বরের ভাগ্নে হিসেবে বিয়ের একদিন আগেই উপস্থিত হওয়া 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের কিশোরটির প্রতি চৌধুরীদের আতিথেয়তা ছিল আন্তরিক। চৌধুরীরা হবু আত্মীয় হিসেবে সৌহার্দ নিয়ে তাকে বরণ করে।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে কিশোর ছেলেটির পরীক্ষা থাকায় সে বাড়ির সবার সঙ্গে মেজো মামার বিয়েতে যেতে পারে না। ছোটোমামার পরামর্শক্রমে সে বিয়ের দিন দুপুর সাড়ে বারোটার ট্রেনে কনের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়ে ভুল করে বারোটায় ভুল ট্রেনে উঠে পড়ে। সেই ট্রেনে পরিচয় হওয়া এক ভদ্রলোকের সাথে দৈবভাবে তার হবু আত্মীয় বাড়ির সবকিছুই মিলে যাওয়ায় সে ভুল চৌধুরী বাড়িতে উপস্থিত হয়। বরের ভাগ্নে হিসেবে তারা সানন্দে গ্রহণ করে তাকে। তাকে আন্তরিকতার সাথে আদর-আপ্যায়ন করে। যত্ন করে খাওয়াদাওয়া করায়। কিশোরটির ভাষায় যা বিয়ের খাবারকেও হার মানায়। সেই বাড়ির সমবয়সি ছেলেরা তাকে নিয়ে পদ্মবিলে শিকারে চলে যায়। অনেক আনন্দ-ফূর্তি করে তারা। এমনকি তার ভুল করে ভুল বিয়ে বাড়িতে এসে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ হলেও চৌধুরীরা তার সাথে মার্জিত আচরণ করে। তারা তার মামাবাড়িতে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে ছোটোমামাকে ডেকে এনে বিষয়টি খোলাসা করে।
পরিশেষে বলা যায়, 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের কিশোর ছেলেটি নিজের মামার শ্বশুরবাড়ি ভেবে ভুল চৌধুরীদের বাড়িতে উপস্থিত হলেও তাদের আতিথেয়তা ছিল সৌহার্দপূর্ণ। তারা তাকে বরের ভাগ্নে হিসেবে আন্তরিকতা নিয়েই গ্রহণ করেছিল।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের কিশোর ছেলেটির মেজো মামার বিয়ে। বিয়ের তিন দিন আগে ছোটো মামা সবাইকে নিয়ে গেলেও পরীক্ষার কারণে কিশোরটি যেতে পারবে না। ছোটোমামা তখন কিশোর ছেলেটিকে সরাসরি কনের বাড়িতে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলে কিশোরটি মামার বিয়েতে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হয়।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে কিশোর ছেলেটির স্কুলে পরীক্ষা চলছে। এমন সময়ে তার মেজো মামার বিয়ে ঠিক হয়। মেজোমামা ও ছোটোমামা তাদের বাড়িতে আসেন নিমন্ত্রণের জন্য। মেজোমামা একদিন পর চলে যান। ছোটোমামা বিয়ের তিন দিন আগে সবাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য থেকে যান। কিন্তু কিশোর ছেলেটি তার পরীক্ষা থাকার কারণে বাদ পড়ে যায়। এমতাবস্থায় ছোটোমামা মেজোমামার বিয়েতে যাওয়ার একটি পরামর্শ দেন। পরামর্শটি শুনে কিশোর ছেলেটি আশান্বিত হয়।
মেজোমামার বিয়ে সতেরো তারিখে। কিশোরটির পরীক্ষা শেষ হবে ষোলো তারিখে। ফলে আগের দিন পরীক্ষা শেষ হলেও মামার বিয়েতে উপস্থিত থাকা অনিশ্চিত হয়ে যায় ছেলেটির জন্য। সতেরো তারিখে সাড়ে বারোটার ট্রেনে চড়লেও পৌছাতে সন্ধ্যা সাতটা বাজবে। ততক্ষণে তার মামা বরযাত্রীসহ বিয়েতে রওনা হয়ে যাবেন। কিশোরটির কাছে মনে হয় বরযাত্রী হিসেবে না যেতে পারলে বিয়েতে যাওয়ার কোনো মানে নেই। এমন সময়ে ছেলেটির মনোবাসনা পূরণে এগিয়ে আসেন ছোটোমামা। কিশোরটিকে মামাবাড়ি না গিয়ে সরাসরি কনের বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ছোটোমামার পরামর্শ শুনে কিশোরটি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।
ছোটোমামা ছেলেটিকে সতেরো তারিখ সাড়ে বারোটার ট্রেন ধরে সোজা কনের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বলেন। সরাসরি সেখানে গিয়ে সে বরযাত্রীর সাথে মিলিত হতে পারবে। তাহলে তার বিয়ে উপভোগ করা কিংবা বিরিয়ানি খাওয়া কোনোটাই বাদ যাবে না। ছোটোমামা কনের বাড়ির স্টেশনের নাম ভুলে যান। অনেক ভেবেচিন্তে ছোটোমামা আরেকটা বুদ্ধি বের করেন। তিনি জানেন, ঢাকা থেকে বারোটি স্টেশন পরে কনের বাড়ি। সেখানে চৌধুরীদের নাম বললেই লোকে চিনিয়ে দেবে। চৌধুরীরা ওই এলাকার নামকরা লোক। মেজোমামা চৌধুরীদের মেয়েই বিয়ে করছেন। কিশোরটি যদি ঢাকা থেকে গুনে গুনে বারোটি স্টেশন পরে নেমে চৌধুরীদের পরিচয় দেয়, সহজেই সে মেজোমামার হবু শ্বশুরবাড়ি পৌছাতে পারবে।
