ধর্মীয় উপাখ্যানে নৈতিক শিক্ষা (ষষ্ঠ অধ্যায়)

হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

523

'নীতি' শব্দ থেকে 'নৈতিক' শব্দের উৎপত্তি। যে শিক্ষা দ্বারা মানুষের মনে নীতিবোধ জন্মে, কিছু আচার ও নিয়ম-কানুন আয়ত্ত হয়, তাকে 'নৈতিক শিক্ষা' বলা হয়। 'নৈতিক শিক্ষা' ধর্মের অঙ্গ। মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্য নৈতিক শিক্ষার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু ধর্মগ্রন্থসমূহে তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক উপাখ্যানের মধ্যদিয়েও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। এ অধ্যায়ে সত্যবাদিতা, ক্ষমার ধারণা ও গুরুত্ব এবং তৎসম্পর্কিত দৃষ্টান্তমূলক উপাখ্যান সন্নিবেশিত হয়েছে।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • ধর্মীয় আদর্শের আলোকে সত্যবাদিতা ও ক্ষমার ধারণা দুটি ব্যাখ্যা করতে পারব
  • সত্যবাদিতা ও ক্ষমার আদর্শের প্রমাণ সম্পর্কিত একটি উপাখ্যান বর্ণনা করতে পারব
  • উপাখ্যানের শিক্ষা মূল্যায়ন করতে পারব
  • পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে সত্যবলা ও ক্ষমার গুরুত্ব বর্ণনা করতে পারব
  • সত্য কথা বলার অভ্যাস ও ক্ষমার আদর্শ গঠনে পরিবারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারব
  • ব্যক্তি ও সামজিক জীবনে ক্ষমার আদর্শ ও সত্যবলার গুরুত্ব উপলব্ধি করে সত্য বলার অভ্যাস গঠনে উদ্বুদ্ধ হব
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

সত্যবাদিতার ধারণা
সত্যবাদিতা একটি বিশেষ গুণ। এ গুণ যার থাকে, তিনি সমাজে বিশেষ ভাবে সম্মানিত হন। সত্যবাদিতা মানব চরিত্রের একটি মহৎ গুণ। গোপন না করে অকপটে সবকিছু প্রকাশ করার নামই 'সত্যবাদিতা'। সত্য মানব জীবনের স্বরূপ বিকশিত করে। সত্যের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বা তথ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। সত্যবাদী কখনো খারাপ কাজ করতে পারে না। সত্যবাদিতা ধর্মের অঙ্গ। সকলেরই উচিত সত্যকথা বলা, সৎ পথে চলা এবং সত্যবাদিতার অনুশীলন করা। এ বিশ্বে যত মহাপুরুষ আছেন তাঁরা সকলেই সত্যবাদী। সত্য প্রকাশ করাই ছিল তাঁদের জীবনের অন্যতম ব্রত।

