ফসল উৎপাদনে কৃষি উপকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি উপকরণগুলোর মধ্যে মাটি, পানি, বীজ, সার উল্লেখযোগ্য। কোন মাটিতে কোন ফসল জন্মাবে, ভালো বীজের বৈশিষ্ট্যগুলো কেমন, ফসলে সেচের দরকার আছে কি না, অতিরিক্ত পানি ফসলের ক্ষতি করছে কি না, জমিতে কী কী সার প্রয়োগ করা দরকার, এসব সম্পর্কে আমরা এ অধ্যায়ে বিস্তারিত জানব।

এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-
- ব্যবহার অনুযায়ী উপযুক্ত মাটি শনাক্ত করতে পারব।
- কৃষি ফলনে মাটির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- কৃষি ক্ষেত্রে পানির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
- বীজের বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ বর্ণনা করতে পারব।
- সারের প্রকারভেদ বর্ণনা করতে পারব।
- কৃষিতে রাসায়নিক সারের প্রভাব মূল্যায়ন করতে পারব।
- কৃষিকাজে সার ব্যবহারের উপযোগিতা মূল্যায়ন করতে পারব।
- কৃষিকাজে পানির পরিমিত ব্যবহারে সচেতন হব।
- রাসায়নিক সার অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
এম এ পাস রহিম জমিতে ধানের চাষ করেন। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে তিনি ফসল উৎপাদন করেন। তিনি এবারও বাজার থেকে কিছু বীজ সংগ্রহ করে বীজ বপন করলেন। তিনি লক্ষ করলেন যে গত বছরের তুলনায় এ বছর ফসল কম হয়েছে এবং ধানের বীজ অন্য জাতের মিশ্রণযুক্ত।
মিনহাজ একদিন তার চাষকৃত মাছের পুকুরে গিয়ে লক্ষ করল মাছ দলবদ্ধভাবে পানির উপর ভেসে বেড়াচ্ছে।

মাটি একটি প্রাকৃতিক বস্তু এবং মিশ্র পদার্থ। এ মাটিতে চাষাবাদ করে মানুষ শস্য ফলায়। আমরা কি জানি, এ মাটি কীভাবে তৈরি হয়েছে? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবী প্রথমে একটি জলন্ত অগ্নিগোলকের পিও ছিল। দীর্ঘকাল তাপ বিকিরণ করতে করতে এ পিণ্ড ঠাণ্ডা হয়ে শিলাময় শক্ত ভূ-ত্বক সৃষ্টি করেছে। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় শিলা কালক্রমে ক্ষয় হয়ে মাটির সৃষ্টি হয়েছে।
পরিশেষে বলতে পারি, মাটি হলো:
(১) প্রাকৃতিক বস্তু, যা খনিজ ও জৈব পদার্থের সমন্বয়ে ঘটিত;
(২) ভূ-পৃষ্ঠের সবচেয়ে উপরের স্তর, যা উদ্ভিদকে অবলম্বন দেয়; (৩) বিভিন্ন পুরুত্ববিশিষ্ট নানা স্তর দ্বারা গঠিত যার প্রতিটি
স্তরের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক ধর্ম বিভিন্ন।