ছোটোমামার পরামর্শ মন দিয়ে শুনে কিশোরটি উদ্বুদ্ধ হয়। সে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে মামার বিয়েতে উপস্থিত হতে পারার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের গল্পকথক ভুল করে ভুল চৌধুরী বাড়িতে উপস্থিত হলেও সেখানে তার ভ্রমণ ছিল আনন্দময়। সেই বাড়িতে তার সমবয়সি ছেলেরা তাকে নিয়ে পদ্মবিলে পাখি শিকারে যায়। পাখি শিকারে গিয়ে তার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের গল্পকথকের মেজোমামার বিয়ে। পরীক্ষার কারণে সেই বিয়েতে বিচ্ছিন্নভাবে অংশ নিতে গিয়ে সে উপস্থিত হয় ভুল বিয়েবাড়িতে। সেই বাড়ির লোকজন তাকে আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করে। বরের ভাগ্নে হিসেবে আদর-আপ্যায়ন করে। সেই বাড়ির ছেলেরা তাকে নিয়ে পাখি শিকার করতে যায় বিলে। বিলটির নাম পদ্মবিল হলেও সেখানে পদ্ম ছিল না। স্থানে স্থানে শাপলা আর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ছিল শুধু। শিকারের নামে প্রাণী হত্যা মন্দ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেও তার রেহাই হয় না। বুলু-টুলুরা চার-পাঁচটা বক মারার পরেই গল্পকথকের হাতে বন্দুক দিয়ে শিকার করতে বলে। গল্পকথক না চাইলেও জোর করে তাকে শুট করতে হয়। সে শুট করতে জানে না। তবুও জোর করে শুট করতে হলে কম্পিত হাতে ট্রিগার চাপে। সেই গুলি গিয়ে লাগে বাঁ পাশে কিছুটা দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা তাদের মোটরকারের চাকায়। সশব্দে চাকাটি ফেটে যায়। বুলু-টুলু গাড়ির পিছন থেকে বাড়িত চাকা এনে লাগিয়ে নেয়। অতঃপর তারা বাড়ি ফেরে।
গল্পকথকের অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রমণ ও পাখি শিকারের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্নরকম অভিজ্ঞতার। বন্দুক চালানোর অনভিজ্ঞতা নিয়েও শুট করেছিল। যার গুলি লেগে গাড়ির চাকা ফেটে গিয়েছিল।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের গল্পকথক একটি কিশোর ছেলে হওয়ায় ট্রেনের ভদ্রলোক তাকে সহানুভূতির চোখে দেখেন। তাদের গন্তব্য একই জায়গায় হওয়ায় তাদের মধ্যে একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে যার প্রকাশ ঘটে।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের কিশোর ছেলেটির মেজোমামার বিয়ে। স্কুলে পরীক্ষা থাকার কারণে সে পরিবারের বাকি সবার সাথে মামাবাড়ি যেতে পারে না। ছোটোমামা তাকে সরাসরি কনের বাড়িতে উপস্থিত হওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়। তার পরামর্শ অনুযায়ী গল্পকথক সরাসরি কনের বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা দেয়। তার ট্রেন দুপুর সাড়ে বারোটায়। সাড়ে এগারোটায় সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখে ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে ওঠে। কিশোরটি যে কামড়ায় চড়ে, সেখানে বেশি ভিড় ছিল না। একজন ভদ্রলোক তাকে ডেকে পাশে বসায়। এরপর দুজনের মধ্যে রসাত্মক ও আন্তরিক একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে চেপে কিশোরটি পাশে থাকা ভদ্রলোকের ঘড়িতে দেখতে পায় কেবল বারোটা বাজে। তার ট্রেন ছিল সাড়ে বারোটায়। ভদ্রলোকের ঘড়িতে সময় বারোটা দেখালে সে দ্বিধান্বিত হয়। ভদ্রলোকের ঘড়ির সময় সম্পর্কে সে সন্দিহান হয়ে পড়ে। ঘড়ি সচল নাকি অচল এই বিষয়ে ভদ্রলোকের কাছে জানতে চাইলে তাদের মধ্যে পরবর্তী কথোপকথন রসাত্মক হয়ে ওঠে। বয়স্ক একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে কিশোর একটি ছেলের মধ্যে অনায়াস ও কৌতুকপূর্ণ কথোপকথন তাদের উভয়ের আন্তরিকতার পরিচয় দেয়। পরবর্তীকালে কিশোরটি তখন তার ছোটোমামার ট্রেনের সময় নির্ধারণে ভুল হতে পারে ভেবে নেয়। এরপর ভদ্রলোকের সাথে গল্পকথকের আলাপচারিতায় প্রকাশ পায় তারা একই গন্তব্যে যাচ্ছে।
সেই স্টেশন থেকে পরবর্তী গন্তব্যের কথা জানতে চাইলে চৌধুরীদের প্রসজা আসে। কিশোরটির মেজোমামা সেখানকার চৌধুরীদের মেয়ে বিয়ে করছেন। কিশোরটি সেই চৌধুরী বাড়িতে যাচ্ছে। ভদ্রলোক জানান, তিনিও চৌধুরী বাড়িতেই যাচ্ছেন। চৌধুরী তার আত্মীয় হন। তার মেয়ের বিয়েতে যোগদানের জন্য তিনি যাচ্ছেন। ভদ্রলোক ও কিশোরটির গন্তব্য একই জায়গায়, একই বাড়িতে হওয়ায় তাদের মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।
পরিশেষে বলা যায়, তাড়াহুড়ো করে ভুল ট্রেনে চেপে বসলেও সেখানে একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে সহজ ও অনায়াস সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় গল্পকথকের পরবর্তী যাত্রা সহজ ও সুন্দর হয়। বয়সের ব্যবধান ঘুচে যায় উভয়ের সৌহার্দপূর্ণ মানসিকতায়। তাদের গন্তব্য একই জায়গায় হওয়ায় তাদের মধ্যকার আন্তরিকতা আরও বৃদ্ধি পায়।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের কিশোরটি মেজোমামার হবু শ্বশুরবাড়ি ভেবে ভুল চৌধুরী বাড়িতে চলে যায়। সেই চৌধুরীদের গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে সে ট্রেনের ভদ্রলোকের কাছে অবগত হয়। পরবর্তীসময়ে যা সে নিজেই অবলোকন করে।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের কিশোরটি ভুলক্রমে যে অঞ্চলের চৌধুরী বাড়ি চলে যায়, সেই অঞ্চলটি ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ভুল ট্রেনে চেপে যে ভদ্রলোকের সাথে কিশোরটির পরিচয় হয় তিনি তাকে জানান, সেখানে ঘুরে দেখার মতো অনেক কিছুই আছে। মাইল তিনেকের মধ্যে আছে পদ্মবিল। সেখানে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। শহরের পশ্চিমে আছে বিরাট মাঠ। সেখানে ছেলেরা খেলাধুলা করে। মাঠের ওদিকটাতেই কিছুটা জঙ্গলের মতো আছে। আগে ঘন জঙ্গল থাকলেও বর্তমানে দু-একটি পাতলা ঝোপঝাড় ছাড়া আর কিছু নেই। এখন ছেলেরা সেখানে পিকনিক করতে যায়। গল্পের কিশোরটি পরদিন সেই বাড়ির ছেলেদের সাথে পদ্মবিলে পাখি শিকার করতে যায়। বিলের সৌন্দর্য দেখে সে মোহিত হয়।