একক কাজ: কোন গুণদ্বারা তুমি সত্যবাদী লোককে চিহ্নিত করবে দৃষ্টান্তসহ লিখ।

সত্যবাদিতা সম্পর্কে উপনিষদ থেকে একটি উপাখ্যান বর্ণনা করছি।

উপাখ্যান: সত্যবাদী সত্যকাম


প্রাচীনকালে গৌতম নামে এক ঋষি ছিলেন। একদিন তিনি তাঁর আশ্রমে শিষ্যদের নিয়ে ব্রহ্মবিদ্যা বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় একজন বালক এসে তাঁকে প্রণাম শেষে মাথা নিচু করে তাঁর সম্মুখে দাঁড়াল। ঋষি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?'
বালকটি উত্তর করল, 'আমার নাম সত্যকাম। এখান থেকে একটু দূরে গ্রামে আমার বাড়ি। সেখান থেকেই এসেছি।'
ঋষি বললেন, 'এখানে কী চাও?' বালকটি বিনীতভাবে উত্তর দিল, 'গুরুদেব, আমি আপনার নিকট ব্রহ্মচর্য পালন করে ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা করতে চাই।'
তখন ঋষি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার গোত্র কী?' বালকটি করজোড়ে বলল, 'গুরুদেব, আমি আমার গোত্র কী তা জানিনা। বাড়িতে আমার মা আছেন। আমি মাকে জিজ্ঞাসা করে কাল আপনাকে বলব।' গৃহে এসে মাকে সব কথা খুলে বলল সত্যকাম। তার মা তাকে বললেন, 'বাবা সত্যকাম আমি তোমার গোত্র কী তা জানিনা। আমার নাম জবালা। তাই তুমি জাবাল সত্যকাম।'
পরের দিন সত্যকাম ঋষির আশ্রমে গিয়ে গুরুদেবকে প্রণাম করে বলল, 'গুরুদেব, আমি মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। আমার গোত্র কী? কিন্তু মা বললেন যে তিনিও জানেন না আমার গোত্র কী। আমার মায়ের নাম জবালা। তাই আমি জাবাল সত্যকাম।'

সত্যকামের মুখে এমন সরল সত্যকথা শুনে ঋষি তাকে বুকে টেনে নিয়ে আলিঙ্গন করে বললেন, 'বৎস, সত্যকাম, তুমি সত্যকথা বলেছ। সুতরাং তুমি ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণই এমন সত্য কথা বলতে পারে। আমি তোমাকে উপনয়ন দেব, ব্রহ্মবিদ্যা দান করব।' গোত্রহীন হয়েও সত্যকাম সত্যকথা বলেছে বলে ঋষি তাকে তাড়িয়ে না দিয়ে বুকে টেনে নিলেন। ব্রহ্মচর্য পালন করতে অনুমতি দিলেন। সেদিন থেকে সত্যকাম ঋষি গৌতমের আশ্রমে থেকে বিদ্যাচর্চা আরম্ভ করল।

উপাখ্যানের শিক্ষা
সত্য সর্বদা প্রকাশিত। সত্য প্রকাশ করা উচিত। সত্য কখনও গোপন করা যায় না।

একক কাজ: সত্যবাদী সত্যকাম উপাখ্যানের শিক্ষা উল্লেখ কর এবং তোমার জীবনে এ শিক্ষার ক্ষেত্র চিহ্নিত কর।
Content added By

সত্য ব্যক্তি জীবনকে সুন্দর করে। সত্যবাদীকে সকলে ভালোবাসে, বিশ্বাস, সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। সত্যবাদী সকলেই আস্থার পাত্র। সত্যবাদীর সাহস সর্বদাই অধিক। এই সাহসের মূলে রয়েছে ব্যক্তির সৎ চিন্তা এবং পরিপূর্ণ বিবেকবোধ। আমাদের পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজের সকলকে সত্য বলার অভ্যাস গঠন করা উচিত।
পরিবারিক জীবনে সত্যকথা বলার প্রয়োজনীয়তা অধিক। সত্যকথা বলার মাধ্যমে পরিবারে পরস্পর পরস্পরের কাছাকাছি আসা সহজ হয়। পরিবারে একে অন্যকে সহজে বুঝতে পারে। পারিবারিক কোনো সিদ্ধান্তগ্রহণ করা সহজ হয়। তাছাড়া পরিবারে একে অন্যের উপর নির্ভর করা যায়। সত্যকথা বলার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। যেকোনো জটিলতা সহজে কাটিয়ে উঠা যায়। সুতরাং আমরা পরিবারের সকলে সত্য কথা বলব এবং সৎ জীবন গড়ব। সৎ জীবনই আমাদের পরিবারের মূলভিত্তি।
বিদ্যালয়ে আমরা নানা কার্যক্রমে জড়িত হই। এসব কার্যক্রমে আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো দায়িত্ব পালন করি। শিক্ষক, সহপাঠীসহ অন্যান্য সকলের সাথে বিভিন্ন কাজ করি। এ ক্ষেত্রে আমাদের সত্যকথা বলার গুরুত্ব অধিক। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী সত্যবাদীকে খুব পছন্দ করে। সত্যবাদী সর্বদা স্পষ্টভাষী ও সৎসাহসী হয়ে থাকে। তাদের বিবেকবোধ অত্যন্ত সজাগ থাকে। এ গুণের কারণে সত্যবাদীকে সকলে পছন্দ এবং বিভিন্ন কাজে দায়িত্ব প্রদান করে।
সমাজে সত্যবাদীকে সকলে বিশ্বাস করে। সত্যবাদী সমাজের আদর্শ। সমাজে সত্যবাদী ব্যক্তির আদর্শকে অনেকেই অনুসরণ করে। সমাজের বিভিন্ন বিরোধ, দ্বন্দ্বসহ নানা সমস্যা সমাধানে সত্যবাদী ব্যক্তিই এগিয়ে আসেন।