মাটির গঠন উপাদান মাটি প্রধানত ৪টি উপাদান দ্বারা গঠিত। উপাদানগুলো হলো- (১) অজৈব পদার্থ বা খনিজ পদার্থ (২) জৈব পদার্থ (৩) পানি ও (৪) বায়ু।
১। খনিজ পদার্থ: আমরা পূর্বেই জেনেছি, ভূ-পৃষ্ঠ প্রকৃতপক্ষে শিলা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। প্রাকৃতিক শক্তি তথা তাপ, চাপ, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, পানিপ্রবাহ ইত্যাদির প্রভাবে সময়ের ব্যবধানে আদি শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মাটির অজৈব বা খনিজ পদার্থ সৃষ্টি করেছে। নুড়িপাথর, বালিকণা, পলিকণা ও কর্দমকণা হচ্ছে মাটির খনিজ পদার্থ। এসব খনিজ পদার্থ নানাভাবে মিশে মাটির বুনট সৃষ্টি হয়েছে। মাটিতে খনিজ পদার্থের পরিমাণ আয়তন ভিত্তিতে শতকরা প্রায় ৪৫ ভাগ অর্থাৎ মাটির সর্ববৃহৎ অংশ জুড়ে আছে।
২। জৈব পদার্থ: জৈব পদার্থ মাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জীবজন্তুর মৃতদেহ, গাছপালা, লতাপাতা, খড়কুটা, প্রাণীর মলমূত্র, প্রভৃতি মাটিতে পচে জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয়। মাটিতে আয়তনের ভিত্তিতে শতকরা ৫ ভাগ জৈব পদার্থ থাকে। জৈব পদার্থকে মাটির প্রাণ বলা হয়। কেননা জৈব পদার্থের উপস্থিতিতে মাটির অণুজীবগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
এছাড়াও জৈব পদার্থ (১) মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক ধর্মাবলি উন্নত করে; (২) ভূমিক্ষয় রোধ করে (৩) মাটিতে পানি ও বায়ু চলাচল সহজতর করে (৪) মাটিস্থ কেঁচোর সংখ্যা ও এর কার্যাবলি বাড়ায়; (৫) মাটির রস ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
৩। পানি: মাটির একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পানি। মাটির বিভিন্ন কণার মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে পানি অবস্থান করে। মাটির পানি উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানগুলোকে তরল রাখে এবং মাটিকে রসাল রাখে। বৃষ্টিপাত, বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প, ভূ-গর্ভস্থ পানি ও সেচব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত পানিই মাটির পানির প্রধান উৎস। আদর্শ মাটিতে পানির পরিমাণ হলো শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ।
৪। বায়ু: বায়ু মাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাটির কণার ফাঁকে ফাঁকে বায়ু থাকে। উদ্ভিদের শিকড় ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য অণুজীবের কর্মতৎপরতার জন্য যে অক্সিজেনের প্রয়োজন, তা মাটিতে অবস্থানরত বায়ু সরবরাহ করে। আদর্শ মাটিতে বায়ুর পরিমাণ হলো শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ।
| কাজ: মাটির গঠন উপাদানের শতকরা হারের পেপার মডেল তৈরি করে সে মডেলগুলো শ্রেণিকক্ষে টানিয়ে রাখ। |
যেসব খনিজ কণার ব্যাস দুই মিলিমিটার বা তার কম, তাকে মাটির কণা বলা হয়। আমরা জানি, এ কণার দ্বারাই মাটির বুনট সৃষ্টি হয়। মাটির বুনট হলো মাটির বালি, পলি, কর্দমকণার তুলনামূলক পরিমাণ বা শতকরা অনুপাত। মাটির এসব কণা বিভিন্ন অনুপাতে বিভিন্ন প্রকার মাটির সৃষ্টি করে। আর মনে রাখব, এসব কণার আকারও ভিন্ন ভিন্ন হয়।
কোন মাটিতে কোন ফসল জন্মায় তা জানার জন্যই মাটির শ্রেণিবিভাগ জানা খুবই দরকার। কৃষিকাজে ব্যবহারের সুবিধার জন্য বুনটের উপর ভিত্তি করে মাটিকে প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- (১) বেলে মাটি (২) দোআঁশ মাটি ও (৩) এঁটেল মাটি।
(১) বেলে মাটি: যে মাটিতে শতকরা ৭০ ভাগ বা তারও বেশি বালিকণা থাকে, তাকে বেলে মাটি বলে। মোটা কণাযুক্ত বেলে মাটিতে ফসলের চাষ করা যায় না। তবে বেলে মাটিতে প্রচুর কম্পোস্ট, গোবর ও সবুজ সার প্রয়োগ করে চিনা, কাউন, ফুটি, আলু, তরমুজ ইত্যাদি চাষ করা সম্ভব।

(২) দোআঁশ মাটি: যে মাটিতে বালিকণার পরিমাণ শতকরা ৭০ ভাগের কম কিন্তু ২০ ভাগের বেশি, তাকে দোআঁশ মাটি বলে। তবে আদর্শ দোআঁশ মাটিতে অর্ধেক বালিকণা এবং বাকি অর্ধেক পলি ও কর্দমকণা থাকা আবশ্যক। চাষাবাদের জন্য এ মাটি উত্তম। এ মাটিতে সব ধরনের ফসল ভালো জন্মে। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার মাটি দোআঁশ প্রকৃতির। দোআঁশ মাটিকে আবার ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- (১) বেলে-দোআঁশ মাটি (২) পলি-দোআঁশ মাটি (৩) এঁটেল-দোআঁশ মাটি।

(৩) এঁটেল মাটি: যে মাটিতে কমপক্ষে শতকরা ৪০ ভাগ কর্দমকণা থাকে, তাকে এঁটেল মাটি বলে। এ মাটিতে পলিকণাও বেশি থাকে। ঢাকা জেলার উত্তরাংশ, টাঙ্গাইল জেলার পূর্বাংশ ও ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে এ মাটি দেখা যায়। এ মাটিতে চাষ করা খুব কষ্টকর। জৈব সার প্রয়োগে চাষের উপযোগী করা সম্ভব। ধান, পাট, আখ ও শাকসবজি এ মাটিতে ভালো জন্মে।

