হিন্দুধর্মের স্বরূপ (প্রথম পরিচ্ছেদ)

হিন্দুধর্মের স্বরূপ ও বিশ্বাস - হিন্দুধর্ম শিক্ষা - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

197
Please, contribute by adding content to হিন্দুধর্মের স্বরূপ.
Content

সনাতন ধর্ম ও হিন্দুধর্ম মূলত একই ধর্ম। অন্য কথায়, সনাতন ধর্মের অপর নাম হিন্দুধর্ম। সনাতন শব্দের অর্থ চিরন্তন। যা অতীতে ছিল বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে, সেটি সনাতন। সনাতন শব্দটিতে চিরদিনের কথা নির্দেশ করা হয়। সময়ের পরিবর্তনেও যার কোন পরিবর্তন হয় না সেটিই সনাতন। 'হিন্দু' শব্দটি এসেছে সিন্ধু শব্দ থেকে। সিন্ধুনদ প্রাচীনকাল থেকে প্রবাহিত। এই নদের তীরে প্রাচীনকালে সনাতন ধর্মের লোক বাস করত। তাদের আচার-আচরণ, ধর্ম বিশ্বাসে একটি বিশিষ্ট রূপ ছিল।

বিদেশিদের কাছে এদের পরিচয় হয় সিন্ধু নদের নামে। বিদেশিরাই সিন্ধু শব্দকে হিন্দু বলে উচ্চারণ করত। আর সেখানকার সনাতন ধর্মের লোকদেরকে তারা বলত হিন্দু। হিন্দুদের সনাতন ধর্মই তাদের ভাষায় হয়ে ওঠে 'হিন্দুধর্ম'।

এই ধর্ম অতি প্রাচীন। সময়ের অগ্রগতিতেও এ ধর্মের মূল ধারণাগুলোর কোন পরিবর্তন নেই। তবে দেশ-কালের প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে এ ধর্মে নতুন চিন্তা-চেতনা সংযুক্ত হয়েছে। হিন্দুধর্ম নামে নতুন নামকরণ হয়েছে। এভাবেই সনাতন ধর্মের বিকাশ ঘটেছে এবং ঘটছে।
মোটকথা, সনাতন ধর্মের নতুন পরিচয় হচ্ছে হিন্দুধর্ম নামে। সনাতন ধর্মে যে চিন্তা-চেতনা সেটিই হিন্দুধর্মের চিন্তা-চেতনা। হিন্দুধর্মের মূল ধর্মবোধ হচ্ছে- ঈশ্বরে বিশ্বাস, কর্মফলে বিশ্বাস, জন্মান্তরে বিশ্বাস, ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা, দেব-দেবীর পূজা-পার্বণ, জগতের কল্যাণ সাধন ইত্যাদি।
নতুন শব্দ: চিরন্তন, কর্মফল, সনাতন, জন্মান্তর।

Content added By

হিন্দুধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস সনাতন ধর্মের পরিচিতির মধ্যেই বর্তমান। সনাতন ধর্ম কোন একজন মাত্র মুনি, ঋষি বা অবতারপুরুষের প্রতিষ্ঠিত ধর্ম নয়। আদিম মানুষের মনে যখন সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়বোধ জেগেছিল- এক কথায়, ধর্মবোধ জেগেছিল, সেখান থেকে এ ধর্মের বিকাশ শুরু। আর সমাজের চিন্তাশীল ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের ধ্যান-ধারণার ফসল নিয়ে এ ধর্ম ক্রমশ বিকাশ লাভ করে।

