আদর্শ জীবনচরিত (সপ্তম অধ্যায়)

হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

407

ভারতবর্ষে অনেক মহাপুরুষ ও মহীয়সী নারী জন্মগ্রহণ করেছেন। আজীবন তাঁরা জগতের কল্যাণ করেছেন। মানুষের মঙ্গল করেছেন। তাঁদের জীবনী থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। আমাদের জীবন সুন্দরভাবে গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারি। তাই তাঁদের জীবনী আমাদের কাছে আদর্শ জীবনচরিত হিসেবে বিবেচ্য। এ অধ্যায়ে পাঁচজন আদর্শ মহাপুরুষ এবং মহীয়সী নারীর জীবনচরিত বর্ণনা করা হলো। তাঁরা হলেন শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, রাণী রাসমণি, শ্রীরামকৃষ্ণ ও বামাক্ষেপা।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • শ্রীকৃষ্ণের শৈশবকালের জীবনাদর্শ বর্ণনা করতে পারব
  • নৈতিক চরিত্র গঠনে শ্রীকৃষ্ণের জীবনাদর্শের শিক্ষা ব্যাখ্যা করতে পারব
  • নৈতিকতা গঠনে শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবনাদর্শের শিক্ষা বর্ণনা করতে পারব
  • রাণী রাসমণির জীবনাদর্শ সম্পর্কে জানতে পারব
  • রাণী রাসমণির সংস্কারমূলক কার্য বর্ণনা করতে পারব
  • নৈতিক চরিত্র গঠনে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনাদর্শ বর্ণনা করতে পারব
  • নৈতিক চরিত্র গঠনে বামাক্ষেপার জীবনাদর্শ বর্ণনা করতে পারব
  • মহাপুরুষ ও মহীয়সী নারীদের জীবনাদর্শের শিক্ষা নিজ জীবনাচরণে মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ হব
  • পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত মহাপুরুষ-মহীয়সী নারীদের জীবনী ও অবদান সম্পর্কে অনুসন্ধান পরিচালনা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী কণার বাড়ির পাশে একটি বিড়াল ছানা অসহায়ভাবে পড়ে আছে দেখে তার মায়া হয়। সে এটিকে বাড়িতে নিয়ে আসে এবং আদর যত্নে বড় করে তোলে। বিড়ালটি এখন কণার খুবই ভক্ত।

ভক্তিই মুক্তির পথ
শ্রদ্ধাই মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ
জীবসেবাই ঈশ্বরের সেবা
কর্তব্যনিষ্ঠা মানুষকে মহান করে তোলে

শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান- 'কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্'। জগতের কল্যাণের জন্য তিনি মানবরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দুষ্টকে দমন করে তিনি শিষ্টকে পালন করেছিলেন। আমরা এখানে শ্রীকৃষ্ণের শৈশবকালের কর্মকান্ড সম্পর্কে জানব।
তখন দ্বাপর যুগ। মথুরায় রাজত্ব করতেন রাজা কংস। তিনি ছিলেন ভীষণ অত্যাচারী। নিজের পিতা উগ্রসেনকে বন্দী করে সিংহাসন দখল করেন।
কংসের খুড়তুত বোন দেবকী। পরমা সুন্দরী। দেবকীকে কংস খুব ভালোবাসেন। তাই আদর করে রাজা শূরের পুত্র বসুদেবের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। বসুদেব ছিলেন পরম ধার্মিক ও রূপবান। বসুদেবের সঙ্গে বোনের বিয়ে হওয়ায় কংস খুব খুশি। নিজে রথ চালিয়ে তিনি তাঁদের রাজ্যে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। এমন সময় দৈববাণী হলো- 'শোন কংস, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান তোমায় হত্যা করবে।'
এ-কথা শুনে কংস ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। তিনি তরবারি দিয়ে দেবকীকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। তখন বসুদেব মিনতি করে বললেন, 'আপনি ওকে হত্যা করবেন না। আমরা আমাদের প্রতিটি সন্তানকে জন্মমাত্র আপনার হাতে তুলে দেব।'
বসুদেবের কথায় কংস শান্ত হলেন। তিনি রাজধানীতে ফিরে বসুদেব ও দেবকীকে কারাগারে আটকে রাখলেন। একে একে তাঁদের ছয়টি পুত্র সন্তান হলো। বসুদেব তাদেরকে কংসের হাতে তুলে দিলেন। কংস তাদের পাথরে আছড়ে হত্যা করলেন।
দেবকীর সপ্তম সন্তান বলরাম। ভগবান তাঁকে দেবকীর গর্ভ থেকে বসুদেবের প্রথম স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে নিয়ে যান।
দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান শ্রীকৃষ্ণ। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে তাঁর জন্ম। সেদিন প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। বসুদেব তাকিয়ে দেখলেন কারাকক্ষের দরজা খোলা। কারারক্ষীরা সব ঘুমে অচেতন। কোথাও কেউ জেগে নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঐ অবস্থায়ই বসুদেব শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে, নদী পার হয়ে, গোকুলে চলে গেলেন। সেখানেও সবাই ঘুমে অচেতন। তিনি নন্দরাজার বাড়িতে ঢুকলেন। তাঁর স্ত্রী যশোদার পাশে কেবল জন্ম নেয়া একটি মেয়ে শিশু ঘুমাচ্ছে। বসুদেব মেয়েটিকে কোলে নিয়ে নিজের পুত্রকে সেখানে রাখলেন। তারপর দ্রুত চলে এলেন কংসের কারাগারে। মেয়েটিকে শুইয়ে দিলেন দেবকীর পাশে।

