স্রষ্টা ও সৃষ্টি (প্রথম অধ্যায়)

হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.8k

কোনো কিছু সৃষ্টির জন্য একজন স্রষ্টার প্রয়োজন হয়। স্রষ্টা ছাড়া কোনো কিছুর সৃষ্টি হয় না। এ মহাবিশ্ব ও মহাবিশ্বের সবকিছু অর্থাৎ মানুষ, গাছপালা, জীবজন্তু, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, আকাশ-বাতাস প্রভৃতি এক-একটি সৃষ্টি। এ সকল সৃষ্টির একজন স্রষ্টা রয়েছেন। আমরা তাঁকে দেখতে পাই না কিন্তু তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করি। আমরা তাঁকে ঈশ্বর নামে ডাকি। তাঁর অনেক নাম- ব্রহ্ম, পরমেশ্বর, পরমাত্মা, ভগবান, আত্মা ইত্যাদি। তিনি প্রতিটি জীবের মধ্যে আত্মারূপে বিরাজ করেন। তাই আমরা জীবের সেবা করব। জীবসেবাই আমাদের পরম ধর্ম। জীবসেবার মাধ্যমেই আমরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারি। এ অধ্যায়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টির ধারণা, স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক, সকল জীবের মধ্যে স্রষ্টা বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং ঈশ্বর সম্পর্কিত একটি সংস্কৃত মন্ত্র বা শ্লোক বাংলা অর্থসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • স্রষ্টা ও সৃষ্টির ধারণা এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারব
  • সকল জীবের মধ্যে স্রষ্টা বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব
  • ঈশ্বর সম্পর্কিত একটি সহজ সংস্কৃত মন্ত্র বা শ্লোক সহজ অর্থসহ বলতে পারব এবং ব্যাখ্যা করতে পারব
  • সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করে জীবসেবায় উদ্বুদ্ধ হতে পারবো।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় প্রশ্নের উত্তর দাও

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়ে মৃণাল সেন গভীর আগ্রহ নিয়ে সমুদ্র-নদী, গাছপালা প্রভৃতি দেখছিলেন। এসব অপরূপ সৃষ্টি দেখে তার উপলব্ধি হলো প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন পারস্পরিক সম্পর্কে আবদ্ধ। কারও নিয়ন্ত্রণেই এসব উপাদান এমন শৃঙ্খলাবোধ হয়ে আবর্তিত হচ্ছে।

সকল জীবে স্রষ্টার অস্তিত্ব
স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক
ঈশ্বরতত্ত্ব
অবতারবাদ

এই পৃথিবী বড় সুন্দর ও বিচিত্র। এখানে রয়েছে মানুষ, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়- পর্বত, মরু-প্রান্তরসহ আরও কত রকমের বিচিত্রতা। পৃথিবীর উপরে রয়েছে সুনীল আকাশ। আকাশে বিরাজ করছে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, ছায়াপথ ইত্যাদি।
এই পৃথিবীর সকল জীবের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব। সে নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছু তৈরি করতে পারে, যা অনেক জীবই পারে না। যেমন- সহজেই একজন কাঠমিস্ত্রি কাঠ দিয়ে চেয়ার, টেবিল, নৌকা প্রভৃতি প্রস্তুত করতে পারেন। কিন্তু অন্য প্রাণীরা তা করতে পারে না। এই চেয়ার, টেবিল, নৌকা ইত্যাদি তৈরির জন্য কাঠের প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কাঠ কীভাবে তৈরি হয়েছে? উত্তরটা খুবই সহজ। গাছ কেটে কাঠ প্রস্তুত হয়েছে এবং কাঠ থেকে তক্তা তৈরি করে নৌকা বানানো হয়েছে। এর পরের প্রশ্ন- গাছ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, কে সৃষ্টি করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা যাক।
আমরা আগেই বলেছি, সকল সৃষ্টির মূলে একজন স্রষ্টা আছেন। তাহলে গাছও সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। তেমনিভাবে পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, তারা, ধূমকেতু, ছায়াপথ, মানুষ, পশু-পাখি-কীট- পতঙ্গ একই সৃষ্টিকর্তার আলাদা আলাদা সৃষ্টি। সারকথা এ মহাবিশ্ব ও জীবকুলের একজন স্রষ্টা আছেন। স্রষ্টা সবকিছু সৃষ্টি করেন। আর মানুষ স্রষ্টার কোনো সৃষ্টির সাহায্য নিয়ে অন্য কিছু তৈরি করে। যেমন, স্রষ্টা গাছ সৃষ্টি করেছেন। মানুষ তা থেকে চেয়ার, টেবিল, নৌকা ইত্যাদি তৈরি করতে পেরেছে। তাই মানুষের তৈরি স্রষ্টার সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু স্রষ্টার সৃষ্টি তাঁর নিজের ইচ্ছাধীন।
হিন্দুধর্ম অনুসারে এই স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তাকে ঈশ্বর নামে অভিহিত করা হয়। ঈশ্বরের অনেক নাম, অনেক পরিচয়। যেমন- ব্রহ্ম, ভগবান, পরমাত্মা ইত্যাদি। আবার পরমাত্মা যখন জীবের মধ্যে আত্মারূপে অবস্থান করেন, তখন তাঁকে আত্মা বা জীবাত্মা বলে। জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ মহাবিশ্ব এবং মহাবিশ্বের সবকিছুই হচ্ছে সৃষ্টি। এ সকল সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা তাঁর নাম ঈশ্বর। ঈশ্বরকে কেউ দেখতে পায় না। তাঁর কোনো আকার নেই। তিনি নিরাকার। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আকার আছে। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে আমরা তাঁকে অনুভব করি। তাঁকে তাঁর সৃষ্টির যে-কোনো আকৃতিতে অর্থাৎ সাকার রূপে উপলব্ধি করা যায়। সাধকেরা সাধনার মাধ্যমে এবং ভক্তেরা ভক্তির মাধ্যমে তাঁর সান্নিধ্য উপলব্ধি করে থাকেন।