| কাজ ১: নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ- (১) মাটির বুনট কী? (২) কীভাবে মাটির বুনট নির্ধারিত হয়? (৩) বুনটের উপর ভিত্তি করে মাটি কত প্রকার ও কী কী? (৪) চাষাবাদের সবচেয়ে উপযোগী মাটি কোনটি? কাজ ২: বেলে, দোআঁশ ও এঁটেল মাটিতে জন্মায় এরূপ ফসলের একটি তালিকা তৈরি কর। |
ফসল উৎপাদনে মাটির গুণাগুণ প্রভাব বিস্তার করে। কোন মাটিতে কোন ধরনের ফসল উৎপাদন করা যাবে তা মাটির গুণাগুণের উপর নির্ভর করে। মাটির সকল গুণাবলিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা- (ক) ভৌত গুণাগুণ (খ) রাসায়নিক গুণাগুণ
(গ) জৈবিক গুণাগুণ।
(ক) মাটির ভৌত গুণাগুণ: মাটির ভৌত গুণাগুণ বলতে ১) মাটির বুনট ২) মাটির সংযুতি ৩) মাটির ঘনত্ব ৪) মাটির বর্ণ ৫) মাটির তাপমাত্রা ৬) মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা ৭) মাটির বায়ু চলাচল ইত্যাদিকে বোঝায়।
(খ) মাটির রাসায়নিক গুণাগুণ: মাটির রাসায়নিক গুণাগুণ বলতে ১) মাটির অম্লত্ব ক্ষারত্ব ২) উদ্ভিদের জন্য সহজলভ্য পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ ৩) মাটির লবণাক্ততা ইত্যাদিকে বোঝায়।
(গ) মাটির জৈবিক গুণাগুণ মাটির জৈবিক গুণাগুণ বলতে ১) অণুজীবের প্রকার ২) অণুজীবের সংখ্যা ৩) অণুজীবের কার্যাবলি ইত্যাদিকে বোঝায়।
কৃষি ফলনে মাটির গুণাগুণের গুরুত্ব: ফসল উৎপাদনে মাটির গুণাগুণের গুরুত্ব অপরিসীম। মাটির ভৌত গুণাবলির মধ্যে মাটির বুনট, মাটির সংযুতি, মাটির ঘনত্ব ইত্যাদি ফসল উৎপাদনে প্রভাব বিস্তার করে। মাটির বুনটের পার্থক্যের কারণে মাটিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। দোআঁশ মাটিতে অধিকাংশ ফসল ভালো জন্মে। এঁটেল মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বেশি বলে এ মাটিতে ধান ভালো জন্মে। বেলে মাটিতে বাদাম, আলু, ফুটি, তরমুজ ইত্যাদি ফসল জন্মে। মাটির বালি, পলি ও কর্দমকণা যে দলাকৃতিতে সজ্জিত থাকে তাকে মাটির সংযুতি বলে। দানাদার, চুর্ণাকার সংযুতি ফসল চাষের জন্য বেশি উপযোগী। থালাকার সংযুতির মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বেশি। মাটির রাসায়নিক গুণাগুণের মধ্যে মাটির অম্লত্ব, ক্ষারত্ব, লবণাক্ততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ফসল বেশি অম্লীয়, ক্ষারীয় বা লবণাক্ততা পছন্দ করে না অর্থাৎ নিরপেক্ষ মাটি ফসল চাষের জন্য বেশি উপযোগী। এ ধরনের মাটিতে উদ্ভিদের জন্য সহজলভ্য পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে ও অণুজৈবিক কার্যাবলি সক্রিয় থাকে।
কেঁচো, ছত্রাক, ব্যাক্টেরিয়া, শৈবাল ইত্যাদি জীব ও অণুজীবের সংখ্যা, প্রকার এবং ক্রিয়াকলাপই মাটির জৈবিক গুণাবলি। এসব জীব ও অণুজীব মাটিতে হিউমাস উৎপাদন ও ফসলের জন্য পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য করার মাধ্যমে প্রভূত উপকার করে।
| কাজ: বেলে, দোআঁশ ও এঁটেল মাটির গুণাগুণগুলো লিখে উপস্থাপন কর। |
আমরা কি জানি, জীবের দেহে কোন উপাদানটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে? কোন বস্তুটি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো জীবের অস্তিত্ব সম্ভব নয়? কোন পদার্থটিকে জীবের জীবন বলা হয়? সবকটি প্রশ্নের উত্তরে বলব 'পানি'। তাহলে জীব এ পানি কোথা থেকে পায়? গাছ একটি জীব, সে পানি পায় সেচ বা বৃষ্টি থেকে। যখন পানি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়, তখন তা সরানোর প্রয়োজন পড়ে, যাকে নিষ্কাশন বলে। এখন আমরা পানি সেচ ও পানি নিষ্কাশন সম্পর্কে আলোচনা করব।
ফসলের গাছ বড় হওয়ার জন্য জমিতে কৃত্রিম উপায়ে পানি সরবরাহ করাকেই সেচ বলা হয়। যেকোনো জীবের বাঁচার জন্য যেমন পানি অপরিহার্য, ফসলের জন্যও তেমনি। ফসল সুন্দরভাবে বাঁচার ও ফলন দেবার জন্য মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি ও পানিতে দ্রবীভূত পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে। খরা, অনাবৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে ফসলের জমিতে পানির আবশ্যকতা দেখা দেয়। আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় সেচ অত্যাবশ্যক।

সেচের পানির উৎস
সেচের পানি প্রধানত ২টি উৎস থেকে পাওয়া যায়, যথা- (ক) ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি; (খ) ভূ-গর্ভস্থ পানি। ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির উৎস হচ্ছে নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়, পুকুর প্রভৃতির পানি। বৃষ্টিপাতের কারণে প্রধানত এসব পানি জমা হয়।