কারাগারের দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল। কারারক্ষীরা জেগে উঠলেন। পরের দিন প্রভাতে সবাই দেখল, দেবকীর এক মেয়ে হয়েছে। কংস এসে যখন মেয়েটিকে আছড়ে মারতে গেলেন, তখন সে হঠাৎ আকাশে উঠে গেল এবং কংসকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।'
এ-কথা শুনে কংস ভয়ে চমকে উঠলেন। ক্রোধে ক্ষিপ্তও হলেন। তিনি তক্ষুনি আদেশ দিলেন গোকুলে যত শিশু আছে সবাইকে মেরে ফেলতে।
কংসের আদেশে পূতনা রাক্ষসীকে ডাকা হলো এবং তাকে বলা হলো গোকুলের সমস্ত শিশুকে মেরে ফেলতে হবে। বিনিময়ে তাকে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হবে।

স্বর্ণমুদ্রার লোভে পূতনা এক সুন্দরী নারীর রূপ ধরে গোকুলে চলল। প্রথমেই গেল নন্দরাজের বাড়ি। কেঁদে কেঁদে যশোদাকে বলল, 'মা, আমি বড়ই দুঃখিনী। আমার দুধের শিশু মারা গেছে। আমার কোনো টাকা-পয়সা চাইনে। দুবেলা দুটো খেতে দিও। বিনিময়ে আমি তোমার শিশুপুত্রকে পালন করব।'
পূতনার কথায় যশোদার মায়া হলো। তিনি পূতনাকে কাজে রাখলেন। একদিন পূতনা কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে বাইরে গেল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। তখন নিজের স্তন কৃষ্ণের মুখে ঢুকিয়ে দিল। স্তনে মাখানো ছিল তীব্র বিষ। তার ধারণা ছিল, এই বিষে কৃষ্ণের মৃত্যু হবে। কিন্তু কৃষ্ণ তো ভগবান। শিশু হলেও তিনি সবই বুঝতে পারলেন। তাই পূতনার স্তনে এমন টান দিলেন যে, তাতে পূতনারই মৃত্যু হলো। এভাবে পূতনাকে বিনাশ করে তিনি গোকুলের শত শত শিশুকে বাঁচালেন।
পূতনার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কংস খুবই চিন্তিত হলেন। তিনি ভাবলেন, কোনো নারীর পক্ষে কৃষ্ণকে মারা সম্ভব নয়। তাই তিনি তাঁর এক শক্তিশালী পুরুষ অনুচরকে ডাকলেন। তাকে সব বুঝিয়ে বললেন। অনুচর বলল, 'মহারাজ, চিন্তা করবেন না। আজ সূর্যাস্তের মধ্যেই আপনি শত্রুর মৃত্যু সংবাদ পাবেন।' এই বলে অনুচর গোকুলের দিকে চলল। সোজা গিয়ে উঠল নন্দরাজের বাড়িতে। মা যশোদা তখন একটা শকট বা গাড়ির নিচে কৃষ্ণকে শুইয়ে রেখে কাজ করছিলেন। এই সুযোগে অনুচর শকট চাপা দিয়ে কৃষ্ণকে মারতে এগিয়ে গেল। কৃষ্ণ তার মনোভাব বুঝতে পারলেন। তাই সজোরে এক লাথি মারলেন। ফলে শকটের চাপে অনুচর মারা গেল। এভাবে কৃষ্ণ কংসের অনুচরের হাত থেকেও গোকুলের শিশুদের রক্ষা করলেন।
এবার কংস তৃণাবর্ত নামক এক অসুরকে পাঠালেন কৃষ্ণকে মারার জন্য। তৃণাবর্ত গোকুলে গিয়ে প্রচন্ড ঘূর্ণিবায়ুর সৃষ্টি করল। সমস্ত গোকুল ভীষণ ঝড়ে অন্ধকার হয়ে গেল। তৃণাবর্তের উদ্দেশ্য কৃষ্ণকে অনেক উঁচুতে তুলে আছড়ে মারবে। ঘূর্ণিবায়ুর ফলে কৃষ্ণ অনেক উঁচুতে উঠে এলেন বটে। কিন্তু তাঁকে আছাড়
মারার আগে তিনিই তৃণাবর্তের বুকে দিলেন ভীষণ চাপ। ফলে মটিতে পড়ে সে মারা গেল। এভাবে শ্রীকৃষ্ণ শৈশব অবস্থায়ই দুষ্টের দমন করে শিষ্টের পালন করেছেন।

শ্রীকৃষ্ণের জীবনী থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষা পাই যে, ভগবান সর্বদা দুষ্টের দমন করেন এবং শিষ্টের পালন করেন। মানবরূপে জন্ম নিয়ে তিনি দুর্জনদের হত্যা করে জগতের মঙ্গল করেন। ভগবান সহায় থাকলে দুষ্টরা কিছু করতে পারেনা। তিনিই সবাইকে রক্ষা করেন। তাই আমরা সবাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ভক্তি করব। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণে সাহসী ভূমিকা নিয়ে শিশুদের কল্যাণে এগিয়ে যাব।