একক কাজ: স্রষ্টার সৃষ্টি হিসেবে তোমার বাসস্থানের চারপাশের বিশটি সৃষ্টির তালিকা প্রস্তুত কর।
Content added By

স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। স্রষ্টা জীবকূলের কল্যাণে এ সুন্দর প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন।
সমুদ্র, নদী, পাহাড়-পর্বত, চন্দ্র-সূর্য, গাছ-পালা, জীবজন্তু প্রভৃতি তাঁর সৃষ্ট প্রকৃতির অংশ। সৃষ্টার এই সৃষ্টির মধ্যেও রয়েছে গভীর সম্পর্ক। সূর্যের আলোয় পৃথিবী আলোকিত হয়। আলোর উপস্থিতিতে গাছ-পালা খাবার গ্রহণ করে। প্রাণীকূল এই আলোয় জীবনধারণের কাজে মেতে ওঠে। প্রকৃতির প্রাণচাঞ্চল্যের মূলেই রয়েছে এই সূর্যের আলো। এভাবে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের সাথেই রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক। আর এ সবকিছুর সম্পর্ক সৃষ্টিকর্তাই নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রকৃতির সব উপাদানের মধ্যে ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মূলেই রয়েছেন তিনি। স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা তাঁকে উপলব্ধি করতে পারি। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত সকল সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং ভালোবাসা
ও সম্মান করা।
ঈশ্বর যে সৃষ্টি করেন তা তাঁর নিজের প্রয়োজনে নয়। তিনি নিজের আনন্দের জন্য সৃষ্টি করেন। একেই বলে তাঁর লীলা।
তিনি মহাবিশ্বের আকাশ, বাতাস, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র-নদী, বনভূমি, গাছ-পালা ও বিচিত্রসব জীবজন্ত সৃষ্টি করে তাঁর লীলার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমরা সহজেই তা অনুভব করতে পারি। স্রষ্টা অনাদি ও অনন্ত। কিন্তু সৃষ্টির আদি ও অন্ত আছে। অর্থাৎ সৃষ্টির উদ্ভব ও ধ্বংস, জন্ম ও মৃত্যু আছে।

দলগত কাজ: সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টার অস্তিত্ব উপলব্ধি করে তোমাদের করণীয় সম্পর্কে লেখ।

নতুন শব্দ: বিদ্যমান, সেবিছে, পরিচর্যা, লীলা, প্রাণচাঞ্চল্য।

Content added By

সকল জীবের মধ্যেই স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে। তিনি সকল জীব সৃষ্টি করেছেন এবং জীবদেহেই অবস্থান করেন। তাই আমরা প্রতিটি জীবকেই ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা করি। যেমন: আমরা তুলসীগাছকে পূজা করি আবার গাভীকেও মাতৃরূপে পূজা করি। স্রষ্টার এই সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করি। এ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন-

'বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর,
জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।'

