপর, এইসব করে ক্লান্ত হয়ে গেলে ছেলেটা পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ত গাছটার ছায়ায়। ছেলেটাও গাছটাকে ভালোবাসত খু-উ-ব। এবং গাছটা এতে সুখী ছিল। কিন্তু সময় গড়িয়ে যেতে থাকে। ছেলেটাও বড়ো হয়ে উঠতে থাকে। প্রায়ই দেখা যেত গাছটা দাঁড়িয়ে আছে একলা। তো একদিন ছেলেটা গাছটার কাছে আসে, আর তখন গাছটা বলে, 'আয়, আয়, আমার গা বেয়ে উঠে ডাল ধরে দোল খা, আম খা, খেল আমার ছায়ায় বসে। আরাম কর। তোর সুখ দেখে আমি সুখ পাই।' কিন্তু ছেলেটা বলে, 'এখন কি আর আমার গাছে উঠে খেলার বয়স আছে নাকি? আমি এখন নানান সব জিনিস কিনতে চাই, মজা করতে চাই। আমার চাই কিছু টাকা। তুমি কিছু টাকা দিতে পারো আমায়?' গাছটা বলে, 'এই তো মুশকিলে ফেললি। আমার কাছে তো টাকা নেই। আমার আছে কেবল পাতা আর আম। তা, এক কাজ করিস না কেন; আমার আমগুলো পেড়ে নে; ওগুলো বিক্রি করলে অনেক টাকা পাবি। তখন মনের সাধ মিটিয়ে কেনাকাটা করতে পারবি।'
কাজেই, ছেলেটা তখন গাছে উঠে আমগুলো পেড়ে সেগুলো নিয়ে চলে যায়। খুব খুশি হয় গাছটা। কিন্তু এরপর আবার বেশ কিছুদিন কোনো দেখা মেলে না ছেলেটার...। মন খারাপ করে থাকে গাছটা। তারপর একদিন আবার আসে ছেলেটা। খুশিতে সারা শরীর নেচে ওঠে গাছটার। বলে, 'আয় আয়, আমার গা বেয়ে উঠে আয় ওপরে, দোল খা ডাল ধরে, ফুর্তি কর।' কিন্তু ছেলেটা বলে, 'গাছে ওঠার চেয়ে ঢের জরুরি কাজ আছে আমার। মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই, একটা বাড়ি চাই আমার; রোদ-বৃষ্টিতে, গ্রীষ্মে-শীতে যাতে কষ্ট না হয়। আমার চাই একটা বউ, ছেলেমেয়ে। ওদেরকে রাখার জন্যে একটা বাড়ি আমার খুব দরকার। তুমি একটা বাড়ি দিতে পারো আমায়?' গাছ বলে, 'আমার তো কোনো বাড়ি নেই, তবে হ্যাঁ, আমার ডালপালাগুলো কেটে নিতে পারিস। তাহলে খুব সহজেই ওগুলো দিয়ে একটি বাড়ি বানিয়ে নিতে পারবি তুই। তখন তোর আর সুখের সীমা থাকবে না।' কাজেই ছেলেটা তখন গাছটার ডালপালা সব কেটে ফেলে, তারপর সেগুলো নিয়ে চলে যায় বাড়ি বানাবার জন্য। খুশি হয় গাছটা। তারপর বেশ কিছু দিন আর কোনো খোঁজ-খবরই থাকে না ছেলেটার। তবে একদিন যখন আবার আসে সে, ভীষণ খুশি হয় গাছটা। এত্ত খুশি যে কথাই বলতে পারে না সে কিছুক্ষণ। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে, 'আয় আয়, খেলবি আয়।' ছেলেটা বলে, 'খেলার বয়স আর মোটেই নেই আমার। বুড়ো হয়ে গেছি। তাছাড়া মনটাও খুব খারাপ। একটা যদি নৌকা পেতাম তাহলে খুব ভালো হতো। ওটাতে চেপে বহু দূরে চলে যেতে পারতাম এখান থেকে। একটা নৌকা দিতে পারো তুমি আমায়?' 'আমার কাণ্ডটা কেটে ফেল, তারপর একটা নৌকা বানিয়ে নে ওটা দিয়ে,' গাছটা পরামর্শ দেয়। 'তখন ওটাতে করে তুই ভেসে বেড়াতে পারবি, খুশি হবি।' কাজেই ছেলেটা তখন গাছটার কাণ্ডটা কেটে ফেলে, তারপর ওটা দিয়ে নৌকা বানিয়ে ভেসে পড়ে দূরদেশের উদ্দেশে। খুশি হয় গাছটা। কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথায় যেন খচখচ করতে থাকে। বহুদিন পর আবার ফিরে আসে ছেলেটা। গাছটা তখন বলে, 'আয়, কিন্তু এবার যে তোকে দেওয়ার মতো আর কিছুই নেই আমার রে- আমার আমগুলো আর নেই।' কিন্তু ছেলেটা বলে, 'আম যে খাব এমন শক্তি কি আর আছে আমার দাঁতে?' গাছটা বলে, 'আমার ডালপালাগুলোও যে আর নেই রে। ওগুলো ধরে তুই আর ঝুলতে পারবি না।' ছেলেটা বলে, 'আমি এখন এতই বুড়ো হয়ে গেছি যে গাছের ডাল ধরে ঝুলোঝুলি করার আর শক্তি নেই আমার।' গাছ বলে, 'কাণ্ডটাও তো নেই, তুই