একক কাজ: পরিবার ও বিদ্যালয়ে সত্যকথা বলার গুরুত্বসমূহ চিহ্নিত কর।
Content added By

সত্যকথা বলার অভ্যাস গঠনে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা পরিবারের প্রধান। তাঁদেরকেই এ বিষয়ে অধিক সচেতন হতে হয়। মা-বাবাকে পরিবারের সকল কাজকর্মে সত্যকথা বলার অভ্যাস করতে হবে। পরিবারে সত্যকথা বলার পরিবেশ সৃষ্টি হলেই সন্তানের আচরণে তা প্রতিভাত হবে। সন্তান কোনো কাজে কোনো কারণে সত্য বলা হতে বিরত থাকলে মা-বাবা এ ক্ষেত্রে তার ভুল সংশোধনের সুযোগ দিয়ে সত্য বলতে উৎসাহিত করবেন। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে এবং তাদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে।
পরিবারের বিভিন্ন কাজে মা-বাবা সন্তানের সাথে থাকেন। এ সময়ে সত্যবাদীর গল্প কিংবা ঘটনা বলে তাদের জীবনবোধে সাড়া জাগাতে পারেন। অনেক পরিবারে বাবা-মা এবং সন্তানরা একসাথে খাবার গ্রহণ করেন। এ সময়ে সত্যবলার পুরস্কার এর উপর কোনো ঘটনা বা এলাকার কোনো সত্য ঘটনার অবতারণা করে সন্তানের মনকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। আমাদের ধর্মগ্রন্থে সত্যবলার অনেক কাহিনি রয়েছে। এসব গল্প বলার মাধ্যমেও পরিবারের সদস্যগণ শিশুদের সত্যকথা বলতে উৎসাহিত করতে পারেন।

একক কাজ: সত্য কথা বলার উৎসাহ প্রদানে তোমার পরিবারের সদস্যগণ কী ভূমিকা পালন করেছেন?
Content added By