একক কাজ: শ্রীকৃষ্ণের শৈশবকালের একটি ঘটনা লেখ।

নতুন শব্দ : স্বয়ম্, শিষ্ট, দৈববাণী, ঘুটঘুটে, কারাগার, কারারক্ষী, ক্ষিপ্ত, পূতনা, শকট, ঘূর্ণিবায়ু।

Content added By

পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা। এর অন্তর্গত বারাসাত মহকুমার একটি গ্রাম চাকলা। এ গ্রামেই ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দে লোকনাথের জন্ম। পিতা রামকানাই চক্রবর্তী এবং মাতা কমলা দেবী।
লোকনাথ ছিলেন তাঁর পিতা-মাতার চতুর্থ পুত্র। রামকানাইর বড়ই ইচ্ছা- তাঁর একটি পুত্র সন্ন্যাস গ্রহণ করুক। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে বংশ পবিত্র করুক।
পিতার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য লোকনাথ এগিয়ে এলেন। তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করবেন। এ-কথা শুনলেন লোকনাথের বন্ধু বেণীমাধব চক্রবর্তী। তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন সন্ন্যাস নেবেন। আচার্য ভগবান গাঙ্গুলী হলেন তাঁদের গুরু। তিনি ছিলেন একজন যোগী পুরুষ। তিনি তাঁদের দীক্ষা দিলেন। তারপর একদিন দুই বালক ব্রহ্মচারীকে নিয়ে তিনি গৃহত্যাগ করলেন।
প্রথমে তাঁরা গেলেন কোলকাতার কালীঘাটে। কালীঘাট তখন সাধন-ভজনের এক পবিত্র অরণ্যভূমি। গুরুর তত্ত্বাবধানে লোকনাথ ও বেণীমাধব কঠোর সাধনায় রত হলেন। এভাবে তাঁদের ২৫ বছর কেটে গেল। তারপর তাঁরা গেলেন কাশীধামে। গুরু ভগবান গাঙ্গুলী তখন বৃদ্ধ। শরীর খুবই দুর্বল। তাই তিনি কাশীধামের পরম সাধক হিতলাল মিশ্রের হাতে লোকনাথ ও বেণীমাধবকে তুলে দিলেন। তারপর গঙ্গার ঘাটে গিয়ে তিনি যোগবলে দেহত্যাগ করেন।
হিতলাল মিশ্র লোকনাথ ও বেণীমাধবকে নিয়ে চলে যান হিমালয়ে। সেখানে দীর্ঘকাল কঠোর সাধনা করে দুজনেই সিদ্ধিলাভ করেন। যোগবিভূতির অধিকারী হন। এরপর তাঁরা দেশ পরিভ্রমণে বের হন। আফগানিস্তান মক্কা, মদিনা, চীন প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করে তাঁরা হিমালয়ে ফিরে আসেন। হিতলাল তখন বলেন, 'আমার সাথে আর তোমাদের থাকার প্রয়োজন নেই। তোমরা নিজভূমিতে যাও। সেখানে তোমাদের কাজ করতে হবে।'
এবার দুই বন্ধুর বিচ্ছিন্ন হবার পালা। বেণীমাধব গেলেন ভারতের কামাখ্যার দিকে। আর লোকনাথ এলেন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। এখান থেকেই লোকনাথের লোকসেবা ও সাধনার নতুন জীবনের শুরু।

দাউদকান্দিতে লোকনাথ একদিন এক বটগাছের নিচে বসে ধ্যান করছেন। এমন সময় ভেঙ্গু কর্মকার নামে এক দরিদ্র লোক এসে তাঁর পা জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, 'বাবা, আমাকে রক্ষা করুন। আমি এক ফৌজদারি মামলায় পড়েছি। রেহাই পাবার উপায় নেই।'

ভেঙ্গুকে দেখে লোকনাথের দয়া হলো। তিনি যে সর্বজীবের মধ্যেই ব্রহ্মকে খুঁজতেন। সর্বজীবের মঙ্গল সাধনই ছিল তাঁর সাধনার লক্ষ্য। তাই তিনি ভেঙ্গুকে অভয় দিয়ে বললেন, 'যা, তুই মুক্তি পাবি।' ভেঙ্গু ঠিকই মুক্তি পেলেন। তাই খুশি হয়ে তিনি লোকনাথকে তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন। লোকনাথ সেখানে কিছুদিন থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদী গ্রামে চলে গেলেন।

বারদীর জমিদার তখন নাগবাবু। তিনি একবার লোকনাথের কৃপায় মামলায় জয়লাভ করেন। তাই তিনি বারদী গ্রামে লোকনাথের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। ক্রমে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় লোকনাথের আশ্রম। দলে- দলে ভক্তরা আসতে থাকেন। লোকনাথের অলৌকিক শক্তির প্রভাবে অনেক রুগ্ন মানুষ সুস্থ হন। অনেকে বিপদ থেকে উদ্ধার পান। পাপী- তাপী মুক্তি লাভ করেন। সাধকেরা সিদ্ধি লাভ করেন। এভাবে লোকনাথ 'বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী' হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দেশ-বিদেশে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
লোকনাথ জাতি, ধর্ম বা বর্ণের বিচার করতেন না। তাঁর কাছে সব মানুষই ছিল সমান। তাঁকে এক গোয়ালিনী দুধ দিতেন। লোকনাথ তাঁকে মা বলে ডাকতেন। লোকনাথের অনুরোধে গোয়ালিনী শেষে আশ্রমেই থাকতেন।

