রাণী রাসমণি (পাঠ ৩)

আদর্শ জীবনচরিত - হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

776

রাণী রাসমণি ছিলেন এক মহীয়সী নারী। গরিবের ঘরে জন্ম হলেও এক জমিদারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ফলে তিনি সত্য সত্যিই রানির পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু রানি হলে কী হবে? তিনি কখনও বিলাসী জীবন যাপন করেননি। আজীবন ধর্মচর্চা ও জনকল্যাণমূলক কাজ করে গেছেন। এজন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে রাণী রাসমণি কোলকাতার উত্তরে গঙ্গার পূর্বতীরে হালিশহরের নিকট কোনা নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম হরেকৃষ্ণ দাস। মাতার নাম রামপ্রিয়া দাসী। হরেকৃষ্ণ দাসের পেশা ছিল গৃহ-নির্মাণ ও কৃষিকাজ। জন্মের পর মা রামপ্রিয়া মেয়ের নাম রাখেন রাণী। পরে তাঁর নাম হয় রাসমণি। আরও পরে দুটি নাম একত্রিত হয়ে প্রতিবেশীদের কাছে তিনি রাণী রাসমণি নামে পরিচিত হন। ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের চার কন্যা- পদ্মামণি, কুমারী, করুণা এবং জগদম্বা।
রাজচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত কর্মকুশল। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন বুদ্ধিমতী স্ত্রী রাসমণি। কিন্তু ব্যবহারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। এর ফলে তাঁর সাফল্য আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। পিতার মুত্যুর পর রাজচন্দ্র বিশাল সম্পদের অধিকারী হন।
রাজচন্দ্র নিজে ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল স্ত্রী রাসমণির অনুপ্রেরণা। ফলে এই জমিদার পরিবার জনকল্যাণের জন্য অনেক কাজ করে গেছেন। ১২৩০ (১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ) সালের বন্যায় বাংলার অনেক পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। রাণী রাসমণি তাদের সাহায্যের জন্য বহু অর্থ ব্যয় করেন। ঐ বছরই রাসমণির পিতা পরলোক গমন করেন। রাসমণি কন্যার কর্তব্য অনুসারে পিতার পারলৌকিক ক্রিয়া করার জন্য গঙ্গার ঘাটে যান।
কিন্তু যাতায়াতের রাস্তা এবং গঙ্গার ঘাটের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। তাই জনগণের সুবিধার কথা চিন্তা করে রাণী স্বামীকে অনুরোধ করেন সংস্কারের জন্য। রাজচন্দ্র বহু টাকা খরচ করে 'বাবু ঘাট' ও 'বাবু রোড' নির্মাণ করান।

রাজচন্দ্র ও রাসমণির দাম্পত্য জীবন খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে রাজচন্দ্র ইহলোক ত্যাগ করেন। এর ফলে জমিদারির সমস্ত দায়িত্ব পড়ে রাণী রাসমণির ওপর। কিন্তু জমিদারির পাশাপাশি তিনি জনকল্যাণ ও ধর্মচর্চা সমানভাবে করে গেছেন।
১২৪৫ (১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) সালে রাণী রাসমণি ১,২২,১১৫ টাকা খরচ করে একটি রূপার রথ তৈরি করান। তাতে জগন্নাথ দেবকে বসিয়ে রথযাত্রার দিন পরিবারের লোকজনকে নিয়ে কোলকাতার রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করেন।