হিন্দু ধর্মের মূলে রয়েছেন স্বয়ং ভগবান। ভগবান বা স্রষ্টা জগৎসৃষ্টির সাথে সাথে ধর্মেরও সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জীবন সুন্দর ও সুখময় করার জন্যই ধর্ম এসেছে। হিন্দু ধর্মের মূল বিশ্বাস হচ্ছে স্রষ্টা বা ভগবান আছেন। তাঁর সৃষ্ট জগতে মানুষকে কাজ করতে হচ্ছে। আর প্রতিটি কাজের যে ফল সেটিও মানুষকে ভোগ করতে হয়। একেই বলে কর্মফল- যা জন্মান্তরেও ভোগ করতে হয়। এর ফলে আসে জন্মান্তরের কথা। অমঙ্গল ও দুষ্টজনের অত্যাচার থেকে জগতকে মুক্ত করার জন্য ভগবান অবতাররূপে আবির্ভূত হন। ঈশ্বরের উপাসনা, নামজপ, কীর্তন এবং দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা, ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি ধর্মকর্মের অনুশীলন করে মানুষ সুখ শান্তি এবং মুক্তি লাভ করতে পারে।
সনাতন ধর্ম চিন্তায় যেমন ছিল পুনর্জন্ম, অবতার ও মোক্ষলাভের কথা- এ সবই রয়েছে হিন্দুধর্মে। তবে ধর্ম আচরণের পদ্ধতি হিসেবে কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রাচীনকালে সনাতন বা হিন্দু ধর্মে ধর্মানুষ্ঠান ছিল যজ্ঞক্রিয়া। সেটি ক্রমে দেব-দেবীর আরাধনায় রূপ নিয়েছে। যজ্ঞকর্মে দেব-দেবীর শক্তি ও রূপের বর্ণনা নিয়ে যজ্ঞক্রিয়া হতো। পরবর্তীকালে ঐ দেব-দেবীরই রূপ কল্পনা করে বিগ্রহ বা প্রতিমার মাধ্যমে পূজা-অর্চনার ব্যবস্থা হয়। সনাতন ধর্মের যে অবতার ও মোক্ষলাভের বিষয় রয়েছে এ সবই হিন্দুধর্মের সম্পদ। তবে ক্রমবিকাশের স্তরে স্তরে হিন্দুধর্মে আচার-আচরণে কিছু কিছু নতুনত্বও এসেছে। বৈদিক যুগের যজ্ঞক্রিয়া পূজা অর্চনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে আধুনিক হিন্দুধর্মে শুধু ঈশ্বরের নাম ও গুণকীর্তনের প্রচলন হয়েছে।

সনাতন ধর্মচর্চার আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদের একটি বিশিষ্ট রূপ ছিল। এদেশের বাইরে থেকে ইরান, গ্রিস প্রভৃতি দেশের জনগোষ্ঠী এখানে আসে। তারা সিন্ধুনদের তীরবর্তী লোকদেরকে একটি ভিন্ন মানবগোষ্ঠী মনে করত। বিদেশিদের উচ্চারণে সিন্ধু শব্দটির 'স'এর স্থলে 'হ' হয়ে উচ্চারিত হয়। ফলে সিন্ধু শব্দটি হয়ে পড়ে হিন্দু শব্দ। আর সিন্ধুনদের তীরবর্তী লোকজনও ঐ বিদেশিদের ডাকে হিন্দু হয়ে যায়। আর এটি আস্তে আস্তে দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এর ফলে এদেশে সনাতন ধর্মের অনুসারী মাত্রই হিন্দু নামে পরিচিত হয়।
হিন্দুধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঈশ্বরকে বিশ্বাস, ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা এবং একই সঙ্গে জগতের কল্যাণ সাধন। এখানে রয়েছে ঈশ্বর আরাধনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ। আর এ সুযোগের মধ্য দিয়ে মানুষ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সহজ সরল রূপ পেয়ে যায়। এভাবে এ ধর্মের অনুসারীরা মুক্তচিন্তার অধিকার পেয়ে গর্ববোধ করেন।

একক কাজ: হিন্দুধর্মের উৎপত্তির বিকাশ ধারাবাহিকভাবে লেখ।

নতুন শব্দ: সনাতন, অবতার, সিন্ধুনদ, যজ্ঞক্রিয়া, মোক্ষলাভ।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...