ক্ষমার ধারণা
ক্ষমা একটি মহৎ গুণ। ক্ষমা ধর্মের অঙ্গ। শাস্ত্রে আছে।
ধৃতি-ক্ষমা-দমোহস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্।
অর্থাৎ সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, দয়া, চুরি না করা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়-সংযম, শুভবুদ্ধি, জ্ঞান, সত্য ও অক্রোধ- এই দশটি ধর্মের স্বরূপ বা বাহ্য লক্ষণ। এখানে এই দশটি লক্ষণের মধ্যে দ্বিতীয় যে গুণ বা লক্ষণ- সেটি হলো ক্ষমা। আমরা জানি ধর্মের পরিচয় পাওয়া যায় ধার্মিকের মধ্যে। সুতরাং যিনি ধার্মিক তাঁর মধ্যে ক্ষমা নামক গুণটি থাকতেই হবে। অনুতপ্ত অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দেয়াকে 'ক্ষমা' বলে। শাস্তি দেয়ার মতো শক্তি সাহস এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপরাধী বা অন্যায়কারীর উপর প্রতিশোধ না নিয়ে বা বল প্রয়োগ করে তাকে পরাভূত বা পর্যুদস্তু না করে ছেড়ে দেয়াকেই ক্ষমা করা বলে। 'ক্ষমা' দ্বারা অপরাধীর মনে অনুশোচনা হয়। এতে তার আত্মশুদ্ধির সুযোগ ঘটে। ভবিষ্যতে অন্যায়কারী বা অপরাধী পুনরায় অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে। কারণ তার বিবেক এসব খারাপ কাজ করা থেকে তাকে নিবৃত্ত করবে। 'ক্ষমা' দ্বারা শত্রুকে তার শত্রুতা থেকে নিবৃত্ত করা সম্ভব। আর এভাবেই সমাজ থেকে অশান্তি দূর হতে পারে। পৃথিবীতে যত মহাপুরুষ জন্ম গ্রহণ করেছেন তাঁরা সকলেই এই 'ক্ষমা' গুণের অধিকারী ছিলেন। এই ক্ষমা গুণই তাঁদেরকে মহান বলে সকলের নিকট পরিচিত করিয়েছে। তাঁদের দ্বারাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা ক্ষমাশীল হব। তাহলে আমাদের ব্যক্তি জীবন ও সমাজ শৃঙ্খলামন্ডিত থাকবে।

একক কাজ: ধর্মের দশটি বাহ্যিক লক্ষণের নাম লেখ।

ক্ষমার আদর্শ বিষয়ক একটি উপাখ্যান-

উপাখ্যান: ক্ষমার আদর্শ


প্রায় পাঁচশত বছর আগের কথা। সে সময় জাতিভেদ, বর্ণভেদ সমাজকে কলুষিত করেছিল। সমাজের এই ভেদাভেদ দূর করে সমাজকে কলুষমুক্ত করতে, ধর্মীয় গোড়ামি ভেঙ্গে দিতে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সহজ করে দিলেন শ্রীগৌরাঙ্গ। শ্রীগৌরাঙ্গ বা শ্রীগৌরসুন্দরই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তাঁর সহচর ছিলেন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু। আরও ছিলেন- শ্রীঅদ্বৈত আচার্য, শ্রীহরিদাস, শ্রীরূপ, শ্রীসনাতন, শ্রীজীব, শ্রীগোপাল ভট্ট, শ্রী রঘুনাথদাস প্রমুখ।
শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু তাঁদের বললেন, কৃষ্ণনাম কর। জাতিধর্ম নির্বিশেষে হরিনাম বিলাও, শ্রী নিত্যানন্দ মেতে উঠলেন কৃষ্ণনাম সংকীর্তনে। যাকে পান, তাকেই বলেন কৃষ্ণনামের কথা, ভজনের কথা।
সে সময় নবদ্বীপে জগাই মাধাই নামে দুই ভাই বাস করত। তারা ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও সব সময় পাপ কাজে মত্ত ছিল। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে মানুষের প্রতি অত্যাচার করাই ছিল তাদের দৈনন্দিন কাজ। তাঁদের অত্যচারে নবদ্বীপের লোক অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। জগাই-মাধাইয়ের এমন দুরবস্থা দেখে নিত্যানন্দের প্রাণ কেঁদে উঠল। করুণায় তাঁর মন গলে গেল। তিনি সঙ্গী সাথীদের নিয়ে জগাই মাধাইয়ের বাড়ির কাছে গিয়ে কীর্তন শুরু করলেন-

বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ কহ কৃষ্ণ নাম।
কৃষ্ণ মাতা কৃষ্ণ পিতা কৃষ্ণ ধন প্রাণ।
তোমা সব লাগিয়া কৃষ্ণের অবতার।
হেন কৃষ্ণ ভজ সবে ছাড় অনাচার। (চৈতন্য-ভাগবত)