বিল, মাঠ, জঙ্গলের সমারোহে চৌধুরীদের গ্রাম ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের গল্পকথকের পরীক্ষা থাকার কারণে তার মেজোমামার বিয়েতে অংশ নেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ছোটোমামার পরামর্শে বিয়ের দিন সরাসরি কনের বাড়িতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাড়াহুড়োয় ভুল ট্রেনে উঠে পড়ে ভুল বাড়িতে উপস্থিত হয়ে বিপাকে পড়তে হয় তাকে।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে গল্পকথক কিশোরটির মেজোমামার বিয়ে নিয়ে ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়। ছোটোমামা বিয়ের তিন দিন আগে সবাইকে নিয়ে মামাবাড়ি গেলেও স্কুলে পরীক্ষা থাকার কারণে তাকে থেকে যেতে হয়। মামার বিয়েতে অংশ নেওয়া তার জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যদিও মেজোমামার বিয়ে তার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের দিন, কিন্তু মামাবাড়ি যাওয়ার ট্রেনের সময়সূচির জন্য তার যাওয়া অনিশ্চয়তায় পড়ে। এমন পরিস্থিতি থেকে তাকে উদ্ধার করেন ছোটোমামা।
ছোটোমামা গল্পকথককে মামাবাড়ি না গিয়ে সরাসরি কনের বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এতে সে বিয়ে বাড়িতেই বরযাত্রীর সাথে যুক্ত হতে পারবে। তার আর মেজোমামার বিয়ে থেকে বঞ্চিতও হতে হবে না। ছোটোমামার পরামর্শ অনুযায়ী সে সতেরো তারিখ দুপুর সাড়ে বারোটার ট্রেনের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়। ছোটোমামা স্টেশনের নাম ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, বারোটি স্টেশন পরে নেমে 'চৌধুরী বাড়ি'র কথা বললেই লোকে চিনিয়ে দেবে। চৌধুরীরা সেখানকার নামকরা লোক। এমন ঠিকানা ও গন্তব্য মাথায় নিয়ে গল্পকথক স্টেশনে পৌছায়। তার ট্রেন ছিল সাড়ে বারোটায়। ভুল করে সে বারোটার ট্রেনে উঠে পড়ে।
ট্রেনে চেপে একজন ভদ্রলোকের সাথে তার পরিচয় হয়। ভদ্রলোক তাকে ডেকে পাশে বসান। বিভিন্ন গল্প করতে করতে গল্পকথকের গন্তব্য জানতে চাইলে সে বারোটি স্টেশন পরে নেমে চৌধুরীদের কথা জানায়। ঘটনাক্রমে সেই ভদ্রলোকও সেখানেই যাচ্ছিলেন। একই বাড়ির একই বিয়েতে তাদের একত্রে গমন তাদের মধ্যে আন্তরিকতার সৃষ্টি করে। গল্পকথক কনের বাড়ির একজন আত্মীয় পেয়ে আশ্বস্ত হয়। ট্রেনের ভদ্রলোক তাকে চৌধুরী বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বরের ভাগ্নে হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার পরীক্ষা থাকার কারণে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিয়েতে আসার কারণও জানানো হয়। কনের বাড়ির সবাই তাকে সাদরে গ্রহণ করে। বিয়ের সন্ধ্যায় বরযাত্রী এলে দেখা যায়, এই বর গল্পকথকের মামা নয়। বরযাত্রীও তাকে চিনতে পারে না। এমতাবস্থায় তার মামাবাড়িতে টেলিগ্রাম পাঠালে পরদিন ছোটোমামা এসে পড়েন। ছোটোমামার সঙ্গে চৌধুরী ও ট্রেনের ভদ্রলোকের অনেকক্ষণ আলাপের পরে বিষয়টি খোলাসা হয়।
গল্পকথকের ট্রেন ছিল সাড়ে বারোটায়, যে ট্রেনে চেপে সে মেজোমামার হবু শ্বশুরবাড়ি যাবে। ভুল করে সে বারোটার ট্রেনে উঠে পড়ে, যেটি ছিল বিপরীতগামী। ঘটনার এমনই দৈবপাকে গল্পকথককে মেজোমামার বিয়েতে অংশ নিতে গিয়ে বিপাকের মধ্যে পড়তে হয়। সাড়ে বারোটায় চিটাগাং লাইনের ট্রেনের বদলে ভুল করে বারোটায় ময়মনসিংহ লাইনের ট্রেনে চড়াতেই ছিল তার বিপাকের সূত্রপাত।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে বিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য কিশোর ছেলেটির অপেক্ষার তর আর সইছে না।
গল্পের কিশোরটির স্কুলে পরীক্ষা থাকার জন্য সে মামার বিয়েতে সকলের সাথে যেতে পারেনি। মেজো মামার বিয়ের আয়োজনে যেন সে উপস্থিত থাকতে পারে এইজন্য তার ছোটো মামা তাকে একটি পরামর্শ দেয়। বিয়ের দিন দুপুর সাড়ে বারোটার ট্রেনে চড়ে সোজা মেয়ের বাড়িতে যেতে বলেন; তাহলে সেখানে সে পরিবার ও বিয়ে বাড়ির সকলের সাথে মিলতে পারবে। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পরের দিন ট্রেনে উঠার জন্য তার অপেক্ষার তর সহ্য হচ্ছিল না। সে খুবই উচ্ছসিত ছিল বিয়ে বাড়ি দ্রুত পৌছানোর জন্য।