পক্ষান্তরে, কূপ খনন করে বা নলকূপ দ্বারা ভূ-গর্ভের পানি উত্তোলন করে সেচ দেওয়া হয়। এ পানিকেই ভূ- গর্ভস্থ পানি বলে। ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎস হচ্ছে বৃষ্টির পানি।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এ বৃষ্টিপাত সবসময় কাজে লাগে না। তাই বৃষ্টির উপর নির্ভর করে ফসল চাষাবাদ করলে সবসময় ভালো ফলন পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে বর্ষাকালে বেশি বৃষ্টি হলেও শীত মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এ ছাড়া দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষাকালেও বৃষ্টিপাত কম হয়। ফলে পানির অভাবে ফসলের ফলন কম হয়। এ অবস্থায় ফসলের ফলন বাড়ানোর জন্য পানি সেচ দিতে হয়। প্রতিটি ফসলের বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে পানির চাহিদায় ভিন্নতা রয়েছে। আর এই চাহিদা অনুযায়ী ফসলে পানি সেচ দিতে হয়।

সেচের পানির উপকারিতা: (১) উদ্ভিদ শিকড়ের সাহায্যে পানি পরিশোষণ করে। (২) উদ্ভিদ মাটি থেকে পানি পরিশোষণের সাথে পুষ্টি উপাদান আহরণ করে। (৩) সেচের মাধ্যমে মাটির তাপমাত্রা ঠিক রাখা যায়। (৪) অণুজীবের কার্যকারিতা ও পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পায়।
অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন: জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হয়। জমি থেকে এই অতিরিক্ত পানি সরিয়ে ফেলাকেই পানি নিষ্কাশন বলে। জমিতে অতিরিক্ত পানি জমলে গাছের শিকড় অঞ্চলে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়, ফলে অনেক গাছ মারা যায়।

আমরা উপরের চিত্রগুলো লক্ষ করি। কী দেখতে পাচ্ছি? পুকরে পানি, নদীতে পানি ও খালে পানি। আমরা কি জানি, এ পানিতে কোন জীব বাস করে? আর এ জীব আমরা খেয়ে আমিষের চাহিদা পূরণ করে থাকি। উত্তরে আমরা বলব মাছ। তাহলে মাছ পানিতে চাষ করলে তার এ আবাস সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা দরকার। আমরা জানি, আমাদের বসবাসের জন্য যেমন বাড়ি ও বাড়ির পরিবেশ থাকা দরকার, তেমনি মাছের জন্য তার বসবাসের জায়গা পানির পরিবেশ সুন্দর থাকা দরকার। কাজেই এসো আমরা মাছ চাষে পানির গুণাগুণ ও তার প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করি।
পানির ভৌত গুণাগুণ ও মাছ চাষে তার প্রভাব: পানির ভৌত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পুকুরের উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। মাছ চাষের পানির ভৌত গুণাগুণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. পানির বর্ণ
পানির বর্ণ হালকা সবুজ হলে তা পুকুরের অধিক উৎপাদনশীলতা নির্দেশ করে। বিভিন্ন ধরনের জৈব ও অজৈব দ্রব্যের উপস্থিতির কারণে পানির বর্ণ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। রং দেখে পানির উৎপাদন শক্তি আন্দাজ করা যায়। পানির রং সবুজ বা বাদামি হলে বোঝা যাবে পানিতে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। পুকুরে নিয়মিত সার প্রয়োগ করলে উক্ত রং বজায় থাকবে।
২. পানির স্বচ্ছতা
পানির স্বচ্ছতা ২৫ সেন্টিমিটার বা তার কম হলে পুকুরের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হয়। পানিতে কনুই পর্যন্ত হাত ডুবানোর পর যদি হাতের তালু দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে মাছের জন্য বেশি খাদ্য নেই। তখন পুকুরে সার দিতে হয়।

৩.পানির গভীরতা: পানির গভীরতা মাছ চাষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাছ চাষের জন্য পুকুরের পানির গভীরতা কমপক্ষে ১.৫ মিটার থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে ২ মিটার গভীরতা মাছ চাষের জন্য উত্তম। পানির গভীরতা খুব বেশি হলে সূর্যের আলো পানির গভীরে পৌঁছাতে পারে না। আবার পানির গভীরতা খুব কম হলে সূর্যের তাপে পানি গরম হয়ে উঠে।
8.পানির তাপমাত্রা: পানির তাপমাত্রার উপরও মাছের বৃদ্ধি নির্ভর করে। শীতকালে মাছের বৃদ্ধি কম হয় এবং গরমকালে বেশি বাড়ে। যেমন: রুই জাতীয় মাছ চাষের জন্য ২৫০-৩০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা উত্তম।
৫. সূর্যালোক : সূর্যালোকের উপর খাদ্য উৎপাদন নির্ভর করে। তাই পুকুর পাড়ের বড় গাছপালা কেটে পানিতে সূর্যালোক প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। পুকুরে ভাসমান কুচুরিপানা, শেওলা ও আগাছা ইত্যাদিও পানিতে সূর্যালোক প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করে।

