বেদের সাধারণ পরিচয় (পাঠ ২ ও ৩)

ধর্মগ্রন্থ - হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

559

বেদ হিন্দুদের আদি এবং প্রধান ধর্মগ্রন্থ। 'বেদ' শব্দের অর্থ জ্ঞান। জ্ঞান পবিত্র, বিচিত্র ও সুন্দর। এ জ্ঞান স্রষ্টা ও প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান। জ্ঞানের কি শেষ আছে? জ্ঞান কি চেষ্টা ছাড়া পাওয়া যায়? তার জন্য চেষ্টা করতে হয়, সাধনা করতে হয়। গভীর চিন্তায় ডুবে যাওয়া বা নিমগ্ন হওয়াকে বলে ধ্যান। ধ্যানে সত্যকে উপলব্ধি করা যায়। সত্য চিরন্তন, সনাতন। যা সনাতন তার অন্ত নেই। এ সত্য সৃষ্টি করা যায় না, এ সত্য গভীর ধ্যানের আলোকে দর্শন করা যায়- উপলব্ধি করা যায়।

প্রাচীনকালে যাঁরা সত্য বা জ্ঞান এবং স্রষ্টার মাহাত্ম্য দর্শন বা উপলব্ধি করতে পারতেন, তাঁদের বলা হতো ঋষি। বেদ এই ঋষিদের ধ্যানলব্ধ পবিত্র জ্ঞান। ধ্যানের মাধ্যমে ঋষিগণ সেই সত্য দর্শন করে তাকে ভাবের আবেগে প্রকাশ করেছেন। এ জন্যই বলা হয়, বেদ সৃষ্ট নয়, দৃষ্ট। অর্থাৎ বেদ কেউ সৃষ্টি করেননি, উপলব্ধি করেছেন মাত্র।

একক কাজ: ধর্মগ্রন্থ ও সাধারণ গ্রন্থের মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত কর।

বেদে বহু দেব-দেবীর বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন অগ্নি, সূর্য, ইন্দ্র, বিষ্ণু, বায়ু, বরুণ, রুদ্র, যম, ঊষা, বাক্, রাত্রি, সরস্বতী ইত্যাদি। তবে বেদে বলা হয়েছে, একই পরমাত্মা থেকে সকল দেব-দেবীর উদ্ভব। প্রত্যেকের গুণ ও শক্তি ভেদে তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন দেব-দেবী রূপে প্রকাশিত।
ঋষিগণ এই দেব-দেবীর মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন। তাঁদের স্তুতি বা প্রশংসা করেছেন এবং অসাধারণ শক্তি ও প্রভাবসম্পন্ন দেব-দেবীর কাছে ধন-সম্পদ, সুখ ও শান্তি প্রার্থনা করেছেন। ঋষিগণ বেদের দেবতাদের তিন ভাগে ভাগ করেছেন-

১. স্বর্গের দেবতা এঁদের ক্ষমতাই শুধু বোঝা যায়। এঁরা পৃথিবীতে নেমে আসেন না। যেমন- সূর্য, যম, বরুণ, প্রভৃতি।

২. অন্তরীক্ষের দেবতা: এঁদের উনাদের ক্ষমতা বোঝা যায়, দেখাও যায়। তাঁরা মর্ত্যে নেমে আসেন কিন্তু অবস্থান করেন না। যেমন- ইন্দ্র, বায়ু ইত্যাদি।
৩. মর্ত্যের দেবতা: যে সকল দেবতা মর্ত্যে বা পৃথিবীতে আসেন এবং অবস্থান করেন তাঁদের বলা হয় মর্ত্যের দেবতা। যেমন- অগ্নি দেবতা।

অগ্নিকে আমরা পৃথিবীতে দেখতে পাই। তাই তাঁর কাছে ভালো ভালো জিনিস উৎসর্গ করে তাঁরই মাধ্যমে অন্যান্য দেবতাদের নিকট প্রার্থনা জানানো হয়। এভাবে আগুন জ্বেলে বেদের মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবতাদের আহ্বান জানানো এবং এই প্রার্থনা করাকে যজ্ঞ বলা হয় ।