মেজো মামার বিয়েতে সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকতে চাওয়ার আনন্দে কিশোরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষার তর সইছিল না।
খান মোহাম্মদ ফারাবী একজন সৃষ্টিশীল মেধাবী লেখক। তাঁর 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে আমার ট্রেনের ভদ্রলোক চরিত্রটিকে বেশি ভালো লেগেছে তার আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহারের কারণে।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের কিশোর ছেলেটি বেশি তাড়াহুড়োর জন্য সাড়ে বারোটার চিটাগাং লাইনের ট্রেনে না-উঠে বারোটার ময়মনসিংহ লাইনের ট্রেনে উঠে পড়ে। সে ট্রেনের যে কামরায় ওঠে সেখানে বেশি ভিড় ছিল না। সে কামড়ার এক ভদ্রলোক তাকে ডেকে পাশে বসায়। ভদ্রলোকের ঘড়ির সময় দেখে কিশোর তাকে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করলে তাদের মধ্যে একটা হাস্যরসাত্মক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিশোর ছেলেটি তার গন্তব্য স্টেশনের নাম না-জানলে ভদ্রলোকটি কিশোর ছেলেটির কথামতো গণনা করে তাকে সেই স্টেশনের নাম বলে। তাকে সাথে করে চৌধুরীদের বিয়ে বাড়ি নিয়ে যায় এবং সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এখানে চরিত্রটির দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়।
গল্পকথকের বিয়ে বাড়ি সহজে পৌছানো, যাত্রা সহজ ও সুন্দর হয় ভদ্রলোকটির সৌহার্দপূর্ণ মানসিকতার জন্য। বয়সের ব্যবধান থাকলেও ছোটো একটি ছেলের প্রতি আন্তরিকতা দেখানোর জন্য ট্রেনের ভদ্রলোকের চরিত্রটিকে আমার ভালো লেগেছে।
গল্পকথক পদ্মবিলে শিকার করতে যেতে না চাইলেও বুলু ও টুলুর জোরাজুরিতে শেষপর্যন্ত শিকার করতে যেতে হয়।
কিশোর ছেলেটি চৌধুরী বাড়ি যাওয়ার সময় জানতে পারে বিয়ের তারিখ একদিন পিছিয়েছে। রাত্রে সেখানে বিশ্রাম করলেও পরের দিন সকালে চৌধুরী বাড়ির দুইজন ছেলে এসে কিশোরকে পদ্মবিলে শিকার করতে যেতে বলে। কিশোরটি নানা রকম অজুহাত, যুক্তিতর্ক দেখায় বনে যেয়ে প্রাণিহত্যা না করার জন্য। তবে ছেলে দুইটি ছিল নাছোড়া বান্দা। তারা তাকে বনে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরও বেশি পীড়াপীড়ি শুরু করে।
বুলু ও টুলুর পীড়াপীড়িতে কিশোর ছেলেটি যুক্তি দিয়েও অবশেষে হার মেনে তাদের সাথে পদ্মবিলে শিকার করতে যায়।
খান মোহাম্মদ ফারাবীর 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্প থেকে হাস্যরসের মাধ্যমে ঝোঁকের বশে কোনো কাজ না করার শিক্ষা পেয়েছি।
'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে দেখা যায়, কিশোর ছেলেটি তার মামার বিয়েতে যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকে। কনে বাড়ির ঠিকানা না জেনে কেবল বারো স্টেশন পর নেমে চৌধুরী বাড়ি যাবে ভেবে বাড়ি থেকে রওনা হয়। সঠিক তথ্য না জেনে অনুমাননির্ভর ঠিকানায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে কী পরিমাণ বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয় তা আলোচ্য গল্পে দেখা যায়।
সাড়ে বারোটার ট্রেনে না-উঠে কিশোর ছেলেটি তাড়াহুড়া করে স্টেশন ছেড়ে যাওয়া বারোটার ট্রেনে উঠে পড়ে। সে যে কোন সময়ের ট্রেনে উঠেছে, সেটি কোন রুটের ও কী নাম তা সে একবারও খেয়াল করার প্রয়োজন মনে করে না। তাকে ট্রেনে আট-আনা জরিমানাও দিতে হয়। ট্রেনের কামরায় এক ভদ্রলোকের সহযোগিতায় সে অন্য এক চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে উপস্থিত হয়। কাকতালীয়ভাবে সেই চৌধুরী সাহেবের মেয়েরও বিয়ে হচ্ছিল। ঝোঁকের বশে ভুল ট্রেনে উঠে পড়া, ভুল ঠিকানায় পৌছানো ও বরযাত্রীরা- তাকে চিনতে না পারা এসবকিছু মিলে সে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। উপরন্তু মামার বিয়েতে ছেলেটির যে আনন্দ করার কথা ছিল তা সে করতে পারে না।
কোনো কাজ সঠিক তথ্য না জেনে করা উচিত নয়। তাড়াহুড়ো করে কোনো কাজ করলে তার ফল যে ভালো হয় না বরং দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা এই গল্পটি পড়ে আমি শিক্ষা পেয়েছি।

মেজো মামার বিয়ে। ছোটো মামা আর মেজোমামা তাই এসেছেন দাওয়াত দিতে। বাড়ির সবাই বিয়ের তিন, দিন আগে মামাবাড়ি যাবে। শুধু আমিই যেতে পারব না। কারণ, আমার পরীক্ষা। হ্যাঁ, মামার যেদিন বিয়ে ঠিক, তার আগের দিনই আমার পরীক্ষা শেষ হবে।
মেজোমামা পরদিনই চলে গেলেন। শুধু ছোটোমামা রইলেন। তিনি বিয়ের তিন দিন আগে সবাইকে (অবশ্য আমি বাদে) নিয়ে যাবেন।
সেদিন খাওয়ার পর ছোটোমামার সঙ্গে গল্প করছিলাম।
আমি বলছিলাম, 'মেজোমামার বিয়েতে আর যাওয়া হলো না। ইশ! কত দিন ধরে বিরিয়ানি খাইনি। এরকম
চান্সটা মিস হয়ে গেল।'
ছোটোমামা খানিক চিন্তা করে বললেন, 'তুই কিন্তু যেতে পারিস।'
আমি উৎসাহিত হয়ে উঠলাম, 'কীভাবে?'
: তোর পরীক্ষা তো শেষ হবে ষোলো তারিখ, আর বিয়ে হলো গিয়ে সতেরো তারিখ। সুতরাং...