পানির রাসায়নিক গুণাগুণ ও মাছ চাষে তার প্রভাব
মাছ চাষের পানির রাসায়নিক গুণাবলির মধ্যে কয়েকটি আলোচনা করা হলো:
১. দ্রবীভূত অক্সিজেন: জলজ উদ্ভিদ যে অক্সিজেন ছাড়ে তা পানিতে দ্রবীভূত হয়। বাতাস থেকেও কিছু অক্সিজেন সরাসরি পানিতে মিশে। পুকুরে অবস্থিত মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী এ অক্সিজেন দ্বারা শ্বাসকার্য চালায়। অক্সিজেনের অভাবে মাছ দলবদ্ধভাবে পানির উপর ভেসে বেড়ায়। একে মাছের খাবি খাওয়া বলে।
পানিতে অক্সিজেন হ্রাসের কারণ: (১) পানিতে গাছের পাতা ও ডালপালা পচা (২) কাঁচা গোবর বেশি পরিমাণে ব্যবহার (৩) আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকা (৪) পানি খুব ঘোলা হওয়া।
অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণের উপায়: পানির উপরিভাগে ঢেউ সৃষ্টি করে তাৎক্ষণিকভাবে পানিতে
অক্সিজেনের অভাব পূরণ করা যায়। সাঁতার কেটে বা বাঁশ দিয়ে পানির উপর পিটিয়ে এ ঢেউ সৃষ্টি করা যায়।
২. দ্রবীভূত কার্বন ডাইঅক্সাইড : কোনো কারণে পানিতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পুকুরের তলায় অত্যধিক জৈব পদার্থ ও কাদা থাকলে অধিক তাপমাত্রায় পুকুরে এ গ্যাসের আধিক্য ঘটে।
৩. পানির পি-এইচ: পানি অম্লধর্মী না ক্ষারধর্মী, তা পি-এইচ মিটার দ্বারা পরিমাপ করা যায়। পি-এইচ ৭- এর কম হলে পানি অম্লীয়, ৭-এর বেশি হলে পানি ক্ষারীয় এবং ৭ হলে পানি নিরপেক্ষ। সামান্য ক্ষারধর্মী পানি মাছ চাষের জন্য ভালো। তবে পানির পি-এইচ ৬.৫-৮.৫ হলে পানি প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনে সহায়ক হয়।
৪. ফসফরাস: ফসফরাস পানিতে মাছের খাদ্যের পরিমাণ বাড়ায়।
৫. নাইট্রোজেন: নাইট্রোজেন জলজ অণুজীবের জন্য খুবই উপকারী। আর এ অণুজীবই মাছের প্রধান খাদ্য।
৬.পটাশিয়াম: মাছের খাদ্যচাহিদা পূরণের জন্য পানিতে পটাশ দিতে হয়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, মাছ চাষে পানির অনেক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
পানির গুণাগুণ এর উপর জলাশয়ে মাছের উৎপাদন নির্ভর করছে।
| কাজ: 'মাছ চাষে পানির' গুণাগুণের প্রভাব দলগতভাবে আলোচনা করে উপস্থাপন কর। |
পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া মানুষ, পশু-পাখি, গাছপালা কোনো জীবই বাঁচতে পারে না। পুষ্টি উপাদান দেহের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের জন্য পানি প্রয়োজন। এটি হজম, বিপাকপ্রক্রিয়া ও দূষিত পদার্থ দেহ থেকে নির্গত হতে সাহায্য করে। শরীরের উত্তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পানির ভূমিকা রয়েছে। পানি জীবদেহের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। দেহের গঠনের উপাদানের মধ্যে পানির পরিমাণ সবচেয়ে অধিক। প্রাণিদেহের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই পানি।

গৃহপালিত পশু-পাখির খাবার পানির উৎস: নলকূপ, কুয়া, পুকুর ইত্যাদির পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ পানি।
পশু-পাখির দেহে পানির কার্যকারিতা: (১) পানি খাদ্যকে শোষণ করতে সাহায্য করে। (২) দেহের
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। (৩) পুষ্টি উপাদান কোষে পৌঁছাতে সাহায্য করে। (৪) দেহে তারল্য বজায় রাখে (৫) বিভিন্ন প্রকার পাচকরস পরিবহনে সাহায্য করে।
পশু-পাখির দেহে পানির কার্যকারিতা:
পরিমিত পরিমাণ পানি গ্রহণ না করলে তাদের অন্যান্য খাদ্য গ্রহণ ও ব্যবহারে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। পশু-পাখির উৎপাদন ও ওজন কমে যাবে। পশু-পাখির গর্ভকালীন পানির অভাবে পেটের বাচ্চা ও ডিম উৎপাদন হুমকির সম্মুখীন হবে। এমনকি পানির অভাবে মারাও যেতে পারে।
সমাধান: পশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ পানি খাওয়াতে হবে। পশু-পাখি যাতে কোনোভাবেই পঁচা বা দূষিত পানি না খেতে পারে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। পানি জীবাণুমুক্ত হতে হবে। এছাড়া পানির প্রয়োজনীয়তা খাদ্য, আবহাওয়া ও বয়সের উপর নির্ভর করে। শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে পানি বেশি প্রয়োজন। শুকনো ঘাস ও দানাদার খাদ্য বেশি খাওয়ালে পানি বেশি প্রয়োজন হবে।
পানির চাহিদা: দুধেল গাভির পানির বেশি প্রয়োজন। একটি দুধেল গাভি দৈনিক ৩০-৪০ লিটার পানি পান করে থাকে। একটি মুরগি তার খাদ্যের দ্বিগুণ পানি পান করে। হিসাব করে দেখা গেছে, একটি মুরগি দৈনিক ২০০-৩০০ মিলি পানি পান করে।
| কাজ: 'দুধেল গাভিকে অপর্যাপ্ত খাবার পানি খাওয়ালে কী হবে' সে সম্পর্কে খাতায় লিখ। |
উদ্ভিদের বংশবিস্তারের মাধ্যম হলো বীজ। বীজ থেকেই নতুন উদ্ভিদের জন্ম হয়। সাধারণভাবে বীজ বলতে উদ্ভিদের নিষিক্ত ও পরিপক্ক ডিম্বককে বোঝায়। যেমন: ধান, গম, পাট ইত্যাদির বীজ। তবে ব্যাপকভাবে বীজ বলতে উদ্ভিদের যে কোনো জীবন্ত অংশ যা পরবর্তীতে বংশবিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন ধান, মিষ্টি আলুর লতা, আখের কাণ্ড, পাথর কুচির পাতা, পেঁয়াজ, গোলআলু ইত্যাদি।