লোকনাথ শুধু মানুষ নয়, জীবজন্তু ও পশুপাখিকেও সমানভাবে ভালোবাসতেন। তাঁর আশ্রমে অনেক পশুপাখি থাকত। তিনি নিজের হাতে তাদের খাবার দিতেন। পাখিরা নির্ভয়ে তাঁর গায়ে এসে বসত। আসলে তিনি সব জীবের মধ্যেই ব্রহ্মের উপস্থিতি উপলব্ধি করতেন। তিনি মনে করতেন, ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ বিকাশ কল্যাণতম রূপে। তিনি বলতেন, 'যত্তে রূপং কল্যাণতমং তৎ তে পশ্যামি।'- আমি তোমার কল্যাণতম রূপই প্রত্যক্ষ করি। তাই জীবের কল্যাণ করে তিনি যে আনন্দ পেতেন, সেটাই ছিল তাঁর ব্রহ্মানন্দ।
বাবা লোকনাথ ছিলেন অশেষ কৃপাবান মহাপুরুষ। তাই তিনি সংসারী লোকদের প্রতি পরম আশ্বাসের বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন,

'রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়িবে,
আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।'

এই পরম পুরুষ বাবা লোকনাথ ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে বারদীর আশ্রমে পরলোক গমন করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ১৬০ বছর।

লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবনী থেকে আমরা এই নৈতিক শিক্ষা পাই যে, পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। মানুষ, পশু-পাখি সকল জীবকে ভালোবাসতে হবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ কোনরূপ ভেদাভেদ করা যাবে না। সমাজের উঁচু-নীচু সবাইকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। ব্রহ্মজ্ঞানে জীবের সেবা করতে হবে। সকলের মধ্যে যে আত্মা আছে, তার সঙ্গে নিজের আত্মাকে এক করে দেখতে হবে। তবেই ব্রহ্মলাভ হবে।

একক কাজ: শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর লোকসেবার একটি ঘটনা লিখ

নতুন শব্দ: ব্রহ্মচারী, যোগীপুরুষ, ফৌজদারি, পশ্যামি, ব্রহ্মজ্ঞান।

Content added By

রাণী রাসমণি ছিলেন এক মহীয়সী নারী। গরিবের ঘরে জন্ম হলেও এক জমিদারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ফলে তিনি সত্য সত্যিই রানির পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু রানি হলে কী হবে? তিনি কখনও বিলাসী জীবন যাপন করেননি। আজীবন ধর্মচর্চা ও জনকল্যাণমূলক কাজ করে গেছেন। এজন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে রাণী রাসমণি কোলকাতার উত্তরে গঙ্গার পূর্বতীরে হালিশহরের নিকট কোনা নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম হরেকৃষ্ণ দাস। মাতার নাম রামপ্রিয়া দাসী। হরেকৃষ্ণ দাসের পেশা ছিল গৃহ-নির্মাণ ও কৃষিকাজ। জন্মের পর মা রামপ্রিয়া মেয়ের নাম রাখেন রাণী। পরে তাঁর নাম হয় রাসমণি। আরও পরে দুটি নাম একত্রিত হয়ে প্রতিবেশীদের কাছে তিনি রাণী রাসমণি নামে পরিচিত হন। ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের চার কন্যা- পদ্মামণি, কুমারী, করুণা এবং জগদম্বা।
রাজচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত কর্মকুশল। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন বুদ্ধিমতী স্ত্রী রাসমণি। কিন্তু ব্যবহারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। এর ফলে তাঁর সাফল্য আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। পিতার মুত্যুর পর রাজচন্দ্র বিশাল সম্পদের অধিকারী হন।
রাজচন্দ্র নিজে ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল স্ত্রী রাসমণির অনুপ্রেরণা। ফলে এই জমিদার পরিবার জনকল্যাণের জন্য অনেক কাজ করে গেছেন। ১২৩০ (১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ) সালের বন্যায় বাংলার অনেক পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। রাণী রাসমণি তাদের সাহায্যের জন্য বহু অর্থ ব্যয় করেন। ঐ বছরই রাসমণির পিতা পরলোক গমন করেন। রাসমণি কন্যার কর্তব্য অনুসারে পিতার পারলৌকিক ক্রিয়া করার জন্য গঙ্গার ঘাটে যান।
কিন্তু যাতায়াতের রাস্তা এবং গঙ্গার ঘাটের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। তাই জনগণের সুবিধার কথা চিন্তা করে রাণী স্বামীকে অনুরোধ করেন সংস্কারের জন্য। রাজচন্দ্র বহু টাকা খরচ করে 'বাবু ঘাট' ও 'বাবু রোড' নির্মাণ করান।

রাজচন্দ্র ও রাসমণির দাম্পত্য জীবন খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে রাজচন্দ্র ইহলোক ত্যাগ করেন। এর ফলে জমিদারির সমস্ত দায়িত্ব পড়ে রাণী রাসমণির ওপর। কিন্তু জমিদারির পাশাপাশি তিনি জনকল্যাণ ও ধর্মচর্চা সমানভাবে করে গেছেন।
১২৪৫ (১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) সালে রাণী রাসমণি ১,২২,১১৫ টাকা খরচ করে একটি রূপার রথ তৈরি করান। তাতে জগন্নাথ দেবকে বসিয়ে রথযাত্রার দিন পরিবারের লোকজনকে নিয়ে কোলকাতার রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করেন।

