ক্ষমার ধারণা
ক্ষমা একটি মহৎ গুণ। ক্ষমা ধর্মের অঙ্গ। শাস্ত্রে আছে।
ধৃতি-ক্ষমা-দমোহস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্।
অর্থাৎ সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, দয়া, চুরি না করা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়-সংযম, শুভবুদ্ধি, জ্ঞান, সত্য ও অক্রোধ- এই দশটি ধর্মের স্বরূপ বা বাহ্য লক্ষণ। এখানে এই দশটি লক্ষণের মধ্যে দ্বিতীয় যে গুণ বা লক্ষণ- সেটি হলো ক্ষমা। আমরা জানি ধর্মের পরিচয় পাওয়া যায় ধার্মিকের মধ্যে। সুতরাং যিনি ধার্মিক তাঁর মধ্যে ক্ষমা নামক গুণটি থাকতেই হবে। অনুতপ্ত অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দেয়াকে 'ক্ষমা' বলে। শাস্তি দেয়ার মতো শক্তি সাহস এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপরাধী বা অন্যায়কারীর উপর প্রতিশোধ না নিয়ে বা বল প্রয়োগ করে তাকে পরাভূত বা পর্যুদস্তু না করে ছেড়ে দেয়াকেই ক্ষমা করা বলে। 'ক্ষমা' দ্বারা অপরাধীর মনে অনুশোচনা হয়। এতে তার আত্মশুদ্ধির সুযোগ ঘটে। ভবিষ্যতে অন্যায়কারী বা অপরাধী পুনরায় অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে। কারণ তার বিবেক এসব খারাপ কাজ করা থেকে তাকে নিবৃত্ত করবে। 'ক্ষমা' দ্বারা শত্রুকে তার শত্রুতা থেকে নিবৃত্ত করা সম্ভব। আর এভাবেই সমাজ থেকে অশান্তি দূর হতে পারে। পৃথিবীতে যত মহাপুরুষ জন্ম গ্রহণ করেছেন তাঁরা সকলেই এই 'ক্ষমা' গুণের অধিকারী ছিলেন। এই ক্ষমা গুণই তাঁদেরকে মহান বলে সকলের নিকট পরিচিত করিয়েছে। তাঁদের দ্বারাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা ক্ষমাশীল হব। তাহলে আমাদের ব্যক্তি জীবন ও সমাজ শৃঙ্খলামন্ডিত থাকবে।
| একক কাজ: ধর্মের দশটি বাহ্যিক লক্ষণের নাম লেখ। |
ক্ষমার আদর্শ বিষয়ক একটি উপাখ্যান-
উপাখ্যান: ক্ষমার আদর্শ

প্রায় পাঁচশত বছর আগের কথা। সে সময় জাতিভেদ, বর্ণভেদ সমাজকে কলুষিত করেছিল। সমাজের এই ভেদাভেদ দূর করে সমাজকে কলুষমুক্ত করতে, ধর্মীয় গোড়ামি ভেঙ্গে দিতে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সহজ করে দিলেন শ্রীগৌরাঙ্গ। শ্রীগৌরাঙ্গ বা শ্রীগৌরসুন্দরই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তাঁর সহচর ছিলেন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু। আরও ছিলেন- শ্রীঅদ্বৈত আচার্য, শ্রীহরিদাস, শ্রীরূপ, শ্রীসনাতন, শ্রীজীব, শ্রীগোপাল ভট্ট, শ্রী রঘুনাথদাস প্রমুখ।
শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু তাঁদের বললেন, কৃষ্ণনাম কর। জাতিধর্ম নির্বিশেষে হরিনাম বিলাও, শ্রী নিত্যানন্দ মেতে উঠলেন কৃষ্ণনাম সংকীর্তনে। যাকে পান, তাকেই বলেন কৃষ্ণনামের কথা, ভজনের কথা।
সে সময় নবদ্বীপে জগাই মাধাই নামে দুই ভাই বাস করত। তারা ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও সব সময় পাপ কাজে মত্ত ছিল। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে মানুষের প্রতি অত্যাচার করাই ছিল তাদের দৈনন্দিন কাজ। তাঁদের অত্যচারে নবদ্বীপের লোক অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। জগাই-মাধাইয়ের এমন দুরবস্থা দেখে নিত্যানন্দের প্রাণ কেঁদে উঠল। করুণায় তাঁর মন গলে গেল। তিনি সঙ্গী সাথীদের নিয়ে জগাই মাধাইয়ের বাড়ির কাছে গিয়ে কীর্তন শুরু করলেন-
বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ কহ কৃষ্ণ নাম।
কৃষ্ণ মাতা কৃষ্ণ পিতা কৃষ্ণ ধন প্রাণ।
তোমা সব লাগিয়া কৃষ্ণের অবতার।
হেন কৃষ্ণ ভজ সবে ছাড় অনাচার। (চৈতন্য-ভাগবত)
সারারাত মদ্যপান করে জগাই-মাধাই সে সময় দিবা নিদ্রায় মগ্ন ছিল। কীর্তনের শব্দে তাদের ঘুম ভেঙ্গে গেল। জগাই-মাধাই বাইরে বেরিয়ে এলো। নিত্যানন্দের মুখে হরিনাম শুনে দুভাই ভীষণ ক্ষেপে গেল। তাদের অবস্থা দেখে নিত্যানন্দের হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। তাঁর দুচোখে অবিরল ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি 'হরিবোল', 'হরিবোল', বলে কেঁদে উঠলেন।
নিত্যানন্দের এহেন অবস্থা দেখে জগাই-মাধাইয়ের মন মোটেই নরম হলো না, বরং তারা ক্রোধে জ্বলে উঠল। মাধাই একটি কলসীর কানা নিয়ে নিত্যানন্দের মাথায় আঘাত করল। নিত্যানন্দের কপাল কেটে রক্ত ঝরতে লাগল। সে অবস্থাতেও তিনি হরিনাম করতে লাগলেন। যেন তাঁর কিছুই হয়নি। এমনিভাবে তিনি মাধাইকে বললেন-
'মারিলি কলসির কানা সহিবারে পারি।
তোদের দুর্গতি আমি সহিবারে নারি।
মেরেছিস মেরেছিস তোরা তাতে ক্ষতি নাই।
সুমধুর হরিনাম মুখে বল ভাই।'
এ সংবাদ শোনামাত্র গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু শিষ্যগণসহ সেখানে উপস্থিত হলেন। নিত্যানন্দের ঐ রক্তাক্ত অবস্থা দেখে তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুকে নিরস্ত করলেন। তিনি শান্ত হলেন।
এ ঘটনায় অনুতপ্ত হয়ে জগাই-মাধাই শ্রীগৌরাঙ্গের চরণে লুটিয়ে পড়ে। তখন শ্রীগৌরাঙ্গ সহাস্যে বললেন জগাইকে আমি ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু মাধাই তো নিত্যানন্দের নিকট অপরাধী। আমার ভক্তকে যে কষ্ট দেয় আমি তাদের ক্ষমা করতে পারিনা।
তখন নিত্যানন্দ গদগদ কণ্ঠে মহাপ্রভুকে বললেন, 'আমি জানি তুমি এ দুটি জীবকে উদ্ধার করবে। তবু আমার গৌরব বাড়ানোর জন্যই আমার অনুমতির কথা বলছ। তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক, আমি মাধাইকে ক্ষমা করলাম।' এই বলে নিত্যানন্দ মাধাইকে আলিঙ্গন করলেন, শ্রীগৌরাঙ্গ তখন জগাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। ভক্তগণ সমস্বরে বলে উঠলেন, 'হরিবোল', 'হরিবোল'।
এ ঘটনার পর জগাই-মাধাই হয়ে গেল নতুন মানুষ। কৃষ্ণ, কৃষ্ণ বলতে তাদের নয়নে অশ্রু ঝরে। এভাবে বড় সাধক হয়ে গেল জগাই মাধাই। শ্রীনিত্যানন্দের ক্ষমাই মহাপাপী জগাই মাধাইকে সাধকে পরিণত করেছিল। এটাই ক্ষমার আদর্শ।
| একক কাজ: শ্রীনিত্যানন্দের আদর্শ সম্পর্কে পাঁচটি বাক্য লেখ। |
উপাখ্যানের শিক্ষা: ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ। ক্ষমা দ্বারা অসৎ মানুষকে সৎ মানুষে পরিবর্তন করা এবং দুর্জয় শত্রুকেও বশ করা যায়।
Read more