: তুমি তো বলতে চাও যে, আমার পরীক্ষা ঘোলো তারিখ শেষ হবে, তাহলে তো সতেরো তারিখে সহজেই যাওয়া যায় মামাবাড়ি। তুমি মনে করেছ এ কথাটা আমি ভেবে দেখিনি, কিন্তু তিনটের পরে তো আর ট্রেন নেই। মানে পরীক্ষা তো শেষ হবে সেই পাঁচটায়। কিন্তু তখন তো আর মামাবাড়ির কোনো ট্রেন পাব না। রাত্রিতে সেদিনের কোনো ট্রেনই নেই। দিনে মাত্র সাড়ে বারোটা আর তিনটায় দুটো ট্রেনই আছে। সুতরাং ষোলো তারিখেই পরীক্ষা দিয়ে মামার বাড়ি যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যেতে হলে সেই পরের দিন। মানে সতেরো তারিখে সাড়ে বারোটার ট্রেনে যেতে হবে। সেই ট্রেন গিয়ে পৌঁছবে সন্ধ্যা সাতটায়। তাহলে আর গিয়ে লাভ কী, কারণ ততক্ষণে তো মামা বরযাত্রীসহ বিয়েতে রওনা হয়ে যাবেন। যদি মামার সঙ্গে বরযাত্রী হয়ে যেতে না-ই পারলাম, তবে আর গিয়ে লাভটা কী শুনি?
: উঁহু, আমি তা বলছি না।
: তবে?
: তুই যদি সোজা কনের বাড়িতে চলে যাস-
: তার মানে?
: তোর আমাদের বাড়িতে যাওয়ার আর কী দরকার? তুই সতেরো তারিখে সাড়ে বারোটার ট্রেনে সোজা কনের বাড়িতে চলে যাবি। তাহলে তুই সেখানে বরযাত্রীদের সঙ্গে মিলতে পারবি। আর তাহলে তোর বিরিয়ানিটাও মিস যায় না। কী বলিস?
আমি তো লাফিয়ে উঠলাম- থ্রি চিয়ার্স ফর ছোটোমামা। বললাম, 'মার্ভেলাস আইডিয়া।'
আনন্দে একবারে আকাশে যাওয়ার জোগাড় করছি। কিন্তু সেই মুহূর্তে ছোটোমামা যে-কথাটা বললেন, তাতে আমি আকাশে উঠতে উঠতেই ধপ করে পড়ে গেলাম। তিনি বললেন, 'কিন্তু একটা কথা কী জানিস ফোকলা?'
: কী?
: স্টেশনের নামটাই যে আমার মনে নেই।
: স্টেশনের নাম। কোন স্টেশনের?
: ওই কনের বাড়ি যেখানে সেখানকার স্টেশনের নামই ভুলে গেছি।
: অ্যাঁ, স্টেশনের নামই জানো না! তবে যাব কী করে? আমাদের বাসার কেউ জানে না?
: না বোধ হয়। শুধু মেজোভাইয়াই জানতেন। কিন্তু তিনি চলে গেছেন।
: তাহলে?
: আমি অবশ্য একটা উপায় বাতলে দিতে পারি।
: কী উপায়?
ছোটোমামা মনে মনে কী যেন একটা হিসাবে করলেন। তারপর বললেন,
: হ্যাঁ, কনের বাড়ির স্টেশন হলো ঢাকা থেকে বারোটা স্টেশনের পর। তুই যদি গুনে গুনে বারোটা স্টেশন পর নামতে পারিস, তাহলেই চলবে।
: নিশ্চয়ই পারব।
: স্টেশনে নেমে তুই একটা রিকশা নিয়ে বলবি যে, 'চৌধুরীদের বাড়িতে যাব'। ব্যস, তাহলেই চলবে। চৌধুরীরা ওখানকার নামকরা লোক। সবাই ওঁদের চেনে।
: আমি নিশ্চয়ই যেতে পারব।
মেজোমামার বিয়ের তিন দিন আগে বাড়িসুদ্ধ সবাই চলে গেল। শুধু আমিই রইলাম। যাওয়ার সময় সবাই উপদেশ দিয়ে গেল ভালো করে পরীক্ষা দিতে।
আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। আজ সতেরো তারিখ। আজই সাড়ে বারোটার ট্রেনে বিয়ে বাড়ি যাব। অপেক্ষা করে করে আর তর সইছে না। শেষ পর্যন্ত সাড়ে এগারোটায় বাড়ি থেকে বের হলাম। তারপর ধীরে-সুস্থে স্টেশনে উপস্থিত হলাম। ভেবেছিলাম গাড়ি ছাড়তে এখনও দেরি। ওমা! গিয়ে দেখি, গাড়ি চলতে আরম্ভ করেছে। লাফ দিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। আমি যে কামরাতে উঠলাম, সে কামরায় অবশ্য ভিড় বেশি নেই। একজন ভদ্রলোক আমাকে বললেন, 'এই যে এখানে বসো খোকা, এখানে বসো।'
আমি তাঁর পাশেই বসে পড়লাম। হঠাৎ তাঁর ঘড়ির দিকে নজর পড়তেই আশ্চর্য হলাম, আরে এ যে মোটে বারোটা বাজে! গাড়ি ছাড়ার কথা তো সাড়ে বারোটায়! আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম, 'আপনার ঘড়িটা কি- বন্ধ, মানে বলছিলাম কি আপনার ঘড়িটা ঠিকমতো চলছে তো?'
: কী বললে?
: আজ্ঞে আপনার ঘড়িটার কথা বলছিলাম।
: ঘড়িটার কথা? তা আমার ঘড়িটা যেই দেখে সেই কিছু না বলে পারে না। আমার ছেলে মিউনিখে থাকে কিনা, তাই সেখান থেকেই ঘড়িটা পাঠিয়েছে। খুব ভালো ঘড়ি। যে দেখে সে-ই প্রশংসা করে। ঘড়িটা তোমার কাছে ভালো লেগেছে নাকি? চেনটা দেখছ তো! কী সুন্দর! এখানে এসব জিনিস টাকা ছাড়লেও পাবে না।
: আজ্ঞে আমি সে কথা বলছি না।
: তবে কী বলছিলে?
: মানে আপনার ঘড়িটা ঠিকমতো টাইম দেয় তো!