একবার তিনি পুণ্যভূমি জগন্নাথ ক্ষেত্রে যান। সেখানকার রাস্তাঘাট ছিল জরাজীর্ণ। তীর্থযাত্রীদের খুব কষ্ট হতো চলাফেরা করতে। রাসমণি তাঁদের সুবিধার কথা চিন্তা করে সমস্ত রাস্তা সংস্কার করে দেন শুধু তা-ই নয়। ষাট হাজার টাকা ব্যয় করে তিনি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এই তিন বিগ্রহের জন্য হীরক খচিত তিনটি মুকুটও তৈরি করিয়ে দেন।
রাণী রাসমণি অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো গঙ্গার জলকর বন্ধ করা। একবার ইংরেজ সরকার গঙ্গায় মাছ ধরার জন্য জেলেদের ওপর কর আরোপ করেন। নিরুপায় জেলেরা তখন রাসমণির শরণাপন্ন হন। রাসমণি সরকারকে দশ হাজার টাকা কর দিয়ে মুসুড়ি থেকে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত সমস্ত গঙ্গা জমা নেন এবং রশি টানিয়ে জাহাজ ও নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে সরকার আপত্তি তোলেন। উত্তরে রাণী বলেন যে, নদীতে জাহাজ চলাচল করলে মাছ অন্যত্র চলে যাবে। এতে জেলেদের ক্ষতি হবে। এ অবস্থায় সরকার রাণীকে তাঁর টাকা ফেরত দেন এবং জলকর তুলে নেন।
রাণী তাঁর প্রজাদের সন্তানের ন্যায় প্রতিপালন করতেন। একবার এক নীলকর সাহেব মকিমপুর পরগণায় প্রজাদের ওপর উৎপীড়ন শুরু করেন। এ-কথা রাণী শুনতে পান এবং তাঁর হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়। তিনি প্রজাদের উন্নতিকল্পে এক লক্ষ টাকা খরচ করে 'টোনার খাল' খনন করান। এর ফলে মধুমতী নদীর সঙ্গে নবগঙ্গার সংযোগ সাধিত হয়। এছাড়া সোনাই, বেলিয়াঘাটা ও ভবানীপুরে বাজার স্থাপন এবং কালীঘাট নির্মাণ তাঁর অনন্য কীর্তি।

ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে রাণী রাসমণির সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি দক্ষিণেশ্বরে মন্দির স্থাপন। রাণী একদিন বিশ্বেশ্বর দর্শনের জন্য কাশীধামে যাওয়া স্থির করেন। যাত্রার পূর্বরাত্রে মা কালী তাঁকে স্বপ্নে বলেন, 'কাশী যাওয়ার আবশ্যকতা নেই, গঙ্গার তীরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা ও ভোগের ব্যবস্থা করো। আমি ঐ মূর্তিকে আশ্রয় করে আবির্ভূত হয়ে তোমার নিকট থেকে নিত্য পূজা গ্রহণ করব।' মায়ের এই আদেশ পেয়ে রাসমণি গঙ্গার তীরে জমি কিনে মন্দির নির্মাণ করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের অগ্রজ রামকুমারকে পুরোহিত নিয়োগ করা হয়। রাণী সেখানে প্রতিদিন পূজা দিতেন। রামকুমারের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণ স্বয়ং পুরোহিতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কারণেই ঐ মন্দির আজ দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির নামে খ্যাত। এখানেই রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাণী রাসমণি ইহধাম ত্যাগ করেন।
রাণী রাসমণির জীবনী থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষা লাভ করতে পারি যে, মানুষের জন্মের চেয়ে তার কর্মই বড়। জন্ম যেখানেই হোক, কর্মের দ্বারা মানুষ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। এটাই প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। সম্পদকে মানুষের সেবায় লাগাতে হবে। শুধু নিজের সুখই নয়, অপরের সুখের জন্যও সম্পদ ও ক্ষমতার ব্যবহার করতে হবে। কর্মের অবসরে ধর্মচর্চায় মন দিতে হবে। তাতে দেহ-মন শুদ্ধ হয়, পবিত্র হয়। এভাবে ধর্মচর্চা ও জনসেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারলে জীবন সার্থক হয়।

দলীয় কাজ: রাণী রাসমণির সংস্কারমূলক কাজ চিহ্নিত করে একটি পোস্টার তৈরি কর।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...