পূর্বের শ্রেণিতে আমরা ঈশ্বর সম্বন্ধে জেনেছি। জগৎ সৃষ্টি ও মানবজাতির কল্যাণে তাঁর কর্মকীর্তির মাধ্যমে আমরা বিভিন্নভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানবজাতির জন্য তাঁর মুক্তিপরিকল্পনার কথাও আমরা অবগত হয়েছি। ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেছেন যেন আমরা তাঁকে জানতে পারি, তাঁর প্রতি অনুগত থাকি, তাঁকে ভালোবাসি ও তাঁর গুণকীর্তন করি। তিনিই প্রথম আমাদের ভালোবেসেছেন যেন আমরা তাঁকে ভালোবাসতে পারি।
ঈশ্বরকে জানতে গিয়ে আমরা আরও দেখেছি যে, তিন ব্যক্তিতে এক ঈশ্বর। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আমাদের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেছেন: কখনো পিতারূপে, কখনো পুত্ররূপে, আবার কখনো পবিত্র আত্মরূপে। তিনি একসাথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেননি। তাঁকে পরিপূর্ণভাবে বোঝার যোগ্যতা মানবজাতির নেই। তাঁর মহানুভবতা পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি আমাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দয়াশীল ঈশ্বর তাঁর এই প্রতিশ্রুতির কথা কখনো ভুলে যাননি। তিনি আব্রাহাম ও তাঁর বংশধরদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। সময় হলে পর তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে এ জগতে প্রেরণ করলেন।
মানবজাতি বারে বারে ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছে। তারা ঈশ্বরের অবাধ্য হয়েছে। ভাই ভাইকে খুন করে ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বস্ত হয়েছে। এভাবে তাদের পতন হয়েছে। মহান ঈশ্বর মানুষকে পাপ থেকে উদ্ধার করতে এবং তার কাছে মানুষকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে একটি মহাপরিকল্পনা করেছেন। তিনি এই পরিকল্পনা করেছেন যে, তিনি মানুষের কাছে আসবেন। তাই ঠিক করেছেন তাঁর একমাত্র পুত্রকে একটি নারীর মধ্য দিয়ে জগতে প্রেরণ করবেন।
রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট অগাস্টাস সিজারের সময়ে এবং যুদেয়া দেশের রাজা হেরোদের শাসনামলে বেথলেহেমের একটি কুমারীর কাছে তিনি তাঁর দূতকে প্রেরণ করলেন। স্বর্গদূত গাব্রিয়েল মারীয়ার কাছে এসে ঈশ্বরের বার্তা প্রকাশ করলেন। মারীয়াকে প্রসাদে পূর্ণা বলে তিনি অবহিত করলেন এবং তাঁকে প্রণাম করলেন। তিনি মারীয়াকে জানালেন যে, ঈশ্বর তাঁর সহায় আছেন। তিনি গর্ভবতী হবেন এবং একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেবেন। তাঁর নাম হবে যীশু। তিনিই হবেন সমগ্র মানবজাতির মুক্তিদাতা।
মারীয়া একজন সহজ সরল যুবতী ছিলেন। তাঁর বাবার নাম যোয়াকিম এবং মায়ের নাম আন্না। তিনি যোসেফ নামে এক যুবকের সাথে বাগদত্তা হয়েছিলেন। প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সাথে মারীয়ার পরিবার ছোটো একটি গ্রামে বাস করতেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের জীবনযাপন চলছিল। মারীয়ার পিতামাতা ধার্মিক এবং ঈশ্বরের অনুগত ছিলেন। পিতামাতার স্নেহ ভালোবাসায় ও যত্নে মারীয়া বড় হন। পিতামাতার ন্যায় মারীয়াও খুব ঈশ্বরভক্ত ছিলেন। ঈশ্বর আগে থেকেই মারীয়াকে মনোনীত করে রেখেছিলেন তাঁর পুত্রের জননী হওয়ার জন্য। তাই তিনি মারীয়াকে জন্মের আগে থেকেই আলাদা করে রেখেছিলেন, যেন আদিপাপ তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে। মারীয়া ছিলেন নিষ্কলঙ্কা ও আদিপাপ বর্জিতা। গাব্রিয়েল দূতের সম্বোধনে মারীয়া বিচলিত হলেন। দূতের বার্তা অসম্ভব ভেবে তিনি দূতকে প্রশ্ন করলেন, এ কী করে সম্ভব, কারণ তিনি যে কুমারী। দূত বললেন, ঈশ্বরের পক্ষে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। কাজেই পবিত্র আত্মার প্রভাবে মারীয়া গর্ভবতী হবেন। কারণ যাঁর জন্ম হবে তিনি ঈশ্বরের সন্তান বলে পরিচিত হবেন। ঈশ্বরের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণে মারীয়া "হ্যাঁ" বলেছেন। আর এই "হ্যাঁ" বলার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
মারীয়ার স্বামী যোসেফ একজন ধার্মিক, ঈশ্বরভীরু ও বিনয়ী মানুষ ছিলেন। পেশায় তিনি ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি। তাঁরা একসঙ্গে মিলিত হওয়ার পূর্বেই মারীয়া গর্ভবতী হলেন। এই সংবাদ জানার পর তিনি তাঁকে গোপনে ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঈশ্বর গাব্রিয়েল দূতকে যোসেফের কাছে প্রেরণ করলেন। ঈশ্বরের পরিকল্পনার কথা তাঁকে জানালেন। যোসেফকে তিনি সাহস দিলেন যেন মারীয়াকে তিনি স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে ভয় না পান। কারণ মারীয়া পবিত্র আত্মার প্রভাবে গর্ভবতী হয়েছেন। আর তাঁর যে সন্তান হবে তা ঈশ্বরের সন্তান বলে পরিচিত হবে। গাব্রিয়েল দূতের কথামতো যোসেফ সবকিছু করলেন। তিনি মারীয়াকে নিজের সত্রী ও যীশুকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করলেন। এভাবে মারীয়া ও যোসেফের পরিবারে ঈশ্বর তার একমাত্র পুত্রকে প্রেরণ করলেন। তিনি শাশ্বত ঈশ্বরের অদ্বিতীয় পুত্র, প্রভু যীশু খ্রীষ্ট। "আপনি সেই খ্রীষ্ট, জীবনময় ঈশ্বরের পুত্র” (মথি ১৬:১৬)-সাধু পিতরের মতো করে এই কথা বলে আমরা সবাই যীশুর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করি। কারণ তাঁর আগমনে সমগ্র মানবজাতি পেয়েছে অনুগ্রহ আর পরিত্রাণ।
| কাজ: মারীয়ার যে কোন ৩টি গুণ লিখ। |
Read more