: হুঁ, হুঁ, হাসালে দেখছি। এ ঘড়ি যদি ঠিকমতো টাইম না-দেয় তবে কোন ঘড়িতে ঠিকমতো টাইম পাওয়া যাবে বলতে পারো?
: তা তো বটেই, তা তো বটেই।
: তবে?
: আপনার ঘড়ি তো ঠিকমতো টাইম দেবেই, নিশ্চয়ই দেবে, দেওয়া তো উচিত। তবে ঘড়িটা যদি মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যায়, কী বলে, সেটা যদি না চলে, কিংবা বলতে পারেন আপনি যদি ঘড়িটা না চালান-
: আমি ঘড়ি চালাতে যাব কেন? ঘড়িটা নিশ্চয়ই ঘোড়া নয়, তাহলে ঘড়ি চালানোর প্রশ্নই ওঠে না। ঘোড়ার পিঠে না-হয় বসা যায়, কিন্তু ঘড়িটা তো আমার পিঠেই, থুরি আমার হাতেই অবস্থান করে। আর এখন তো ঘোড়ার চেয়ে মোটর চালনাই ভালো, কিংবা ঘোড়ার বিকল্প বাইকেও চাপতে পারো।
: আজ্ঞে আমি বাইকে চাপতেও পারি না, আর ওসবে চড়ার ইচ্ছাও নেই। আর ঘোড়াকে তো মোটেই পছন্দ করি না। আমার মনে হয়, ঘোড়াও আমাকে নিশ্চয়ই পছন্দ করে না। কারণ, একবার ঘোড়ার পিঠে চাপতে গিয়ে ঘোড়াও এরকম রেগে গিয়েছিল যে আমার মনে হলো ওর পিঠে চড়াটাই ঘোড়া বোধ হয় পছন্দ করল না। আর তার ফলে রেগে গিয়েও যে ব্যাপার ঘটাল তাতে আমার সাড়ে তেত্রিশ ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল। তাই বুঝতেই পারছেন ওসব ঘোড়া-টোড়া চড়া আমি মোটেও পছন্দ করি না।
: তা বাপু তুমি যেটায় চড়তে পছন্দ করো না সেটায় আমায় চড়তে বলছ কেন?
: কই, আমি তো আপনাকে ঘোড়ায় চড়তে কখনো বলিনি, শুধু আপনার ঘড়ির টাইমটা-
: জানতে চেয়েছিলে! তা তো দেখতেই পাচ্ছ বারোটা বেজে এই দু-তিন মিনিট।
: হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি, তবে গাড়ি তো ছাড়ে সাড়ে বারোটায়। তাই ভাবছিলাম, আপনার ঘড়িটা বোধ হয় চলছে না।
: না তো, গাড়ি তো বারোটায় ছাড়ে। আমি এ গাড়িতে প্রায়ই আসা-যাওয়া করি, আমি ভালো করেই জানি এ গাড়ি বারোটায় ছাড়ে।
আমি ভাবলাম কী জানি, ছোটো মামাই হয়তো গাড়ির টাইম বলতে ভুল করেছে। ভাগ্যিস, তাড়াতাড়ি এসেছিলাম। নইলে ট্রেনটা মিস হয়ে যেত। ভদ্রলোক আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তা তুমি কোথায় নামবে?'
: স্টেশনের নাম জানি না, তবে ঢাকা থেকে বারোটা স্টেশন পরে নামব।
: বারোটা স্টেশন পরে!
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মনে মনে যেন একটা হিসাব করলেন। তারপর হঠাৎ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন, 'আরে আমি যে স্টেশনে নামছি তুমিও তাহলে সেই স্টেশনেই নামছ।' ভদ্রলোক আমাকে স্টেশনের নামটি বললেন।
এমনি সময় সে গাড়ি কোনো স্টেশনে যেন থামল। তারপরই আমাদের কামরায় চেকার এল। সবার কাছে টিকিট চেয়ে আমার কাছেও টিকিট চাইল। আমি সেই ভদ্রলোকের কাছ থেকে স্টেশনটির নাম জেনে নিয়েছিলাম। তাই আট আনা ফাইন দিয়ে চেকারের কাছ থেকে ওই স্টেশনের টিকিট করে নিলাম।
গাড়ি কিছুক্ষণ পরেই চলতে আরম্ভ করল। ভদ্রলোক আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, 'তা তুমি সেখানে কোথায় যাবে?'
: সেখানে চৌধুরী বাড়ি যাব।
: বলো কী- এ্যাঁ! আমিও তো চৌধুরীদের বাড়ির লোকই। চৌধুরী সম্পর্কে আমার মামাতো ভাই। তা চৌধুরীদের তুমি কী হও?
: আজ্ঞে আমি অবশ্য কিছু হই না। তবে আমার মামার সঙ্গে আজ চৌধুরী সাহেবের মেয়ের বিয়ে। তাই সেখানে চলেছি।
: কিন্তু বিয়ে তো আজ নয়।
: আজ নয়?
: না। আজ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তারিখ বদলে দেওয়া হয়েছে। কাল বিয়ে হবে। তুমি কি একাই এসেছ?
: হ্যাঁ, আমি একাই এসেছি। আজ বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। তাই আমি সোজা ঢাকা থেকে কনেপক্ষের বাড়ি যাচ্ছি, কথা ছিল সেখানেই বরপক্ষের সঙ্গে মিলিত হব।
: তা ভালোই করেছ, একদিন আগে এসে জায়গাটা ভালো করে দেখে-টেখে যেতে পারবে।
আমি একটু আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম, 'দেখার কোনো জিনিস আছে?'
: তা থাকবে না কেন? মাইল তিনেক ভিতরে গেলেই পদ্মবিল। বিরাট বিল। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আছে সেখানে।
যত ইচ্ছে শিকার করতে পারো। শহরের পশ্চিমে বিরাট মাঠ। সেখানে ছেলেরা খেলাধুলা করে। তারপর ওদিকে আবার একটু জঙ্গলের মতো আছে। আগে অবশ্য ঘন জঙ্গলই ছিল। তবে এখন সেই জঙ্গল আর নেই। পাতলা দু-একটা ঝোপঝাড় যা আছে। এখন ছেলেরা ওখানে পিকনিক করতে যায়। তারপর উত্তর দিকে...
