মানুষ যেন একা না থাকে, সেই জন্যে ঈশ্বর প্রথমে এই সুন্দর পৃথিবী ও প্রাণিকূল এবং অন্য সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। সবশেষে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। প্রথমে তিনি সৃষ্টি করলেন পুরুষ। এই প্রথম মানুষ হলেন আদম। তাঁকে তিনি রাখলেন স্বর্গের এদেন বাগানে। কিন্তু ঈশ্বর আদমের নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারলেন। তাই একসময় ঈশ্বর বললেন: "মানুষের একা থাকা ভালো নয়। তাই আমি এখন তার জন্যে এমনই একজনকে গড়ে তুলব যে তাকে সাহায্য করবে, তার যোগ্য সঙ্গী হবে।" ঈশ্বর মাটি দিয়ে স্থলভূমির সব জীবজন্তু ও আকাশের পাখিকে সৃষ্টি করলেন। তারপর মানুষকে তিনি বললেন সমস্ত প্রাণীদের নাম রাখতে।
মানুষ অর্থাৎ আদম সবকিছুর নাম রাখলেন। কিন্তু এসব প্রাণীর মধ্যে মানুষের সঙ্গী হবার মতো কাউকে পাওয়া গেল না। কারণ মানুষ অন্য পশুপাখির চেয়ে আলাদা। মানুষের প্রকৃত অভাব নিঃসঙ্গতা তখনো মিটেনি।
তখন ঈশ্বর আদমের ওপর নামিয়ে আনলেন এক তন্দ্রার ভাব। সে ঘুমিয়ে পড়ল। এই সময় তার একটি পাঁজর খুলে নিয়ে তিনি মাংস দিয়ে ওই জায়গাটি ঢেকে দিলেন। তার বুক থেকে খুলে নেওয়া সেই পাঁজর দিয়ে প্রভু ঈশ্বর গড়ে তুললেন একটি নারী বা হবাকে, তারপর মানুষের কাছে তাকে নিয়ে এলেন। তখন মানুষ বলে উঠল:
"অবশেষে এ-ই তো আমার অস্থির অস্থি, আমার মাংসের মাংস! এর নাম হবে নারী, কেননা নরদেহ থেকেই একে তুলে আনা হয়েছে!"
সেই জন্যে মানুষ তার পিতামাতাকে ছেড়ে নিজের সত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং তারা দুইজন একদেহ হয়ে ওঠে। এভাবেই সৃষ্টি হলো পুরুষ ও নারী।
নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতা ও পার্থক্য
ঈশ্বর প্রথম মানুষ আদমের মতো করে নারী অর্থাৎ হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন, যার স্বরূপ একবারে তাঁরই মতো। পৃথিবীর অন্য কোনো সৃষ্টি অবলম্বন করে আদমের জীবনসঙ্গিনীর সৃষ্টি হয়নি। বরং মানুষের দেহটির এক অংশ নিয়েই সে তৈরি হয়েছে। তাইতো মানুষ নারীকে দেখামাত্রই বুঝতে পেরেছে, সে-ই তাঁর যোগ্য সঙ্গিনী। তাঁর সঙ্গে তাঁর দেহ মনের আত্মীয়তা বা সম্পর্ক রয়েছে। তাঁরা দুইজনেই সমানভাবে মানবসত্তার অধিকারী, কিন্তু ভিন্নভাবে। কারণ পুরুষ পুরুষই আর নারী নারীই। তাঁদের দুইজনেরই প্রথম পরিচয়- তাঁরা মানুষ। তবে তাঁরা পরস্পরের পরিপূরক। এ কারণেই তাঁরা একে অন্যের সাথে মিলিত হতে চায়। তাঁরা পরস্পরের প্রতি মিলনের আর্কষণ অনুভব করে। তবে নারী ও পুরুষের মধ্যেকার সমতা ও পার্থক্যগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।
| সমতা | পার্থক্য |