একবার তিনি পুণ্যভূমি জগন্নাথ ক্ষেত্রে যান। সেখানকার রাস্তাঘাট ছিল জরাজীর্ণ। তীর্থযাত্রীদের খুব কষ্ট হতো চলাফেরা করতে। রাসমণি তাঁদের সুবিধার কথা চিন্তা করে সমস্ত রাস্তা সংস্কার করে দেন শুধু তা-ই নয়। ষাট হাজার টাকা ব্যয় করে তিনি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এই তিন বিগ্রহের জন্য হীরক খচিত তিনটি মুকুটও তৈরি করিয়ে দেন।
রাণী রাসমণি অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো গঙ্গার জলকর বন্ধ করা। একবার ইংরেজ সরকার গঙ্গায় মাছ ধরার জন্য জেলেদের ওপর কর আরোপ করেন। নিরুপায় জেলেরা তখন রাসমণির শরণাপন্ন হন। রাসমণি সরকারকে দশ হাজার টাকা কর দিয়ে মুসুড়ি থেকে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত সমস্ত গঙ্গা জমা নেন এবং রশি টানিয়ে জাহাজ ও নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে সরকার আপত্তি তোলেন। উত্তরে রাণী বলেন যে, নদীতে জাহাজ চলাচল করলে মাছ অন্যত্র চলে যাবে। এতে জেলেদের ক্ষতি হবে। এ অবস্থায় সরকার রাণীকে তাঁর টাকা ফেরত দেন এবং জলকর তুলে নেন।
রাণী তাঁর প্রজাদের সন্তানের ন্যায় প্রতিপালন করতেন। একবার এক নীলকর সাহেব মকিমপুর পরগণায় প্রজাদের ওপর উৎপীড়ন শুরু করেন। এ-কথা রাণী শুনতে পান এবং তাঁর হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়। তিনি প্রজাদের উন্নতিকল্পে এক লক্ষ টাকা খরচ করে 'টোনার খাল' খনন করান। এর ফলে মধুমতী নদীর সঙ্গে নবগঙ্গার সংযোগ সাধিত হয়। এছাড়া সোনাই, বেলিয়াঘাটা ও ভবানীপুরে বাজার স্থাপন এবং কালীঘাট নির্মাণ তাঁর অনন্য কীর্তি।

ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে রাণী রাসমণির সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি দক্ষিণেশ্বরে মন্দির স্থাপন। রাণী একদিন বিশ্বেশ্বর দর্শনের জন্য কাশীধামে যাওয়া স্থির করেন। যাত্রার পূর্বরাত্রে মা কালী তাঁকে স্বপ্নে বলেন, 'কাশী যাওয়ার আবশ্যকতা নেই, গঙ্গার তীরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা ও ভোগের ব্যবস্থা করো। আমি ঐ মূর্তিকে আশ্রয় করে আবির্ভূত হয়ে তোমার নিকট থেকে নিত্য পূজা গ্রহণ করব।' মায়ের এই আদেশ পেয়ে রাসমণি গঙ্গার তীরে জমি কিনে মন্দির নির্মাণ করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের অগ্রজ রামকুমারকে পুরোহিত নিয়োগ করা হয়। রাণী সেখানে প্রতিদিন পূজা দিতেন। রামকুমারের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণ স্বয়ং পুরোহিতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কারণেই ঐ মন্দির আজ দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির নামে খ্যাত। এখানেই রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাণী রাসমণি ইহধাম ত্যাগ করেন।
রাণী রাসমণির জীবনী থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষা লাভ করতে পারি যে, মানুষের জন্মের চেয়ে তার কর্মই বড়। জন্ম যেখানেই হোক, কর্মের দ্বারা মানুষ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। এটাই প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। সম্পদকে মানুষের সেবায় লাগাতে হবে। শুধু নিজের সুখই নয়, অপরের সুখের জন্যও সম্পদ ও ক্ষমতার ব্যবহার করতে হবে। কর্মের অবসরে ধর্মচর্চায় মন দিতে হবে। তাতে দেহ-মন শুদ্ধ হয়, পবিত্র হয়। এভাবে ধর্মচর্চা ও জনসেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারলে জীবন সার্থক হয়।

দলীয় কাজ: রাণী রাসমণির সংস্কারমূলক কাজ চিহ্নিত করে একটি পোস্টার তৈরি কর।
Content added By

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার কামারপুকুর গ্রামে শ্রীরামকৃষ্ণের জন্ম ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি। তাঁর পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা চন্দ্রমণি দেবী। ক্ষুদিরাম শিশুপুত্রের নাম রাখেন গদাধর। এই গদাধরই পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস নামে জগদ্বিখ্যাত হন।
বালক গদাধর দেখতে ছিলেন খুবই সুন্দর। সদা প্রসন্ন ভাব তাঁর। প্রকৃতিকে খুবই ভালোবাসতেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করত। আকাশে উড়ন্ত বলাকার ঝাঁক দেখে মাঝে মাঝে তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়তেন। বাঁধাধরা লেখাপড়ায় তাঁর মন ছিলনা। কিন্তু ভজন-কীর্তনের প্রতি খুব আকর্ষণ ছিল। লোকমুখে শুনে শুনে তিনি বহু স্তব-স্তোত্র এবং রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন।