| কাজ: শ্রেণিকক্ষে বাংলাদেশে জন্মে এমন কিছু উদ্ভিদের বীজ দেখে এগুলো কোন কোন উদ্ভিদের বীজ তা শনাক্ত কর। |
আমরা এ পর্যন্ত অনেক বীজ দেখলাম এবং বীজের নাম শনাক্ত করতে পারলাম। এবার আমরা ভালো বীজের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানব।
১.বীজ বিশুদ্ধতা: কাঙ্ক্ষিত ফসলের বীজের সাথে যেন অন্য ফসলের বীজ, আগাছার বীজ, কাঁকর জাতীয় পদার্থ প্রভৃতি মিশ্রিত না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এতে বীজের বিশুদ্ধতা বজায় থাকে না।
২. জাত বিশুদ্ধতা: কোনো বীজের নমুনায় একই ফসলের অন্য জাতের বীজ থাকলে বীজের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। যেমন: নাইজারশাইল ধানের বীজের সাথে বিনাশাইল ধানের মিশ্রণ থাকলে জাত বিশুদ্ধতা থাকে না। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বীজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করলে জাত বিশুদ্ধতা বজায় থাকে।
৩. গজানোর ক্ষমতা: এ বিষয়টিকে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বলে। কোনো বীজ নমুনায় কতোটি বীজ অঙ্কুরিত হবে সে হিসাব থেকেই বীজের ভালোমন্দ গুণ বিচার করা হয়। উত্তম বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ১০০% পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু সবসময় সব বীজ এ হারে গজায় না। কমপক্ষে ৮০% গজানোর হার সম্পন্ন বীজকে উত্তম বীজ বলা যায়।
8. বীজের জীবনীশক্তি তেজ: নমুনা বীজের চারা যদি সতেজ, সজীব ও স্বাস্থ্যবান হয় এবং প্রতিকূল অবস্থায় তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠতে পারে, তবে সে বীজকে তেজস্বী বীজ বলা হয়।
৫. বীজের আর্দ্রতা: নমুনা বীজের মধ্যে শতকরা কতো ভাগ পানি আছে, তাই বীজের আর্দ্রতা। বীজের আর্দ্রতা বীজকে বাঁচিয়ে রাখে। যেমন দানা শস্যের বীজের আর্দ্রতা ৮-১০% রাখা উত্তম।