আমি আর কিছু বললাম না। সন্ধ্যার দিকেই গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেলাম। ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে চৌধুরীদের বাড়িতে গেলেন। আমি বৈঠকখানায় বসলাম। তিনি ভিতরে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আরও একজন ভদ্রলোক (মনে হয় ইনিই সেই চৌধুরী সাহেব) ও আমার সমবয়সি কয়েকটি ছেলে সেখানে এল। সেই ভদ্রলোক আমাকে দেখিয়ে বললেন, 'বুঝলে হে চৌধুরী, এই হলো তোমার জামাইয়ের ভাগনে।'
চৌধুরী সাহেব আমার দিকে চেয়ে বললেন, 'তা খোকা তুমি এখানে বসে রয়েছ কেন? ভিতরে এসো, ভিতরে
এসো।'
ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে ভিতরে গেলেন। তারপর চৌধুরী সাহেব হেঁকে বললেন, 'কই তোমরা সব গেলে কোথায়? দেখে যাও কে এসেছে।'
কিছুক্ষণ পরেই একজন ভদ্রমহিলা সেখানে এলেন। চৌধুরী সাহেব বললেন, 'আরে দেখেছ, আমাদের জামাইয়ের ভাগনে।'
: বলো কী?
তারপর ভদ্রমহিলা আমার দিকে চেয়ে বললেন, 'তা ভাই তোমার আসতে তো কষ্ট হয়নি?'
: জ্বি না।
আমি একেবারে বিনয়ে বিগলিত।
ভদ্রমহিলা বললেন, 'ওমা, তোমরা ওকে এখনও কিছু খেতে দাওনি? এসো, এসো!' বলে তিনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে চললেন। তারপর যা ভূরিভোজন হলো। বিয়ের খাওয়াকে যা হার মানায়।
যাক, সে রাত্রি ভালোভাবেই কাটল। পরদিন সকালে নয়টার দিকে দুটি ছেলে এল। এ বাড়িরই ছেলে। একজনের নাম বুলু, অপরজনের নাম টুলু। তারা আমাকে এসে বলল, 'চলো আজ পদ্মবিলে শিকার করতে যাই।'
আমি আঁতকে উঠলাম। বলে কী! আমি যাব শিকার করতে! তাহলেই সেরেছে। শিকারে যাওয়ার ব্যাপারটাকে আমি তাই সরাসরি অস্বীকার করলাম। কিন্তু ছেলে দুটোও নাছোড়বান্দা। তারা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেই। আমি যতই অস্বীকার করি, তারাও ততই শিকারে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে। আমি যুক্তি দিয়ে বুঝাই, 'শিকার জিনিসটা ভালো নয়, খামাখা কয়েকটি প্রাণীহত্যা।'
ওদের কাছে হার মানতেই হলো।
বিরাট পদ্মবিল, স্থানে স্থানে শাপলা রয়েছে। অবশ্য পদ্মফুলের নামগন্ধও দেখলাম না কোনোখানে। সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসছে। শিকার করার জায়গাই বটে!
বুলু-টুলুরাই শিকার করছে। কিন্তু ওরা যে হঠাৎ আমাকেই পাকড়াও করে বসবে তা কে জানত। ওরা চার-পাঁচটা বক মারার পর আমার হাতে বন্দুক দিয়ে বলল, 'তুমি একটা শুট করো!'
আমি কী করে বলি যে, বন্দুক ছুড়তে জানি না। কিন্তু ওরাও আমাকে ছাড়বে না। বলে, 'শিকারে এসে যদি একটাও শুট না করো তবে এলে কী জন্যে?'
বাধ্য হয়েই আমাকে বন্দুক হাতে নিতে হলো। হাত কাঁপতে লাগল। ট্রিগারে টিপ দিলাম। আমার সামনেই বাঁ পাশে কিছু দূরে মোটরকারটা দাঁড় করানো ছিল। আমার গুলি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মোটরের পিছনের চাকাটা সশব্দে ফেটে গেল। বুল-টুলু দৌড়ে গেল গাড়ির কাছে। তারপর গাড়ির পিছন থেকে বাড়তি চাকাটা এনে অনেক কসরত করে লাগাল। অবশেষে বাড়ি ফিরলাম।
আজ বিয়ের দিন। তাই বাড়ি সরগরম। কোনোমতে দিনটা কেটে সন্ধ্যা হলো। বর আসার অপেক্ষায় আমরা সবাই বসে রয়েছি। এমন সময় রব উঠল, 'বর এসেছে, বর এসেছে।' কিছুক্ষণের মধ্যেই বরযাত্রীসহ বর এলেন। আমি আনন্দিত হয়ে মামার কাছে গেলাম। কিন্তু কোথায় মামা! বর তো আমার মেজোমামা নয়। এদিকে চৌধুরী সাহেব এসে বরকে বললেন, 'এই যে বাবাজি, তোমার ভাগনে কালই এখানে এসে গিয়েছে।' বর আশ্চর্য হয়ে বললেন, 'ও তো আমার ভাগনে নয়। আর একে তো আমি চিনিই না।'
: এ্যাঁ, বলো কী?
চৌধুরী সাহেব হতভম্ব। আশেপাশে যে ছেলেরা ছিল তারা খেপে উঠল।
চৌধুরী সাহেব তাদের থামালেন। তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, 'তুমি কি তাহলে মিথ্যে বলেছ?'
আমি বললাম, 'জ্বি না, আমি তো ব্যাপার কিছুই বুঝছি না। আমার মামা তো এখানেই আসতে বলে দিয়েছিলেন।'
চৌধুরী সাহেব বললেন, 'ঠিক আছে তুমি আজ এখানে থাকো। তোমার মামার বাড়িতেই টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছি। সেখান থেকে কোনো লোক এসে তোমাকে নিয়ে যাবে। তোমার মামার বাড়ির ঠিকানা কী?'