পিতার মৃত্যুর পর গদাধরের জীবনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। তিনি কখনও শ্মশানে গিয়ে বসে থাকেন। কখনও বা নির্জনে আম বাগানে গিয়ে সময় কাটান। সাধু-বৈষ্ণবদের দেখলে কৌতূহল ভরে তাঁদের আচরণ লক্ষ করেন। তাঁদের নিকট ভজন শেখেন।
এক সময় গদাধর দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে আসেন। তাঁর বড় ভাই রামকুমার মন্দিরের পুরোহিত। গদাধর কখনও কখনও মায়ের মন্দিরে ভাবতন্ময় হয়ে থাকেন। কখনও আবার আত্মমগ্ন অবস্থায় গঙ্গাতীরে ঘুরে বেড়ান।
রামকুমারের মৃত্যুর পর গদাধর মায়ের পূজার ভার গ্রহণ করেন। এখানেই তাঁর সাধন জীবনের শুরু। তিনি ভবতারিণীর পূজায় মন-প্রাণ ঢেলে দেন। মাকে শোনান রামপ্রসাদী আর কমলাকান্তের গান। 'মা', 'মা' বলে আকুল হয়ে যান। তাঁর আকুল আহ্বানে একদিন মা ভবতারিণী জ্যোতির্ময়ী রূপে আবির্ভূত হন।

এ-সময় গদাধরের জীবনে ঘটে আর এক পরিবর্তন। ভাবের আবেশে তিনি উন্মাদের ন্যায় আচরণ করেন। ক্রমে ক্রমে তাঁর উন্মাদনা বেড়ে যায়। এ খবর পেয়ে মা চন্দ্রমণি তাঁকে বাড়ি নিয়ে যান এবং রাম মুখুজ্যের মেয়ে সারদাদেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন।
বিয়ের অল্প কিছুদিন পরেই গদাধর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে আসেন। আবার তাঁর মধ্যে দিব্যোন্মাদনার ভাব দেখা দেয়। এ-সময় অর্থাৎ ১৮৬১ সালের শেষভাগে সিদ্ধা ভৈরবী যোগেশ্বরী দক্ষিণেশ্বরে আসেন। গদাধর তাঁকে গুরু মানেন এবং তান্ত্রিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। এই ভৈরবীই গদাধরকে অসামান্য যোগী এবং অবতার পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেন।

এরপর গদাধরের সাধন জীবনে আসেন সন্ন্যাসী তোতাপুরী। সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষিত করে তিনি গদাধরের নাম রাখেন শ্রীরামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণ হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সাধনপথ শাক্ত, বৈষ্ণব, তান্ত্রিক প্রভৃতি মতে সাধনা করেন। এমনকি ইসলাম ও খ্রিষ্ট ধর্মমতেও সাধনা করেন। সব ক্ষেত্রেই তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। তিনি বলেন, 'নিষ্ঠার সঙ্গে সাধনা করলে সব পথেই ঈশ্বরকে লাভ করা যায়।' তাঁর উপলব্ধ সত্য হলো, 'যত মত তত পথ'। অর্থাৎ পথ বহু হলেও লক্ষ্য এক ঈশ্বর লাভ।
শ্রীরামকৃষ্ণের এই সাধনা ও তাঁর পরমতসহিষ্ণুতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ফলে অনেক জ্ঞানী-গুণী দক্ষিণেশ্বরে আসতে লাগলেন। তিনি তাঁদের গল্পের মাধ্যমে অনেক জটিল তত্ত্ব বুঝিয়ে দিতেন।
প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণরাও আসতে লাগলেন। একদিন এলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি ঈশ্বর দেখেছেন এমন একজন ব্যক্তিকে খুঁজছিলেন। নরেন্দ্রনাথ সরাসরি শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কি ঈশ্বর দেখেছেন?' উত্তরে শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, 'হ্যাঁ, নিশ্চয় দেখেছি। এই তোকে যেমন দেখছি। তোকেও দেখাতে পারি।' নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় ঈশ্বর দর্শন করে ধন্য হলেন এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্মে নিজেকে সমর্পণ করলেন। এই নরেন্দ্রনাথই হলেন শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।
পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী শুধু মুখের কথা নয়, সেগুলো তাঁর জীবনচর্চায় রূপায়িত সত্য। তিনি অহংকারশূন্য হয়ে জীবকে শিবজ্ঞানে সেবা করেছেন। জীবসেবার আদর্শে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট এই মহাপুরুষ পরলোক গমন করেন।