৬. বীজের বর্ণ: প্রত্যেক জাতের বীজের স্বতন্ত্র রং থাকে। আর তাই ভালো বীজের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক উজ্জ্বল রং থাকতে হবে। ভালো বীজ চেনার প্রথম লক্ষণই হচ্ছে বীজের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা।
বিভিন্নভাবে বীজের শ্রেণিবিভাগ করা যায়। যেমন:
১।ব্যবহারের ভিত্তিতে বীজকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(ক)উদ্ভিদতাত্ত্বিক বীজ: উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, নিষিক্ত ও পরিপত্ত্ব ডিম্বককে বীজ বলে।
যেমন: ধান, পাট, গম ইত্যাদি বীজ।
(খ) কৃষিতাত্ত্বিক বীজ: কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, উদ্ভিদের যেকোনো অংশ যা উপযুক্ত পরিবেশে আপন জাতের নতুন উদ্ভিদের জন্ম দিতে পারে, তাকে কৃষিতাত্ত্বিক বীজ বলে। যেমন: আদা ও হলুদের কন্দ, মিষ্টি আলুর লতা, কাঁকরোলের মূল, আখের কাণ্ড ইত্যাদি।
২।বীজাবরণের উপস্থিতির ভিত্তিতে বীজকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(ক) অনাবৃত বীজ: এসব বীজে কোনো আবরণ থাকে না। যেমন: পাইন, সাইকাস ইত্যাদি।
(খ) আবৃত বীজ: এসব বীজের আবরণ থাকে। যেমন: ধান, সরিষা, ইত্যাদি।
৩। বীজপত্রের সংখ্যার ভিত্তিতে বীজকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(ক) একবীজপত্রী বীজ: এসব বীজে একটি মাত্র বীজপত্র থাকে। যেমন; ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি
(খ) দ্বিবীজপত্রী বীজ: এসব বীজে দুটি বীজপত্র থাকে। যেমন: ছোলা, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি।
(গ) বহুবীজপত্রী বীজ: এসব বীজে দুইয়ের অধিক বীজপত্র থাকে। যেমন: পাইন।
| কাজ: বিভিন্ন বীজের কয়েকটি নমুনা মিশ্রণ থেকে নমুনা বীজগুলোর শ্রেণিবিন্যাস কর। |
আমরা যেমন খাবার খাই, তেমনি উদ্ভিদও মাটি থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। উদ্ভিদের জীবনচক্র সম্পন্ন করার জন্য ১৭টি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন হয়। তবে সবগুলো পুষ্টি উপাদানই উদ্ভিদের জন্য সমান পরিমাণে প্রয়োজন হয় না। এর মধ্যে কিছু পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদের জন্য বেশি পরিমাণে লাগে যেমন: নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ইত্যাদি। এই উপাদানগুলোকে আমরা জমিতে সার হিসেবে প্রয়োগ করি যেমন: ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ইত্যাদি।
উৎস অনুযায়ী সারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক) জৈব সার।
খ) রাসায়নিক সার।

(ক) জৈব সার
যেসব সার জীবের দেহ থেকে প্রাপ্ত অর্থাৎ উদ্ভিদ বা প্রাণীর ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রস্তুত করা যায়, তাদেরকে জৈব সার বলে। যেমন- গোবর সার, কম্পোস্ট সার, সবুজ সার, খৈল ইত্যাদি। গাছের প্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্য উপাদানই জৈব সারে থাকে
জমিতে জৈব সার প্রয়োগের সুবিধা
জৈব সারে ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদানই থাকে।

- মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
- মাটির অণুজীবের কার্যাবলি বাড়ায়।
- মাটির সংযুতির উন্নতি ঘটায়।
- মাটির পানি ধারন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
- মাটিতে বায়ু চলাচল বৃদ্ধি করে।
(খ) রাসায়নিক সার
কলকারখানায় যে সকল সার তৈরি করা হয় তাদেরকে রাসায়নিক সার বলে। যেমন: ইউরিয়া, ডিএপি, জিপসাম, দস্তাসার।
কয়েকটি সারের নাম ও এদের সরবরাহকৃত পুষ্টি উপাদানের নাম নিম্নের ছকে তুলে ধরা হলো:
| সার | পুষ্টি উপাদান |
| ইউরিয়া | নাইট্রোজেন |
| টিএসপি | ফসফরাস, ক্যালসিয়াম |
| এমওপি | পটাশিয়াম |
| ডিএপি | নাইট্রোজেন, ফসফরাস |
| জিপসাম | সালফার, ক্যালসিয়াম |
| দস্তাসার | জিংক, সালফার |
রাসায়নিক সার প্রয়োগের সুবিধা
১। উদ্ভিদের প্রয়োজন অনুযায়ী মাটিতে সঠিক পরিমাণে পুষ্টি উপাদান যোগ করা যায়।
২। উদ্ভিদের পুষ্টি ঘাটতি দ্রুত মিটানোর জন্য রাসায়নিক সার খুবই কার্যকরী।
৩। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাসায়নিক সার প্রয়োগের অসুবিধা
১। সুষম পরিমাণে ব্যবহার না করলে মাটি ও ফসলের ক্ষতি যায়।
২। রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
৩। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে পরিবেশদূষণ ঘটে।
| কাজ: জৈব সার ও রাসায়নিক সারের নামের তালিকা তৈরি কর। |
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। প্রতিবছর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাই অল্প জমি থেকে বেশি পরিমাণে ফসল উৎপাদনের জন্য সার ব্যবহার একান্ত অপরিহার্য। তাই বাংলাদেশে সারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রধানত জৈব ও অজৈব এই দুই ধরনের সার ব্যবহার হচ্ছে। তবে কোন সার কী পরিমাণে প্রয়োগ করতে হবে সে ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন:
১। মাটির উর্বরতার অবস্থা।
২। উৎপাদিত ফসলের ধরন ও জাত।
৩। সার প্রয়োগের সময় ও পদ্ধতি।
৪। সার অপচয়ের মাত্রা।
৫। মাটির আর্দ্রতার অবস্থা।
| কাজ: 'কৃষি ফলনে সারের ভূমিকা' বিষয়ে দলগতভাবে আলোচনা করে উপস্থাপন কর। |
শূন্যস্থান পূরণ কর
১. উদ্ভিদের ……………… মাধ্যম হলো বীজ।
২. আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় ……………… অত্যাবশ্যক।
৩. ইউরিয়া ……………… সার।
৪. জৈব সার ……………… উর্বরতা বাড়ায়।
বাম পাশের সাথে ডান পাশের মিলকরণ
| বাম পাশ | ডান পাশ |
১. টিএসপি সার ২. ভূ-গর্ভস্থ সেচ ৩. বীজ উদ্ভিদের প্রধান মাধ্যম ৪. মাটি গঠনে বেশি থাকে ৫. কৃষিতাত্ত্বিক বীজ | বংশবিস্তার। খনিজ পদার্থ। মিষ্টি আলুর লতা। নলকূপ। ফসফরাস। |
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন
১. বেলে মাটিতে কী কী ফসল চাষ করা যায়?
২. বীজের গুণাবলি কী কী?
৩. কীভাবে বীজের জাত বিশুদ্ধতা রক্ষা করা যায়?
বর্ণনামূলক প্রশ্ন
১. মাটির গঠন উপাদানগুলো বর্ণনা কর।
২. বীজের বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ বর্ণনা কর।
৩. উদাহরণসহ সারের শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা কর।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. নিচের কোনটি উদ্ভিদতাত্ত্বিক বীজ?
ক. আদা
খ. ভুট্টা
গ. পাট
ঘ. সরিষা
২. ইউরিয়া সার থেকে উদ্ভিদ কোন খাদ্য উপাদান পায়?
ক. নাইট্রোজেন
খ. ফসফরাস
গ. সালফার
ঘ. পটাশিয়াম
৩. জীবদেহে পানির কাজ হচ্ছে-
i. পুষ্টি উপাদান কোষে পৌঁছানো
ii. দেহে তারল্য বজায় রাখা
iii. পাচকরস পরিবহনে সাহায্য করা
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
৪. অঙ্গ ব্যবহার করে বংশবিস্তার করা যায় কোন ফসলের?
ক. ধান, শসা, গম
খ. পাট, সরিষা, সয়াবিন
গ. ভুট্টা, মাষকলাই, বাদাম
ঘ. আখ, পটল, মিষ্টি আলু
নিচের অনুচ্ছেদটি পড় এবং ৫ ও ৬ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও
'ধলেশ্বরী' নদী তীরের বাসিন্দা মর্জিয়া বেগম দুগ্ধ খামার করে কাঙ্খিত পরিমাণে দুধের উৎপাদন পেলেন। তার গাভি দুটি সুস্থ ও সুন্দর মসৃণ চামড়ার অধিকারী। খামার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন যত্নের মধ্যে তিনি প্রতিদিন গাভি দুটিকে প্রয়োজনীয় পানি পান করাতেন।
৫. মর্জিয়া বেগম দুটি গাভিকে কত লিটার পানি দিতেন?
ক. ২০-৪০ লিটার
খ. ৬০-৮০ লিটার
গ. ৪০-৬০ লিটার
ঘ. ৮০-১০০ লিটার
৬. মর্জিয়া বেগমের গাভি দুটির মসৃণ চামড়া থাকার কারণ কোনটি?
ক. পরিমাণমত পানি পান করানো
খ. প্রয়োজনীয় দানাদার খাদ্য খাওয়ানো
গ. নির্দিষ্ট পরিমাণ কাঁচা ঘাস খাওয়ানো
ঘ. নিয়মিত গাভিগুলোকে গোসল করানো
সৃজনশীল প্রশ্ন
১. প্রত্যেক ফসল মাড়াই মৌসুমেই কৃষক মজিদের বাড়ির আঙ্গিনায় খড়কুটা, চিটা ও লতাপাতা ইত্যাদি আবর্জনায় ভরে যায়। এতে বাড়ির চারপাশের পরিবেশ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শক্রমে মজিদ উক্ত আবর্জনা সদ্ব্যবহারের পদ্ধতি গ্রহণ করলেন এবং তার কৃষিজমিতে এগুলো প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন।
ক. জৈব পদার্থ কাকে বলে?
খ. জমিতে ফসল উৎপাদন বুনটের উপর নির্ভরশীল। ব্যাখ্যা কর।
গ. মজিদ কীভাবে তার বাড়ির আবর্জনা সদ্ব্যবহার করবে? পদ্ধতিটি ব্যাখ্যা কর।
ঘ. মজিদের সিদ্ধান্তটি তার কৃষি কর্মকাণ্ডকে কীভাবে প্রভাবিত করবে তা বিশ্লেষণ কর।
২.
| গ্রুপ | মাটির কণার প্রকৃতি | মাটির প্রকার | ফসল/বৈশিষ্ট্য |
| ক | ৭০ ভাগ বালি | ? | ফুটি, বাঙ্গি, তরমুজ |
| খ | ৪০ ভাগ বালি | দোআঁশ | ? |
| গ | ৬০ ভাগ বালি | ? | ধান চাষের উপযোগী কর |
ক. মাটি কাকে বলে?
খ. জৈব পদার্থকে মাটির প্রাণ বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।
গ. ছকের গ্রুপ গ-এর মাটিকে কীভাবে ধান চাষের উপযোগী করা যায়, তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. ছকের কোন গ্রুপের মাটি ফসল চাষের জন্য উত্তম কারণ বিশ্লেষণ কর।