সারারাত মদ্যপান করে জগাই-মাধাই সে সময় দিবা নিদ্রায় মগ্ন ছিল। কীর্তনের শব্দে তাদের ঘুম ভেঙ্গে গেল। জগাই-মাধাই বাইরে বেরিয়ে এলো। নিত্যানন্দের মুখে হরিনাম শুনে দুভাই ভীষণ ক্ষেপে গেল। তাদের অবস্থা দেখে নিত্যানন্দের হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। তাঁর দুচোখে অবিরল ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি 'হরিবোল', 'হরিবোল', বলে কেঁদে উঠলেন।
নিত্যানন্দের এহেন অবস্থা দেখে জগাই-মাধাইয়ের মন মোটেই নরম হলো না, বরং তারা ক্রোধে জ্বলে উঠল। মাধাই একটি কলসীর কানা নিয়ে নিত্যানন্দের মাথায় আঘাত করল। নিত্যানন্দের কপাল কেটে রক্ত ঝরতে লাগল। সে অবস্থাতেও তিনি হরিনাম করতে লাগলেন। যেন তাঁর কিছুই হয়নি। এমনিভাবে তিনি মাধাইকে বললেন-

'মারিলি কলসির কানা সহিবারে পারি।
তোদের দুর্গতি আমি সহিবারে নারি।
মেরেছিস মেরেছিস তোরা তাতে ক্ষতি নাই।
সুমধুর হরিনাম মুখে বল ভাই।'

এ সংবাদ শোনামাত্র গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু শিষ্যগণসহ সেখানে উপস্থিত হলেন। নিত্যানন্দের ঐ রক্তাক্ত অবস্থা দেখে তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুকে নিরস্ত করলেন। তিনি শান্ত হলেন।
এ ঘটনায় অনুতপ্ত হয়ে জগাই-মাধাই শ্রীগৌরাঙ্গের চরণে লুটিয়ে পড়ে। তখন শ্রীগৌরাঙ্গ সহাস্যে বললেন জগাইকে আমি ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু মাধাই তো নিত্যানন্দের নিকট অপরাধী। আমার ভক্তকে যে কষ্ট দেয় আমি তাদের ক্ষমা করতে পারিনা।
তখন নিত্যানন্দ গদগদ কণ্ঠে মহাপ্রভুকে বললেন, 'আমি জানি তুমি এ দুটি জীবকে উদ্ধার করবে। তবু আমার গৌরব বাড়ানোর জন্যই আমার অনুমতির কথা বলছ। তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক, আমি মাধাইকে ক্ষমা করলাম।' এই বলে নিত্যানন্দ মাধাইকে আলিঙ্গন করলেন, শ্রীগৌরাঙ্গ তখন জগাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। ভক্তগণ সমস্বরে বলে উঠলেন, 'হরিবোল', 'হরিবোল'।

এ ঘটনার পর জগাই-মাধাই হয়ে গেল নতুন মানুষ। কৃষ্ণ, কৃষ্ণ বলতে তাদের নয়নে অশ্রু ঝরে। এভাবে বড় সাধক হয়ে গেল জগাই মাধাই। শ্রীনিত্যানন্দের ক্ষমাই মহাপাপী জগাই মাধাইকে সাধকে পরিণত করেছিল। এটাই ক্ষমার আদর্শ।

একক কাজ: শ্রীনিত্যানন্দের আদর্শ সম্পর্কে পাঁচটি বাক্য লেখ।

উপাখ্যানের শিক্ষা: ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ। ক্ষমা দ্বারা অসৎ মানুষকে সৎ মানুষে পরিবর্তন করা এবং দুর্জয় শত্রুকেও বশ করা যায়।