শ্রীরামকৃষ্ণের কয়েকটি উপদেশ:
১. পিতাকে ভক্তি কর, পিতার সঙ্গে প্রীতি কর। জগৎরূপে যিনি সর্বব্যাপী হয়ে আছেন, তিনিই মা। জননী, জন্মস্থান, বাপ-মাকে ফাঁকি দিয়ে যে ধর্ম করবে, তার ধর্ম ছাই হয়ে যাবে।
২. মা গুরুজন, ব্রহ্মময়ী-স্বরূপা। যতক্ষণ মা আছেন, মাকে দেখতে হবে।
৩. একমাত্র ভক্তির দ্বারা জাতিভেদ উঠে যেতে পারে। ভক্তের জাতি নেই। ভক্তি হলেই দেহ, মন, আত্মা সব শুদ্ধ হয়।
৪. ছাদের উপর উঠতে হলে মই, বাঁশ, সিঁড়ি ইত্যাদি নানা উপায়ে যেমন ওঠা যায়, তেমনি এক ঈশ্বরের কাছে যাবার অনেক উপায় আছে। প্রত্যেক ধর্মই এক একটি উপায়।
৫. আন্তরিক হলে সব ধর্মের ভেতর দিয়েই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়। ঈশ্বরের কাছে নানা পথ দিয়ে পৌঁছানো যায়। 'যত মত তত পথ'।
শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষা পাই যে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে। ঈশ্বরজ্ঞানে জীবের সেবা করতে হবে। পিতা, মাতা এবং জন্মভূমিকে শ্রদ্ধা করতে হবে। সকল ধর্মকেই শ্রদ্ধা করতে হবে। তাহলে আর ধর্মীয় সংঘাত দেখা দেবে না। সকল ধর্মেরই লক্ষ্য এক- ঈশ্বর লাভ। সকল ধর্মে ভক্তি থাকলে জাতিভেদ থাকবে না। ভক্তের কোনো জাতি নেই। ভক্তিতে দেহ, মন, আত্মা শুদ্ধ হয়। আমরা সকলে শ্রীরামকৃষ্ণের এই জীবনাদর্শ অনুসরণ করব।

একক কাজ : শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ তুমি কীভাবে মেনে চলবে তাঁর একটি তালিকা তৈরি কর।

নতুন শব্দ : পরমহংস, আবেশ, মুগ্ধ, দিব্যোন্মাদনা, শাক্ত, বৈষ্ণব, তান্ত্রিক, সিদ্ধিলাভ, শ্রীপাদপদ্ম, ব্রহ্মময়ী, সংঘাত।

Content added By

বামাক্ষেপা ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ সাধক। তিনি তান্ত্রিক মতে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁর সাধনার স্থল ছিল তারাপীঠ। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় তারাপীঠ অবস্থিত। এখানে আরও অনেক তন্ত্রসাধক সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন। যেমন- আনন্দনাথ, কৈলাসপতি প্রমুখ। তারাপীঠ হিন্দুদের একটি বিশিষ্ট তীর্থস্থান।

তারাপীঠের নিকটে অটলা গ্রাম। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে শিব চতুর্দশী তিথিতে বামাক্ষেপা এখানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায়, মাতা রাজকুমারী দেবী। বামাক্ষেপা তাঁর পিতা-মাতার দ্বিতীয় সন্তান।
প্রথম সন্তান জয়কালী। এছাড়া দুর্গাদেবী, দ্রবময়ী ও সুন্দরী নামে তাঁর আরও তিন বোন এবং রামচন্দ্র নামে এক ভাই ছিলেন। বামাক্ষেপার আসল নাম বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়। পরে তারামায়ের সাধনায় তাঁর ক্ষেপামি বা একরোখা ভাব দেখে সবাই তাঁকে বামাক্ষেপা বলেই ডাকতেন। পিতা সর্বানন্দ খেত-খামারে কাজ করতেন। এতে যে সামান্য আয় হতো, তাতেই তাঁর সংসার কোনো রকমে চলে যেত। সর্বানন্দ ছিলেন বড়ই ধর্মভীরু ও সরল প্রকৃতির মানুষ। অল্প বয়সে দীক্ষা নিয়ে তিনি তারামায়ের সাধনায় ডুবে যান। স্ত্রী রাজকুমারীও ছিলেন ধর্মপ্রাণা ও ভক্তিমতী। এমন বাবা-মায়ের সন্তান হয়ে বামাচরণও তারামায়ের ভক্ত হন। 'জয়তারা জয়তারা' বলে তিনি মাটিতে লুটোপুটি খান। বামাচরণ বড়ই সরল ও আপনভোলা। তাঁর সরলতা অন্যের চোখে ছিল পাগলামি।