বেদের ছন্দোবদ্ধ বাক্যকে বলা হয় মন্ত্র। ঋষিরা বেদ থেকে মন্ত্র উচ্চারণ করে ধর্মানুষ্ঠান বা উপাসনা করেছেন। বৈদিক উপাসনা পদ্ধতি ছিল যজ্ঞ বা হোম করা। এছাড়া বেদের বাক্য সুর দিয়ে যজ্ঞের সময় গান করা হয়। বেদে রয়েছে এই রকম কিছু গান। এই গানকে বলা হতো সাম। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের বিচিত্র জ্ঞানের কথাও বেদে রয়েছে।

দলীয় কাজ: স্বর্গ, মর্ত্য ও অন্তরিক্ষের দেব-দেবীর একটি তালিকা তৈরি কর।

বেদের শ্রেণিবিভাগ
বিষয়বস্তু ও রচনা রীতির পার্থক্য সামনে রেখে বেদের শ্রেণিবিভাগ করেছেন মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। বেদকে তিনি বিভক্ত করেছেন বলে তাঁকে বলা হয়েছে বেদব্যাস। বেদকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ।

১. ঋগ্বেদ ঋক্ মানে মন্ত্র। ঋগ্বেদে রয়েছে স্তুতি ও প্রার্থনামূলক মন্ত্র। স্তুতি মানে প্রশংসা আর প্রার্থনা মানে কোনো কিছু চাওয়া। প্রার্থনা করে এক এক দেবতার কাছ থেকে এক এক বিষয় চাওয়া হয়। এখানে ১০৪৭২টি মন্ত্র রয়েছে। এগুলো পদ্যে বা ছন্দে রচিত যা এক ধরনের কবিতা। ঋগ্বেদ অগ্নি, ইন্দ্র, বিষ্ণু, ঊষা, রাত্রি প্রভৃতি দেব-দেবীর স্তুতি ও প্রার্থনামূলক মন্ত্রের সংগ্রহ।
২. সামবেদ সাম মানে গান। এই বেদে সংগৃহীত হয়েছে গান। যজ্ঞ করার সময় কোনো কোনো ঋক বা মন্ত্র আবৃত্তি না করে সুর করে গাওয়া হতো। যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্যে এই গান গাওয়া হয়। সামবেদে সর্বমোট ১৮১০টি মন্ত্র আছে।

৩. যজুর্বেদ যজুঃ মানে যজ্ঞ। যজুর্বেদে রয়েছে এমন কিছু মন্ত্র যেগুলো যজ্ঞ করার সময় উচ্চারিত হয়। এখানে যজ্ঞের নিয়ম পদ্ধতিও বর্ণিত হয়েছে। এটি কৃষ্ণ যজুর্বেদ ও শুক্ল যজুর্বেদ নামে দুভাগে বিভক্ত। দুটিতে মোট ৪০৯৯টি মন্ত্র রয়েছে।
৪. অথর্ববেদ চিকিৎসা বিজ্ঞান, বাস্তুকলা, ইত্যাদি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের জ্ঞান নিয়ে সংকলিত হয়েছে অথর্ববেদ। এখানে প্রায় ৬০০০টি মন্ত্র রয়েছে। এই যে বেদের চারটি ভাগ, এর একেকটি ভাগকে সংহিতা বলা হয়েছে। যেমন- ঋগ্বেদ সংহিতা, সামবেদ সংহিতা, যজুর্বেদ সংহিতা এবং অথর্ববেদ সংহিতা।

একক কাজ: ছকে প্রদত্ত বেদ-এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কমপক্ষে দুটি বাক্য লিখে ছক পূরণ কর।

ঋগ্বেদ

সামবেদ

যজুর্বেদ

অথর্ববেদ

নতুন শব্দ: নিমগ্ন, উপলব্ধি, সনাতন, ধ্যানলব্ধ, দৃষ্ট, মাহাত্ম্য, অন্তরীক্ষ, মর্ত্য, স্তুতি, ঋক্, সাম, যজুঃ, সংহিতা, বাস্তুকলা।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...