গীতায় ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এবং ফলের আশা না করে নিজের কাজ করতে বলা হয়েছে। কাজটাই বড়, ফল যা-ই হোক। কর্মফলের কথা চিন্তা করতে থাকলে কাজের প্রতি একাগ্রতা আসে না। এভাবে ফলের আশা না করে কাজ করাকে বলে নিষ্কাম কর্ম। এ প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-
কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূমা তে সঙ্গোহত্ত্বকর্মণি।। গীতা-২/৪৭
অর্থাৎ কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনও তোমার অধিকার নেই। কর্মফলের প্রতি তুমি আসক্ত হয়ে যেন নিজ কর্তব্যের প্রতি অবহেলা না করো।
অর্জুন যে আত্মীয়দের সাথে যুদ্ধ করতে চাইছেন না, এতে কোন লাভ হচ্ছে না। এর কারণ আমাদের জন্ম এবং মৃত্যু ঈশ্বরের হাতে। সুতরাং কারো মৃত্যু অর্জুনের যুদ্ধ করা বা না করার ওপর নির্ভর করে না। অর্জুন নিজেই কি জানেন কখন তাঁর মৃত্যু ঘটবে! তাছাড়া ঈশ্বরই আত্মারূপে আমাদের মধ্যে থাকেন। তাই মৃত্যুর মাধ্যমে দেহের ধ্বংস হলেও, আত্মার ধ্বংস হয় না। আত্মাকে অগ্নি, বায়ু, জল- কেউ ধ্বংস করতে পারে না।
এক্ষেত্রে বলা হয়েছে-
ন জায়তে প্রিয়তে বা কদাচিৎ
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।। গীতা- ২/২০
অর্থাৎ আত্মার কখনও জন্ম বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাণ।
শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না। আত্মা সনাতন, অবিনশ্বর। শুধু স্থানান্তর হয়। আত্মাকে এভাবে জানতে পারলে আর দুঃখ থাকে না। তখন সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় সমান হয়ে যায়। গীতায় যোগের কথা বলা হয়েছে। যোগ হচ্ছে কর্মের কৌশল বা উপায়। নিষ্কাম কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ বা ভক্তিযোগ দ্বারা ঈশ্বরকে লাভ করা যায়। যিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্য বা অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য আরাধনা করেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাকে ভক্ত বলেছেন। ভক্ত চার রকম যথা- আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু আর জ্ঞানী। যিনি বিপদে পড়ে ঈশ্বরকে ডাকেন তিনি আর্তভক্ত। যিনি কোন ইচ্ছা বা প্রার্থনা পূরণের জন্য ঈশ্বরকে ডাকেন, তাঁকে অর্থার্থী ভক্ত বলা হয়। যিনি জ্ঞানের দ্বারা ঈশ্বরকে জানতে চান তিনি হচ্ছেন জিজ্ঞাসু ভক্ত। আর যিনি কোন কিছু পেতে না চেয়ে ঈশ্বরকে ভক্তি করেন এবং এজন্য তাকে ডাকেন, তাকে জ্ঞানীভক্ত বলা হয়। গীতা সব উপনিষদের সারকথা। ঈশ্বর বা ব্রহ্ম সম্পর্কে ধারণা এক জায়গায় সমন্বিতরূপে প্রকাশ করা হয়েছে। গীতামাহাত্ম্যে তাই বলা হয়েছে উপনিষদ যেন গাভী স্বরূপ, আর দুগ্ধ হচ্ছে গীতা। গোবৎস যেমন একটু একটু আঘাত করে দুধ বের করে, অর্জুন তেমনি গোবৎসের মতো প্রশ্ন করে একটু একটু আঘাত করেছেন। আর গীতারূপ দুধ দোহন করেছেন অর্থাৎ গীতারূপ জ্ঞানের কথা স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে শ্রবণ করেছেন।
| একক কাজ: গীতার উপদেশসমূহ চিহ্নিত কর এবং সমাজের মঙ্গলের জন্য তুমি যে ধরনের কাজ করতে চাও তার একটি তালিকা তৈরি কর। |
উল্লিখিত ভক্ত সম্পর্কে দুটি বাক্য লিখে ঘরগুলো যথার্থভাবে পূরণ কর | আর্তভক্ত | অর্থার্থীভক্ত | জিজ্ঞাসুভক্ত | জ্ঞানীভক্ত |
|
|
|
|
নতুন শব্দ: আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু, সান্নিধ্য।
Read more