প্রথাগত লেখাপড়ার প্রতি বামাচরণের মন ছিলনা। পাঠশালা কোনোরকমে শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে আর যাওয়া হয়নি। তবে তাঁর একটি বিশেষ গুণ ছিল। তিনি সুমিষ্ট স্বরে গান গাইতে পারতেন। একদিন তারামায়ের মন্দিরে গানের আসর বসেছে। বেহালা বাজাচ্ছেন পিতা সর্বানন্দ। সর্বানন্দ এক সময় বামাচরণকে কৃষ্ণ সাজিয়ে দিলেন। আর বামা নেচে-নেচে মিষ্টি কণ্ঠে গান গাইতে লাগলেন। গাঁয়ের মানুষ বামার কৃষ্ণরূপ দেখে আর গান শুনে অতিশয় আনন্দ পেলেন।
একদিন বামাচরণ জেদ ধরেন শ্মশানে যাবেন। পিতা সর্বানন্দ কিছুতেই থামাতে পারেন না। অবশেষে বামাচরণকে নিয়ে তিনি শ্মশানপুরীতে গেলেন। মহাশশ্মশান দেখে বামার মনে ভাবান্তরের সৃষ্টি হয়। তিনি শ্মশানভূমিকে ভালোবেসে ফেলেন।
এ ঘটনার পর বামা যেন কেমন হয়ে গেছেন। সত্যি সত্যি তিনি ক্ষেপায় পরিণত হন। এ ক্ষেপাটি তাঁর গভীর ধর্ম নিষ্ঠার জন্য। শ্মশানভূমির সাথে, তারামায়ের সাথে তাঁর নিবিড় ভাব গড়ে উঠল। শুরু হলো বামাচরণের শ্মশানলীলা। সে সময় শ্মশানে ছিলেন তন্ত্রসাধক ও বেদজ্ঞ মোক্ষদানন্দ। আরও ছিলেন ব্রজবাসী কৈলাসপতি। কৈলাসপতি বামাকে দীক্ষা দেন। আর মোক্ষদানন্দ দেন সাধনার শিক্ষা। শুরু হলো মহাশ্মশানে বামাচরণের তন্ত্রসাধনা।
এরপর হঠাৎ একদিন পিতা সর্বানন্দের মৃত্যু হয়। বামাচরণের বয়স তখন ১৮ বছর। সংসারের কথা ভেবে মা রাজকুমারী ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। বামাকে বলেন কিছু একটা করতে। বামা একের পর এক কাজ নেন। কিন্তু কোথাও মন বসাতে পারেন না। তাঁর কেবল তারামায়ের রাঙা চরণের কথা মনে পড়ে। একবার এক মন্দিরে ফুল তোলার কাজ নেন। কিন্তু রক্তজবা তুলতে গিয়ে মনে পড়ে যায় তারামায়ের চরণযুগলের কথা। আর অমনি তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েন। কখনো বা ভাবে বিভোর হয়ে গান ধরেন। এক মনে গাছতলায় বসে থাকেন। ফলে তাঁর কোনো কাজই বেশিদিন টেকে না। এভাবেই তিনি বামাক্ষেপা নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বামাক্ষেপার এই ক্ষেপামি চলতেই থাকে। তারামায়ের সাধনায় তিনি মন-প্রাণ ঢেলে দেন এবং এক সময় সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁর সিদ্ধিলাভের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় নাটোরের মহারানি অন্নদাসুন্দরী তাঁর কথা জানতে পারেন। তারাপীঠের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল তখন নাটোরের রাজপরিবার। তাই রানির নির্দেশে বামাক্ষেপাকে তারাপীঠের পুরোহিত নিয়োগ করা হয়।
বামাক্ষেপা ছিলেন খুবই সহজ-সরল এক আত্মভোলা মানুষ। খাদ্যাখাদ্য, পূজা-মন্ত্র কোনো কিছুই তিনি মানতেন না। 'এই বেলপাতা লে মা, এই অন্ন লে মা, এই জল লে মা, এই ফুল ধূপ লে মা'। এই ছিল বামার পূজা।
বামা তারামায়ের ভক্ত হলেও নিজের মাকেও খুব শ্রদ্ধা করতেন। মা রাজকুমারী মারা যাওয়ার পর তাঁর দেহ তারাপীঠে আনা হয়। বামা তখন দ্বারকা নদীর ওপারে তারাপীঠ শ্মশানে। বর্ষাকালে নদীতে প্রচন্ড ঢেউ। তাই ভয়ে কেউ মৃতদেহ ওপারে শ্মশানে নিতে চাইছে না। এপারেই দাহ করার আয়োজন করছে। কিন্তু মায়ের আত্মার সদ্গতির জন্য তারাপীঠের শ্মশানেই তাঁকে দাহ করা দরকার। এ কথা ভেবে বামাক্ষেপা মা-তারার নাম নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন। এপারে এসে মায়ের শরীর নিজের সঙ্গে বেঁধে সাঁতরে ওপারে গেলেন এবং শ্মশানে মায়ের দেহ দাহ করলেন।
বামাক্ষেপা লোকশিক্ষার জন্য বলতেন:
(১) ধর্ম অন্তরের জিনিস, বেশি আড়ম্বর করলে নষ্ট হয়।
(২) মায়াকে জয় করতে পারলেই মহামায়ার কৃপা পাওয়া যায়।
(৩) তারা মা-র করুণা পেলেও মোক্ষ লাভ হয়।
(৪) গুরু, মন্ত্র আর ভগবান- এঁদের মধ্যে পার্থক্য ভাবতে নেই। তোমরাও ভাববে না, তোমাদের মঙ্গল হবে। কলিযুগে মুক্তিসাধনা আর হরিনাম ছাড়া জীবের গতি নেই।
(৫) দিনরাত যে কালীতারা, রাধাকৃষ্ণ নাম করে, পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
তন্ত্রসাধনায় অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করে বামাক্ষেপা ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন।
বামাক্ষেপার জীবনী থেকে আমরা এই নৈতিক শিক্ষা পাই যে, মনে-প্রাণে কোনো কিছু চাইলে তা পাওয়া যায়। ধর্ম অন্তর দিয়ে পালন করতে হয়। বাইরে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। দেব-দেবীর পূজায় ভক্তিই প্রধান। মন্ত্র- তন্ত্র, নিয়ম-কানুন প্রধান বিষয় নয়। ভক্তি ভরে মা-তারা এবং রাধা-কৃষ্ণের নাম নিলে পাপ তাকে স্পর্শ করে না। পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে।
সাধক বামাক্ষেপার এই শিক্ষা আমরা আমাদের জীবনে কাজে লাগাব।

একক কাজ: বামাক্ষেপার লোকশিক্ষাসমূহ উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর।

নতুন শব্দ: ক্ষেপা, শ্মশান, বেদজ্ঞ, বেঁহুশ, আত্মভোলা, দাহ।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...