Content added By

ক্ষমা মহৎ গুণ। ক্ষমাশীল ব্যক্তি পরিবার ও সমাজে সমাদৃত। শিশু ক্ষমার শিক্ষা পরিবারের মধ্য হতেই অর্জন করে থাকে। আমাদের পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন কাজে ক্ষমার গুরুত্ব অনেক। ক্ষমা মানুষকে মহৎ করে তোলে। পরিবারে ক্ষমার দৃষ্টান্ত পরস্পরের মধ্যে মানসিক দুরত্ব কমিয়ে দেয়। পারিবারিক জীবনে অনেক সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে কেউ অন্যায় করে আবার কেউবা তা সহ্য করে। এ সহ্যবোধের মধ্য দিয়ে কেউ অন্যের রূঢ় আচরণে ক্ষুদ্ধ না হয়ে ক্ষমা করে দেয়। ক্ষমা করার এই গুণ পরিবারের অন্য সদস্যকেও প্রভাবিত করে। ক্ষমাবোধ আমাদের আচরণকে পরিশীলিত করে। ক্ষমাশীল সদস্যের প্রতি পরিবারের সকলের শ্রদ্ধাবোধ অধিক থাকে। আমাদের বিদ্যালয় পরিবেশেও ক্ষমার গুরুত্ব অধিক। বিদ্যালয়ে আমাদের বন্ধুদের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই নানা বিষয় নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রেও কেউ অন্যায় করে আবার কেউবা অন্যায় না করে বন্ধুর অন্যায় আচরণ সহ্য করে। কেউ বন্ধুর অন্যায় আচরণ শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং বন্ধুকে ক্ষমা করে দেয়। এতে বন্ধুদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। ক্ষমা শিক্ষার্থীর জীবন সুন্দর করে তোলে। আমাদের অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা ক্ষমাশীল। তাঁদের এই ক্ষমাশীল আচরণ দ্বারা আমরা নানাভাবে প্রভাবিত হই। ক্ষমার গুণ বিদ্যালয় পরিবেশকে সুন্দর করে তুলতে পারে। সমাজ জীবনেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমার গুরুত্ব অধিক। ক্ষমাশীল ব্যক্তি সমাজে সমাদৃত এবং শ্রদ্ধার পাত্র।

একক কাজ: পারিবারিক জীবনে ক্ষমার গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর।
Content added By

ক্ষমার আদর্শ গঠনে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যে পরিবারে মা-বাবা ক্ষমাশীল আচরণ করে সে পরিবারে সন্তানের মধ্যেও এরূপ আচরণ পরিলক্ষিত হবে। পরিবারে সকল সদস্য একই প্রকৃতির আচরণ করে না। একই পরিবারের সদস্যদের আচরণের ধরণও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। কেউ একটু সহজ ও সরল প্রকৃতির আবার কেউবা জটিল প্রকৃতির। কোনো কারণে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে পরিবারে একেক জনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার ধরনও একেক প্রকৃতির। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাকে অত্যন্ত সচেতন হতে হয়। পরিবারে যারা সর্বদাই অন্যায় ও রূঢ় আচরণ করে তাদের প্রতি মা-বাবাকে ধৈর্য ও সহনশীল হতে হয়। ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য অন্যায়কারীর নিকট তুলে ধরতে হয়। তাদের আচরণে পরিবর্তন আনতে ছোট ছোট অন্যায়গুলো ক্ষমা করে দিতে হয়। জীবনে অন্যায় আচরণের প্রভাব সম্পর্কে তাঁদের নিকট বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে হয়। সমাজ জীবনে যারা ক্ষমাশীল হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র তাদের জীবনের ঘটনা সন্তানদের মাঝে গল্পের ছলে বলতে হয়। পরিবারে আমরা যখন একই সাথে কোনো কাজ করি কিংবা খাবার খেতে বসি এ সময়ে বাবা কিংবা মা ধর্মগ্রন্থের ক্ষমার আদর্শের কাহিনি শুনিয়েও আমাদের বিবেকবোধে নাড়া দিতে পারেন।

একক কাজ: তোমার পরিবারে ক্ষমার আদর্শ গঠনে মা কিংবা বাবা কী ভূমিকা রাখতে পারেন তা বুঝিয়ে লেখ।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...