আমি ঠিকানা বললাম। তিনি টেলিগ্রাম করতে লোক পাঠালেন।
রাতটা নির্বিঘ্নেই কাটল। পরদিন ছোটোমামা এসে হাজির। তিনি টেলিগ্রাম পেয়ে ছুটে এসেছেন। এদিকে চৌধুরী সাহেব এবং ওই ভদ্রলোকও এসেছেন। ছোটোমামার সঙ্গে তাঁরা অনেকক্ষণ আলাপ করার পরই ব্যাপারটা খোলাসা হয়ে গেল।
আসলে ব্যাপারটা হয়েছে এরকম:
ছোটোমামা আমাকে হিসাব করে বলেছিলেন বারোটি স্টেশন পরে নামতে। তিনি আমাকে চিটাগাং লাইনের গাড়িতে চড়েই বারোটা স্টেশন পরে নামতে বলেছিলেন; কিন্তু আমি ভুলে ময়মনসিংহ লাইনে এসে পড়েছি। কারণ ছোটোমামা আমাকে সাড়ে বারোটার ট্রেনে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু বারোটার সময় ময়মনসিংহ লাইনের একটা গাড়ি ছিল। আমি যখন স্টেশনে আসি, তখন ওই ময়মনসিংহের গাড়িটাই ছাড়ছিল। আর ভুল করে আমি তাতেই উঠে পড়েছিলাম। তারপর ময়মনসিংহ লাইনেই বারোটা স্টেশন পরে নেমে পড়লাম। ভাগ্যক্রমে সেখানেও চৌধুরী সাহেব নামে একজন লোক ছিলেন এবং তাঁরও মেয়ের বিয়ে আমার মেজোমামার বিয়ের পরদিনই ঠিক হয়েছিল। তাই ভুল করে আমি এটাকেই আমার মেজোমামার শ্বশুরবাড়ি মনে করেছিলাম!
ব্যাপারটা খোলাসা হতেই সবাই আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। ছোটোমামা চৌধুরী সাহেবকে বললেন, 'এ যে দেখি রীতিমতো একটা অ্যাডভেঞ্চার। বারোটার ট্রেনটাই যত গন্ডগোলের মূল'- বলেই আবার সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন।
Related Question
View Allবিয়ে সতেরো তারিখে হওয়ার কথা ছিল।
গল্পকথক অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
গল্পকথকের মেজ মামার বিয়ের দিন ঠিক হয় তার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের দিন। কিন্তু পরিবহন সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কোনোভাবেই তার পক্ষে বিয়ে বাড়িতে যাওয়া সম্ভব নয়। এমন অবস্থায় ছোট মামা গল্পকথককে একটি বুদ্ধি দেন। পরীক্ষা শেষ করে যেহেতু সে মামাবাড়ি গিয়ে বিয়েতে উপস্থিত হতে পারবে না, তাই বিয়ের দিন ট্রেনে করে কনের বাড়িতে গিয়ে সরাসরি বিয়েতে উপস্থিত হতে হবে। ছোট মামার এমন পরামর্শে গল্পকথক অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে ওঠে এবং আলোচ্য উক্তিটি করে।
যাত্রার পরিবহন হিসেবে ট্রেনের দিকটির সঙ্গে উদ্দীপক ও 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের সাদৃশ্য রয়েছে।
যাত্রাপথে আমরা নানা ধরনের পরিবহন ব্যবহার করে থাকি। তার মধ্যে অন্যতম হলো ট্রেন। ট্রেনে ভ্রমণ সত্যিই খুবই আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য উদ্দীপকে ট্রেনের ছুটে চলার কথা বলা হয়েছে। রাত-দুপুর ট্রেন শুধু ছুটতেই থাকে। তার কোনো বাড়িঘর নেই, তাই তার ছোটারও শেষ নেই। 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে যাত্রার যে দৃশ্য আমরা দেখতে পাই, ট্রেনের কথা বলা হয়েছে। ট্রেনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা হাস্যরসাত্মকভাবে গল্পে প্রকাশ পেয়েছে। তাই বলা যায়, যাত্রার পরিবহন হিসেবে ট্রেনের দিকটির সঙ্গে উদ্দীপকও গল্পের সাদৃশ্য রয়েছে।
"সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটিই 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পের একমাত্র বিষয় নয়।"- মন্তব্যটি যথার্থ।
যাত্রাপথে অবশ্যই আমাদের অনেক সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। কেননা সামান্য অসাবধানতার কারণে অনেক বড় ভোগান্তি হতে পারে। আর সেখান থেকে নানা রকমের বিপদও ঘটে অনেক সময়।
উদ্দীপকে প্রতিনিয়ত ট্রেনের ছুটে চলার কথা বলা হয়েছে। যেন রাত-দুপুর কোনো সময়ই ট্রেন স্থির থাকে না। মনে হয় ট্রেনের কোনো বাড়িঘর নেই; তাই তার চলার কোনো শেষ নেই। 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে ট্রেনের ছুটে চলার দিকটি প্রকাশ পেলেও মূলত সামান্য ভুলের জন্য মানুষের কী পরিমাণ ভোগান্তির শিকার হতে হয় তা প্রকাশ পেয়েছে। হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়নে অনেক দিক খেয়াল রাখা প্রয়োজন। গল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে এ দিকটি ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকে শুধু ট্রেনের ছুটে চলার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে 'মামার বিয়ের বরযাত্রী' গল্পে সামান্য ভুলের কারণে গল্পকথকের ভোগান্তি এবং হঠকারী সিদ্ধান্তের কুফল ব্যক্ত হয়েছে। তাই ট্রেনের ছুটে চলার দিকটির সঙ্গে উদ্দীপক ও গল্পের সাদৃশ্য থাকলেও সেটি গল্পের মূল বিষয় নয়। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
ট্রেন বারোটায় ছেড়েছিল।
আলোচ্য উক্তিটি ট্রেনের ভেতরের ভদ্রলোক গল্পকথককে ভুল বুঝে করেছেন।
গল্পকথক ভুলবশত অন্য ট্রেনে উঠে পড়েন। যে বগিতে গল্পকথক উঠেছিলেন, সে বগিতে আরও একজন, ভদ্রলোক ছিলেন। তাকে গল্পকথক ঘড়ির সময় ঠিক আছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। কারণ লেখক যে ট্রেনে যাওয়ার কথা ছিল তার সময়, আর তিনি যে ট্রেনে যাচ্ছেন সেই ট্রেনের সময় মিলছে না। তাই ঘড়ির সময় ঠিক আছে কিনা এই প্রসঙ্গে নানান কথা হয়। একপর্যায়ে ভদ্রলোক লেখকের কথা ভুল বুঝে আলোচ্য উক্তিটি করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!