অর্থাৎ জীবের মধ্যে এক ঈশ্বর বহুরূপে বিরাজ করেন। তাই ঈশ্বরকে বাইরে খোঁজার প্রয়োজন হয় না এবং জীবকে সেবা করলেই ঈশ্বরকে সেবা করা হয়।
ঈশ্বর সর্বত্রই রয়েছেন এবং তিনি জীবদেহে আত্মারূপে বিরাজ করেন। জীবদেহে ঈশ্বর আত্মারূপে অবস্থান করেন বলেই জীবদেহ সচল। সুতরাং জীবদেহের সচলতা নির্ভর করে ঈশ্বরের অস্তিত্বের উপর। ঈশ্বর ছাড়া জীবদেহের অস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না। আত্মাই জীবদেহের প্রাণ। জীবদেহ থেকে আত্মার সরে যাওয়াটাই হল জীবদেহের মৃত্যু। এ অবস্থায় জীবদেহের মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকে না। আত্মা নিরাকার। তাই আমরা আত্মাকে দেখতে পাই না কিন্তু তার উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারি। হিন্দুধর্ম বিশ্বাস করে, আত্মার মৃত্যু হয় না, অবস্থান ত্যাগ করে অন্য অবস্থানে আশ্রয় নেয়। অর্থাৎ আত্মার মৃত্যু নেই।
আত্মাই ঈশ্বর। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, মানুষ যেমন পুরাতন কাপড় পরিত্যাগ করে নতুন কাপড় পরিধান করে, আত্মাও তেমনি পুরাতন দেহ পরিত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে। আত্মার এ পরিবর্তনের মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবের জন্ম ও মৃত্যু। প্রতিটি জীবদেহে তাঁর উপস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সৃষ্টির উপর তাঁর কর্তৃত্বের কথা, সৃষ্টির মধ্যে তাঁর অস্তিত্বের কথা। জীবের অস্তিত্ব স্রষ্টা বা ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল।

একক কাজ: স্রষ্টার অস্তিত্বের কয়েকটি দৃষ্টান্ত চিহ্নিত কর।

নতুন শব্দ: অস্তিত্ব, সচল, জীবদেহ, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা।

Content added By

ঈশ্বর পরম ব্রহ্ম। তাঁর অসীম ক্ষমতা। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, পালন করছেন। আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাই কৃতজ্ঞতাবশত এবং আমাদের মঙ্গলের জন্য আমরা ঈশ্বরের প্রশংসা করি। একেই বলে স্তব বা স্তুতি। এসো, আমরা ঈশ্বরের মাহাত্ম্য প্রকাশক একটি মন্ত্র পরম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করি:

নমস্তে পরমং ব্রহ্ম
সর্বশক্তিমতে নমঃ.।
নিরাকারোহপি সাকারঃ
স্বেচ্ছারূপং নমো নমঃ।
(যজুর্বেদ, শান্তি পাঠ)

সরল অর্থ: যিনি পরম ব্রহ্ম, যিনি সর্বশক্তিমান, নিরাকার হয়েও সাকার, ইচ্ছামত রূপধারী, তাঁকে নমস্কার করি। এ মন্ত্র থেকে বোঝা যায়, ঈশ্বরের অপর নাম ব্রহ্ম।
তাঁকে পরমব্রহ্মও বলা হয়। তিনি নিরাকার। তবে প্রয়োজনে সাকার রূপও ধারণ করে থাকেন। যেমন, নিরাকার ঈশ্বর সাকার শ্রীকৃষ্ণরূপে পৃথিবীতে এসেছেন। তিনি তাঁর ইচ্ছেমতো রূপ ধারণ করতে পারেন। তিনি যুগে যুগে বিভিন্ন অবতার রূপ ধারণ করেছেন। যেমন- বামন অবতার, নৃসিংহ অবতার, রাম অবতার ইত্যাদি। তিনি দুষ্টের দমন করে শিষ্টের পালন করেন। এই অনন্ত শক্তিময় ঈশ্বরকে আমরা নমস্কার করি, বার বার নমস্কার করি।

একক কাজ: ঈশ্বর সম্পর্কিত মন্ত্রের শিক্ষা এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে লেখ।

শব্দ বিশ্লেষণ:

নমস্তে নমঃ+ তে। পরমং ব্রহ্ম - পরম ব্রহ্মকে। সর্বশক্তিমতে সর্বশক্তিমানকে। নিরাকারঃ - নিঃ + আকারঃ। নিরাকারোহপি নিরাকারঃ + অপি (যার আকার নেই। যাকে দেখা যায় না, তবে অনুভব করা যায়। এখানে নিরাকার ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে বোঝানো হয়েছে)। সাকারঃ স + আকারঃ (যার আকার আছে; প্রয়োজনে ঈশ্বর সাকারও হতে পারেন)।

স্বেচ্ছা স্ব+ ইচ্ছা। স্বেচ্ছারূপং স্বেচ্ছারূপধারীকে অর্থাৎ স্বয়ং ঈশ্বরকে।

টীকা: বেদ, উপনিষদ প্রভৃতি বৈদিক ধর্মগ্রন্থের কবিতাগুলোকে বলা হয় মন্ত্র এবং বৈদিক যুগের পরবর্তী কালে সংস্কৃত ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থের কবিতাগুলোকে বলা হয় শ্লোক।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...