তো ওটা বেয়ে ওপরে উঠতে পারবি না।' ছেলেটা সে কথা শুনে বলে, 'আমি আসলে এত ক্লান্ত যে গাছ বেয়ে ওঠার জোর নেই আমার গায়ে।' একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গাছটা বলে, 'আমার খুব খারাপ লাগছে রে। তোকে যদি একটা কিছু অন্তত দিতে পারতাম... কিন্তু কিছুই যে নেই আমার। আমি স্রেফ বুড়ি গুঁড়ি একটা। আমায় ক্ষমা করে দে তুই।' ছেলেটা বলে, 'এখন আমার আর খুব বেশি কিছু নেই চাইবার। বসে জিরোবার মতো স্রেফ একটা নিরিবিলি জায়গা হলেই যথেষ্ট। ভীষণ ক্লান্ত আমি।' যদ্দুর পারা যায় নিজেকে সোজা করে গাছটা বলে, 'তা, বেশ তো, বুড়ি গুঁড়ি আর কিছু না হোক, বসে জিরোবার মতো একটা ভালো জায়গা তো বটেই। আয়, আয়, বোস, জিরিয়ে নে তোর যত খুশি।' ছেলেটা তা-ই করে। এইবার সত্যি সত্যি-ই খুশি হয় গাছটা।
'একটি সুখীী গাছের গল্প' গল্পে একটি আমগাছ একটি ছোট ছেলেকে খুব ভালোবাসত। ছেলেটিও গাছটিকে খুব ভালোবাসত। ছেলেটি গাছের সব ঝরাপাতা দিয়ে মুকুট বানিয়ে বনের রাজা সাজত। কখনো-বা গাছটার কান্ড বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে ডাল ধরে দোল খেত, আর আম খেত। মাঝে মাঝে তারা লুকোচুরিও খেলত। ছেলেটা কখনো ক্লান্ত হয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ত গাছের ছায়ায়।
মহত্ত্ব ও উদারতার দিক দিয়ে উদ্দীপকের আলোচ্য বৃক্ষ ও 'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পের আমগাছটি সাদৃশ্যপূর্ণ।
উদারতা সবসময় পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। আর সংকীর্ণতা কখনই স্থান পায় না। পৃথিবী উদারতাকে গ্রহণ করে, সংকীর্ণতাকে বিলুপ্ত করে।
উদ্দীপকে বৃক্ষের অবদান ও ত্যাগের কথা বলা হয়েছে। বৃক্ষ মাটি থেকে রস টেনে নিজেকে পুষ্ট করে নিজের জন্য নয়। বরং অন্যকে দানেই তার তুষ্টি। 'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পে দেখা যায়, আমগাছটি নিজের ফল, কান্ড সবকিছু ছেলেটিকে দিয়ে দেয় এবং সুখ পায়। নিজের জন্য তার আর কিছুই থাকে না। তাই বলা যায়, মহত্ত্ব ও উদারতার দিক দিয়ে উদ্দীপকের আলোচ্য বৃক্ষ ও গল্পের আমগাছটির সাদৃশ্য রয়েছে।
যারা স্বার্থপর মানুষ তারা ভোগ করে সুখ পায়। আর ত্যাগী মানুষ সবসময় অন্যকে দান করে সুখ পায়। তারা কখনই নিজের সুখকে বড় করে দেখে না, অন্যের সুখই তার কাছে মুখ্য।
উদ্দীপকে বৃক্ষের নিজের বৃদ্ধির বিষয়টি মূলত তার নিজের স্বার্থের নয়। বরং সে নিজেকে তৈরি করে অন্যের জন্য। এখানে ত্যাগী মানুষের ইঙ্গিত বহন করা হয়েছে বৃক্ষের অন্তরালে। 'একটি সুখী গাছের গল্প' গল্পে যে আমগাছটির কথা বলা হয়েছে, তার অন্তরালেও ত্যাগী মানুষের কথা প্রকাশ করা হয়েছে। যারা কিনা শুধু দিতেই চায়, দিয়েই খুশি হয়। বিনিময়ে নিজেরা কিছু চায় না।
উদ্দীপকে গাছের অন্তরালে ত্যাগী মানুষের কথা বলা হয়েছে। গল্পে আমগাছটির মধ্য দিয়ে ত্যাগী ও উদার মানুষের কথা বলা হয়েছে। তাই বলা যায়, আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।
ছেলেটি দ্বিতীয়বার গাছটির কাছে নিজের থাকার জায়গা অর্থাৎ আশ্রয় চেয়েছিল।
আমগাছটির সঙ্গে ছেলেটির খুব অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। দুজন দুজনকে অনেক ভালোও বাসত। এমনকি ছেলেটির কোনো কিছু প্রয়োজন হলেই সে ছুটে চলে আসত গাছটির কাছে। এমনি করে ছেলেটি দ্বিতীয়বার এসে গাছটির কাছে তার থাকার জায়গা অর্থাৎ একটি বাড়ি চেয়েছিল। গাছটি ছেলেটির সেই ইচ্ছাও পূরণ করেছিল।