| ১। ঈশ্বর তাঁর আপন প্রতিমূর্তিতে পুরুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি নারীকেও তাঁর আপন প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন। | ১। শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে নারী ও পুরুষের কিছু কিছু ভিন্নতা আছে। বিশেষত পুরুষ ও নারীর যৌন অঙ্গগুলো ভিন্ন। এর মধ্য দিয়ে পুরুষ ও নারীকে আলাদাভাবে চেনা যায়। তাছাড়া পুরুষের দেহ তুলনামূলকভাবে শক্ত; কিন্তু নারীর দেহ কোমল। পোশাক-পরিচ্ছদেও পার্থক্য আছে। |
| ২। পুরুষ দেহ, মন ও আত্মা নিয়ে যেমন মানুষ, নারীও তার দেহ, মন ও আত্মা নিয়ে একজন মানুষ। | ২। ঈশ্বরপ্রদত্ত বিশেষ কিছু ক্ষমতা পুরুষ ও নারীভেদে ভিন্ন। যেমন নারীদের সন্তানধারণ ও জন্মদানের ক্ষমতা আছে, যা পুরুষদের নেই। |
| ৩। পুরুষের যেমন দৈহিক, আত্মিক, মানসিক ও সামাজিক প্রয়োজন রয়েছে মানুষ হিসেবে নারীর প্রয়োজনও একই রকম। | ৩। ভাব বিনিময়, আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বা কাজ করার ধরনের বেশ ভিন্নতা লক্ষণীয়। পুরুষরা অপেক্ষাকৃত কঠোর, সব অনুভূতি সহজে প্রকাশ করতে পারে না। নারীরা তুলনামূলকভাবে কোমল ও আবেগপ্রবণ। |
| ৪। পুরুষের যেমন আত্মমর্যাদাবোধ ও অধিকার রয়েছে, নারীর রয়েছে সমান মর্যাদাবোধ ও অধিকার। | ৪। পুরুষেরা শারীরিক শক্তি বা বাহুবলে বিশ্বাসী। নারীদের জোর থাকে মন ও হৃদয়ে। নারীদের অভ্যন্তরীণ শক্তি বেশি। |
| ৫। পুরুষসুলভ অনেক গুণ নারীর মধ্যেও আছে এবং নারীসুলভ অনেক গুণ পুরুষের মধ্যেও আছে। | ৫। গুণগত দিক থেকে পুরুষ ও নারীর মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে। |
| ৬। নারীরা পুরুষের মতো যে-কোনো কাজ করার যোগ্যতা রাখে। | ৬। সামাজিক বিবেচনায় বিশেষভাবে পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যথেষ্ট বৈষম্য ও পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়। নারীদের নানাভাবে হেয় করা হয়। অনেকভাবে তাদের অধিকারবঞ্চিত করা হয়। পুরুষ ও কন্যাশিশুর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য লক্ষণীয়। |
উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো আমরা সাধারণভাবে খেয়াল করে থাকি। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে একজন পুরুষের ৫১% ভাগ হলো পুরুষসত্তা এবং বাকি ৪৯% ভাগ হলো নারীসত্তা। এই দুই মিলে হলো একজন পরিপূর্ণ পুরুষ। আবার একজন নারীর ৫১% ভাগ হলো নারীসত্তা এবং বাকি ৪৯% ভাগ হলো পুরুষসত্তা। এই দুই মিলে হলো একজন পূর্ণ নারী। কিন্তু পুরুষ ও নারী উভয়ে ঈশ্বরের সৃষ্টি। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তাঁরা সবাই সমান। তাঁরা ভিন্ন হলেও পরস্পরের পরিপূরক ও তাঁরা সমান। তাঁরা কেউ ছোট বা বড় নয়। বরং তাঁরা মানুষ হিসেবে সমমর্যাদার অধিকারী।
| কাজ: তোমার পরিবার বা আশেপাশে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে বৈষম্য ও পার্থক্যগুলো তুমি দেখ তাঁর পাঁচটি লিখ এবং ছোট দলে সহভাগিতা করো। |